#নন্দিত_চন্দ্রকলঙ্ক
লেখনীতে : মিথিলা মাশরেকা
৬৮.
স্নিগ্ধতার ঘরের বাইরে ওর দুই প্রতিবেশী আর অনু। বর এসেছে শুনে সবাই গেইটে চলে গেছে। আর বৃদ্ধাশ্রমের বয়স্করা ড্রয়িংরুমে। অনু নিজের ফোনের ম্যাসেজ চেইক করলো। স্নিগ্ধতা সিন করেছে ওর ম্যাসেজ। অথচ ফোনও রিসিভ করছে না, দরজাও খুলছে না। সেইযে সাইফ ওর সাথে কথা বলতে ঢুকেছে, এরপর আর সাড়াশব্দ নেই কোনো। বিয়ের আগ-মুহুর্তে আদুরে বোনের প্রতি ভাই আবেগপ্রকাশ করবে, এসব ভেবে আর কেউ ওদের ডাকেও নি। কিন্তু এখন তো বরপক্ষ এসেছে। এবার তো বেরোনো উচিত ওদের। সাইফ-অগ্নিলাকে ছাড়া শারাফ বা বরপক্ষের স্বাগত ভালো দেখাবে না। অনুর চিন্তা হতে শুরু করেছে। গতরাতের ঘটনার পর ওর নিজের মানসিক অবস্থাও তো ভালো না। স্নিগ্ধতা বলে আবারো দরজা ধাক্কাতে যাচ্ছিলো অনু। সেসময়ই দরজা খুলে দিলো স্নিগ্ধতা। ওকে দেখে অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে রইলো অনু। বিস্মিতস্বরে বললো,
– তুই বেনারসি পরেছিস?
স্নিগ্ধতা নিজের গায়ে তাকালো। ওর পরনে শুভ্র জামাটার পরিবর্তে এখন লাল টকটকে বেনাসরি। ওই লালকে রঙ বললে ভুল হবে হয়তো। ও তো সর্বাঙ্গে সাইফের মতো নিস্পাপের র’ক্ত জড়িয়েছে। শুভ্রতার মতো বিশুদ্ধতা ওর জন্য নয়। মৃদ্যুস্বরে বললো,
– শারাফ চেয়েছিলো আমি লাল বধু হয়ে ওর ঘরে যাই। তাই…
অনু হাসলো। ওর থুতনি ধরে বললো,
– বাব্বাহ! এতো জলদি এমন বরপাগল হয়ে গেলি? আনএক্সপেক্টেড।
স্নিগ্ধতা জবাব দিলো না। ওর সর্বাঙ্গে আগের সাজের ছিটেফোটাও নেই। অনুর কপালে ভাজ পরলো। কিছু একটা মনে পরতেই ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিলো ও। শুধালো,
– আচ্ছা সাইফ ভাইয়া কই রে? তোরা তো রুমেই কথা বলছিলি তাইনা?
স্নিগ্ধতা জবাব দিলোনা। তেমনই নিরব। তখনই এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে আসলেন ওখানে। স্নিগ্ধতাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
– কিরে স্নিগ্ধতা? সাইফকে দেখছিনা যে? বরপক্ষকে আর কতক্ষন গেইটে দাড় করিয়ে রাখবো বলতো। কোথায় ও?
– সে অনেক আগেই কেইসের ফাইল সাবমিট করতে বেরিয়ে গেছে। আজকে নাকি ওটার লাস্ট ডেইট।
শান্তশিষ্টভাবে জবাব দিলে স্নিগ্ধতা। কপাল আরো কুচকে আসলো অনুর। সাইফ বলেছিলো, যে করেই হোক এ বিয়েতে থাকবে ও। অথচ কেইসের জন্য আজকেও বেরিয়ে গেলো? কখন গেলো? স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে দেখে ও স্থির। ওর নিমীলিত নিচুদৃষ্টি দেখে মায়া হলো অনুর। কিছুক্ষণ আগেও কতোটা হাসিখুশি ছিলো স্নিগ্ধতা। আর সাইফ বিয়েতে নেই বলে এখন রাজ্যের কষ্ট চাপা দিয়ে আছে ও। অনু ওর কাধে হাত রাখলো। বললো,
– দেখ স্নিগ্ধতা, তুইতো জানিস ভাইয়া এমনই। মন খারাপ…
অনু শেষ করার আগেই পাশে থাকা ভদ্রলোক বলে উঠলেন,
– এই ছেলেটা পারেও! আজকে ওর বোনের বিয়ে! আজকেও পুলিশস্টেশনে যেতে হবে ওকে? কোনো মানে হয়?
আশপাশে আরো গুন্জন শুনতে পেলো স্নিগ্ধতা। কিন্তু কিছু বললো না। ওকে চুপ দেখে বলতে বলতেই থেমে গেলো সবাই। ভদ্রলোক নিজেও স্নিগ্ধতার মুখের দিক তাকিয়ে আটকে গেলেন। স্নিগ্ধতার চেহারায় বিষন্নতা দেখে আর কিছু বলতে ইচ্ছে করলো না তার। তাড়া দেখিয়ে বললেন,
– আচ্ছা সাইফ নেই তো কি হয়েছে? আমরা তো আছি! এতোজন থাকতে আর কিসের চিন্তা তোর বলতো? ও সাইফ চলে আসবে কাজ শেষ হলেই। এই স্নিগ্ধতা? যা তোর সাজ শেষ কর। যা দেখছি, তোর তো সাজ শেষ হয়নি৷ জলদি যা! বরপক্ষ ভেতরে ঢুকেই ফটোসেশনের জন্য ডাক লাগাবে কিন্তু! জলদি রেডি হ যা!
অনুকে ইশারা করে ভদ্রলোক চলে গেলেন। অনুও দ্রুত ঘাড় নাড়ালো। স্নিগ্ধতাকে ধরে নিয়ে আয়নার সামনে বসালো ও। ঘর ভরে গেলো মেয়ের দলে। বাইরের কলকল আওয়াজ কানে আসছিলো স্নিগ্ধতার। সবাইমিলে ওকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে। তারপরও ও তেমনি স্তব্ধ। পুতুলের মতো চুপচাপ বসে আছে৷ দুজন মেয়ে ওর চুল ঠিক করছে, একজন কাজল, লিপস্টিক দিয়ে ওর চেহারা সাজাচ্ছে। ওদের একজন স্নিগ্ধতাকে বললো,
– কিরে? অগ্নিলা ভাবীকে দেখছিনা যে! সাইফ ভাইয়া কি বউসমেত পুলিশস্টেশনে গেছে? নাকি ভাবীই ভাইয়ার পেছনপেছন ছুটেছে?
হাসাহাসি করতে লাগলো সবাই। তবে অনু বিষয়টাকে গুরত্ব দিলো। ও আবারো স্নিগ্ধতাকে জিজ্ঞেস করলো,
– ঠিকই তো। ম্যাম কোথায় রে? ম্যামকে তো অনেকআগেই তোদের ডাকতে পাঠিয়েছিলাম আমি।
– জানিনা। বরপক্ষের ওখানে হতে পারে।
অনু বিশ্বাস করে নিলো কথাটা। স্নিগ্ধতাকে নতুনকরে গয়না পরাচ্ছে ও। বেনারসির সাথে মানানসই স্বর্ণের গয়না। বিছানায় বসা এক বয়স্কা কয়েকটা গয়নার বাক্স অনুকে এগিয়ে দিয়ে বললো,
– এইবার না লাগছে নতুন বউ! আমাদের কালে তো লাল বেনারসি ছাড়া বিয়েই হতো না। আর তোমরা ওকে কি পরিয়েছিলে? সাদা জামা। নাও অনু! এগুলো পরাও স্নিগ্ধতাকে। এগুলো ওর মায়ের গয়না। সাইফ অনেক যত্ন করে তুলে রেখেছিলো। আমাকে বলেছিলো পরাতে বলতে। তারপর তোমরা যে জামা পরিয়েছিলে, ওই সাদা জামার সাথে নাকি এই সোনার গয়না যাবেনা, এই বলে বারণ করে গেছে। ওর সাধ-আহ্লাদ পরে। আগে ওর টুকির ভালোলাগা।
চোখ দিয়ে জল গরালো স্নিগ্ধতার। সবার চোখে পরলো, বিন্দুমাত্র শব্দ করে কাদছে না ও। দম বন্ধ রেখে পাথরের মতো বসে আছে। সাজানো শেষ হয় স্নিগ্ধতার। কয়েকমুহুর্ত পরই বাইরে থেকে ডাক আসে স্নিগ্ধতাকে নিয়ে যাবার জন্য। অনু ওকে তুলে দাড় করালো। একটা প্রতিবেশি মেয়ে এসে ওর কাধে থুতনি রেখে, ড্রেসিং টেবিলে স্নিগ্ধতার প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে বললো,
– মাশাল্লাহ কি মিষ্টি লাগছে রে তোকে স্নিগ্ধতা! এমন লাল টুকটুকে বউ আমি জীবনে আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। তোকে দেখে মনোবিজ্ঞানী ইয়াকীন শারাফ নিজেই আজকে মানসিক ভারসাম্য হারাবে।
আবারো হাসাহাসি করতে লাগলো সবাই। স্নিগ্ধতার যেনো কানেই গেলো না কথাটা। একহাতে মাথার বউ ওড়নাটা ধরে পেছন ফিরলো ও। মৃদ্যুপায়ে এগোলো আলমারির দিকে। বড় আলমারিটায় আপাদমস্তক দেখার মতো বড় আয়না লাগানো। সে আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে পুরোপুরি সাজে দেখলো স্নিগ্ধতা। জলভরা চোখে চেয়ে থেকে ফিসফিসিয়ে বললো,
– শেষবারের মতো তোমার টুকিকে একটু আদর করে দাও ভাইয়া? তোমার কাছে এটা আমার শেষ আবদার। প্রমিস…
•
বেনারসি পরিহিত স্নিগ্ধতাকে দেখে সাইফ চোখ বন্ধ করে নিলো। সামনের টেবিলে অগ্নিলা ল্যাপটপ স্ক্রিন অন করে রেখে, আবারো ওর পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বসেছে। সাইফ সরতে বললেও মানেনি ও। স্নিগ্ধতার আশপাশ দেখে ক্যামেরার অবস্থান স্পষ্ট টের পেলো সাইফ। স্নিগ্ধতার রুমের বড় আলমারিতে থাকা আয়নার পারার মাঝেই ক্যামেরা সেট করা। অগ্নিলা মিনমিনে গলায় বললো,
– স্নিগ্ধতা কি বললো সাইফ? মাইক্রোফোন নেই আয়নায়। আমি শুনতে পাইনি ও কি বললো। তুমি বুঝেছো ও কি বলেছে?
সাইফের জ্বলন্ত চোখজোড়া চিকচিক করছে পানিতে। অগ্নিলা বুঝলো, সাইফের নিরবতার অর্থ, এই খু’নী, বিশ্বাসঘাতক য়্যুমুর মুখে আমার টুকির নামটাও শুনতে চাইনা আমি। য়্যুমুর কাজের উদ্দেশ্য খারাপ না হলেও, প্রক্রিয়া বেআইনি। আর সেটা সাইফ কোনোদিনও মানতে পারবে না। এটুকো চেনে ও সাইফের নিরবতাকে। সাইফ মুখে বললো,
– আর কোথায় কি কি ফাঁদ পেতেছো তোমরা?
– এই আলমারীর কোনো ব্যাকসাইড নেই সাইফ। যেটা আছে, একটা টেম্পোরারি দেয়াল। অসময়ে স্নিগ্ধতার বাসা থেকে বেরোনোর পথ ওটা।
অসময় বলতে যে অগ্নিলা খু’নের উদ্দেশ্যে বেরোনোর সময় বুঝিয়েছে, সেটা বুঝতে সময় লাগলো না সাইফের। নিজের বাড়িতেই একটা খু’নী এমন চক্রব্যুহ কবে, কখন কিভাবে রচনা করছে, সেটা ও পুলিশ হয়েও ও জানতে পারেনি। নিজের ওপর রাগ বাড়ে সাইফের। আবারো ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকায় ও। সেখানে থাকা স্নিগ্ধতার মুখটা দেখে ওর ভুলে যেতে মনে চায় সবটা। পরপরই ও নিজেকে বোঝায়, এটা ওর বোন নয়। এরমাঝে কয়েকটা ছেলেমেয়ে এসে স্নিগ্ধতার মাথার ওপর ওড়না ধরলো। মানে বিয়ের জন্য এখন নিয়ে যাওয়া হবে স্নিগ্ধতাকে। স্নিগ্ধতা চোখ মুছে পা বাড়ালো। অগ্নিলা হাতের রিমোটটা নিয়ে একটা সুইচ টিপে দিলে আরেকটা দৃশ্য চালু হয় ল্যাপটপে। সাইফ দেখলো, সব দৃশ্যেই একদম সম্মুখ থেকে দেখা যাচ্ছে স্নিগ্ধতাকে। অগ্নিলা বললো,
– সবাই জানে তুমি পুলিশস্টেশনে আছো। আর আমি আপুকে বলেছি, আমার কাজ আছে। তবে স্নিগ্ধতা কবুল বলার আগেই পৌছে যাবো। রাগ করে ফোন কেটে দিয়েছে ও। তবে সবাইকে সামলে নেবে ও জানি। কেউ আমাদের খোজ করবে না সাইফ। আজকে তোমার কাছে আমার স্বীকারোক্তি দেবার সময়। আজকে আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। অনুর টিকলিতে যে মাইক্রোক্যামেরা আছে, ওটা দিয়ে আমরা দুজনে মিলে একসাথে এ গল্পের সূচনা থেকে উপসংহার দেখবো হুম? হুম?
সাইফ ল্যাপটপ স্ক্রিনে চেয়ে। ওর বাসার ছোট্ট বাগানে স্টেজ করা হয়েছে। সাদা ঝালড় আর ফুলের সে সাজ সাইফের নিজহাতে করা। সাদা শেরওয়ানি পরিহিত শারাফ স্টেজের মাঝের সোফায় বসে। ওর হাসিটা দেখে সাইফের পুনরায় অপরাধবোধ শুরু হয়ে গেলো। মুসকানকে কোলে নিয়ে ওরসাথে দুষ্টুমি করছে শারাফ। মিসেস সেজান আর শাওন বাদে স্বপ্নীলের বাকিসব ওর আশেপাশেই। পুরো পরিবারটাকে ওমন হাসিখুশি দেখে সাইফের ভেতরটা খু’চিয়ে ধরলো। এমন সুন্দর একটা পরিবারে য়্যুমুর ন’জর লেগেছে! নজরই তো! একটা খু’নী যখন বিয়ে করে কোনো বাড়িতে ঢুকবে, তার পরিণয় নিসন্দেহে ভ’য়াবহই হতে চলেছে। অগ্নিলা বললো,
– মিট স্বপ্নীল পরিবার। আমার আপন বোনের শশুড়বাড়ি। চারবছর আগে আমার বোন মেহেরুনের সাথে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় এ বাড়ির বড় ছেলে শাওনের সাথে। যে কিনা ইন্জিনিয়ারিং পাশ করে নরওয়েতে চাকরিরত। আর বাড়ির ছোট ছেলে, শারাফ৷ আমার দেখা সবচেয়ে হাসিখুশি ছেলেটা। হাসতে হাসতে যে সব সিচুয়েশন সামাল দিতে পারে। বোনের হবু বরকে নিয়ে সবই জানো তুমি। যেটুকো জানোনা, তা অতোটা অর্থবহ না এ গল্পে। ওর ম্যাসাচুসেটসে থাকা তিনবছর। পিএইচডি করতে যাওয়ার সে যাত্রার শুরুতে শারাফের সাথে পরিচয় হয় এক নরওয়েজিয়ান ট্যুরিস্টের। য়্যুমু-সাকলিক।
ক্যামেরা আবারো ঘোরে। এবারে স্নিগ্ধতাকে ঘর থেকে বেরোতে দেখা যায়। ওর মাথার ওপর ওড়না ধরে আছে আগেপিছের কয়েকজন। চারপাশে সবাই হাসিমুখে। কেবল ওর মুখে হাসি নেই। নিচদিক তাকিয়ে এগোচ্ছে ও শুধু। মুখচেহারা উদাস, অনূভুতিশুন্য। অগ্নিলা বললো,
– গল্পের মুল চরিত্র। মা নরওয়েজিয়ান প্লাস্টিক সার্জন। তুরস্কে এক মুসলিম ভদ্রলোকের সাথে এই খ্রিস্টধর্মাবলম্বীর প্রেম হয়। আর তার পরিনয় হিসেবে, য়্যুমু। য়্যুমুকে ওর মা সবটুকো স্বাধীনতা দিয়েছিলো। দেশবিদেশ ঘুরে বেরাতো ও। একসময় য়্যুমু পা দেয় ম্যাসাচুসেটসে। শারাফের সাথে দেখা হয়ে যায় ওর। স্টেডিলি, য়্যুমু শারাফের প্রেমে পরে যায়। তবে শারাফ নিজের দিক থেকে ঠিক ছিলো। য়্যুমুকে ভালো বন্ধু হিসেবেই গণ্য করতো ও। ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে কয়েকদিনের জন্য বিডিতে চলে আসে শারাফ। তবে য়্যুমুর সে দুরুত্ব পছন্দ হয়না। বিডিও আসে ওউ। তারপর সেখান থেকে য়্যুমু কিকরে স্নিগ্ধতা হয়, তা তুমি জানো। আর এরপরই শুরু স্নিগ্ধতার প্রলয়রুপ।
অগ্নিলার গলা ধরে আসছিলো। স্ক্রিনে তখন দেখানো হচ্ছে, স্নিগ্ধতার সাথে সবাই ছবি তুলছে। ওকে স্বাভাবকি করার, হাসানের চেষ্টা করছে। কিন্তু ও তেমনই নিস্প্রভ। অগ্নিলা একটা শুকনো ঢোক গিলে বললো,
– তোমার কাছে আসা শুরুর চারটে কেইসের আগে ও আরো তিনটে খু’ন করেছিলো সাইফ।
সাইফ থমকে অগ্নিলার দিকে তাকালো। এতোক্ষনে প্রথমবার চোখাচোখি হয় ওদের দুজনের। সাইফ সামনে তাকায়। স্নিগ্ধতাকে দেখে কপালের পাশ বেয়ে ঘাম গরায় ওর। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো বিচলিত হয়ে বলে ওঠে, ‘আটটা নয়, মোট এগারোটা খু’ন করেছে এই মেয়েটা। ও কোনো সুস্থ্য মস্তিষ্কের মানুষ নয়। হতেই পারেনা সেটা। আর এমনটা হলে ওর আশেপাশে কেউই নিরাপদ নয়।’ অগ্নিলা বললো,
– সে তিনজন কে কে ছিলো, সেটা আমি আজ অবদিও জানিনা। ওদের বডি য়্যুমু কোথায় কিভাবে গায়েব করেছে সেটাও আমাকে বলেনি ও। তোমার কেইসের দ্বিতীয় খু’নের সময় ওর-আমার সাথে দেখা হয়। ওইদিন মাঝরাস্তায় এক পলিটিশিয়ানের গালে জুতা মে’রেছিলাম আমি। স্কুলের এক বাচ্চা মেয়েকে ভুলভাল বুঝিয়ে গাড়িতে তুলে বাজেভাবে ছোয়ার চেষ্টা করেছিলো জানোয়ারটা। আমার কাজে পুরো জায়গাটায় হুলস্থুল পরে যায়। ওইদিন সন্ধ্যেপরই ওই পলিটিশিয়ানের কয়েক চেলা কিডন্যাপের চেষ্টা করে আমাকে। কিন্তু আমাকে গাড়িতে তোলার সময়ই স্নিগ্ধতারুপী য়্যুমু সেখানে পৌছে। সেই কালো জ্যাকেট মাস্কধারী অবয়ব। অদ্ভুত কিছু একটা স্প্রে করে সেন্সলেস করে ফেলে প্রত্যেককে। আর জ্ঞান ফেরার পর আমি নিজেকে এইখানটায় পাই। জাস্ট লাইক ইউ।
সেরাতে য়্যুমু অতি গুছিয়ে বুঝায় আমাকে, ও ভার্সিটির হলগুলোতে চলা মাদকব্যবসা আর মেয়েদের হলে রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা থামাতে চায়। আর এজন্য সবাইকে সমূলে মে’রে ফেলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো উপায় নেই। ছাত্রীহলের অবস্থা শুনেই মাথা নষ্ট হয়ে যায় আমার। রাজি হয়ে যাই ওর কথায়। তবে তখনও আমি লেকচারার হইনি। আর য়্যুমুও বুঝে উঠতে পারছিলোনা এসবে জড়িত মুল হোতাদের গর্ত থেকে কিভাবে টেনে বের করা যায়। সুযোগের অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় ছিলোনা আমাদের। সেসময় আরো দুটো খু’ন আমাদের প্লানমাফিক হয়। ওরা দুজনেই ক্যাম্পাসের বাইরের অপকর্মে জড়িত ছিলো। প্রথমজনকে আমি টার্গেট করেছিলাম, দ্বিতীয় ছেলেটার কুকর্মের খোজ য়্যুমু ব্লাক ওয়ার্ল্ডে পেয়েছিলো। আইটিতেও ভ’য়ানকরকমের দক্ষতা আছে ওর। সুযোগ, সময় বুঝে ওদেরও ইতি টানে য়্যুমু। বাকের স্যার তখনো এসবে ইনভল্ব না। স্বেচ্ছায় তৃতীয়জনের বডি ডাম্প করার দায়িত্ব আমি নিয়েছিলাম। তবে য়্যুমুর মতো এতো ক্লিন রেখে কাজটা শেষ করতে পারিনি। গলদ রয়ে যায়। ওখানে নিজের ব্লাডস্যাম্পল রেখে আসি। যেটা তোমার চোখে পরেছিলো।
এরপর শারাফ দেশে আসে। তবে য়্যুমুর জীবনে শারাফের দ্বিতীয়বার আগমনের আগে গল্পে আরেকটা চরিত্র চলে আসে। আরাফাত। যে কিনা স্নিগ্ধতাকে পরিচয়ের শুরু থেকেই অসম্ভব ভালোবাসতে শুরু করে। ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে উদ্যত হয়েছিলো ও। বাট য়্যুমু বিয়ের জন্য তৈরী ছিলোনা। দুটো কারন ছিলো এর। শারাফকে খুববেশি ভালোবেসেছিলো মেয়েটা। অন্যকাউকে ভালেবাসা সম্ভব ছিলোনা ওর জন্য। আর দ্বিতীয় কারন, একটা গ্যাঙ রেইপড মেয়ে হয়ে ও চায়নি কোনো পুরুষকে জীবনে আনতে। ডক্টর জেনেলাকে বলে এইডসের ভুয়া রিপোর্ট তৈরী করে ও। আরাফাতকে আটকে দেয়।
হুল্লোড় শুনে ল্যাপটপে তাকায় সাইফ। শারাফ স্নিগ্ধতা বরাবর দাড়িয়ে। সবাই হৈহৈ করছে। অগ্নিলা নিমীলিত আওয়াজে বললো,
– তিনবছর পর শারাফ আবারো ভার্সিটিতে যায়। সেখানে স্নিগ্ধতারুপী য়্যুমুর সাথে দেখা হয় ওর। এন্ড দেন, দ্যা শারাফ-স্নিগ্ধতা মোমেন্ট।
সাইফ স্ক্রিনে দেখলো, শারাফ একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে স্নিগ্ধতার দিকে তাকিয়ে আছে। আর স্নিগ্ধতার দৃষ্টিনত। দুপা এগিয়ে স্নিগ্ধতার দিকে হাত বাড়ালো শারাফ। অগ্নিলা মৃদ্যু হেসে বললো,
– আপাতদৃষ্টিতে সেটাকে স্নিগ্ধতার লাইফে শারাফের আগমন বলা চলে। কিন্তু এই কাহিনী বলে, সেটা ছিলো স্নিগ্ধতার লাইফে শারাফকে আনায়ন।
সামনে বাড়িয়ে রাখা হাতের দিকে কয়েকদন্ড তাকিয়ে থাকলো স্নিগ্ধতা। এবারে চোখ তুলে তাকালো ও। শারাফের হাসোজ্জল মুখটা দেখে মনের ভেতরের যন্ত্রণাগুলো আরোবেশি উত্তাপে জ্বলে উঠলো যেনো। মেহেদীরাঙা ডানহাত রাখলো ও শারাফের হাতের ওপর। শারাফ হেসে ওকে নিয়ে স্টেজে দাড়ায়। সবাই একেরপর এক ছবি তুলছে ওদের সাথে। এদিকে অগ্নিলা বলে চলেছে,
– এভাবেই আমাদেরও পরিণয় হয়েছিলো। মনে পরে সাইফ? হাহ! কেইসগুলো তোমার কাছে চলে গেলে আমার-য়্যুমু দুজনের জন্যই তা চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। য়্যুমু এতোদিন তোমার থেকে লুকিয়ে যা করার করতো। কিন্তু এবার যখন তুমিই ওকে ধরার দায়িত্ব নিয়েছো, তোমার প্রতিটা সেকেন্ডের হিসাব রাখা প্রয়োজন ছিলো ওর। তোমার মাথায় কি চলছে, সেটা জানার প্রয়োজন ছিলো। এজন্য আমি সিদ্ধান্ত নেই স্বয়ং আমিই তোমার দুর্বলতা হয়ে উঠবো, যাতে তোমার পরবর্তী স্টেপ বুঝে উঠতে পারি। আমাদের প্রতিটা দেখাসাক্ষাৎ প্রি প্লানড ছিলো সাইফ। প্রথম দিন চঞ্চলকে চড় মারা থেকে শুরু করে তোমার গাড়ির কাচ ভাঙা, কিডন্যাপ কাহিনী, পুরোটাই সাজানো ছিলো।
তারপর সবুজের খু’ন। তুমি ভেবেছিলে এই রিলেটেড তোমার পেনড্রাইভটা পুলিশস্টেশনে গায়েব হয়েছে। ওটা আসলে তোমার বাসা থেকেই গায়েব হয়েছিলো। সবুজের পরিনয় ওর বাজে কাজগুলোর শাস্তি তো ছিলো, এরসাথে ভার্সিটিতে রাজনীতির জোর দেখানো দলের প্রতি য়্যুমুর ওয়ার্নিংও ছিলো। কে কারা এসব কন্ট্রোল করছে, যাতে কোনো একটা হিন্টস পায় ও। য়্যুমু একরকম হুট করেই ওকে মা’রার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো বলে আমি অবাক হয়েছিলাম কিছুটা। তবে সে বিস্ময় বাড়াইনি। ও একাই সামলাতে চেয়েছিলো সবটা। কিন্তু আমি ওকে একা ছাড়বো না বলে জেদ করে গিয়েছিলাম চারপাশ পরখ করতে। কিন্তু সারিকা কিভাবে আমার দৃষ্টি এড়িয়ে ছাদে চলে গেলো টের পাইনি। তারপর শারাফকে এই কেইসে জড়াও তুমি। সেসময় তোমাদের দুজনের কথোপকথন জানা জরুরি ছিলো য়্যুমুর। মনেপরে তোমরা প্রথমবার যে কফিশপে বসে কেইস নিয়ে আলোচনা করছিলে? স্নিগ্ধতা শাড়ি কিনতে গিয়েছিলো? সেবার তোমাদের কথার মাঝে তোমার একটা ফোনকল আসে সাইফ। তুমি শারাফের কথার মাঝে এতোটাই ডুবে ছিলে যে, ফোনের দিক না তাকিয়েই সোয়াইপ করে কেটে দিতে চাও কলটা৷ এন্ড দ্যাট ওয়াজ ইওর আনাদার মিস্টেক। ফোনটা তোমার ছিলো না। ওটা য়্যুমুর ফোন ছিলো। ইচ্ছে করে একই রিংটোন দিয়ে তোমার কাছে রেখে দিয়েছিলো ও। ফোনটা তোমার ফোনের ওপোজিট সোয়াইপড ছিলো। যারফলে সেদিন কল কাটে না, বরং রিসিভ হয়। তোমার শারাফের কনভার্সেশনের একটা একটা বর্ণ শুনে নিজেরমতো করে প্লান তৈরী করে য়্যুমু।
সাইফ চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলো। কতোটা বুদ্ধিমত্ত্বার সাথে য়্যুমু পুরোটা সাজিয়েছে ভাবতেই অবাক হয় ও। অগ্নিলা পানির গ্লাস ওর মুখ বরাবর ধরলো। তবে সেটা মুখে নিলোনা সাইফ। স্ক্রিনে তখনও সবাই ছবি তুলতে ব্যস্ত। অগ্নিলা বললো,
– এরপর স্নিগ্ধতার এগেইনিস্টে আসে মোহিনী। আর ওর প্রেমে মাতোয়ারা প্রেমিক শারাফ তখন নিজের ভাইকে বলে মোহিনীর ব্যবস্থা করতে। শারাফ নিজে য়্যুমুকে বলেছে এটা। য়্যুমু কনফার্ম হয়, শাওন এসবে জড়িত। হি’জ দ্যা মেইন কার্লপ্রিট। আমিও জানতে পারি আমার বোনজামাইয়ের আসল রুপ। নরওয়েতে বসে বাংলাদেশে ড্রাগ ডিল করা, ভার্সিটির হলগুলোতে নোংরা কাজকর্ম চালিয়ে মেয়েদের সম্ভ্রম নিয়ে তামাশাকারী মানুষরুপী জানোয়ার, শাওন!
দাঁতে দাত চেপে বললো অগ্নিলা। সাইফ বিস্ফোরিত চোখে তাকালো। শাওনের এতোবড় সত্যিটা আশা করেনি ও। কথাগুলো শুনে মাথা ধপধপ করতে লাগলো ওর। কিন্তু অগ্নিলার চোখে রাগ ব্যতিত কিছুই নেই। শাওন যে ওর একমাত্র বোনের বর, সে সম্পর্ক ওর ঘৃণায় বিন্দুমাত্র আঁচ ফেলতে পারেনি। অগ্নিলা বড়বড় দম নিয়ে সংবরন করলো নিজেকে। বললো,
– নিজের বোনের বরকে এসবে মানতে আমার দুনিয়া আটকে গিয়েছিলো সাইফ। বিশ্বাস করো! তারপরও, আমি আমার আদর্শে আপোষ করতে পারিনি। হলে এতোসব জঘণ্য কার্যক্রম টিকিয়ে রাখার জন্য শাওনকে সাজা দেবার সিদ্ধান্তে অটল থাকি। তখনো আমি য়্যমুর সাথে হওয়া অন্যায়ের বিষয়ে কিছুই জানতামনা। ইভেন য়্যুমুই যে স্নিগ্ধতা হয়ে আমাদের মাঝে আছে, আমি এটাও জানতামনা। নাইবা জানতাম শাওন ওর রেপিস্টদের একজন। প্রি ম্যারেজ ব্যাচেলর ট্যুরের নাম করে কক্সবাজার গিয়ে ও আর ওর বন্ধুরাই চারজন রেইপ করেছিলো য়্যুমুকে।
এরপর ডক্টর নাজমুলকে যেদিন খু’ন করার প্লান ছিলো, ওইদিনই শারাফ য়্যুমুকে নিয়ে বেরিয়ে যায়। ওর অনুপস্থিতিতে কাজটা আমি নিজহাতে করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে সেটা করতে দেয়নি য়্যুমু। শুধু অত্যাচার করে ছেড়ে দেওয়া হয় নাজমুলকে। আর আমাদের বিয়ের রাতে সুযোগ বুঝে য়্যুমু নিজে শেষ করে নাজমুলকে। তখনো অবদি আমি একবারো প্রশ্ন করিনি ওকে। কিন্তু বাকের স্যার যখন নাজমুলের ভ্যানচালককে মেরে ফেলে, আমার রাগ হয় য়্যুমুর ওপর। ওই মানুষটা তো নির্দোষ ছিলো। রাগের বশে স্নিগ্ধতার এইসব কাজের সূচনা খুজতে শুরু করি আমি। আর সেখানে য়্যুমুর ডাইরি খুজে পাই। সেদিন সে ডাইরি য়্যুমু নিজে পরে শোনায় আমাকে। ওর সাথে কি কি ঘটেছিলো। এমনিতেও শাওনের ওপর ঘৃণা ছিলো আমার। য়্যুমুর ঘটনা শুনে ক্ষোভ আক্রোশ আরো সহস্রগুনে বেড়ে যায় ওর প্রতি। ওকে দেশে আনার জন্য সবরকম চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু যখন আমার বিয়েতেও ও না আসে, প্লান বদলাতে হয় আমাদের। শারাফের সাথে স্নিগ্ধতার কাহিনীকেও বিয়ে অবদি টানতে হয়। কারন শাওন আমার বিয়েতে না আসলেও, ভাইয়ের বিয়েতে ঠিকই আসতো। আর সেটাই ঘটেছে। শাওন ফিরতেই ওর আরেক সঙ্গী তারেকের ব্যবস্থা হয়ে যায়। তারসাথে চঞ্চলেরও।
সাইফ প্রতিক্রিয়া করা ভুলে গেলো। টের পেলো, অন্যায়ের মুল উপরে ফেলার নেশা অগ্নিলাকে এমনভাবে বশ করেছে যে, নিজের বোনকে বিধবা করতেও পিছপা হবেনা ও। অগ্নিলা শান্তশিষ্টভাবে বললো,
– এইতো! কলঙ্কিত চাঁদের নন্দিত হবার গল্প সাইফ। আর এ গল্পে এখন শুধু বাকি এই বিয়েটা, স্বপ্নীলে য়্যুমুর প্রবেশ আর শাওনের ইতি। ব্যস! সেটাই নন্দিত চন্দ্রকলঙ্কের উপসংহার।
শাওন বড়বড় চোখে তাকালো। সবটার শুরু, প্রবাহ, উদ্দেশ্য, সবটা পরিষ্কার হয়ে ধরা দেয় ওর কাছে। সেসময় অগ্নিলার ফোনে ম্যাসেজ আসে একটা। ওটা পড়ে, চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেললো অগ্নিলা। সাইফের বাধা হাতে আলতো এক চুমু খেলো একটা। তারপর জড়ানো আওয়াজে ‘আসছি’ বলে বেরিয়ে যায় ও। সাইফ অস্থির হয়ে পরে। ওর মাথায় শুধু ঘুরছে, শাওনকে য়্যুমুর হাতে মরতে দেবেনা ও। সবকিছুর জন্য শাওন সাজা পাবে। আর এই এগারোটা খুনের জন্য সাজা পাবে য়্যুমুও। সবচেয়ে বড় কথা, সবকিছু থেকে অজ্ঞাত শারাফও ওর মতো ভালোবেসে ঠকে যাবে, এটাও কিছুতেই হতে দেবেনা। সাইফ হাতের বাধন নড়চড় করাতে লাগলো। দাত দিয়ে বাধন কাটার জন্য উবু হওয়ার চেষ্টা করলো। কিন্তু ব্যথার জন্য পারলো না। শব্দ শুনে ল্যাপটপ স্ক্রিনে তাকালো ও। কিন্তু সেখানকার দৃশ্য দেখে গায়ের জোর কমে আসলো সাইফের। ফুলের ঝালরে দু পাশে সামনাসামনি শারাফ স্নিগ্ধতা বসে। কাজীসাহেব ওদের বিয়ে পরাতে শুরু করেছে। সাইফ চেচাতে শুরু করলো। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করলো। কিন্তু লাভ হয়না। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে, ওর চোখের সামনে তিনকবুলে পবিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ হয় দুটো নাম। শারাফ-স্নিগ্ধতা…
#চলবে…

