#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৬
#আরোবী_খান_সিনথিয়া
“পিহু! ছেলেটা কী মাহির ছিল না ?”
জাহানারা বেগমের কথায় মাথা নাড়ল পিহু। ছেলেটা মাহিরই ছিল। জাহানারা বেগম আশ্বস্ত হলেন , পিহু তার সাথে মিথ্যে বলবে না। জাহানারা বেগম পিহুকে নিজের কাছে ডাকলেন। বিছানায় বসলেন। পিহু তার পাশে বসল। মাথা ইতোমধ্যে সে নিচু করে ফেলেছে। নাক টানতে! কান্না আটকে রেখেছে ভীষণ কষ্টে!
জাহানারা বেগম পিহুর অবস্থা দেখে , পিহুর পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন , — “আমি তোর মাকে কিচ্ছু বলবো না মাহিরের ব্যাপারে।”
কথাটা পিহুর কর্ণকুহুরে আসতেই , পিহু জলে টলমল চোখে তাকালো জাহানারা বেগমের দিকে। জাহানারা বেগম হেসে বললেন , — “এবার কান্না থামা পাগল মেয়ে!”
পিহু চোখ মুছে ফেলল। জাহানারা বেগমের পিহুর হাত ধরলেন। হাতে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন ,
— “পছন্দ করিস তাকে ?”
পিহু ভড়কালো। কী উত্তর দিবে বুঝতে পারল না। জাহানারা বেগম ফের পিহুকে আশ্বস্ত করলেন ,
— “ভয় পাস না , পছন্দ করলেও তোর মা’কে
আমি কিচ্ছু বলবো না !”
পিহু তখন অস্ফুট স্বরে বলল , — “পছন্দ না ,
ভালোবাসি তাকে !”
জাহানারা বেগম থমকালেন , — “কিহ?”
পিহু এবার কিছুটা সাহস নিয়ে বলল ,
— “পছন্দ না , ভালোবাসি তাকে !”
জাহানারা বেগম এবার আরও কিছুটা অবাক হলেন ,
— “তুমি কীভাবে জানো ? সে তোমার ভালোবাসা! শুধু এট্রাকশন না !”
পিহু ঠোঁট কামড়ে কিছুটা চুপ থেকে বলল ,
— “আমাকে রাহা আপু একবার , ভালোবাসা আর পছন্দের মাঝে পার্থক্য বুঝিয়ে ছিল !”
জাহানারা বেগম জানতে চাইলেন রাহা কী বলেছে তাকে। পিহু তখন কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলতে লাগল ,
— “আমরা যখন কাউকে পছন্দ করি , তখন আমরা শুধু নিজের ব্যাপারটাই ভাবি! অপরপাশের মানুষটার কথা একটুও ভাবি না ! আমাদের তাদের সাথে কথা না বললে , অস্থির লাগবে ! তাকে ছাড়া থাকতে কষ্ট হবে! এই অভ্যাসটাকেই আমরা সম্ভবত ভালোবাসার নাম দেই! ভালো লাগাকে ভালোবেসে ফেলি…”
পিহুর করার মাঝেই জাহানারা বেগম উৎকণ্ঠা হয়ে বললেন , — “তাহলে কী তোমার মনে হয় না , তুমি মাহিরকে পছন্দ করছো? মাহিরের সাথে থাকবে বলে তো , জেদ করছিলে আম্মুর সাথে ভীষণ! মাহির তো তাহলে শুধু তোমার অভ্যাস?”
পিহু ডানে বামে মাথা নাড়ল। সে একমত না জাহানারা বেগমের সাথে ! পিহু ফের বলতে শুরু করল ,
— “রাহা আপুও আমাকে এটাই বোঝানোর চেষ্টা করেছিল , যে এটা শুধু ভালো লাগা ! ভালোবাসা নেই এখানে!”
তখন জাহানারা বেগম উৎকণ্ঠা হয়ে বললেন ,
— “তারপর ?”
পিহু কিছুটা ভ্রু কুঁচকালো জাহানারা বেগমের উৎসাহ দেখে। কিন্তু বিস্ময়টা সাইডে রেখে পিহু বলতে শুরু করল , — “মাহির ভাইয়া আর আমি ছোট থেকেই ভীষণ ক্লোজ ছিলাম! আম্মুও আমাকে ততটা যত্ন নিতে পারত না ! কারণ ছিল মোহনা আপু! তার সাথেই আম্মুর সারাটা সময় কেটে যেত। শুধু মাহির ভাইয়া আম্মুকে মেনে নেয়নি দেখে আম্মু কখনো মাহির ভাইয়ার কাছও ঘেঁষতে পারেনি ! খালা মনি , মাহির ভাইয়ার চাচী ততটাও মাহির ভাইয়া কিংবা মোহনা আপুর জন্য টান দেখায় নি! এক কথায় মোহনা আপু কারো যত্ন পেলেও , মাহির ভাইয়া সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়! সেদিক থেকেই আমার তার প্রতি ভীষণ মায়া হতো! সে কলেজে যাবে , তখন আমি আমার ছোট ছোট হাতে তার ফ্লাক্সে পানি ভরে দিতাম! তার জুতো পরিষ্কার করতাম! সে ছাড়া ব্রেকফাস্ট , লাঞ্চ কিংবা রাতের ভাতও খেতাম না! কারণ আমি তার সাথে না খেলে , সে বেশির ভাগ সময় না খেয়ে থাকত! তাকে জোর করে কেউ খাওয়াতে পারত না আমি ছাড়া !”
কথাটা বলেই থেমে ছিল পিহু। তার চোখ দু’টো টলমল করে আসল। নাক টেনে বলল , — “মাহির ভাইয়ার বোধ হয় এই জীবনটা ভীষণ বিতৃষ্ণার লেগে ছিল তখন , তাই না আন্টি ?”
পিহুর কথাগুলো শুনে বর্তমানে জাহানারা বেগমও বাকরুদ্ধ। ছেলেটি যে এতটা অসহায় তা তো কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় না ! পিহু না বললে , বোধ হয় ছেলেটার জন্য মায়াটাও এখন লাগত না ! পিহু জাহানারা বেগম ফ্যাকাশে মুখ দেখে মৃদু হাসল ,
— “আমার মতো , এখন আপনারও ভীষণ মায়া হচ্ছে না , মাহির ভাইয়ার জন্য ?”
প্রশ্নটা করেই থামল পিহু । মুখ নামিয়ে নিল। ফের বলল , — “ছোট থেকে তাকে ভীষণ কাছ থেকে দেখেছি তো , তাই তার মনের ভেতরটাও একটু একটু টের পেয়েছি! তারপর তার জন্য মায়া কখন ভালোবাসা হলো জানা নেই আমার ! কিন্তু এই দুনিয়ায় তাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারলেও , সে আমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবে না , আন্টি ! আমার ভালোবাসা ছাড়া সে এক কাঙাল পুরুষ! যার ভাগ্যের খাতায় শুধু আমার নাম লিখে দেয়া হয়েছে ! হয়ত সে আমাকে পেয়ে সব কিছু পেয়ে যাবে , নয়ত আমাকে হারিয়ে কাঙাল হবে !”
কথাগুলো বলে থামল পিহু। তাকালো জাহানারা বেগমের দিকে। উনি এখনো তেমনি আছেন। তার চোখ মুখ ফ্যাকাশে !
কিন্তু জাহানারা নিজেকে কিছুটা সামলে বললেন,
— “এমনও তো হতে পারে , তুমিই এসব ভাবছো! তুমি যে বললে , মাহিরকে ছাড়া তুমি থাকতে পারবে ? তেমনই তো মাহিরও তোমাকে একদিন ভুলে অন্য কারো সাথে ভালো থাকতে শিখে যাবে ?”
পিহু বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ল , — “আমি কখন বললাম আমি তাকে ছাড়া ভালো থাকব ? আমি শুধু বললাম , তাকে ছেড়ে থাকতে পারব !”
কথাটা বলেই থেমে ছিল পিহু। ফের কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , — “ঠিক জীবন্ত লাশের মতো !”
পিহুর কথাটা শুনে বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে আসল জাহানারা বেগমের। মেয়েটা পিচ্চি হলেও , কত কিছু শিখে গেছে , তাই না ? ওর বয়সের মেয়েরা এতকিছু বুঝেও ? ওর বয়সে থাকতে , জাহানারা বেগম শুধু শিখেছিল , ভালো লাগার ব্যাপারটা ! কিন্তু এই মেয়ে তো জীবন্ত লাশেরও সংজ্ঞা জানে !
জাহানারা বেগমকে থ’মেরে থাকতে দেখে , পিহু হাতে থাকা মোবাইলটার স্ক্রিন অন করল। মাহিরকে তার সামনেই কল করল। পিহু এতদিনে অন্তত জাহানারা বেগমকে কিছুটা চিনেছে! জাহানারা বেগম যদি তাদের বিরুদ্ধে থাকতেন , তাহলে প্রিয়তা বেগমকে মাহিরের ব্যাপারটা বলে দিতেন! সেদিন পিহু যেতে নিয়েও ফিরে এসেছিল মাহিরকে দেখতে! তখন স্কুল গেটের সামনে আসতেই দেখল , মাহিরের সাথে জাহানারা বেগম কথা বলছেন। তারপর তারা গাড়ি করে কোথাও চলে গেল।
পিহুর সেদিন ভীষণ ভয় করেছিল ! কিন্তু যখন দেখল, মাহির আর জাহানারা বেগম কেউ এ ব্যাপারে কোন কথা বলল না ! পিহু বুঝল , তারা নিজেদের মাঝেই ব্যাপারটা রাখছে! মাহির পিহুকে টেনশন না করার জন্য সেদিনের দেখা আড়াল রাখল। আর জাহানারা বেগম পিহু আর মাহিরকে বাঁচাতে মুখ বন্ধ রাখলেন প্রিয়তার কাছে! কিন্তু জাহানারা বেগম মাহিরকে রীতিমতো পরীক্ষা করছে পিহুর জন্য! যেন পিহুর লাইফ নষ্ট না হয়!
পিহুকে কল করতে দেখে জাহানারা বেগম ভ্রু কুঁচকালেন , — “তুমি এসময় ছেলেটাকে কল করছো কেন?”
পিহু শান্ত স্বরে বলল , — “আপনার সংশয় মেটাতে!”
জাহানারা বেগম আরও কিছুটা বিস্মিত হলো! মাহির কল তুলতেই , কলের স্পিকারে মাহিরের অস্থির কন্ঠস্বর শোনা গেল ,
— “পিহু ?”
— “হু , মাহির ভাইয়া !”
— “তু…তুই ঠিক আছিস ?”
— “হু , আছি তো !”
— “তাহলে কল তুলছিলি না কেন ?”
— “আন্টির সাথে কথা বলছিলাম তাই !”
মোবাইলের ওপাশ থেকে মাহিরের উত্তর আসল না। মাহিরকে চুপ থাকতে দেখে , পিহুও কিছু বলল না। মাহির ফের নীরবতা ভেঙে বলল ,
— “ উনি কী বলল তোকে ?”
— “আমি বললাম , আপনি আমাকে ছাড়া বাঁচবেন না!”
— “তারপর ?”
— “উনি বললেন , এসব আমার ধারণা ! আপনিও আমাকে ছাড়া বাঁচবেন! আর ভালো থাকতে শিখে যাবেন অন্য কারো সাথে !”
মাহির থমকালো। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,
— “তোর কী মনে হয় আমি পারব এসব ? আমার দ্বারা সম্ভব ?”
পিহু শান্ত কন্ঠে বলল , — “নাহ ; সম্ভব না! আমাকে ছাড়া আপনি এক মুহূর্তও বাঁচতে পারবেন না !”
মাহির চুপ ! জাহানারা বেগমের দিকে তাকালো পিহু! ফের বলল , — “এবার আপনি বলুন ! আপনি আমাকে ছাড়া বাঁচতে পারবেন?”
মাহির ওপাশ থেকে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল , — “আমি কী আদৌও বেঁচে আছি তোকে ছাড়া ? নিজেকে একটা জীবন্ত লাশ মনে হয় রোজ রোজ আমার কাছে ! সারাক্ষণ ভয় হয় তোকে নিয়ে , হারিয়ে ফেলব না তো তোকে ?”
পিহু ধীর কন্ঠে বলল , — “কীভাবে বলব বলেন? পুরো দুনিয়ায় যে আমাদের বিপক্ষে , মাহির ভাই !”
মোবাইল ওপাশ থেকে তাহিরের ফুঁপিয়ে উঠার শব্দ আসল। পিহুর চোখ থেকে গালে গড়িয়ে পরল অশ্রু। স্পিকার সরিয়ে কানে দিল মোবাইলটা ! বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে এসে পরল সে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল ,
— “আমি রোজ আর্জি জানাচ্ছি তো খোদাকে! আপনি চিন্তা করবেন না ! সে আপনার কাছে আমাকে ফিরিয়ে দিবে , মাহির ভাই !”
জাহানারা বেগম পিহুকে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখছিল। পিহু সেই নীল আকাশটার দিকে তাকিয়ে।তার গালে বেয়ে আসা অশ্রু কণাগুলো রোদের আলোয় চমকাচ্ছিল মুক্তোর মতো! জাহানারা বেগম এবার চলে আসতে নিলেন , কিন্তু দরজার সামনে গম্ভীর মুখো প্রিয়তা বেগমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ঢোক গিললেন। প্রিয়তা বেগম এখন কী ভাবছেন? তার মাথায় কী চলছে , জাহানারা বেগমের তা জানা নেই!
চলবে—

