ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_২২

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_২২

এরশাদ ঢাকা থেকে ফিরেছে সকালে, তবে বাড়ি ফিরেনি। সোজা ইটভাটায় গিয়েছিল। দু’বোট ইটের চালান যাবে। তার’ই সব ব্যবস্থা করেছে। তার মধ্যে নতুন বায়না এসেছে। এগুলোর সব কাজ টাজ গুছিয়ে আসতে আসতে সন্ধ্যা।

শাহবাজের বাড়িতে থাকার ঠিক ঠিকানা না থাকলেও এরশাদ বলতে গেলে ঘরকুণো। কাজ ব্যতীত খুব একটা বেরোয় না। যদিও বেরোয় সেটা রাতে। তাই পুরো এক রাত, এক দিন এই প্রথম’ই বাইরে থাকা। তাই বাড়িতে পা রাখতেই কালাম দৌড়ে এলো। সব খবর’ই সুন্দর মতো পাচার করলো। না করার কারণ নেই। এই বাড়িতে যেমন জয়তুনের খাস লোক আছে, তেমনি তারও আছে। না বললেও তার কানে সব’ই আসবে। তাই আগে বলাই ভালো। কেননা, বাতাস একটু নড়চড় হলে সবার আগে গাল কালামরে’ই ফাটবে।

তবে শাহবাজ এখনো এই সব ঝামেলা থেকে বাইরে। তার দুনিয়া ছিল দাদি, চেলাপেলা আর সদর, বাজার, স্টেশনের তাদের যতো দোকান, পাট আছে সেগুলোর দেখাশোনা। এর মধ্যে বাড়তি ঝামেলা হিসেবে বিয়ে জুটে গেছে। অবশ্য নিজের ঘাড়ত্যাড়ামির জন্য। তা না হলে, আয়নামতি আয়নামতির রাস্তায়, সে তার। এখন আবার কোন ভূত চেপেছে কে জানে? ইট ভাটার পুরোনো যতো লেবার আছে, টেনে সবার জনমকুন্ডলী বের করছে। কি করবে কে জানে? সব ঘুটে তেনাবেনা করছে।

জয়তুন বসার রুমেই বসা, পা ছড়িয়ে কাঠের পিঁড়িতে। আম্বিয়া তার পেছনে জলচৌকিতে। সাদা সোনালি চুলে বিলি কেটে আলতো করে তেল ঘষে ঘষে মালিশ করছে। এরশাদ দেখে উপরে গেলো না। দাদির গা ঘেঁষে পায়ের কাছে বসলো। এভাবে তাদের দু’ভাইয়ের’ই বসার অভ্যাস আছে। শাহবাজ তো এখনো মাঝে মাঝে এসে দাদির গা ঘেঁষে শুয়েও পড়ে।

আম্বিয়া আড়চোখে একবার তাকালো। পোড়ার কারণে কখনো মুখে অভিব্যক্তি বোঝা যায় না। তবুও আম্বিয়ার মনে হলো, কোন কারণে মেজাজ বিগড়ে আছে। অবশ্য এরশাদ ভাই শাহবাজের মতো না। শাহবাজ চিন্তা ভাবনা ছাড়াই হুটহাট যা মান চায় করে ফেলে। তবে এরশাদ ভাই, সে সহজে কাউকে কিছু বলে না। কিন্তু একবার মাথা বিগড়ে গেলে কাউকে চেনে না। তাই চোখ ফিরিয়ে গলা ছেয়ে বললো, — এই কে আছিস, পানি আন।

জয়তুন হাত বাড়িয়ে এরশাদের গালে রাখলো। সবাই তাকালেই এই মুখ দেখে আঁতকে উঠে, ভয় পায়। তবে তার দেখলে মায়া লাগে, কলিজা ঠান্ডা হয়। দুনিয়ার কাছে আতঙ্ক, তার যে মনের শান্তি। বুকের ধন যে এরা। ব্যস! একটার ঘর বইছে, এই টার বইলেই শান্তি। তাই সারা মুখে, মাথায় মমতা মাখা কাঁপা কাঁপা হাত বুলিয়ে বললো, — শহরে গেছিলি ক্যা ?

— একটু দরকার ছিল।

জয়তুন ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তার আর তাদের নাতিদের মাঝে আলাদা দরকার বলে কিছু নেই। তো? আজকে আবার এই নতুন দরকার কোথা থেকে এলো। তাই ভ্রু কুঁচকেই বললো, — এমন কি দরকার যে দাদির কাছে বলা যায় না?

— যেমন তুমি বলোনি।

— কি বলিনাই?

— ছোট চাচা মেয়েটাকে অনুরোধ করে এনেছে দাদি। স্পষ্ট করে বলেছিল অসম্মান তো ভালোই, দূরে থাকতে।

— তো?

— কাজটা ঠিক করোনি।

জয়তুন এরশাদের গাল থেকে হাত সরিয়ে নিলো। এরশাদের অভিব্যক্তি বোঝা না গেলেও জয়তুনের আগুন চোখে মুখে স্পষ্ট। তাই হাত সরিয়ে নিতে নিতে বললো, — একগ্রাম মানুষের সামনে মুখে মুখে চাপা চালানো, চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন, প্রথম বার জয়তুনের কোন মুখের কথার হেরফের হওয়া। তোর কাছে কিছুই লাগে না?

— সে গ্রামে প্রথম এসেছে।

— তো, তাই বইলা আমি এমনি ছাইড়া দেবো? নিজের দুর্গতি নিজে টেনে ঘাড়ে নিয়েছে। আমি শাস্তি দিলে দোষ, না? দুনিয়া সাক্ষী জয়তুন কাউরে বিনা কারণে খোঁচাতে যায় না।

— শাস্তি আর ধ্বংস এর মধ্যে ফারাক বুঝো?

— এতো বোঝারতো কিছু নাই। সাপের লেজে নিজ ইচ্ছায় পা দিছে। সাপ ছেড়ে দেবে কেন?

এরশাদ এগিয়ে দাদির কোলো মাথা রাখলো। রেখে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল। জয়তুন রাগে খেয়াল না করলেও আম্বিয়া যেন ঠিক বুঝল। দেখছে তো নতুন না। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে এক ছাদের নিচে। সবার হাবভাব’ই বোঝা। তাই এখনো অতি সহজেই বুঝলো, এটা শুধু নিশ্চুপ না, বিগড়ে যাওয়া মেজাজ সামলে নেওয়া। নিলোও তাই! নিয়ে সব সময়ের মতো সুন্দর মায়া কণ্ঠে বললো– যা হয়েছে ভুলে যাও দাদি ।

— জয়তুন কিছু ভুলে না, সেটা তুই ভালো করেই জানিস। তাছাড়া তোর এতো জ্বলছে ক্যা?

এরশাদ হাসলো! তবে উত্তর দিলো না। কথা ঘুরিয়ে বললো, — আজিজ চাচাকে কি বলেছো?

— যা শুনেছিস তাই বলেছি।

— এখন বিয়ের দরকার নেই, বেশি সময় তো নেই। পরীক্ষা টা শেষ হোক।

— কিসের পরীক্ষা ? আর শেষ করেই বা হইবো কি? মেয়েদের আসল পরীক্ষা সংসারে। সেখানে ফেল, জীবন ফেল।

— আমাদের একটা মাত্র বোন দাদি। তার খুব ইচ্ছা লেখাপড়া করার। করুক না।

— এখন এই বাড়ির সব সিদ্ধান্ত তুই নিবি?

— আমি নিচ্ছি না দাদি, জানাচ্ছি।

— জানিয়েছিস শুনেছি। তবে শেষ কথা জয়তুনের’ই হবে। অন্তত যতোদিন আমি বেঁচে আছি। আর যদি মানতে কষ্ট হয়। তবে বুড়ি মানুষ দম বেরুতে খুব একটা শক্তি ক্ষয় হবে না। শুধু মুখের উপরে বালিশ চেপে ধরবি, ব্যস কাহিনী খতম। তারপরে যা খুশি কর।

এরশাদ আবারো হেসে ফেললো। হেসে বললো, — অন্তত ওর মতটা তো জানতে চাও। ফরহাদকে ওর পছন্দ না ও হতে পারে।

— মেয়ে মাইনষের আবার পছন্দ কি? দু পৃষ্টা পড়ে লাজ লজ্জা সব বিসর্জন দিছে নাকি? বড়রা যা করবো তাদের জন্য সেটাই ঠিক।

এরশাদ হাল ছাড়লো! তখনি শাহবাজ এলো। চোখ কপালে তুলে বললো, — ওরে বাবা! আমার দাদির কোলে এ কেন? এ তো থাকবে তার প্রিয় চাচার কোলে।

এরশাদ জয়তুনের কোলে মাথা রেখেই নিচে হাত, পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো। শুতে শুতে চোখ বন্ধ করে বললো, — আজকের জন্য ভাড়া নিয়েছি। যা তুইও ছোট চাচার কোলে গিয়ে উঠে পড়।

শাহবাজ মুখ বাঁকালো! জয়তুনের চোখের মুখের রাগ নিমিষেই গায়েব হলো। রাগের জায়গায় ঠোঁটের কোণে খিলে গেলো হাসি। সেই হাসি নিয়েই বললো, — সারাদিন বাড়িত আসোস নাই ক্যা?

শাহবাজ তার মতোই বললো, — আসি কবে?

— তাও কথা! তয় আগের কথা আর এহনের কথা কি এক হইলো? বিয়া করছোস না?

— তো? নাত বউ তোমার দরকার ছিল, আমার তো না। তাই গলা ধরে বসে থাকো। এখানে আমার কাজ কি?

— তোর কাজ নাই?

— না। বলেই সোজা উপরের দিকে গেলো। যেতে যেতে তার চোখ পড়ল বীণার রুমের দিকে। খাটের সাইডে কেউ পা ঝুলিয়ে বসা। মুখ দেখা না গেলেও বুঝতে এতোটুকুও সমস্যা হলো না কে। কেননা এই বাড়িতে এমন দুধে আলতা গায়ের রঙের বর্তমানে একজন’ই আছে। সারেং বাড়ির ছোট নাত বউ আয়নামতি।

শাহবাজ সাথে সাথে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিয়ে উপরে এলো, তবে নিজের রুমের দিকে গেলো না, এলো ছোট চাচার রুমে।

ছোট চাচা খাটে হেলান দিয়ে বসে বইয়ে ডুবে আছে। এতো ডুবে হবেটা কি রে ভাই। সেই মরলে মগজে কিলবিল করবে পোকায়। মাঝখান থেকে অযথা পেরেশানী। আর এই পেরেশানীর বই দেখলেই তো তার মেজাজ খারাপ হয়। তাই আজও বাদ গেলো না। এগিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে একেবারে সামনে বসলো। বসতেই টেনে বই নিয়ে খাটের আরেক কোণে ছুড়ে মারলো।

জাফর বড় একটা শ্বাস ফেললো! এক দল পাগলের মাঝে তার বসবাস। সে শ্বাস ফেলে চোখ থেকে চশমা খুলতে খুলতে বললো, — বাপরে, সারেং বাড়ির শাহজাহান শাহবাজের পদধুলা আজ চাচার রুমে। কাহিনী কি?

— কাহিনীতো কত কিছুর’ই। সারেং বাড়িতে শান্তির অভাব হলেও কাহিনীর অভাব তো এই জন্মে দেখিনি।

জাফর হাসলো! বাড়ি যতোই বড় থাক, নিস্তব্দ রাতে বাড়িতে সুতো পড়লেও জাফরের কানে আসে। একা মানুষ, ঘুম নেই বললেই চলে। তাই রাত জেগে পড়ে। আর রাতে বাড়িতে এতো কিছু হবে আর সে বুঝবেনা এটা কি হয়? অবশ্য সে ইচ্ছে করেই বের হয়নি। পৃথিলার কথা ঠিক। তারা যতো ছাড়বে ততোই এরা একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরবে। হয়েছেও তাই! তাইতো সকালে ঠিক বাড়িতে ডাক্তার এসে হাজির হয়েছে। সে যদি বের হতো, ঘটনা অন্য দিকে যেত, আর এই ছেলে ফিরেও তাকাতো না।

জাফর হেসে চমশাটা পাশের টেবিলে রাখতে রাখতে বললো, — সত্য! সারেং বাড়িতে আজ পর্যন্ত কাহিনী ছাড়া তো কিছু’ই ঘটেনি । এই যে দেখ, আজ পর্যন্ত একটা বিয়ে না হয়েছে স্বাভাবিক ভাবে, না করতে পেরেছে কেউ শান্তির সংসার।

— সেই গিট্টু তো তোমার বাপে পাঁকিয়ে গেছে। কোন দরকার ছিল আমার সোনার মতো দাদি থাকতে আরেকটা বিয়ে করার?

— তুই করেছিস কেন?

শাহবাজের চোয়াল সাথে সাথেই শক্ত হলো! জাফর দেখে হেসে বললো, — আমরা যতো অভিযোগ করি না কেন? জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ সব উপরওয়ালার হাতে। যতো কিছু’ই করো, কোন লাভ নেই। তিনি যেমন লিখেছেন তেমন’ই হবে।

— শুধু পারো বড় বড় কথা বলতে। আর কি পারো?

— কিছুই না। আমি খুব’ই সাধারণ মানুষ। তবে এই সাধারণ মানুষের কাছে শাহজাহান শাহবাজের আগমনের কারণ কি?

— বাবার মৃত্যুর পরে সব দায়িত্বে তুমি ছিলে। তার অনেকটা দিন পরে বাহার উদ্দিন লেবার গায়েব হয়। সেই ব্যাপারে কিছু জানো?

জাফর মনে করার চেষ্টা করলো। আসলে তখন সব কিছু এতো এলোমেলো।এতোগুলো মানুষের মৃত্যু, এরশাদের পাগলামি। সে সিদেসাধা মানুষ। কিভাবে যে সব সামলেছে, একমাত্র আল্লাহ’ই জানে। তাই কোন লেবার গায়েব হলো, ওতো মনেও নেই। তাই একটু চিন্তা করেই বললো, — তেমন কিছু মনে নেই রে। তাছাড়া এখনের মতো তো ছিল না। লেবারদের তখন সব কারবারের জন্য আলাদা এক লোক ছিল। সেই লেবার নিতো, ছাটাই করতো। কোন লেবারের কি হলো এতো কাহিনী কি আর মালিক পক্ষ পর্যন্ত আসে?

— সেই লোকের নাম কি?

— মনির! আমাদের পাশের গ্রামের’ই ছিল। বয়স হয়েছিল। তাছাড়া এরশাদ দায়িত্ব নিয়ে সব নিজে দেখে লোক নিয়েছে। তখন তাকে আর নেওয়া হয়নি।

— বাড়ির ঠিকানা দাও।

— কার?

— কার আবার মনিরের।

— তা না হয় দিলাম, তবে কাহিনী কি?

— সেটাই জানতে চাই, আসলে কাহিনী কি?

জাফর বুঝতে পারলো না, শাহবাজ উঠলো। উঠতেই জাফর তারা মায়া ভরা কণ্ঠে বললো, — শক্তি, মেজাজ, রাগ যেই পুরুষ জায়গামতো দেখাতে পারে সেই হয় আসল পুরুষ। আসল পুরুষরা কখনও মায়া, মহব্বতের জায়গায় শক্তি খাটায় না। খাটায় কাপুরুষেরা। আমাদের জীবন যা যাওয়ার গেছে, তোরা ভুল করিস না। সব ভুল কিন্তু সুধরানো যায় না।

শাহবাজ উত্তর দিলো না। বেরিয়ে এলো। এসে বারান্দায় দাঁড়ালো। আকাশে মেঘ নেই। চাঁদ ঝিলমিল করছে। সেই ঝিলমিল করা আলোতে তার মেজাজ ঠিক তো হবে ভালোই, দাঁড়াতেই আরো খারাপ হলো। ইমরানদের বারান্দায় পৃথিলা নামক মেয়েটা বসে আছে। হাতে বই! দিন দুনিয়া ভুলে বইয়ে ডুবে আছে। আরে জ্বালা রে, যেদিকে তাকাও শুধু জ্ঞানের জাহাজ আর জাহাজ।

আয়না চোখ মুখ অন্ধকার করে বীণার রুমে বসে আছে। অন্ধকারের দু’টো কারণ। প্রথম, শয়তান হাজির। এখন রাত তার কেমন যাবে আল্লাহ’ই জানে? আর দ্বিতীয় বীণা মেয়েটা সেই তখন বালিশে মুখ গুঁজেছে যে গুঁজেছেই। তার খারাপ লাগছে। অবশ্য পড়ে থাকা জায়েজ। ফরহাদ ভাইকে সেও কিছুটা চেনে। বাবা! চান্দিতে সব সময় আগুনের গোলা নিয়ে ঘুরে। তবে মানুষ ভালো। এই বাড়ির মতো তো খুনি না।

ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল। যেতেই ‘টুস’ করে অন্ধকারে তলিয়ে গেল পুরো সারেং বাড়ি। আয়নার জীবনে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এর আগে ছিল না। এই বাড়িতেই প্রথম, হঠাৎ হঠাৎ এমন অচেনা অন্ধকারের সঙ্গে পরিচয় নতুন। কিছুক্ষণ আগেও মাথার ওপরে ঘুরে চলা ফ্যানটার ঘটাং ঘটাং শব্দে তার বেশ ভালোই লাগছিল। শুধু কি ভালো, যখন ঘুরে আয়না অবাক নয়নে তাকিয়ে থাকে। কি একটা জিনিস, কি সুন্দর গরম থেকে গা বাঁচিয়ে দিচ্ছে।

আম্বিয়া এলো হারিকেন নিয়ে। একটা টেবিলে রাখতে রাখতে বললো, — রুমে আলো দিয়া আসো, ছোট চাচার ঘরে মোববাতি আছে। তবে শাবহবাজ সে কিছু করার ধরার কাছেও যাবে না। তাছাড়া এমন থোম্বা মেরে কোণা কাঞ্চিতে পড়ে থাকলে হবে? জামাই আইছে, সেদিকে যাও। নাকি আমি’ই এখনো দৌড়ে দৌড়ে সব করবো।

আয়না কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল আম্বিয়ার মুখের দিকে। যেন আম্বিয়া কি বলছে বুঝতেই পারেনি।

আম্বিয়া এক পলক তাকালো। তার হয়েছে যতো জ্বালা। তাই রুম থেকে বের হতে হতে বললো, — লাথি খাও আর গুতা। স্বামীর ঘর ছাড়া স্বামীর বাড়িত উপায় নাই। তাই যাও, এমন তাকাইয়া লাভ নাই।

আয়নার অন্ধকার মুখ আরেক ধাপ অন্ধকারে ঢেকে গেলো। সেই অন্ধকার মুখ নিয়েই ধীরে ধীরে উঠল। পা টিপে, বুকের ভিতর একরাশ আতঙ্ক নিয়ে রওনা দিলেও, এসে রুমটা ফাঁকা দেখে খানিকটা স্বস্তি পেল। কোথায় গেছে কে জানে? তবে তড়িঘড়ি করে হারিকেনটা রেখে দ্রুত বেরিয়ে আসতে গিয়েই হলো বিপত্তি।

ঠিক তখনই দরজা দিয়ে ঢুকছিল শাহবাজ। আয়নার সাথে এমন ধাক্কা লাগল, শাহবাজ চুল পরিমাণও নড়েনি, তবে আয়না ছিল দৌড়ের উপর, তাই ধাক্কাও লাগলো বেশি। এমন বেশি প্রায় ছিটকে পড়ল একপাশে। সেই পড়া দৃশ্য একদৃষ্টিতে শাহবাজ চুপচাপ’ই তাকিয়ে দেখল। যেন কিছুই ঘটেনি। এমন পড়া সে আসতে যেতে দেখছে।

তাই আয়নার উপরে দৃষ্টি রেখে স্বাভাবিক ভাবেই ভেতরে এলো। দুমিনিটও হয় নি বাড়িতে পা রেখেছে, এর মধ্যে’ই আবার এই আপদ এসে হাজির। কেন রে, ভালো থাকলে ভূতে কিলায়?

শাহবাজ ঢুকে আয়নার সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসলো। তার ইচ্ছে ছিল ঐ যে নরম, কোমল, ফর্সা হাত। মেঝেটা কোমল ভাবে ছুঁয়ে আছে। সেই হাতের উপরে পা টা রেখে একটু চটকে দিতে । তবে এই যে আহম্মক মার্কা মেয়ে, যে কিনা পড়ে হতম্ভব হয়ে হা করে বসে আছে। গায়ে নীল কাপড়। মাথায় ব্যান্ডেজের কারণে খোঁপাটা একটু ঢিলে করে ঘাড়ের কাছে করা। সেই খোঁপার সাইডেই কালো একটা তিল। ফর্সা ঘাড়ে ঠিক যেন নজর টিকা। সেই টিকা হোক বা অন্য কিছু, শাহবাজ হাতটা ভর্তা করতে পারলো না। তবে ঠোঁটে সেই আগের হাসি ঠিক রইল।

আর সেই হাসি দেখেই আয়না কেঁপে উঠল। কাঁপতে কাঁপতেই ঢোক গিললো। আল্লাগ গো! শয়তানটা আবার ঠিক সামনে। আর সবচেয়ে বড় কথা ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা হাসি। এই হাসিই বলছে, এখন আয়নার বারোটা ঠিক বাজাবে।

তাই আয়না একবার শাহবাজ আরেকবার তার পেছনে খোলা দরজার দিকে তাকালো। তার তাকানো দেখেই শাহবাজ বললো, — ধাক্কা দেওয়ার কথা যদি মাথায় এসেছে। একদম জানে মেরে ফেলবো বলে দিলাম।

আয়না সাথে সাথে দু’পাশে মাথা নাড়লো। নেড়ে আস্তে করে বললো, — না, না। আমি এমন ভাবিনি।

— তো?

আয়না যতো সম্ভব পেছনে চেপে হাতের উপরে ভর দিয়ে উঠার চেষ্টা করলো। আর ঠিক তখনি শাহবাজ হাত দিয়ে হাতের মধ্যে দিলো এক ধাক্কা। আয়না আবার ধপাস করে পড়ল। পড়তেই চোখ, মুখ কুঁচকে তাকালো।

শাহবাজ ভ্রু নাচিয়ে নির্বিকার চিত্তে’ই বললো, — কি?

আয়নার ভেতর ফুঁপিয়ে এলো। তাকে তো এই শয়তানটা মানুষ’ই মনে করে না। যখন যা মন চাচ্ছে করছে। তাই ফুঁপিয়েই বললো, — আপনারা সব খারাপ।

— জানি, আর কিছু?

— আমি আপনার, আপনার ভাই কেন? সারেং বাড়ির আশে পাশেও আসতে চাইনি। আমিতো চলে’ই যাচ্ছিলাম। সব গন্ডগল করেছেন আপনি। করে এখন সব দোষ আমার ঘাড়ে ঠেলে দিচ্ছেন। আবার যা খুশি তাই করছেন। কেন? গরীব হয়েছি বলে মানুষ না?

— মিথ্যা বলেছিলে কেন?

আয়না থমকালো! তবে উত্তর দিলো না। তার চোখে টলমলো পানি। সে পানি নিয়েই শাহবাজের ঠিক বুক বরাবর ছোট বাচ্চাদের মতো অভিমানে ছোট্ট একটা ধাক্কা মারলো। আজকে অবশ্য শরীরের সব শক্তি দিয়ে না। এই একটু হালকা। শাহবাজ শুধু একটু নড়লো। উপরে শুধু একটু নড়লেও, শাহবাজের কাছে মনে হলো, ঐ যে শান্ত ঝরঝর করে ঝড়ে পড়া বৃষ্টির মাঝে হঠাৎ বজ্রপাত হয়, ঠিক তেমনি তার বুকের উপরে কিছু একটা পড়ল। আর পড়তেই নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

সেই বন্ধ হয়ে যাওয়া বুক নিয়ে শাহবাজ পাথরের মূতির মতো বসে রইল। দৃষ্টি এই যে অভিমানে ভরা গোলগাল ছোট্ট একটা মুখ, এই মুখের উপরে। যেন না বলেই কত কথা বলছে। বলছে, সব আপনাদের জন্য, সব। আমি এসব কিচ্ছু চাইনি। আমি চেয়েছিলাম একটু মুক্তি। আপনি ধরে খাচায় বন্দি করেছেন।

আয়না কাঁপা কাঁপা হাতে নিজের মতো দু’হাতে চোখ মুছলো। মুছতে মুছতে একবার আড়চোখে শাহবাজের দিকে তাকালো। শাহবাজ বুঝতেও পারলো না, কি সুন্দর মায়ার জাদুতে তাকে আটকে ফেলা হলো।

আয়না নিজের মতোই আঁচলে নাক ঝাড়লো, চোখ, মুখ মুছলো। মুছে কাঁধের আঁচল ঠিক করলো। করে নিজের মতোই সাইড দিয়ে চেপে আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে নিজের মতোই বেরিয়ে এলো।

আসতেই সিঁড়ির কাছে এরশাদের সাথে দেখা হলো। সে উপরে আসছিল। আয়না ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো। নিতে নিতে বললো, — একটা দেখতে দৈত্য আরেকটা স্বভাবে। দুইটাকে দেখলেই কলিজা কেঁপে উঠে।

এরশাদ শুনে সব সময়ের মতো ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে যেতে যেতে বললো, — ভাসুর হই আমি, মুখ সামলে।

আয়না মুখ বাঁকালো। অবশ্য এরশাদের আড়ালে। ভাসুর না অসুর। নিজেদের বেলা ঠিক ষোল আনা। আর পরের বেলা বাপের বয়সী লোকের গায়ে হাত তুলতেও হাত কাঁপে না। সে মুখ বাঁকিয়ে সোজা নিচে নামতে গিয়েও আবার ফিরে এলো।

এরশাদ দেখে ভ্রু কুঁচকে বললো, — কি হয়েছে?

আয়না আস্তে করে বললো — বীণা কাঁদছে।

— সে কাঁদছে তোমার কি?

— আমার খারাপ লাগছে। আপনি না বড় ভাই। ভাই হয়ে বোনের জন্য কিছু করবেন না?

এরশাদের শুনে ভালো লাগলো। মেয়েটা তাহলে মিথ্যে বলেনি। পরিস্থিতি যাই থাক, বিয়েটা মানিয়ে নিতে চেষ্টা করছে। তাই হয়ত এই বাড়ির কারো কষ্টে একটু হলেও কষ্ট পাচ্ছে।

তাই নরম সুরেই বললো, — বিয়ে তো আগে হোক পরে, হবেই। তাই ভালোয় ভালোয় আগে হওয়াই ভালো। তাছাড়া ফরহাদ ভালো ছেলে।

— বীণা যে পড়তে চায়।

— মানুষের সব ইচ্ছা পূরণ হবে এমন কোন কথা নেই। তাছাড়া পড়েও তো কোন লাভ নেই। দাদি গ্রামের বাইরে তার নাতনিকে যেতে দেবে না। এই পরীক্ষা পর্যন্ত’ই। তাই যতো তাড়াতাড়ি মানিয়ে নেওয়া যায় ততোই ভালো।

আয়না আর কিছু বললো না। বলে অবশ্য লাভ হবে বলেও মনে হয় না। সে ভেবেছে তার বাবা – মা নেই এতিম, তাই কপালে এতো দুর্গতি। এখন দেখো যার সব আছে তার কপালেও দুর্গতি। আসলে মেয়ে জাতের কোথাও শান্তি নেই। যেখানেই থাকো, যেখানেই যাও। তোমার জীবনে তোমার কোন হক নেই, স্বপ্ন নেই। তুমি খাচার পোষা পায়রা। আদর দেবে, যত্ন দেবে, খাবার দেবে, আগলে রাখবে, এমনকি খোলা আকাশে উড়ার অনুমতিও দেবে। তবে ইশারা দিলে সাথে সাথে খাচায় ফিরতে হবে। ফিরলে ভালো, না ফিরলেই দুর্গতি।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here