অচিনরেখা” বিনতে ফিরোজ ১.

0
4

(যাদের কাছে পোস্টটা পৌঁছাবে একটু কমেন্ট করবেন)

“অচিনরেখা”
বিনতে ফিরোজ
১.

“মেহরিমা এসেছো! কেমন আছো?”

বইখাতা গুছিয়ে কেবলই একটু শুয়েছিল শাহরিয়ার। মায়ের কথা শুনে হালকা লেগে যাওয়া চোখদুটো ধপ করে খুলে গেলো। খোলা দরজায় নেভী ব্লু রঙের পর্দা ঝুলছে। সেই পর্দার ফাঁকা দিয়ে মাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে কারো সাথে কথা বলছেন। শাহরিয়ার জানে তার মন উচাটন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবু হৃদযন্ত্রটা তারস্বরে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে রীতিমত দামামা বাজাতে শুরু করেছে।
“ও মেহরিমা না।” বিড়বিড় করলো শাহরিয়ার। তাতে লাভের বদলে ক্ষতিটাই হলো। যে অস্থিরতাটুকু বুকের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল সেটা কাঁচা ঘুম ছুটিয়ে মাথায় গেঁথে বসলো। এবার রুমির কণ্ঠ পাওয়া যাচ্ছে। অকারনেই বিরক্ত হলো শাহরিয়ার। এরা কি তাকে ঘুমাতে দেবে না?

মাইন্ড ডাইভার্ট করতে টেবিল থেকে একটা বই টেনে নিলো। আর একটা পরীক্ষা। তারপর আনুষ্ঠানিকভাবে মাস্টার্স শেষ হবে। অধ্যয়নরত ভার্সিটির টিচার ক্যান্ডিডেট হিসেবে ওখানেই জয়েন করার সুযোগ পাচ্ছে শাহরিয়ার। বেশ আগে থেকেই স্যারদের সাথে ক্লাসে যাওয়া আসা করে। কীভাবে ক্লাস নিতে হয় শিখে নেয়। রেজাল্ট এবং রেসপন্স দুটোই ভালো হওয়ার কারণে শিক্ষকেরাও তাকে পছন্দ করেন। ফলে চাকরি নিয়ে আলাদা করে আর টেনশন নেই। এখানেই লেকচারার পদে ঢুকে পড়বে সে। আর আগানোর ইচ্ছা নেই। নিজেকে খুব জোর করে এ পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। অপছন্দের পড়াশোনাটা করেছে একটা কারণে। জোরের কথা মনে হতেই আবার থেমে যাওয়া হৃদপিন্ড যেন নৃত্য করতে শুরু করলো। বিছানা থেকে উঠলো শাহরিয়ার। দরজাটা লাগিয়ে দেয়ার জন্য।

পা দুটো চঞ্চল হতেই মনটা আরো বেশি চঞ্চল হলো। গাঢ় নীল পর্দাটা সরিয়ে একবার ডাইনিং রুমটা দেখার ইচ্ছে হলো। ওখানেই তো মেহরিমা আছে। সে জানে হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক হওয়ার মেহরিমা সে নয়। কস্মিনকালেও তাকে এখানে পাওয়া সম্ভব না। তবু মন তো মানে না। চোখের দেখাকে বিশ্বাস করতেই দরজা বন্ধ করার ফাঁকে একবার নীল পর্দার ওপারে চোখ বুলিয়ে নিল। একটা মেয়ের পেছন দিক দেখা যাচ্ছে। রুমির সাথে গল্পে ব্যস্ত। এক ঝলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিল শাহরিয়ার। মেহরিমা নেই। সুদূর ঝিনাইদহ থেকে সে ঢাকায় আসবেই কেনো!

দরজা আটকে শুয়ে পড়ল সে। এক হাত কপালে রেখে চোখ বন্ধ করলো। তেরোটা বছর ধরে এসবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শাহরিয়ারের নিশ্বাস বেড়ে গেলো। এই পাক খাওয়া নৌকা কূল পাবে কবে?

____________________

বাইরের রোদটা দেখে মেহরিমার মন চাইলো আর এক ঘণ্টা থাকতে। মার্চ মাসেই এই অবস্থা। মে, জুনে কি হবে ভাবলেই দেহটা ক্লান্ত ক্লান্ত লাগে।
“আরো করবো মিস?”
মেহরিমা জানালা থেকে চোখ সরাল। তার ক্লাস সেভেনের ছাত্রী নিধি ডাকছে। মেয়েটাকে গণিত পড়ায় সে।
“আজকে আর করতে হবে না। খাতা দাও। হোমওয়ার্ক দিয়ে দিই।” দেড় ঘণ্টা হয়ে গেছে সে নিধিকে পড়াচ্ছে। নিধি ইতোমধ্যেই ক্লান্ত হয়ে গেছে। জোর করে মেহরিমার কথা শুনছে বোঝা যাচ্ছে। আর দুটো অংক দেয়া যেত। ততক্ষণে বেলা তিনটের এই রোদের তেজ একটু কমতো। কিন্তু জোর করা মেহরিমার পছন্দ না।
“নিধি এক গ্লাস পানি খাওয়াও তো।”
নিধি উঠে গেলে মেহরিমার মনে হলো পানি চাওয়াটা ঠিক হয়নি। এর আগে একদিন পানি চেয়েছিল। নিধির মা চা নাশতা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এবারও যে একই ঘটনা ঘটবে না তার নিশ্চয়তা কি। চেয়ে নাশতা খাওয়ার মেয়ে মেহরিমা না। সেবার মুখ রক্ষা করলেও আজ শুধু পানিই খাবে সে।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্সে অনার্স করছে মেহরিমা। সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে আজ চার মাস যাবৎ। ভার্সিটির গাড়িতেই আরাপপুরে নিজের বাসা পর্যন্ত চলে আসে। নিধিকে পড়িয়ে একেবারে বাড়িতে যায়। দু বাড়ি পরেই তাদের পৈতৃক নিবাস।
“মিস।”
মেহরিমার ধ্যান ভাঙলো। নিধি শুধু এক গ্লাস পানি এনেছে। ভালো হয়েছে। নিধির মা সম্ভবত ঘুমাচ্ছে।
ঢকঢক করে পানিটা খেয়ে আবার জানালার দিকে তাকালো। নিধি তার দিকে তাকিয়ে আছে। কখন সে বেরিয়ে যাবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পরনের বোরখাটা ঠিক করলো মেহরিমা। কালো বোরখায় গরম মনে হচ্ছে বেশি লাগছে। কালকে এটা ধুয়ে দিয়ে সবুজটা পড়বে।

“মিস আপনার আংটিটা অনেক সুন্দর।”
মেহরিমা উঠতেই নিধি বলল। না চাইতেও ডান হাতের অনামিকা আঙুলে পড়া আংটির দিকে তাকালো মেহরিমা। স্বর্ণের চকচকে জৌলুস খুইয়ে রংটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তের বছরে আঙুলের মাপ বদলেছে। মাঝখান থেকে কেটে অ্যাডজাস্ট করে নিয়েছে সেই আঁকাবাঁকা আংটিটাই। সেটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মেহরিমার মাঝে গরমের অস্থিরতা কমে গেল। এক পশলা শীতলতা যেন ছুঁয়ে গেলো মন গহীন। মেহরিমা কেন পারে না টান মেরে এটা ছুঁড়ে ফেলতে? কেন এই ছোট্ট আংটিটা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে?

বাড়িতে ঢুকতেই মেহজাবিনকে দেখা গেলো টিভির সামনে। মেহরিমা বিরক্ত হয়ে বলল, “সারাদিন কীভাবে টিভি দেখিস তুই?”
“চোখ দিয়ে।” নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল মেহজাবিন।
মেহরিমার বিরক্তিটা রাগে পরিণত হলো মেহজাবিনের কথার ধরনে। আশপাশে বাবা মাকে দেখলো না মেহরিমা। শক্ত কণ্ঠে বলল, “টিভি বন্ধ কর।”
“উফ আপা! বাইরে থেকে এসেছিস খেয়ে দেয়ে ঘুমা। আমার উপর মাতব্বরি করবি না তো সবসময়!”
মেহজাবিন চড়া কণ্ঠে বলল। মেহরিমা চুপ করে গেলো। উঁচু কণ্ঠে কোনো কথাই সে সহ্য করতে পারে না। এবং তারপরই চুপ করে যায়। টিভির দিকে তাকালে স্টার প্লাসে চলতে থাকা হিন্দি সিরিয়াল দেখা গেলো। চকচকে, মেকআপ ঘষা সব মুখের নানান রকম অভিব্যক্তি। মেহরিমা আর কিছু না বলে সেটাপ বক্সের সুইচ উল্টাপাল্টা করে টিপে দিয়ে চলে গেলো। মেহজাবিন চেঁচিয়ে উঠলো, “এসেই শুরু করেছিস আপা! আমি আব্বুর কাছে নালিশ দিবো!” ততক্ষণে টিভি স্ক্রীনে ভেসে উঠেছে দুর্বোধ্য সব লেখা। সদ্য টেনে ওঠা মেহজাবিনের কাছে সেগুলো অপরিচিত। রিমোট কয়েকবার টিপলেও বেশি সাহস করতে পারল না সে। একটু এদিক ওদিক হলে? এই বাড়িতে টিভিটাই তো তার সঙ্গী।

বাবা মাকে ঘুমাতে দেখে আর ডাকেনি মেহরিমা। গোসল করে বোরখা ধুয়ে বিছানায় গড়িয়ে পড়েছিল। যদিও পেট ক্ষুধায় অবশ হয়ে আসছে তবু উঠে যেয়ে একটু খেতে ইচ্ছে করছে না। ডান হাতটা চোখের সামনে মেলে ধরে ফ্যাকাশে হয়ে আসা আংটিটার তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ঘুমিয়ে গেলো সে। ঘুম ভাঙ্গলো মেহজাবিনের কণ্ঠে। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে মেহরিমাকে ধাক্কা দিচ্ছে।
“আপা! এই আপা! ওঠ। শাহরিয়ার ভাই আসছে।”
মেহরিমা তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। তার ঘুম পুরো হয়নি। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। জড়ানো কণ্ঠে সে বলল, “শাহরিয়ার ভাই?”
“হ্যাঁ। আজকে আসার কথা ছিল না? তুই আবার ভুলে গেছিস। আম্মু বলল তোকে সুন্দর করে বসে থাকতে।”
“শাহরিয়ার ভাইয়ের আজকে আসার কথা?” মেহরিমার সবকিছু যেন জট পাকিয়ে গেলো। ছয়টা বছর যেই মানুষটার দেখা নেই সে সহসাই কেন ঢাকা থেকে ঝিনাইদহ চলে আসবে? তার আজকে আসার কথা ছিল আর মেহরিমা জানে না?
“এই আপা! মূর্তির মতো বসে আছিস কেন? ওঠ!”
“শাহরিয়ার ভাই কে?”
“আরে পল্লব আংকেলের ভাগ্নি। শাহরিয়ার।” পল্লব তাদের নিকটতম প্রতিবেশী।
মেহরিমার সমস্ত উত্তেজনা চুরচুর করে ভেঙে গেলো। ধপ করে শুয়ে পড়ল সে।
“ইউনূস ভাই বলতে পারিস না?”
মেহজাবিন মুখ কুচকে বলল, “ইউনূস বুড়ো মানুষের নাম। তার চেয়ে শাহরিয়ার ভালো। তুই আবার শুয়ে পড়লি কেনো?”
“বুড়ো মানুষের নামেই ডাকবি। এরপর থেকে যেন ইউনূস বলতে শুনি।”
“আচ্ছা ইউনূস ভাইই বলব। কিন্তু তুই ওঠ।”
“তোকে পড়াতে আসবে আমি বসে থেকে কি করবো?”
এতক্ষণে মেহজাবিনের কণ্ঠ খাদে নেমে এলো, “আমি হলাম ছাত্রী। আর তুই হলি পাত্রী। আমাকে পড়াবে আর তোকে দেখবে। দুজন কি এক হলাম?”
মেহরিমা চোখ গরম করে তাকালো।
“আমার দিকে এভাবে তাকিয়ে লাভ নেই। আম্মু এবার টাইট করে নেমেছে। ইউনূসকেই মেয়ের জামাই বানাবে।”
“আমি বিয়ে করব না।”
“আমাকে বলে কি লাভ? আম্মুকে যেয়ে বল। এখন ওঠ তো। নাহলে আম্মু আমাকেই বকবে। ওঠ না!”
মেহরিমা ক্লান্তির শ্বাস ছাড়ল। এবার কি বলে আটকাবে মাকে?

~চলমান~

(কোনটা আপনাদের ভালো লাগছে? “ক্যানভাস” কন্টিনিউ করবো নাকি “অচিনরেখা”?)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here