#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব-৩০
পৃথিলা মোটামুটি ঠিক হলো দুপুরের পরে। ঠিক হতেই এক রাশ অস্বস্তি তাকে ঘিরে ধরলো। অচেনা আজানা কতোগুলো মানুষ তার জন্য কতো কিছু করে ফেলেছে। ইশ! এই দায় থেকে বাঁচবে কি করে?
জাফর পৃথিলার অবস্থা বুঝলো। না বোঝার কিছু নেই। মেয়েটাকে একটু একটু হলেও কিছুটা চিনতে পারছে । তাই হেসে বললো, — কখনও সুযোগ হলে সুধে আসলে শোধ করে দিও কেমন?
পৃথিলা তখন হেসেছে! বলতে গেলে মলিন মুখে প্রাণ খোলা হাসি। হেসেই বললো, — আমার সেই সাধ্য নেই। আমি খুব সাধারণ একজন। তবুও এই সাধারণ একজনের জন্য এতো করলেন। তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
জাফর কিছুক্ষণ পৃথিলার ক্লান্ত চোখে মুখে নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। যতোক্ষণ জ্ঞান ছিল না, ততোক্ষণ অসংখ্য বার মাথায় হাত রেখেছেন। এই সুযোগ যে আর কখনো আসবেনা, সে জানে। তবুও আবার এই যে ক্লান্ত মুখটা। এই মুখটায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে করলো। আর বলতে ইচ্ছে হলো, — তুমি যে কি মা, নিজেও জানো না। এই যে বিশাল এক শূণ্যতা নিয়ে বেঁচে থাকা একজন মানুষ, তার হৃদয়ের এক টুকরো স্বস্তির আলো তুমি। যে আলোর দিকে তাকিয়ে আজকাল শান্তির নিশ্বাস ফেলি।
তবে মুখে বললো, — আমরা আসলে কে যে কি, তা কেউ’ই জানি না। তবে তোমার ধন্যবাদ গ্রহণ করা হলো। আর এতো অস্বস্তি হওয়ার কিছু নেই। মানুষের পাশে মানুষ থাকবেই।
পৃথিলা আগের মতোই হাসলো। আর হাসতে হাসতে’ই চোখ গেলো কেবিনের বাহিরে। ডাক্তারের সাথে এরশাদ কথা বলছে। বলতে বলতে এক পলক তাকালো। তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে চোখ ফিরিয়ে নিলো। নেওয়াটা’ই স্বাভাবিক! তবে পৃথিলার স্বাভাবিক মনে হলো না। এই চোখ, এই চোখ দুটো অন্য কিছু বলে। আর এই যে সুস্থ হয়েছে বলতে গেলো অনেকক্ষণ। আর এই অনেকক্ষণের মাঝে লোকটা একবারের জন্যও কেবিনে আসেনি। অথচ স্বাভাবিক কর্মকান্ড হলে, যে রোগী নিয়ে এতো দৌড়াদৌড়ি, একটু সুস্থ হলে সর্ব প্রথম তাকেই এসে দেখা।
পৃথিলা নিজেও চোখ ফিরিয়ে নিলো। নিতেই এরশাদ তাকালো। আর যতোক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে কথা বললো, একপলকে তাকিয়েই রইল।
মিঠাপুকুরের আকাশে আজ মেঘের ঘনাঘটা না থাকলেও, সারেং বাড়িটা যেন থমকে আছে। সব কিছুই ঠিক, চলছে নিজ ছন্দে। তবুও যেন কিছু একটা ঠিক নেই। অথচ সব সময়ের মতো জয়তুন দুপুরে খাবার খেয়েছে, খেয়ে কিছুক্ষণ নিজের রুমে গড়াগড়ি করে। আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। নিজের রুমেই গিয়েছে। তবে সেই যাওয়াও যেন কিছুটা অন্য রকম। বীণাও আছে তার মতো, রাতে ঘুমায়নি তাই সারাদির রুম থেকে আর বেরও হয়নি। তবে আম্বিয়া আছে মহা ব্যস্ত হয়ে। তারতো আর বসে থাকলে চলে না। এতো বড় সংসারের ঘানি ঘাড়ে। তার মধ্যে আবার আলাউদ্দিনের আয়োজন। ঝামেলা তো কম না। তবে সে জানে এরশাদ ভাই আসলেই সব কাজ পানির মতো হয়ে যাবে। সব কাজ সুন্দর মতো করে ফেলার গুণ তার আছে। তবে ভেতর বাড়ি তো তার ঘাড়েই। তার মধ্যে কুটুম বাড়ি থেকে মানুষ আসবে। আগের সম্পর্ক এক ছিল, এখন হবে মেয়ের বাড়ির কুটুম। এক দুই পদ পিঠা সামনে না রাখলে তো মান ইজ্জত যাবে। তাই তো চাল ভিজিয়েছে। বিকেলে ঢেকিতে কুড়োবে। সেই আয়োজন করছে ব্যস্ত হয়ে।
আর আয়নামতি আছে তার তোষক বালিশ নিয়ে। অবশ্য নিজ হাতেই জগ ভর্তি পানি ঢেলে ভিজিয়েছে। শয়তানটা বুঝে নি। বিনা কারণে ধমক দিলো কেন? নিজেদের বেলা ঠিক ষোল আনা, অন্যের বেলা এক আনাও নেই। কথায় কথায়, “মিথ্যা বলেছিলে কেন? নাটক করছিস কেন? ” আর এদিকে একেকজন দুনিয়া ফালাফালা করে ফেলছে, তাতে কোন দোষ নেই। তাই ভেবেছিল, নে এবার ঘুমা, ভেজা বালিশ, কাঁথায় সাঁতরে সাঁতরে ঘুমা। অবশ্য যেমন ভেবেছিলো তেমন লাভ হয়নি। তখনি বুড়ি ডেকে পাঠিয়েছে। আর ডাকতেই চলে গেছে। ফিরেছে একেবারে দুপুরের কাছাকাছি। ফিরে কয়টা নাকে মুখে খেয়ে অন্য রুমে চুপচাপ শুয়ে পড়েছে। এতো বড় সারেং বাড়িতে রুমের অভাব কি আর আছে। বরং মানুষের চেয়ে থাকার জায়গা বেশি।
তাই নিজের কপাল আয়না নিজে’ই চাপড়েছে। কোন দুঃখে পানি ঢালতে গিয়েছিল। এই যে নিজের দম’ইতো এখন বের হচ্ছে। অবশ্য আম্বিয়াবু কে বলতেই প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছে। তাকানোর কারণ আছে, ঐ শয়তারটা না বুঝলেও, পুরো বাড়ির কোণা কাঞ্চি আম্বিয়াবুর নখদর্পণে। তাই জালানা যতোই খোলা থাক, যতোই ঝড় বৃষ্টি হোক, বিশাল রুমের খাট পর্যন্ত যাওয়ার কথা না। আর গেলেও আশপাশ ভিজবে তবে তোষক না। তবে কিছু’ই বলে নি। বাইরে থেকে জয়তুন বুড়ির দু’জন লোককে ডেকে এনেছে। এনে সুন্দর মতো ছাদে তুলেছে। তুললে কি হবে, সব ঝামেলা তো তার উপর দিয়েই যাচ্ছে। তাছাড়া এতো সহজে কি আর শুকায়? রোদ উঠেছে নাম মাত্র। অনেক কষ্টে উল্টে পাল্টে শুকালো।
এই পুরো বাড়িতে সারেং বাড়ির নাতিদের থাকার জায়গার অভাব না হলেও, তার আছে। তাই তো এই কষ্ট। এখন আবার সেগুলো নামানোর আয়োজন করছে। আর সেই আয়োজনের ধুম ধারাক্কায় শাহবাজের গাঢ় ঘুম যে পাতলা হচ্ছে, আয়না বুঝতেই পারে নি। কেনানা শাহবাজ ঘুমিয়েছে একেবারে সিঁড়ির সাথের রুমে। সিঁড়ি দিয়ে উঠা নামা সব তার কানে যাচ্ছে। আর যাচ্ছে বলে বিরক্ত নিয়ে ফট করে চোখ খুলে তাকালো।
আর তাকিয়েই ঝট করে উঠে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে দরজা খুললো প্রায় ধরাম করে। সকাল থেকে সে ছিল দৌড়ের উপরে। সংসারের কাজের ঝামেলায় সে অভ্যস্ত না। সব করে এরশাদ ভাই। তবে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তাদের কারো খবর নেই। দাদি সব ফেললো তার ঘাড়ে। সেগুলে করতে করতেই মেজাজ তার তুঙ্গে। সেই তুঙ্গে যাওয়া মেজাজ নিয়ে বাইরে এলো। আর আসতেই তুঙ্গে যাওয়া মেজাজে আগুন লেগে গেলো।
তাদের বাড়ির দু’লোক ধরাধরি করে তোষক নামাচ্ছে। নামাক সেটা তার সমস্যা না, সমস্যা হলো তাদের সাইডে এক সিঁড়ির উপরে’ই আয়না দাঁড়িয়ে। দু’হাতে মুঠোকরে বুকে দু’টো বালিশ চেপে ধরে রেখেছে। গায়ে সকালের ফিরোজা রঙের’ই কাপড়। তবে এখনো মাথায় ঘোমটা নেই, হয়ত দৌড় ঝাপে পড়েছে। তবে দু’হাত বালিশ ঝাপটে ধরে রাখার জন্য আঁচল কিছুটা বেঁকেছে। সেই বাঁকানোতে ফর্সা কোমরের কাছটা সকালের মতোই উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে।
হাজার বৈরিতা থাক, হাজার ঘৃণা থাক। কবুল, কবুল’ই। আর নিজের জিনিস নিজের’ই। কেননা কবুলের শক্তি ঐ যে কালো জাদুর মতো। ফট করে তো ঘাড়ে চাপে। তবে কাজ করে খুব ধীরে ধীরে। মানুষ বুঝেনা, দেখেনা তবে এমন কাবু করে। চাইলেও মোহ কাটা যায়না। আর শাহবাজ স্বীকার না করুক, নিজের অহমের কাছে মাথা নত না করুক। সে যে এই মোহে্ পড়েছে অনেক আগেই তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাই যেই উঁকি ঝুঁকি মারা কোমর সকালে তার সামনে ঠিক থাকলেও, এখন এই মানুষদের সামনে বড়ই বেঠিক লাগলো।
আর লাগতেই শাহবাজের মেজাজের বারুদে আগুন ঠিক লেগে গেলো। গিয়ে অবশ্য আয়নাকে কিছু বললো না। ঐ যে বুকে মাথা রাখলো। তখন থেকে কিছু বলতে গায়ে লাগছে। তা না হলে শাহবাজের হাতে গরম দুধ ফেলা, তার তোষক বালিশকে পানি দিয়ে গোছল। চুপচাপ বসে থাকতো? আছড়ে না ব্যাঙ বানিয়ে ফেলতো।
তাই ধড়মড়িয়ে এগিয়ে গেলো। গিয়ে শরীরের সব শক্তি দিয়ে তোষক ছুঁড়ে মারলো।
আয়না হতবাক হলো। হয়ে যেখানে ছিল সেখান থেকেই নিচে উঁকি দিলো। তোষক একেবারে ধরাম করে বসার রুমে গিয়ে পড়েছে। এই শয়তানের আবার হলো কি? দেখতো! এখন আবার টেনে উপরে কে তুলবে? ধুর! এমনিতেই সকাল থেকে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে তার জান শেষ। তার হতবাক বিরক্তিতে পরিণত হলো। এই বাড়ির জ্বালা যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। কিছু করতে যাও তাও দোষ, না করতে যাও তাও দোষ।
জয়তুনের লোকও হতম্ভব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি করবে দিশে পাচ্ছে না। তাই একবার আয়না, একবার শাহবাজের দিকে তাকালো। শাহবাজ তার মতোই বললো, — লাথি খাইবার না চাইলে ভাগ।
জয়তুনের লোক কিছু বলবে তার আগেই আয়না বললো, — ভাগ মানে? এই তোষক এখন কে উঠাবে? ছাদে আরেকটা আছে। আমাকে মেরে ভূত বানিয়ে ফেললোও আমার দ্বারা সম্ভব না।
শাহবাজ আয়নার কথার উত্তর দিলো না বরং এই কালনাগিনী কথা বলতে গিয়ে বালিশ দু’টো আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে। এমন ভাবে আঁকড়ে ধরছে, যেন হীরে জহরতের বাক্স। আর সেই বাক্স আঁকড়ে ধরতে গিয়ে তার নজরে অন্য কিছুই পড়লো। আর পড়তে’ই আগুন চোখে জয়তুনের লোকের দিকে তাকালো। এই বেচারা রা আয়নার দিকে ফিরেও তাকায়নি, তাদের সেই সাহস আছে? জয়তুন চোখ উপড়ে ফেলবে না। তাই তারা কিছু’ই বুঝলো না। তবে এবার ঠিক চলে গেলো। আর যেতেই শাহবাজ একবার আয়নার দিকে কটমটিয়ে তাকালো, তাকিয়ে নিজের মতো আবার সেই রুমের দিকে গেলো।
আয়না শান্ত চোখে যাওয়া দেখলো। তার শান্তি এই শয়তানের সহ্য হয় না, সে জানে। আরামে আরামে কাজ করবে এটা বুঝি সহ্য হবে? খাটাশের ঘরে খাটাশ।
বিরবির করতে করতে আয়না নিজের মতো রুমে গিয়ে বালিশ রাখলো। নিচের টা আম্বিয়াবুর নজরে পড়লেই ব্যবস্থা হয়ে যাবে। তবে ছাদের তোষকের করবে কি? তাই মুখ গোঁজ করেই আবার ছাদে এলো। তোষক নিয়ে কতোক্ষণ টানাটানি করলো। দুনিয়া উল্টো গেলেও তার দ্বারা সম্ভব না। তাই তোষকের উপরেই পা ছড়িয়েই কিছুক্ষণ বসে বসে বিকেলের আকাশ দেখলো। দেখে সাবিহাদের বাড়িতে একটু উঁকি ঝুঁকি মারলো। পৃথিলা আপাকে নিয়ে ফিরছে না কেন সবাই। খবরতো এসেছে জ্বর নাকি কমেছে, তবে? তার খুব ইচ্ছে একটু দেখতে যাওয়ার। তবে এই বাড়িতে তার ইচ্ছের মূল্য দেবে কে?
উঁকি ঝুঁকির পরে ছাদ থেকে কতোগুলো লাল চন্দন কুড়ালো। সাইডেই বিশাল গাছ।ছাদে কি সুন্দর বিছিয়ে থাকে। সেই বিছানো থেকেই নিয়ে কতগুলো আঁচলে বাঁধলো। ছোট বেলা কোথায় কোথায় থেকে কুড়িয়ে আনতো। এনে নারিকেল তেলের বোতলে রাখতো। আর এখন কতো, ছুঁয়ে দেখার সময়ও নেই।
তাই কতগুলো আঁচলে বেঁধে ফিরে যাবে তখনি দেখলো শাহবাজ উঠে আসছে। আগের মতোই চোখে মুখে বিরক্তের রেখা। সেই রেখা নিয়েই আঙুল তুলে আয়নাকে ডাকলো।
আয়না ভয়ে ঢোক গিললো! দোতলা, ছাদ পুরোই খালি নিস্তব্ধ। ধাক্কা দিয়ে ছাদ থেকে ফেলে দিলে কেউ জানবেও না, এই শয়তানের কারসাজি। তাই ঢোক গিলে শান্ত ভাবে এগিয়ে গেলো। বেশি না অবশ্য এই দু’তিন কদম।
আয়না দু’তিন কদম এগুলোও শাহবাজ বাকিটুকু এগুলো। এগিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই কোমরের দিকে ঘাড় কাত করে তাকালো। আয়না প্রথমে বুঝলো না। তাই শাহবাজের সাথে সাথে নিজেও কাত হয়ে তাকালো। তাকাতেই তার নজরে পড়ল, নেয়ে ঘেমে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিয়ে চিকচিক করা তার ফর্সা কোমর। আর নজর পড়তেই আবারো ঢোক গিললো। গিলে ফট করে সোজা দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে আঁচল টেনে ঢেকে মুঠো করে ধরলো।
শাহবাজ সব ঢং’ই দেখলো। দেখে তার সেই চিরচেনা হাসি দিয়ে বললো, — আহা ঢাকছো কেন? এই দেড় ইঞ্চি কোমর আমাকে দেখাবার জন্যই তো জায়গার কাপড় জায়গায় থাকে না। দেখি হাত সরাও, ভালো ভাবে দেখি।
আয়না কোমরের কাপড় আরো শক্ত করে মুঠো করলো। করে সাথে সাথে’ই দু’কদম পেঁছালো।
আয়না যেমন দু’কদম পেঁছালো, শাহবাজও দু’কদম এগুলো। এগিয়ে তার মতোই বললো, — এই রং ঢং দেখিয়ে আমার মাথা খারাপ করতে’ই তো চাও, আমি বুঝিতো। লেদা বাবু তো আর না। তোমার মতো তিন চার আয়না আমি এমনিই হজম করতে পারি। তবে সমস্যা হলো তোকে পারছি না। গলায় কাঁটার মতো বিঁধে গেছিস। এখন না পারি ঢোক গিলে হজম করতে, না পারি টেনে বের করতে।
শাহবাজের একবার তুমি, একবার তুইতে আয়নার গলা শুকিয়ে এলো। আবার মাথা বিগড়েছে ঠিক বুঝলো। আর যখন বিগড়ে তার উপর দিয়ে ঝড় যায়। আল্লাহ রক্ষা করো। কিন্তু এখন করেছে টা কি? সকালে করলেও এক কথা ছিল। বালিশ তোষক ভিজিয়েছে। তাছাড়া কথা সত্য তখন তাকে জ্বালানোর জন্য’ই কোমর ঠিক বের করেছিল।
শাহবাজ আরেকটু এগুলো। আয়না আরেকটু পেছালো। পিছিয়ে আস্তে করে বললো, — দিন দুপুরে তাড়ি খেয়েছেন আপনি?
— না কালনাগিনী! আপনার কাছে এলে আমি সব সময় মাথা ঠিক করে আসি। জানি তো মাথা নষ্ট করার জন্য দু’পায়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
আবার আপনি! আয়না হাল ছাড়লো! ছেড়ে বললো — দেখেন কথায় কথায় এতো হাবিজাবি বলবেন না। তাছাড়া আমার কোন দরকার জাদু টোনা করার। আমি এমনিও সারেং বাড়ির বউ, ওমনিও সারেং বাড়ির বউ। নতুন করে জাদু করে আর হবোটা কি?
— কথা সত্য। তাহলে বাড়ির কামলাদের মাথা চিবুতে গেছেন কেন?
আয়না অবাক হলো! অবাক হয়ে বললো, — কি?
— এতো সাধু সেজে তো লাভ নেই। সুন্দরী, রুপসী রুপের আগুনে জ্বলে। সেই জ্বালা নেভাতে বুঝি?
আয়না উত্তর দিলো না। তবে তার গোল গোল চোখে পানি চিকচিক ঠিক করলো। শাহবাজ সেই চিকচিক করা পানি দেখলো। দেখে আসলেই বুঝলো এই মেয়ের শান্তি তার হজম হয় না। এই যে এখন কতো আরাম আরাম লাগছে। তাই হেসে স্বাভাবিক ভাবে তোষকের কাছে গেলো। মুরিয়ে ঝট করে কাঁধে তুললো। তুলতে তুলতে বললো, — সারেং বাড়ির রুপসী বউ, এসে একটু সাহায্য করেন। যদি সিঁড়িতে উল্টে পড়ি। তোষকে পানি ঢালার জন্য ওই দেড় ইঞ্চি কোমর মুচড়ে ভাঙবো।
আয়না কিছু বললো না। শান্ত ভাবে এগিয়ে গেলো। গিয়ে পেছন থেকে ধরলো। শান্ত ভাবে ধরলেও তার শরীর জ্বলছে। মানুষ মনে করে নাতো এরা। যখন যা মন চায় তাই বলে। সেই বলায় সামনের জন মরলো বাঁচলো তাতে তাদের কিছু আসে যায় না। তাই সেই দিন মাথার বাড়িটা ফেরানোর জন্য আফসোস হলো। মহাজন চাচা’ই ঠিক। এদের প্রতি দয়া করলে কি হবে, এরা কারো প্রতি দয়া করে না।
আর এই দয়াহীন মানুষের জন্য আয়নার ভেতর থেকে ঘৃণা উপচে পড়লো। আর পড়তে পড়তেই তার নজর গেলো শাহবাজের পায়ের দিকে। ভারী তোষক! কাঁধে নেওয়ার জন্য নিচে না দেখে’ই হনহনিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
আয়নার তখন কি হলো কে জানে। আঁচলের বাঁধটা মুখে নিয়ে খুললো, খুলে চন্দন গুলো এক হাতে নিলো। নিতেই মহাজন চাচার একটা কথা কানে বাজতে লাগলো — মেয়েরা চাইলে সব পারে।
আর তখনি মুঠোর চন্দনগুলো আস্তে করে সিঁড়িতে ছড়িয়ে দিলে। আর দিতে দেরি শাহবাজের পায়ের নিচে পড়তে দেরি হলো না। আর পড়তেই শাহবাজ তোষক নিয়ে উলটে পড়লো।
আয়নার কলিজা খাবলে উঠল। গ্রামের সিধেসাদা মেয়ে। যে যতোই খারাপ থাক। কারো ক্ষতি তো চাইতে পারে না। তাই সেই দিন যেমন ঠিক মূর্হুত্বে মত ঘুরে গিয়েছিল, আজও গেলো। আর যেতেই দৌড়ে ধরতে গেলো। যেই চন্দন শাহবাজের জন্য ছড়িয়ে দিয়েছিল সেই চন্দনে তার পাও হড়কে গেলো।
উলটে পড়ায় শাহবাজের তেমন কিছু হয়নি। তবে আয়নাকে পড়তে দেখে উঠে দাঁড়ানোর আগেই জাপটে ধরলো। সোজা সিঁড়ি, ধরে আর ব্যালেন্স রাখতে পারলো না। দুজনেই গড়িয়ে পড়লো। এই গড়িয়ে পড়ায় আয়নার কিছুই হলো না। সে রইলো শাহবাজের বুকে, দু’হাতের শক্ত দেয়ালের মাঝে। তবে শাহবাজ পড়ার সময় এক পাশ ঘুরে রেলিংয়ের ধারে এক হাত ধরাম করে লাগলো।
চলবে……

