প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_২৪

0
2

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_২৪
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

খাওয়া দাওয়া শেষের দিকে। যে দুটো টেবিল লোক দিয়ে ভর্তি ছিল তাও এখন ফাঁকা। একটার উপর একটা চেয়ার তুলে উপরে থাকা শামিয়ানাটাও খুলে নেওয়া হয়েছে। টেবিলে থাকা পাতলা ক্লথগুলো তাড়াহুড়ো করে টানতে গিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। কায়দা করে ফাঁকা টেবিলগুলো এক পাশে রেখে অনুষ্ঠানে দায়িত্বরত লোকজন চলে গিয়েছে।
যাওয়ার আগে অবশ্য বলে গেল বাকি যা রয়ে গেছে বিকেলে এসে সেসব নিয়ে যাবে। পাকশী পাক সেরে সেই দুপুরেই বিদায় নিয়েছে। শুধু তারা কেন, কাজের জন্য যাদের রাখা হয়েছে সকলেই চলে গিয়েছে। শুধু দুজন বাদে। তারা যত দ্রুত সম্ভব হাত চালিয়ে কাজ শেষ করার চেষ্টায়।

শুকতারা হাতের বাসন ফেলে দৌড়ে মেয়ের কাছে গেল। মেয়েটা ক্ষুধায় কাঁদছে। মেয়ের কান্না দেখে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগল। কত করে বলল আজ আমি দম ফেলার ফুরসত পাব না, আমার সাথে আসিস না। কিন্তু মেয়েটা মা ছাড়া থাকতে নারাজ। জেদ ধরল সে মায়ের সাথে আসবে। অগত্যা শুকতারাকে মেয়ে নিয়ে কাজে আসতে হলো। এখন দেখো, খিদের জ্বালায় কেমন পেট চেপে কাঁদছে। সে খাবার দিবে কই থেকে।

রাগে দুঃখে এলোপাথাড়ি চড় লাগাল। শক্ত করে চুলের মুঠি ধরে ক্রমাগত ঝাঁকিয়ে বলল,
– বান্দির বাচ্চা তোরে কয় নাই বাইত থাক, আমার লগে আওন লাকত না। হুনলি না তো আমার কথা। এহন যে খিদায় মরতাছোস তোরে খাওন দিমু কইত্তে। বাইত থাকলে তো খাইতে পারতি। না তোর তো আবার মা ছাড়া চলে না। এহন মারে দেইখা পেট ভরা।

বলেই আবার বাসন ধোয়াতে মন দিল। চোখ থেকে পানি ঝরছে তার। শাড়ির আঁচল মুখে চেপে কয়েকবার ফুঁপিয়ে ওঠে। জয়তুন্নেছা তাড়া দিয়ে বলল,
– শুকু হাত চালা। কাম সারলে জলদি বাইত যাইবার পারমু। তুইও পাগল। দেখলি মাইয়া খিদায় কানতাছে। আবার মারতে গেলি কেন?

– কী করাম বুবু, চোহের সামনে খাওনের লাইগা এমন ছটফট করতে দেইখা কোন মা সইতে পারে কও? আমিও…

– তাই সহ্য করতে না পেরে বুঝি মেয়েকে এভাবে মারলেন? আর মারলেনই যখন এখন চোখের পানি ফেলছেন কেন? লোক দেখাতে?

নিজেদের কথার মাঝে পুরুষালি কণ্ঠ শুনে দু বোন চমকে মাথা তুলে চায়। বিস্ময় নিয়ে বলল,
– আরে জামাই বাবাজি কোন কামে আইলা?

বিয়ের দুদিন আগে থেকে এ বাড়িতে কাজের জন্য তাদের আনা হয়েছে। যার বিয়ে তাকে চিনবে না। হঠাৎ নাওয়াজকে দেখে দুজন বেশ অবাক হলো। তাদের কাছে ঠিক কোন কারণে আসতে পারে তা বোধগম্য হলো না। নাওয়াজের বলা কথায় মনঃক্ষুণ্ণ হলেও তা গায়ে মাখল না।

মুখের ভাব পাল্টে বলল,
– কোন কামে আইছো কইলা না যে?

– এখান থেকে উঠে আসুন। আর কাজ করতে হবে না।

বুঝতে না পেরে কপাল কুঁচকে বলল,
– মানে বুঝবার পারলাম না।

– বললাম আপনাদের আর কাজ করতে হবে না।

কাজ শেষের দিকে; এখন কোন কারণে উঠে যেতে বলছে।নাকি বাহানায় তাদের টাকা না দিয়ে বিদায় করে দেওয়ার ধান্দা। তবে এ কদিনের ব্যবহারে তো মনে হয়নি এ লোকগুলো এমন ছলচাতুরি জানে। নাওয়াজ তাড়া দিতে একপ্রকার দ্বিধা নিয়েই উঠে এলো।

বিস্ময়ের সহিত দু জোড়া চোখ নাওয়াজের দিকে চেয়ে আছে। নাওয়াজ মৃদু হেসে বলল,
– খাওয়া শুরু করুন।

একটু আগের গম্ভীর ভাবটা এখন আর নেই। শুকতারা চেয়ে দেখল যেখানে সাদা ভাত কপালে জুটে না সেখানে প্লেট ভর্তি পোলাও, সাথে ছয়, সাত টুকরো গোরুর গোশ, একটা রোস্ট, দুটো ডিম, দুটো বড়ো বড়ো মাছের পিস, দুটো কাবাব আর সালাদ দিয়ে ঠাসা। ছলছল চোখে চেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল শুকতারা। মেয়েটা তার খাওয়ার জন্য হা করে বসে আছে। কে বলবে একটু আগে মায়ের হাতে এ খাওয়ার জন্যই মার খেয়েছে। হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে মেয়ের মুখে খাবার তুলে দিল।

শুকতারা, জয়তুন্নেছা দু বোন। স্বামী মরার পর জয়তুন্নেছার ঠাঁই হয় একমাত্র ছেলের কাছে। মাস কয়েক ঠিক থাকলেও এরপর থেকে শুরু হয় ছেলের বউয়ের অত্যাচার। বাড়ির সব কাজ তাকে দিয়ে করাতো। অথচ রাতে স্বামী এলে নানা ইন্ধন দিত যাতে জয়তুন্নেছাকে এ বাড়ি ছাড়া করে। ইনিয়ে বিনিয়ে বলত, সারাদিন শুয়ে বসে কাটিয়ে দেয়। একটা কাজেও হাত লাগায় না। আমি বললেও বাহানা দিলে বলে বউ এ বয়সে শরীর চলে না। কাম করমু কেমনে?
শুধু শুধু এ মহিলাকে রেখে কি লাভ। তাছাড়া ছেলে বড়ো হচ্ছে। তার জন্য টাকা পয়সা জমাতে হবে তো? নাকি সব মায়ের পিছনে ঢেলে দেবে। এমন নানা কথায় অতিষ্ঠ হয়ে জয়তুন্নেছাকে শুকতারার কাছে রেখে যায়।

মাকে বুঝ দেবার ভঙ্গিতে বলল,
– কয়দিন খালার কাছে থাকো। ওর এখন মাথা গরম। ঠিক হয়লে নিয়া যামু।

একদিন, দুদিন মাস গেলে ছেলে যখন নিতে আসে না জয়তুন্নেছা যা বুঝার বুঝে যায়। বুক ফেটে কান্না আসে তার। এ ছেলের জন্য কি না করল। যখন কয়ল আম্মা ব্যবসা দাঁড় করানোর লাইগা লাখ পাঁচেক টাকা লাগব তখন ভিটা বাড়ি বন্ধক দিয়া টাকা দিল। সে দেনা আজও শোধ করতে না পারায় স্বামীর ভিটাও হারাইল। এখন কিনা শেষ বয়সে এসে এদিন দেখতে হলো। বাড়িটা থাকলে কারো কাছে নত হতে হতো না।

সহায় সম্বল সব খুইয়ে বোনের বাড়ি পড়ে রইল। কিন্তু এভাবে কয়দিন চলে। শুকতারার স্বামী অসুস্থ মানুষ। আয় রোজগার নাই। তার উপর তিনি বোঝা হয়ে জুটলেন। শেষে না পেরে পেটের দায়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করার চিন্তা করে। বালতি ভর্তি কাপড় কাচা, রোজ ঘর মুছে, বাসন ধুয়ে মাস শেষে পাওয়া পাঁচশ টাকায় যেন হতো না। পরে একজন বুদ্ধি দিল কাম যখন করবাই কামের কাম করো। বিয়া বাড়ি, অনুষ্ঠান বাড়ির থালা বাসন ধুইয়া মাসে অনেক টাকা পাইবা। সেই শুনে দু বোন লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ ছেড়ে অনুষ্ঠান বাড়িতে বাসন ধোয়ার কাজ করে বেড়ায়।

কত বাড়িতে যে কাজ করেছে তার ইয়ত্তা নেই। কই আগে তো কেউ তাদের এমন যত্নের সহিত ভাতের প্লেট ধরিয়ে দেয়নি। বরং তারা খেল কী খেল না সে খবর অবধি নিত না। কিন্তু একটু পরপর ঠিকই এসে দেখে যেত তারা ঠিকমতো কাজ করছে তো, কাজে ফাঁকি দিচ্ছে না তো, কাজের ফাঁকে আবার কিছু হাতিয়ে নিচ্ছে না তো। এসব লোকেদের আবার স্বভাব খারাপ থাকে। চোখের সামনে ঝা চকচক কিছু দেখলে কখন হাতিয়ে নিতে পারবে সেই সুযোগ খুঁজে বেড়ায়। যেই না দেখবে ধারের কাছে কেউ নেই অমনি সব পুঁটলিতে ভরে নিবে। তাদের পাহারা দিয়ে কূল পেত না। খেয়েছে কিনা সে খোঁজ নিবে কখন। তাছাড়া ধুয়ে তো দিবে ঐ দুটো বাসন, তার বিনিময়ে আবার হাজার টাকা দিতে হবে। টাকাও দিবে আবার খাওয়াবেও। এত আরাম এদের দিলে চলে। এদের তো কাজের উপর রাখা উচিত। টাকা দিয়ে লোক রেখেছে কাজ করিয়ে তা উসুল করতে হবে না।

ভালো মন্দ খেতে না পেয়ে চোখের সামনে লোভনীয় সব খাবার দেখে মায়ের আঁচল ধরে যখন ঘুরঘুর করে তখন লাজ শরমের মাথা খুইয়ে দু মুঠো ভাত চেয়ে বসতো। তাদের আবার লাজলজ্জা কীসের। পেটে দানা পানি না পড়লে লজ্জা দিয়ে কোন মহাভারত শুদ্ধ করবে। এত সংকোচ নিয়ে চাওয়ার পর কেউ মুখের উপর বলে দিত খাবার নেই বাছা। নিজেরাই খেতে পারি না। তোমাকে কী দিব। কেউ বা বিরক্ত হলেও সামাজিকতা রক্ষার্থে দু মুঠো ভাত আর পাতিলের তলায় লেগে থাকা ঝোল ধরিয়ে দিত। গোশের চিহ্নও থাকত না তাতে।

মেয়েটা তার মাছ ভাতের চেয়ে গোশ ভাত বেশি পছন্দ করে। তারা বাসি খাবার দিয়ে পেট ভরাতে পারলেও মেয়েটা এসব খেতে চায় না। মাঝে মাঝে গোশ খাওয়ার জন্য বায়না ধরে। শুকতারারও মন চায় মেয়েকে গোশ ভাত খাওয়াতে। কিন্তু অসুস্থ স্বামীর ওষুধ পত্তর আর মাসকাবারি কিনে হাতে দু আনাও থাকে না। এত টাকা কেজির গোশ খাওয়াবে কি করে। কিন্তু তিনি প্রতি মাসে ভেবে রাখেন এবার কিছু টাকা হাতে রেখে মেয়েকে ভাতের হোটেল থেকে গোশ ভাত খাইয়ে আনবেন। কিন্তু তার ভাবনা ভাবনা অবধিই থেকে যায়। মেয়েকে নিয়ে আর ভাতের হোটেলে যাওয়া হয় না। উল্টো আরও টাকার সংকটে পড়তে হয়।

মা সবসময় তাকে সাথে আনতে চায় না। বিয়ে বাড়িতে কত ভালো মন্দ খাবার হয়, তা ফেলে সে কী ঘরের পঁচা গান্ধা খাবার খাবে। তাই তো মাঝেমধ্যে জেদ ধরে মায়ের সাথে আসে। শুকতারা তো জানে মেয়ে তার একটু গোশত ভাত খাওয়ার লোভে তার সাথে আসতে চায়। মেয়েটা তো তার অবুঝ। বুঝ হলে কী এমন করত! শুকতারাও মানা করে না, নিয়ে আসে। মেয়েটাকে এখন থেকেই বাস্তব দুনিয়ার সাথে পরিচয় করাতে হবে। সে তো আর ধনীর দুলালি না যে তাকে ননীর পুতুল করে রাখতে পারবে। যত তাড়াতাড়ি দুনিয়া চিনবে, চারপাশের মানুষ চিনবে তত ভালো।

খাবার ঠিকই দিয়েছে। কিন্তু যা খেতে চায় তা নেই। তবুও মেয়ের আনন্দে ভাটা পড়ত না। গোশ না থাক। গোশের ঘ্রাণ তো আসে। তাই শুঁকে খাওয়া যাবে নে। মনের আনন্দে এই ঝোল ভাতই গিলত। মেয়ের এমন আনন্দ দেখে শুকতারার মনে হতো মেয়ে তার এমনি থাক। বাস্তবতার চাপায় পিষ্ট হবার কোনো দরকার নেই। মেয়ের এমন আনন্দ দেখার জন্য সে না হয় দু মুঠো ভাত চেয়ে নিবে। মেয়ের জন্য হাজারবার লজ্জা শরম বিসর্জন দিতে প্রস্তুত।

চোখের পানি মুছলে কী তা বাঁধ মানে। সেই আবার আপনাআপনি গড়িয়ে পড়ে। শুকতারাকে কাঁদতে দেখে নাওয়াজ বলল,
– খাওয়ার সময় কাঁদতে নেই।

জয়তুন্নেছা নাওয়াজের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে বলল,
– এমন মানুষ অনেক কম দেখছি বাবা। আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক।

নাওয়াজ টেবিলে থাকা প্যাকেটগুলো দেখিয়ে বলল,
– ঐ যে প্যাকেটগুলো দেখছেন না, যাওয়ার আগে মনে করে নিয়ে যাবেন। ওগুলো আপনাদের।

ওরা দুজন তড়িঘড়ি করে বলল,
– তুমি যা করেছ, এতে আমরা অনেক খুশি। আর কিছু লাগব না। আমরা ওসব কিছু নিতে পারব না।

– না বললে তো হবে না। তেমন কিছু নেই ওখানে। শুধু দুটো খাবারের প্যাকেট আছে। এঁটো খাবারগুলো ফেলে দিবেন।
ওসব নিয়ে খেতে পারবেন না। গিয়ে দেখবেন নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

নাওয়াজের কথায় দুজন লজ্জা পেল। ছেলেটা তাদের থালা থেকে এঁটো খাবার ভরতে দেখে নিয়েছে। তবে এসব খেয়ে তো তারা অভ্যস্ত। অনুষ্ঠান বাড়ির এঁটো খাবার বাড়ি নিয়ে সকলে স্বাচ্ছন্দ্যে গিলে। সে বেলা আর তাদের রাঁধতে হয় না। এক বেলার খাবার বেঁচে যায়। তাই বা কম কিসে।

জয়তুন্নেছা লজ্জা পেয়ে বলল,
– তা না হয় ফালাইয়া দিলাম। কিন্তু ওসব নিতে বলো না।

– আপনাদের নিতে হবে না। আমি তো সব এ মেয়েটার জন্য দিয়েছি। তা মেয়ে তোমার নাম কী?

আপন মনে মায়ের হাতে খেয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ প্রশ্ন কানে যেতে ভীত স্বরে বলল,
– আমারে কয়তাছেন?

– আপাতত তোমাকে ছাড়া আশেপাশে তো কোনো মিষ্টি মেয়ে চোখে পড়ছে না।

মেয়েটা যেন খুশি হলো। উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
– আমার নাম তারা।

– বেশ সুন্দর নাম তো। ঠিক তোমার মতো।

মেয়েটা ঘুরে নাওয়াজের দিকে চেয়ে আগ্রহের সহিত জানতে চাইল,
– আমি সুন্দর?

– তা তো সুন্দর। কেন আগে কেউ বলেনি?

তারা মাথা নাড়িয়ে বলল,
– আম্মা ছাড়া আমারে কেউ সুন্দর কয় নাই। সবাই কয় আমি নাকি দেখতে খারাপ, সুন্দর না।

বলেই মুখ গোমড়া করে নিল। নাওয়াজ মেয়েটাকে দেখল। বয়স কত হবে? সাত কিংবা আট। গায়ে একটা গোল জামা। মলিন চেহারা, রোগা পাতলা শরীর। ঠিকমতো যত্ন আর খাবারের অভাবে বোধহয় চেহারার এ দশা। তবুও চোখ মুখে আলাদা লাবণ্য।

– রাতের আকাশে তারা দেখো তো, কেমন মিটমিট করে জ্বলে?

খানিকটা উৎফুল্ল হয়ে বলল,
– আমার অনেক ভাল্লাগে।

নাওয়াজ একটু হেসে বলল,
– আমারও ভালো লাগে। তবে যতই ভালো লাগার জিনিস হোক তুমি, আমি কেউ চাইলেও কিন্তু ছুঁতে পারি না। পারি কি?

তারা সহসাই মাথা নাড়িয়ে প্রত্যুত্তর করল,
– না।

– তুমিও ঐ রাতের আকাশে জ্বলতে থাকা তারার মতো। সহজে কারো চোখে তোমার সৌন্দর্য ধরা দিবে না। তুমি ঐ তারার থেকেও বেশি দুর্লভ।

দুর্লভ শব্দটা প্রথম শুনল তারা। সে এর মানে ঠাহর করতে পারল না। তবে তাকে যে তারার মতো সুন্দর বলেছে তা বুঝে খুশি হলো।

– কোন ক্লাসে পড়ো?

এ কথা শুনে মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। মাথা নুইয়ে বলল,
– আমি তো পড়ালেখা করি না।

নাওয়াজ চেয়ারে আয়েশ করে বসে বলল,
– তা পড়তে চাও?

– চাই তো। আমার লগের সবাই পড়ালেখা করে। আম্মারে কত কইরা কই আম্মা আমিও পড়মু, আমারে স্কুলে ভর্তি করায় দেও। কিন্তু আম্মা দেয় না। কয় আমি বলে ছোড।

শুকতারা মেয়েকে ধমকে বলল,
– তোর খাওয়া শেষ না, যা ওঠ। বাইত যাইয়া তোর পড়ার ভূত মাথা থেইকা নামামু।

নাওয়াজের দিকে তাকিয়ে বলল,
– তুমি ওর কথায় কিছু মনে কইরো না। ছোড মাইয়া, না বুইঝা এমন কয়ছে। আমরা যাই। এহনও অনেকটি বাসন মাজা বাহি।

– তা যান। তবে আপনারা চাইলে আমি ওকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিতে পারি। খরচ নিয়ে ভাববেন না, ওসব আমি সামলে নেব।

– ছিঃ! ছিঃ! কী যে কও। এসব বইলা লজ্জায় ফালাইয়ও না। মাইয়ার বাপ সুস্থ হইলে ভাবতাছি ওরে স্কুলে ভর্তি করামু।

দেয়ালে পিঠ ঠেকতে অপারগ হয়ে নত হতে হয়। নয়তো তাদের আত্মসম্মান সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। এরা না খেয়ে মরবে। তবুও হাত পাততে নারাজ। পাছে না মান যায়।
ভেবে কারো কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশে কুণ্ঠা বোধ করে। কেউ সাহায্য করতে চাইলেও সলজ্জায় ফিরিয়ে দেয়। তবুও লোকে তাদের হীন চোখে দেখে। সারাক্ষণ দূরছাই দূরছাই করে বেড়ায়। ভাবে তাদের লোভ বেশি। দু পয়সা পেলে বোধহয় পিছ ছাড়া হবে না।

নাওয়াজ দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলল,
– প্যাকেটগুলো আবার রেখে যাবেন না। ওগুলো নিয়ে যাবেন। আর একটা কথা, আর কখনো খাবারের জন্য মেয়েকে মারবেন না। কোনো দরকার হলে অবশ্যই আমার সাথে যোগাযোগ করবেন। আমাকে বলতে না পারলে মাকে বলবেন। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করব আপনাদের সাহায্য করার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here