#কথা_দিলো_রোদ্দুর (১৪)
#তুসিকা
এদিকে সাম্য ও যে বাসায় থাকে সেখানে পৌঁছেছে অনেক আগেই,, ভেজা কাপড় পাল্টে গোসল করে গা এলিয়ে দিয়েছে বিছানায়,, পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে,, কিন্ত এখন কিছু বানিয়ে খেতে ও ইচ্ছে করছে না,,, মূলত বৃষ্টিতে ভিজে তার খুব বাজে অবস্থা,, সাম্য শখ করে বৃষ্টিতে ভেজে তবে আজ একটু বেশিই হয়ে গেছে,, হাঁচি কাঁশি তো ছিল ই এখন গা টা ও একটু গরম হয়ে আসছে যেন!!
সে সময় অর্থি কে মিথ্যেই বলেছে, সাম্যের অফিস টাইম শেষ হয়ে গিয়েছিল অনেক আগেই। অর্থিদের বাসায় যেতে পারতো; কিন্ত হঠাৎ কেন জানি যায়নি,, ফারিশ কে দেখে ??এমনটা হওয়ার কারণ বোধ হয় সাম্য নিজেই জানে না,, তবে পেটের ভেতর ইঁদুর গুলো যেন খিদের জানান দিচ্ছে বাজেভাবে,, তাই ফোন হাতে নিয়ে মুসাবের নম্বরের কল দিল।
মুসাব আর সাম্য একই সাথে ব্যাংকিং সেক্টরে জব নিয়েছে, পড়াশোনার পাশে তারা নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফোকাস করছে সমান তালে,, তাই সুযোগ পেয়েছে বিধায় এই শহরের চাকরির অফার টা দুইজনে ই মিস করলো না,, হ্যাঁ আরো দুই জায়গা থেকে তারা অফার পেয়েছে তবে সাম্যের বলাতে মুসাব ও এই ফেনীতে ই একই অফিসে জব নিয়েছে।
একসাথে থাকছে একটা ভালো, দুজনার অসুবিধে হলে একে অন্যের সাহায্য করতে পারবে,, তাই তো রান্না না করার বাইরে থেকে যেন খাবার কিনে আনে তাই মুসাবের নম্বরে কল দিল,, কিন্ত প্রথম দুবার ধরলো না,, পরের বার ফোনের উওর করলো মুসাব। প্রথম মুসাব ই কথা বললো;
—” কি রে এই বৃষ্টির মধ্যে কোথায় গিয়েছিলি,, আমি আরো অফিসে তোর জন্য অপেক্ষা করছি,,,
—” তেমন কিছু না,, বাসায় চলে এসেছি,, কিন্ত বাসায় তো রান্না করা নেই, যদি বাইরে থেকে কিছু নিয়ে আসিস…. এখন বাইরে থেকে খেলে রাতে রান্না করবো,,
সাম্য শেষ কথাটা মিনমিন করেই বলল, দুজনের একজন ও বাইরের খাবার বেশিদিন খেতে পারে না,, গত দুই দিন ধরে বাইরে থেকে খাবার খেয়েছে, আজকে ভেবেছিল অফিস শেষ করে বাসায় আসলে দুজনে রান্না করে খাবে,, কিন্ত তা আর হলো কই,, তাই মুসাব কে খাবার আনতে বলাতে সাম্য ভাবলো মুসাব মানা করবে, কিন্ত মুসাব বলল;
—” ঠিক আছে, আমি দশ মিনিটের ভেতর আসছি।
এই কথা শুনে সাম্য ফোনটা পাশে রেখে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে রইল,, তবে মিনিট পাঁচেক পর আবারো ফোন এলো, এবার সাম্যের মা ফাতেমা বেগম ফোন করেছে,, ছেলের জন্য তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই, তাই ফোন কানে নিতে ভেসে উঠল ফাতেমা বেগমের দুশ্চিন্তা মাখা কন্ঠস্বর;
—” অফিস শেষ হলো তোর,, বাসায় ফিরেছিস,,
—” হ্যাঁ আম্মু ফিরেছি,, এইতো কিছুক্ষণ হবে খেয়ে শুয়েছি,,
মিথ্যে কথাই বললো সাম্য, কারন ফাতেমা বেগম শুনলেই রাগারাগি করবেন সাম্যের এমন অনিয়ম শুনে,, তিনি তো সাম্য কে এখানে আসতেই বারণ করেছিল, সে কুমিল্লায় ছিল সেখানেই নাশিদা ফুফুর বাসা কাছেই ছিল, নাশিদা বেগম মেহেদীর মা,, হ্যাঁ মেহেদী সাম্য খুব ভালো বন্ধু, তবে নাশিদা বেগম আবার সাম্যের বাবার খালাতো বোন হয়,, সেদিকে সাম্যের ফুফু।
তাই তো মেহেদীদের পারিবারিক সকল কিছুতে সাম্যের উপস্থিতি একটু বেশিই,, আর নাশিদা বেগম সাম্যের জন্য প্রায়ই রান্না করে পাঠাতেন, তাই ফাতেমা বেগমের এত চিন্তা ছিল না,, কিন্ত এখন একা এই শহরে আছে দেখে ফাতেমা বেগমের চিন্তার শেষ নেই। তাই ফাতেমা বেগম বললেন;
—” আচ্ছা! তা এই সপ্তাহে বাসায় আসবি তো,, আমি তোর জন্য আচার আর কিছু খাবার রান্না করে ফ্রিজ এ রেখে দেব, আসলে নিয়ে যাবি ওখানে,,
—”হ্যাঁ আসবো,, কিন্ত শুধু শুধু এত রান্না বান্না করার দরকার নেই, কষ্ট হবে তোমার,,
—”আরে কিসের কষ্ট,, বরং তুই ওখানে কষ্ট করছিস,, বলেছি চট্টগ্রাম চলে আয়, এখানে কিছু কর, কিন্ত তুই তো আমার কোনো কথাই শুনলি না,, পড়াশোনা ও বাইরে বাইরে করেছিস, এখন চাকরি ও বাইরের জেলায় করছিস,,
—” আরে আম্মু চিন্তা করো না,, এখানে তো ইনর্টান হিসেবে আছি,, কাজ শিখি, সব কিছু দেখি পরে চট্টগ্রাম ফিরে আসবো,,,
—”তোর যা ইচ্ছা,, আমার কথার কি দাম আছে নাকি,, তোর বাপ ও নিজের মন মর্জি মতো চলেছে তুই ও চলছিস,,
সাম্য বুঝেছে ফাতেমা বেগম অভিমান করেছে তাই সে হাসি দিয়ে বলল —-” আম্মু,,, হয়েছে আর অভিমান করতে হবে না,, এই সপ্তাহে আসলে একটু বেশি করে মাংস দিয়ে ডাল রান্না করে দিও, মুসাবের জন্য নিয়ে আসবো,,
—” আচ্ছা,,
এভাবে মা ছেলেতে মিলে কথা হলো কিছুক্ষণ,, আর মুসাব ও খাবার নিয়ে আসলো এর মাঝে। তাই ফোন রেখে মুসাব ফ্রেশ হয়ে আসতেই সাম্য খাবার বেড়ে নিল দুজনের জন্য। দুজন একসাথে খেতে ও বসলো, তবে খাওয়ার এক পর্যায়ে মুসাব রুমের পাশে রাখা ছাতাটা লক্ষ্য করলো, সে নরমাল বলল;
–” ওটা কার ছাতা, তোর কাছে তো ছাতা ছিল না।
কথাটা শুনে সাম্যের যেন হঠাৎ নাকে মুখে খাবার উঠে গেল,, শেষে পানি খেয়ে শান্ত হলো,,
—” আশ্চর্য,, সামান্য একটা কথা জিজ্ঞেস করেছি, এমন রিয়েক্ট করছি যে!! কি ব্যাপার সাম্য!!
মুসাব একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্ব, সে নিমিষেই বুঝলো কিছু কারণ আছে,, তাই আরো একটু জোর দিল, আর মুসাবের এমন কথার ধরণ দেখে সাম্য বলল এটা অর্থির ছাতা, আর বৃষ্টির মধ্যে সে অর্থির সাথেই ছিল। আর অর্থিকে বাসায় দিয়ে আসতেই সাম্যের দেরী হয়ে গেছে তা ও বলে। সবটা শুনে মুসাব মিটমিট করে হাসলো,, আর বলল;
—” কি কোইনসিডেন্ট তাই না,,
—” হ্যাঁ,, অস্বাভাবিক এর কি আছে,, একই শহরে দেখা হতে পারে না বুঝি,,
–”হুম,,, হতেই পারে না,, এক সাথে চলা, দেখা হওয়া,, কথা বলা,, আরো কত কিছু,,,
সাম্য একটু বিরক্ত নিয়ে বলল;
—” চুপ কর শা’লা। এই কারনেই তোকে বলতে চাইনি,, কি থেকে কি বলছিস,,
সাম্যের মুড দেখে মুসাব তাকে আরো বিরক্ত করতে হালকা সুরে গুন গুন করলো;
“” প্রেমে পড়েছে মন,, প্রেমে পড়েছে,, অচেনা এক মানুষ আমায় পাগল করেছে,,
এটা শুনে সাম্য যেন আরো বিরক্ত হলো,, আর দ্রুত খেয়ে উঠে পড়লো,, মুসাবের সামনে আর থাকলো ও না জ্বরের ঔষধ খেয়ে কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে পড়ল। সন্ধ্যার দিকে জ্বর আসলো গা কাঁপিয়ে,, মাথা তুলে যেন বসা ও মুশকিল,, তবে মুসাব বন্ধুর দেখভাল করলো,, নিজে রান্না করলো, খাইয়ে দিল, আর মাথা গা মুছিয়ে দিয়ে ঔষধ ও খাইয়ে দিল। শেষ রাতে জ্বর টা একটু কমলে নিজে ও শুয়ে পড়ল সাম্যের পাশে।
____________
মাঝে চোখের পলকে কেটে গেল দুটো দিন,, অর্থিদের বাসার পরিস্থিতি মোটামুটি ভালোই বলা চলে,, ফারিশ এখনো অর্থিদের বাসায় আছে,, তবে আজ চলে যাবে বলেছে, কিন্ত রেবেকা বেগম বলেছে ফারিশ যেন আরো দুদিন থেকে যায়,, কিন্ত ফারিশ কি কথা শোনার ছেলে নাকি,, নিজের মন মর্জি মতো চলে,, তাই অর্থিদের বাসায় এসেছে হুট করে আর এখন আজ সকালেই নাস্তার টেবিলে রেবেকা বেগম কে বলেছে বিকেলে নাকি চলে যাবে,, এটা শুনে রেবেকা বেগম বললেন;
—”এসেছিস যখন আরো দুটো দিন থেকে যা না ফারিশ,,, বাড়িতে গিয়ে কি করবি,,,
রেবেকা বেগমের কথায় ফারিশ তখন পরোটা মুখে নিতে নিতে বলল;
—” আরে না খালামনি বাড়িতে অনেক কাজ আছে,, আর আমি তো অর্থি কে দেখতেই এসেছি,, এই দুদিনে দেখা শেষ তাই চলে যাবো,,
ফারিশের কথা শুনে অর্থি আড়চোখে তার দিকে তাকালো,, অন্য কেউ না জানলে অর্থি তো জানে সে এখানে কার জন্য এসেছে,, ফারিশের প্রেমিকা এখন ফেনীতে বেড়াতে এসেছে, সে সুবাদে ই তো ফারিশের এখানে আসা,, কি যেন নাম বলেছিল” আফরিন জাহান আরশিয়া” হ্যাঁ আরশিয়া,,, কাল রাতে তো ফারিশ অর্থি কে বলেছে সে যেন আরশিয়া র সাথে কথা বলে,, তাহলে একটা ভালো বন্ডিং হবে দুটো তে,, আর অর্থি ও আরশিয়া র ব্যাপারে তার মা সাজেদা বেগম কে বলতে পারবে। কিন্ত অর্থি শুধু বলেছে সময় হলে কথা বলবে,, তাই আজ ফারিশ ঠিক করেছে আরশিয়া র সাথে দেখা করতে যাবে, আর অর্থি কে ও নিয়ে যাবে,, অর্থি প্রথমে মানা করলে ও ফারিশের জোর করাতে রাজি হয়।
তাই তো কলেজে এসেছে আর ছুটির পর এখন ফারিশের জন্যই অপেক্ষা করছে,, ফারিশ বলেছিল তাড়াতাড়ি চলে আসবে কিন্ত পনেরো মিনিট যাবত ফারিশের দেখা নেই দেখে বেশ বিরক্ত ই হচ্ছিল অর্থি। আর ফেরদৌস ও চলে গেছে,, তাই একা একা দাঁড়িয়ে আছে কলেজ গেটের কাছে,,
তবে বিশ মিনিটের মাথায় ফারিশ আসলো হন্তদন্ত হয়ে,, হাতে তার এক গুচ্ছ গোলাপ,, এগুলোর জন্যই দেরী হয়ে গেছে তার।
—” আচ্ছা অর্থি আর রাগ করিস না,,, এই তো আজকে চলে যাবো, তখন আর কেউ বিরক্ত করবে না বোন, এখন চল আরশিয়া অপেক্ষা করছে,,,
অর্থি আর কিছু বলল না, রাগ দেখিয়ে আর কি লাভ, সেই ফারিশ চলে গেলে তো বাসায় বোরিং ভাবে ই কাটবে সময়,, তাই অর্থি ফারিশের সাথে চলে গেল,,
________
এই দুদিনে সাম্যের জ্বর টা সেরেছে,, মাঝে একটি দিন অফিস থেকে ছুটি নিলে ও আজ ঠিকই অফিস করেছে,, আর আজ সাম্য অর্থির ছাতাটা ও নিয়ে এসেছিল, তাকে ফেরত দেবে বলে। ওইদিন তো একা ছিল তবে আজ সাম্য মুসাব কে ও সাথে করে এনেছে,, তাদের জানাই ছিল অর্থির ছুটি কখন হবে, তাই সে মতে তারা এসেছে ঠিকই কিন্ত অর্থির সাথে ফারিশ আছে, আর উপর ফারিশের হাতে ফুলের তোড়া, দুজনেই হেসে হেসে কথা বলতে বলতে কোথাও যাচ্ছে বোধ হয়,, তাই সাম্য রাস্তার ওপর পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। মুসাব কে উদ্দেশ্য করে বলল;
—” তারা দুজন কি প্রেম করছে মুসাব,,,
মুসাব মুচকি হাসলো,, আর সাম্য কে বলল;
—” কেন ভাই,, অন্তরে কি খুব লাগছে,,
—” কি সব বাজে কথা বলছি তুই,, আমি এমনই জিজ্ঞেস করছি,, দেখলি না তিশার বিয়ের সময় ফারিশ অর্থি কে নিয়ে একটু বাড়াবাড়ি করছিল, আর এখন দেখ!
—’ ওও তুই এত কিছু খেয়াল করেছিস,,
—” কি আশ্চর্য,,, আমি এমনিতেই বলছি,, ওরা প্রেম করছে আমার কি,,, আর তুই কোন ব্যাপার কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস,,
বলেই রাস্তার অপর পাশে দেখতে লাগলো,,
তখন মুসাব আবারো বলল;
—” আচ্ছা ঠিক আছে আর কিছু বলব না,, তবে একটা কথা বলি— ফারিশের না একটা প্রেমিকা আছে,, আমার জানা মতে।
মুসাবের কথায় সাম্যের ভাবগতি পরিবর্তন হলো না,, সে এখনো ওদের দিকে তাকিয়ে আছে, দুজন কে তীক্ষ্ণ নজরে দেখছে,, আর বোধ হয় একে একে হিসেব মেলাচ্ছে আসলেই কি তারা প্রেমে জড়িয়ে আছে কিনা।
চলবে।
আচ্ছা গল্প কি আপনাদের কাছে ঠিক করে পৌছাচ্ছে না,, আপনারা রিয়েক্ট করছেন না,, এমন কেন হচ্ছে আমি নিজেও জানি না,, ১৩ নং পর্বে রিয়েক্ট কত কম করেছেন,,. তাই যারা পড়ছেন প্লিজ একটা করে লাইক কমেন্ট করে যাবেন, পরের পর্ব তাড়াতাড়ি পেতে তো আরো বেশি করে কমেন্ট করবেন,, বেশি রেসপন্স পেলে গল্প একদিনে লিখে আবার একদিনে পোস্ট করবো,,,
আর এখন গল্পের কথা,, সাম্য আসলেই মনে করছে ফারিশ অর্থির প্রেম চলছে,, আচ্ছা ও মুখে বলছে না কিন্ত সাম্য যে অর্থি কে একটু একটু পছন্দ করছে আপনারা কে কে জানতে পেরেছেন???
আর গল্পে যদি কিছু ভুল মনে হয় বলেন, আমি অবশ্যই ঠিক করে নেব,,,

