#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৪৭ (প্রথমাংশ)
ঘটনার সূত্রপাত বেশ অনেকদিন আগে। যখন মীরা এবং জায়দান উভয়কে হারিয়ে আমি এই জগতে একদম একাকী হয়ে গিয়েছিলাম। ততদিনে মিসিরের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, জমির আসল মালিক এখন আমার বড় চাচা, ব্যাংক নয়। বুঝতে কিছুই আর বাকি থাকেনি। আমাকে বেশ বড়সড় একটা ঘোল খাওয়ানো হয়েছে। ড্যাডের মৃত্যুর পর যে শত শত পেপার ঋণ এবং লেনদেনের নামে আমার কাছ থেকে সাইন করিয়ে নেয়া হয়েছে তা আদৌ সেই কাজে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা তা উপলব্ধিতে বাকি নেই কিছুই।
তবে আমার কাছে কোনো প্রমাণ ছিলোনা। তাই আমি চাইলেও তাকবীর চাচার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আনতে পারতাম না। হন্যে হয়ে ছুটেছি এদিক সেদিক। এমন কোনো উপায় বাকি ছিলোনা যা আমি অবলম্বন করে দেখিনি। অনেকটা দৈবিকভাবেই তখন আমার সঙ্গে যোগাযোগ হয় এক ব্যক্তির। আবু কাশিম। ড্যাডের প্রাক্তন পি এ। এই মানুষটাকে অনেক বেশি ভরসা করতো ড্যাড আমি জানতাম। তবে ড্যাডের মা*রা যাওয়ার পর তিনি একপ্রকার অলক্ষ্যে চলে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে আমার কোনো কথা হয়নি। তবে এরপর হলো। আমি আমার নিজের সন্দেহের কথা জানানোর পরেই তিনি আমাকে যে কথাটা বললেন, তাতে আমার আত্মা শুকিয়ে উঠেছিল। আবু কাশিমের ভাষ্যমতে, আমার ড্যাড মারা যাননি, বরং তাকে খু*ন করা হয়েছে।
বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর নিজের জীবনের ব্যস্ততায় এবং ড্যাডের উপর চাপা ক্ষোভ থেকে আমাদের সম্পর্কে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সেটা পুষিয়ে ওঠার সুযোগ পাইনি কোনোদিন। ডিভোর্সের পরপর সকল কুল হারিয়ে যখন ড্যাডের দুয়ারে গেলাম, তখনি জানলাম হার্ট অ্যাটাকে মৃ*ত্যু হয়েছে তার। ওই সময়টায় একজন মেয়ে হিসাবে শোকের থেকে বড় কিছু মাথায় আসেনি। কাউকে জিজ্ঞেসও করিনি কিভাবে কি হয়েছে। শুধু ড্যাডের নিথর শরীরটা দেখেছি। জায়দান এবং তার পিতা জাফর এসেছিল, শেষ দেখা দেখতে। তবে তখন আমি কারো সঙ্গে কিছু বলার অবস্থায় ছিলাম না। স্বাভাবিক মৃ*ত্যু হিসাবে ধরেই সবকিছু করা হয়েছিল। বড় চাচা তাকবীর আগ বাড়িয়ে সব সামলাচ্ছিলেন দেখে মনে মনে স্বস্তিও পেয়েছিলাম। অথচ, একবারের জন্যও মাথায় দ্বিতীয় চিন্তা আসেনি আমার!
আবু কাশিমের বক্তব্য ভিন্ন ছিল। শেষ সময়টায় সেই ড্যাডের পাশে ছিল সবথেকে বেশি। দিনদিন নাকি ড্যাডের শরীর খারাপ হচ্ছিল, অথচ তিনি আমাকে কিছুই জানাননি। কিছু সন্দেহ ছিল, নাকি নিজের সময় শেষ ভেবেছিলেন কে জানে! তিনি আমাকে সহায় সম্পত্তি লিখে দিয়ে যাওয়ার জন্য কাগজপত্র তৈরি করছিলেন। তবে একদিন হঠাৎ করে কি হলো আবু কাশিমও জানেনা! কল পেয়ে যখন ছুটতে ছুটতে ড্যাডের কাছে গেলেন, ততক্ষণে নাকি তিনি প্রাণত্যাগ করেছিলেন। তাকবীর আর আহান উভয়ে উপস্থিত ছিল। তখন কাশিম এমন এক ঋণের কথা জানতে পারেন, যেটা ড্যাডের ব্যক্তিগত পি এ হয়েও এতদিন তার ধারণায়ও ছিলোনা! কিসের ঋণ? কোথাকার ঋণ? ড্যাডের কোনো ঋণ তো ছিলই না, উপরন্তু কিছু প্রতিষ্ঠানের কাছে তিনি টাকা পেতেন। তখন তাকবীর চাচা ঠান্ডা মাথায় আবু কাশিমকে বলেছিল, পরিবারের ভেতরে এমন অনেক সত্যই থাকে যা বাইরের মানুষকে জানানো যায়না। এই ব্যাপারেও শুধু তাকবীর জানতেন এতদিন। কিছু বুঝে উঠতেও পারেনি আবু কাশিম। এর আগেই তাকে ছাঁটাই করে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। আহান স্বয়ং নাকি বারকয়েক হুমকিও দিয়েছিল, যদি বেজায়গায় মুখ খুলতে যায় তাহলে পরিণাম ভালো হবেনা।
আবু কাশিম কোথাও মুখ খোলেনি। কার কাছে খুলবে? কেনই বা খুলবে? সবটাই কেমন সাজানো, গোছানো, নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত ছিল। সে দূরে থেকেছে, গা ঢাকা দিয়ে, নিজের মতন। যতদিন না আমি তাকে খুঁজে বের করেছি। তার পুরাতন বসের মেয়ের সামনে সে চুপ করে থাকতে পারেনি। কারণ তাকদীর হুসেইন শুধু তার একজন বস ছিলেন না, ছিলেন একজন শিক্ষক এবং জ্যেষ্ঠতুল্য আপনজন।
এত এত খটকা, সূত্র এবং সত্যি জানার পর পানির মতন পরিষ্কার হয়েছে সবটা। কিন্তু একটা সমস্যা কিছুতেই আর ঘোচানো গেলোনা। প্রমাণের অপর্যাপ্ততা। কাশিমের মুখের কথা যথেষ্ট নয়। নথিপত্রে প্রমাণ দরকার। যেটা আমার কাছে নেই। যদি আমাকে দিয়ে সাইন করিয়ে নেয়া কাগজগুলো জাল করে কোনোভাবে সম্পত্তি ট্রান্সফারের কাগজ বানানো হয়ে থাকে, তাহলে সেটা অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করবে আমার চাচা। আমি তাকে অভিযুক্ত দায়ের করতে পারবোনা। তাছাড়া এর প্রমাণই বা কোথায় সে আসলেই ড্যাডকে খু*ন করেছে? আইন চায় প্রমাণ, সেটা আমি দিতে পারতাম না।
জায়দানের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর একদিন সময় নিয়ে আমি তাকে সব বলেছিলাম। খানিক আতঙ্কিত ছিলাম এই ভেবে, যে স্বামী আমাকে ফিরে আসতে বলবে। সে আজীবন চেয়েছে আমি যেন কোনরকম বিপদ আপদ থেকে দূরে থাকি। তবে আমায় অবাক করে দিয়ে সেদিন জায়দান আমার হাত ধরে বলেছিল,
“তোমার সাথে আমি আছি।”
এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি আমাকে। নিজের জননীর কাছেই জেনেছিলাম, সর্বদাই নিজের ছোট ভাইয়ের জিনিসের প্রতি চোখ ছিল তাকবীর চাচার। সেই নজর থেকে বাদ পড়েনি আমার মা সাবিনাও। ড্যাড বেঁচে থাকতে কোনোদিন সাহস না করলেও সবকিছু হাসিল করে ফেলার পর অনেকবার আম্মুর সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে চেয়েছিলেন তিনি। এমন ঘৃণ্য কথাগুলো শুনে রাগে আমি দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম। তবে তখন একটা উপায়ও আমার কাছে ধরা দিল। যদিও এতে আম্মুকে ব্যবহার করার মতন বিষয়টা আমার বুকে বাঁধছিলো ভীষণ, তবে আম্মু বেশ স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন নিজের স্বামীর ন্যায়বিচারের কথা ভেবে। জায়দান আমার সাথে ছিল। মিসিরেরও অবদান ব্যাপক। তাকবীর চাচার বর্তমান অবস্থান এবং কাজ সম্পর্কে কর্পোরেট জগৎ থেকে সেই আমাদের কাছে তথ্য পাচার করেছে। আমাদের সকলের অংশগ্রহণে অবশেষে বাস্তবায়িত হওয়ার পথে এক মহাপরিকল্পনা।
***
সময় বাকি আছে আর মাত্র তিন মিনিট। ক্লাসরুমে সকলে ব্যস্ত শেষ সময়টুকুতে লিখা শেষ করতে। বেশ কয়েকজন তখনো ক্যালকুলেটর চেপে হিসাব মেলাতে ব্যস্ত। কয়েকজন আবার ল্যাপটপে ঝুঁকে আছে অন্তিম মুহূর্তে তথ্য মিলিয়ে দেখতে। আজ ওপেন বুক এক্সাম দিচ্ছে সকল শিক্ষার্থী। এমন এক্সাম মাসে একবার নিয়ে থাকে তাদের প্রফেসর জায়দান আরেফিন।
সি আর নিরুপমা অত্যন্ত দ্রুত বইয়ের পাতা উল্টে যাচ্ছে। বই খুলে পরীক্ষা দিতে হলেও নিজের ভাষায় সবটার সারমর্ম করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে যায় সে। মাথা হ্যাং হয়ে আছে তার। ঠিক এমন সময়েই পাশ থেকে বান্ধবী খুঁচিয়ে ডাকলো তাকে। ভীষণ বিরক্ত হলো নিরুপমা।
“কি? ডিস্টার্ব করিস না তো!”
“নিরু! প্রফেসরকে দেখ একবার!”
এতক্ষণে খেয়াল করলো নিরুপমা। ক্লাসের প্রায় সকলেই নিজেদের লিখা থামিয়ে সামনের দিকে চেয়ে আছে। তাদের দৃষ্টি লক্ষ্য করে তাকাতেই নিরুপমা এমন এক দৃশ্য দেখলো যা সে নিজের সবথেকে সুন্দরতম স্বপ্নেও কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি।
ডায়াসের একপাশে দাঁড়িয়ে আছে জায়দান। কফি বর্ণের শার্ট এবং কালো ফরমাল পরনে। স্যুটটা খুলে টেবিলের একপাশে রেখেছে। সেই টেবিলেই এক হাত ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চশমার অন্তরাল থেকে বাদামী নয়নজোড়া চেয়ে আছে নিজের অন্য হাতে ধরে রাখা ফোনের দিকে। বিস্ময়কর ব্যাপার সেটি নয়। অবিশ্বাস্য বিষয়টা হলো জায়দানের ঠোঁটজুড়ে সূক্ষ্ম এক হাসির রেখা!
যে প্রফেসরকে ইহজীবনে কোনোদিন সামান্যতম ভ্রু তুলতে অবধি দেখেনি কেউ, সে কিনা নিজের ফোনের দিকে চেয়ে মিটিমিটি হাসছে! হ্যালির ধূমকেতুও এর চাইতে কম দূর্লভ!
গোটা ক্লাসের দৃষ্টি সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত জায়দান মগ্ন নিজের জগতে। স্ক্রীনে ভাসছে তার প্রিয়তমার মেসেজ। দুটো শাড়ীর ছবি পাঠিয়েছে সে, খুব সম্ভবত অনলাইন অর্ডার করবে।
মাই ওয়াইফ: লালডা না কালাডা?
টাওয়ার: তোমার যেটা ভালো লাগে।
মাই ওয়াইফ: আমার তো সেকেন্ড ফ্লোরের মাহমুদ সাহেবকেও ভালো লাগে।
টাওয়ার: আমারও ঐশ্বরিয়া রায়কে ভালো লাগে।
মাই ওয়াইফ: খাম্বা তোমার কন্ট্রোলের তার ছিঁড়ে দেবো একদম! বিশ্বাস করো, আমি বংশের বাত্তি নেভানোতে এক্সপার্ট!
টাওয়ার: মাহমুদ সাহেবের কথা বললে কেন?
মাই ওয়াইফ: তুমি ঐশ্বরিয়া রায়ের কথা বললে কেন?
টাওয়ার: কালো শাড়ীটা বেশি সুন্দর।
মাই ওয়াইফ: আমি এখন লাল শাড়ীটাই কিনবো!
টাওয়ার: আমাকে জিজ্ঞেস করলে কেনো যদি আগেই ঠিক করে রেখে থাকো? নারী জাতিকে আমি আসলেই বুঝতে পারিনা।
মাই ওয়াইফ: আমিও পুরুষ জাতিকে বুঝতে পারিনা। সোজা কথায় উত্তর না দিয়ে কথা প্যাঁচায় সাপের মতন আর দোষ দেয় নারী জাতির।
টাওয়ার: আ’ম নেভার গোয়িং টু উইন অ্যাগেইনস্ট ইউ।
মাই ওয়াইফ: ইয়েস। থ্যাংক ইউ। এবার বলো…
সাবিন আরো দুটো ছবি পাঠালো। তবে এমন জিনিসের, যা দেখে জায়দানের মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে দেখলো না, তার অলক্ষ্যে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছে কত জোড়া চোখ!
মাই ওয়াইফ: কোন নাইটড্রেসটা…
সাবিন টাইপিং শেষ করার আগেই জায়দান এক শব্দে উত্তর করলো,
টাওয়ার: খয়েরীটা।
সিটে বসে থাকা নিরুপমার আশেপাশে সবাই ততক্ষণে ফিসফাস করছে,
“ভাই এ আমি কি দেখছি? প্রফেসর আবার ব্লাশিংও করছে! কেউ আমাকে দুটো চিমটি দে ভাই!”
“আমি শিওর প্রফেসরের পরকীয়ার চক্কর চলছে। বউয়ের সঙ্গে কেউ এভাবে আচরণ করতেই পারেনা। উঁহু, ইম্পসিবল! প্রফেসর কারো সঙ্গে প্রেম করছে!”
একটা ছেলে বলতেই আশপাশ থেকে দুজন মেয়ের থাপ্পড় হজম করলো সে। নিরুপমা বেশ বিরক্ত গলায় বললো,
“কেন ভাই? কেউ কি বউয়ের সঙ্গে প্রেম করতে পারেনা? নাকি সবাই শুধু বিয়ের আগেই প্রেম করে?”
“বিয়ের পরেও প্রেম হয় নাকি? জানতাম না তো!”
“হয়। হয়ত প্রফেসরের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে? কে বলতে পারে?”
পাশ থেকে আর দুজন বলল,
“প্রফেসর বিবাহিত? সিরিয়াসলি?”
“আই কান্ট টেইক ইট! হার্টটা ভেঙে টুকুশ করে মরে যাব।”
গুঞ্জন বুঝি একটু বেশীই জোরালো হলো। তাতেই হুশ হলো জায়দানের। চটজলদি ফোন বন্ধ করে পকেটে ভরে ফেললো। রুমাল তুলে ঘাড়ের পিছনে জমা একফোঁটা ঘাম মুছে নিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
“সরি স্টুডেন্টস। কোথায় যেন ছিলাম? ওহ, রাইট। টাইমস আপ! প্লীজ সাবমিট ইওর পেপার্স।”
ভার্সিটির সকল ক্লাস এবং কাজ শেষ করে জায়দান যখন বেরোলো তখন বিকালপ্রায়। আগে না থাকলেও আজকাল সবসময় বাসায় ফেরার ভীষণ তাড়া থাকে তার। তবে আজ বাইকে চেপে বাসার পথের ঠিক উল্টোদিকে গেলো সে। বেশ খানিকটা সময় বাদে চাপা গলির ভেতর একটা আধভাঙা দেয়ালের পাশে বাইক পার্ক করল সে। এমন ঘিঞ্জি এলাকায় তার দামী চকচকে বাইকটা অনেক বেমানান লাগছে। সেদিকে বিশেষ ভ্রুক্ষেপ না করে জায়দান নেমে এলো। শার্টের হাতা গুটিয়ে কনুই পর্যন্ত তুলতে তুলতে এগোলো। সামনেই একটি পুরাতন ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। লালচে ইটের গাঁথুনি। খানিকটা আশির দশকের কথা মনে পড়ে যায় এই স্থাপনা দেখলে। জায়দান মসজিদের সিঁড়ির সামনে নিজের শুজোড়া খুলে রেখে পাশের ওযুখানায় ওযু করে নিলো। বক্স থেকে টুপি নিয়ে মাথায় জড়িয়ে অবশেষে সে ভেতরে ঢুকলো।
ফজর এবং আসরের ওয়াক্তে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকে। এখানেও সেটি ব্যতিক্রম নয়। ভেতরে যতজন আছে, তাদের সকলকে হাতে গোণা যাবে। এর মধ্যে আবার অধিকাংশ শিশু। ইমামের কাছে আরবী পড়ার পর একেবারে আসরের নামাজ আদায় করে এই শিশুরা বাসায় ফিরে যায়। ইমাম ইতোমধ্যে নির্ধারিত জায়গার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। মুসল্লিরা আসতে শুরু করলে বয়োজ্যেষ্ঠ ইমাম কাঁপা কাঁপা গলায় জানালেন,
“এই ওয়াক্তের ইমামতি আমার একজন আগ্রহী শিক্ষার্থী পরিচালনা করবে। কারো অসম্মতি আছে?”
সকলেই না সুলভ মাথা নাড়লো। শিশুদের ভিড়ের পিছন থেকে সামনে এগিয়ে এলো আয়দান। সুদীর্ঘ অবয়ব তার। পরনে পাঞ্জাবী বা তেমন কোনো পোশাক নেই। ছিমছাম একটা ঢোলা কালো ফতুয়া এবং টাখনুর উপরে তোলা ট্রাউজার। মাথায় কালো টুপি। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ভেতরেও তার ত্বক সামান্য রঙিন দেখাচ্ছে। লজ্জা পাচ্ছে সে।
আয়দান ইমামের পাশে এসে ফিসফিস করে কিছু বললো। বিপরীতে ইমাম বিস্তৃত হেসে তার কাঁধ চাপড়ে দিয়ে বললেন,
“তুমি পারবে সেটা তুমি না জানলেও আল্লাহ ঠিকই জানে।”
এই কথার পর আয়দান আর কিছু বললোনা। নামাজ পরিচালনার জন্য মসজিদের নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। সামনে ঘুরে তাকানোর আগে সে পিছনে চাইতেই হঠাৎ করে জমে গেলো। বাদামী নয়নযুগলের দৃষ্টি মিলিত হলো। নিজের বড় ভাইকে দন্ডায়মান দেখে বুকের ভেতর বুঝি উথাল পাথাল ঝড়ের উপস্থিতি টের পেলো আয়দান। তবে সেই তুলনায় জায়দান একেবারেই শান্ত, নির্বিকার। নীরবে সে সামনের কাতারে এসে দাঁড়ালো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ফেললো আয়দান। পরক্ষণে যখন সে সামনে ফিরে অদৃশ্যমান রহমানুর রহিমের উদ্দেশ্যে তাকালো, তখন তার চোখে অশ্রু জমলো, কন্ঠে জোরালোভাবে ধ্বনিত হলো নামাজের নিয়ত এবং,
“আল্লাহু আকবার….”
***
আসরের নামাজ শেষ হওয়ার পর যেমন নিঃশব্দে এসে ঢুকেছিল, তেমনি নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো জায়দান। সিঁড়ির গোড়ায় বসে মোজা এবং জুতোজোড়া পায়ে গলিয়ে সে যখন বাইরের গেটের দিকে এগোলো, ঠিক তখনি পেছন থেকে ডাক ভেসে এলো,
“ভাইয়া!”
থামলো জায়দান। পিছন থেকে রীতিমত দৌঁড়ে এসে তার সামনে দাঁড়ালো আয়দান। খানিকটা হাঁপাচ্ছে। উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে জায়দানকে আপাদমস্তক দেখলো সে।
“ভালো আছো?”
প্রশ্নটা খানিকটা ভয়ে ভয়েই করলো আয়দান। মীরার ঘটনার পর থেকে একবারও তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলেনি আপন বড় ভাই। জায়দান কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর করলো,
“ভালো আছি। তুমি ভালো আছো?”
আয়দানের ঠোঁটে বিরাট এক হাসি ফুটলো। চোখজুড়ে জ্বলজ্বলে আবেগ। মাথা ঝাঁকিয়ে সেই আবেগটুকু নিয়ন্ত্রণ করে সে বললো,
“আলহামদুলিল্লাহ।”
“আব্বু আম্মু কেমন আছে?”
এই প্রশ্নটা আয়দানের চেহারায় সামান্য ছায়া নামিয়ে আনলো। আঙুল মটকে বিচলিত গলায় জবাব দিলো,
“আম্মু আব্বুকে ডিভোর্স দিতে চায়।”
কথাটি শুনে জায়দানের মধ্যে বিশেষ অভিব্যক্তি না ফুটলেও দীর্ঘ একটা সময় চুপ থাকলো সে। শুধুমাত্র শনশনে হাওয়া খেলে গেলো চারপাশে। দূরে ঘরে ফেরার তাড়ায় থাকা পাখিদের কিচির মিচির। অবশেষে দীর্ঘ সময় বাদে জায়দান মুখ খুললো,
“জীবনের শেষ সময়ে এসে যদি তারা নিজেরা নিজেদের মতন সুখী হতে চায়, তবে তাতে ক্ষতি নেই।”
এটুকু বলেই জায়দান উল্টো ঘুরল চলে যাওয়ার জন্য। তখনি পিছন থেকে আয়দান বলে উঠল,
“তুমি কি আমাকে মাফ করতে পেরেছ, ভাইয়া?”
জায়দান থামলো। বাতাসে তার চুল খানিকটা এলোমেলো হয়ে গেলো। ঘুরে দাঁড়ালো সে আয়দানের দিকে। দুই ভাইয়ের উচ্চতায় অতি সামান্য পার্থক্য রয়েছে। দুজনই ছয়ফুট হলেও জায়দান কয়েক ইঞ্চি লম্বা। এক পা এগিয়ে আয়দানের সন্নিকটে আসলো সে। গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখছে ছেলেটা, যেন ত্রিশের কাছাকাছি পৌঁছানো কোনো পুরুষ নয়, বরং সেই পাঁচ বছরের নিষ্পাপ প্রফুল্ল বাচ্চাটি। জয়দান নিজের ডান হাতটি তুললো, অতঃপর আয়দানের মাথায় ছোঁয়ালো। ছোট ভাইয়ের শুষ্ক ঝাঁকড়া চুলগুলো আঙুল বুলিয়ে অগোছালো করে দিয়ে সে নরম গলায় বলল,
“পরেরবার শুধু সূরা ইখলাস দিয়ে নামাজ শেষ করে দিওনা। এরকম অনেক সুন্দর সূরা আছে কোরআনে।”
মন্ত্রমুগ্ধের মতন তারকাখচিত দৃষ্টিতে নির্বাক তাকিয়ে রইলো আয়দান। জায়দান দূরে সরে দাঁড়ালো, অতঃপর উল্টো ঘুরে লম্বা পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে গেটের বাইরে বেরিয়ে গেলো। তার সুদীর্ঘ অবয়ব চোখের সামনে থেকে সম্পূর্ণ গায়েব না হওয়া অবধি দাঁড়িয়ে রইলো আয়দান সেখানে। বুকভর্তি তার উষ্ণতা, চোখভর্তি মায়া।
_________চলবে_________

