#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতেঃ মিথিলা মাশরেকা
৯.
“পরিত্যক্ত কলাভবনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃ*তদেহ উদ্ধার! নেশায় আছন্ন অবস্থায় পেয়ে প্রথমে নির্মম অত্যাচার আর তারপর হ*ত্যা!”
বড়বড় শিরোনামে সবুজের মৃতদেহটা টিভিচ্যানেলসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ দেখানো হচ্ছে। টিভিতে খবরটা দেখে সাইফ আটকে রইলো। মুখে ব্রেড তুলতে গিয়েও তুলতে পারলো না। স্নিগ্ধতাকে বাসায় আনার পর ওকে নিয়েই ব্যস্ত সময় কেটেছে সাইফের। যদিও স্নিগ্ধতা সম্পুর্ণ সুস্থ, তবুও নিজহাতে রান্না করে, ওকে খাইয়ে, ঘুম পাড়িয়ে সারাটা রাত সাইফের কেটেছে চঞ্চলকে কিভাবে শাস্তি দেবে, সে চিন্তাতে। রাতের মধ্যে ওই ক্যাম্পাসে খু*নের ঘটনা ঘটেছে দেখে, প্রতিক্রিয়া করা ভুলে গেলো ও। পুর্ণ মনোযোগ দিলো খবরের দিকে।
বিভ্যৎসভাবে চোখ বের করে নেওয়া হয়েছে সবুজের। ঠোট ধারালো কিছুর আচড়। হাতের আঙুলগুলোর গিট দুমড়েমুচড়ে বাকিয়ে দেওয়া আর নখের পরিবর্তে আঙুলের উপরিভাগসহ নেইলকাটারে কেটে নেওয়া। বুকের লোমগুলো হাতে টেনে তোলা হয়েছে যেনো। পায়ের নখের ওপর পাথরজাতীয় কিছু বারবার ফেলে থেতলে দেওয়া হয়েছে। অনুরুপ অবস্থা লজ্জাস্থানেরও। এমনটাই বলা হচ্ছে নিউজে। সবটা দেখে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো সাইফ। এমন নৃশংস মৃ*ত্যুর চেয়েও বড় কথা, ওর চলমান কেইসের বাকি চারটে খু*নের সাথে পুরোপুরিভাবে মিলে গেছে সবুজের মৃত্যুর ধরনটা। সবাই চঞ্চলকে সন্দেহভাজন মনে করলেও, ওর মাথায় কেবলই ঘুরতে লাগলো সিরিয়াল কিলারের কথা।
-ভাইয়া!
স্নিগ্ধতার গলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠলো সাইফ। নিজের ঘরে ঘুমন্ত দেখে এসেছে ওকে। এভাবে চিৎকার কেনো করবে হঠাৎ? টিভি অফ করে ছুট লাগালো বোনের ঘরে। দরজা খুলে দেখে স্নিগ্ধতা বিছানার চাদর খামচে ধরে বসে আছে। জোরে জোরে শ্বাস ফেলছে অস্থিরভাবে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অনেকটা ভয় পেয়ে আছে ও। সাইফ ছুটে গিয়ে বিছানায় বসে স্নিগ্ধতার গালে আলতোভাবে ছুইয়ে বললো,
-টুকি? কি হয়েছে? এইতো আমি আছি দেখ? টুকি?
স্নিগ্ধতা যেনো হুশে ফিরলো। কিন্তু ভয় কমেনি ওর। ভাইয়ের বুকে মুখ গুজে দিয়ে বললো,
-ভ্ ভাইয়া, র্ রক্ত! র্ রক্ত! আমি…
সাইফ চোখ বন্ধ করে শক্ত রাখলো নিজেকে। ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখে প্রায়ই এভাবে “রক্ত!” বলে চেচিয়ে ওঠে স্নিগ্ধতা। অনেক চেষ্টা করেছে। কিন্তু কার এক্সিডেন্টের ওর সে রক্তাক্ত অতীতকে কিছুতেই ভুলাতে পারেনি সাইফ। একহাতে বোনকে জড়িয়ে রেখে, ওর চুলে আরেকহাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,
-রক্ত নেই টুকি। বাজে স্বপ্ন দেখেছিস তুই।
…
-ভয় পাসনা। আমি আছি তো!
সময় নিয়ে স্নিগ্ধতা শান্ত হলো। মুখ তুলে তাকালো সাইফের দিকে। সাইফ সুন্দর একটা হাসি দিয়ে ওর চুলগুলো ঠিক করে দিলো। স্নিগ্ধতা মিনমিনে গলায় বললো,
-আমি তোমাকে অনেকবেশি জ্বালাই, অনেকবেশি কষ্ট দেই। তাইনা ভাইয়া?
সাইফ শব্দ করে হেসে দিলো। বেডসাইড টেবিল থেকে পানির বোতলটা স্নিগ্ধতার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
-হুম। কারন প্রতিবার আমিই তোকে সুযোগ করে দেই আমাকে জ্বালানোর। আচ্ছা বলতো, তোকে আমি কখনো ভয় পেতে বারণ করিনা কেনো?
-কেনো?
-তুই ভয় পেলে আমার নিজের দায়িত্বগুলোর কথা মনে পরে। আমার টুকি তো মা*রামারি, স*ন্ত্রাস সহ্য করতে পারে না। তো তোর জন্য যেমন তোর পাশে কোনো ভায়োলেন্স তৈরী হতে দেবো না, ঠিক তেমনই একজন পুলিশ হিসেবে দেশের বাকিসব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো, তাদের সাথেও কোনোরকম ভায়োলেন্স তৈরী হতে দেবো না। আর এমনটা হলে, তবেই না আমার ডিএমপি তে জয়েন করা স্বার্থক বল?
স্নিগ্ধতা কেবল চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ভাইয়ের দিকে। সাইফ স্নিগ্ধতাকে ঠেলে বিছানা থেকে নামালো। বিছানায় থাকা পাতলা চাদরটা ভাজ দিতে লাগলো। তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বললো,
-চল ফ্রেশ হয়ে রেডি হ জলদি। স্যান্ডউইচ বানিয়েছি। ভার্সিটি যাবি তো!
স্নিগ্ধতা তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে। সাইফ কাজ থামিয়ে একপলক বোনের দিকে তাকিয়ে বললো,
-আর হ্যাঁ, মনে রাখিস, আমি থাকতে কেউ, কখনো, কোনো ক্ষতি করতে পারবে না তোর। আমি তোর ঢাল হয়ে আছি, ছিলাম আর থাকবো। সবসময়।
ঠোটে হাসি ফুটলো স্নিগ্ধতার। সাইফ নিজের কাজে মনোযোগ দিলো। হাসি পরপরই নুইয়ে গেলো স্নিগ্ধতার। মৃ*ত্যু তো এমনিতেও কড়া নাড়ছে ওর দুয়ারে। কিন্তু সে মৃত্যুর আগে যদি কখনো এ ভরসা হারিয়ে যায়? সাইফের ভরসাই যে ওকে বাচিয়ে রেখেছে! মহাপরিণয় কি কেবলই মৃ*ত্যুই? নাকি অন্যকোনো পরিণতির মোড় নেবে ওর জীবন? আদৌও কি সম্ভব তা?
•
মনোবিজ্ঞানের লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে বেরোলো শারাফ। থেসিসের জন্য এভাবে নিয়মিত ক্যাম্পাসে আসতে হচ্ছে ওকে। কোনটা, কখন, কোন লজিকাল স্টেটমেন্টে লিখবে, সে ধারনার জন্য নতুন পুরোতন সবরকম বই ঘাটাঘাটি করতে হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে জরিপ করতে চেয়েছিলেন প্রফেসর নাহিদ। এ জরিপ সাধারনত মনোবিজ্ঞানের সিনিয়র শিক্ষার্থীরাই পরিচালনা করে। শারাফ ইতিমধ্যে বাইরে থেকে এ বিষয়ে পড়াশোনা করে এসেছে। তাই সবার ইচ্ছে ছিলো এক্ষেত্রে ওকেই প্রতিনিধি করা। মানা করতে পারেনি শারাফ। বুঝছে, এ নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করতে চলেছে ও।
শারাফ এগোচ্ছিলো রিডিংরুমের দিকে। বারান্দা থেকে হঠাৎ বাইরে তাকাতেই পায়ের গতি কমে আসলো ওর। হাতে থাকা খোলা বইয়ের পাতাটা দমকা এক বাতাসে উল্টে গেলো। সামনে এগোনোর পরিবর্তে এগিয়ে মাঠের দিকটায় এসে দাড়ালো শারাফ। দৃষ্টি আটকালো এক অ-উপেক্ষাযোগ্য দৃশ্যে। এক অনাকাঙ্ক্ষীত প্রলয়ায়। স্নিগ্ধতায়!
মাঠের ওপাশে একসারি রঙ্গন গাছ। আলাদা আলাদা রঙের রঙ্গন ফুটে লালইটের রাস্তাটাকে আরো সুন্দর করে তুলেছে। আর সে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে ক্যানভাসে ছবি আকাচ্ছে স্নিগ্ধতা। ছাড়া চুল, পরনে হালকা গোলাপী-সাদার বড়হাতা গাউন, ওড়নাটা সাদা। ওর গায়ের বরনে রঙদুটো যেনো পুর্ণরুপে নিজের স্বার্থকতা খুজে নিয়েছে। কিঞ্চিৎ বাতাসে কিছু চুল চোখে এসে পরলো স্নিগ্ধতার। চুলগুলো কানে গুজে দিয়ে স্নিগ্ধতা আবারো হাত চালালো ক্যানভাসে। এ যেনো একপ্রকার চোখের শান্তি। শারাফ নিশব্দে হাসলো সেদিকে চেয়ে।
-এতো মনোযোগ দিয়ে কার মন পড়ার চেষ্টা করছেন মিস্টার সাইক্যাট্রিস্ট?
মুচকি হেসে চোখ নামিয়ে নিলো শারাফ। পাশ ফিরে অগ্নিলাকে দেখে অবাক হলো না একটুও। ডানহাতে থাকা বইটা বন্ধ করে বা হাত পকেটে গুজে আরামে দাড়ালো। বললো,
-সেটা কি আদৌও আপনার নজর এড়িয়েছে ম্যাডাম?
অগ্নিলা মৃদ্যু হাসলো। উকি দিয়ে একপলক দেখে নিলে স্নিগ্ধতাকে। চোখের চশমা ঠেলে দিয়ে বললো,
-তোমার দৃষ্টি আটকানো স্নিগ্ধতার সাথে কাল পরিচয় হয়েছে আমারও শারাফ। মেয়েটা ওর নামের মতোই মাশাআল্লাহ্। যেমন রুপ, তেমন ব্যবহার। দেখলেই মনে হয়, উপরওয়ালা খুব যত্ন করে বানিয়েছে ওকে। বেশ মানাবে তোমাদের।
-সেরকম কিছু না অগ্নিলা। এখান দিয়েই যাচ্ছিলাম আর…
-বা হাতের কাটা দাগটার মতো এখন নিজের অনুভূতিকেও লুকাচ্ছো?
শারাফ থামলো। অগ্নিলা একপা এগিয়ে শারাফের বাহাত সামনে তুলে ধরলো। অনামিকা আঙুলটার নিচে অনেকখানি কাটার দাগ। বেশ গভীর আর বাজেভাবে কেটে গেছে। একপ্রকার বিরক্তিতে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো শারাফ। উটকো ঝামেলাটা এড়াতে চাইছিলো বলে, যাতে কারো চোখে না পরে, এজন্য ব্যান্ডেজ অবদি লাগায়নি। জানতো সেটা কাজে দেবে না অগ্নিলার ক্ষেত্রে। তাই পকেটে পুরেছিলো হাতটা। লাভ হয়নি তাতেও। শারাফ নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো মৃদ্যুভাবে। অগ্নিলা শীতলস্বরে বললো,
-নিউজ দেখেছো?
-হুম।
-কাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে শারাফ? বাসায় তো নয়ই! দেন?
অগ্নিলার প্রশ্নের ধরন দেখে মুচকি হাসলো শারাফ। বললো,
-আমার এমন কেনো মনে হচ্ছে অগ্নিলা যে, তুমি টিচিং ছেড়ে সামহাউ পুলিশে জয়েন করতে চলেছো?
-কাল রাতে যে ছেলেটা ওমন ভয়ানকভাবে খু*ন হয়েছে, সে আর তার বন্ধুরা মিলে গতকাল স্নিগ্ধতাকে টিজ করেছিলো শারাফ।
অগ্নিলা শারাফের ওই চমৎকার হাসিতে ভুললো না। বরং নিজের কথাগুলো আরো গাঢ়ভাবে বললো। শারাফ কিঞ্চিৎ ভ্রুকুচকে তাকাতেই অগ্নিলা আবারো বললো,
-ডোন্ট গিভ মি দ্যাট লুক। ওরা যখন স্নিগ্ধতার ওখানে ছিলো, সে সময় তোমার রিডিংরুমে থাকার কথা থাকলেও, তুমি সেখানে ছিলে না। নাইবা গত রাতে ছেলেটা খু*ন হওয়ার সময় তুমি বাসায় ছিলে।
-সো? কি মিন করতে চাইছো তুমি?
-এতো ভয়ানক মাইন্ডগেইম খেলার চেষ্টা করো না শারাফ।
-তোমার মনে হচ্ছে না যে তুমি একটু বেশিই ভাবছো?
শারাফের ঠান্ডা স্বর। কিছু বলতে যাবে, ফোন বেজে উঠলো অগ্নিলার। একপলক ফোন, তারপর শারাফের দিকে তাকিয়ে বললো,
-আমাকে ভুল প্রমান করো প্লিজ। আই’ল বি এগারলি ওয়েটিং!
ফোন কানে তুলে চলে গেলো অগ্নিলা। কপালে ভাজ ফেলে হাতের কাটা জায়গাটার দিকে তাকিয়ে রইলো শারাফ। তারপর স্নিগ্ধতা যেখানে ছিলো, সেদিকে তাকালো। ওখানে এখন নেই স্নিগ্ধতা। বেখেয়ালিভাবে পায়ের নিচের ইটের টুকরোতে পা ছুড়লো শারাফ। সামনে দিয়ে দুটো একটা মেয়ে যাচ্ছিলো। শারাফ একদম বাচ্চাদের মতো করে কান ধরে বললো,
-সরি…
মেয়েদুটো হেসে দিয়ে ‘ইটস্ ওকে’ বলে চলে গেলো। মাথা নেড়ে হাসতে হাসতে নিজেও চলে আসলো শারাফ। খানিকটা দুরে বটের আড়ালে একজোড়া চোখ সে বাচ্চামো, সে হাসিটা তুলে নিলো তার চোখে। তারপর তুলির আঁচড়ে এটে দিলো তার ক্যানভাসে। ইন করা মেরুন শার্ট, ফর্মাল গেট আপ, গুটানো হাতা, একহাতে বই, আরেকহাতে কান ধরে, আধোআধো চাওনিতে সরি আঁকানো সে বিম্ব। এবার তুলি ছেড়ে নখের ডগায় কালোরঙ তুললো স্নিগ্ধতা। শারাফের বা হাতের কাটা জায়গাটাও ঠিকঠাকমতো আঁকলো ছবিতে। আঁকানো শেষে দু পা পিছিয়ে গিয়ে নিস্পলকভাবে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। ক্যাম্পাসে এতোকিছু, এতোমানুষ থাকতে এই মানুষটাকেই কেনো নিজের ক্যানভাসে তুললো ও, তা ও নিজেও জানেনা। মৃদ্যুস্বরে কেবল বললো,
-এই স্নিগ্ধতম ব্যক্তিত্বে, ওই কাটাদাগের মতো আর কোনো কলঙ্ক, কখনো না লাগুক!
#চলবে…
[ শেষ হওয়া সকল গল্পের লিংক, চলমান গল্পের সবধরনের আপডেট এবং গল্প ও লেখিকা সম্পর্কিত আড্ডা, আলোচনা, মতামত জানাতে জয়েন করুন “মিথিমহল”। গ্রুপ লিংকঃ
https://www.facebook.com/groups/233416685257163/?ref=share_group_link ]

