চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৮ #আরোবী_খান_সিনথিয়া

0
1

#চৈত্রের_প্রেম_নির্বাসন — — ১৮
#আরোবী_খান_সিনথিয়া

প্রায় ১ ঘন্টা পর মাহিরের গাড়ি থেমেছে পতিতাদের এলাকায় ! রাতের আঁধারে রঙিন লাইটে জ্বলমল করছে সবকিছু ! আসছে একেক বাড়ি থেকে শব্দ! কখনো আসছে গালির শব্দ ! মাহির হন্তদন্ত একেক জায়গায় ছুটছে ! তার কদম জোড়া থেমেছে এক বিশাল বড় বাড়ির সামনে ! বাড়িটির দেয়ালের টেমপ্লেটে লেখা সৌদামিনি নিবাস! বাড়িটির দরজা খোলা ! ভেতর থেকে হট্ট হাসির সোরগোল হাসছে !

মাহির দ্রুত ছুটে গেল সেদিকে! কয়েকটি কম বয়সী মেয়ে মাহিরকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে , কিছুটা বিস্মিত হলো ! কয়েকজন বলিষ্ঠ দেহের পুরুষ ছুটে এসে আটকালো মাহিরকে!

“কী চাই , ভাই ?” একজন সবে মাহিরকে প্রশ্ন করেছিল ; তার পাশের লোকটি উৎসুক হয়ে বলল ,

— “এত হম্বিতম্বি করে ভেতরে ঢুকলেন কেন?
জায়গাটাকে কী পাবলিক পার্ক পেয়েছেন নাকি?”

মাহির আশপাশ দেখতে দেখতে বলল ,
— “মেয়ে চাই !”

মাহিরের কথা শুনে হেসে উঠল লোক দু’টো। মাহিরকে দেখল‌ , অগোছালো মাহির পুরো ! পরণের শার্ট মলিন হয়ে আছে ! উসখো খুসকো চুল ! মাহিরকে ভীষণ চিন্তিত লাগছে ! লোক দু’টো চোখের ইশারায় কথা বলল।

এক লোক মাহিরকে প্রশ্ন ছুঁড়ল ,

— “ সৌদামিনি দিদির সাথে দেখা করতে হলে , টাকা লাগে বাপু ! তোমাকে দেখে তো মনে হচ…”

মাহির তাদের কথা শেষ করতে না দিয়েই , নিজের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করল ! মানিব্যাগের ভেতর এক বান্ডিল হাজার টাকার নোট ছিল! টাকার বান্ডিল লোকটার হাতে দিয়ে বলল ,

— “বিল হওয়ার পর বাকিটা !”

লোকগুলো আবার ইশারায় কথা বলল। ফের মাহিরকে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে বলল। এক কম বয়সী আসল মাহিরের কাছে। চা , কফি কিছু খাবে নাকি প্রশ্ন ছুঁড়ল। কিন্তু মাহির সাথে মাথা নাড়ালো ডানে বামে! সে কিছু খাবে না ! মেয়েটি মলিন মুখে চলে গেল।

মাহির অপেক্ষা করল কয়েক মিনিট। তার মাঝে তার মোবাইলে কল আসল। মাহির মোবাইল দেখল , পুলিশ অফিসারের ফোন এসেছে। মাহির আশপাশ তাকাতে তাকে কল তুলল। মোবাইলের অপরপাশ থেকে ভেসে আসল পুলিশ অফিসারের অস্থির কন্ঠ ,

— “স্যার আমরা আসব ?”

মাহির ক্ষীণ কন্ঠে বলল , — “কতবার বলব , এখন না! অপেক্ষা করুন। আমি আগে দেখে নেয় , পিহু এখানে আছে নাকি ! সিউর হলেই আপনাদেরকে বলছি ! তার আগে কেউ এখানে আসবেন না ! অপেক্ষা করুন !”

“ওকে স্যার !” — কথাটা বলেই পুলিশ অফিসারটি কল কেটে দিল। মাহিরকে অনেক বলেছিল , মাহির যেন সেখানে একা না যায় ! কিন্তু মাহির শুনল না ! পুলিশ অফিসারদের দেখলে , সেখানে পিহুকে খোঁজার আগেই ঝামেলা হতে পারত ! পিহুকে ফের যদি না পেত ? তাহলে ? তখন ?

মাহির তখন প্ল্যান কষল! মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে , ব্যাংকের থেকে টাকা উঠিয়ে সোজা এখানে এসেছে!
তাহিরের এত চিন্তা-ভাবনার মাঝে , সৌদামিনি দিদি আসল ! হাতে তার পানের বাটি! মুখে পান চিবোতে চিবোতে , তিনি মাহিরকে পরখ করলেন !

মাহির তাকে দেখে এক মুহূর্ত অস্বস্তি ফিল করল। ফের নিজেকে সামলে উঠল। সৌদামিনি দিদি সোফায় বসে , প্রশ্ন ছুঁড়লেন ,

— “কী বাপু ? তুমি তো মির্জাদের ছেলে ! এ পাড়ায় কী করছো শুনি ? তুমি তো আলভি মির্জার ছেলে , তাই না? মির্জা ইন্ড্রাস্ট্রির উত্তরসুরী!”

মাহির মাথা নাড়ল। হ্যাঁ , সেই ! সৌদামিনি দিদি হাসলেন , — “তাই বলো ! তোমাকে দেখে আমি চমকালাম অনেক ! কিন্তু তোমারই তো বয়স এসব করার ! তা তুমি তো দেখছি , একবারে কদম রেখেই , মেয়ে নিতে চলে আসলে , বাপু ?”

কথাটা বলেই থেমেছিলেন সৌদামিনি দিদি। ফের হেসে বললেন , — “ভেবেছিলাম , রাত কাটিয়ে পর দিন চলে যাবে ! তোমাকে ঐ বারান্দা দিয়ে দেখছিলাম আমি ! টাকা যখন ছুঁড়লে , বুঝে গেলাম মেয়ে নিতে আসছো ! তা বলো , কেমন মেয়ে চাও তুমি ?”

মাহির এক শ্বাস টেনে বলল , — “ কম বয়সী ! এই বয়স পনেরো ষোল হবে এমন !”

সৌদামিনির দিদির মুখে হাসি ফুটল। হেসে হেসেই বললো , — “জানো বাপু ? আজই এই বয়সের এক মেয়ে এনেছিল আমার ছেলে-পেলে ! আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম ! এই বয়সের দাম খাসা হয় ! কিন্তু এতটা ভাগ্যবান হবো ভাবিনি ! দেখো আমদানি হতে হতে মেয়েটা রপ্তানি হতেও চলল !”

কথাটা বলেই সৌদামিনি উঠলেন। হাত দিয়ে ইশারা করলেন মাহিরকে তার সাথে আসতে। বাড়িটার দোতলায় নিয়ে আসলেন ! অনেক মেয়েরায় মাহিরকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখল। মাহির তাকাতেই লুকিয়ে পরল। এক রুমের সামনে আসতেই থামলেন সৌদামিনি দিদি। ফের বললেন ,

— “জানো ভেবেছিলাম , মেয়েটাকে বাইরেই বিক্রি করে দেব ! কিন্তু ফের না জানে , মেয়েটাকে রেখে দিলাম কেন ? মনে হচ্ছে , তোমার জন্য খোলা আমার মনটা পাল্টালেন ! তোমারই কপালে ছিল মেয়েটা !”

কথাটা বলতে বলতে দরজাটা খুললেন সৌদামিনি দিদি। মাহির সেখানে তাকালো কৌতূহল নিয়ে! একটা মেয়ে বিছানার কাছে ফ্লোরে বসে আছে ! চোখ , মুখ বাঁধা! হাত , পা দু’টোও বাঁধা ! মেয়েটা…মেয়েটা আর কেউ নয় , পিহু! মাহির পিহুকে দেখে থমকে গেল এক মুহূর্ত। ছুটে পিহুর কাছে যাবে তার আগেই , মাহিরের বাহু ধরে থামিয়ে দিলেন সৌদামিনি দিদি ! মাহির তাকালো বিস্ফোরিত চোখে সৌদামিনির দিকে!

সৌদামিনি দিদি হাসলেন। ফের বললেন ,

— “এত তাড়া কিসের বাপু ? মেয়েটাকে দেখছি , এক সেকেন্ডেই মনে ধরে গেছে তোমার !”

মাহির দাঁতে দাঁত পিষে বলল , — “হাত ছাড়ুন আমার!”

সৌদামিনি দিদি মুখ বাঁকালেন। হাত ছাড়লেন ! মাহির নিজেকে সামলে রুমে ঢুকল। তার পেছন পেছন সৌদামিনি দিদি আসলেন। মাহির এক হাঁটু গেড়ে পিহুর সামনে বসল। পিহু থুতনি ধরে , মুখ উঁচিয়ে দেখল মাহির পিহুকে! পিহু বন্দী পাখির মতো ছটফট করল!

সৌদামিনি দিদি কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লেন ,
— “চাই !”

মাহির মাথা নাড়ল , — “হু !”

সৌদামিনি দিদি খুশি হলেন উত্তর শুনে। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখে প্রশ্ন ছুঁড়লেন , — “কত দিবে ?”

মাহির চাপা স্বরে বলল , — “কত চাই ?”

সৌদামিনি দিদি চুপ থাকলেন। মাহির উত্তর না পেয়ে , তাকালো সৌদামিনির দিকে।

সৌদামিনি দিদি মাহিরের চোখে চোখ রেখে বললেন ,
— “বেশি না ! মেয়েটা কিন্তু পুরোই নতুন , ওকে কিন্তু এখন অব্দি কোন পুরুষ ছুঁতেও দেয় নি বাপু !”

মাহির পিহুর দিকে তাকালো। পিহু ইতোমধ্যে মাহিরের কন্ঠ শুনে থমকে গেছে। এক দু’বার কিছু বলতে চাচ্ছে বোধ হয় তাই মরা মাছের মতো ছটফট করে উঠছে!

মাহির ফের প্রশ্ন ছুঁড়ল , — “কত ?”

সৌদামিনি দিদি এবার উত্তর করল ,
— “পঞ্চাশ লাখ !”

মাহির চোখের পলক ফেলে বলল , — “ওকে !”

মাহির উঠে পরল। টাকার ব্যবস্থা করছে বলে রুম থেকে বের হয়ে ফোন করল পুলিশ অফিসারকে । আসতে বলল!

কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে এক পুরুষের চেঁচামেচির শব্দ আসল , — “দিদি! দিদি ! পুলিশ এসেছে ! যলদি আসো !”

সৌদামিনি দিদি পিহুর পাশ থেকে সরে আসতেই নিচ্ছিলেন ! কিন্তু মাহিরকে রুমে দ্রুত কদমে ঢুকতে দেখে থামাতে চাইলেন। কিন্তু মাহির তাকে ধাক্কা মেরে , পিহুর কাছে ছুটে আসল। পিহুর চোখের পট্টি খুলল। পিহুর মুখ খুলে , গালে হাত রাখল ! অস্থির কন্ঠে
বলল ,

— “ঠিক আছিস তুই , পিহু?”

পিহু ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মাহির আর পিহুকে এমন অবস্থায় দেখে থমকালেন সৌদামিনি দিদি। কিছুটা টের পেলেন কী হচ্ছে এসব ? দোতলায় পুলিশসহ সৌদামিনির লোকও ছুটে আসল !

পিহু মাহিরকে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে। তাদের বিপরীত পাশে সৌদামিনি দিদি বন্দুক হাতে ! নিশানা মাহিরের দিকে তাক করা !

সৌদামিনি দিদিকে বন্দুক নিচে নামাতে বলছে বার বার পুলিশ অফিসার গুলো! কিন্তু সৌদামিনি বন্দুক সেট করে , দাঁতে দাঁত পিষে বললেন ,

— “আমার কাছে আসা মেয়েগুলো কখনো ফেরত যায় না , পুলিশ বাবু ! হয়ত এই মেয়ের দাম দিন নয়ত মেয়ের লা/শ নিয়ে যান !”

পুলিশ অফিসার চেঁচিয়ে উঠল ,
— “বন্দুক নিচে নামাও , সৌদামিনি ! না হলে আমি তোমাকে শুট করতে বাধ্য হবো !”

সৌদামিনি দিদি হাসলেন । ফের বললেন ,

— “তোমাদের এত সাহস নেই , পুলিশ বাবু ! যে আমাকে মারবে ! না হলে , ওপর মহলকে কী উত্তর দেবে ? আমি তোমাদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে ! তোমরা আমাকে জে/লে পর্যন্ত ঢোকাতে পারবে না ! শুধু শুধু বৃথা চেষ্টা কেন করছো ? ভালোই ভালোই আমার কথা মেনে নাও , নয়ত এ সৌদামিনি ভিলায় নিজের পায়ে হেঁটে আসলেও , ফেরত যাবে লাশ হয়ে !”

মুহূর্তেই সৌদামিনির আরও লোক বন্দুক নিয়ে হাজির হয়েছে ! পুলিশদের মাথায় বন্দুক ঠেকানো। সৌদামিনি হাসল ! মাহির পরিস্থিতি দেখে , হাত উঁচিয়ে বলল ,

— “থামুন ! থামুন ! আপনার টাকা চাই তো ? আমি দিব!কত বলে ছিলেন , পঞ্চাশ লাখ ? আমি দরকার পরলে , এক কোটি দিব ! তারপরও বন্দুক নিচে নামান প্লিজ !”

সৌদামিনি হাসল। নামালো না বন্দুক ! হেসে হেসেই বললো , — “বাপু ? কী ভেবেছিলে আমাকে ? পুলিশ আনলেই , পেয়ে যাবে আমাকে ? একবারও ভাবলে না , পুলিশরাও সৌদামিনির কাজ জানে ! সৌদামিনি কী কাজ করে ? তার ঠিকানাও জানে ! তারপরও কেন সৌদামিনি ভিলার দরজা খোলা থাকে ? কেন এখনো সৌদামিনি জেলের আসামী না পেয়ে মুক্ত পাখির মতো উড়ছে !”

মাহির উত্তর দিল না। সৌদামিনি ফের বলল ,

— “এক কোটি টাকায় দিবে এখন বাপু তুমি ! ভীষণ ভুল করে ফেলেছো ! তা কীভাবে দিবে শুনি ? আবার ফোন করে কোন পুলিশকে ডাকবে ?”

মাহির অস্থির কন্ঠে বলল , — “কোন পুলিশকেই ডাকব না ! এবার সত্যি সত্যি টাকা পেয়ে যাবেন ! প্লিজ বন্দুক নিচে নামান !”

সৌদামিনি উত্তর করল না। ইশারা করতেই , মাহিরের সামনে বন্দুক হাতে দু’টো বিশাল দেহ বিশিষ্ট লোক আসল ! পিহুকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল মাহির থেকে ! ততক্ষণে পুলিশদের থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে! মাহিরকে যাওয়ার ইশারা করল সৌদামিনি দিদি। মাহির যেতে চাইল না !

মাহির বলল ফোন স্পিকারে রেখে কল করল চাচ্চুকে। পরিস্থিতি জানিয়ে দ্রুত টাকা আনতে বলল। ঘন্টা খানেকের মধ্যে টাকা ভর্তি ব্যাগ হাতে আলিফ মির্জা আসলেন সৌদামিনি মহল !

সৌদামিনি দিদি হাসল ! টাকার ব্যাগ হাতে নিয়ে বলল ,

— “আগেই টাকা দিয়ে দিলে , এত কিছু করাই লাগত না ! শুধু শুধু !”

আলিফ মির্জা চাপা স্বরে বললেন ,
— “আমার মা কোথায় , সৌদামিনি ?”

সৌদামিনি হাসল। ইশারায় পিহুকে আনতে বলল। বন্দুক ঠেকিয়ে ঠেকিয়ে সবাইকে ড্রয়িংরুমে আনা হলো! পিহুর বাহু ধরে সৌদামিনি তাকে ছুঁড়ে মারল আলিফ মির্জার কাছে ! আলিফ মির্জার পাশে দাঁড়ানো মাহিরের কাছে ছুটে আসল পিহু! মাহিরও ছুটে আসল পিহুর কাছে। পিহু কাঁদতে কাঁদতে মাহিরকে জাপ্টে ধরল !

পুলিশ অফিসারদের শাসালো সৌদামিনি দিদি ! আবার যেন কেউ এমন বেয়াদবি না করে সৌদামিনি মহলে ! না হলে এরপর শুধু বন্দুক চলবে ! মুখ না ! এরপর জ্যান্ত না , মৃত লাশ হয়ে বের হবে তারা !

পুলিশরা শুধু কটমট করে তাকালো সৌদামিনির দিকে। সবাইকে বন্দুকের নলেই বের করা হলো সৌদামিনি মহল থেকে। আলিফ মির্জা চেঁচিয়ে উঠলেন পুলিশ অফিসারদের ওপর ! পিহুর ঠিকানা যখন পতিতালয়ে মেলল ! তাকে কেন কেউ কিছু বলল না ? সৌদামিনির সাথে ঝামেলা করতে কেন গেল তারা ? কিন্তু পুলিশ নিশ্চুপ !

মির্জাদের গাড়ি ছুটল মির্জা বাড়ির দিকে। পূর্ণতা বেগমকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন রাশেদা বেগম! সবাই পিহুর খোঁজ মিলেছে জেনে , অপেক্ষা করছে!

চলবে—

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here