#সমাপ্তির_ওপাড়ে
#জাবিন_ফোরকান
#পর্বসংখ্যা৫০ (প্রথমাংশ)
— চলো না। আমরা আবার বিয়ে করি?
— করব। বাট, লেট আস বি সেটেল্ড ফার্স্ট। এতদিন অপেক্ষা করেছ, আর একটুখানি পারবেনা?
— এতগুলো কিসের ওষুধ?
— প্রেশারের ওষুধ।
— আমাদের সন্তানের কথা বললে তুমি বারবার এড়িয়ে যাও কেন, জায়দান?
— আমি কখনো বাবা হতে চাইনা, সাবিন।
— কথা দাও, আর কখনো ছেড়ে যাবেনা।
— কথা দিলাম, তোমার হৃদফলকে থাকবে আমার নাম। দোয়া করি, আমার কবরের পাশে হোক তোমার স্থান।
আজ আর কোনো সন্দেহ বাকি নেই। কি, কেন, কিভাবে? কোনো প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে নেই। সবটাই দিনের আলোর মতন পরিষ্কার। সকলের অগোচরে বিদায়ের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছে একটি পুরুষ। সেই পুরুষটি এতটাই একা, যে তার সবথেকে কাছের মানুষটাও কোনোদিন আঁচ পায়নি। হয়ত পেতোও না। যদি না সে নিজে স্বীকার করার দয়াটুকু করতো। মানুষ নানা ভাবে একা হয়। কেউ সব হারিয়ে, কেউ কিছু না পেয়ে। কিন্তু সবকিছু থেকেও একা হওয়ার যে বিষয়টা, সেটাকে বাংলা ভাষার কোন শব্দ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায়?
***
ভার্সিটির গেইট পেরিয়ে সড়কে বেরোতে না বেরোতেই ঝেঁপে বৃষ্টি নামলো। এখন ঠিক কোন ঋতু চলছে? জায়দানের খেয়াল হলোনা। কয়েক সেকেন্ডের মাথায় ভিজে গিয়েছে সে। দ্রুত বাইকটা একটি যাত্রী ছাউনির সামনে পার্ক করে ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালো সে। পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথার চুলগুলো ঝেড়ে মুছে নিলো। ভাগ্যিস আজ স্টুডেন্টদের প্রজেক্টগুলো সাথে নিয়ে বের হয়নি! বৃষ্টির কারণে রাস্তাটা খানিক ফাঁকা হয়ে এসেছে। মানুষজন কম, গুটিকতক যারা আছে তারা এখানে সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। ঘড়ি দেখলো জায়দান। রাত সাড়ে বারোটা। বেশ দেরী হয়ে গিয়েছে। বাড়িতে সাবিন চিন্তা করছে। একটা ফোন করবে কি?
ভাবতে ভাবতেই ছাউনির চেয়ারে বসলো সে। ফোনের জন্য পকেটে হাত ভরতেই ভেতর থেকে একটি স্নিকার বার বেরিয়ে এলো। মিষ্টিজাত দ্রব্য জায়দানের একদমই পছন্দ নয়। কিন্তু আজ ক্লাসের সি আর নিরুপমার জন্মদিন থাকায় রীতিমত জোর করেই দেয়া হয়েছে তাকে, না করতে পারেনি ভদ্রতার খাতিরে। স্নিকার বারটা দেখে হঠাৎ মনে হলো, ভীষণ ক্ষুধা লেগেছে তার। দুপুরে কাজের চাপে কিছু খাওয়া হয়নি। নিজের হাতে থাকা দায়িত্বগুলো মিটিয়ে ফেলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রিজাইন নিয়ে কথা বলবে জায়দান। এমন সিদ্ধান্ত তার বহু আগের।
স্নিকার বারের প্যাকেট খুলে খানিকটা বিতৃষ্ণা নিয়েই কামড় বসালো জায়দান। তবে চকলেটের স্বাদটা মুখের ভেতর খারাপ লাগলোনা। হয়ত ক্ষুধায় খাচ্ছে বলে, কিন্তু এটা আসলেই অসাধারণ! প্যাকেট দেখতে দেখতে দ্বিতীয় কামড় দিয়ে জায়দান ভাবলো, বাকিটুকু আর খাবেনা। সাবিনের জন্য নিয়ে যাবে। মেয়েটা চকলেট খুব পছন্দ করে।
তবে চকলেট আর গলা দিয়ে নামলোনা জায়দানের। দ্বিতীয় কামড় দেয়ার সাথে সাথেই সে খেয়াল করলো, চকলেটের যেখানে সে কামড় দিয়েছে, সেখানে ছোপ ছোপ র*ক্ত লেগে আছে। একটুও বিস্মিত হলোনা সে। মুখের ভেতরের আধ চেবানো অংশটুকু হাতে ফেলে দিতেই ছাউনির ভেতর মৃদু আলোয় উদ্ভাসিত হলো দৃশ্যটি। চকলেটের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার রক্তিম তরল। মুখের ভেতর নোনতা স্বাদটা টের পেলো জায়দান। ক্ষুধা, রুচি সবকিছু হইহই করে বিদায় নিলো মুহূর্তেই। একদম নির্লিপ্তভাবেই উঠে দাঁড়িয়ে সে হেঁটে গেলো ছাউনির ভেতর এক কোণায় রাখা ডাস্টবিনের দিকে। ফেলে দিলো চকলেট। ছাউনির বাইরে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টিতে রুমালটা ভিজিয়ে নিজের ঠোঁট এবং মুখের ভেতরটা খানিক মুছে নেয়ার চেষ্টা করলো। অফহোয়াইট রুমাল লালচে বর্ণে রেঙে উঠলো। সেটি দুমড়ে মুচড়ে নিজের পকেটে ভরে ফেলে একটি দীর্ঘশ্বাস টানলো সে। পরক্ষণে বাইরের দিকে হাঁটা দিলো। বৃষ্টির পরোয়া করলোনা আর। শরীরে হালকা জ্বর জ্বর ভাবটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেই বাইকে চেপে বসলো। ঠিক তখনি অদূরে দৃশ্যটি নজরে এলো তার।
ঝমঝম বৃষ্টির মাঝে অদূরে দাঁড়িয়ে সাবিন। ভিজে একাকার, তবুও কোনো হেলদোল নেই। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একনাগাড়ে চেয়ে আছে সামনে, অদ্ভুতুড়ে এক প্রাণহীন দৃষ্টিতে। জায়দান মুখ তুলে প্রশস্ত নয়নে দেখলো অর্ধাঙ্গিনীকে। মেঘ আজ আকাশে নয়, বরং ঘন কালো হয়ে ঘনিয়েছে তার স্ত্রীর মুখজুড়ে। তাতে যে যাতনা এবং অভিমানের অভিব্যক্তি ছাপা, তা জায়দানকে সব বুঝিয়ে দিতে যথেষ্ট।
তীব্র বর্ষণে চুপচুপে হয়ে ভিজতে ভিজতে কয়েক পা এগোলো সাবিন, রোবটের মতন করে। জায়দান বাইক থেকে নেমে গেলো। কয়েক কদম সামনে হেঁটে স্থির দাঁড়িয়ে তাকে দেখে গেলো। বৃষ্টির ফোঁটা চশমার কাচে জমে ঝাপসা করে দিচ্ছে দৃষ্টিকে। সাবিন থামলো এক হাত দূরে। তার পরনের ডেনিম জ্যাকেটের পকেট থেকে বেরিয়ে থাকা খামটা চোখে পড়ল জায়দানের। চিনতে একটুও বেগ পোহাতে হলোনা। কোনো অস্বাভাবিক অনুভূতি হলো? উঁহু। বরং হঠাৎ করেই নিজেকে ভীষণ নির্ভার লাগতে লাগলো।
একটা শব্দও উচ্চারণ করলোনা সাবিন। কাঁপতে থাকা দুহাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরলো জায়দানকে। তার বুকে মাথা গুঁজে শক্তভাবে চেপে ধরলো, যেন নিজের জীবনের অন্তিম অবলম্বনকে জাপটে ধরেছে সে। বরফের দেশে মানুষ যেমন করে এক শিখা আগুন খোঁজে, মরুভূমিতে যেমন করে মানুষ এক বিন্দু পানি খোঁজে, সাবিনের খোঁজটাও হুবহু তেমনি। জীবন মৃত্যুর খোঁজ। জায়দানের বাহুডোরে প্রচন্ডভাবে কাঁপতে লাগলো সাবিনের শরীর, যেন ভূমিকম্প খেলে যাচ্ছে রমণীর শরীরে। কান্নার কাঁপুনি। জায়দান পাল্টা জড়িয়ে ধরতে নিঃশব্দে নিজের বাহুজোড়া তুললো। তার মনে পড়ল চিঠিতে লিখা নিজের কথাগুলো,
“যখন তুমি সব জানতে পারবে, তখন আমায় কিছু জিজ্ঞেস করো না, কেমন? শুধু কাছে এসে শক্তভাবে জড়িয়ে ধরো প্লীজ! তোমার আর্তনাদ আমি সইতে পারবনা। নিঃশব্দে মুখ গুঁজে থেকো আমার বুকের মাঝে। আমি তোমায় সামলে নেবো, সবসময়ের মতন।”
অবশেষে জায়দান সাবিনকে জড়িয়ে ধরতে পারলো। অন্তরে ধ্বনিত হলো এমন একটি কথা যেটা সে মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে পারবেনা। সাবিন তার কথা রেখেছে, কিন্তু জায়দান নিজের কথা রাখতে পারেনি।
সহধর্মিনীকে সে নিজের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেললো। মুখ নামিয়ে গুঁজে ফেলল তার ভেজা চুলে। প্রাণভরে গ্রহণ করলো প্রিয়তমার অস্তিত্বে মাখা সুগন্ধটুকু। বৃষ্টির ঝাঁপটা বাড়লো। দমকা হাওয়া কাঁপুনি খেলিয়ে দিলো শরীরের প্রতিটি কোষজুড়ে। তার মাঝে জায়দান শুধু একটা বাক্যই ফিসফিস করে আওড়ালো বারংবার,
“কেঁদো না। আমার উপর দয়া থাকলে আর একফোঁটা কেঁদো না!”
বিপরীতে সাবিনের অশ্রুসিক্ত কন্ঠস্বর ভেসে এলো,
“একটা মেশিন বানাতে পারবে, জায়দান?”
নোনতা স্বাদের একটি ঢোক গিলে জায়দান শুধালো,
“কিসের মেশিন?”
এক মুহুর্ত নীরবতা। বৃষ্টির ঝাঁপটা এবং বাতাসের শনশন আওয়াজ পেরিয়ে অতঃপর উত্তর এলো,
“স্মৃতি মুছে ফেলার মেশিন।”
***
“এক মাস?”
“উঁহু।”
“এক সপ্তাহ?”
“নোপ!”
অসহায়ের মতন সাবিন এবং জায়দানের কথোপকথন দেখে যাচ্ছেন তাকবীর। শেষমেষ জায়দান হাতের তিনটি আঙুল তুলে বলল,
“তবে তিনদিন?”
“হ্যাঁ। তিনদিন।”
“মাই ওয়াইফ সেইড ইট। আপনার কাছে ৭২ ঘণ্টা সময় আছে তাকবীর হুসেইন। সবকিছু স্বীকার করার জন্য।”
“অন্যথায় তোমার আমার মিলন হবে প্রেস কনফারেন্সের টেবিলে, ডিয়ার চাচ্চু!”
ধড়ফড় করে নিজের বিছানায় উঠে বসলেন তাকবীর। ভয়ানক দুঃস্বপ্নটি তাকে গত ৪৮ ঘণ্টা যাবৎ ভূতের মতন তাড়া করে বেরিয়েছে। আর মাত্র ২৪ ঘণ্টা সময় আছে হাতে। অথচ, কোনো ব্যবস্থাই করতে পারেননি তিনি। সমস্ত শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। কম্বল লেপ্টে গিয়েছে শরীরে। যেন অশরীরী এক শৃঙ্খল। সেটা অতি আক্রোশে দূরে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে তিনি উঠলেন। মেঝেতে পা নামিয়ে এদিক সেদিক পায়চারি করতে লাগলেন।
সাবিন যে তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানে, সেটা তিনি আগেই ধারণা করেছিলেন। এজন্যই আহানকে বলে টাইট দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন ওই মেয়েকে। মেয়ে মানুষ, ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার কথা। অথচ, এই মেয়েটা এমনি ঘাড়বাঁকা যে তারই বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। আবার হুমকিও দিচ্ছে! সত্যিই কি কোনো প্রমাণ আছে তাদের কাছে? নাকি স্রেফ ফাঁকা বুলি? ব্যবসায় জয়ের প্রান্তে দাঁড়িয়ে যদি এতকিছু হয়ে যায়, তার প্রতিপত্তি থাকবে কিভাবে? তাছাড়া, ওই বজ্জাত মেয়েটা তো একা না! সঙ্গে জুটেছে ওটার স্বামী! কিভাবে বাগিয়েছে লোকটাকে? ওই লোকটা নাকি আবার ব্র্যাকের প্রফেসর, তাও সাইবার সিকিউরিটি এক্সপার্ট! বিদেশে পি এইচ ডি করেছে। তার হাত নিশ্চয়ই অনেক দূর! চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে, শুধু সবসময় বরফের মতন মুখ করে চুপচাপ থাকে বলে বোঝা যায়না।
থেমে গেলেন তাকবীর। না না! আর অপেক্ষা করা যাবেনা। ওই মেয়েটাকে সেবার দয়া দেখিয়ে ছেড়ে দেয়ার কথা বলাটাই ভুল হয়েছিল। সাবিন তার বাপের চাইতেও একশো গুণ বেশি ত্যাদড়! বোঝা উচিত ছিল তাকবীরের। এবার আর কোনো কাঁচা খেলা নয়। একেবারে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলতে হবে সমস্যার মূলকে!
হাত বাড়িয়ে নিজের ফোন হাতে নিয়ে দ্রুত ডায়াল করলেন তিনি। প্রথম কয়েকবারে ফোন রিসিভ হলোনা। পঞ্চমবারে রিসিভ হতেই অত্যন্ত শীতল গলায় তাকবীর হুংকার দিলেন,
“আর কতকাল কাপুরুষের মতন গা ঢাকা দিয়ে থাকবি? এবার আহত সিংহের খাঁচা থেকে বেরোনোর সময় হয়েছে! হ্যাডম থাকলে বেরিয়ে আয়, আর জিতে নে!”
_________চলবে_________
[ আজকের পর্বটা ছোট হয়েছে অনেক, জানি, কিছু মনে করবেন না।
সকলকে রমজানুল মোবারক!♥️ ]

