#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৩ (শেষাংশ)
কান্না।
মানুষের বেদনা প্রকাশের অনুভূতি। কান্নাকে কেউ ভাবে দূর্বলতা, কেউ ভাবে কষ্ট বের করে দেয়ার শক্তিশালী উপায় আবার কেউবা ভাবে লজ্জাজনক। জীবনে কখনোই কাঁদেনি এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। তার চেয়েও বিরল জায়দানের মতন মানুষেরা। যাদের অনুভূতির হিসাব মিলিয়ে উঠতে লেগে যায় বছরের পর বছর।
জন্মের পরপর না কাঁদায় ডাক্তারের কত কসরত করে জায়দানের হৃদযন্ত্র সচল করতে কাঁদাতে হয়েছিল তা সে নিজে না জানলেও জানেন জেসমিন। স্মৃতিগুলো মলিন হলেও পুরোপুরি মুছে যায়নি অন্তর থেকে। জন্মের পর আজ যেন প্রথমবার নিজের বড় ছেলেকে কাঁদতে দেখছেন তিনি। দেখছে সবাই। চোখের সামনে স্বয়ং মৃত্যুদূত এসে দাঁড়ালেও যে বান্দার অভিব্যক্তি নির্লিপ্ত থাকার কথা, তেমন একটা অনুভূতিহীন মানুষের চোখ বেয়ে অবাধে অশ্রু গড়ানোর বিষয়টা নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মতনই আশ্চর্য্যজনক।
অথচ আজ বাঁধ মানলনা জায়দান। রোবটতুল্য শরীর কিভাবে এতদিন বুকের ভেতর এতটা আবেগ লুকিয়ে রেখেছিল তা বুঝতে সে নিজেও অপারগ। সাবিনকে নিজের কাছ থেকে আস্তে করে সরিয়ে দাঁড় করালো জায়দান। বাদামী চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরতে ঝরতে ঝাপসা দেখছে সে। ভাঙা চশমাখানি চোখ থেকে খুলে নিয়ে হাতের উল্টোপিঠ চোখে চাপলো অশ্রু বন্ধ করতে। অথচ কোনো বাঁধাই আজ কাজ করলোনা। অর্ধাঙ্গিনী তার হতবাক হয়ে চেয়ে আছে আপন ছলছল দৃষ্টিতে। জায়দানের অশ্রুপাত সংক্রমিত করেছে সাবিনকেও।
“তুমি যখন আয়দানের জন্য সোয়েটার বুনতে, আমারও ইচ্ছা হতো একটার আবদার করতে। যখন ওর জন্য আঁচার বানাতে, আমারও ইচ্ছা হতো একটুখানি চেখে দেখতে। ইচ্ছা হতো, বাহির থেকে ভেতরে এসে তোমার সঙ্গে একবেলা খাবার খেতে, ইচ্ছা হতো তোমার কোলে মাথা রেখে নিজের সারাদিনের ক্লান্তি ভুলতে। আম্মু…আমার চাওয়াটা কি খুব ভারী যে তুমি বইতে চাওনি কোনোদিন?”
জায়দানের কন্ঠস্বর ভেঙে গিয়েছে সম্পূর্ণ। কান্নামাখা কাঁপা কাঁপা গভীর কণ্ঠের আর্তনাদ কাউকে শান্ত থাকতে দিলোনা। কখন যে কার অশ্রু বয়ে নেমে বুক ভিজিয়েছে কেউই টের পেলনা। জায়দান নিজের কান্না থামাতে চাইলেও কেন যেন পারছেনা। কখনো আবেগ না দেখানোর কারণে আজ বুঝি সবটা উপচে বেরোচ্ছে। কে জানে আর কোনোদিন বেরোতে পারবে কিনা!
“স্কুলে – কলেজে সবার বাবা মা তাদের পাশে থাকতো। প্রত্যেকটা পাবলিক পরীক্ষা, প্রত্যেকটা রেজাল্টের দিন, প্রত্যেকটা ফার্স্ট ইন এভরিথিং হওয়ার দিন আমি আশাহত হয়ে তোমায় খুঁজতাম আম্মু! আমি জানতাম তুমি আসবে না! কোনোদিন এসে বলবে না, জায়দান আম প্রাউড অব ইউ! কোনোদিন না! তবুও কেন খুঁজতাম? আব্বুকে কোনোদিন খুঁজিনি, অথচ তাকে জোর দিয়ে বললো সে আসতো! অথচ আমি তোমায় খুঁজলাম, পাবো না জেনেও খুঁজলাম দিনের পর দিন। প্রত্যেকটা অ্যাচিভমেন্ট, প্রত্যেকটা প্রাইজ গিভিং সারমোনি, প্রত্যেকটা অ্যাওয়ার্ড রিসিভিংয়ে আমার অভিভাবকের সিটটা ফাঁকাই পরে রইলো। গোটা দুনিয়ার মানুষ আমায় শুভেচ্ছা জানিয়ে ফেললো, অথচ আমি আমার আম্মুর ঠোঁটের সন্তুষ্ট হাসিটুকু অবধি কোনোদিন দেখতে পেলাম না!”
সমস্ত ঘর ভরে উঠেছে জায়দানের ফোঁপানোর আওয়াজে। অশ্রু গড়িয়ে তার গলা থেকে বুক অবধি ভিজিয়ে ফেলেছে। অশ্রুসিক্ত হয়ে টি শার্ট লেপ্টে গিয়েছে বুকে।
“দিনের পর দিন আমি মিথ্যা আশা নিয়ে বেঁচেছি। ভালো পড়ালেখা করলে আম্মু আমায় ভালোবাসবে। সবকিছুতে ফার্স্ট হলে আম্মু আমায় ভালোবাসবে। ভদ্র থাকলে আম্মু আমায় ভালোবাসবে। নিজেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় নিয়ে পৌঁছাতে পারলে আম্মু আমায় ভালোবাসবে! একদিন…একদিন না একদিন আম্মু আমাকে ভালোবাসবেই! আমাকে জন্ম দিয়েছে যে! বছরের পর বছর বাঁচার জন্য নয়, আমি তোমার জন্য বেঁচেছি আম্মু, শুধু তোমার জন্য!”
“ভাইয়া, চুপ করো, প্লীজ!”
মৃদু গলায় আকুল আর্জি জানালো আয়দান। ভাইয়ের এমন ভগ্ন রূপ সে সইতে পারছেনা। অথচ তাকে বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে জায়দান কান্নাজড়িত ভারী কন্ঠে বলতে লাগলো,
“আমার কি কষ্ট হয়না আম্মু? তুমি আমাকে দূরে ঠেলে আয়দানকে ভালোবাসলে আমার কষ্ট হয় আম্মু! এইযে, তুমি এখন ওর বুকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে শীতল দৃষ্টিতে চেয়ে আছো, আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে আম্মু!”
মিসির দুহাতে নিজের চোখ চেপে ধরলো, তার ইচ্ছা হচ্ছে কোনোভাবে নিজের কান দুটোও বন্ধ করে নিতে। বন্ধুর এমন আকুতি সে সহ্য করতে পারছেনা। মনে হচ্ছে বারংবার তার বুকটা ভেঙে খানখান করছে কেউ। তার নিজের মায়ের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। আজ সকালেও তিনি ফোন করে বলছিলেন, মিসির যেন এই সপ্তাহে অবশ্যই তার সাথে গিয়ে দেখা করে। তার বাবা মা দুজন ঢাকার বাইরে থাকেন বিধায় সপ্তাহে, দুই সপ্তাহে মিসির যায়। কখনো কাজের বাহানায় তাও হয়না। অথচ ওই মহিলার কি টান! মাতৃত্বের টান! কাছে না থেকেও ছেলের প্রতি নাড়ির টান। অথচ জায়দান নিজের বাড়িতেই…! ভাবতেই চোখ ঠিকরে অশ্রু উপচে গড়ালো মিসিরের।
“আমি শুধু তোমার একটুখানি ভালোবাসা চেয়েছিলাম আম্মু! আমি তোমার আদরের কাঙাল। এক বিন্দু আবেগ হলেও আমার চলতো। ক্ষুধার্ত নেড়ী কুকুর যেমন খাবারের পিছন পিছন ঘোরে, তেমনি আমি তোমার স্নেহের পিছনে ঘুরেছি, আম্মু! এত লোভ ছিল আমার তোমাকে পাওয়ার যে আমি নিজের স্ত্রীর প্রতি পাষাণ হতেও দ্বিতীয়বার চিন্তা করিনি! আমি দিনের পর দিন সাবিনের প্রতি তোমার সকল অন্যায় – অত্যাচার দেখেও চুপ থেকেছি। আমার বুক ফাটতো তবু মুখ ফুটতো না! কেন জানো আম্মু? আমি ভয় পেতাম! তোমাকে পাওয়ার আগেই হারিয়ে ফেলার ভয়! আমি একজন ভালো ছেলে হওয়ার লোভে একজন ভালো স্বামী হতে পারিনি!”
জায়দানের শরীর কাঁপতে শুরু করেছে কান্নার দমকে দমকে। অথচ সে থামতে পারছেনা আজ। চাইছে, কিন্তু সম্ভব হচ্ছেনা। টি শার্টের নিচের অংশ তুলে সে চোখ মুছলো, পুনরায় অশ্রু এসে ভরে গেলো।
“আমার আম্মু আমাকে সইতে পারতোনা। আমার আব্বু থেকেও নেই, অধরা ছায়া। আমার ভাই আমায় ঘৃণা করতো, মনস্টার ভাবতো! আর আমার বউ? আমার বউ আমাকে অন্যের সাথে তুলনা করতো! তার মতে আমি তার যোগ্য ছিলাম না, সে নিজের চাচাতো ভাইয়ের মতন ছেলে জীবনে চাইতো। আমার মতন নিরামিষ মানুষটা তার জীবন এতটাই তছনছ করে রেখেছিল যে সম্পর্ক শেষ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল সে। আমার চারপাশের প্রত্যেকটা মানুষ সুখী ছিল, ছিলাম না শুধু আমি! তাদের স্বপ্ন, জীবনে ছিলো অন্য সবাই, জায়গা ছিল না শুধু এই আমিটার! যেন তাদের পায়ের ছিঁড়ে যাওয়া জুতা আমি, যার কাজ ঘরের কোণায় অবহেলায় পড়ে থাকা।”
“জায়দান, আ’ম সরি! আ’ম সো সরি মাই লাভ! আমি বুঝতে পারিনি, কোনোদিন বুঝতে পারিনি!”
হাহাকার করে উঠল সাবিন। তার খুব ইচ্ছা করছে এই মুহূর্তে আরো একবার শক্তভাবে তার প্রিয়তমকে জড়িয়ে ধরে। ভুলিয়ে দেয় তার সকল যাতনা। অথচ আজ সে বুঝতে সক্ষম, অতীতে সে নিজেও কিভাবে এই মানুষটার যন্ত্রণায় ভূমিকা রেখেছে।
আজ তিনটি মানুষ ভীষণ অপরাধী ভঙ্গিতে জায়দানের সামনে চোখের পানি ফেলছে নীরবে। তার স্ত্রী সাবিন, ভাই আয়দান এবং পিতা জাফর। জায়দানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেন ক্রন্দনে মেতেছে তারাও। একমাত্র পাথরের ন্যায় স্থির, বরফের ন্যায় শীতল দন্ডায়মান জেসমিন। খটখটে শুকনো চোখ। তীক্ষ্ণ চাহুনি। আবদ্ধ নজর তার বড় সন্তানের উপর। যে আজ ভাঙাচোরা এক আয়না।
“জীবনে কত বড় মহাপাপ করলে এমন ভয়ানক অভিশাপ গায়ে লাগে আমার জানা নেই। কিন্তু আমি এটুকু জানি আম্মু, এটুকু আমি নিশ্চিত, তুমি আমায় কখনোই ভালোবাসবে না। কক্ষনো না!”
ফোঁপানি বন্ধ হয়েছে জায়দানের। চোখ থেকে মোছেনি অশ্রু, যেমনটা দূর হয়নি নিদারুণ কষ্টের ছাপ। নিষ্পলক চেয়ে আছে সে জেসমিনের দিকে। সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া গলায় সে অবুঝ হয়ে প্রশ্ন করলো,
“আমাকে একটুখানি আদর করবে, আম্মু? শুধু একটুখানি, এক চুল পরিমাণ?”
আকুল আর্জি। হৃদয়কে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার মতন বেদনা। জেসমিন পলক ফেললেন না। নড়লেন না। জায়দান পায়ে পায়ে তার মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ালো। একেবারে কাছে। নিজের একটি হাত তুললো, ভীষণ কাঁপলো তা, যেন ছুঁয়ে দিতে চাইলো জননীকে। অথচ স্পর্শ করার সাহস তার হলোনা। হাত সরিয়ে নিলো সে, শক্ত একটি ঢোক গিলে কান্না টেনে শিশুর মতন শুধালো,
“আমি কি খুব খারাপ, আম্মু?”
জেসমিনের তরফ থেকে কোনো জবাব এলোনা। তিনি আজ বাকরুদ্ধ। জীবনের সমাপ্তিতে এসে তিনি প্রথমবারের মতন বড় সন্তানের চোখে অশ্রুজল দেখলেন। এর চাইতে বড় পাওনা কিংবা অভিশাপ এক মায়ের জীবনে আর কি হতে পারে?
জায়দান হাঁটু ভেঙে উবু হয়ে বসলো। মাথাটা ঝুঁকিয়ে আলতো করে জেসমিনের একপাশে ঝুলতে থাকা হাতে ছোঁয়ালো আলতো করে। জেসমিন সামান্য কেঁপে উঠলেন, বুঝি তার তন্দ্রা ভাঙলো। নড়েচড়ে উঠলো হাতের আঙুল। জায়দান রীতিমত ফিসফিস করে বললো,
“পরপারে দেখা হলে আমাকে একটাবার জড়িয়ে ধরো, আম্মু। আমি অনন্তকাল সেই এক আলিঙ্গনের মায়ায় কাটিয়ে দেব নাহয়।”
জেসমিন বুঝি বিদ্যুৎ ঝটকা খেলেন। নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে তৎক্ষণাৎ দূরে সরে দাঁড়ালেন। প্রসারিত নয়নজুড়ে তার অব্যক্ত প্রকাশ। জায়দান নীরবে বেশ খানিকক্ষণ বসে রইল। অতঃপর উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে টলটলে অনুভব থাকলেও অশ্রু শুকিয়ে দাগ হয়ে এসেছে। আগের মতন বাঁধভাঙা আবেগটুকু আর প্রকাশ পেলনা তার কন্ঠে। চারপাশে চেয়ে সে প্রত্যেককে একবার একবার করে দেখলো। জাফর উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছেন, তার চেহারা দেখা যাচ্ছেনা। আয়দান মুখ ঢেকে রেখেছে। একপাশে মিসির টলটলে চোখে চেয়ে আছে, তার পাশে আরওয়া নিজের ওড়না চেপে অতি আপ্লুত মুখে দেখছে সবকিছু। সাবিন মেঝের দিকে তাকিয়ে রয়েছে, তার দুই গাল বেয়ে নীরবে অশ্রু গড়াচ্ছে।
অবশেষে দৃষ্টি জেসমিনের উপর ফেরালো জায়দান। তার কন্ঠে ধ্বনিত হলো,
“সাবিন হুসেইন জায়দান আরেফিনের এক ও একমাত্র অর্ধাঙ্গিনী। এই সত্যটা মেনে নিতে যদি কারো কষ্ট হয়, সে নির্দ্বিধায় নিজের অবোধ পুত্রকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতে পারে। এই পুত্র মাম্মি ডেকে বাপের হোটেলে পা তুলে খাওয়া কোনো নাপুরুষ নয় যে নিজের ও নিজের স্ত্রীর ভরণপোষণ বইতে পারবেনা। জায়দানের নামের শেষে আরেফিনের আশ্রয় না থাকতেই পারে, তবুও সে ড. জায়দান!”
পিনপতন নীরবতা ভর করল চারপাশে। নির্বাক প্রতিক্রিয়া। জায়দান পিছিয়ে গেলো ধীরে ধীরে। জেসমিনের মাঝেই দৃষ্টি বজায় রাখলো সে। একটা টু শব্দও উচ্চারণ না করা জননীর দিকে চেয়ে সে প্রচণ্ড অসহায় বোধ করলো। তার ব্যথিত কন্ঠস্বর যেন তীরের ফলার মতন বিঁধলো উপস্থিত প্রত্যেকের হৃদয়জুড়ে।
“আমি জীবন নামক যুদ্ধক্ষেত্রে লড়তে নেমে দেখলাম, প্রতিপক্ষ আমার মা।”
এটুকুই। কি যেন হয়ে গেলো জায়দানের। সে আর থাকতে পারলোনা কারো সামনে। উল্টো ঘুরে হনহন করে এগোলো বাসার দরজার দিকে। ঠিক তখনি জাফরের ভাঙা কন্ঠস্বর তাকে পিছন থেকে ডাকলো,
“জায়দান…বাবা আমার, প্লীজ আমায়…”
“স্টপ ট্রিটিং ইওর কিড লাইক ইওর পাঞ্চিং ব্যাগ!”
জায়দানের ভয়ানক হুংকার কাঁপিয়ে দিলো বুঝি গোটা ধরিত্রীকে! প্রতিধ্বনিত হলো তা দেয়ালে দেয়ালে অশনীর সংকেতের মতন। জাফরসহ প্রত্যেকে জমে গেলো। মাথা কাত করে চেয়ে জায়দান গর্জন তুলে বললো,
“আমরা র*ক্ত মাংসে গড়া জ্বলজ্যান্ত মানুষ! বাবা মায়ের স্ট্রেস রিলিভার মেশিন নই! শুধুমাত্র তোমরা কষ্ট করে এসেছ বলে সন্তানদেরও কষ্ট সহ্য করতে হবে এই বুলশিট ধারণা পরিবর্তন করো! স্টপ পাসিং ডাউন ইওর ট্রমা! নো কিড আস্কড ফর ইট! ফাকিং ব্রেক দ্যা সাইকেল!”
চৌকাঠের বাইরে পা রাখলো জায়দান, শেষ একটি বাক্যই উচ্চারণ করলো সে,
“আজ থেকে আমার সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন হলো একজন বাবা হওয়া!”
আর দেখা গেলনা তাকে। অনুভূতিহীন মানুষটা কিছু সময়ের অতি আবেগে সকলকে ভাসিয়ে রেখে আড়াল হয়ে গেলো দৃষ্টিসীমানার। মিলিয়ে গেলো তার অস্তিত্ব, সকল যাতনাটুকু বুকের ভেতর চেপে।
সে চলে যেতেই ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়ল এক রমণী। পরাজিত ভঙ্গিতে যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইলো তার সমস্ত সত্তা। জায়দানের অর্ধাঙ্গিনী, তার ভালোবাসার সাবিন। সে স্বামীকে অনুসরণ করলো না। অথচ অনুভব করলো তার সকল অব্যক্ত অনুভূতিদের। তাতেই তার মনে হলো, দম বন্ধ হয়ে মারা যাবে সে।
***
জানিনা এই মুহূর্তে ঠিক কেমন লাগছে আমার। পৃথিবীতে এমন কোনো ভাষা আবিষ্কার হয়নি যে ভাষার শব্দ দিয়ে আমি নিজের অনুভূতিকে জাহির করতে পারবো। অসীম শূন্যতা, সুবিশাল ফাঁপা জগৎ। কোথাও কোনো কূল নেই। যেন অনন্তকাল ধরে আমি এক অশেষ পথ চলছি।
কতক্ষণ নির্বাকতায় অবরুদ্ধ সময় কেটেছে আমি জানিনা। আমার চোখের সামনে সর্বপ্রথম এসে দাঁড়ালো একজোড়া মেয়েলী পা। উবু হয়ে সে বসতেই দেখতে পেলাম, আরওয়া। আমার কাঁধে হাত রেখে সে সোজা করে বসালো আমায়। চোখমুখ মুছে নিলেও অশ্রুপাতের দরুণ তা ফুলে রয়েছে মেয়েটার। কিছুই বোধ করলাম না। আরওয়া মুখে কিছু না বলে নীরবে নিজের বাম হাত থেকে স্বর্ণের একটা আংটি খুলে নিলো। আমার হাতের তালুতে সেটি চেপে রেখে বললো,
“আমি আজ এটা ফিরিয়ে দিতে এসেছিলাম।”
আমার গালে একটি হাত ছুঁইয়ে সে ফিসফিস করে উচ্চারণ করল,
“পারলে কোনোদিন আমাকে মাফ করে দেয়ার চেষ্টা করবেন।”
আর থাকলো না সে। জায়দানের পর দ্বিতীয়বার বাসা থেকে বেরিয়ে গেলো আরওয়া। মিসির ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল, তাকে অনুসরণ করলোনা। হাতের মাঝে সোনার আংটিটা মুষ্টি পাকিয়ে ধরে আহাম্মকের মতন বসে থাকলাম আমি। মাথাটা কাজ করছেনা। এতটা গভীর অনুভূতি শেষ কবে আমায় ছুঁয়েছে, কিংবা আদৌ ছুঁয়েছে কিনা আমার অজানা। সবেমাত্র নিজেকে একটুখানি সামলে উঠে দাঁড়িয়েছি কি দাঁড়াইনি, তখনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালো আয়দান। ভোঁতা যাতনা নিয়ে আমায় দেখলো সে। অপ্রত্যাশিতভাবে মাথা সামান্য ঝুঁকিয়ে বিগড়ে যাওয়া ছেলেটা আমায় বললো,
“আমি তোর বন্ধু হতে চাই না, কিন্তু তোর ক্ষমা চাই। শত্রুকে ক্ষমা করিস, পারবি না?”
মস্তিষ্ক আমার কিছু বিশ্লেষণ করার আগেই আমায় অবিশ্বাসের সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে এগিয়ে এলেন জাফর। ছেলের সুউচ্চ অবয়বের পাশে দাঁড়িয়ে প্রাণহীন অথচ সততাপূর্ণ গলায় তিনি বললেন,
“কারো কাছেই ক্ষমা চাওয়ার মুখ আমি নিজের রাখিনি। তবুও লজ্জাহীন বেহায়া বলেই তোমার সামনে দাঁড়িয়ে বলছি, ক্ষমা করো।”
পিতা এবং সন্তানের নতমুখ এবং পরাজয় বরণ দেখে বুকের ভেতর কেমন যেন চিনচিনে ব্যথা হলো। কিসের ব্যথা? জানিনা। জানতেও পারলাম না। নীরবতা ভেঙে অবশেষে ধ্বনিত হলো জেসমিনের যান্ত্রিক কন্ঠস্বর,
“জাফর, আমাকে বাড়িতে নিয়ে চলো।”
_________চলবে_________
[ 🛑নোট:
অনেক প্রশ্ন পেয়েছি তাই যারা জানেন না তাদের জন্য:
(ডাঃ /ডা.)— ডাক্তার / চিকিৎসক।
(ড.)— ডক্টরেট [ যারা পি এইচ ডি ডিগ্রি সম্পন্ন করেছে ]
জায়দান পি এইচ ডি শেষ করেছে + প্রফেসর হিসাবে কর্মরত। এজন্য তার নামের আগে ড. বসে। ]

