প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৬৩

0
3

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৬৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

নাওয়াজ যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। প্রতিক্রিয়া বিহীন দৃষ্টিপাত করে আভিরার ক্রন্দনরত চেহারায়। মেয়েটার লোচন গলিয়ে ঝরঝর করে পড়ছে বিষাদের অশ্রু কণা। নাওয়াজ নিজের স্তব্ধতা কাটিয়ে আভিরার পিঠে হাত রেখে বেডে হেলান দিয়ে বসে। নীরবতায় নিস্তব্ধ রজনী ভারী ঠেকে তার কাছে। নাওয়াজের বক্ষপটে ক্ষীণ শ্বাস প্রশ্বাসের আনাগোনা। ক্রোধে শিরা উপশিরার রক্ত ছলকে ওঠে। বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক রোষানলে পূর্ণ। তবে ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি নির্জীব, নিষ্প্রাণ! বাদামি চোখের মণির আশপাশ রক্তিম আভায় ছেয়ে যায়। শ্বেতমণ্ডল যেন রক্তে রঞ্জিত! চোয়াল শক্ত, মুখাবয়ব কঠিন! দাঁতে দাঁত চেপে ক্রোধ সংবরণের বৃথা চেষ্টা চালায়। অস্বাভাবিক ক্রোধে তার শরীর কাঁপছে। সে নিঃশব্দে একদৃষ্টে আভিরার কান্না দেখে গেল। নেত্র পল্লব অশ্রু জলে ভিজে একে অপরের সহিত জড়িয়ে, নাকের ডগা লালচে, অশ্রু কণা মেয়েটার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে। নাওয়াজের সহ্য হলো না তা। খসখসে হাতে কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রু কণা সযত্নে মুছে দেয়। মেয়েটার মুখশ্রী ছুঁয়ে দেয় তর্জনী দ্বারা। মেয়েটার মুখ উঁচুতে তুলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। আভিরা অমন চাহনিতে মিইয়ে যায়।‌ শরীর কেঁপে ওঠে। ভাঙা গলায় কোনোরকম আওড়ায়,
– আমার হাত পায়ে থাকা গভীর ক্ষতের কারণও আপনার বোন।

– লাবণ্য দায়ী নয়।

নাওয়াজ খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে উঠল। তার দৃষ্টি এখনও মেয়েটার মুখশ্রী জুড়ে। আভিরার চমকে উঠা চাহনি নজর এড়ায় না তার। আভিরা অবাক নয়নে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

– মানে?

– দুর্ঘটনা ছিল কেবল, সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত।

– কী সব বলছেন? মা যে বলল আপুই…

– শাড়ির সাথে পা বেঁধে গিয়েছিল। ব্যালেন্স রাখতে না পেরে আপনার সাথে ধাক্কা লাগে। সেদিন ও ইচ্ছে করে কিছু করেনি। উপর থেকে দেখেছিলাম সবটা। অজান্তে হোক, তবুও এসবের জন্য লাবণ্যর উপর চাপা ক্ষোভ কাজ করত।

আভিরার বুঝল এসবের জন্যই লাবণ্যকে নাওয়াজ এড়িয়ে যেত। মেয়েটা বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে বলল,
– কিন্তু আমার ভাইয়ের সাথে, আপনার সাথে ইচ্ছে করেই করেছে।

নাওয়াজ আভিরার ঠোঁটে আঙুল চেপে চুপ করিয়ে দেয়।‌এসব শুনতে ভালো লাগছে না তার। মেয়েটা তার নিজের বোন না হলেও নাওয়াজ তাকে সেই প্রথম দিন থেকেই বোনের নজরে দেখে আসছে।‌ হয়তো কখনো সেভাবে প্রকাশ করতে সক্ষম হয়নি। আর তার অক্ষমতার কারণেই বোধ হয় সব এতটা জটিল হয়ে গিয়েছে। এই মেয়েটার এত অধঃপতন সহ্য করার মতো। ছোটো একটা বাচ্চাকে আঘাত করতে বিবেকে বাঁধেনি। কী জঘন্য পন্থা অবলম্বন করেছিল তাকে পাওয়ার জন্য!
ভাবতেই ক্রোধে কপালের রগ ফুলে ওঠে। চোখ বুজে রাগ সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। এসবের জন্য কোনো না কোনোভাবে সে দায়ী। নিজের স্বভাবের বাইরে গিয়ে যদি লাবণ্যর সাথে সহজ হওয়ার চেষ্টা করত, তাহলে এদিন দেখতে হতো না। সে তো কখনো ভাইয়ের মতো সহজতর আচরণ করেনি লাবণ্যর সাথে। এক বাড়িতে থেকেও তাদের খাবার টেবিলে ছাড়া দেখা হতো না, কখনো প্রয়োজন ছাড়া কথাও হতো না। মেয়েটাও চাপা স্বভাবের ছিল, দূরে দূরে থাকত তার থেকে। সেজন্য সেও সেভাবে চেষ্টা করেনি। নাওয়াজের এই প্রথমবার যেন খুব করে আফসোস হচ্ছে, অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। নিজের এমন অন্তর্মুখী স্বভাবের জন্য নিজের প্রতি রাগ হলো নাওয়াজের।

ফ্যানের ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ছাড়া আপাতত আর কোনো আওয়াজ নেই। জাগ্রত দুটো মানুষের মাঝে অদ্ভুত নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙে নাওয়াজের কথায়।

– উঠুন, বাইরে যাব।

আভিরা নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ে। নাওয়াজ মেয়েটার এক হাত আঁকড়ে বাইরে পা বাড়ায়। কদমে কদম মিলিয়ে হেঁটে চলে মানব মানবী। ফের যেন নীরবতা গ্রাস করে। সদর দরজা চাপিয়ে বের হলো। মুহূর্তেই তীব্র সুঘ্রাণ ঠেকে নাসারন্ধ্রে। আভিরা গভীর শ্বাস টেনে ফুলের ঘ্রাণ নেয়। সুগন্ধি ফুলের সুবাসে সুরভিত চারপাশ। বাতাসে কেমন মাদকতা। দুজনে গন্ধরাজ ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা।

গেট থেকে বাড়ির মূল ফটক অবধি ইট সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া সামান্য চওড়া পথ, বাড়ির উঠানের মধ্যিখানে একেবারে। আঙিনাকে দু ভাগে বিভক্ত করে রেখেছে লম্বা চওড়া প্রশস্ত রাস্তা। বৃষ্টির দিনে কাদা পানিতে যেন পা মাড়াতে না হয় সেজন্য এই রাস্তা করা। সদর দরজার দু পাশে গাঁদা ফুলের চারা লাগানো। বড়ো বড়ো ফুল ফুটে এতে। মাথার উপর জ্বলে চলেছে রঙ বেরঙের লাইট, সাথে উঠানে লাগানো বাল্বের আলোতে চারপাশ আলোকিত। আভিরা মাহাদদের বাড়িতে নজর দেয়। দু বাড়িতে যেন আলো ঠিকরে পড়ছে, চোখে পড়ার মতো। এ বাড়ির শুধু উঠানে লাইটিং করা হলেও মাহাদের পুরো বাড়ি জুড়ে। কেমন জ্বলজ্বল করছে। উজ্জ্বল আলোক রশ্মি আঁধার রাতকে রঙিন করে রেখেছে।

– আপনার বাবার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেও আপনার উপরে প্রতি মুহূর্তে আমার নজর থাকত। রাস্তায় কয়েকটা বখাটে একবার আপনার গায়ে রঙ দিয়েছিল। আপনার মনে আছে আঞ্জুম?

হঠাৎ নাওয়াজের কথায় আভিরা হকচকিয়ে ওঠে। লোকটা কী নিয়ে কথা বলছে প্রথমে বুঝে উঠতে না পারলেও পরমুহূর্তেই চোখ জ্বলে উঠে আভিরার। মন মস্তিষ্ক বিষিয়ে যায় কিছু তিক্ত স্মৃতিতে। চোখের সামনে যেন ভেসে উঠে প্রতিটা দৃশ্যকলাপ।

সে তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী। ক্লাস শেষে বের হতেই দেখল রাস্তার এক পাশে জটলা বেঁধে রয়েছে। কয়েকটা ছেলে রঙ মিশ্রিত পানিতে ভিজে চুপচুপে। সাদা শার্ট রঙে একাকার। রঙ মেখে থাকায় মুখের আনন অস্পষ্ট। তবে এরা যে এই স্কুলেরই ছাত্র বুঝতে অসুবিধা হয় না। সে পা বাড়িয়ে সরে আসতে নিলেই কেউ একজন তার গায়ে রঙ ছুঁড়ে মারে। এতেই ক্ষ্যান্ত হয় না। মুহূর্তেই রঙ মেশানো পানিতে গা ভিজে আভিরার। আভিরা এমন অতর্কিত কাজে এতটাই হতভম্ব হয়েছিল সহসাই বুঝে উঠতে পারছিল না তার সাথে ঠিক কী হয়েছে। বুঝে উঠতে পেরেই পুরো শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। লজ্জা, অস্বস্তি হানা দেয় ভেতরে, অক্ষিকোটর ভরে উঠে জলে। সাদা স্কুল ড্রেস ভিজে শরীরের ভাঁজ দৃশ্যমান হতে সময় লাগে না। আভিরা থরথর করে কাঁপছে। মেয়েটা মাঝ রাস্তায় বসে পড়ে। হাঁটুতে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে সকলেই কিশোরীর আর্তনাদ দেখে। তবে কেউ এগিয়ে আসে না। কান্নার মাঝে অনুভব করে কেউ তাকে লোক চক্ষুর আড়াল করে রেখেছে। চাদর দিয়ে আড়াল করেছিল রঙে ভেজা গা। আভিরার তখন হুঁশ জ্ঞান নেই। কিন্তু সতর্ক দৃষ্টি ফেললেই দেখত ক্রোধে জ্বলতে থাকা অক্ষিদ্বয়। চোখ নয় যেন জ্বলন্ত লাভা। হাতে থাকা হটিস্টিক দিয়ে আধমরা করে ফেলে রেখে গিয়েছিল ছেলেগুলোকে। আভিরা নিভু নিভু চোখে কয়েক পলক দেখেছিল। তবে চেহারা দেখতে সক্ষম হয়নি। কিন্তু বুঝে ছিল এই পুরুষ ক্রোধে জ্বলে অঙ্গার।

সেসব মনে হতেই মেয়েটার মুখ ভার করে আসে। ছোটো করে জবাব দেয়,
– হু।

– ওদের কে মেরে ছিল জানেন?

মেয়েটা মাথা নাড়ে। সে জানে না।

– তাকিয়ে দেখুন আপনার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

আভিরা নেত্র পল্লব বড়ো বড়ো করে চাইল। কোটর থেকে যেন চোখ বেরিয়ে আসবে। দ্বিধা নিয়ে প্রশ্ন করল,
– আপনি?

– হু।

– আপনি এত হিংস্র?

আভিরার কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে। চোখের সামনে ভেসে উঠে কয়েকটা রক্তাক্ত দেহ। কী নির্মমভাবে মেরে ছিল সেদিন। আভিরার মনে হয়েছিল ঐ ব্যক্তির মধ্যে দয়া মায়া বলতে কিছুই নেই। নয়তো এমন অমানুষের মতো মারে।

– উহু! হিংস্র নই। তবে…

– তবে কী?

– আমার নারীর দিকে কেউ হাত বাড়ালে এই ইয়াজিদ মানুষ থেকে অমানুষ হয়ে যায়। তখন হিংস্রর থেকে কম কিছু না সে।

ভোর হতেই বাড়ির সকলে উঠে যায়। ছোটো ছোটো বাচ্চারা হইচই শুরু করে দিয়েছে। কেউ কেউ উঠানে দৌড়াদৌড়ি করছে, কেউ বা চুপচাপ বসে রয়েছে। বাড়ির আঙিনা সাজাতে ব্যস্ত দলে দলে। প্রবেশদ্বারে বিশাল এক গেট করা হয়েছে। রঙিন কাপড় মোড়ানো তাতে। উঠানের এক পাশে প্যান্ডেল করা হবে। তারই তোড়জোড় চলছে। এ মাথা থেকে ও মাথায় তিনটা তিনটা করে দু পাশে ছয়টা বাঁশ গেঁথে লাল হলুদ কাপড় দিয়ে আবরণ দেওয়া হয়েছে। দশ, বারোটা টেবিল বসিয়ে চেয়ার সেট করা শেষ। দুপুর হলেই লোকজনের খাওয়া দাওয়া শুরু হবে।

বাড়ির মহিলারা নাস্তা বানাচ্ছে সকলে। এ বাড়িতে কনে বাদে মাত্র দুজন নারী লোক। দুজনের পক্ষে এতগুলো মানুষের জন্য নাস্তা বানানো কোনোভাবেই সম্ভব না। আভিরার মা, চাচি থেকে শুরু করে অনুষ্ঠানে আগত অনেকেই হাতে হাতে সাহায্য করছে। বলা চলে কনে বাদে বাকি কেউ বসে নেই। সকলের জন্য পরোটা, ঘন করে ডাল রান্না করা হয়েছে। ফ্রিজে তুলে রাখা বিরিয়ানি নামিয়ে গরম করে বাচ্চাদের খেতে দিল। তারা কেউ পরোটা মুখে দিবে না, বিরিয়ানি খাবে। খেয়েই সকলে ছুটে উঠানে গেল।

লাবণ্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে বাইরের সাজসজ্জা দেখে চলেছে। আভিরা পুরো রুম খুঁজেও যখন লাবণ্যকে পেল না কেমন ভয় হতে শুরু করে। লাবণ্যকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মেয়েটা। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলল,
– খাবার এনেছি। খেয়ে নিন।

– রেখে যাও। পরে খাব।

আভিরা বেরিয়ে যায় রুম থেকে। রান্নাঘরে গিয়ে নাস্তা হাতে আবার উপরের ঘরে ছুটল। বন্ধ ঘরের দরজায় কড়া নাড়ে বার কয়েক। দরজা খুলতেই হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকল মেয়েটা।

– কী হয়েছে? এমন ছুটছ কেন?

আভিরা কিছুটা হাসার চেষ্টা করে বলল,
– আব্ এমনি। আপনার জন্য খাবার এনেছি।

– রেখে যাও।

আভিরা বের হতেই ইয়াজমীন পুনরায় দরজা লাগাতে উদ্যত হলে আভিরা ক্ষীণ স্বরে বলল,
– নিচে যাবেন না?

– না।

আভিরা গুটি গুটি পায়ে চলে যায়। দোতলা বেয়ে নিচে নামল। নিচে যেতে দেখল তার মা তাযীমকে ধমকে চলেছে। আভিরা গিয়ে ভাইয়ের পাশে বসে। মাকে উদ্দেশ্য করে বলল,
– কী হলো বকছ কেন?

– বকছি কী সাধে? এক তুমি খাবার খাওয়া নিয়ে জ্বালিয়ে গেলে এখন জ্বালাচ্ছে তোমার ভাই। এত যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না।

আভিরা হাসে। বিয়ের আগে তো ভাইকে সে নিজেই খাইয়ে দিত। তাই মায়ের তেমন চিন্তা ছিল না। কিন্তু এখন নিশ্চয়ই প্রতি বেলা খাওয়াতে গিয়ে ঝামেলায় পড়তে হয়।

– দেখি আমার কাছে দাও। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।

– নে, বজ্জাতটাকে খাইয়ে আমাকে উদ্ধার কর। আমি আপার কাছে যাচ্ছি।

আনেসা উঠে যেতে আভিরা পরোটা ছিঁড়ে ভাইয়ের মুখে দেয়।

– মাকে এত জ্বালাস কেন?

– কোথায় জ্বালায়?

– মা তাহলে কী বলে গেল?

– অত আম্মুর কথা শোনো না, আম্মু বেশি বেশি বলে।

আভিরা হাসতে হাসতে বলে,
– তাই?

– হু।

পরমুহূর্তেই ছেলেটা মুখ নামিয়ে বলল,
– তুমি আমাদের বাড়িতে কবে যাবে?

আভিরা ভাইয়ের কথা অত না ভেবেই উত্তর দেয়।

– লাবণ্য আপু চলে গেলে মাকে রেখে ও বাড়িতে যাওয়া হবে না রে।

ছেলেটা হঠাৎ কেঁদে ওঠে। আভিরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ভাইয়ের বাহুতে ধাক্কা দিয়ে বলে উঠল,
– এই কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?

তাযীম কথা বলে না। দু হাতে জাপটে ধরল বোনকে।

– তোমাকে ছাড়া আমার ভালো লাগে না। তুমি চলে এসো। এ বাড়িতে আর থাকতে হবে না।

আভিরা বহু কষ্টে হাসি আটকায়। কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
– কেন যাব? তুই তো আমার কথা শুনিস না। আমাকে দেখতে পারিস না আগের মতো।

– তোমার সব কথা শুনব। যা বলবে তাই করব। আর দেখতে পারি না বলছ কেন? আমি দেখতে পারি।

– আচ্ছা। এখন কান্না থামা। কেউ দেখলে ছিঁচকাদুনে বলবে তোকে।

তাযীম লজ্জা পেল। বোনের কাছ থেকে সরে যায়। দ্রুত চোখের পানি মুছে। নাক টেনে টেনে বলল,
– আর খাব না।

– পুরোটা শেষ না করে এক পা ও নড়বি না। চুপচাপ হা কর।

তাযীম চুপচাপ খেয়ে নেয়। আর একটাও কথা বলে না সে। আভিরা কতক্ষণ ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইল। চোখ জ্বলছে, হাত বাড়িয়ে ভাইয়ের চুলগুলো এলোমেলো করে দিল। বুকটা ভার হয়ে আসে তার। ভাইকে জড়িয়ে ধরে।

পাশে কারো উপস্থিতি অনুভব করে আভিরা ভাইকে ছেড়ে দিয়ে পিছন ফিরে চাইল। আভিরাকে তাকাতে দেখে জ্যোতি একগাল হেসে উঠল। মুচকি হেসে চোখের ইশারায় জানতে চাইল, সব ঠিকঠাক?

– হু। খেয়েছ তুমি?

– হ্যাঁ।

– আজকে কী পরবে আপু?

– শাড়ি।

জ্যোতি খানিকটা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল,
– আমিও পরব। পরিয়ে দিবে আমাকে।

পরমুহূর্তে ঠোঁট উল্টে বলল,
– ওহ্। তুমি তো নিজেই শাড়ি পরতে পারো না। আমাকে পরিয়ে দিবে কীভাবে?

আভিরা আচমকা হেসে উঠল। জ্যোতি খানিকটা ভড়কে গেলেও স্বাভাবিক করে নেয় নিজেকে।

– শিখে গিয়েছি।

– কীভাবে শিখলে?

আভিরা ফিসফিস করে বলল,
– বলা যাবে না। ওটা সিক্রেট।

_

দুপুর থেকেই যেসকল অতিথি আসা বাকি ছিল তারাও এসে গিয়েছে। ফাঁকা বাড়ি লোকজন দিয়ে ভর্তি। প্রতিটা বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। ইয়াজমীন আর লাবণ্যর ঘর বাদে বাকি সব রুমই আত্মীয় স্বজনের দখলে। এমনকি নাওয়াজ আর তার রুমটাও। আভিরা ক্লান্ত শরীরে রুমে আসে। ভাবল এবার বিছানায় গা এলিয়ে দিবে। কিন্তু রুম ভর্তি মানুষ দেখেই মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ার উপক্রম। এত মানুষ তার রুমে। দু তিনটা বাচ্চা ফ্লোরে হামাগুড়ি দিয়ে চলেছে। ড্রেসিং টেবিলের সবকিছু এলোমেলো দেখে কাঁদতে ইচ্ছে করে তার। পুরো রুম দেখে নেয় এক নজর। কী বাজে অবস্থা করে রেখেছে তার গোছানো রুমটার। বিছানার চাদর খুলে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে, বালিশ একটা ফ্লোরে তো আরেকটা খাটে। এসব যে বাচ্চাদের কাজ বুঝতে বাকি রইল না আভিরার। বড়োরা কেউ সাজতে ব্যস্ত, কেউ আবার মোবাইল হাতে বসে রয়েছে। আভিরার হঠাৎ রাগ লাগে। তার রুমে বসেছে ভালো কথা, তাই বলে রুমের এ হাল করবে। মেয়েটা ধুপধাপ পা ফেলে জ্যোতির কাছে চলে গেল। মেয়েটা বলেছিল তাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে। জ্যোতিকে শাড়ি পরিয়ে সে নিজেও রেডি হবে। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাগরিবের পরেই বিয়ে।

আভিরা জ্যোতিকে শাড়ি পরিয়ে দিয়ে বলল, রুম খালি করতে। রুম ভর্তি মেয়েমানুষ থাকলেও তাদের সামনে শাড়ি পরতে পারবে না সে। সবার মোটামুটি রেডি হওয়া শেষ। তাই সকলেই বেরিয়ে গেল। শুধু জ্যোতি খাটে বসে আভিরাকে দেখছে। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে মেয়েটা গলা উঁচিয়ে জানতে চাইল,
– কে?

ওপাশ থেকে গম্ভীর স্বর ভেসে এলো,
– আঞ্জুম ভিতরে আছে?

– হ্যাঁ।

বলেই জ্যোতি দরজা খুলে দিল। নাওয়াজকে দেখে রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়া উচিত মনে করল। নাওয়াজকে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল সে। জ্যোতি বেরিয়ে যেতেই নাওয়াজ দরজা আটকে ঘুরে তাকায়। আভিরা কুঁচি করছিল তখন। নাওয়াজকে দেখেই হাত ফসকে কুঁচি খুলে যায় তার। মেয়েটা তুতলিয়ে বলে উঠল,
– আপনি এখানে?

– হ্যাঁ।

– কিছু লাগবে?

– হু।

– কী লাগবে?

– আপনাকে।

নাওয়াজের সহজ স্বীকারোক্তি। তাতেই আঁতকে উঠে আভিরা। নাওয়াজ আপাদমস্তক আভিরাকে এক পলক দেখে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায়। ভয়ে আভিরা পড়ে যেতে নিলেই নাওয়াজ বাহু আঁকড়ে মেয়েটাকে পড়ে যাওয়া থেকে আটকায়।

– কী করছিলেন আপনি?

আভিরা কপাল কুঁচকায়। কী করছিলেন মানে। এ লোক কী দেখতে পারছে না সে কী করছে।

– তৈরি হচ্ছি।

– শাড়ি কেন পরছেন?

আভিরার কপালে ভাঁজ পড়ে। এ লোকের কথার মানে বুঝে উঠতে পারছে না সে।

– শাড়ি না পরে কী পরব?

– একা একা শাড়ি পরতে গেলেন কেন? আমায় ডাকেননি কেন?

আভিরা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। নাওয়াজ শাড়ির আঁচলে হাত দিতে চেঁচিয়ে উঠে আভিরা।

– আরে কী করছেন?

– হুশ। দেখতে থাকুন।

নাওয়াজ কুঁচি করে মেয়েটার পেটের কাছে গুঁজে দেয়। দুধে আলতা গায়ে নীল রঙটা যেন ফোঁটে উঠেছে। নাওয়াজের চোখ তুলে তাকানো দায় মেয়েটার চোখ ধাঁধানো রূপে। নীলের মধ্যে গোল্ডেন রঙের কারুকাজ খচিত বেনারসি শোভা পাচ্ছে আভিরার গায়ে। এই শাড়ি সে ই কিনেছিল আভিরার জন্য। শাড়িটা দেখেই মনে হচ্ছিল এইটাতে আভিরাকে মানাবে। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগবে তা ভাবনায় আসেনি। ইশ্ মেয়েটা তাকে এমন মরণ যন্ত্রণা দেয় কেন? তার রূপে যে এই পুরুষের হৃদয় ঝলসে যাওয়ার জো এই মেয়ে কী তা বুঝে না।

নাওয়াজ আভিরাকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। মেয়েটার কাঁধে থুতনি ঠেকিয়ে ধীমি আওয়াজে বলল,
– আরশিতে যার প্রতিবিম্ব পরিলক্ষিত, আমার মন মহলের সম্রাজ্ঞী সে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here