প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৫৯

0
1

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৫৯
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

নাওয়াজের শক্তপোক্ত দু হাত রেলিং আঁকড়ে। পকেট থেকে লাইটার বের করে সিগারেট ধরাল সে। এক টান দিয়ে তা ফেলে দিতে গিয়েও আবার পরপর টান দেয়। চারপাশ সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। নাওয়াজ ঘাড় বেঁকিয়ে এক পলক চাইল বিছানায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকা রমণীর পানে। তার গায়ে এখনও সেই কালো শাড়ি। মেয়েটা খুলেনি। শাড়ি পরেই শুয়েছে। ছেলেটা ফের নিকষ কালো আঁধারে নজর তাক করে। আঁধারে নিমজ্জিত ধরণী, ঘুমে আচ্ছন্ন তল্লাট। সাড়া শব্দ নেই কোথাও, চারপাশে কেমন অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কেবল ঝিঁঝিঁ পোকা ডেকে চলেছে অদূরে থাকা ঝোঁপঝাড় হতে।

নিস্তব্ধ এই গভীর রাতে দুর্বোধ্য এক মানব ইট, সিমেন্টে বানানো দালানের অলিন্দে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকে চলেছে। ধীরস্থে হাতের সিগারেটটা শেষ করে নিচে ফেলে নাওয়াজ। দু হাত মুঠ করে রেলিংয়ে ভর দিয়ে সেথায় থুতনি ঠেকায়। নিগূঢ় অন্ধকারে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কী দেখে চলেছে বলা মুশকিল। নাওয়াজ পুনরায় নিজের রুমে দৃষ্টি ফেলে। তার চোখের চাহনি স্থির, অক্ষিদ্বয় খানিকটা লালচে আভায় ছেয়ে। পরনের শার্ট কেমন কুঁচকে রয়েছে, চুলগুলোও অগোছালো। নাওয়াজ অস্থির হয়ে আরেকটা সিগারেট ধরায়। মেয়েটার টলটল সিক্ত চাহনি ভেসে উঠতেই চোখ বুজে নেয় নাওয়াজ। কালকে রাতের কথা মনে পড়তেই ক্রোধে মস্তিষ্ক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতে লেলিহান শিখার ন্যায় পরিস্ফুট হয়। শিরা উপশিরায় প্রবলতর হয় রক্ত সঞ্চালন, টগবগিয়ে ফুটে উঠে তা। নাওয়াজের ভিতরটা স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলে চলেছে।

মেয়েটাকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে নিজের করতে চায়নি সে। তোফায়েল আহমেদের কথা মনে হতেই নাওয়াজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ভদ্রলোককে সে কথা দিয়েছিল। বলেছিল, আভিরার থেকে দূরে থাকবে। নিজের দেওয়া কথা রাখতে অপারগ নাওয়াজ। ব্যর্থতায় বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার, শ্বাস প্রশ্বাস রুদ্ধ হলো। তোফায়েল আহমেদের সামনে কী করে দাঁড়াবে। কীভাবে বুঝাবে সে কতটা অপারগ হয়ে মেয়েটাকে কাছে টেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। কথা রাখতে না পেরে তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হয় নাওয়াজের হৃদয়। আভিরার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেও ভিতরে ভিতরে অস্থির হয়ে পড়েছিল নাওয়াজ। সারাটা দিন কাজে মনোযোগ দিতে পারেনি। তার চোখের সামনে শুধু কালকে রাতের চিত্র জ্বলজ্বল করছিল। এক মুহূর্তের জন্যও ঐ ঘটনা মাথা থেকে সরেনি। রুমে এসে আভিরাকে অমন সাজে দেখে মাথা খারাপ গিয়েছিল তার। মনে হচ্ছিল মেয়েটা লাবণ্যর অন্য রূপ। লাবণ্যও তো এমন সাজে কাল তার সামনে এসেছিল, বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল নিজেকে। মেয়েটাও লাবণ্যর মতোই তার কাছে ধরা দিতে চাইছে। তাকে এমন রূপে দেখে নাওয়াজের কী অবস্থা হবে তা কেন ভাবনায় আসেনি। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কাছে এসেছে বলে কী রোজ রোজ এই মেয়েকে নিজের করে নিবে। নাওয়াজ এমনটা করবে না। আভিরাকে ফিরিয়ে দিয়ে তার মন ভেঙে দিল সে, স্বইচ্ছেই আঘাত হানল নাজুক মনে।

আভিরার শরীর ঘেঁষে শুয়েছে নাওয়াজ। শাড়ি সামান্য উপরে উঠাতে নগ্ন পা বেরিয়ে এসেছে। ফর্সা পা দুটো দেখেই ফাঁকা ঢোক গিলে নাওয়াজ। তার পুরুষ মনকে বুঝ দেওয়া যেন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে তার ক্ষেত্রে। ঠোঁট জোড়ায় চোখ পড়তে নাওয়াজের অবাধ্য চোখ আটকায়। হালকা লালচে হয়ে থাকা ওষ্ঠ দেখে তার ভিতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। ইচ্ছে করল ঘুমন্ত রমণীকে টেনে তুলে তার ঠোঁটে প্রগাঢ় চুম্বন আঁকতে। নাওয়াজ বুড়ো আঙুল দিয়ে মেয়েটার নিম্নাষ্ঠ চেপে ধরল। মুখ নামিয়ে ছোটো করে চুমু আঁকল। এতে যেন হলো না পুরুষটার, অস্থির হয়ে উঠল গাঢ় একটা চুমু খাওয়ার জন্য। নাওয়াজ আস্তে ধীরে ওষ্ঠাধরের মিলন ঘটায়, সেকেন্ড ব্যবধানে একত্রিত হয় ওষ্ঠাদ্বয়। ঘুমের মধ্যে শ্বাস ফেলতে না পেরে ছটফট করে উঠল আভিরা, আঁতকে উঠে চোখ মেলতেই শরীর নিস্তেজ হয়ে এলো তার। আতঙ্কে ছেয়ে থাকা চোখ দুটোতে যেন নিদারুণ ক্লেশ। চোখ ভরে এলো অশ্রুতে। তিরতির করে কাঁপতে থাকে ওষ্ঠ যুগল। মেয়েটা ছটফট করে সরে যেতেই নাওয়াজ শক্ত হাতে বাহু আঁকড়ে ধরে। এলোমেলো স্বরে বলে উঠল,
– একটা চুমু খাব শুধু, প্লিজ।

মেয়েটাকে বলার সুযোগ দিল না। অস্থির হয়ে ঠোঁট দুটো আঁকড়ে ধরে। ওষ্ঠাদ্বয়ের বেপরোয়া সংঘর্ষে আভিরার অবস্থা নাজেহাল, শ্বাস নেওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। এই বুঝি দম আটকে মারা পড়বে।

আভিরা অভিমানে চোখ ফিরিয়ে নিতেই নাওয়াজ এক টানে মেয়েটাকে নিজের দিকে ফেরায়। শক্ত হাতে মেয়েটার চুল আঁকড়ে কাছে টানতেই আভিরার মুখ দিয়ে ব্যথাতুর শব্দ বেরিয়ে আসে। নাওয়াজ মেয়েটাকে টেনে নিজের বুকে ফেলে। রাশভারী কণ্ঠে বলল,
– এই শাড়ি খুলেননি কেন? আপনাকে তো বলেছিলাম শাড়ি পাল্টে তারপর ঘুমাতে।

আভিরাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে নাওয়াজ ধমকে উঠল,
– এই মেয়ে কথা বলছেন না কেন?

হঠাৎ ধমকে আভিরা কেঁপে ওঠে। ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। ফুঁপানোর দরুন ছোটো শরীরটা কেমন কাঁপছে। নাওয়াজ মেয়েটার পিঠে হাত রাখে। দু হাতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ধীমি আওয়াজে বলল,
– কাঁদছেন যে, আমি কী কান্না করার মতো কিছু বলেছি? মহা মুশকিল তো আঞ্জুম। আজকাল কিছু হলেই কান্নাকাটি শুরু করেন। কেঁদেকুটে কী প্রমাণ করতে চান, আপনি খুব অসহায়? আপনি তো একটা জালিম মহিলা। স্বৈরাচারের ন্যায় আমার মতো পুরুষকে বেসামাল করে ছাড়ছেন।

নাওয়াজ মেয়েটার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
– আপনি বশীকরণ জানেন মেয়ে, আপনার ইন্দ্রজালে পুরোপুরি ফেঁসে গেলাম।

তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়তেই আভিরা কুঁকড়ে যায়, শিরশির করে উঠে অঙ্গ। মেয়েটা চোখ ফিরিয়ে নেয়। নাওয়াজ আরও গভীরভাবে মিশিয়ে নেয় মেয়েটাকে। খসখসে হাতে সুডৌল কোমর ছুঁতেই আভিরার ভিতরটা ছলকে ওঠে। কণ্ঠে একরাশ মাদকতা ছড়িয়ে বলল,
– এরপর থেকে এমন সাজে আমার সামনে আসবেন না। আমি ধৈর্য হারা হলে আপনার মরণ নিশ্চিত, সুস্থভাবে হেঁটে চলার অবস্থায় রাখব না। আপনি নিশ্চয়ই এখন মরতে চাইবেন না। মরতে চাইলে আসুন, আপনাকে মরণের দোর ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

_

ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে আভিরা বিরক্ত হলো। চোখ মুখ কুঁচকে খানিকটা সরে গিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল,
– ঘুমাতে দিন, রাতে ঘুমাতে দেননি। এখন আবার সকাল সকাল ডেকে চলেছেন।

নাওয়াজ মেয়েটাকে দু হাতে জড়িয়ে ধরে বলল,
– আমি ঘুমাতে দেইনি? না কি আপনি আমাকে বাধ্য করেছেন?

আভিরা হঠাৎ নিশ্চুপ হয়ে যায়। পুরুষটার উন্মুক্ত বুকে নাক ঘষে মুখ ডুবিয়ে পড়ে রইল। চোখ মেলে না মেয়েটা। চোখ মেললে তারই বিপদ। অসহ্য রকমের লজ্জায় পড়তে হবে। নাওয়াজ মেয়েটার মাথায় চুমু খেল, পিঠে ছড়িয়ে থাকা এলোমেলো কেশে নাক ডুবায়।

নাওয়াজ মেয়েটার চুলে হাত গলিয়ে আস্তে ধীরে ফের ডাকল,
– আঞ্জুম দশটা বাজে। এবার উঠা দরকার।

সময়ের কথা শুনেই আভিরা তড়িঘড়ি করে উঠতে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল। নাওয়াজ দু হাতে আগলে নেয় আভিরাকে। বুকের সাথে চেপে ধরে বলল,
– এত তাড়াহুড়া করে উঠতে হবে কেন? আপনি এত ছটফটে কেন আঞ্জুম? ধীরে সুস্থে উঠা যায় না?

আভিরা লজ্জা পেল। হঠাৎ নিজের দিকে চোখ পড়তেই আঁতকে ওঠে। লাজের পরিবর্তে কেমন ভয় হানা দেয় অক্ষিদ্বয়ে। নাওয়াজের অন্তর্বেদী দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই হিমশিম খেল আভিরা। নাওয়াজ তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আভিরার শরীর অসাড় হয়ে আসে অমন দৃষ্টিতে। হাঁসফাঁস করতে লাগল, বুক ধড়ফড় করছে কেমন। শ্বাস প্রশ্বাসের বেগ জোরালো। নাওয়াজের চাহনি তার পুরো শরীর জুড়ে। আভিরা বুঝে উঠতে পেরেই চাদর জড়ায় গায়ে। নাওয়াজ চাদরসহ মেয়েটাকে নিজের উপর ফেলে। মুখের সামনে পড়ে থাকা চুলগুলো সরিয়ে দিতে দিতে বলল,
– কী ব্যাপার? মনে হচ্ছে লজ্জা পাচ্ছেন?

বলেই ঠোঁট কামড়ে হাসল। আভিরা গুটিয়ে যায়। তার বক্ষপটে নিদারুণ অস্থিরতা। এ লোকের সামনে থাকা সম্ভবপর নয়। কথার দ্বারা লজ্জা দিতে দিতে মেরে ফেলবে তাকে। আভিরা কিছুটা মিনমিন করে বলল,
– সকালের নাস্তা বানাতে হবে, ছাড়ুন।

নাওয়াজ নাকে নাক ঘষে। দু হাতের বাঁধন দৃঢ় করে বলল,
– আজ ছাড়ছি না ম্যাডাম। খাবার খেতে হবে না, আজ স্বামীর আদর খান।

আভিরার ইচ্ছে করছে লজ্জায় মরে যেতে। এভাবে এই লোকের বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো। এ লোক তাকে এত সহজে ছাড়বে না। এ কথা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি তার। আভিরা কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কণ্ঠনালী কিছুটা খাদে নামিয়ে বলল,
– খাব আমি, কাল রাতে আমার খাওয়া হয়নি।

নাওয়াজ হাতের বাঁধন আলগা করে। মেয়েটার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল,
– এই কথা এখন বলছেন। আজ নাস্তা বানাতে হবে না, আমি বাহির থেকে খাবার আনছি।

নাওয়াজ খাটের এক পাশে পড়ে থাকা শার্ট গায়ে জড়িয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। নাওয়াজ যেতেই আভিরা হাফ ছেড়ে বাঁচে। কাল রাতে তার খাওয়া হয়নি, না খেয়েই ঘুমিয়েছে সে। রাতে না খেলেও মোটেও খিদে লাগেনি তার। লোকটার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য রাতে যে খাওয়া হয়নি সে কথা বলল। আভিরা জানে সে এ কথা না বললে নাওয়াজ তাকে ছাড়বে না। আভিরা খাট থেকে নেমে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করতে নিলেই গলার ধারে নজর আটকায় তার। লালচে দাগ স্পষ্ট, আভিরা আলগোছে ছুঁয়ে দিল।

আলমারি থেকে কাপড় নিয়ে গোসলে গেল। ঠান্ডা পানি গায়ে পড়তে শরীর জ্বলে উঠল। আভিরা দাঁত দাঁত চেপে গোসল সেরে দ্রুত বের হলো। ভেজা চুল মুছে হালকা করে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে নেয়। খাটের উপর পড়ে থাকা ওড়না গায়ে জড়াতে নিলেই দরজা খোলার আওয়াজে চকিতে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। নাওয়াজ এসেছে। লোকটা ঘেমে গিয়েছে কেমন। আভিরা ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গেল। কপালের ঘাম মুছে দেয় আলতো হাতে। নাওয়াজ ফোলো ফোলো গাল দুটো চেপে ধরে চুমু খেল। মেয়েটাকে মুহূর্তে শূন্যে তুলে নিতেই আভিরা হকচকিয়ে ওঠে। পড়ে যাওয়ার ভয়ে অপ্রস্তুতভাবে গলা আঁকড়ে ধরে নাওয়াজের। খানিকটা চেঁচিয়ে বলল,
– আরে কী করছেন?

– আমারও গোসল করা দরকার তাই না?

এমন কথায় আভিরার কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে, চিবুক ঠেকে গলায়। সলজ্জায় হাঁসফাঁস অবস্থা তার। ছটফট করে উঠল নিচে নামার জন্য। নাওয়াজ নাকের সাথে নাক ঘষে বলল,
– আমাকে ছাড়া গোসল সেরেছেন, শাস্তি স্বরূপ আমার সাথে পুনরায় গোসল করতে হবে আপনাকে।

আভিরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টি ফেলে। কাঁদো কাঁদো চাহনি তার। কোন পাগলের পাল্লায় পড়ল সে। এই লোকের সাথে গোসল করতে হবে মানে? পাগল লোক, মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে এই লোকের। অসভ্য লোকের মতো যা ইচ্ছে তাই বলে চলেছে। নাওয়াজ হঠাৎ মেয়েটাকে নামিয়ে দেয়।

– আপাতত ওড়না গায়ে জড়ান, এভাবে আমাকে দিশেহারা করা সম্ভব নয়।

আভিরা তড়িঘড়ি করে খাটের উপরে থাকা ওড়না গায়ে জড়ায়। আনত মুখশ্রী তুলে অসভ্য খেতাব প্রাপ্ত লোকের দিকে চাইল না আর। নাওয়াজ টাওয়াল হাত নিয়ে সামনে এগোতে গিয়েও কী ভেবে যেন ফিরে আসে।

– একসাথে এত কিছু করতে আমি অভ্যস্ত নই। আজ ছেড়ে দিয়েছি বলে ভাববেন না বেঁচে গিয়েছেন। অতি শীঘ্রই আমার সাথে আপনার গা ভেজাতে হবে।

আভিরার কান দিয়ে গরম ধোঁয়া বের হয় এমন নির্লজ্জ মার্কা কথায়। এ লোকের মুখে কিছু আটকায় না। কী সব বলছে!

_

আভিরা শাশুড়ি মায়ের ঘরে দরজা আটকে বসে আছে। ঘণ্টাখানেক হবে ইয়াজমীন এসেছে। নাওয়াজ গিয়ে নিয়ে এসেছে মাকে। ইয়াজমীন আসতেই আভিরা শাশুড়ির কাছে ছুটে আসে। নাওয়াজ তার ঘরে একা। থাক একা, আভিরা অমন বেফাঁস মন্তব্য করা লোকের সামনে যাবে না। সকাল থেকেই এটা ওটা বলে জ্বালিয়ে মারছে। আভিরা অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছে নাওয়াজের আচরণে। গম্ভীর লোকটাকে এত কথা বলতে এই প্রথম দেখল সে। নাওয়াজের এমন আচরণের সাথে মোটেও অভ্যস্ত না সে।

ইয়াজমীনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে আভিরা। ভালো লাগছে না তার। অনেকক্ষণ হয়েছে সে শাশুড়ি মায়ের রুমে আছে। ঐ লোক একবারের জন্যও তাকে ডাকতে আসেনি। অভিমানে আভিরার চোখ ভিজে আসে। আভিরা ভেবে নিয়েছে সে আজ এ ঘরেই থাকবে। ঐ লোক ডাকলেও যাবে না।

টেবিলে একের পর এক পদ সাজিয়ে রাখল আভিরা। সবার প্লেটে ভাত বেড়ে দিয়ে রান্নাঘর থেকে পানির জগ নিয়ে আসে।

– লাবণ্য কোথায়?

লাবণ্যর কথা শুনে আভিরাকে খানিকটা অপ্রস্তুত হতে দেখা গেলেও নাওয়াজের খুব একটা ভাবাবেগ হলো না। নিজের পাতে মাছের পিস তুলে নিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল,
– ঘুমাচ্ছে।

ইয়াজমীন খাওয়া থামিয়ে নাওয়াজের দিকে তাকাল। কপাল কুঁচকে বলল,
– ঘুমাচ্ছে মানে? আসার পরই তো শুনলাম মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। এতক্ষণ অবধি কীসের ঘুম ওর, তাও আবার না খেয়ে। আভিরা মা একটু কষ্ট করে মেয়েটাকে ডেকে আনো তো।

– ডাকার দরকার নেই। ঘুমাতে দাও। অসুস্থ ও।

– অসুস্থ মানে? কী হয়েছে? আগে বলিসনি কেন?

ইয়াজমীনকে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে দেখে নাওয়াজ শান্ত স্বরে বলল,
– তেমন কিছু হয়নি, শরীর দুর্বল ওর। তুমি খেয়ে ঘুমাতে যাও। ওকে ডাকতে হবে না।

– মেয়েটা কি না খেয়ে থাকবে?

নাওয়াজ চুপচাপ খেয়ে উঠে চলে গেল। প্রশ্নের জবাব দিল না। ছেলেকে উঠতে দেখে ইয়াজমীন ছেলের যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল।

– কী হয়েছে ওর? বাড়িতে কী কিছু হয়েছে?

আভিরা বিব্রত চোখে চায়। কী বলবে এখন। শাশুড়িকে মিথ্যা বলতে কোথাও যেন বাঁধছে। খানিকটা আমতা আমতা করে বলল,
– আবব্ কিছু হয়নি। আপনার ছেলের মাথা ব্যথা করছে মা।

ইয়াজমীন সন্দিহান নজরে তাকায়। তবে আর কিছু জানতে চাইল না। আভিরা সবকিছু গুছিয়ে ইয়াজমীনের রুমের দিকে পা বাড়ায়। ইয়াজমীনকে বলা হয়নি সে আজ ও ঘরে থাকবে। সিঁড়ির কাছে যেতেই কেউ তাকে হেঁচকা টানে নিজের সাথে মিশিয়ে নেয়। ভয়ে আভিরার অন্তর আত্মা কেঁপে ওঠে। চিৎকার দিতে নিলেই শক্তপোক্ত হাতের দ্বারা তার মুখ চেপে ধরল। পাঁজাকোলা করে তুলে বলল,
– মান অভিমান যা আছে তা যেন ঘরের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকে। রাগ করে ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও থাকার চিন্তা মাথায় আনলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। আপনার সাথে কঠোর হতে বাধ্য করবেন না আমাকে। আমি কঠোর হলে আপনার জন্য তা মোটেও ভালো হবে না। তখন আমাকে সামাল দেওয়া দুষ্কর হয়ে যাবে আপনার পক্ষে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here