ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৩৭

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৭

বেরুতে বেরুতে বীণার দেরি হয়ে গেল। ছোট চাচাকে খাবার দিল। দিয়ে’ই বুঝি ঝট করে ফিরে আসা যায়! চাচার মলিন মুখটা দেখলেই তো পীড়া হচ্ছে। তাই কিছুক্ষণ বসলো। বসতে বসতেই আজান পড়ে গেল। আর আজান পড়তেই দৌড়ে যাবে ভেবেছিল, এমন সময় দেখলো এরশাদ ভাই খাবার নিয়ে যাচ্ছে। দেখেই আর এতোক্ষণ ও মুখো হয়’ইনি। মাত্রই বেরুলো, একেবারে গোসল করে।

আম্বিয়াবু ঘ্যনর ঘ্যনর করে মাথা খেয়ে ফেলছে, তাই আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ গোসলে চলে গেছে। গোসল থেকে ফিরে আর কোথাও যায়নি, সোজা চলে এসেছে। অবশ্য বেশিক্ষণ বসা যাবে না, নামাজ শেষ হলো বলে।

তবুও সাবিহা ভাবির কাছে উসখুস করতে করতে বীণা কিছুক্ষণ বসলো। সাবিহা ভাবির সঙ্গে তার সম্পর্ক সব সময়ই অন্যরকম। তবুও আজ মনে হলো, সেই আগের মতো আর তাল নেই, মনের রং ও নেই। তাই মনটা খারাপ করেই বলল,– পৃথিলা আপার সাথে একটু দেখা করি ভাবি।

সাবিহা বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে বলল, — যাও, জিজ্ঞেস করার কী হলো?

বীণার, এই কথাটায়ও খুব খারাপ লাগলো। এই এক কথায় যেনো কত লুকানো আক্ষেপ। সেই আক্ষেপের মন খারাপ নিয়েই ঐ রুমে গেলো। আস্তে করে দাঁড়ালো পৃথিলার সামনে। সেই দাঁড়ানোও জড়তায় ঘেরা। অন্যায় হচ্ছে জেনেও যখন কিছু করা যায় না, তখন জড়তা তো ঘিরে ধরবেই। তবে তার আর সাধ্য কই? নিজে আছে চোরাবালির মধ্যে দাঁড়িয়ে। এই ডুবে তো সেই ডুবে। তাই জড়তা নিয়েই ডাকলো, — আপা।

পৃথিলা ফিরে তাকালো। তার দৃষ্টি শান্ত, কোন আলাদা প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না।

বীণা দেখলো! দেখে বলার মতো কোন কথা পেলো না। তাই আস্তে করে বলল, — খেয়ে নিন না, আপা। অসুস্থ হয়ে যাবেন।

পৃথিলা বীণার অবস্থা বুঝলো। আসলে মাঝে মাঝে সবাই সব বুঝে, তবে কিছুই করার থাকে না। তাই শান্ত ভাবেই বলল, — তোমার ভাই কি তোমাকে পাঠিয়েছে?

বীণা সাথে সাথে দু’পাশে মাথা নাড়লো। নেড়ে আগের মতোই বলল, — আমি নিজেই আসতাম। তবে ছোট চাচা বলেছে।

— কেন?
— আপনাকে নিয়ে সে খুব চিন্তিত।

পৃথিলা হালকা হাসলো! হেসে বলল, — জেনে ভালো লাগলো। তবে তোমার ছোট চাচাকে বলো, — অন্যায় যে করে, আর দেখেও যে চুপ থাকে, তারা সমান অপরাধী।

বীণার চোখে পানি চলে এলো। সে কখনোও বলতে পারবে না। ছোট চাচা এমন না, একদম না। ও তো ভাইকে খুব স্নেহ করে, তাই কিছু বলতে পারছে না। নরম মনের মানুষ। তাই চোখের পানি সামলে বলল,– ছোট চাচা কি এমন?

— তোমাদের বাড়ির কে কেমন, এই বিষয়ে আমি যেতে চাচ্ছি না। তুমি এসেছো আমি খুশি হয়েছি, বসো।

বীণা আবারো দু’পাশে মাথা নাড়লো। নেড়ে হাতের মাঝে মুঠো করা কাগজটা আস্তে করে টেবিলের উপর রাখলো। রেখে বলল, — শাহবাজ ভাই দিতে বলল। চুপিচুপি। কাউকে বলতে নিষেধ করেছে।

পৃথিলা কিছু বললো না। না কোন আগ্রহ দেখা গেলো চিঠির দিকে। সে বসে ছিল জানালার পাশে। আগের মতোই বসে রইল। বীণা বেরিয়ে এলো। নামাজ থেকে সবাই ফিরছে। তাই চোখের কোণা মুছতে মুছতে সাইড দিয়ে এলো। আর তখনই কারো সাথে ধাক্কা খেলো।

বীণা ভাবলো, এরশাদ ভাই। চোরের মন পুলিশ পুলিশ তাই ভয়ে মুখ এতটুকু হয়ে গেল। আর হতেই সামনে তাকিয়ে দেখলো, ফরহাদ ভাই দাঁড়িয়ে। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, মাথায় টুপি। নামাজ থেকে ফিরেছে। তাই বীণা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

বাঁচলেও ফরহাদ বিরক্ত মুখে বলল, — ঠেলে ধাক্কিয়ে গায়ের উপরে আসছিস কেন?

বীণা আস্তে করেই বলল, — আমি দেখি নি।

— দেখবি কী করে, চোখ আছে তোদের?

বীণার কথা বলতে ইচ্ছে করলো না। মনটা কোনো দিক দিয়েই ভালো নেই। তাই সাইড কেটে চলে যেতে নিলো।তবে ফরহাদ আগের মতোই দাঁড়িয়ে বলল, — কাহিনি কী? চোরের মতো পালাচ্ছিস কেন?

বীণা বিরক্ত হলো! তবুও শান্ত ভাবে বলল, — আমি যে ভাবেই যাই, আপনার তো সমস্যা হওয়ার কথা না।

— তা ঠিক। বলেই ফরহাদ নিজেই যেতে নিলো। তবে বীণা ডাকলো,– ফরহাদ ভাই..

ফরহাদ দাঁড়ালো! দাঁড়াতেই বীণা বলল,– বড় ভাই পৃথিলা আপাকে আটকে রেখেছে। আপনি তো তার বন্ধু। একটু বুঝিয়ে বলেন না।

ফরহাদ জানতো না। এক দিনেই এই দিকে এতো কাহিনী করে ফেলেছে, তার জানার কথাও না। তাই ভ্রু কুঁচকে বলল, — আটকে রেখেছে মানে?

বীণা সব বললো! ফরহাদ চুপচাপ’ই শুনলো। সে কারো বিষয়ে’ই নাক গলায় না। নিজের মতো থাকে। এরশাদ’ই ডেকে একেকটা ঘাড়ে ফেলে। এজন্যই বিরক্তের উপরে থাকে। কেননা এমন এমন জিনিস তার ঘাড়ে ফেলে, করতে গেলে আপনা আপনি’ই মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তবুও সে কি’বা এরশাদ। কেউ কখনোও কারো কাজে পিছিয়ে থাকে না। তাই ভেবেছে পছন্দ করেছে ভালো কথা। তাছাড়া কে কাকে ভালোবাসবে এটা যার যার ব্যাপার। তবে এখন বেশি হয়ে গেলো না।

ফরহাদের ভাবনার মাঝেই বীণা বললো, — ছোট চাচা বলেছে আপনার আব্বার সাথে কথা বলবে।

— কি কথা?

বীণা হা হয়ে তাকিয়ে রইল। একটা মানুষ কতোটা গা ছাড়া হলে এমন কথা বলতে পারে তার জানা নেই। আর এদিকে দেখো তার নিজের সব নাওয়া খাওয়া লাটে। তাই হা হয়েই বলল,– আমার সাথে আজ আপনার বিয়ের কথা পাকা হবে, মনে আছে তো?

— ওহ! তাই বল! আমি ভাবলাম কি না কি?

— এটা আপনার কাছে কি না কি, মনে হয়?

ফরহাদের বিরক্তি ফিরে এলো। এতো প্রশ্ন ভালো লাগে না। তাই বিরক্ত মুখেই বলল, — নিজের কাজে যা।

— সেটাতো যাবো’ই। আপনি বললেও যাবো, না বললেও যাবো।

— আমার এমন কেন মনে হচ্ছে আজকাল তোর চাপা বেশি চলছে।

— চললে সমস্যা কি? এখন তো আর আপনি আমার স্যার না।

— কে জানি খবর পাঠালো?

— পাঠিয়েছিলাম, আসেন তো আর নাই।

— আমাকে তোর জয়তুন আরার পোষা পাখি মনে হয়। ইচ্ছে হলে নিষেধ করবি, আবার ইচ্ছে হলে আসতে বলবি।

— পোষা পাখি না হলেও, নাতীন জামাই হওয়ার জন্য তো মরে যাচ্ছেন।

ফরহাদ শীতল চোখে তাকালো! বীণা গোনায় ধরলে তো। ফরহাদকে দেখিয়ে মুখ বাঁকালো। বাঁকিয়ে বলল, –হয়েছেন তো বাপের লেদা। বাপে যেদিকে আঙুল তাক করে সেদিকেই প্যাঁচার মতো গোল গোল চোখে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কোন দুনিয়া চেনেন না। আবার এসেছেন আমাকে চাপা শেখাতে।

— বাপ সাইডে রেখে কথা বল ফাজিল। তা না হলে আমি ভুলে যাবো তুই কে?

— ভুলে যান, দয়া করে ভুলে। এই বীণা সারা জীবন আপনার কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে।

ফরহাদ কিছু বললো না তবে রাগে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে দাঁড়ালো! বীণা মুখ বাঁকিয়ে একটু হাসলো। সে ফরহাদের মতো ওতো লম্বা না হলেও, কিছুটা কাছাকাছি। তাই পা উঁচিয়ে মুখ বরাবর হয়ে বলল, — গত এক দেড় বছর যে অত্যাচার করেছেন। শুধু পড়া লেখার জন্য চুপচাপ হজম করেছি। এখন পড়াও নেই, হজমও নেই।

ফরহাদ এবারো কিছু বলল না, আগের মতোই রইল। তবে মুখের সামনে, এই যে ক্লান্ত, মলিন মুখ। সেই মুখটা ঠিক খেয়াল করলো। খেয়াল করলো, ছেড়ে রাখা আধ ভেজা কোমর ছাড়িয়ে যাওয়া চুল। আরো খেয়াল করলো ঐ যে কানের পাশে বসে থাকা কালো ছোট একটা তিল। যা গত দেড় বছরে ফরহাদ একবারও খেয়াল করেছে কি না সন্দেহ।

—-

নামাজের পরে’ই আলাউদ্দিনের নামে দোয়া পড়ানো হলো। আত্মীয় স্বজন কেউ নেই, জয়তুন’ই সখার দুঃখে কিছুক্ষণ বিভোর হয়ে রইল। মোনাজাতে হাত তুলে চোখের পানি ফেললো। আর তারপরেই খাওয়া দাওয়ার পর্ব শুরু হলো।

আয়না নিচতলার এক রুম থেকে বসে বসে সেই শুরুটা দেখলো। প্যান্ডেল করা, উপর থেকে দেখা যায় না। তাই এই রুমেই এসে বসেছে। নিচের রুমগুলো থেকে পুরো উঠোন দেখা যায়। তাই সে চুপচাপই বসে দেখলো।

দেখতে দেখতে পরিচিত কত মানুষের মুখ দেখলো। এই মুখের মাঝে খুঁজে ফিরলো কয়েকটা মানুষের পরিচিত মুখ। অথচ এত মানুষ এলো গেলো, তাদের দেখা গেলো না। যাওয়ার কথাও না। হয়তো দাওয়াতই দেয়নি। আর সেটা ভাবতেই আয়নার গলা চেপে কান্না দলা পাকিয়ে এলো।

সেই দলা পাকানো কান্না নিয়েই আয়না তাকিয়ে রইল। যেই পর্যন্ত মানুষ আসে যায়, সেই পর্যন্তই ঐ যে লোহার তৈরি সদর দরজা, সেখানেই তাকিয়ে রইলো। তবে যেই মুখ খুঁজে ফিরলো, তাদের দেখা গেলো না।

তখনই আম্বিয়া এসে কিছুটা ঝাঁজের সাথে বললো, — কয় দিকে আমি যাই বলতো! বীনাকে একটু তৈরি করাতেও তো পারো! ঐ মেয়েও ঢের, কিচ্ছু করবে না, মানে কিচ্ছু করবেনা। এখনো বাড়ির জামা গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঐ বাড়ির মানুষ এলো বলে। সব যন্ত্রনা আমার ঘাড়েই কেন থাকে?

আয়না নিজেকে সামলে ঘুরে তাকালো। তাকিয়ে অবশ্য অবাক হলো না। সকাল থেকেই কোনো কারণে আম্বিয়াবুর মেজাজ খারাপ। আর কেন খারাপ, আয়না মনে হয় বুঝতে পারছে। আর পারছে বলেই কোনো টুঁ শব্দ করলো না। আম্বিয়াবুর মুখের দিকে শান্ত ভাবেই একবার তাকালো, তাকিয়ে বেরিয়ে এলো।

আসতেই শাহবাজের মুখোমুখি হলো। কুটুম বাড়ির জন্য খাবার দাবার আলাদা করে ভেতরে আনছে। নেয়ে ঘেমে একাকার। আয়না এগিয়ে গেলো। দাঁড়ালো শাহবাজের সামনে।

শাহবাজ ভ্রু নাচিয়ে বলল,– ব্যাপার কি? ডেকে ডেকে খুঁজে পাওয়া যায় না। এখন না চাইতেই সামনে।

আয়না কিছু বলল না, তবে শাহবাজকে অবাক করে আঁচল উঠিয়ে মুখের গলার ঘাম মুছে দিলো। শাহবাজের কোন প্রতিক্রিয়া হলো না। শান্ত চোখেই এই অপরুপ সুন্দর মুখটার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল,– কি হয়েছে?

— কিছু না।

— আমি বলে ছিলাম, আমার সাথে নাটক করবি না।

— আমি যাই করি, নাটক মনে হয় কেন আপনার?

শাহবাজ উত্তর দিলো না। তবে তার চোয়াল ঠিক শক্ত হলো। অনুষ্ঠান বাড়ি না হলে এতোক্ষণে মনে হয় ধুম- ধারাক্কা শুরু হয়ে যেতো। আয়নাও আর দাঁড়ালো না। বীণার রুমে গেলো। বীণার অবস্থা তার চেয়েও খারাপ। চোখ মুখ শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে আছে। আয়না মলিন ভাবে হাসলো, হেসে বলল, — চিন্তা করো না। দেখো, সব ঠিক হবে।

বীণা আয়নার হাত ঝাপটে ধরলো! ধরে বলল, — সত্যিই?

— হুম সত্যিই।

আবদুল আজিজ সারেং বাড়িতে এসেছে বলতে গেলে একটু দেরিতে। ততক্ষণে দোয়া, গ্রামের মানুষের খাবারের ঝামেলাটা শেষ। পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন। এক তো বিয়ের কথা বার্তা হবে, আর দ্বিতীয়ত তার বড় বউয়ের আবার একটু ফ্যাকড়া বেশি। এক ওয়াক্ত খাওয়ার জন্য সে ভিড় ঠেলবে না। তাই ইচ্ছে করেই দেরিতে আসা। দেরিতে এলেও জয়তুন আপ্যায়নে কমতি রাখলেন না। তাদের সব ব্যবস্থা করা হয়েছে ভেতরে। ভেতরে ফ্যানের নিচে আরামে আয়াশে আপ্যায়ন করলো। দুই ভাই, চাচা মিলে খেদমত নিজ হাতেই করলেন। হাজার হলেও তাদের বাড়ির একমাত্র মেয়ের শ্বশুর বাড়ি। কোন দিকে কমতি যেন না হয়। হলোও না, আপ্যায়নে সারেং বাড়ির বদনাম নেই। বরং ফাতিমা থেকে শুরু করে সবাই খুশিই হলো। এজন্যই বলে আত্মীয় সমানে সমানে না হলে ঠিক জমে না। বড়টাও আছে। তবে শহুরে, শহুরে বেয়াই বাড়ির সাথে তাদের মনের মতো মিলমেশ হয় না।

খাবারের পর জাফর এগিয়ে আজিজের পাশে বসলো। হাতটা আলতো করে ধরে কোমল সুরে বলল, — একটা আবদার করবো ভাইজান। আমাদের বাড়ির সন্তান আমার কাছে প্রথম কিছু চেয়েছে। মেয়েটা তোমার ঘরে দিচ্ছি, তার শখ-আহ্লাদও সব তোমার হাতে দিতে চাই। যদি অভয় দাও আবদার টা রাখতে চাই।

আজিজ কিছুই বুঝতে পারলো না, তবে জাফর তার খুব প্রিয়। তাই তো নিজের হাতটা জাফরের হাতের উপর রাখলো। রেখে ভরসা দিলো।

জাফর হেসে বলল, — আমার মেয়েটার খুব শখ ভাইজান, সে লেখাপড়া করবে। আমি জানি এমন কিছু বলে জবান দেওয়া হয়নি। তবুও অন্য কেউ হলে এই দূর্সাহস করতাম না।

আজিজের মুখে অন্ধকার ছেঁয়েছে, জাফর দেখলো। গাঁও গ্রামে বউয়ের পড়া লেখা মানা সহজ কথা না। জাফর আবার কিছু বলবে তবে তাকে অবাক করে এরশাদ এগিয়ে এলো। বসলো তাদের সামনে। বসে তার স্বভাব মতো সম্মানের সাথে বলল, — কোন জোর নেই চাচা। আমরা আপনার সব সিন্ধান্ত’ই সুন্দর ভাবে মেনে নেবো। এটা শুধু একটা আবদার। এই আবদারটা রাখলে, আমার বোনটা খুব খুশি হবে।

আজিজ নিশ্চুপ বসলো। এরশাদ শান্ত চোখেই দেখলো। দেখে আগের মতোই বলল, — আপনি’ই বলেছিলেন চাচা। আপনার বাড়ি আমার বোনের জন্য নিজেদের বাড়ি’ই। তাই আবদার রাখার সাহস আমরা করেছি। কিছু মনে করবেন না। আমার দাদির জবানে কোন হেরফের হবে না।

আজিজ বড় একটা শ্বাস ফেললো। ফেলে একপলক ছেলের দিকে তাকালো। ছেলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে চোখ ফিরিয়ে বলল,– আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমাদের আবদার রাখলাম। ঘরের মেয়ে। তার সাথে কি আর দুনিয়ার হিসেব মেলে।

জাফর খুশি হলো। জয়তুন সব কিছুই চুপচাপ দেখলো। এত সহজে মানা যেন তার হজম হলো না। অবশ্য বেশি চিন্তা ভাবনার সুযোগ পেলেন না। আজিজ আবার বলল, — আপনাদের আবদার তো রাখলাম। এবার আমাদেরটাও রাখেন। পরীক্ষার তো দেরি নাই। এই মাস খানেক। তাই বিয়ের তারিখটা যদি তাড়াতাড়ি রাখা হয় আমরাও খুশি হবো। তাছাড়া ফরহাদ আছে, পড়ার তো সমস্যা হওয়ার কথা না।

জাফর নিষেধ করতে যাচ্ছিল — মাস খানেকের ব্যাপার, বিয়েটা পরীক্ষার পরেই হোক। তবে জয়তুন নিজের মতোই বললো, — আমাদেরও কোনো সমস্যা নাই। তুমি এতোখান ছাড় দিবার পারলা, আমরা আর ঝামেলা পাকাবো কী নিয়ে।

ব্যস, সামনে জুম্মাবারে দিনক্ষণ ঠিক করা হয়ে গেলো। বীণা রুমে বসে সব শুনলো। শুনে হতবাক হয়ে বসে রইলো। সে খুশি হবে না বেজার, বুঝতে পারছে না। সেই না বোঝার মাঝেই আম্বিয়া এসে ধরে তাকে বসার ঘরে নিয়ে এলো। গায়ে তার মিষ্টি কাতান শাড়ি। সেই শাড়ি আর হতবাকে জড়সড়ো হয়ে আছে। সেই থাকার মাঝেই ফরহাদের ভাবি দুষ্টুমি করে ঝট করে টেনে ফরহাদের পাশে বসিয়ে দিলো। আর দিতে’ই গিয়ে বীণা বলতে গেলো ফরহাদের গায়ের উপরেই পড়লো। আর পড়তেই বীণা শক্ত হয়ে গেলো।

ফরহাদের অবশ্য তেমন ভাবান্তর হলো না। তবে নিজের মতোই একটু সাইড হয়ে বসলো। বসতে বসতে শুধু বললো, — পড়াও নেই, হজমও নেই। না?

বীণা উত্তর দিলো না। আসলে সে ধরেই নিয়েছিল কেউ রাজি হবে না। কিভাবে হলো?

সেই হওয়ার মাঝেই আয়না শেষ পাতে পায়েস নিয়ে এলো। সবাইকে সুন্দর করে গুছিয়ে এগিয়ে দিলো। আজিজ বসেছে একটু সাইডে। তার সামনে যেতেই আজিজ হাসলো! হেসে কোমল সুরে বলল, — ভালো আছিস রে মা?

আয়না হেসে মাথা কাত করল। করেই বলল, — ভালো, আপনি ভালো আছেন চাচা ?

— আল্লাহর রহমতে ভালো! তো সব ঠিক?

আয়না আবারও মাথা কাত করলো। করে পায়েসের বাটিটা হাতে তুলে এগিয়ে বলল, — পায়েস নিন চাচা।

আজিজ হাত বাড়িয়ে নিলো। নিতেই ভ্রু কুঁচকে আয়নার মুখের দিকে তাকালো। কেননা বাটির নিচে একটা ভাঁজ করা কাগজ।

আয়না স্বাভাবিক ভাবেই আজিজের সামনের ছোট্ট টেবিল থেকে শরবতের খালি গ্লাসগুলো নেওয়ার জন্য নিচু হলো। হতেই বলল, — আপনি বিয়ের আগে বলেছিলেন না চাচা, শক্তিশালী শত্রুর সাথে জয় হচ্ছে টিকে থাকা। এই যে দেখেন, আমি টিকে আছি। এখন শুধু ভেতর থেকে ছেদ করার পালা।

আজিজ কোন প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সাইডে বসা জাফরের দিকে একপলক তাকালো। তার বড় ছেলের সাথে কথা বলছে। এই দিকে ধ্যান নেই। তাই নিজের মতো যত্ন করে পায়েসের বাটি হাতের তালুতে রাখতে রাখতে বলল, — তোর বিশ্বাস নেই রে। কখন আবার পাল্টি মারিস।

— এবার মারবো না।

আজিজ হাসলো! হেসে সবার চোখের আড়ালে কাগজটা পাঞ্জাবির পকেটে রাখলো। রেখে পায়েস মুখে দিলো। আর আয়না গ্লাস গুলো নিয়ে নিজের মতো চলে গেলো।

গল্প কথায় কখন যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, বোঝা গেলো না। আজিজ তাড়া দিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিলো। বিদায় নেওয়ার আগে ছোট ছেলের বউয়ের হাতে ফাতিমা মোটা সোনার বালা পড়ালো। পড়িয়ে সবাই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলো।

আজিজ অবশ্য বাড়িতে গেলেন না। তিনি তার পাটের আড়তের সামনে এসে ভ্যান থেকে নেমে গেলেন। নেমে পকেট থেকে কাগজটা বের করলেন। যেখানে আয়নার ভাঙা ভাঙা হাতে বাড়ির সব ঘটনা লেখা। আর তার সাথে লেখা। পৃথিলা আপাকে ঢাকায় পৌঁচ্ছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। যতো তাড়াতাড়ি পারেন। তার জীবন সংকটে।

আজিজ হাসলো! হো হো করা হাসি। হেসে চিঠিটা টুকরো টুকরো করে বাতাসে মিলিয়ে দিলো। দিয়ে বললো, — তুই আমার হারিয়ে যাওয়া সুযোগ রে আয়না। বড় মহা মূল্যবান সুযোগ।

আজিজ যেমন আয়নার চিঠি হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো, তেমনি শাহবাজের চিঠির দিকে পৃথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। এত বাজে লেখা সে তার ইহজীবনে দেখেনি। তাই অনেক কষ্টে পড়ার চেষ্টা করলো। যেখানে লেখা, ” আমি আপনাকে ঢাকায় পৌঁছে দেবো। অবশ্য এখন না, সুযোগ পেলে। সেই পর্যন্ত এই না খাওয়ার ঢং বন্ধ করেন। যতো ঢং করবেন, বিপদ ততো বাড়বে। তাই স্বাভাবিক থাকেন। তাছাড়া পালানোর জন্য শক্তি দরকার। আমি তো আর কোলে করে ঢাকায় নিয়ে যাবো না। একজনের কোলে উঠেই তো ঘণ্টা বাজিয়ে ফেলেছেন। তাই আমার ঘন্টা সহিসালামত’ই থাকুক। আর হ্যাঁ, এই চিঠি চুপচাপ হজম, এমনকি ইমরান, সাবিহাও না। যদি এই জেল থেকে মুক্তি চান, এই শাহবাজ ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নাই। তাই যা বলি চুপচাপ তাই করেন। ”

পৃথিলা চিঠির দিকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে রইলো। তার কেন জানি মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই, কি ঠিক নেই? আর হঠাৎ করে তার প্রতি এতো সদয় হওয়ার কারণ কি?

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here