ধূপছায়া #নূপুর_ইসলাম #পর্ব_৪১

0
2

#ধূপছায়া
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_৪১

পৃথিলাদের ভ্যান একেবারে লাইব্রেরির সামনে এসে থামলো। সামনে মানে একেবারে সামনে। ভ্যান থেকেই দোকানের সিঁড়িতে পা রাখা যায়। একটা দোকানে মেয়েমানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পত্রিকা দেখবে, এমন মনোভাব গ্রামের মানুষের নেই। গ্রামের মহিলারা অতিরিক্ত দরকার ছাড়া সদরে পা মাড়ায় না। কিছু কিছু যদিও দেখা যায় তারা অতি নিম্নবিত্ত। পেটের দায়ে কাজের খোঁজে। এর বাইরে কিছুটা বাঁকা চোখেই তাকায়। তাই সেই বাঁকা নজর থেকে বাঁচানোর জন্যই হয়ত সোজা এই রাস্তা। অথচ পৃথিলা এক দুনিয়া থেকে আরেক দুনিয়ায় এসেছে সম্পূর্ণ একা। এখন তার জন্য এই রাস্তার ব্যবস্থা হাসির’ই বটে।

অবশ্য তার চোখে মুখে হাসির ছিটেফোঁটা ও নেই। সে ভ্যান থেকে নামলো চোখ, মুখ কুঁচকে। নিজের গা থেকেই সিগারেটের গন্ধ আসছে। কেউ সাইড দিয়ে হেঁটে গেলে ভাববে সে নিজেই সিগারেট খেয়েছে। আর সেই গন্ধে তার গা গুলিয়ে আসছে।

এরশাদ ভ্যান থামার সাথে সাথে নেমেছে। সব সময় দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালেও, এখন দাঁড়ালো পাশাপাশি। দাঁড়িয়ে সব সময়ের মতো সুন্দর মার্জিত স্বরে বলল, — আপনি ঠিক আছেন?

পৃথিলা ঠান্ডা ধরনের মানুষ। কাউকে আঘাত বা আক্রমণাত্মক মনোভাব কখনো হয় না। তবে আজ কেন জানি এই লোকটাকে ঠাটিয়ে একটা চড় লাগাতে ইচ্ছে হলো। এ জন্যই হয়ত বলে সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে। এমন পরিবেশে এমন মানুষদের মাঝে আটকে আছে। না চাইতেও স্বভাবে পরিবর্তন আসছে। তাই কোন উত্তর দিলো না। আস্তে করে শুধু একটু সরে দাঁড়ালো। তার চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তি।

এরশাদ দেখলো! দেখে ভ্যানওয়ালাকে বলল, — এক বোতল পানি নিয়ে আয়।

এই ভ্যানওয়ালা সেই ভ্যানওয়ালা। তাই বলতে দেরি দৌড়ে যেতে দেরি হয়নি। যেতেই এরশাদ আস্তে করে বলল, — বাড়তি কিছু করার চেষ্টা করবেন না। যদি মনে করে থাকেন, এতো মানুষ দৌড়ে গিয়ে সাহায্য চাইবেন, আর তারা আপনার কথা শুনেই সারেং বাড়ির কারো উপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে, সেটা একদম ভুল। তাই যা করতে এসেছেন, শুধু সেইটুকুই করুন। বিশ্বাস করুন এতে আপনার’ই ভালো।

— হ্যাঁ, কতো ভালো তা তো দেখতেই পাচ্ছি।

— না, পাচ্ছেন না। তাই মনে করুন অনুরোধ করছি। যেভাবে আছেন সেভাবেই থাকুন পৃথিলা।

— কেন, ভয় পাচ্ছেন?

এরশাদ হাসল! হেসে বলল, — অতি বুদ্ধিমতিদের ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।

— না, আপনি ভয় পান নিজেকে। আপনি কখনো আয়না দেখেন এরশাদ?

এরশাদ উত্তর দিলো না। সে আয়না দেখে না বললেই চলে। অনেকদিন পরে একবার দেখেছিল, পৃথিলা যেদিন মিঠাপুকুরে এলো তার পরের দিন। তাও ছোট চাচার রুমে। তার পুরো রুমে কোন আয়না নেই।

পৃথিলা উত্তরের আশাও করলো না। সে এগিয়ে গেলো! যেতে যেতে বলল, — নিশ্চিন্তে থাকুন, আমি যেইটুকুর জন্য এসেছি, সেইটুকুই করবো।

পৃথিলা একাই দোকানে ঢুকলো! এরশাদ ভ্যানের গায়ে হেলান দাঁড়ানো। দাঁড়িয়ে আবার সিগারেট ধরালো। তবে দৃষ্টি এক জায়গাতে। সেটা কোথায় বলার অপেক্ষা রাখে না। পৃথিলা নিজেও বুঝল। তবে এবার কোনো বাড়তি ঝামেলায় গেলো না। এই দোকানে নিয়মিত পত্রিকা আসে। সামনেই রাখা। পৃথিলা দুটো বইয়ের নাম বলে বলল, — আমি কি পত্রিকাটা একটু দেখতে পারি?

দোকানদার বই বের করতে করতে হেসে বলল, — দেখেন আপা, জিজ্ঞেস করার কী হলো!

পৃথিলা পত্রিকা টেনে নিলো। এই পৃষ্ঠা ওই পৃষ্ঠা, সব ভালো করে দেখলো। প্রতিদিন নিত্য নতুন অপরাধ হচ্ছে। তারেক তো এমন কেউ না, যে প্রতিদিন নিয়ম করে সেই খবর ছেপে যাবে। তাছাড়া, বেশ কয়েকদিন হয়ে গেছে। তাই কিছুই চোখে পড়ল না।

সে বড় একটা শ্বাস ফেললো, ফেলতেই না চাইতেও এরশাদের দিকে নজর পড়ল। সোজা চোখ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে। না পড়ে উপায় কি? তাই পড়তেই দেখল, এরশাদ ঠোঁট টিপে হাসছে। তারা পত্রিকা না পড়তে পারলেও, এই লোকটা নিয়ম করেই পড়েছে। তাই জানতো, জানতো বলে সহজে রাজি হয়েছে।

পৃথিলা চোখ ফিরিয়ে নিলো। টাকা বের করার জন্য হ্যান্ডব্যাগ হাতে নিলো। তখনি দেখলো ভ্যানওয়ালা ফিরে এসেছে, আর এরশাদের দৃষ্টি সরেছে। আর সরতেই ঝট করে পৃথিলা ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করে হালকা ধাক্কায়, দোকানের কাচঘেরা সামনের টেবিলের আরেক কোণায় পাঠিয়ে দিল। সে অবশ্য জানে না, দোকানদারের নজরে পড়বে কি না। তবে ভাগ্য ভালো হলে পড়তেও পারে। চিঠিটার ওপরে ছোট্ট একটা চিরকুট। না, বাড়তি কিছু লেখেনি। এই গ্রামে কে ভালো, কে মন্দ, কে সারেং বাড়ির লোক সে কিছুই জানে না। তাই শুধু লিখেছে, “চিঠিটা দয়া করে ডাকঘরে পৌঁছে দেবেন।” যদি ভালো মনের হয়, দেবে, না হলে ফেলে দেবে। এখন দেখা যাক, ভাগ্য তাকে কোন প্রান্তে নিয়ে যায়।

পৃথিলা টাকা দিয়ে, বই হাতে নিয়ে বেরুতে গিয়েও থামকে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে শান্ত ভাবে এরশাদের দিকে আবার তাকালো। সে আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে। তবে হাতে এখন একটা পানির বোতল। ঠোঁটে সেই আগের হাসি। সেই হাসিকে পুরো উপেক্ষা করে পৃথিলা আবার দোকানের ভেতরে এলো। এসে দোকানদারকে বলল, — আপনার দোকানে তো নিয়মিত পত্রিকা আসে?

— জ্বি আপা।

— কিছুদিন আগে ঢাকার একটা ফ্ল্যাট বাড়িতে তারেক নামের এক লোকের খুন হয়েছিল। সেটার ব্যাপারে কিছু জানেন?

দোকানদার হেসে বলল,– জ্বি আপা! জানবো না কেন? দু’দিন আগেও পত্রিকার হেডলাইন ছিল।

— সেই খুনটার কী হয়েছে? খুনি কি ধরা পড়েছে?

— না আপা, পড়েনি। প্রতিদিন কত খুন হয়! কয়টা ধরতে পারে! তবে সন্দেহ এখন সব আগের স্ত্রীর দিকে। সেই মেয়ের খবর নাই। তবে মেয়ে নাকি আবার বিরাট পুলিশের মেয়ে। তার বাপেই তো কেসটা এখন হাতে নিছে। সে বলছে ” তার মেয়ে কখনো খুন করতে পারে না। বরং হয়ত সে নিজেই বিপদে আছে। তা না হলে পালিয়ে থাকবে এমন মেয়ে সে না। ”

পৃথিলা চমকে উঠলো। চমকে বলল, — কে কেসটা নিয়েছে?

— ওই যে, খুনির আগের স্ত্রীর বাপে।

পৃথিলার বিশ্বাস হয় না। তাই আগের মতোই বলল, — আপনি কি তার নামটা বলতে পারবেন?

— মনে নাই গো আপা। তবে দাঁড়ান, পত্রিকা আছে তো! মাসেরটা জমা করি। তারপর কেজিদরে বিক্রি করি।
বলে দোকানের এক কোণায় থেকে দু’দিন আগের পত্রিকা টেনে বের করলো। ধুলো ঝেড়ে সামনে মেলতেই, কষ্ট করে আর খুঁজে নাম পড়তে হলো না। তার বাবা, তার স্নেহের বাবার ছবিটা ভেসে উঠল।রক্তের সম্পর্ক না থাক, কখনো ভালোবাসায় কমতি রাখেনি। মিথিলার চেয়ে ভালোবাসার পাল্লা বরং সব সময় তার দিকেই ছিল ভারী।

তবে পৃথিলা সব পৃষ্টা নেড়ে চেড়ে তার কোন ছবি পেলো না। অথচ তার টাই আগে দেওয়ার কথা। তারেকের সাথে বিয়ের পরে মা তার সব ছবি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। হয়ত তাই তার কোন ছবি বাবা দিতে পারেনি। তবে তারেকের ফ্ল্যাটে তো থাকার কথা, পুলিশ পায়নি কেন? সে তো কয়েকটা কাপড় আর দরকারি জিনিস ছাড়া কিছুই আনে নি।

পৃথিলার আর ভাবতে পারলো না। চোখে পানি চলে এলো। সেই পানি নিয়েই পাশে রাখা কাঠের টুলটার ওপরে বসে পড়লো। কতদিন পর বাবার মুখটা দেখলো! আর মা, মা কি তাকে ক্ষমা করেছে?

এরশাদের মুখে এখন আর আগের মতো হাসি নেই। সোজা দাঁড়ালো! দাঁড়িয়ে সিগারেট পায়ে পিষলো। পিষে দোকানদারের দিকে শীতল চোখে তাকালো।
দোকানদার আগা মাথা কিছুই বুঝল না। তবে এরশাদের দৃষ্টিতে ঢোক গিললো। সারেং বাড়ির মানুষদের ভয় পায় না, এই অত্র গ্রাম, বাজার, সদরে এমন মানুষ কমই আছে।

আয়না আস্তে করে উঁকি দিল। অবশ্য স্বাভাবিক ভাবে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেও সমস্যা নেই। পুরো দরজা হাট করে খোলা। এই বান্দা ঘুমালে দিন দুনিয়ার হুঁশ থাকে না। এখনও নেই। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। প্লাস্টারের হাবভাবও নেই। লুঙ্গি উঠে আছে হাঁটুর উপরে। হাত সুস্থ হাতের মতো ছড়িয়ে।

আয়না উঁকি দিয়েই কিছুক্ষণ সেই ভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরে যাওয়ার সাহস হচ্ছে না। হাবভাব তো ভালো না। গেলেই যদি আবার উল্টো পাল্টা কিছু করে! অবশ্য দিনের বেলা। দরজাও হাট করে খোলা। মনে হয় না এখন শয়তানগিরি কিছু করবে।

আয়না ঢোক গিলে আস্তে করে এগিয়ে গেল। দাঁড়ালো শাহবাজের মুখোমুখি। বাচ্চাদের মতো হাঁ করে ঘুমিয়ে আছে। ঘাড় ছোঁয়া চুল এলোমেলো। শ্যামলা মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আয়না এতদিনে একবারও ভালো করে মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেনি। আজ দেখল। বরং খুঁটিয়ে খুঁটিয়েই দেখল। তবে ডেকে তোলার সাহস হলো না। বুকে কাগজ গুলো চেপে দাঁড়িয়ে রইল।

শাহবাজ ঘুমের ঘোরেই চিত হয়ে শুলো। আয়না দেখে আস্তে করে বলল, — শুনছেন?

শাহবাজের গাঢ় ঘুমে আয়নার কথা কানে ধারের কাছেও যায়নি। বরং সে আরও নড়ে চড়ে আরাম করে শুলো। আয়না আবার ডাকলো, — শুনছেন?

এবারও কোনো হেলদোল নেই। আয়না মুখ গোঁজ করলো। করে নিজের মাথা নিজে চুলকালো। চুলকে আস্তে করে হাতে ছুঁয়ে বলল,– শুনছেন?

এবারো খবর নেই। দিন দুনিয়ার আচার বানিয়ে এ লোক ঘুমাচ্ছে। আয়না হাল ছাড়লো, ছেড়ে এক ধাক্কা দিল। এবার কাজ হয়েছে। শাহবাজ চোখ, নাক মুখ কুঁচকে ঝাড়ি মেরে বলল, — কি হয়েছে?

আয়না ভয় মাখা কণ্ঠে বলল, — দরকার আছে উঠেন।

শাহবাজ আগের তেজেই বলল — কি দরকার?

— উঠেন তারপর বলি।

শাহবাজ বিরক্ত নিয়ে উঠল। উঠে ভালো করে চোখ খুলতেই নজরে পড়ল লাল টকটকে দু’টো ঠোঁট। যেই ঠোঁট দু’টো ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই ঠোঁট, গোঁজ করা মুখ শাহবাজকে কেমন টানে, এই মেয়ে যদি জানতো, তাহলে দিন রাত আঁচলে পুরো মুখ ঢেকে রাখতো।

তাই সেই টেনে নেওয়া ঠোঁটের দিকে চোখ রেখে বলল — কী হয়েছে, সাত সকালে এমন ধাক্কাধাক্কি কেন?

আয়না আর ডানে বামে গেল না। যত তাড়াতাড়ি ফেরা যায় ততই ভালো। তাইতো হাত বাড়িয়ে সাজেশন দেখিয়ে বলল, — এটা ফরহাদ ভাইদের বাড়িতে দিতে হবে। বীণার পড়া।

— কিসের পড়া?

— কিসের পড়া আবার কি? পরীক্ষার পড়া। রাতের মধ্যে লাগবে। আপনি তাড়াতাড়ি পৌঁছে দেন।

— দাদি বলেছে?

আয়না মিথ্যে বলল, — হুম।

দিচ্ছি বলেই শাহবাজ পা গুটিয়ে বসলো। বসে খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, — দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে আসো। আমার কথা আছে। আর ভুলেও দৌড় দেবে না।

আয়নার কলিজা ধক করে উঠল। যেমন উঠেছিল, ওই যে প্রথম দিন। সামনে সোজা এসে বলেছিল, “কাপড় খোলো” ঠিক তেমনি। শুরু হয়ে গেছে রে শয়তানের শয়তানগিরি।

— কি বললাম?

আয়নার মুখে কথা আসে না। এ কেমন মানুষ? কোনো সংকোচ নেই, জড়তা নেই। সব পুরুষমানুষ এমন নিলজ্জ, ঠোঁটকাটা হয়? কী জানি! আল্লাহ।

— আমি উঠবো?

আয়না ঢোক গিললো, গিলে আস্তে করে বলল, — কথা বলতে দরজা চাপানো লাগবে কেন?

— কারণ, আপনাকে দেখে আজকাল মাথা ঠিক রাখতে পারি না, তাই। দেখা গেল কথা বলতে বলতে মাথা বিগড়ে গেল। আমার কিছু না হলেও, কেউ কিছু দেখলে আপনাকে তো আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমি আপনার কথা ভেবেই বলছি।

আয়না আপনি শুনেই তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা চাপালো। মাথা বিগড়াবে কি, তার তো ধারণা বিগড়েই গেছে। অবশ্য খিল ফেলল না। সে দৌড় দেবে, অবশ্যই দেবে। তবে কী বলবে, সেটা আগে শোনা যাক।

তাই দরজা চাপিয়ে একটু সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে পাশের চেয়ারে আগে সাজেশনটা রাখল। দেখা গেল এইটুকুর জন্য আবার আসতে হয়! তাই আগেই সাবধান। তারপর ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে বলল, — বলুন।

শাহবাজ আয়নার হাবভাব সবই দেখল। দেখে শান্ত ভাবে বলল, — খাটে এসে বসো।

— আমি এখানেই ঠিক, আপনি বলুন।

শাহবাজ হাসল! হেসে উঠবে তখনি আয়না হাত উঁচিয়ে থামিয়ে বলল, — বসছি, বসছি তো। বলেই শাহবাজের ঠিক বরাবর, খাটের আরেক প্রান্তে কোনো রকম বসল। বসতে গিয়ে কিছুটা কুঁকিয়ে চোখ মুখ কুঁচকে কোমরে হাত রাখল। তার কোমরের বারোটা এমনিতেই বেজে আছে। আবার কি করবে কে জানে?

শাহবাজ আবারো ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে বলল, — দৌড়াদৌড়ি, মারামারি, ঝাঁকাঝাঁকি তো অনেক হলো। এত ঢং আমার ভালো লাগছে না। এখন দশ কথার এক কথা, আমার বউ চাই।

আয়না নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কতো বউ লাগবে আল্লাহ্’ই জানে। তাই বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। নেড়ে বলল, — আচ্ছা।

শাহবাজ অবাক হলো। অবাক হয়ে বলল,– আমি কী বলেছি, আপনি বুঝেছেন?

আয়না সাথে সাথে মাথা নাড়ল। নেড়ে বলল, — আপনার বউ লাগবে। এখন আমার তো কিছু করার নাই। দাদিকে বলেন।

শাহবাজ ভ্রু কুঁচকালো। কুঁচকে বলল, — দাদিকে বলব মানে?

— মানে আবার কী? আপনার বউ লাগবে। এখন আমি কী করব? আমি থাকি চার দেয়ালের ভেতরে। যা করার দাদিই তো করতে পারবে।

শাহবাজ নিজেও বুঝদারের মতো মাথা ঝাঁকাল। ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। তার সাথে সাথে আয়নাও উঠে দাঁড়াল। তবে হাবভাব কোন দিকে, সে বুঝতে পারছে না। কথা তো সুন্দর ভাবেই বলছে।

শাহবাজ স্বাভাবিক ভাবে দরজার দিকে এগোল। আয়না ভেবেছিল কথা শেষ, বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে অবাক করে শাহবাজ দরজায় খিল দিল। তাও উপরেরটা। যেটায় আয়না মরে গেলেও হাত পৌঁছাবে না।

আয়না ঢোক গিলল। গিলে বলল, — দাদি আমাকে এটা দিয়েই নিচে যেতে বলেছেন।

শাহবাজ উত্তর দিল না। এগিয়ে আয়নার সামনে এল। এসে আগের মতোই বলল, — আমার হাতে প্লাস্টার। বেশি দৌড়ঝাঁপ করলে নাক বরাবর, বেশি না একটা ঘুঁষি মারব।

আয়না সাথে সাথে নাক চেপে ধরল। ধরে বলল, — আমি বাইরে যাব।

— কেন?

— কাজ আছে।

— কিসের কাজ?

— সারেং বাড়ির বউ আমি, কাজের অভাব আছে?

— উঁহুম, ভুল।

— কী ভুল?

শাহবাজ আরো এগোল। একদম আয়নার কাছাকাছি। আয়না সাথে সাথে পিছাতে গিয়ে খাটে ধপ বসে পড়ল। শাহবাজ ঝুঁকে বলল, — আজ থেকে আপনি শাহবাজের বউ। আর এই বউকে’ই শাহবাজের চাই। এখন চাই। এই মুহূর্ত্বে চাই। বুঝেছেন, শাহবাজের বউ?

আয়না আবার ঢোক গিলল। গিলে বলল, — আমাকে না আপনি ঘৃণা করতেন? ভাইয়ের হবু বউ না কি যেন বলেছিলেন।

— এখনো করি।

— তবে ?

— তা তো জানি না। তবে এইটুকু জানি, আমার বউ লাগবে।

— ওহ।

— আর কিছু বলার আছে?

আয়না উত্তর দিল না। দিয়ে লাভ আছে বলেও মনে হলো না। তাই সাইড কেটে বেরোতে চাইল। পারলো কই? ঝট করে শাহবাজ কোমর চেপে ধরল। ধরে আর সময় নষ্ট নেই। ঝাপটে আয়নাকে নিয়েই খাটে পড়ল। আয়না ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। শাহবাজ অবশ্য কিছুই করল না। শুধু আয়নার পাশে আরাম করে কাত হয়ে শুয়ে বলল, — কাঁদছো কেন?

— আমার কোমরে ব্যথা, টাটাচ্ছে।

— ওহ বলেই পেটের আঁচল ঝট করে সরিয়ে বলল, — দেখি। মালিশ করে দেই।

আয়না “মাগো!” বলেই ঝট করে ঘুরে গেল। ঘুরতেই পিঠে সেই যে শাহবাজের লাঠির বাড়ি, সেই বাড়ির দাগটা শাহবাজের নজরে পড়ল। লম্বা সোজা দাগ। ফর্সা পিঠে হালকা কালো হয়ে আছে। বোঝা’ই যাচ্ছে অনেক দিন আগের।

শাহবাজ সেই দাগে আঙুল ছুঁয়ে বলল, — পিঠে কী হয়েছিল?

আয়না উত্তর দিল না। সে বরং সরার তালে আছে। আর সরতে গিয়েই শাহবাজ কোমর ঝাপটে আবার টেনে কাছে নিল। আয়না অবশ্য আর ফেরেনি। তার পিঠ শাহবাজের বুকে। সে আছে বাঁকা কুঁজো হয়ে । শাহবাজও তার মতোই বাঁকা হয়ে শুলো। শুতে শুতে বলল, — যত ঢংই করো, আজকে আমি ছাড়ব না।

ঠিক তখনি দরজায় টোকা পড়ল। কাজের লোক টোকা দিয়ে বলল, — আয়না ভাবি, দাদি ডাকে। পান নাকি খাইবো?

আয়না হাঁফ ছাড়ল। আল্লাহ বাঁচাইছে গো। বলেই ঝট করে উঠতে গেল। শাহবাজ আগের মতো চেপে ধরে স্বাভাবিক ভাবে বলল, — দাদিকে গিয়ে বল, আয়না ভাবি, শাহবাজ ভাইয়ের কাছে।

আয়না আবার কেঁদে ফেলল। শাহবাজ কোমর ছেড়ে চিত হয়ে শুতে শুতে বলল, — আজকে আমি সত্যিই ছাড়ব না আয়নামতি।

আয়না ফুঁপাতে ফুঁপাতেই বলল — আমি আপনাকে ঘৃণা করি।

— মা বাবার খুনিদের ঘৃণা তো করবেই। বরং ভালোবাসলেই অবাক হতাম।

আয়না অবাক হয়ে ঘুরে তাকাল। শাহবাজ সব সময়ের মতো তার চেনা ভঙ্গিতে হাসল। হেসে আয়নার লাল টুকটুকে ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে বলল, — এত ঘৃণা গায়ে আগুন দিয়ে বিয়ের সময় কোথায় ছিল?

— ছিল। ছিল বলেই বিয়ে করেছি।

— কেন?

— কারণ, আমি আপনাকে খুন করতে চেয়েছিলাম। আমার জীবন তো নরক বানিয়েছেন আপনি’ই। কি হতো আমাকে যেতে দিলে। বিয়ের দিন রাতে যে হামলা হলো, সেটায় আমি ছিলাম। তো, এখনো আপনার বউ চাই?

শাহবাজ অবাক হলো না। অনুমান সে আগেই করেছে। সেই দিন চিঠিটা কিছুটা হলেও দেখেছে। তবে কে পাঠিয়েছে ধরতে পারছে না। আর যার কথা ঘুরে ফিরে মাথায় আসছে, সেটা মানতে পারছে না। তার সাথে সারেং বাড়ির শত্রুতা কী? সম্পর্ক তো আর একদিনের না । তাদের জন্মের আগের। নাকি অন্য কেউ। আয়নার চাচা। না তার এতো সাহস হবে না। তবে? আর কে? সারেং বাড়ির ক্ষতি করে কার লাভ? আর এইসবের একমাত্র উত্তর আয়না। তবে সে জানে, আয়না মরেও গেলেও মুখ খুলবে না। অবশ্য আয়নার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতক্ষণে চাপা খুলে ফেলতো। তবে সে আয়নামতি, শাহবাজের পিরিতের বউ। চাইলেই কি আর এখন কিছু করা যায়? তাই তার মতোই বলল, — হ্যাঁ চাই।

— আপনি আমার কাছে এলে গলায় দড়ি দেব। আজই দেব। এই ঘরের ফ্যানের মধ্যে দেবো।

— দাও, সমস্যা নাই। তবে কার সাথে হাত মিলিয়েছো, সেটা বলে যাও।

— কেন? সারেং বাড়ির এত ক্ষমতা? যান, খুঁজে বের করেন।

শাহবাজ আগের মতোই হাসল। হেসে ঝট করে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দরজার খিল খুলল। খুলে নিজের মতো বেরিয়ে গেলো। বোকা আয়না বুঝল না শাহবাজ কেমন প্যাঁচে ফেলে তার পেটের কথা বের করল। এখন বাকি শুধু মুখ খোলার ব্যবস্থা করা। আর তার মুখ তার বাবা মায়ের খুনি কে জানতে পারলেই খুলবে। আপনা আপনি’ই খুলবে। তা না হলে, শাহবাজের বউ লাগবে, আবার অনুমতি চাইবে, এতো ভদ্র শাহবাজ হলো টা কবে?

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here