#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_১১
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা
আভিরা টলমল চোখে আকাশ পানে চেয়ে আছে।
– আপু চল, দোকানে যাব। আমায় চকলেট কিনে দিবি।
তাযীমের কথা কানে আসতে আভিরার মেজাজ বিগড়ে গেল। মুহূর্তেই মেয়েটা চিল্লিয়ে উঠে,
– সারাক্ষণ খালি চকলেট, চকলেট। আর কোনো কথা নেই।
ঐদিন না তোকে চকলেট খেতে নিষেধ করেছি। তাহলে আবার কেন এসেছিস? এখান থেকে যা। আমার ঘর থেকে এখনি বের হো তুই। আমার ধারের কাছেও আসবি না আর।
হঠাৎ ধমকে তাযীমের ছোটোখাটো শরীরটা কেঁপে ওঠে।
বাবা বকলেও আপু কখনো তাকে বকে না। ছেলেটা কান্না করে দিবে এমন ভাব। ফর্সা মুখটা লাল আভায় ছেয়ে গেল। নাকের দু পাশের পেশী ফুলে উঠেছে। নাকের ডগায় থাকা চশমাটা ঠেলে আঙুল উঁচিয়ে বোনকে বলল,
– তুমি পঁচা আপু। আব্বুর মতো তুমিও আমায় বকলে। আমি আর তোমার সাথে কথা বলব না। আর আসবও না তোমার কাছে, দেখে নিও। তুমি কান্না করলেও আসব না।
তাযীম দৌড়ে বেরিয়ে গেল। ভাই যেতেই আভিরা বুঝল সে শুধু শুধু বাচ্চা ছেলেটার উপর রাগ দেখিয়েছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে পিছন থেকে ডাকল কয়েকবার। তবে ছেলেটা শুনল না। ফিরেও চাইল না আভিরার পানে।
_
সারা বাড়ি খাবারের ঘ্রাণে মুখরিত। আভিরা সেই কখন থেকে জানালার ধারে বসে আছে। কোনোদিকে যেন তার ধ্যান নেই। ঘরে এসে মেয়েকে এভাবে বসে থাকতে দেখে আনেসার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সেই কখন বলে গিয়েছে যাতে গোসল করে নেয়। আর এখনও কিনা এখানেই বসে আছে।
– কয়টা বাজে? এখনও বসে আছিস যে? কথা কানে যায় না তোর। কখন বলে গেলাম সময় নেই, গোসলে যা। ওনারা চলে আসবে। আমার কথা শোনার প্রয়োজন মনে হয় না। রান্না সামলাব না তোর দিকে নজর দিব। এত বড়ো হয়েছিস অথচ আক্কেল জ্ঞান হাঁটুর নিচে।
মায়ের ঝাঁজালো কণ্ঠ কানে আসতে আভিরা ঘোর থেকে বেরিয়ে এলো।
মায়ের এমন কথায় আভিরা অবাক হয় না, বিচলিত হয় না। রাগ হয় না তার, অভিমান হয় না।
আভিরা জানে তার মা সবসময় এমনভাবেই কথা বলে। ভালো একটা কথা বললেও তার কণ্ঠে ঝাঁজ মেশানো থাকে।খিটখিট করে প্রত্যেক কথায়। তবে আজ কেন জানি মায়ের ঝাঁজালো স্বর ভালো লাগল না। মন খারাপেরা এসে জেঁকে ধরল মেয়েটাকে। আভিরা টলমলে চোখে চাইল মায়ের দিকে। আনেসা কথা শুনিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই, থামার নাম নেই। নজরে এলো না মেয়ের অশ্রুতে টইটম্বুর চোখ জোড়া।
আভিরা নিঃশব্দে জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে গেল।
দরজা লাগানোর শব্দে আনেসা থামে। ধপ করে বসে পড়ল গোছানো বিছানায়। মেয়ের অভিমানী চোখ তার নজর এড়ায়নি। সে দেখেও নিরুত্তর ছিল। আনেসা একে একে আভিরার ব্যবহৃত সবগুলো জিনিস ছুঁয়ে দেখল, আলতো হাতের পরশ বুলায়। সবগুলো জিনিসে তার মেয়ের ছোঁয়া রয়েছে। এগুলো ছুঁয়ে মনে হচ্ছে তিনি মেয়েকে ছুঁয়ে দিচ্ছেন। আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর, তার মেয়ে আর এ ঘরে থাকবে না। রোজ সকালে মেয়েকে ঘুম থেকে তোলার তাড়া থাকবে না, প্রত্যেক বেলা বকে বকে খাওয়াতে হবে না, নাম ধরে ডাকলেই মেয়েটা তার ছুটে আসবে না।
এ ফাঁকা ঘর, এ ফাঁকা ঘর দেখলেই তো তার দম বন্ধ হয়ে আসবে। প্রতিনিয়ত এ ঘরটা ফাঁকা দেখবে কেমন করে?
এখন থেকেই অভ্যাস করতে হবে। মায়া বাড়ালে যে তারই জ্বালা।
_
আভিরার কামিজের অনেকটা অংশ ভিজে গেছে। মাত্রই গোসল সেরে বেরিয়েছে সে। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সেই পানিতে তার পিঠ ভিজে জামা শরীরের সাথে লেপ্টে। এর মাঝে আভিরার ছোটো কাকি ঘরে এলো। আভিরার ভেজা চুল দেখে মোহনা নাক মুখ কুঁচকে নেয়।
– ভেজা চুল এখনও না মুছে বসে আছো যে? তোমার এ বদ অভ্যাস কবে যাবে বলো তো? আপা কি শুধু শুধু তোমায় বকাবকি করে। তোমার কাজকর্মের জন্যই তো এমন করে। আসো তো দেখি। এদিকে এসো, আমি মুছে দেই।
মোহনা আভিরার চুল মুছে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে শুকিয়ে নিল। এ মেয়ে যা সে এ কাজগুলো করে না দিলে ভেজা চুলেই বসে থাকত। চেনা আছে তার এ মেয়েকে। দু বছর ধরে তো দেখে আসছে। নিজের প্রতি কোনো যত্ন নেই এ মেয়ের।
– শাড়ি কোথায় তোমার? আপা দিয়ে যায়নি?
– না।
– আচ্ছা দাঁড়াও, আমি নিয়ে আসছি।
মোহনা সুন্দর করে আভিরাকে শাড়ি পরিয়ে দিল। ওনার শাড়ি পরানোর হাত অনেক ভালো। অল্প সময়ে বেশ সুন্দরভাবে শাড়ি পরাতে পারেন। হালকা গোলাপি রঙের শাড়িটার আঁচল টেনে ভালো করে পিন দিয়ে আটকে দেয়। হালকা পাতলা উনি নিজেই সাজিয়ে দিয়েছেন। এসব কাজে সে বেশ পটু।
– এখানে বসে থাকো। আমি আর তাহমিদা আপা এসে নিয়ে যাব।
খানিক বাদে মোহনা আর তাহমিদা এসে আভিরাকে বসার ঘরে নিয়ে যায়। আভিরা সালাম দিল সকলকে। তার গলা কাঁপছে, শরীরও কাঁপছে মৃদু। অপরিচিত পুরুষালি কণ্ঠ সালামের প্রত্যুত্তর করে।
আভিরা দাঁড়িয়ে রইল। ওনারা না বললে সে বসবে কি করে। তার নানি, দাদি, কাকি সকলে তাকে পইপই করে বলে দিয়েছে কী কী করতে হবে আর কী করা যাবে না। বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যেন কোনো ভুলচুক না হয়। আভিরা সব মাথায় রেখেছে।
– আরে না বসে দাঁড়িয়ে আছো যে।
পরিচিত, পরিচিত কণ্ঠ। আভিরার চিনতে অসুবিধা হলো না। হসপিটালে যে ভদ্রমহিলার দেখা পেয়েছিল, যাকে সে বাবা মায়ের পরিচিত কেউ হিসেবে জানে। এ সময়ে ওনার উপস্থিতি একটা দিকেই ইঙ্গিত করে।
আভিরা ঠায় দাঁড়িয়ে রইল, শ্বাস আটকে এলো মেয়েটার।
মোহনা আভিরাকে সিঙ্গেল সোফায় বসিয়ে দেয়। সিঙ্গেল সোফার বিপরীত পাশে আরও একটা সিঙ্গেল সোফা। আভিরার সোফার এক ইঞ্চি দূরত্বে দু পাশে দুটো ডাবল সোফা। মাঝে ছোটো একটা আয়তাকার টেবিল। ডাবল সোফায় লাবণ্য, মাহিরা, ইয়াজমীন। আর তাদের বিপরীতে মাহাদ, বর্ণা। মাহিরা মাহাদের বোন। মাহিরা এবার মাস্টার্স পড়ছে। লাবণ্যর ব্যাচমেট সে। বর্ণা মাহিরা, মাহাদের বড়ো ভাই সৌভিকের বউ। দুই বছরের একটা বাচ্চাও আছে তাদের।
একদম বরাবর সোফায় বসেছে নাওয়াজ। আভিরার নত চোখে ধরা দিল চকচকে বুট পরিহিত একজোড়া পা। শুধু এতটুকু চোখে পড়ল মেয়েটার। মাথা তুলে দেখলে হয়তো আপাদমস্তক পুরো মানুষটাকে নজরে আটকায়।
মোহনা আর তাহমিদা হাতে হাতে নাস্তা এনে আয়তাকার টেবিলের এ কোণা থেকে ও কোণা ভর্তি করে ফেলল। আনেসা রান্নার দিকটা দেখছে। আভিরার হাতে শরবতের ট্রে ধরিয়ে তার পিছনে দাঁড়িয়ে রইল দুজন। আভিরা একে একে সবার হাতে শরবতের গ্লাস তুলে দিয়ে শেষে এসে থামল কাঙ্ক্ষিত মানুষটার সম্মুখে। মুখ তুলে চাইল একবার। চোখে চোখ পড়ল। মানুষটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
আভিরা লজ্জায় মাথা নামিয়ে ফেলে। নাওয়াজের হাতে গ্লাস তুলে দিতে নিলে অসাবধানতাবশত একটু ছোঁয়া লেগে গেল। অসাবধানতাবশত? উহু! ইচ্ছাকৃত, ইচ্ছাকৃতভাবে ছুঁয়েছে নাওয়াজ। আভিরা কেঁপে উঠল। নড়বড়ে হয়ে গ্লাসটা পড়তে নিলে নাওয়াজ মেয়েটার হাতসহ গ্লাস আঁকড়ে ধরে। কানের কাছে মুখ নিয়ে ধীর শীতল কণ্ঠে বলল,
– মিস আভিরা আঞ্জুম, মিসেস নাওয়াজ ইয়াজিদ হতে প্রস্তুত তো আপনি?
আভিরা আড়ষ্ট ভঙ্গিতে আশপাশে তাকায়। কেউ দেখছে কী তাদের? না, তাদের দিকে কারো নজর নেই। তবুও মেয়েটা লজ্জায় মিইয়ে গেল। এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েনি। এত মানুষের মাঝে এভাবে হাত ধরাতেই যেন তার যত অস্বস্তি।
এ লোক এমন নির্লজ্জ। এমন নির্লজ্জ মানুষ দেখা হয়নি আভিরার। আভিরা জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। তার গলা কেমন শুকিয়ে এসেছে। মাথার আঁচল টেনে সামনে আনে।
আভিরা ভেবে পেল না, ভরা মানুষের সামনে কেউ এমন হাত আঁকড়ে ধরে। আবার কী সব বলছে। তার মা যে বলল ছেলে অনেক ভালো। এই বুঝি ভালোর নমুনা।
_
আনেসা কাল আভিরার মতামত জানতে চাইলে আভিরা চুপ করেছিল। চুপ করে থাকায় যেন তার একমাত্র কাজ।
সরাসরি তার পছন্দের কথা জানতে চাইলে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মেয়েটা। তার তো পছন্দের কোনো মানুষ নেই।
তবে তৎক্ষণাৎ তার মাথায় একজনের কথায় এসেছিল। সেই অচেনা, অদেখা, বেনামি পত্র প্রেরকের কথা। সে তো চিনে না লোকটাকে। আর না কোনোদিন দেখেছে। এমনকি নামও জানে না তার। আভিরার তো ঐ লোককে পছন্দও না। তবুও তার মনে লোকটাকে নিয়ে কিছু একটা আছে। সে কিছু একটা কী আভিরা ভেবে পেল না।
সোমবার পেরিয়ে কাল শুক্রবার। কিন্তু আভিরা কোনো চিঠি পায়নি। আভিরার বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকে এমনটা হয়ে আসছে। কোনো চিঠি আসে না। প্রথমে আভিরা ভেবেছিল হয়তো দিতে ভুলে গিয়েছে। তবে এখন মনে হচ্ছে চিঠি দাতা হয়তো চিঠি দেওয়ায় বন্ধ করে দিয়েছে।
আভিরা এতে অবাক হলো না। এ যুগে এসে কেউ খামে মোড়ানো অনুভূতি কেন লিখতে যাবে? কার এত দায় পড়েছে? নিশ্চয় কেউ জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত মজা লুটেছে। হঠাৎ বিতৃষ্ণায় আভিরার মুখটা থেঁতো হয়ে এলো। যেন কেউ জোর করে তাকে নিম পাতার রস গিলিয়ে ছেড়েছে। মুখ ভার করে বসে রইল মেয়েটা। আভিরাকে চুপ থাকতে দেখে আনেসা আশ্বাস দিয়ে বলল,
– দেখ তোর কোনো পছন্দ থাকলে আমায় বলতে পারিস। আমরা নিশ্চয়ই মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছু করব না।
আভিরা আর নিরুত্তর রইল না। মিনমিনিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
– আমার কোনো পছন্দ নেই মা।
– তাহলে কী ওদের কাল আসতে বলব?
আনেসা উৎসুক নয়নে চেয়ে আছে মেয়ের দিকে। আভিরা মায়ের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার একই স্বরে বলল,
– তোমরা যা ভালো মনে করো।
আভিরা লজ্জায় মাথা নামিয়ে নেয়। যাহ, তার কী লজ্জা লাগছে। এখানে লজ্জা পাওয়ার কী হলো। সামান্য একটা বিষয়ে সে লজ্জা পাচ্ছে কেন? অদ্ভুত!
– ছেলে অনেক ভালো বুঝলি। বহু বছর থেকে তো চেনা এই ছেলেকে। তাছাড়া তুইও দেখেছিস।

