#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৩৯
টিফিনের ঘন্টা পেরুতেই ফরহাদ ক্লাস থেকে বেরুলো। চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। এই মেঘ বৃষ্টির দিনে কাদা পানি মাড়িয়ে স্কুলে আসা বিরক্তির কাজ’ই বটে। তার মধ্যে ছেলে মেয়েরা নামমাত্র এসেছে। এই নামমাত্র কয়জন ছেলে মেয়ে নিয়ে বসে থাকাও আরেক বিরক্তি। তাই সে তার বিরক্তির মেজাজ নিয়েই টিচার্স রুমে আসলো। আসতেই দেখলো এরশাদ বসে আছে।
তাকে দেখে ফরহাদ আবাক হলো না। সে জানতো এরশাদ আসবে। তার কাজ সব গোছানো। একটা মেয়ে চাকরিতে জয়েন করে ফট করে আসা বন্ধ করা স্বাভাবিক না। হেড স্যারেরা খোঁজ অন্তত করবে। অবশ্য সে বলেছে অসুস্থ, তবুও এখন মনে হয় না আর চাকরি করতে পারবে। এরশাদ সে ভাবেই এগুবে।
ফরহাদ এখানে আর কথা বাড়ালো না। তার ড্রয়ার থেকে কয়েকটা সিট বের করে হাতে নিয়ে বলল,– আয় চা খেয়ে আসি।
এরশাদ বিনা শব্দেই উঠল। স্কুল থেকে বেরিয়ে একটু দূরে চায়ের দোকান। সেখানে যেতে যেতে ফরহাদ হাতের সিটগুলো এরশাদকে এগিয়ে দিলো।
এরশাদ স্বাভাবিক ভাবে নিলো। নিয়ে চোখ বুলালো। টেস্ট পরীক্ষার সাজেশন। স্কুল থেকে হয়ত দিয়েছে। বীণা তো স্কুলে আসছে না। হেড স্যারও জিজ্ঞেস করলেন। এরশাদ সব বুঝিয়ে বলল। হেড স্যারের অবশ্য কিছুটা মনঃক্ষুন্ন হয়েছে। তবে লেখাপড়া কথা শুনে খুশি হলো। গ্রামের ছেলে মেয়েদের গ্রামের ছেলে মেয়েদের মাঝেই বিয়ে হয়। ফরহাদ, বীণার বিয়ের কথা শুনে তেমন প্রতিক্রিয়া হলো না। তাছাড়া গ্রামের দুই’ প্রভাবশালীর ছেলে মেয়ের বিয়ে। কি’ই বা বলার আছে।
এরশাদ সাজেশন মোড়াতে মোড়াতে বলল,– আমার বোন ভালো থাকবে তো ফরহাদ?
ফরহাদও তার মতো বলল, — তোর বোন ভালো থাকবে কি না, সেটা আমাকে জিজ্ঞেস করছিন কেন ? তাছাড়া বোনের ভালো চাইতে তো দেখলাম না। কি এক ঘোড়ার ডিম বিয়ের প্রস্তাব গেছে। পুরো গোষ্ঠী উঠে পড়ে লেগে গেছে বিয়ে দিতে।
এরশাদ হাসলো! হেসে বলল,– ঘোড়াটা না চিনলেও ডিমের উপরে ভরসা আছে।
— ডিমের চেয়ে ঘোড়া ভালো। দেখলি না চট করে পড়ালেখার জন্য রাজি হয়ে গেলো। আমি হলে কখনও হতাম না।
— কেন?
— প্রথমটাও বিদ্যাসাগরী ছিল। আলা ভোলা। বই ছাড়া ডান বান চিনে না। ওমা প্রেমের এক বছর পর দেখি আরেকজনের সাথে লটরপটর।
এরশাদ আগের মতোই হাসলো! হেসে বলল,– আমার বোন ওমন না।
— ওই মেয়ের ভাইও সেই কথাই বলতো।
— তুই জানিস?
— আমি সব জানি।
— ভালো।
— ভালো তো অবশ্যই। তবে নিজের বোনের এতো চিন্তা, পরের মেয়ের চিন্তা কই?
— ওর ব্যাপারে কথা থাক।
— কেন?
এরশাদ উত্তর দিলো না। চায়ের দোকান এসেছে। তারা ভেতরে গেলো না। ইশারায় দু- কাপ দেখালো। দেখিয়ে একটু দূরে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে এরশাদ সিগারেট ধরালো। ধরিয়ে বলল,– কোন কিছুর বিনিময়ে আমি ওকে ছাড়বো না।
— আমি ছাড়তে বলছি না। তবে যেটা করছিস সেটা অন্যায়। এভাবে সংসার হয় না। তাছাড়া সে কোন অবুঝ মেয়ে না, জোর করে বিয়ে করে আদর সোহাগ দিলেই ভুলে যাবে। বরং ঘৃণার চাদর বাড়বে। বাড়তে বাড়তে কোন অঘটন ঘটাবে।
— সে আমাকে এমনিতে’ই ঘৃণা করে। নতুন করে কিছু করার নেই।
— তাহলে?
— আগেই তো বললাম, আমি তাকে ছাড়ছি না।
— এতো পাগল হলি কেন? রস কষ বিহীন একটা মেয়ে। কথায় কথায় জ্ঞান। জীবন তেজপাতা করে ফেলবে বলে দিলাম।
— দিক।
ফরহাদ হাল ছেড়ে বলল,– তাহলে আপাতত বিয়েটা বাদ রাখ।
— কেন?
— তালাক হয়েছে কতোদিন? গুনে দেখেছিস?
এরশাদ হো হো করে হাসলো! যার জীবন আছে পাপে ডুবে, সে ঠিক বেঠিক গুণে দেখবে। সে হেসেই সিগারেট টা পায়ে পিষল। চা এসেছে, স্বাভাবিক ভাবে হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিলো।
জয়তুন আরার রাতের খাবার আজকেও আয়না নিয়ে এলো। রাতের খাবার বেশি ভাগ সময় তিনি নিজের রুমেই খান। খাওয়ার সময় আগে, ঘুমিয়ে যান ও আগে। তাই আর বের হন না। তবে সবাই বাড়িতে থাকলে আলাদা কথা। তখন তিনি খাবার না খেলেও খাবার ঘরের দরজায় বসেন। কিন্তু সেই সময় আজকাল হয় না বললেই চলে। যে যার মতো আসে,যায়। অবশ্য নাতি দের কখনও তিনি ঘরে বেঁধে রাখার চেষ্টাও করে নি। বরং সিংহের মতো তৈরি করেছেন। ছেলে মানুষ ঘরকোণে হবে কেন? আলতাফ ছিল ম্যানমেনা, তার রক্ত। যাবে কোথায়? জাফরও ম্যানমেনা। তবে জসিম, সে যেমন ছিল, তার রক্তও তেমন।
জয়তুন নিজের মতোই ধীরে ধীরে উঠল। আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পর থেকে একা হাঁটতে চলতে সমস্যা হচ্ছে। শরীর কাঁপে! তবুও নিজের মতোই উঠল। আম্বিয়া হলে নিজে থেকেই ধরতো। জ্ঞান হয়েছে পর থেকে এই বাড়িতে, সবার হাবভাব বুঝে। তবে এই মেয়ে এখনোও তেমন ভাবে কিছু বুঝে না। সব সময় কোন এক আতঙ্কে আছে। আতঙ্ক লুকিয়ে রাখবে তাও না। চোখে মুখে স্পষ্ট নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অবশ্য তার নাতি’ই এমন। তাইতো লোকে বলে, যা হয় ভালোর জন্যই হয়। তার এই মাথা গরম নাতির জন্য এমন ঠান্ডা মেয়ের’ই দরকার ছিল। সাত চড় পড়বে, তবুও রা করবে না। এই যে কি সুন্দর মানিয়ে নিচ্ছে।
জয়তুন উঠে চেয়ারে বসলো। আয়না সব গুছিয়ে এগিয়ে দিলো। জয়তুন সব চুপচাপ দেখলো। তবে আজকেও কিছু বলল না। আম্বিয়া কোন শোকে কাতর, সে জানে। সব কয়টা বড় হলো তো চোখের সামনে। কার কোন দিকে নজর, এইটুকু বোঝে।
আম্বিয়া কাজের লোকের মেয়ে হলেও এখন সারেং বাড়ির সদস্যর মতো। খুবই ভালো মেয়ে এতে সন্দেহ নেই। তবুও সদস্য হোক আর যাই হোক, ভালো হোক বা খারাপ। বাপ পরিচয়হীন মেয়েকে স্নেহ করা যায়, বাড়ির সব দায়িত্ব দেওয়া যায়, তবে নাতি পুতির বউ করা যায় না। বউ দিয়ে বংশ এগোয়। আর বংশে রক্তে দূষিত রক্ত? ছ্যাঁ! জয়তুন মরে গেলেও হবে না।
কেননা জয়তুন সব সহ্য করতে পারে, তবে রক্তের ছিনিমিনি মানতে পারে না। তাই তো জসিমকে সে পালক এনেছে দেখে শুনে। হ্যাঁ গরীর ছিল তবে দূষিত রক্ত না। তাই চোখ মুখ কিছুটা বিকৃত করেই খাবার টেনে নিল। আম্বিয়ার বাড়াবাড়ি ভালো লাগছে না। অযথা, এরশাদ শুনলে লাথি মেরে ঘর থেকে বের করবে। তাই তিনি চুপ আছেন। আম্বিয়া এমনিতে যাই থাক, তবে সে আছে বলেই সারেং বাড়ির সঠিক নিয়মে চলছে।
সাদা ভাত, হালকা মসলায় পেঁপে আলুর ঝোল। তাতে কালোজিরার ফোড়ন। মাছ আলাদা ভাজা। জয়তুন মাছ নিলেন না, শুধু ঝোল পাতে নিলেন। মসলাদার খাবার এখন আর পেটে সয় না। খাবারদাবারও কমে গেছে অনেক। সময় যে কমে আসছে, সব কিছুই তা জানান দিচ্ছে অনায়াসেই।
জয়তুন খেতে খেতেই বলল, — দুপুরের পর থেকে নিচের এই কোণায় ঐ কোণায় শুধু ঝিমুতে দেখলাম। ব্যাপার কী?
আয়না ঢোক গিলল। সাধে কি আর এখানে ওখানে ঝিমাইছে। দিনটা গেলো তার লুকিয়ে লুকিয়ে। যতক্ষণ শাহবাজ বাড়িতে ছিল, সে আর সামনে তো ভালোই ডান, বাম আশে পাশেও নেই। তখন ছাদে হাত ছাড়তে দেরি, আয়নার সোজা নিচে নামতে দেরি হয়নি। সোজা নিচে নেমে গিয়ে গোসলখানায় ঢুকে পড়েছে। ঢুকেই প্রথম চিঠিটা পানিতে গুলিয়ে, ফেলে দিয়েছে। তারপর গোসলটাও একেবারে সেরে ফেলেছে, যেন আর কিছুই অবশিষ্ট না থাকে। গোসল করে রুমে তো ভালোই, উপরেই আর যায়নি।
তার গোসল হতে হতে এদিকে শাহবাজের খাওয়া টাওয়া শেষ। খেয়ে রুমে কী করেছে কে জানে, তবে অনেকক্ষণ আর নিচে আসেনি। সেও আর উপরে যায়নি। ব্যস, বিকেলে নিজের মতো বেরিয়ে গেছে। যেতেই সে হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। তবে রাত নিয়ে বহুত চিন্তায় আছে। এই চিঠি প্যাঁচ এত সহজে হজম করবে বলে মনে হয় না।
তখনই ফট করে কারেন্ট চলে গেল। জয়তুন কারেন্টের লোকদের ইচ্ছেমতো তুলোধোনা করল। বৃষ্টি কমেছে, তবে আকাশ পরিষ্কার হয়নি। এই থামছে, এই আবার গুঁড়িগুঁড়ি একটু হচ্ছে। আর এই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে কারেন্টও নাটক শুরু করেছে। আসছে আর যাচ্ছে।
জয়তুনের বিরবির করতে করতেই আম্বিয়া হারিকেন নিয়ে এলো। রেখে নিজের মতো চলে গেল। সে যেতেই শাহবাজ উঁকি দিল। জয়তুন দেখলো, দেখলো আয়নাও। আর দেখেই ভূত দেখার মতো আঁতকে উঠল। জয়তুন বিরক্ত মাখা কণ্ঠে বলল, — কী হইছে তোমার?
আয়না সাথে সাথে দু’পাশে মাথা নাড়ল। জয়তুন দেখে শাহবাজের দিকে ফিরে বলল, এমন ভূতের মতো ঘুরে বেড়াইতাছোস ক্যা?
শাহবাজ ভেতরে এসে দাদির খাটে পটাং হয়ে শুয়ে পড়ল। ছোট হারিকেন। জয়তুন আরার আশপাশ ছাড়া, ঘরে আধো আলো আধো অন্ধকার। সেই অন্ধকারে শাহবাজ দৃষ্টি এক জায়গায়। আরে সেখানে রেখেই বলল, — ঘাড় মটকানোর ইচ্ছা। তবে ঘাড় পাচ্ছি না।
আয়না শুনে সাথে সাথে একটু চেপে জয়তুনের সাইডে এলো। আল্লাহ, আজ এত তাড়াতাড়ি কেন? এমনিতে তো অর্ধেক রাত ছাড়া বাড়ি ফেড়ে না। আয়নার আবার মাথা ঘুরতে লাগলো। সে অবশ্য জানে না, তার সব কিছু’ই আরেকজন ঠোঁটে সেই চিরচেনা হাসি নিয়ে দেখছে।
জয়তুন খাওয়ায় আবার মনোযোগ দিল। শাহবাজ নড়েচড়ে শুতে শুতে বলল , — চেয়ারম্যান চাচার সাথে ভাইয়ের গণ্ডগোল হয়েছে।
জয়তুনের হাত থেমে গেল। থেমে শাহবাজের দিকে তাকাল। তাকাতেই শাহবাজ বলল, — ইটের ভাটার সাইডে নদীর পাড়ের জায়গা, সেগুলো নিয়ে।
জায়গা যে চেয়ারম্যান চাচ্ছে সে জানে। ইমরান আরো আগেই তাকে বলেছে। তাই ভ্রু কুঁচকেই বলল — কেমন ঝামেলা?
— ভাইকে তো জানোই। বেয়াদবি, চিল্লাচিল্লি, রাগারাগিতে সে নাই। তবে চেয়ারম্যান চাচা খুব হ্যাঁকড্যাঁক করেছে। ভাইকে হুমকিও দিয়েছে।
জয়তুন হাসল! হেসে বলল, — এরশাদ কী বলছে?
— কিছুই না। সব সময় যা করে। হেসেছে।
জয়তুন আরা নিজেও হাসলেন। হেসে আবার খাওয়া শুরু করলেন। করতে করতে বললেন, — ছেলেটারে কেউ শান্তিতে থাকতে দেয় না। এক কালমুখি এসে মাথাডারে খাইতেছে, আরেকজন এখন বিগড়াইতে চাইছে। তার মধ্যে আবার বাড়িতে বিয়া! শোন, আমি আগেই কইলাম, আমার একমাত্র নাতনির বিয়া। বিয়ায় যদি কোনো কমতি থাকে, মাথার চুল তোগো একটা ও রাখবো না।
শাহবাজ হাসল! হেসে আবার আয়নার দিকে তাকালো। তাকিয়ে বলল, — আজকে বাড়িতে কেউ এসেছিল, দাদি?
জয়তুনের খাওয়া শেষ। হাত ধুতে ধুতে বললেন, — কে আইবো?
— সেটাই তো জানতে চাই।
— ফাউ কথা বাদ দে। জুম্মাবার আইলো বলে। ও নয়া বউ, বীণার রুম থেকে কাগজ কলম আনতো। কী কী করতে হবে, গোছগাছ করে ফেলি।
বলতে দেরি, আয়নার হড়বড় করে বেরুতে দেরি হলো না। শাহবাজ সেই বেরিয়ে যাওয়া দেখলো, দেখে বলল, — বিয়ের সব দায়িত্ব ভাইয়ের ঘাড়ে ফেলো দাদি।
— সেটা তো এমনিতেও সব সময় তার ঘাড়ে’ই থাকে।
— না, সেই থাকা না। এমন ভাবে ফেলো, বাড়ির দক্ষিন কোণের কথা কিছু সময়ের জন্য মাথা থেকে বেরিয়ে যায়।
জয়তুন এবার বুঝলো। বুঝে হাসলো। হেসে পা ছড়িয়ে বসলো। তখনি নিস্তব্ধ সারেং বাড়ি ঝনঝন শব্দে কেঁপে উঠল।
আর এই কেঁপে উঠার কারণ, আয়নামতি। অন্ধকারে হড়বড় করে বেরিয়েছে। আম্বিয়া আসছিল সামনে থেকে। দু’হাতে কালকের থালাবাটি নিয়ে। সব এলোপাথাড়ি হয়ে আছে। সে না গুছিয়ে রাখলে তো কেউ হাতও দেবে না।
তখনি এমন এক ধাক্কা লাগল, আম্বিয়ার হাত থেকে সব ফসকে পড়ল। কাচের গুলো ভাঙলো। স্টিলের গুলোর ঝংকারে সারেং বাড়ির রাত ঝনঝন করে উঠল।
আম্বিয়ার মেজাজ এমনিতেই খারাপ, তার মধ্যে আরও বাড়ল। তাই ঝাঁজের সাথে বলল, — চোখের মাথা খাইছো? কাজকাম তো একটাও করতে দেখিনা, অকাজের বেলা উইড়া চলো!
আয়না মুখ অন্ধকার করে ফেলল। আম্বিয়ার মেজাজ কমলো না। বরং বাড়লো। কথায় আছে না ঝামেলা যখন লাগে সব দিক দিয়েই লাগে। তাই আগের চেয়ে আরো বেশি ঝাঁজের সাথে বলল, — আবার খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো ক্যা? মুখ দিয়া একটা শব্দ না বললে তো, এখানের কোটা ওখানেও নাড়াতে দেখি না। ঝট করে ধরবে তাও না।
শাহবাজ এসে দরজার মাঝামাঝি দাঁড়ালো। দু’ হাত দরজার দু’পাশে। দু’পাশে রেখেই ঘাড় কাত করে আয়নার দিকে তাকালো। ভয়ে মুখ এতোটুকু হয়ে গেছে। সে ঘাড় কাত করেই আম্বিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, — কি হইছে?
আম্বিয়া আগের মতোই বলল,– কি হইছে দেখতাছোস না?
— দেখলাম। অন্ধকার, হতেই পারে। এভাবে চেঁচাচ্ছো কেন? আমার বাপ দাদার টাকার প্লেট গ্লাস গেছে। তোমার এতো জ্বলছে কেন?
আম্বিয়া আগের তেজ নিয়েই বলল — শাহবাজ..
— কি শাহবাজ? দেখো আম্বিয়াবু, একটা কথা সোজা বলি। ঐ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মন বাঁচিয়ে কথা আমার হয় না। ভুল করছে, করতেই পারে। বয়স কত? তাই ভালো করে বলো। তা না হলে আমার বদ হজম হবে। পরে কি থেকে কি করবো। পরে দোষ দিতে পারবে না। হাজার হলেও শাহবাজের বউ। ভুলে যাও কেন?
আয়না অবাক হয়ে তাকালো! তাকালো আম্বিয়াও।
তাদের তাকানো দেখে শাহবাজ তার মতোই বলল — এতো তাকাতাকি করে তো লাভ নাই। পুরো এক গ্রাম মানুষের সামনে কবুল বলে বিয়ে করছি। তাই এর পর থেকে একটু সামলে।
আয়না এই ভূতের মুখে মিষ্টি কথায় ভুললো না। বরং ভাবতে লাগলো, কাহিনী কি? আম্বিয়া অবাক অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। জানা কথা, একদিন তো এই দিন আসতোই। যে বুকে শোয়, তার জন্য দুনিয়া ক্ষয়। আরেকজন তো না শোয়ায়েই দুনিয়া ক্ষয় করে ফেলছে।
তাদের এতো ভাবাভাবির মধ্যে শাহবাজ নিজের মতো চলে গেলো। জয়তুন এসেছে ধীরে ধীরে। দরজায় হাত রেখে চোখ মুখ কুঁচকে আম্বিয়ার দিকে তাকালো। এই কয়দিন চুপ থাকলেও আজকে আর থাকলেন না। তার তেজের সাথেই বললেন, — মেজাজে লাগাম লাগা আম্বিয়া। নিজের অবস্থান ভুললে চলবে না। সংসার সামলালেই কর্ত্রী হওয়া যায় না।
আম্বিয়া ধাক্কার মতো খেলো। সবাই সবকিছু বললেও জয়তুন আরা তাকে সোজা এমন কথা বলতে পারে, তার ধারণা ছিল না। তাই সেও বাঁকি থাকবে কেন? আগুন চোখে তাকাল। জয়তুন সেই চোখের দিকেই তাকিয়ে বললেন, — মানুষ তার অবস্থা ভুলে গেলেই সব হারায়। তাই অবস্থান শক্ত রাখ। আবেগে ভাসলে সব হারাবি।
আম্বিয়া হাসল! তাচ্ছিল্যের হাসি। হেসে বলল,– হারানোর মতো আমার কিছু নাই।
— সেই দায় তো আমাগো না। নিজের নাতনির মতো ভালো ঘর, ভালো ছেলে দেখছি। সেটা তো মনে ধরে নাই।
— হাহ্! নিজের নাতনি। নিজের নাতনি মনে করলে আজ এই দশা দেখতে হতো না।
— কি দেখছোস তুই? মায়ের মতো পেট বাজিয়ে ঘাটে ঘাটে লাথি গুতা খাইতি। তখন বুঝতি দুনিয়া কি? এই জয়তুন যদি না থাকতো, এই দুনিয়ার মুখও দেখতি না।
— সেটা তোমরাও দেখতে না, সেই দিন যদি আম্বিয়া সঠিক সময়ে উপরে না গিয়ে বলতো। এতো নাতি নাতির বড়াই সব ছুটতো।
জয়তুন চেঁচিয়ে উঠল! উঠে বলল, — আম্বিয়া… জিভ তোর টাইনা ছিড়া ফেলামু আমি। আমার মুখে মুখে কথা? আমি এখনোও দুনিয়া দেখতাছি আমার এরশাদের জন্য। আর কারো জন্য না।
আম্বিয়ার চোখে পানি চলে এলো। তবে আর কিছুই বলল না। হনহনিয়ে নিজের রুমের দিকে গেলো। আয়নার এতো খারাপ লাগল। সব দোষ তার। তার জন্যই তার এতো কথা শুনলো।
আম্বিয়া যেতেই জয়তুন আয়নার দিকে আগুন চোখে তাকালো। আয়না ঢোক গিললো। জয়তুন দাঁতে দাঁত চেপে বলল,– অর্কমার ঢেকি। কাজের কাম কিছু’ই আসে না। অকাজ করতে ওস্তাদ বলেই নিজের মতো চলে গেলো।
আয়না কি করবে দিশে পেলো না। তবে মন খারাপ করে সব উঠালো। ভাঙা কাচ ফেললো। ফেলে সুন্দর করে লেবু চিপড়ে একগ্লাস শরবত বানালো। বানিয়ে আম্বিয়াবুর রুমের দিকে গেলো। আজিজ চাচা চিঠিতে বলেছে, আম্বিয়াবুর সাথে ভাব জমাতে। বাইরে থেকে কারো ভেতরে যাওয়া সম্ভব না। তবে কেউ যদি একবার পৃথিলা আপাকে সারেং বাড়ির প্রাচীর থেকে বের করে দেয়। বাকি সব সে সামলে নেবে। আর সেটা নাকি এখন একমাত্র আম্বিয়াবু’ই করতে পারবে। চিঠিতে সে আম্বিয়াবুর মন খরাপের কথাও লিখেছিল। আর দেখো, এদিকে লেগে গেলো আরেক ঝামেলা। একটা কাজও যদি ঠিকঠাক মতো পারে। ধুর!
অবশ্য এই ঝামেলায় একটা দিক ভালো হলো। যার যার রুমে সে সে চলে গেলো। তাই আয়না আম্বিয়ার রুমে বেশ কিছুক্ষণ থাকলো। না এবার আম্বিয়া রাগ ঝাড়লো না। বরং কেউ তার দুঃখের ভাগ নিতে এসেছে বলে সিক্ত হলো।
তারপর সেখান থেকে বের হয়ে আরামছে বসার ঘরে বসে রইল। বাকি কাজটাজ করলো। আম্বিয়ার জায়গায় এরশাদের জন্য দরজাও খুললো। অবশ্য কথা বলল না। চুপচাপ মুখ ফুলিয়ে অন্য পাশে তাকিয়ে রইল। তার তাকানো দেখে এরশাদ শুধু একটু হাসলো। হেসে যেতে যেতে বলল,– ভাসুরের পছন্দ, পছন্দ হয়নি বুঝি?
আয়না উত্তর দেয় নি। মুখ ফুলিয়ে দরজা লাগালো। অসুরের সাথে হুরপরী! কখনও যায়? তাই লাগিয়ে একচোট বিরবির করে সারেং বাড়ির আবার গোষ্ঠী উদ্ধার করলো। করে আগের মতো চেয়ারে বসে রইল। বসে বসে ঝিমুতে লাগলো। সেই ঝিমুনের মাঝেই কেউ হাত ধরে এক ঝাঁকি দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফেললো।
আয়নার ঘুম তো ভালো, আজকেও মাগো বলে চিৎকার দিতে যাচ্ছিল। তার আগেই গলার চিৎকার গলায় শেষ। না সেই দিনের মতো ভাত তরকারি মুখে গেলো না। বরং অন্য কিছু। আর এই অন্য কিছুতে আয়না শক্ত হয়ে গেলো।
শাহবাজের হাতের প্লাস্টার হাতেই। তবে গলায় ঝুলানো নেই। তাই ঝাপটে ধরতে কষ্ট হলো না, বরং আরো আট পাট করেই ধরলো। ধরে যেমন ছিল তেমনি রইল। সেই থাকার মাঝেই ফিসফিস করে বলল, — এখানে কি?
আয়না উত্তর দিলো না। দেওয়ার মতো অবস্থা অবশ্য তার নেই ও। কথা বলতে গেলেই ঠোঁট নড়বে। আর নড়লেই। আয়না চোখ বন্ধ করে ফেললো।
শাহবাজ দেখলো! দেখে বলল,– অন্যের জন্য মিথ্যা বলতে গলা কাঁপে না। শুধু আমার সামনেই যতো ঢং।
আয়না ফট করে আবার তাকালো। গোলগোল চোখ করে। শাহবাজ সেই চোখে চোখ রেখে আরো বেপোরোয়া হলো। এতোটাই হলো আয়না তাল সামলাতে পারলো না। পেছনের তার বসা চেয়ারে পা লেগে উল্টে পড়লো। দু’জনে একসাথেই পড়ল। আর পড়তেই আয়না কুঁকিয়ে উঠল। সে ছোট খাটো মানুষ। এই আশি কেজি চালের বস্তার ভার সে নিতে পারে? তবে শাহবাজ হেসে ফেললো।
তখনি আম্বিয়ার ঘরে হাঁটা চলার শব্দ হলো। চেয়ার উল্টো সমানে দু’টো মানুষ ধপাস করে পড়েছে। শুনে নিশ্চয়’ই এগিয়ে আসছে। আয়না দু’হাতে মুখ ঢেকে ফেললো। শাহবাজ আগের মতোই হাসলো! হেসে ঝট করে উঠে গেলো। গিয়ে আগে হারিকেন কমালো, আর তখনি আম্বিয়া ফট করে দরজা খুললো। হারিকেনের মৃদু আলোতে হারিকেনের সামনে শুধু শাহবাজকে’ই দেখলো। দেখতেই তখনের কথা মনে পড়ল। আর পড়তেই ডানে, বামে আর তাকিয়ে দেখলো না, সোজা আবার ফট করে দরজা লাগিয়ে দিলো।
দিতে দেরি আয়নার জান প্রাণ ছেড়ে দৌড় দিতে দেরি হয়নি। এক দৌড়েই সে তাদের রুমে গেলো। গিয়ে দরজায় খিল দিলো। আজকে আর সে মরে গেলেও দরজা খুলবে না। জীবনেও না।
চলবে……

