প্রেম_বর্ণহীন #তোনিমা_খান #পর্বঃ২২

0
2

#প্রেম_বর্ণহীন
#তোনিমা_খান
#পর্বঃ২২

শীতকালের গভীর রাত। চারিদিকের গা ছমছমে নীরাবতায় ও মোত্তাকিনের গভীর নিদ্রাচ্ছেদ ঘটে। তবে এর কারণ নিছকই কোন শব্দ নয় বরং বক্ষস্থলের শূন্যতা। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে ঘুম জড়ানো নেত্রে খোঁজে মেয়েটিকে। বারান্দার দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নারী অবয়ব দেখে উদাম গতরে কম্বল পেঁচিয়ে বিছানা থেকে নামে।

–“এলাকা পাহাড়া দিচ্ছিস? একটাও চোর ধরতে পেরেছিস?”

রুক্ষ জড়ানো কণ্ঠে ইন্দুবালা গায়ের চাঁদর আরেকটু জড়িয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। এক হাত দূরত্বে থাকা ফোলা ফোলা কুঁচকানো মুখশ্রী দেখে বলল,
–“উঠেছিস কেন?”

–“তুই এখানে কি করছিস না ঘুমিয়ে?”

–“ঘুম আসে না।”, মিহি স্বরে বলে ইন্দুবালা ফের ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয় দরজায়।

মোত্তাকিনের কুঁচকানো কপাল আরো কুঁচকে যায়। কিয়ৎকাল দাঁড়িয়ে থেকে নিরুদ্বেগ হেঁটে গিয়ে সম্মুখের বেতের সোফায় গা এলিয়ে দেয়। ইন্দুবালা ক্লান্ত স্বরে বলল,
–“এই ঠান্ডায় এখানে বসেছিস কেন?”

মোত্তাকিন সোফায় পা ছড়িয়ে শুয়ে কম্বল সমেত দু’হাত ছড়িয়ে বুকের কাছটা খালি করে দিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
–“এখানে আয়।”

ঘুমের জন্য কাতর হলেও শারীরিক অস্থিতিশীলতায় ঘুমাতে না পারা ইন্দুবালার শরীর ভঙ্গুর প্রায়। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল একা একা নির্ঘুম রাত্রি যাপন করতে। একটু সঙ্গ, ভালোবাসার লোভ সর্বদাই তাকে গ্রাস করে। এই মুহূর্তে সেই তৃষ্ণা একটু বেশিই প্রকট ছিল। সে কালবিলম্ব করে না। ধীরস্থির গিয়ে বক্ষমাঝে শুয়ে পড়ে ছেলেটির পায়ের উপর পা রেখে। মোত্তাকিন কম্বলের আড়ালে বক্ষমাঝে লুকিয়ে নেয় ভারী দেহটিকে। ঘুমে জড়িয়ে আসা চোখ বন্ধ করলে তাতে বিঘ্ন ঘটায় ইন্দুবালার অদ্ভুত প্রশ্ন।
–“তোর আমাকে কখনো ঘৃণা লাগে না?”

–“ঘৃণা কেন লাগবে?”, মোত্তাকিন কপাল কুঁচকে শুধায়।

–“এই যে আমি এত কালো, দেখতে অসুন্দর! তোর কখনো ঘৃণা লাগে না? তুই আমায় এত ভালোবাসিস কেন?”

মোত্তাকিনের মেজাজ বিগড়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–“তোকে ভালোবাসি এই গুজব কে রটিয়েছে?”

–“আমি!”

–“নিন্দুক পড়শী! তোর কাজ ই গুজব রটানো। কোন ভালোটালো বাসি না তোকে।”

–“তবে?”

–“তবে কি?”

–“আমায় বুকে নিয়েছিস কেন?”

–“তোকে নেব না তো কাকে নেবো, বেয়াদব? পাড়ার ভাবিকে বুকে নেবো?”

ইন্দুবালা মাথা উল্টে ছেলেটির পানে তাকায়।
–“তোর লজ্জা করে না আমায় নিয়ে সবার মাঝে চলতে? তোর বন্ধুদের বউয়েরা নিশ্চয়ই অনেক সুন্দরী, ফর্সা।”

মোত্তাকিন আর মেজাজ ধরে রাখতে পারে না। শক্ত হাতে মেয়েটির চোয়াল চেপে দাঁত খিচে বলে,
–“তুই এই অবস্থায় আমার হাতে দু’টো খাবি? আমি অন্যের বউ দেখতে যাব কেন? আমার বউ আছে না? আমার বউ সবার থেকে ঢের সুন্দর।”

ইন্দুবালা নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে ছেলেটির দিকে। ওষ্ঠকোনে স্মিত হাসি। কালো কুচকুচে মেয়েটি না-কি সবার থেকে সুন্দর! মোত্তাকিন ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে চেপে ধরা চোয়াল হালকা করে। মাথা নুইয়ে ওষ্ঠদ্বয়ে শব্দ করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে বলে,
–“জগতে চলার পথে সৌন্দর্য হলো একটা ক্ষণস্থায়ী মোহ! আর আমি ক্ষণস্থায়ী মোহে বিশ্বাসী নই। আমি আগে মানুষের ভেতরটা বুঝি, ব্যক্তিত্ব ভালোবাসি। তুই যদি ব্যক্তিত্বের কথা বলিস তবে নিঃসন্দেহে আমি সবার থেকে জিতে গিয়েছি‌।”

ইন্দুবালাও জিতে গিয়েছে চলার পথে এমন একজন মানুষ পেয়ে—যে তাকে সৌন্দর্য দিয়ে নয় বরং মন থেকে ভালোবেসেছে। শরীরের অস্থিরতা ফিকে পড়ল প্রিয় মানুষটির উষ্ণতায়। প্রসন্ন মনে অচিরেই নিদ্রায় তলিয়ে গেল ইন্দুবালা। চুলের গোছায় অলসতার সাথে কারোর হাত অনবরত তার স্বস্তি নিশ্চিত করতে ব্যস্ত।

কথায় আছে “যাহাই বেশি, তাহাই বিষ” অতিরিক্ত সবকিছু দুঃখের কারণ হয়। তেমনি অতিরিক্ত ভালোবাসা কিংবা অন্ধ ভালোবাসাও ক্ষতিকারক। মুহিত ইরতেজাও ঠিক একই পথের বিবাগী পথিক। স্ত্রী সন্তানের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য নিজের ভালোবাসাকে অন্ধের পর্যায়ে নিয়ে যেতেও সে কুণ্ঠাবোধ করেনি। কিন্তু পরিণতি কি সর্বদা আমাদের মনঃপুত হয়?

সড়ক নির্মাণ এ বছরের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হওয়ায় মুহিত ইরতেজা চুক্তি মোতাবেক আট মাস সময় পেয়েছিল। বরাদ্দকৃত এই সময়সীমার মধ্যে মুহিত ইরতেজা টেন্ডারের কাজ শেষ করতে না পারলে তাকে পারফরম্যান্স গ্যারান্টি দিতে হবে। সময়সীমার আর মাত্র দুই সপ্তাহ আছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আগেরবারের মতোও এবারেও বশিরের কাজে সে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। লিস্ট অনুযায়ী তাকে দেখিয়েছে সব নাম্বার ওয়ান ভালো মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে। কিন্তু তবুও তার কোথাও সংকোচ বোধ হচ্ছে। তার থেকেও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় টেন্ডার বাবদ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর থেকে যত টাকা বরাদ্দ করা হয়, তার সবটাই বশির নিয়ে নিয়েছে কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই টাকা নেয়ার কোনপ্রকার মূল চুক্তিপত্র মুহিত ইরতেজাকে দেয়নি। বলেছে মূলকপি মোত্তাকিনের কাছে দিয়ে দেবে। ছেলের উপর বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকায় মুহিত ইরতেজা এতদিন নিশ্চিন্তে ছিল। তবে এখন তার চিন্তা হচ্ছে!

দুই সপ্তাহ পর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর থেকে যখন কাজের গুণগত মান, বিল যাচাই আর তদন্ত করতে আসবে তখন এগুলোর জন্য আবার ঝামেলায় না পড়তে হয়। বশিরের কোম্পানি যথেষ্ট স্বনামধন্য আর প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘশ্বাস ফেলল মুহিত ইরতেজা। সে আশারাখে যেখানে মোত্তাকিন আছে সেখানে সবটা সুন্দর ভাবে মিটবে।

অসুস্থতার ভারে নুব্জ্য দেহ একটু আরাম চায়। মুহিত ইরতেজা বাগানের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ইদানিং তার শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো যায় না। বুকে ব্যথা অনুভব হয় ভীষণ। কখন না জীবন ফুরিয়ে যায় আফসোসে জর্জরিত হয়ে।
ছেলের পেছনে ছুটতে থাকা মিরসাদকে দেখে সে স্মিত হাসল। তার সন্তানরা সবাই মাটির পুতুল! তন্মধ্যে মিরসাদ একটু বেশিই বুঝদ্বার। সে যেতে যেতে তার উদ্দেশ্যে বলল,
–“মিরসাদ, তোমার ভাইয়ের কাছে একটু টেন্ডারের চুক্তিপত্রের বিষয়ে আলোচনা করো। কবে নাগাদ আমি ওটা হাতে পাব জিজ্ঞেস করো।”

মিরসাদ মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে বলল,
–“ঠিক আছে পাপা।”

সকাল সাতটা। প্রভাতের শীতল স্নিগ্ধতায় উদাম দেহে হালকা শিরশির জাগানো অনুভূতি আরো প্রগাঢ় হয় বক্ষমাঝে থাকা নারী অবয়ব আদুরে শব্দ করে বুকে মুখ ঘঁষতেই। মোত্তাকিন ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে তাকায় বক্ষমাঝে বেঘোরে ঘুমানো মেয়েটির পানে। ব্যস্ত দৃষ্টি আরেকবার স্ক্রিনে ভেসে থাকা কালো চকচকে অস্ত্রটির উপর ফেলে সেটা কাউকে সেন্ড করে ফোনটা অদূরে রেখে দিল। আলগোছে মেয়েটিকে আরেকটু জড়িয়ে নেয়। এলোমেলো চুলগুলো গোছাতে গোছাতে ললাট বরাবর গভীরভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। এমন রাত জেগে থাকা তারপর আবার সকালে স্কুল করা—শরীর যে আর শরীর থাকবে না। ডাক্তার জানিয়েছে প্রেগন্যান্সিতে হরমোনাল ইমব্যালেন্সের কারণে এমনটা হয়। তাই তার ও খুব একটা ঘুম হয়নি। শীতের সকাল!মোত্তাকিন গায়ের কম্বলটা টেনে মেয়েটিকে পুরোটা ঢেকে নিলো।
কিয়ৎকাল বাদ অদূরে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করতে লাগল। বশির ভাইয়ের নাম দেখে সে কানে ঠেকায়।
–“ভাই এত সকালে ফোন দিলেন যে?”

–“কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল, মোত্তাকিন। দুদিন পর তোকে এক জায়গায় যেতে হবে একটু। খানিক দূরে।”

–“আচ্ছা ভাই, সমস্যা নেই।”

–“সমস্যা নেই? তুই এত সহজে মেনে যাবি আমি বুঝিনি। শুনলাম তোর বউ নাকি প্রেগন্যান্ট। বউকে রেখে যাবি?”

বরাবরই ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ মনঃপুত হয় না মোত্তাকিনের। তীক্ষ্ম নজর সদ্য আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে ওঠা আবাসিক এলাকার নীরব গলির দিকে ফেলে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
–“আমি আমার স্ত্রী পরিবারকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিয়েই নিজের দিন শুরু করি, ভাই‌। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দ্বন্দ্ব আমার একার হয়।”

–“দেখিস কখনো যেন এই নিরাপত্তায় ঘাটতি না পরে।”, বশিরের ধিমি কণ্ঠ। মোত্তাকিন স্মিত হাসল,
–“নিজেকে নিশ্চিন্ত রাখাও একটা সেল্ফ কেয়ার ভাই। আপনি নিজের খেয়াল রাখেন, আপনার কাজ আমি করে দেব।”

–“শুনে খুব খুশি হয়েছি, মোত্তাকিন।”, বশিরের প্রসন্ন কণ্ঠে মোত্তাকিন চাপা স্বরে বলে,
–“ভাই, টেন্ডারের আসল চুক্তিপত্র চাইছে সিটি মেয়র। আপনি এখনো দেননি।”

–“আরে ব্যাটা দেব দেব। আমি কি পালিয়ে যাচ্ছি না-কি? পালাবে তো অন্যকেউ। আচ্ছা রাখছি, হ্যাঁ। সকাল সকাল বিরক্ত করার জন্য দুঃখিত ছোট ভাই।”, বশির ফোন কেটে দেয়। মোত্তাকিন উদাসীন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অদূরে। বিড়বিড় করে বলে,
–“আপনি কি করতে চাইছেন, ভাই? আপনি যতক্ষণ সহজ থাকবেন আমিও ততক্ষণ সহজ থাকব। আপনি জটিল হলেই সমস্যা!”
*****

সম্মুখের অনাদরে পড়ে থাকা এক স্যুটকেস টাকার থেকে লোলুপ দৃষ্টি সরিয়ে পারভেজ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা ধরিয়ে নিজের ঠোঁটে চেপে আরেকটা মোত্তাকিনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মোত্তাকিন আড়ষ্টতা ভেঙে না বোধক মাথা নাড়লো। পারভেজ ভ্রু কুঁচকে বলল,
–“তুই সত্যি-ই সিগারেট খাস না?”

তূর্য ঝটপট ফিরিয়ে দেয়া সিগারেটটা ছিনিয়ে নিয়ে বলল,
–“নাহ, অনেক মাস হয়েছে, ভাই এখন আর সিগারেট খায় না।”

পারভেজ ভ্রু উঁচিয়ে পুনরায় বলে,
–“এই পন কবে থেকে নিয়েছিস?”

দাঁড়িতে হাত চুলকাতে চুলকাতে মোত্তাকিন উদাসীন কণ্ঠে বলল,
–“ইন্দুবালা সিগারেটের গন্ধে বমি করে দেয়।”

–“এখনো? অভ্যাস হয়ে যাওয়ার কথা এতদিনে।”, পারভেজের গা ছাড়া কণ্ঠে মোত্তাকিন অলসতার সাথে ঠোঁট ছড়িয়ে হেসে বলল,
–“এখন আরো বেশি। বাবু আসার পর থেকে দূর থেকেও কোন উল্টাপাল্টা গন্ধ সহ্য করতে পারে না, বমি করে অবস্থা খারাপ করে দেয়।”

সিগারেটে সুখটান দিতে দিতে পারভেজ বাঁকা চোখে দেখে ছেলেটিকে। স্ত্রী সন্তানের জিকির উঠলেই ছেলেটির মুখে অদ্ভুত সুন্দর এক আদল ফুটে ওঠে। সে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
–“তুই কি চিন্তা করছিস বলতো? বশির ভাই আর উত্তরের মেয়র তপনের এত করুণ অবস্থার পরেও যদি চুপ থাকে, তবে এর পেছনে ভয়ানক কিছু লুকিয়ে আছে।”

–“আমিও চাই বশির ভাই তার ভয়ানক পরিকল্পনা দ্রুত প্রকাশ করুক। আমি আর এগুলো নিতে পারছি না। বাবু আসার আগে তার ভালো বাবা হতে হবে।”, মোত্তাকিনের উদাসীন তবে দৃঢ় কণ্ঠে পারভেজ প্রবল আগ্রহে শুধায়,
–“তুই কোন পরিকল্পনা করেছিস?”

–“নাহ, কোন পরিকল্পনা নেই। শুধু বশির ভাইয়ের পরিকল্পনা যতটা ভয়ানক হবে আমার প্রতিঘাত ততটা ভয়ানক হবে। ব্যাস! আমার মুক্তি চাই এই গোঁজামিল থেকে, আর সেটা যেভাবেই হোক পেতে হবে।”
পারভেজ আর কথা বাড়ায় না গভীর ভাবনায় ডুবে যায়।

–“বিশ হাজার টাকা লাগে।”, পুনশ্চঃ মোত্তাকিনের উদাসীন কণ্ঠে তূর্য গলা খাঁকারি দিয়ে আরেকটু জড়সড় হয়ে বসল। পারভেজ গুরুগম্ভীর অতি শান্ত দৃষ্টি ফেলল ছেলেটির সম্মুখে থাকা এক স্যুটকেস টাকার পানে। থমথমে মুখে বলল,
–“তুই ফাজলামির মুডে আছিস?”

মোত্তাকিন ঘাড় কাত করে তাকায়। ডানে বামে না বোধক মাথা নেড়ে বলল,
–“উঁহু, আসলেই প্রয়োজন। জোগাড় করে দিতে পারবি? মাসের শেষে দিয়ে দেব।”

পারভেজ এবার অধৈর্য্য হয়ে বলল,
–“তোর সামনে এক স্যুটকেস টাকা পড়ে আছে।”

মোত্তাকিন অসন্তোষের সাথে বলল,
–“বাবু দোল খেতে ভালোবাসে, এই টাকায় কি আমি ওর জন্য দোলনা কিনব?”

পারভেজ ভড়কে যায়। সিগারেট দূরে সরিয়ে কপাল কুঁচকে শুধায়,
–“বাবু দোল খেতে পছন্দ করে মানে? পুঁচকে বের হয়েছে?”

মোত্তাকিন গাল ভরে হাসে। প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে বলে,
–“না। জানিস, আস্ত এক দুষ্টু হয়েছে! ইন্দু হাঁটলে ও দোল পায় তাই ও হাঁটা থামালেই লাথি দেয়, দোল খেতে পারে না বলে। গতকাল ধুপধাপ লাথি দিচ্ছিল আমার হাতে ধাক্কা লেগেছে। আমি তো অবাক হয়ে গিয়েছি।”

পারভেজ পুনরায় সিগারেট ঠোঁটে চেপে স্মিত হাসল। বলল,
–“তুই দেখি পাক্কা ফ্যামিলি ম্যান হয়ে যাচ্ছিস।”

–“আরো আগে হওয়া উচিৎ ছিল। হুদাই এতদিন সময় নষ্ট করেছি আর ইন্দুবালাকে মানুষের কথা শুনিয়েছি।”, মোত্তাকিনের কণ্ঠে আফসোস। পরপরই বলল,
–“এখন তোর ও হওয়া উচিৎ। এই তূর্য তুই ও বিয়ে করে একটা চাকরি বাকরিতে ঢুকে পর। এ জীবনে কোন শান্তি নেই অশান্তি ছাড়া।”

পারভেজ ডনে বামে মাথা নেড়ে বলল,
–“তুই যা শুরু করেছিস দলে বেশিদিন টিকব না। এরপর কি করে খাব?”

–“পড়াশুনা করেছিস কি ঘাস কাটতে?”

–“সে এক পরীক্ষা গেলে বই সহ পড়াও কেজি দরে বিক্রি করে দিয়েছি।‌ তা আর মাথায় নেই। ও দিয়ে আর কাজ হবে না।”

–“সার্টিফিকেট তো আছে! আগে একটা চাকরি নেই তারপর কাজ করতে করতে দক্ষতা এসে যাবে।”

–“আমার তো আর বাপের কোম্পানি নেই—যে কাজ না পারলে ধরে ধরে কাজ করাবে আর মাস শেষে মোটা অংকের স্যালারি দেবে।”

–“খোঁচাবি না। ঐ কোম্পানিতে আর এক মাস রয়েছি। এরপর আমি আমার রাস্তায় তারা তাদের।”, মোত্তাকিনের বিরক্তি মিশ্রিত কণ্ঠে তূর্য বলল,
–“ভাই আপনি কি সত্যি সত্যি দল করা ছেড়ে দিচ্ছেন?”

–“দিচ্ছি না দিয়েছি, এখন শুধু ফাইনাল ইস্তফা নেয়া বাকি। জানি না সেই ইস্তফা জীবন থেকে হবে নাকি মনুষ্যত্ব বোধ থেকে। তবে কিছু একটা হবে।”, মোত্তাকিন উদাসীন হয়। কথার মাঝেই বাড়ি যাওয়ার তাগিদ অনুভব হলে, ফের শুধায়,
–“পারবি কিছু টাকার ম্যানেজ করে দিতে?”

পারভেজ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। বলে,
–“দোলনা কিনতে কত লাগবে? আব্বু ঘরের জন্য ভালো মানের একটা ওয়াশিং মেশিন কেনার জন্য বেশকিছু টাকা দিছে। আমার বাপের ইনকাম একদম হালাল। চাইলে সেখান থেকে নিতে পারিস।”

–“দোলনার দাম জিজ্ঞেস করে এসেছি। সতেরো হাজার চায়। তুই এই টাকা দিলে তোর বাপ চ্যাঙ দোলা করে পেটাবে না?”

–“আমার টাকা দিয়ে মেশিন কিনে নেব। তুই নিশ্চিন্তে থাক। তোর বাবু হালাল পয়সায় দোল খেতে পারলে হলো।”

বলেই পারভেজ পকেট থেকে টাকা বের করে গুনে গুনে বিশ হাজার টাকা দিয়ে বলল,
–“এটা আর ফেরত দিতে হবে না। চাচার পক্ষ থেকে উপহার।”

–“সর!”, মোত্তাকিন তার বাহু চাপড়ে নাকোচ করে। পারভেজ উঠতে উঠতে বলে,
–“কোন কথা বলবি না। এগুলো ফেরত দেয়ার নাম ও নিবি না। আসি, আব্বু একবার কিছু বললে যতক্ষণ না করে দেব ততক্ষণ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করবে। ঐ দেখ আবার ফোন দিছে। এই ভদ্রলোকের ফোনে এত টাকা কে দেয় আল্লাহ জানে!”

পারভেজ বিলাপ করতে করতে বেরিয়ে যায় টং এর দোকান থেকে। মোত্তাকিন আর তূর্য ও আড়মোড়া ভেঙে চলে দোলনার দোকানে।

ইন্দুবালা গঠনগত দিক থেকে অনেক লম্বা। মোত্তাকিনের কান ছুঁয়ে যায় তার উচ্চতা। সুস্বাস্থ্য হলেও মোটা কেউ বলতে পারে না। তবে সামান্য ভারী উদর নিয়ে ইদানিং তার চলতে একটু কষ্ট হয়। স্বাস্থ্য বেড়ে গিয়েছে খুব দ্রুত। বাবার সাথে দেখা করে সে ধীরস্থির উদর আঁকড়ে ধরে উপরে ওঠে। মধুমিতা নির্দিষ্ট সময়ের সিরিয়াল দেখছিল। মেয়েটিকে দেখে শুধায়,
–“কি হলো দেখা করে এলি? তোর কূটনী মা কিছু বলেছে না-কি?”

ইন্দুবালা বিতৃষ্ণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
–“সে কিছু বলে না এখন আর। তুমি তাকে নিয়ে এমন কথা বলো না তো! পরে দেখা যাবে সবাই তোমায় কূটনী বলছে।”

মধুমিতা মুখ বাঁকিয়ে বলল,
–“সে তো আমার আর আমার ছেলের ভয়ে বলে না।”

ইন্দুবালা ডানে বামে মাথা নাড়ল। নিজের ঘরে মৃদু আড়ম্বরতা শুনে শুধায়,
–“ঘরে এত আওয়াজ কিসের, মধু?”

–“তুই গিয়ে দেখ।”, মধুমিতার কথায় সে সোজা সেদিকেই পা বাড়ায়। দরজা সম্মুখে গেলে চক্ষু শীতল হয় একটা বিশালাকৃতির ক্রোশেটের দোলনা ঝুলতে দেখে। দোলনা সেট করা হতেই অপরিচিত লোকটিকে বিদায় দিয়ে মোত্তাকিন ঘরে ফিরে আসে। ওষ্ঠকোনা আলতো বেঁকে যায় দোলনা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা হাস্যোজ্জ্বল মুখের মেয়েটিকে দেখে।

কদর করলে কালো কুচকুচে গায়ের বরনেও অদ্ভুত সৌন্দর্য প্রকাশ পায়। অবহেলা, কটুক্তির আড়ালে চাপা পড়া সৌন্দর্যরা এখন অবমুক্ত ঠিক যেন কোন শামুকের খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসা এক মুক্তোর দানা। এখনকার ইন্দুবালাকে দেখলে কেউ বলবে না তার জীবনে গায়ের রঙ নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব, অবজ্ঞার জায়গা আছে। বরং মুখশ্রী সহ বদনে দৃশ্যমান হয় সুখের ছোঁয়া।
সে এগিয়ে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। ইন্দুবালা বাড়িয়ে দেয়া হাত আঁকড়ে ধরে ধীরস্থির দোলনায় বসে। বুড়ো বয়সে দোলনায় চড়ে আরামে খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে। দুলতে দুলতে বলল,
–“এত বড় দোলনার কি প্রয়োজন ছিল?”

মোত্তাকিন মেয়েটিকে‌ দোলাতে দোলাতে বলল,
–“লাথি খাওয়ার চেয়ে দোল খাওয়া বেটার! পছন্দ হয়েছে?”

–“খুব।”, ইন্দুবালা উৎসুক কণ্ঠে বলল।

মোত্তাকিন স্মিত হাসে। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মধুমিতা আলতো হেসে চলে যায়। নিজের বৈবাহিক জীবন সুখের না হওয়ায়, তার খুব শখ ছিল যেন ইন্দুবালার বৈবাহিক জীবন সুখের হয়। হয়তো সে পেরেছে!

কিন্তু আমাদের জীবনের গতিবিধিতে সর্বদাই কেন এত কিন্তুর ঘনঘটা থাকে? জীবন যদি সর্বদা একই ধাঁচে প্রবাহিত হয় তবে কি খুব বেশি ক্ষতি হয়ে যেত?

পরেরদিন দুপুরের ঘটনা। মধুমিতা খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সব গুছিয়ে টিভি ছেড়ে সোফায় পা গুটিয়ে বসে। এখন একটু বিশ্রাম করবে। ইন্দুবালা নিজের মনের খচখচানি দূর করতে মোত্তাকিনের কাবার্ড থেকে ব্যাংকের কাগজপত্র গুলো বের করে। উৎকণ্ঠা নিয়ে সেগুলো মধুমিতাকে দেখিয়ে বলে,
–“মধু, দেখো তো তোমার ছেলের কাছে এত টাকা কোত্থেকে আসে? এখানে কয়েক ধাপে অনেকবার মোটা অংকের টাকা ট্রান্সফারের কথা স্পষ্ট লেখা আছে।”

মধুমিতা ভীষণ আগ্রহের সহিত ব্যাংকের চেক আর কাগজগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে দেখল। অবাক হয় লাখ টাকাও নয় বরং কোটি টাকার লেনদেন দেখে। সে ভিত দৃষ্টিতে তাকায় ইন্দুবালার দিকে।
–“এত টাকা মোত্তাকিনের কাছে কেন আর কোত্থেকে আসবে ইন্দু?”

–“আমিও তো সেটাই বুঝতে পারছি না।”

মধুমিতা গভীর ভাবনায় ডুবে যায়। পরপরই চমকানো স্বরে বলল,
–“আচ্ছা ইন্দু, তুই আমায় সত্যি করে বলতো মোত্তাকিনের কি ওর বাবার সাথে কোনরকম সংযোগ আছে?”

ইন্দুবালা এবার নজর চুরি করতে লাগল। মধুমিতা কঠোর দৃষ্টিতে তাকায়। রেগে গিয়ে বলে,
–“তুই কিছু লুকাচ্ছিস?”

ইন্দুবালা বিপাকে পড়ে। ভেবে দেখল এখন যদি মধুমিতাকে না জানায় তবে যদি কোন বিপদ ঘটে? সে মিনমিনে স্বরে বলল,
–“মোত্তাকিন মিরসাদ ভাইয়ার কোম্পানিতে চাকরি করে মধু।”

নিজের ভ্রান্ত ভাবনা কেমন সত্যি হতে দেখে মধুমিতা ভীত কণ্ঠে বলল,
–“এই কথা তুই আমায় আজ বলছিস? তার মানে মোত্তাকিনের কোন সংযোগ আছে ওর বাবার সাথে। তার মানে কি সেদিনকার ঐ টেন্ডারের কাগজপত্রের সাথেও মোত্তাকিনের সংযোগ রয়েছে।”

ইন্দুবালা আনত সুরে বলল,
–” হতে পারে। নয়তো এত টাকা তো ওর কাছে কোনভাবেই আসার কথা না।”

মধুমিতা ঘেমে ওঠে। উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,
–“এগুলো সরকারি টেন্ডার। এসবে কেন জড়ায় ও, তুই বারন করবি না? এখানে কেউ কোনভাবে ঝামেলায় জড়িয়ে দিলে জেল ছাড়া রেহাই নেই।”

–“আমি তো এসব কিছুই জানি না মধু। আমি শুধু জানি ও মিরসাদ ভাইয়ের কোম্পানিতে চাকরি করে।”

–“ও কোন গন্ডগোলে জড়িয়েছে ইন্দু। আমার মন বলছে ও আবার কোন ঝামেলা ঘটাবে। তিন মাস ঝামেলা ছাড়া ছিল না? এখন আর শান্তি ওর সহ্য হচ্ছে না।”, মধুমিতা বিলাপ করতে লাগল।

তাদের বিলাপ ভয়ে পরিণত হলো পরদিন সকালের সংবাদমাধ্যম অন করতেই। মধুমিতা বাঁক হারা হয়ে যায় টিভির স্ক্রিনে ভাসতে থাকা মুহিত ইরতেজার বিবর্ণ মুখ দেখে। যেখানে একাধিক সরকারি কর্মকর্তা আর পুলিশের ঘেরাও করে আছে, আর তার মাঝে মুহিত ইরতেজা বলহীন, ক্ষমতাহীন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সেখানে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এর কর্মকর্তারা একের পর এক স্টেটমেন্ট দেখিয়ে বিশদ বিবৃতি দিচ্ছে, কি করে সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজা সরকারি টেন্ডারের টাকা লুটে নিম্নমানের কাজের জন্য বশির আর তার কোম্পানিকে হায়ার করে।
বরাদ্দকৃত অর্থের তিন ভাগের এক ভাগ টাকা সে এই টেন্ডারের জন্য ব্যবহার করেছে। একের পর এক মিথ্যা অপবাদে অভিযুক্ত মুহিত ইরতেজাকে তখন হতভম্ব। উত্তেজিত জনতারা ঘৃণ্য, ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে ভস্ম করে দিচ্ছে তাকে। প্রায় ত্রিশ কোটি টাকার কৈফিয়ত চায় তারা। মুহিত ইরতেজা ব্যতিব্যস্ত হয়ে তাদের কাছে বলছে, সে টেন্ডার বাবদ সব টাকাই পরিশোধ করেছে। একের পর এক সাফাই দিলেও সে সরকারী কর্মকর্তাদের মানাতে ব্যর্থ হয়।
কারণ তার কথার কোন যুৎসই প্রমাণ সে দিতে পারছে না। বরং বশির পুলিশ সহ সকলের সামনে বিল পাসের একটি চুক্তিপত্র দেখায়, যেখানে স্পষ্ট লেখা মুহিত ইরতেজা তাকে কতটুকু টাকা দিয়েছে। সে সেই টাকার মধ্যেই টেন্ডারের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামের রশিদ দেখিয়ে ভীষণ অসহায়ের সাথে বলল,
–“আমায় যত টাকা দেয়া হবে আমি তো তত টাকার মধ্যেই কাজটা সম্পন্ন করতে হবে। আপনি বলুন স্যার, এখানে কি আমি দোষী? আপনারা আমায় কেন আইনের আওতায় আনবেন? সিটি মেয়র মুহিত ইরতেজা আমায় যে আদেশ দিয়েছে আমি শুধু সেটাই করেছি।”

বশিরের সমর্থনে দাঁড়িয়ে থাকা উত্তরের মেয়র এই অপবাদকে আরো জোরদার করে দেয়। মুহিত ইরতেজা ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে উত্তরের মেয়র আর বশিরের একের পর এক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করায়। যেই স্টেটমেন্ট প্রত্যেকটাই মিথ্যা।

মুহিত ইরতেজা অনুনয় করে যায় শেষ পর্যন্ত।
–“ও মিথ্যা বলছে, স্যার। আমার কাছে প্রমাণ আছে। আমার ছেলে এই চুক্তিপত্রের সাক্ষী ছিল।”

কিন্তু কেউ মানে না‌। এক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের হক ছিনিয়ে নেয়ায় ক্ষিপ্ত জনগন সেখানেই মারতে উদ্বত হয়। কিন্তু পুলিশ বাহিনীরা মুহিত ইরতেজাকে সাময়িক রক্ষা করে কাস্টিডিতে নেয়। কর্মজীবনে বিগত বছরগুলোতে কোন দূর্নীতির রেকর্ড না থাকায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর তাকে বারো ঘন্টার সময় দেয় নিজের সততা প্রমাণ করার জন্য। সাময়িক তাকে সকল দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়।

প্রত্যেকটা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একের পর এক এমনি খবরে মধুমিতা থমকে যায়। হতভম্ব হয়ে তাকায় নির্বাক ইন্দুবালার দিকে। ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,
–” মিরসাদের বাবা আর যাই করুক না কেন কখনো জনগনের টাকা মেরে খাবে না। এখানে ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু আমার সমস্যা ওখানে না, আমার সমস্যা মোত্তাকিনকে নিয়ে। এতে মোত্তাকিন ও জড়িত, ইন্দুবালা? আমায় সত্যি করে বল না! মোত্তাকিন ঐ বশিরের হয়েই কাজ করত এত বছর যাবৎ। ওর কাছে টেন্ডারের কাগজপত্র ছিল।”

মধুমিতা টলটলে নেত্রে তাকিয়ে শুধায়। ইন্দুবালা বিবর্ণ মুখে মাথা নেড়ে বলল,
–“আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না, মধু। মোত্তাকিন আমায় কখনোই কিছু বলে না।”

মধুমিতা উঠে দাঁড়ায়। ব্যস্ততার সাথে ফোন খোঁজে।
–“মোত্তাকিন কোথায় গিয়েছে? ওকে ফোন দে ইন্দু। ও যদি এগুলোর সাথে জড়িত থাকে তবে আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না। যার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই তাদের কোন ক্ষতিতেও আমরা থাকব না।”

ইন্দুবালা চিন্তায় পড়ে যায়। মোত্তাকিন সকালে বেরিয়েছে দূরে কোথাও যেতে হবে বলে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় গিয়েছে তা বলে যায়নি।
*****
দীর্ঘ পনেরো বছরের জীবনে শেষ বয়সে এসে নিজের ছেলের উপর বিশ্বাস করেই মুহিত ইরতেজা এত বড় টেন্ডারটা বশিরের হাতে দিয়েছিল। কোনপ্রকার অতিরিক্ত সুরক্ষা অবলম্বন করেনি একমাত্র ছেলের সম্পৃক্ততায়। একবারও ভাবেনি এখানে খারাপ কিছু হতে পারে! ছেলে কখনো তার বাবাকে কোনরূপ নিন্দার সম্মুখীন হতে দেবে না বরং আরো উচ্চ শিখরে নিয়ে যাবে। ঠিক কতটা বিশ্বাস করলে এত বড় সরকারি টেন্ডার এভাবে নির্দ্বিধায় একজনের উপর দিয়ে দেয়া যায়! সে বোধহয় ভুলেই গিয়েছিল, সে মা-ছেলের ঘৃণার পাত্র। যত যাই করুক না কেন এ জীবনে কখনো তাদের সহানুভূতি পাবে না।

তবে বিশ্বাস, ভরসা, ভালোবাসার শেষ প্রান্তে এসেও সে ছেলের প্রতি আশা ছাড়ে না। বদ্ধ নেত্র খুলে তাকায় পাশে বসা চিন্তিত মুখের মিরসাদের দিকে।

মিরসাদ ইন্দুবালার কাছে ফোন লাগায়। তাতে চিন্তা ক্রমেই নতুন মাত্র পেল। সে বিমর্ষ কণ্ঠে বাবাকে বলল,
–“পাপা, ইন্দুবালা বলছে মোত্তাকিন দূরে কোথাও গিয়েছে। আসতে দেরি হবে। এদিকে আমাদের হাতে আর মাত্র দুই ঘন্টা সময় আছে।”

মুহিত ইরতেজা শারীরিক দূর্বলতা সামলে অনুনয় করে বললেন,
–“যেকোন উপায়ে মোত্তাকিনকে খুঁজে বের করো, মিরসাদ। আমার হাতে সময় কম। আমি যদি নিজের সততা প্রকাশ করতে না পারি আমায় লজ্জায় মরে যেতে হবে। আমি জানি ও কখনো আমার ক্ষতি করতে পারে না।”

মিরসাদ ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সবেগে আঁকড়ে ধরে বাবার হাত। আশ্বাস দিয়ে বলে
–“কিছু হবে না, পাপা। এত চিন্তা করছ কেন? শরীরের উপর এত চাপ দিও না। মোত্তাকিন আছে, পাপা। ও আমাদের সাহায্য করবে। ও হয়তো বুঝতে পারেনি বশিরের পরিকল্পনা। ও এইসবের সাথে থাকতেই পারে না।”

ডাক্তার কিছুটা চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকায় মিরসাদের দিকে। বলে,
–“মিরসাদ, তার শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। আমার মনে হয় তোমাদের হাসপাতালে যাওয়া উচিৎ। কিছু টেস্ট করানো অতি আবশ্যক। নয়তো আমি সঠিক চিকিৎসা দিতে পারছি না।”

মুহিত ইরতেজা সবেগে নাকোচ করেন। দৃঢ় কণ্ঠে বলেন,
–“হাসপাতালে যাওয়া সম্ভব না আমার পক্ষে। আমার মোত্তাকিনকে চাই, আমার হাতে সময় কম। ও একমাত্র আমার সততা প্রকাশ করতে পারবে।”

মিরসাদ মলিন মুখে অনুর দিকে তাকায়। অনু মিহি স্বরে বলে,
–“আপনিও কি মোত্তাকিনকে অবিশ্বাস করছেন?”

মিরসাদ ম্লান হেসে বলল,
–“অবিশ্বাস করলে এত বড় টেন্ডারটা বিনা কোন সংশয়ে ওর ভরসায় ছেড়ে দিতে কখনো সায় দিতাম না, অনু। শুধু দোয়া করো মোত্তাকিন যেন আমার বিশ্বাসটা ধরে রাখে। ও যদি কোনভাবে আমাদের বিশ্বাস ভেঙে দেয় তবে আমরা এখানেই শেষ হয়ে যাব। এখানে বড় কোন ষড়যন্ত্র আছে অনু।”

মিরসাদ অনেকভাবে চেষ্টা করতে থাকে মোত্তাকিনের সাথে যোগাযোগ করার। কিন্তু চেষ্টা করতে করতে একটাসময় ব্যর্থ হয়ে যায়। সকাল আটটায় দেয়া বারোঘন্টার সময়সীমা অচিরেই শেষ হয়ে যায়। মিরসাদ খেয়াল করে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এর কর্মকর্তারা কিংবা পুলিশ কোনপ্রকার পদক্ষেপ নেবে কি তার আগে আম জনতাই তাদের উপর ক্ষিপ্ত হয়ে আক্রমণ করার জন্য ভীড় জমিয়েছে গেটের সম্মুখে।
সে জানে আম জনতা রূপে এগুলো সব বিরোধী রাজনৈতিক দলের লোকেরাই। মিরসাদ রিস্ক নিতে চায় না তাই অতিদ্রুত স্ত্রী আর সন্তানকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়।

বারান্দা থেকে দ্রুত কদমে ঘরে ঢোকে সে। ছেলের প্রয়োজনীয় কিছু তৈজসপত্রসহ, পোশাক একটা ব্যাগে ঢুকিয়ে আর পর্যাপ্ত পরিমাণে টাকা দিয়ে অনুকে নিয়ে পেছনের গেটের দিকে ছোটে। কিন্তু অনু যেতে নারাজ। সে টলটলে নেত্রে তাকিয়ে বলল,
–”আমি কোথাও যাব না, মিরসাদ। এত মানুষের মাঝে আপনাকে আর পাপাকে একা রেখে আমি কোথাও যাব না।”

–“বোকামো করো না, অনু। তুমি ভুলে যাচ্ছ তোমার ছেলের কথা? এই ঝামেলার মধ্যে ওকে কোনভাবে রাখা যাবে না।”

–“কিন্তু আমরা যাব কোথায় আপনাকে ছেড়ে?”, অনু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলে। সে অনাথ! অনাথ আশ্রমেই বড় হয়েছে। কলেজের এক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিল মিরসাদ। তখনি তাদের পরিচয় হয়। মিরসাদের পছন্দ হয়ে যায় মেয়েটিকে। এবং শুধুমাত্র প্রথম দেখায় ভালোলাগার জোড়েই কোনপ্রকার ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়া একটা অনাথ মেয়েকে বিয়ে করে নেয় সে। সেই থেকেই অনুর দুনিয়া এই মানুষটা।

দুশ্চিন্তায় ঘেমে ওঠা মিরসাদ পেছনের দরজার সামনে এসে ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে। আলগোছে স্ত্রী আর সন্তানকে শক্ত করে বুকে আগলে নেয়। কপালে ভরসার এক চুম্বন করে বলল,
–“তুমি মধুমিতা মায়ের কাছে চলে যাবে এখান থেকে। আমি নিশ্চিত মধুমিতা মা তোমার আর মায়ানের কোন ক্ষতি হতে দেবে না, বুঝেছ? আমি অনেক টাকা দিয়ে দিয়েছি। এখান থেকে যা প্রয়োজন তা করবে, তবুও যেকোন মূল্যে মায়ান আর নিজেকে সুরক্ষিত রাখবে। ওয়াদা করো?”

অনু ফুঁপিয়ে কাঁদছে। কথা বলার শক্তি নেই তার মাঝে। মিরসাদ সময় নষ্ট করতে পারে না জোরপূর্বক অনুকে বের করে দেয় পেছনের গেট থেকে।

ততক্ষণে মুহিত ইরতেজার পুরো বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে অজ্ঞাত আম জনতারা। লোহা গরম থাকতেই আঘাত করতে হবে! সেই ভীড়ের মাঝে মাস্ক পরিহিত বশির আর তার লোকেরা হিংস্র পশুর ন্যায় এগিয়ে চলে বাড়ির গেট ভাঙার জন্য।

দারোয়ানদের উপর ক্ষিপ্র জনতা হামলে পড়তেই মিরসাদ অস্থির হয়ে পড়ল। এই ভীড়ের মাঝে কোনভাবে পড়লে তাদের জানে মেরে ফেলবে ষড়যন্ত্রকারীরা। তাই এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করছে। সে বারান্দা থেকে দ্রুত ঘরে চলে আসে। টলটলে নেত্রে নত শির বসে থাকা বাবাকে বলল,
–“পাপা, এখনো সময় আছে চলো বেরিয়ে যাই এখান থেকে। আমি পুলিশে ফোন দিয়েছি কিন্তু তাদের আসতে আসতে লোকজন ভেতরে ঢুকে যাবে। আমাদের এখান থেকে যে করে হোক বের হতে হবে। এদের হাতে পড়লে আমরা কেউ বাঁচব না।”

–“আমি কোথাও যাব না, মিরসাদ। আমি এখান থেকে চলে গেলেই তারা ভাববে আমি অপরাধী আর তারা আমায় আরো অসম্মান করার সুযোগ পাবে।”, মুহিত ইরতেজার দৃঢ় কণ্ঠ। মিরসাদ রেগে যায়। রাগান্বিত স্বরে বলে,
–“এখানে থাকলে ওরা আমাদের জানে মেরে ফেলবে, পাপা। বোকামি করো না। বেঁচে না থাকলে সততা প্রমাণ করবে কি করে?”

–“আমি মরে গেলেও এখান থেকে কোথাও যাব না, মিরসাদ।”

বাবার সেই একরোখা কণ্ঠে মিরসাদ বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেললো। সে অসুস্থ বাবাকে একা ফেলে কোথাও যাবে কি করে? এমনটা সে কল্পনাও করতে পারে না। ধপ করে বসে পড়ে বাবার পাশে। ভাইয়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস একটু একটু করে ক্ষয় হতে থাকে। ক্ষয়িষ্ণু সেই অন্তঃস্থল নিয়ে অপেক্ষা কোন অনিশ্চিত পরিণতির।
******
–“আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি মোত্তাকিন, এগুলোর সাথে তোর কোন সম্পৃক্ততা আছে? তোর কাছে এই টেন্ডারের একটা ফাইল দেখেছি আমি। আর তোর একাউন্ট থেকেও অনেক বড় অংকের টাকার লেনদেন হয়েছে। এগুলো কিসের?”

টিভির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মোত্তাকিন পলক ফেলে মায়ের উচ্চস্বরে। ইন্দুবালা স্থির নয়নে পর্যবেক্ষণ করছে সদ্য বাহির থেকে আসা মোত্তাকিনের উতরে যাওয়া মুখশ্রী। ছোটবেলা থেকে ছেলেটিকে দেখে আসায় বুঝতে বাকি থাকে না এই ঘটনার সাথে তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। মধুমিতার কঠোরতা মিইয়ে যায় ছেলের নীরাবতায়। সে ভয়ার্ত কণ্ঠে ফের শুধায়,
–“বাবু, তুই চুপ কেন? কথা বলছিস না কেন? জোর গলায় বল, মামনি আমার এগুলোর সাথে কোন সম্পৃক্ততা নেই।”

মধুমিতা এক প্রকার জোর করে কিন্তু মোত্তাকিন টু শব্দ করার ক্ষমতা খুঁজে পায় না। মধুমিতা দেহের বলছেড়ে অবিশ্বাস্য নয়নে তাকায় ছেলের দিকে। তন্মধ্যেই কলিং বের বেজে উঠল। ইন্দুবালা খোলার জন্য পা বাড়ালে মোত্তাকিন তৎক্ষণাৎ বাঁধা দেয়।
–“থাম, আমি দেখছি।”

মোত্তাকিন ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে যায় দরজা কাছে। পিপ হোলে মায়ানের মুখটি ভেসে উঠতেই সে দ্রুত দরজা খুলে দেয়। মোত্তাকিনকে দেখতেই অনুর ক্রন্দনরত চোখেমুখে উল্লাস নেমে আসে। হড়বড়িয়ে বলে,
–“মোত্তাকিন, তুমি এসেছ? ও…. ওর বা…বাবা আর শশুর আব্বু অনেক বড় বিপদে আছে, মোত্তাকিন। তোমার কিছু একটা করে সবাইকে বোঝাও যে ওর দাদুভাই নির্দোষ। তুমি তো জানো ওর দাদুভাই কোন টাকা বাজেয়াপ্ত করেনি। প্লিজ, কিছু করো নয়তো মানুষ তাদের মেরে ফেলবে। আমাদের এখানে জোরপূর্বক পাঠিয়ে দিয়েছে।”

মোত্তাকিন ফাঁকা ঢোক গিলে ভারী গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
–“ভেতরে আসুন, ভাবি।”

–“তুমি একটু ওর বাবার কছে যাও না, ভাই। আমার ভয় করছে মানুষ ভাঙচুর করে ঘরে ঢুকতে চাইছে।”, অনু ঘরে না ঢুকে অনুনয় করে। মোত্তাকিন হাত বাড়িয়ে কাঁপতে থাকা অনুর থেকে মায়ানকে কোলে তুলে নেয়। চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
–“আমি আছি তো ভাবি, তাদের কিছু হবে না। আপনি আসুন, ইন্দু পানি আন।”

অনুর মুখে হাসি ফুটে উঠল। তাদের বসিয়ে মোত্তাকিন দরজা আঁটকে দ্রুত নিজের ঘরে যায়। কিছুক্ষণ আগে চার্জে দেয়া ফোনটা খুলতেই অজশ্র নোটিফিকেশন আসতে লাগল। তন্মধ্যে পারভেজের একাধিক ফোন। সে ফোন ব্যাক করতেই অশ্রাব্য ভাষায় গালি ঠিকরে আসে,
–“কু*ত্তা*র বাচ্চা কোথায় ছিলি তুই? সারাদিন ধরে এতবার ফোন দিচ্ছি ফোন তুলছিস না কেন? তোর পরিবারকে এখনি কোথাও সরিয়ে দে, বশির ভাই মিরসাদ আর তোর বাপকে তুলে নিয়ে এসেছে। এখন তার লক্ষ্য তুই আর তোর পরিবার।”

মোত্তাকিন বদ্ধ নেত্রে কপাল ঘঁষে। কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বিভ্রান্ত কণ্ঠে বলে,
–“এসব কি হচ্ছে পারভেজ?”

–“তোকে আমি সাবধান করেছিলাম আগেই। বশির এবার তোকে শুধু মহরা হিসেবে ব্যবহার করেছে। ও আগে থেকেই জানত— যে তুই মুহিত ইরতেজার ছেলে। তোদের পুরো পরিবারকে মেরে ফেলাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য আর এটাই মোক্ষম সময়। তুই ইন্দুবালা আর তোর মাকে দূরে কোথাও সরিয়ে দে আর নিজেও দূরে সরে যা।”

এহেন ভীতিকর পরিস্থিতিতেও মোত্তাকিনের শান্ত বদনে কোনোরূপ বিচলন দেখাগেল না। সে শান্ত স্বরে বলল,
–“কবে জেনেছে?”

–“তা জানি না, তবে আমার মনে হয় অনেক আগে থেকেই জানত। তুই কোথায় এখন? আর সারাদিন ফোন তুলিস নি কেন?”

–“বশির ভাই ইচ্ছাকৃত আমায় দূরে সরিয়ে রাখার জন্য একটা কাজে পাঠিয়েছিল দূরে।”

–“সবটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল। বশির ভাই ই মানুষের মাধ্যমে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে ভুয়া তথ্য পাঠিয়েছে যে মুহিত ইরতেজা দূর্নীতির আশ্রয় নিয়েছে। আর ভুয়া সব স্টেটমেন্ট দেখিয়ে মুহিত ইরতেজাকে কালপ্রিট বানিয়েছে। আর এখন সবাইকে বলছে মুহিত ইরতেজা আর তার ছেলে পালিয়েছে।”

সব শুনে মোত্তাকিন থম মেরে বসে রইল। পারভেজ হ্যালো হ্যালো করছে।
–“কি হলো কথা বলছিস না কেন? তুই কি করতে চাইছিস?”

মোত্তাকিন ফোন কেটে দিয়ে ফোন দেয় বশিরের কাছে। রিসিভ হতেই সে শান্ত স্বরে বলে,
–“ভাই এটা কি করছেন আপনি? এমনটা তো কথা ছিল না। আপনি বলেছিলেন আপনার শুধু টেন্ডার পেলেই হলো।”

বশির আনন্দে খলবলিয়ে উঠল তার ফোন পেতেই। অতি স্নেহের সাথে বলল,
–“এতদিন এই দিনটার অনেক অপেক্ষা করেছি, মোত্তাকিন। আমি এত বছর ধরে এমন একটা মুহুর্তের-ই অপেক্ষায় ছিলাম যখন আম জনতা পুরোটা মুহিত ইরতেজার বিপক্ষে চলে যাবে। আর এটা করতে তুই আমায় সাহায্য করেছিস। তুই না থাকলে না আমি টেন্ডার পেতাম আর না এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারতাম। আজ আমরা সফল মোত্তাকিন। তুই আমার যেই সফলতা দেখার জন্য এত বছর‌ আমার সঙ্গে কাজ করেছিস তা আজ সত্যি হচ্ছে মোত্তাকিন। তাই এই শুভ কাজ আমি তোকে ছাড়া করতেই পারব না। আমি গাড়ি পাঠিয়েছি তুই আর তোর পরিবার তাড়াতাড়ি চলে আয়। খবরদার মোত্তাকিন এদিক সেদিক যেন না হয়। তোকে আসতেই হবে, মুহিত ইরতেজাকে তুই নিজের হাতে মারবি।”

শেষের কথাটা বশির দাঁতে দাঁত কেটে হিংস্রতার সাথে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলল। মোত্তাকিন ফোন কেটে দেয়। ফোন কেটে আরেকজনকে ফোন দিয়ে ব্যস্ত কণ্ঠে কিছু বলল। এতক্ষণের আড়ম্বরহীন দেহে ভীষণ ব্যস্ততা আঁছড়ে পড়ে। দ্রুত কাবার্ড থেকে কিছু টাকা বের করে আর একটা ব্যাগে ইন্দুবালার কয়টা শীতের কাপড়, জামা আর ইন্দুবালার ওষুধগুলো ঢুকিয়ে নেয়।

সদ্য ঘরে ঢোকা ইন্দুবালার পা থমকে যায়, মোত্তাকিনকে কাবার্ড থেকে বিস্ময়কর এক জিনিস বের করতে দেখে। সে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলে ওঠে,
–“ওটা কি মোত্তাকিন?”

মোত্তাকিন চমকে ওঠে। সতর্কতার সাথে হাতের জিনিসটা কাপড়ের আড়ালে নিয়ে নেয়। ইন্দুবালা এক প্রকার জোর কদমে ছুটে আসে। জোরপূর্বক কাপড়টা সরিয়ে দিতেই সে আশ্চর্য হয়ে যায় কালো রঙের অস্ত্রটি দেখে। বিস্ময়ে আতঙ্ক আঁছড়ে পড়ে তার মাঝে,
–“তোর কাছে এসব কেন মোত্তাকিন? তুই কি করছিস? তুই কি কোন বিপদে পড়েছিস? কোন কথা বলছিস না কেন? এসব কি হচ্ছে?”

বলতে বলতেই ইন্দুবালা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মোত্তাকিন লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করে। হাতের অস্ত্রটি পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে মেয়েটিকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেয়। মাথায় অনবরত হাত বুলাতে বুলাতে আঁকড়ে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
–“থাম ইন্দু থাম, কাঁদিস না। নিজের উপর প্রেশার দিস না। প্রেশার বেড়ে যাবে, বাবুর ক্ষতি হয়ে যাবে, ইন্দু। শ্বাস ফেল, আমার কথা শোন। কিছু হয়নি, আমি যতক্ষণ আছি ততক্ষণ কিছু হবে না। কিন্তু তুই যদি দেরি করিস তবে আমার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। আমি যেটা বলছি সেটা একটু শোন।”

ইন্দুবালা ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলায়। লালচে নেত্রে ফের শুধায়,
–“কি হয়েছে? কি করছিস তুই? অস্ত্র কেন তোর কাছে?”

–“কিছু করছি না। আমি যা বলছি তা মন দিয়ে শোন, ইন্দু। তূর্য আসবে এখনি তুই মামনি আর ভাবিকে নিয়ে গ্রামে চলে যাবি। যতক্ষণ না আমি ফিরব ততক্ষণ নিজ দায়িত্বে নিজের খেয়াল রাখবি।”

–“কিন্তু কেন? তুই কোথায় যাচ্ছিস এই অস্ত্র নিয়ে? তুই কোন বিপদে পরেছিস তাই না? আমি তোকে কোথাও যেতে দেব না, মোত্তাকিন।”, ইন্দুবালা ফের কেঁদে উঠল। মোত্তাকিন তাকে সময় দিতে পারে না, কাবার্ড থেকে একটা বড় শাল বের করে মেয়েটির পুরো গায়ে জড়িয়ে দেয়।

–“কথা বলার সময় নেই, ইন্দু। তূর্য ফোন দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।”
মোত্তাকিন তার হাত ধরে ছুটে বের হতে নেয় ঘর থেকে। কিন্তু ইন্দুবালা নড়তে চায় না, টেনে ধরে তার হাত। ইদানিং তার মন এমনিতেই কু ডাকে। আর আজকের এমন পরিস্থিতি। সে আঁছড়ে পরে ছেলেটির বক্ষমাঝে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অনুনয় করে বলে,
–“কাকের মতো কালো মেয়েটিকে কেউ একজন চাঁদের মতো ভালোবেসেছে, সম্মান দিয়েছে মোত্তাকিন। তুই ব্যতীত আর কেউ কখনো এই মেয়েটিকে এমনভাবে ভালোবাসেনি। তোকে হারালে ফের এই দুনিয়া আমায় একঘেয়ে করে দেবে। প্লিজ মোত্তাকিন, ছেড়ে যাস না! আমার একটা সংসারের খুব শখ! যে সংসারে তুই, মধু আর আমাদের অনাগত পুঁচকে থাকবে। আমি কোথাও যাব না মোত্তাকিন আর না তুই কোথাও যাবি!”
ইন্দুবালা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে শার্টটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অনুনয় করে।

মোত্তাকিনের ব্যস্ততা খানিক থমকায়। ইন্দুবালা কখনো তার কাছে সরাসরি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ করেনি কিন্তু ইনিয়ে বিনিয়ে বহুবার বুঝিয়েছে। শত চিন্তার মাঝেও সেই কান্নায় নিঃশব্দে হাসে সে। বুক থেকে মুখটা তুলে মুছে দেয় নোনাজল গুলোকে। দৃঢ় গলায় বলে,
–“কার এত সাহস আছে আমার ইন্দুকে একঘেয়ে করে দেবে? আমি আছি তো!”

ইন্দুবালা অতিকষ্টে কাঁদতে ভুলে যায়‌। কেননা মোত্তকিন তাকে ইতিমধ্যে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সে স্ফিত উদর আঁকড়ে ধরে নির্নিমেষ চেয়ে বলে,
–“যেতে যেতেও এমনভাবে মায়া লাগিয়ে যাচ্ছিস? তুই আমাদের বাঁচতে দিবি না?”

কক্ষ থেকে বের হতে হতে মোত্তাকিন ক্ষীণ স্বরে বলল,
–“তোদের একটা সুন্দর জীবন দিতে হলে আমায় এতটুকু রিস্ক নিতেই হবে, ইন্দু।”

মা আর ভাবির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে মোত্তাকিন তাদের জোরপূর্বক গাড়িতে উঠিয়ে দেয়। মধুমিতা বাঁক হারা হয়ে যায়, কি হচ্ছে কিছু বুঝে ওঠে না। দুশ্চিন্তায় ইতিমধ্যেই ইন্দুবালার দেহ দূর্বল হয়ে পড়েছে। তন্মধ্যেই গাড়ি স্টার্ট দেয়ার শব্দে সে অশ্রুসিক্ত নয়নে মোত্তাকিনের শার্ট চেপে ধরে। বিদায়ের আগে শেষ বারের মতো অনুনয় করে ফিসফিসিয়ে বলে,
–“তুই কি করছিস আমি কিচ্ছু জানি না মোত্তাকিন। আমি কিছু বললেও তুই শুনবি না আমি জানি। তাই শুধু এতটুকু অনুরোধ করব, আমার জন্য নাহয় নিজের বাচ্চাটার জন্য নিজের খেয়াল রাখিস মোত্তাকিন। আমারা তোর অপেক্ষায় থাকব। তুই ফিরে আসবি শিঘ্রই।”

মোত্তাকিন এক পলক ব্যস্ত দৃষ্টি আবাসিক এলাকার সড়কের দিকে স্ত্রীর পানে তাকায়। সে জানে এই মেয়েটির ছোট্ট একটা দুনিয়া, আর যেই দুনিয়ার মালিক শুধু সে। সে নিরাশা করতেই পারে না বরং দৃঢ় গলায় বলে,
–“আমি ঠিক সময় চলে আসব কিন্তু ওর কোন ক্ষতি যেন না হয়, ইন্দু।”

মোত্তকিন মায়ের দিকে তাকায়। মধুমিতা ক্ষণকালের জন্য ভুলে যায় সব বিরূপ পরিস্থিতি। আগলে নেয় ছেলেকে বুকে। গাড়ি চলতে শুরু করে। মোত্তাকিন অনুর দিকে তাকায়। অনুর আশাভরা চাহনি দেখে ভরসা দিয়ে বলে,
–“মায়ানের আব্বুর কিছু হবে না, ভাবি। আমার উপর ভরসা রাখুন।”

~চলবে~

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here