ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৩২

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩২

ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটা ছাড়িয়ে গেছে। নিস্তব্ধ সারেং বাড়ি রাতের নিস্তব্ধতায় তখন আরও মুড়িয়ে গেছে। সেই নিস্তব্ধতার চাদর ভেদ করে শাহবাজ ফিরল ক্লান্ত ভাবে। হাত তার গলায় ঝুলানো। অতিরিক্ত কিছু না হলেও, হালকা নাকি চির ফাটা মতো হয়েছে। তাই প্লাস্টার করে একেবারে গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। কিছুদিন রাখতে হবে। তারপর গিয়ে খুলবে। নড়াচড়া একদম বন্ধ।

সবই ঠিক আছে, তবে নড়াচড়া বন্ধের কোনও লক্ষণ তার মধ্যে দেখা গেল না। একবার এদিকে নিচ্ছে তো আরেকবার ওদিকে। একবার দেখা গেল গলার রশি গলায় ঝুলছে, হাতের মতো হাত । কয়েক ঘণ্টায় মাঝেই এই বান্দা বিরক্তির চূড়ান্তে পৌঁছে গেছে ।

সেই বিরক্তি নিয়েই বন্ধ দরজায় একসাথেই ধুমধুম করে কয়েকটা ফেলল। আম্বিয়া দৌড়ে এলো, এসে সঙ্গে সঙ্গে খুলল। খুলতেই বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বলল,
— এর চেয়ে ভালো ভাইঙা ফালা। অযথা আর খোলার ঝামেলা নাই।

শাহবাজ উত্তর দিল না। ঘেমে শরীর কুটকুট করছে। ফ্যান ছেড়ে আয়েশ করে বসার ঘরে বসলো। বসে বললো, — ভাঙা আমার জন্য ব্যাপার না। কিন্তু সমস্যা হলো তোমরা বাড়িতে বসে বসে করবাটা কি?

আম্বিয়া অবাক হয়ে বলল, — তোর ধারণা দরজা খোলা ছাড়া আর কোন কাজ করি না?

— না!

— ভালো! তয় একদিন নিজ ঘাড়ে এই কাজ নিলেও তো পারেন।

— না পারিনা, তাহলে তোমাদের রাখছি কি জন্য?

— তাও কথা! দরজা খোলার বান্দি আমরা।

শাহবাজ হাসলো! — দাদি ঘুমিয়ে গেছে?

— হুম!

— বীণা?

— ঘুমে।

— আয়নামতি ?

আম্বিয়া থমকালো! শাহবাজ বেশিভাগ সময়ই রাত করে ফেরে। মাঝে মাঝে তো হুঁশও থাকেনা। তবে যেইদিন মন ভালো থাকে, সেই দিন এভাবে বিনা কারণে কথা বলবে। সবার খোঁজ টোঁজ নেবে। তবে আয়নামতিরও নেবে, এটা অবাক হওয়ার মতোই ব্যাপার। যাক মন লাগলো তাহলো। সে হেসে’ই দরজা লাগাতে এগুলো। লাগাতে লাগাতে বলল, — ঘুমিয়ে গেছে হয়ত। সদর থেকে ফিরে কোনরকম কয়টা খেয়ে’ই উপরে গেছে। আর নিচে নামেনি।

শাহবাজ হাসল! তার সেই চিরচেনা হাসি। হেসে ঝট করেই উঠল। উঠে উপরে যেতে নিল। আম্বিয়া দেখে বলল, — ভাত খাবি না?

— খাবো।

— তাহলে?

— তুমি শুয়ে পড়ো।

আম্বিয়া ভ্রু কুঁচকে তাকাল। প্রথমে সে বুঝতে পারল না। বুঝল, দু’তলার রুমের দরজাতেও যখন ‘ধরাম’ করে দুটো পড়ল। এই মেয়েটাকে আর শান্তি দেবে না।

আয়না আজকেও ধড়ফড়িয়ে উঠল। শাহবাজের হাতে কী কী নাকি করবে, সময় লাগবে, তাই কালাম ভাইকে দিয়ে তাদের আগে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। আর এসে কিছু তো করার নেই। খেয়ে শুতেই চোখ লেগে গেছে।

আবার দরজায় ‘ধরাম’ করে একটা পড়ল। আয়না তাড়াতাড়িই উঠল। কে সে ভালো করেই জানে। আর উঠে তড়িঘড়ি করে দরজা খুলল। খুলতেই দেখল, সাদা আবরণে মুড়ে, গলায় হাত ঝুলিয়ে শায়তানটা দাঁড়িয়ে আছে। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। সেই বিরক্তি নিয়েই দু’ঠোঁট ছাড়িয়ে হাসল। হেসে বলল, — প্রথম আর শেষবার বলছি, আমার রুমে আমি না ফেরা পর্যন্ত যেন দরজায় খিল না পড়ে।

কাঁচা ঘুম ভাঙায় আয়না এমনিতেই হতভম্ব হয়ে আছে। তার মাথায় আগা, মাথা কিছু ঢুকল না। তবুও বুঝদারের মতো ঘাড় কাত করল।

শাহবাজ পুতুলের মতো সেই ঘাড় কাতটুকু দেখল। আর দেখতেই খেয়াল করল, সব বিরক্তি, ক্লান্তি, এই যে হাতে যন্ত্রতা হচ্ছে তাও হাওয়ায় মিশে গেলো। অবশ্য আয়নাকে বুঝতে দিল না। আগের মতোই চোখ মুখ কুঁচকে ভেতরে এলো। খাটে বসলো। বসে খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল,
— হাত, মুখ ধোব। গরমে ঘামে গা কুটকুট করছে। গেঞ্জিটা খুলে দাও।

আয়নার ফট করেই ঘুমের তন্দ্র কেটে গেল। হা হয়ে বলল,– কী করবো?

— কী করবো মানে কী? হাত ভেঙেছে কার জন্য? তাছাড়া স্বামীর সেবা করবেটা কে?

আয়না মাথা নাড়লো। তাও ঠিক! তাছাড়া এই হাত দেখে তার নিজের আবার আফসোস হচ্ছে। ইশ! সারেং বাড়ির মানুষ শয়তান। সেও কি দিন দিন তাই হয়ে যাচ্ছে নাকি?

শাহবাজ আয়নার মুখটা দেখলো! দেখে বললো, — খুলবে ভালো কথা, তবে খুব সাবধানে। হাতে আমার দুনিয়ার ব্যথা। ছুঁলেও ব্যথা, দেখলেও ব্যথা। আর ডাক্তারে সোজা বলেছে, কোন নড়চড় করা যাবে না।

— না নড়ালে খুলবো কেমনে?

— সেটা যদি জানতাম, তাহলে তোমার আশায় বসে থাকতাম?

— তাও কথা। আয়না তার ঘুম ঘুম মায়াময় মুখটায় দুঃখের ছায়া নিয়ে এগিয়ে গেল। শাহবাজের গায়ে কালো গেঞ্জি, আটসাঁটভাবে লাগানো। এটা সে কীভাবে খুলবে, তার মাথায় ধারের কাছেও এলো না। সে একবার এই দিক, আরেকবার ওই দিক দিয়ে ঘুরে ঘুরে কপালে কয়েকটা ভাঁজ নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে দেখতে লাগল। হাত না নাড়িয়ে আসলে খুলবেটা কি করে?

শাহবাজের দৃষ্টি আয়নার মুখের ওপর। ঠোঁটে কোণে হাসি! সেই হাসি নিয়ে আরও আয়েশ করে বসল। তার বউ প্রথম তার শরীর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। ভালো করে দেখুক। তাই আয়েশ করেই বসে বলল,– দেখতে সমস্যা হচ্ছে না তো? আরেকটু নড়ে চড়ে ভালো করে বসবো?

আয়না শাহবাজের খোঁচা বুঝল না। সে মুখ গুঁজ করে আবারো বলল,– এই গেঞ্জি কেমনে খুলবো ?

— আমি কী জানি?

আয়না বড় বিপদে পড়েছে এমন মুখ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,– আপনাদের তো টাকা পয়সার অভাব নাই। কেটে ফেলি? একটা গেঞ্জিতে আর এমন কি হইবো?

— অভাব নেই বলে কেটে সব ফালাফালা করে ফেলবে? তোমার মতো বিনাশকারী বউ তো সারেং বাড়িতে এই পর্যন্ত আর একটাও আসেনি।

আয়না অসহায়বোধ করলো। করে মুড়িয়ে মুড়িয়ে কোন রকম গলা পর্যন্ত আনলো। তারপরে শেষ! করবেটা কি? দুনিয়ার চিন্তা মাথায় নিয়ে, বলতে গেলে গেঞ্জির পেছনে উঠে পড়ে লাগল। লাগতে লাগতে অনেক কষ্টে কনুই পর্যন্ত আনলো। এমন ভাবে আনলো, শাহবাজের গায়ে যেন না লাগে। আর এনে বিশ্বজয়ের হাসি হাসলো। এই তো আর একটু আনতে পারলেই হলো।

তখনি তার টনক নড়লো। সে শাহবাজের দু’পায়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু মাঝেই নয়, বলতে গেলে অনেকটাই কাছে। গলায় দু’হাত। নিচু হয়ে খোলার জন্য মুখটাও কাছাকাছি হয় আছে। আর এটা বুঝতেই আয়নার পিঠ বেয়ে শীতল একটা স্রোত তার বয়ে গেল।

শাহবাজ বসে আছে আগের মতোই। আগের মতোই দৃষ্টি আয়নার মুখে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— হাতটা ভাঙা, তার মধ্যে এই প্লাস্টার… বিরাট আফসোস হচ্ছে।

আয়না তার মতো আস্তে করেই বললো — কিসের?

— জানতে চেয়েও না। রাগ ঢাক আমার মুখে নেই। তাই নাও, বাকিটুকু খুলো। নাকি সারা রাত এমন উধুম ভধুম করে বসিয়ে রাখার ইচ্ছা?

আয়না এতোক্ষণ খেয়াল করেনি তবে চোখের সামনে শাহবাজের খালি গা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলো। তাই আর কোন কথা বাড়াল না। বরং এতোক্ষণ হাত না কাঁপলেও এখন কাঁপা শুরু হলো। আর সেই কাঁপা কাঁপা হাতে’ই গেঞ্জি খুলতে খুলতে আস্তে করে পায়ের মাঝ থেকে বেরোতে চাইলো। আর ঠিক তখনই শাহবাজ কোমর চেপে ধরলো। আর আয়না “মাগো” বলে লাফিয়ে উঠল। উঠে আর ঘরের মেঝেতে পা রাখল না, রাখল একেবারে শাহবাজের পায়ের পাতায়।

শাহবাজ চোখ মুখ কুঁচকালো। কুঁচকে বলল,
— শালার বিয়ে! আরামের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। ঘুম তো ভালোই হাত, পা সব যাচ্ছে। বলতে বলতে কোমর ছেড়ে দিলো। দিয়ে চোখ মুখ কুঁচকেই ধমকে বলল,
— বাকিটুকু আমি খুলছি। যাও, খাবার নিয়ে আসো।

আয়না বলতে গেলে দৌড়ে পালালো। এই ব্যাটার আজ মতিগতি ঠিক নাই, ঠিক বুঝল। তাই হাত ভাঙার জন্য আর আফসোস হলো না। বরং হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তবে সেই বাঁচা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। খাবার আনতেই বলল,
— খাইয়ে দাও।

আয়না অবাক হয়েই বলল,
— হাত ভেঙেছে বামটা, ডান হাতে কী?

— ডান হাতে আফসোস। আসেন এদিকে আসেন, বুঝিয়ে বলি।

আয়না গেল না। বরং তাড়াতাড়ি ভাতের প্লেট হাতে নিল। আবার ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’! এইটার মাথা বিগড়াতে সময় লাগে না। তাছাড়া, এই রাত-বিরাতে যাবে কোথায়? সেই তো এই রুমেই মরতে হবে। তাই যেভাবে বলে, সেভাবেই করা ভালো।

আয়না সুন্দর করেই চুপচাপ খাওয়াল। খাইয়ে ঔষুধ খাওয়ালো। ঔষুধ পাঠিয়েছে এরশাদ ভাই। এই শয়তান প্লাস্টার করেই গায়েব। এই যে ঔষুধ খাওয়ালো, কোথা থেকে খাওয়ালো। সেই খবরও নাই। এমন আজব কিসিমের মানুষ সে ইহজীবনেও দেখে নাই।

খাইয়ে সব কিছু নিয়ে আবার নিচে গেলো। গুছিয়ে রেখে এসে দেখল শাহবাজ শুয়ে পড়েছে। চোখ বন্ধ, হাত গুছিয়ে বুকের উপরে রাখা।

আর এই শোয়া দেখে আয়নার মাথায় ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজতে লাগল। বিয়ের পরে বলতে গেলে এই প্রথম, একই রুমে এক’ই খাটে পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবে থাকা। আয়নার গলা শুকিয়ে এলো। এমনিতেও এই শয়তানের হাব ভাব তার ভালো ঠেকছে না। তাই শুকনো একটা ঠোক গিলে আস্তে করে দরজায় খিল দিল। বাতি কি নেভাবে? সেটা জিজ্ঞেস করারও সাহস হলো না। সে ঘুমিয়েছিলো বাতি জ্বালিয়ে, এখন নিশ্চয়’ই তা সম্ভব না। তাই বুকে সাহস নিয়ে আস্তে করে বাতি নেভাল। নেভাতেই পুরো রুম অন্ধকারে তলিয়ে গেল। ভয়ে সে সব জানালা টানালা লাগিয়ে দিয়েছিল, পর্দা ফেলেছিল। তাই আলোর ছিটেফোঁটাও দেখা গেলো না।

সেই অন্ধকারে হাতড়ে এগুতে গিয়ে খাটের পায়ে তার পা খেলো এক বাড়ি। আয়না কুঁকিয়ে উঠল। শাহবাজ ভালো মন্দ কিছুই বললো না। নড়ে ওপাশে শুতে শুতে শুধু বলল,– শালার প্লাস্টার!

আয়না শুনলো! শুনে সেও কিছু বললো না। খুঁড়াতে খুঁড়াতে আস্তে করে শাহবাজের ঠিক বাম পাশে চুপচাপ শুয়ে পড়লো।

সকালে পৃথিলার ঘুম ভাঙল একটু দেরিতে। ঔষুধের প্রভাব থেকে হোক, আর জ্বরের রেশ থেকেই হোক। ঘুম দিয়েছে গাঢ় । সেই গাঢ় ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বেশ বেলা হলো। বেলা হলেও মাথাটা আজ আর ঘোলা ঘোলা লাগছে না। বরং বেশ হালকা লাগছে। সেই হালকা মাথা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবে চোখ খুলল।

তার জায়গায় অন্য কোনও মেয়ে হলে হকচকিয়ে যেত, নয়ত বিস্ময়ে বাক্য হারা হতো। তবে পৃথিলাম মাঝে তেমন কিছু দেখা গেলো না। বরং স্বাভাবিক ভাবে উঠে বসলো। হাসপাতালের সাদা চাদরের নিচে গায়ের কাপড় একদম ঠিক। তবুও আঁচলটা পেছন থেকে এনে সুন্দর করে গায়ে জড়ালো।

জড়িয়ে দরজার বাইরে তাকালো! জাফর চাচা কোথায়?

এরশাদ পৃথিলার ঠিক সামনে বসা। চেয়ারে! দৃষ্টি অবশ্য পৃথিলার দিকে নেই। তার দৃষ্টি তার পায়ের দিকে। আর সেখানে রেখেই তার সুন্দর, শান্ত, মার্জিত সুরে বললো, — ছোট চাচা নাস্তা করতে গেছে। এসে পড়বে।

গত দু’দিন এই লোক তাদের সাথেই হাসপাতালে ছিল। তবে কোন কারণে দরজা পেরিয়ে কেবিনে আসেনি। এক বারের জন্যও আসেনি। কেন আসেনি পৃথিলা এখন বুঝলো। তার আসায় সে স্বাভাবিক থাকতে পারতো না। এই যে অন্য রকম একটা অস্বস্তি ঘিরে ধরেছে। হয়ত এটার জন্যই আসেনি। তবে আজ কেন?

পৃথিলা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলো। লোকটা এখনো চোখ তুলে তাকায়নি। কিন্তু সে দরজার দিকে তাকিয়েছে, ঠিক বুঝেছে। কিছু কিছু মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় খুব তীক্ষ্ণ হয়। হয়তো এই লোকটারও এমন কিছু। অথচ এই ঘাগু রকমের লোকটাকেই পৃথিলার সারেং বাড়িতে পা রেখেই খুব পরিচিত মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, কিছু লোক দেখলে দ্বিধা আসে না, সংকোচ আসে না, ভয় আসে না। অথচ কি সুন্দর মানুষের চোখে পর্দা ফেলে।

পৃথিলার নিজের প্রতি নিজের’ই হাসি পেলো। আবারো হাতে নাতে প্রমাণ পেলো, মানুষ চিনতে কতোটা অপটু সে। প্রথমে তারেক, আর এখন এই যে সামনে বসা মানুষটা।

তখনি এরশাদ চোখ তুলে তাকালো! তাকিয়ে দরজার দিকে ফেরা পৃথিলার মুখটা দেখলো। দেখে বললো, — আপনি ঠিক আছেন?

পৃথিলা সে কথা উত্তর দিলো না। বরং তার শান্ত স্বরে বললো, — আমাকে ছাড়বে কখন?

— সব হয়ে গেছে। আপনি ঘুমে ছিলেন তাই ডাকিনি।

— ওহ!
— নাস্তা দিতে বলি?
— না! একেবারে বাড়িতে ফিরে খাবো।
— ঔষুধ আছে আপনার।
— একটু পরে খেলে সমস্যা হবে না। আমি নার্সদের সাথে কথা বলে নেবো।

বলেই পৃথিলা ধীরে ধীরে নামল। এখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছে না। তবে তার পা খালি। সেই দিন রাতে কিভাবে এসেছে সে জানে না। তবে খুব যে ভালোভাবে আসেনি, সেটা ঠিক জানে। তাই কিছু জানতে ইচ্ছে করছে না। খালি পা নিয়েই নামার চেষ্টা করল। আর তখনি এরশাদ দাঁড়াল। সাইডের একটা ব্যাগ থেকে নতুন একজোড়া জুতা পৃথিলার পায়ের কাছে রাখল। রাখতে গিয়ে সে ঝুঁকলো একেবারে পৃথিলার পায়ের কাছে। পৃথিলা হকচকিয়ে গেল।

এরশাদ স্বাভাবিক! স্বাভাবিক ভাবে রেখে উঠতে উঠতে বলল, — আর কোন সমস্যা নেই তো?

পৃথিলা আগের মতোই শান্তভাবে বলল, — না। বলে যেভাবে বসে ছিলো সে ভাবেই বসে রইল। জুতার ধারের কাছেও পা নিলো না। এরশাদ সেই জুতার দিকে তাকিয়ে বলল, — সিগারেট ধরালে সমস্যা হবে?

পৃথিলা আগের মতোই শান্তভাবে একটা শব্দই বলল, — না।

এরশাদ সিগারেট ধরালো। ধরিয়ে নিজের মতো টান দিলো। দিয়ে শান্ত স্বরে বলল, — সোজাই বলি। অবশ্য ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বললেও সমস্যা নেই। আপনি বুদ্ধিমতি মানুষ। ঝট করে বুঝে ফেলবেন। অবশ্য আমার ধারণা এতোক্ষণে বুঝেও গেছেন। তাই ছোট করে এক বাক্য’ই বলি, — আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।

পৃথিলা অবাক হলো না। কোনো বাড়তি বিস্ময়ও দেখালো না। আসলে সে এমনি। তারেকের ব্যাপারটা জেনে যেমন শান্ত ছিল, এই যে সামনে বসা লোকটার সোজা কথায়ও তেমনি শান্ত’ই রইল। হ্যাঁ, না, হুঁ, কিছুই বলল না। তার দৃষ্টি আগের মতোই। দরজার দিকে। সে অপেক্ষা করছে জাফর চাচার। জাফর চাচা এলেই বাসায় ফিরবে। ভেবেছিল আরও দুটো দিন মিঠাপুকুরে থাকবে। শরীরটাও ঠিক হলো, স্কুল, সবার কাছ থেকে সুন্দর করে বিদায় নেওয়াও হলো। তবে সেটা আর সম্ভব নয়। এখন ফিরেই গোছগাছ করবে, সোজা দুপুরে ট্রেনে উঠবে।

এরশাদ শান্ত চোখেই দরজার দিকে তাকানো পৃথিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তাকিয়েই সিগারেটে একের পর এক টান দিল। ছোট্ট কেবিন, ধোঁয়ার গন্ধে জমাট বেঁধে গেল।

পৃথিলার কষ্ট হচ্ছে। তবুও আগের মতো বসে রইল। না ফিরে তাকালো, না টু শব্দ করলো। তবে এরশাদ উঠল। উঠে বাইরে যেতে যেতে বলল, — জুতাটা পায়ে দিন পৃথিলা। বিরক্তি, অবহেলা আমি নিতে পারি না।

পৃথিলা শুনল। শুনে আগের মতোই বসে রইল। তার কিছুক্ষণ পরে জাফর এলো। এসে ফেরার প্রস্তুতি নিলো। পৃথিলা তাকেও কিছু বললো না। শুধু একবার ইমরানকে খুঁজলো। সকাল থেকে আর দেখেনি। তার জন্য না এরা বিপদে পড়ে।

সব ঠিক হতেই পৃথিলা বেড থেকে নামল। খালি পায়েই নামল। নেমে নিজের মতোই এগিয়ে গেল।

এরশাদ ভ্যান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পৃথিলাকে এগিয়ে আসতে দেখলো। খালি পায়েই দেখল! দেখে হাসল। সেই প্রথম দিনের মতো সরল এক হাসি। পৃথিলাও সেই হাসি দেখল। দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল।

বীণা আজ টানা তিনদিন পরে বইয়ে হাত রাখলো। বেশ দৃঢ়তার সাথেই রাখলো। দুনিয়ার পড়া জমা হয়ে গেছে। তাই রেখেই ঝটপট খাতা কলম টেনে নিলো।

সারেং বাড়িতে আজ দুনিয়ার কাজ। কাল আলাউদ্দিনের জন্য দোয়া। পুরো এলাকার মানুষ খাবে। তাই তার আয়োজন চলছে। প্যান্ডেলের লোক এসেছে। তাদের হাক ডাকে সকাল সকাল’ই পুরো বাড়ি মুখরিত হয়ে গেছে। সেই মুখরিত কাজের মাঝে’ই আম্বিয়া বীণার রুমের দিকে গেলো ব্যস্ত ভাবে। বাসি কাপড় কি কি তুলে রেখেছে কে জানে। ঘরের কাজ টাজের ধারের কাছেও যায় না। রান্না পারে না । এই মেয়ে শ্বশুর বাড়ি গিয়ে করবেটা কি?

সেই গজগজ করতে করতেই রুমে এলো। এসে দেখলো বীণা বই খাতায় ডুবে আছে। সে ভ্রু কুঁচকে তাকালো। তাকিয়ে বললো, — বই খাতা রেখে, একটু ঘরের কাজ টাজে মন দে বীণা। শ্বশুর বাড়ি গেলে তো মান থাকবে না।

বীণা আম্বিয়ার কথা ধারের কাছেও গেলো না। বরং নিজের মতো অংক কষতে কষতে বললো, — কাউকে পাঠিয়ে ফরহাদ ভাইকে একটু খবর পাঠাও তো। বলো পড়াতে আসতে।

আম্বিয়া অবাক হলো। যার সাথে বিয়ে তাকে ডাকছে ভাই। আবার কি অবলীলায় বাড়ি আসতে বলছে। এই বাড়ির ছেলে মেয়েরা সব লাজ লজ্জা বেঁচে খেলো নাকি?

সে অবাক হয়েই বললো, — কিসের পড়া?
— আমার পরীক্ষার পড়া।
— কে পরীক্ষা দিচ্ছে?
— আমি।
— পাগল হয়েছিস?

বীণা উত্তর দিলো না। নিজেই বেরিয়ে গেলো। বাইরে এসে কালামকে দেখে বললো, — কালাম ভাই, কাউকে পাঠিয়ে ফরহাদ ভাই কে আসতে বলো। বলো আমি পড়ার জন্য আসতে বলেছি।

আম্বিয়া বিস্ময়ে খাবি খেলো। খেয়ে জয়তুনের রুমের দিকে গেলো। জয়তুন শুনলো শান্ত ভাবেই। তার অভিব্যক্তির তেমন পরির্বতন হলো না। তবে আম্বিয়া অবাকের পর আরেক অবাক হলো। কেননা এরশাদ ভাই তখনি ফিরলো। ফিরে সোজা নিজের রুমে গেলো। যেই দাদির সাথে দেখা না করে কখনোও বাড়িতে ঢুকে না, বাইরে যায় না। আজ দু’দিন পরে ফিরে না খবর নিলো না নিজে এগিয়ে গেলো। আসলে হচ্ছে ডা কি এই বাড়িতে?

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here