#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৫
“তোমার চোখ দুটো ভীষণ সুন্দর, জায়দান।”
তপ্ত মুহূর্তমাঝে আমার এমন মোহনীয় মন্তব্য প্রফেসর স্বামীকে সামান্য বিস্মিত করলো। মাথা কাত করে আমার ঘাড় ধরে অতীব কাছে টেনে নয়নমাঝে দৃষ্টিপাত করলো। এতটা কাছ থেকে সুগভীর ওই চোখজোড়া দেখে আমার বুকে বুঝি সুনামির ঢেউ উঠলো। আনমনে তার চোখের পাতা ছুঁয়ে দিয়ে বললাম,
“আগে আমার বাদামী রং ভালো লাগতো না। অথচ এখন বাদামী আমার প্রিয় রং।”
বাদামী সমুদ্রজোড়া আমার মাঝে নিজেদের বিলীন করলো বুঝি। ভাসিয়ে ফেললো আবেগে। জায়দান ঝুঁকে এসে আমার কপালে নিজের কপাল ঘষে নরম গলায় বলল,
“আমাদের পরিবারের সবাই এমনি।”
সম্মতি জানালাম আমি।
“হুম। দেখেছি। আব্বু, আয়দান দুজনের চোখও বাদামী। কিন্তু তোমার সঙ্গে তাদের তুলনা হয়না। তোমার চোখ অন্যরকম সুন্দর জায়দান। একেবারে আমার মনের মতন।”
সূক্ষ্ম হাসির রেখা ছুঁয়ে গেলো জায়দানের ঠোঁটে। সেই ঠোঁটে এখন আমার নিজের ঠোঁটে লাগানো ভ্যাসলিনের প্রলেপ লেগে আছে।
“আমরা সবাই এমন। বাদামী চোখ এবং উচ্চতায় লম্বা। এটা আরেফিন পরিবারের বৈশিষ্ট্য। আরেকটা বৈশিষ্ট্য আছে জানো? আমাদের মাঝে আগে ছেলে সন্তান হয়। আমার দাদার তিনজন ছেলে। বাবার হয়েছি আমরা দুজন ছেলে।”
জায়দানকে একটি মুহূর্তের জন্য হলেও নিজের পরিবারকে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে শুনে আমার ভীষন ভালো লাগলো। তার নাকে নাক ঘষে আদুরে গলায় বলে বসলাম,
“তবে আমাদেরও ছেলে হবে। একদম তোমার মতন। বাদামী চোখ আর ভীষণ লম্বা। তাইনা?”
টেরও পেলাম না স্বামীর গায়ে কথাটি কেমন বিষফোঁড়ার মতন বিঁধলো। হতবাক হয়ে গেলাম যখন সে একেবারে অতর্কিতে আমার কাছ থেকে দূরে সরে দাঁড়ালো। হাত দুটো আমার তখনো তোলা, তাকে আলিঙ্গনে বেঁধে রাখার উদ্দেশ্যে। অথচ জায়দান সীমানার বাইরে। তার কোমল মুখে অদ্ভুতুড়ে এক ছায়া নেমে এসেছে। শক্ত হয়ে গিয়েছে চোয়াল। আর ওই উজ্জ্বল বাদামী চোখজোড়ায় শীতলতা। একটি ঢোক গিললাম আমি।
“জায়…দান? হোয়াটস রং, লাভ?”
আমার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে জায়দান নিজের চুলে আঙুল চালিয়ে হঠাৎ বলে উঠলো,
“অনেক রাত হয়েছে। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো, সাবিন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
এটুকু বলেই সে মুখ ঘুরিয়ে ক্লোজেট থেকে পোশাক বের করে লম্বা পা ফেলে হনহন করে হেঁটে বাথরুমের ভেতর আড়াল হয়ে গেলো। সশব্দে আটকে গেলো দরজা। আমি আহাম্মকের মতন দাঁড়িয়ে রইলাম ঘরের মাঝখানে। মাত্র কিছুক্ষণ আগেই সমস্ত স্থানজুড়ে যে তপ্ত ভালোবাসা খেলা করছিল, এখন সেখানে ভয়ানক শীতলতা।
জায়দান ঘুমিয়ে যেতে বললেও আমার ঘুম এবং ক্লান্তি দুটোই উবে গিয়েছে। ক্ষুধাও লেগেছে বেশ। পায়ে পায়ে হেঁটে গেলাম কিচেনে। যেহেতু আজ আমরা দুজনই সকাল থেকে বাইরে ছিলাম, কারোরই বাসায় খাওয়া হয়নি বিধায় রান্নাও হয়নি। সহজ ব্যবস্থায় করা যায় যে একটা জিনিস, সেটাই করলাম আমি। পানি সিদ্ধ বসিয়ে তাতে দুটো ইনস্ট্যান্ট নুডুলের প্যাকেট ছিঁড়ে দিলাম। বেলপেপার এবং গাজর কেটে পানিতে মশলা মেশালাম। দুটো ডিম অমলেট করে ফেললাম প্যানে। যখন দুটো বাটিতে গরম গরম পরিবেশন করছি, তখন পায়ে পায়ে কিচেনের সামনে এসে দাঁড়ালো জায়দান।
গোসল সেরে এসেছে সেটা তার শরীর থেকে ভেসে আসা শ্যাম্পুর মৃদু সুবাসেই টের পাওয়া সম্ভব। একটা টি শার্ট আর ট্রাউজার পরে আছে এখন। বোধ হয় আমি কিছুক্ষন আগে খালি গা নিয়ে খোটা দেয়ায় গায়ে লেগেছে। মনে মনে মুচকি হাসলাম। ভালোই হয়েছে। সে যত ঢেকে ঢুকে চলবে, আমার হৃদপিন্ড ততই ভালো থাকবে!
কিচেনের ভেতর ঢুকে জায়দান জিজ্ঞেস করলো,
“কি করছো?”
“গুয়ের ট্যাংকি পরিষ্কার করছি। তুমি যোগ দিতে চাও?”
আমার জবাব শুনে নাক কুঁচকে ফেললো জায়দান।
“খাবারের সামনে এসব কোন ধরণের কথাবার্তা?”
“দেখতেই যখন পাচ্ছো, তখন জিজ্ঞেস করছ কেন? নতুন চশমায় এখনো অভ্যস্থ হতে পারেননি, প্রফেসর?”
একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাল ছাড়ার ভঙ্গিতে জায়দান বলে উঠলো,
“ওকে, আ’ম ডান।”
খিলখিল করে হেসে স্বাভাবিক গলায় শুধালাম,
“রাতে কি খেয়েছিলে?”
“স্যান্ডউইচ।”
“দূর্দান্ত ডিনার! নাও, এবার আমার সাথে খেতে বসে পড় দেখি লক্ষ্মী ছেলেরে মতন।”
“উঁহু। গ্যাস্ট্রিক সমস্যা করবে।”
“যতক্ষণ না খেয়ে থাকবে, ততক্ষণ তো করবেই।”
জায়দানকে একপ্রকার জোর করেই টেবিলে বসিয়ে দিয়ে আমি হেঁটে ভেতরে চলে এলাম। খাবার দাবার সংরক্ষণের স্টোর প্লেসে মেডিসিনের জন্য আলাদা জায়গা আছে। সেখানে গিয়ে ক্যাবিনেট খুলে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ খুঁজতে লাগলাম। জায়দানকে এখান থেকেই মেডিসিন নিতে দেখেছি এর আগে একবার দুবার, এখানেই থাকবে হয়ত। উচ্চতায় ছোট হওয়ায় হাতড়াতে গিয়ে ধাক্কা লেগে সাজিয়ে রাখা সারি সারি কিছু ওষুধের বোতল ধপাস করে মেঝেতে পড়ে গেলো। সবকিছুর ভেতর থেকে গ্যাস্ট্রিকের ওষুধের পাতা খুঁজে উঠিয়ে রেখে আবার ক্যাবিনেট আটকে দিয়ে কিচেনে এলাম। জায়দানকে ওষুধ দিতেই সে নিঃশব্দে ওষুধ খেয়ে নিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“ক্যাবিনেটে এত ওষুধ কিসের?”
জায়দান এক মুহূর্তের জন্য থামলো। তার নির্বিকার দৃষ্টি দেখে মনে হলো, বুঝি আমায় সে কিছু বলবেনা। অথচ কয়েক সেকেন্ড বাদে শান্ত গলায় উত্তর করলো,
“প্রেশার আর ঘুমের ওষুধ।”
চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো আমার। জায়দান অদূরে টিমটিম করে জ্বলতে থাকা ডিজাইনার বাল্ব এর দিকে চেয়ে নিরেট স্বরে বললো,
“মাঝে মধ্যে প্যানিক অ্যাটাক হয়ে প্রেশার পড়ে যায়। তখন নার্ভ ঠান্ডা করতে দরকার হয়।”
প্যানিক অ্যাটাক? প্রেশার? প্রত্যেকটা শব্দ আমার বুকে এসে বিধলো বু*লেটের মতন। জায়দানের এমন কোনো সমস্যা ছিল? তার সঙ্গে এতগুলো দিন সংসার করে, সবকিছু পেরিয়ে আজ এতটা ভালোবেসেও আমি কোনোদিন আন্দাজ করতে পারিনি। তার পরিবারের মানুষগুলোও নিশ্চয়ই কখনোই পারেনি। তারা জানেও না তাদেরই নাকের ডগায়, একই ছাদের নিচে থাকা সত্ত্বেও এই লোকটি একাকী কতখানি ভুগেছে।
একাকীত্বের বহু পর্যায় আমি দেখেছি এবং অনুভব করেছি। তবে একজন মানুষ ঠিক কতটা একাকী হলে তার গুরুতর কোনো ঘটনা সম্বন্ধেও অন্য মানুষ জানতে পারেনা সেটা জায়দানকে না দেখলে আমি কোনোদিন বুঝতাম না।
জায়দানের কথা শোনামাত্র ভারী একটা চাপ জেঁকে বসে থাকলো বুকে। সমস্ত খাবার আমরা দুজন পাশাপাশি বসে একেবারে নীরবেই শেষ করলাম। সেও কিছু বলল না, আমিও আগ বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলাম না।
খাবার শেষে দুজন মিলেই সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। জায়দান বাটি চামচ ধুয়ে রাখলো, আমি টেবিল মুছে নিলাম। একসাথেই বেডরুমে এলাম। জায়দান বিছানায় বসে শোয়ার তোড়জোড় করলেও আমি অন্তরের খচখচ অনুভূতিকে আর উপেক্ষা করতে পারলাম না। এগিয়ে গিয়ে জায়দানের পাশে বসলাম।
“মাই লাভ?”
“হুম?”
বালিশ ঠিক করতে করতে জবাব দিলো জায়দান। আমি ঘুরে বসে তার একটা হাত ধরে ফেলে বললাম,
“একটা আবদার করি? রাখবে?”
“কি আবদার?”
“আমাকে তোমার সম্পর্কে বলবে?”
“আমার সম্পর্কে কি বলবো তোমায়? আমায় চেনো না তুমি?”
“চিনি। তবে দিনকে দিন মনে হচ্ছে, তুমি আমার চেনা হয়েও বড্ড অচেনা। আমি তোমাকে এত ভালোবাসি! অথচ সত্যিকার তুমিটাকে আমি চিনিই না! মনে হয়, যেন আমি প্রতিদিন একটু একটু করে নতুনভাবে তোমায় আবিষ্কার করছি। আমাকে তোমার সেই দিকটা দেখাবে যে দিকটায় কেউ কোনোদিন ঠাঁই পায়নি?”
জায়দান কাজ থামিয়ে আমার দিকে তাকালো। তার নির্বিকার মুখে মায়া ফুটলো, এই মায়া শুধুই আমার। কাছে সরে বসে সে গভীর দৃষ্টিতে আমার মুখটা দেখলো। অতঃপর বললো,
“যদি বলি সে দিকটা শুধুমাত্র আমার জন্যই উন্মুক্ত, তবে রাগ করবে কি?”
ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললাম আমি। বুঝলাম না কেমন প্রতিক্রিয়া করা উচিত। জায়দান একটি হাত বাড়িয়ে যত্ন নিয়ে আমার গাল ছুঁয়ে দিলো,
“আমার অদেখা দিকে যা আছে, তা আমি জগতের দ্বিতীয় প্রাণীকে কখনো দেখাতে পারবোনা মাই ওয়াইফ।”
“কি এমন আছে তাতে?”
“আমার জননী, আমার স্ত্রী আর আমার পরিবার। তাদের সুখের স্মৃতি নয়। প্রত্যেকের দেয়া এমন দগদগে ঘা, যে ঘায়ের দাগ আমি অন্য কাউকে দেখিয়ে আমার আপন মানুষগুলোর সম্মানহানি ঘটাতে পারবনা। আমার অন্তরে বাঁধবে।”
অন্তরটা একইসাথে কুঁকড়ে এলো আবার উষ্ণ হয়ে উঠলো। গালের উপর রাখা হাতটা চেপে ধরে তাতে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“এত অব্যক্ত বুকে চেপে বাঁচো কিভাবে তুমি?”
একটুখানি হাসলো জায়দান, অতীব দূর্লভ হাসি। ঝুঁকে এসে আমার একটা হাত নিজের বুকে চেপে জানালো,
“আমি বাঁচি তোমায় নিয়ে। তুমি হয়ত জানো না, তোমার অস্তিত্ব আমার কষ্টের চুম্বক। আমার সবটুকু কষ্ট তুমি শুষে নিয়ে কোথায় যে পাঠিয়ে দাও! কষ্ট আমায় আর খুঁজেই পায় না।”
নিজেকে আটকানো গেলোনা। সামনে বসে থাকা সুউচ্চ স্বামী নামক লোকটাকে আমার এতটা আদুরে লাগলো যে নিজেকে আটকাতে পারলাম না। তার গলা জড়িয়ে ধরে কাছে টেনে ঠোঁটের মাঝে ঠোঁট ডুবিয়ে দিলাম আমি। ভালোবাসা বিনিময়ের মাঝে আর কোনো তপ্ততা নেই। এ শুধুই নিখাঁদ অনুভূতি। জায়দান আমায় কাছে টেনে নিজের কোলে বসিয়ে নিলো। দুবাহু জড়িয়ে ফেললো আমার চারপাশে। নিজের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো আমার অস্তিত্ব। একে অপরের মায়ায় পড়ে গিয়েছি আমরা। মায়া কাটানোর দুঃসাধ্য কার?
আমার অবাধ্য হাতজোড়া জায়দানের কাঁধ পেরিয়ে কোমরে পৌঁছালো। পরনের টি শার্টের ভেতর ঢুকে গেলো। সমান্তরাল উদরে আঙুল খেলে চললো, ছুঁয়ে দিলো শক্তিশালী মাংসপেশী এবং শীতল ত্বক। ঠান্ডার উপর আমার উষ্ণ হাতের ছোঁয়ায় কেঁপে উঠলো জায়দান। অজান্তেই আমার নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে ফিসফিস করল,
“মাই ওয়াইফ! প্লীজ….”
আমার হাত আরো উপরে উঠলো। একেবারে জায়দানের বুকের কাছে। পাঁজরের পাশ ছুঁয়ে আবেশিত গলায় বললাম,
“প্লীজ হোয়াট, লাভ?”
জায়দানের নিঃশ্বাস প্রশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে। চশমার লেন্স তপ্ত অনুভবে ঘোলাটে হয়ে গিয়েছে। বাদামী চোখজোড়া কেমন উদ্ভ্রান্ত দেখাচ্ছে। তাতে নির্লিপ্ততা নেই আর, আছে তীব্র আকর্ষণ। আমার আঙুল তার বুক পেরিয়ে উদরে নেমে এলো। আর সইতে পারলোনা বুঝি জায়দান। তার দুটো হাতই আমায় ছেড়ে বিছানার চাদর আঁকড়ে ধরল। শক্ত মুঠি সাদা হয়ে গেলো তীব্র জোরের কারণে।
“আমি…চাইনা..তুমি তোমার…ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করো!”
ভারী নিঃশ্বাসের মাঝে থেমে থেমে উচ্চারণ করলো জায়দান। আমার হাত নিজেদের দুষ্টুমি জারি রেখে যখন আরো নিচে নামতে চাইলো, তখনি কেঁপে উঠে আমার হাত আঁকড়ে ধরে ফেললো সে। কর্কশ হয়ে আসা গুরুগম্ভীর গলায় বললো,
“আমি বহুবার নিজেকে আটকেছি। তবে বারবার পারবনা। দিনশেষে আমি একজন পুরুষ। তাই বলছি, প্লীজ।”
থামলাম আমি। ঝুঁকে এসে জায়দানের কানের লতিতে শুষ্ক এক চুমু খেয়ে ফিসফিস করলাম,
“বারবার ফিরিয়েছি বলে যে এবারেও ফিরিয়ে দেব, নিশ্চিত হলে কিভাবে? আমিও তো একজন নারী। তোমার বিবাহিতা স্ত্রী।”
জায়দান প্রথমটায় একদম নিশ্চুপ রইলো। একচুল নড়ল না অবধি না, এমনকি নিঃশ্বাস অবধি আটকে ফেললো। বুঝতে পারলাম না আমার কথা তার উপর কেমন প্রভাব ফেলেছে। প্রভাবটা যে বেশ গুরুতর তা টের পেলাম তখন, যখন সে আচমকা আমাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিলো। বিস্ময়কর শব্দ তুলে তাকালাম সামনে, আমার মাথার চুলগুলো ছড়িয়ে পড়লো বালিশের উপর। অত্যন্ত ক্ষীপ্রতায় নিজের টি শার্ট মাথার উপর দিয়ে টেনে খুলে কোথায় যেন ছুঁড়ে ফেলল জায়দান। তার মুখটা লালচে হয়ে উঠেছে। এক মুহূর্তের মাঝে বদলে গিয়েছে শান্ত সমুদ্র, উত্তাল হয়ে উঠেছে জোয়ারের ঢেউয়ে। ঠিক যেন সেদিন গাড়ির ভেতরের জায়দানকে দেখছে আমি। বুকের ভেতর দুরুদুরু অনুভব হতে লাগলো।
ঝুঁকে এলো জায়দান, নিজের চশমা খুলে নেয়ার প্রয়াস না করেই আমার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো। এই চুম্বনে আর কোনো মায়া নেই, কোনো আদর নেই। আছে তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আমার মুখটা এক হাতে চেপে ধরলো সে, অন্য হাত আমার কোমরে। ছটফট করলেও নিজেকে ছাড়াতে ব্যর্থ হলাম। কিংবা হয়ত আমি ব্যর্থই হতে চাই!
আমার ঠোঁট নিজের স্বাদে ভরপুর রাঙিয়ে চিবুক পেরিয়ে গলায় পৌঁছালো জায়দান। ত্বকে মোক্ষম এক কামড় বসিয়ে দিতেই আমার সমস্ত শরীর ঝনঝন করে কেঁপে উঠলো। চোখে আঁধার দেখলাম।
“আহহ!”
আমার ব্যাথাতুর চিৎকারের বিপরীতে জায়দান হিসিয়ে উঠল,
“লাস্ট চান্স, ওয়াইফ!”
কথা বলার অবস্থায় আমি আর নেই। সমস্ত জগৎ বনবন করে ঘুরছে চোখের সামনে। শরীরে খেলে যাচ্ছে একের পর এক ভূমিকম্প। ঘামের ফোঁটা জেগে উঠতে শুরু করেছে উত্তপ্ত লাভার মতন ত্বকজুড়ে। অতি আবেশে জমা অশ্রু টলটল নয়নে আমি জায়দানের দিকে তাকালাম। ওই নির্লিপ্ত মুখ, বাদামী চাহুনি এবং আড়ালে কখনো না দেখানো অতীব ভালোবাসার অভিব্যক্তিকে আর উপেক্ষা করতে পারলাম না। মুখটা আজলায় তুলে নিয়ে কাঁপা গলায় ফিসফিস করলাম,
“আমি শুধু তোমার জায়দান। আমাকে তুমি তোমার মতন করে বরণ করে নাও।”
জায়দানের চোখজোড়া জ্বলজ্বল করে উঠল বুঝি! নাকি আমার ভ্রম কে জানে? আমার বুকে মাথা গুঁজে সে গুঙিয়ে উঠল,
“তুমি আমায় একবারে নয়, দফায় দফায় খু*ন করো।”
অতঃপর যা হলো, তা বর্ণনা এবং অনুভবের সামর্থ্য পেলাম না নিজের মাঝে। অপার্থিব এক সুখ টের পেলাম যেন। জায়দান থেমে থাকলোনা। তার হাতের স্পর্শের বিচরণ ছুঁয়ে গেলো আমার সমস্ত অস্তিত্বকে, সমস্ত গভীর ভালোবাসায় মোড়ানো স্থানজুড়ে। আমার উদরে গিয়ে থামলো সে। শরীরে লেপ্টে থাকা নিজের টি শার্ট টেনে উপরে তুলে উন্মুক্ত করলো ত্বক। বালিশ খামচে ধরলাম আমি তীব্র তাড়নায়।
জায়দানের শ্বাসের তপ্ত বায়ু ছুঁয়ে গেলো আমার ত্বক,
“তোমার পেটের এই কুচকুচে কালো তিলটা আমার কত রাতের ঘুম হারাম করেছে তা কি তুমি জানো?”
জায়দানের ঠোঁট ছুঁয়ে গেলো আমার উদর, গভীরভাবে স্পর্শ করলো তিলটাকে। অজান্তেই এক হাত বালিশে রেখে অন্য হাতে খামচে ধরলাম তার মাথার চুল। জায়দান বুলিয়ে গেলো নিজের আদর। বারংবার কাঁপলাম আমি। জায়দানের কাঁধ আঁকড়ে ধরলাম।
গভীর রাত পেরিয়ে যখন ভোররাত হলো, তখন আমার বন্ধ দুই চোখের পাতা বেয়ে অপার্থিব সুখের অশ্রু গড়িয়ে নামলো। নিজের ঠোঁট বুলিয়ে সেই সবটুকু শুষে নিলো আমার স্বামী। তার পিঠজুড়ে খচিত হলো আমার নখের আঁচড়ে তৈরি মহৎ চিত্রকর্ম। আর কোনো বাঁধা নেই। অত্যন্ত আবেগ নিয়ে আবছায়া আঁধারে স্বামীর মুখটা দেখলাম, ভীষণ সুখে তাকে কেমন লাগে সেই স্মৃতিটুকু নিজের অন্তরে গেঁথে নিলাম।
প্রভাতের সূর্যালোক যখন জানালা চুঁইয়ে রুমের ভেতর এসে পড়ছে, তখন আমি আধ জাগরণ এবং আধ ঘুমে আচ্ছন্ন। আমার পরিশ্রান্ত, শক্তিহীন শরীরটা লেপ্টে আছে পুরুষালী বুকের মাঝে। চোখ বুঁজে আসছে ভীষণ ক্লান্তিতে। মৃদু গুঞ্জনের মতন শব্দে শুনলাম, জায়দান নাইটস্ট্যান্ডের ড্রয়ার খুলে কিছু একটা বের করে নিয়েছে। একটা আংটি। চকচকে, ছোট্ট একটা প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্র বসানো বুঝি আংটির উপর। হীরা নাকি অন্য কিছু বুঝলাম না। সেই বিবেচনার শক্তি নেই শরীরে। জায়দান আমার বাম হাতের অনামিকায় আংটিটা পরিয়ে দিয়ে গাঢ় এক চুমু খেলো। তারপর হাতটা নিজের খোলা বুকে ঠেকিয়ে আমায় আরো কাছে টেনে উভয়কে কম্বলের নিচে ঢেকে ফেললো। চোখজোড়া বুঁজে এসেছে আমার। তলিয়ে যাচ্ছি ঘুমের মাঝে। পুরোপুরি চেতনা লোপ পাওয়ার আগে কানে সুগভীর কণ্ঠটির স্নেহময় উক্তি শুনলাম,
“তুমি এমন এক সুমিষ্ট বিষ, যে বিষ আমি স্বেচ্ছায় বারংবার পান করতে চাই।”
_________চলবে_________
[খুশী?🙄]

