প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৭৩

0
5

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৭৩
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

– আমার উপর ভীষণ রাগ হচ্ছে বুঝি? অসহ্য লাগছে?

সামিহা নিমীলিত চোখে চাইল। আসলেই মাহাদকে এ মুহূর্তে সহ্য হচ্ছে না তার। ভীষণ রকম অসহ্য লাগছে মাহাদের মুখের ঐ হাসি।

– যে প্রেমে মনে হবে তাকে না পেলে জীবন অনর্থক, নিঃশেষ হয়ে যাব আমি, অচিরেই অস্তিত্ব বিলীন হবে সেইটা প্রেম নয়। মোহ কেবল! ভালোবাসা না পেলে মরতে শেখায় না। বরং ভালোবাসার মানুষটার সাথে আজীবন বাঁচার উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। তুমি মরতে গিয়েছিলে তার মানে তুমি আমাকে ভালোবাসনি। ভালোবাসার মানুষের সাথে বার্ধক্য অবধি বাঁচার আকাঙ্ক্ষা থাকতে হয়, অভিলাষ থাকবে জীবনের শেষ অবধি প্রিয় মানুষটার হাতে হাত রেখে জীবন নাশের!

তুমি জানো মানুষ মূলত ভুল মানুষকে ভালোবাসে। আর সেই ভুল মানুষটাকে না পেলে জীবন নাশে মরিয়া হয়ে ওঠে। অন্যের জন্য নিঃশেষ হতে চাওয়া মানুষগুলো বোকার স্বর্গে বাস করে। তাকে ছাড়া আমি বাঁচব না, এমন বদ্ধ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসো। নিজের জন্য বাঁচতে শিখো। দেরিতে হলেও তোমার জীবনে সঠিক মানুষ আসবে, শুধু সময়ের ব্যাপার। দেখবে তখন মনে হবে মরে গেলে জীবনে থাকা চমৎকার এই মানুষটাকে পাওয়া হতো না। নিজের করা বোকামির জন্য তখন শুধু আফসোস হবে। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসবে নির্বিঘ্নে। তুমি অনেক বুদ্ধিমতী নারী, এতদিন আমি এমনটাই জানতাম। তবে আজ তোমাকে পড়ার টেবিলের পরিবর্তে হসপিটালের বেডে দেখে মনে হচ্ছে আমার ধারণা নিছক ভুল!

এবার যেন মাহাদের কণ্ঠ কিছুটা নরম হয়ে এলো।

– সামিহা আমার ধারণা কি নিছক ভুল? খোদা তায়ালা আমাদের মূল্যবান জীবন নিশ্চয় হেলায় ফেলায় শেষ করার জন্য দেননি। যে তোমাকে চায় না তাকে চেয়ে কেন জীবন শেষ করবে? বরং যে তোমাকে চাইছে তার হাত আঁকড়ে বহু বছর বাঁচার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করো। আমাদের থেকেও উপর ওয়ালার পরিকল্পনা সর্বোত্তম। আল্লাহর উপর আস্থা হারিয়ে ফেললে মানে শয়তানের ধোঁকায় তুমি পথভ্রষ্ট হলে।

– লাবণ্য আপু তো তোমাকে চায়নি কখনো। তবে তুমি কেন তাকে চেয়ে যে তোমাকে চেয়েছে তাকে আঁকড়ে ধরোনি?

সামিহার কথায় মাহাদ চমৎকার হাসল। সামিহা চোখ ফিরিয়ে নেয়। এই পুরুষের হাসিতে যেন সে সর্বদা আটকে যায়। তবে এখন এই পুরুষের হাসিতে ভুললে চলবে না।

– ঐ যে বললাম, আমরা সর্বদা ভুল মানুষকে ভালোবাসি।

– তাহলে বলছ আপু তোমার জীবনে ভুল মানুষ?

– উহু, সে আমার জন্য যোগ্য এক নারী। খোদা তায়ালার দেওয়া নেয়ামত।

– আপু তোমাকে কখনো চায়নি।

– কিন্তু আমি তাকে চেয়েছি।

– তোমার কথার ঠিক নেই মাহাদ ভাই। ভিন্ন কথা বলছ কেন?

মাহাদ ঠোঁট কামড়ে হাসল। এ মেয়েকে সে যতটা সাদাসিধে ভেবেছিল সে ততটাও সাদাসিধে নয়। তার কথায় তাকেই প্যাঁচে ফেলছে। সামিহা আনমনে ফের বলে উঠল,
– আমি তোমাকে চেয়েও পেলাম না। আর সে না চেয়েও পেয়ে গেল।

– কারণ আমি তোমার জন্য অকল্যাণকর ছিলাম।

– লাবণ্য আপু তোমার জন্য কল্যাণকর?

– আমাকে জিজ্ঞেস না করে নিজেকে প্রশ্ন করো। সে আমার জন্য অকল্যাণকর হলে খোদা তায়ালা তাকে আমার করে পাঠাতেন না।

সামিহার মলিন মুখটা দেখে মাহাদের মায়া হলো। সামিহার সাথে তার দেখা সাক্ষাৎ হয়নি তেমন। তাহলে কেমন করে তাকে মন দিল এই মেয়ে। ভাইয়ের বন্ধু বাদেও সামাদের পরিবারের সাথে অন্য এক সম্পর্ক রয়েছে তাদের। আত্মীয়তার সম্পর্ক। যেইটা মাহিরার দরুন। তার বোন মাস কয়েক বাদে ঐ বাড়িতে বউ হয়ে যাবে। মাহাদ ভাবছে এই ঘটনার রেশ ধরে তার বোনের উপর যেন বিরূপ প্রভাব না পড়ে। যদিও সামাদের পরিবার তেমন না। তবুও কেমন যেন দুশ্চিন্তা থেকেই যাচ্ছে। সব ভুলে মাহাদ নির্দ্বিধায় সামিহার মাথায় স্নেহের হাত রাখে। এতটুকু ভরসার ছোঁয়াতেই যেন সামিহার অভিমানী হৃদয় হুহু করে কেঁদে উঠল। এই পুরুষটার প্রতি কবে থেকে তার মন কোঠায় দুর্বলতা রয়েছে সে তা জানে না। সামিহা নিজেকে শক্ত করল। এভাবে অন্য এক পুরুষের জন্য পাগলামি করা তাকে মানায় না। বয়সের চেয়েও সে যেন যথেষ্ট ম্যাচিউর। অন্যদের মতো আবেগে গা ভাসিয়ে দেওয়ার মেয়ে না সে। তবুও এই পুরুষের কাছে সে বড্ড অসহায়। অসহায় তার উপেক্ষা, অগ্রাহ্যে!

দরজা খুলে বের হয়ে সামাদের বাবার সম্মুখে পড়ে মাহাদ বিব্রত বোধ করে কেমন। তবুও সামান্য হাসার চেষ্টা করল।

– আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। কেমন আছেন?

এমন একটা পরিস্থিতিতে তার এই প্রশ্ন ঠিক কতটা যুক্তিগত মাহাদ জানে না। এমনকি তাকে এখানে দেখে সামাদের বাবা কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তাও জানা নেই মাহাদের।

সামাদের বাবা এগিয়ে এসে বিগলিত হেসে বলল,
– এই তো ইয়াং ম্যান, আছি ভালোই। তোমার কী খবর?

– আলহামদুলিল্লাহ।

– কখন এসেছ?

– কিছুক্ষণ আগে।

– আচ্ছা আমি একটু মেয়েটার সাথে দেখা করে আসি। তুমি কিন্তু যাবে না। বসো এখানে।

– আচ্ছা।

মাহাদ বসে রইল। তার কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। আগে কখনো এমন লাগেনি। মনে হচ্ছে সামাদের পরিবারের সম্মুখীন হতে পারবে না সে। আজকের এ পরিস্থিতি যেন তাকে বিপাকে ফেলে দিয়েছে। মাহাদ চেয়ারে বসে এদিক ওদিক নজর ফেলে তার মা আর বোনকে খুঁজল। সুরভী আর মাহিরা হাসপাতালেই আছে। অথচ এসে থেকে তাদের দেখা মিলেনি।

সুরভী ছেলেকে দেখে বেশ অবাক হলো। দ্রুত কদমে এগিয়ে এসে বসল মাহাদের পাশে। পাশে কারো উপস্থিতি অনুভব করে মাহাদ মাথা তুলে চাইল। মাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে।

– তুই এখানে?

– হ্যাঁ।

– খবর কে দিল? আমি তো তোকে জানাতে বারণ করেছিলাম।

– লাবণ্য। তুমি কোথায় ছিলে?

– ভাবির কাছে।

– আন্টি কোথায়?

– কেবিনে। খবর শুনেই নাকি জ্ঞান হারিয়েছে।

সামাদদের পরিবারের সকলে এসে উপস্থিত হলো। মাহাদ চোখ তুলে তাকাল পারল না। যেন এমন একটা অবস্থা তার জন্যই হয়েছে। সামাদের বাবা পাশে এসে বসতেই মাহাদ নড়েচড়ে বসে। একমাত্র এই ভদ্রলোক ছাড়া অন্য কেউ তার সাথে মত বিনিময় করেনি। এমনকি সামাদও তাকে অগ্রাহ্য করে চলছে। মাহাদ সামাদের অবস্থা বুঝতে পেরে আর কথা বলার চেষ্টা করেনি। বোনের এ অবস্থায় কোনো ভাইই ঠিক থাকবে না। মাহাদ ভালো করেই জানে তার পরিবর্তে অন্য কোনো ছেলের জন্য সামিহা এমন একটা পদক্ষেপ নিলে সামাদের পরিবার ঐ ছেলেকে সহজে ছেড়ে দিত না। অথচ তার বেলায় একেবারে প্রতিক্রিয়াহীন।

– মেয়েটা যে হঠাৎ করে এমন একটা কাজ করে বসবে আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। মেয়ের কাজের জন্য আমরা লজ্জিত।

মাহাদ সামাদের বাবার দু হাত ধরে বলল,
– আঙ্কেল দয়া করে এসব বলে আমাকে লজ্জায় ফেলবেন না।

– তবে যাই বলো না কেন, তোমাকে মেয়ের জামাই হিসেবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। লাবণ্যর সাথে তোমার বিয়ে না হলে আজ এই হসপিটালে বসেই তিন কবুল বলিয়ে বিয়ে দিয়ে দিতাম।

মাহাদ কিছু বলল না। শুধু অদ্ভুতভাবে হাসল। তার প্রাণনাশিনী ছাড়া অন্য কাউকে নিজের বধূ রূপে সে দুঃস্বপ্নেও কল্পনা করতে পারে না।

হঠাৎ চেঁচামেচির আওয়াজে সকলে উঠে দাঁড়ায়। এত বড়ো মেয়ে কিনা ইনজেকশনের ভয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করছে। অথচ সে নাকি হাতে ছুরি চালিয়ে ছিল আজ। তখন কি এই মেয়ের ভয় লাগেনি? কেবিনের অবস্থা দেখে সকলে হতভম্ব। সকলে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
– কী হচ্ছে এখানে?

সামিহা ফুঁসে উঠল। হাতের কাছে থাকা বালিশ ছুঁড়ে মারে তৎক্ষণাৎ। ইন্টার্ন করা ছেলেটা এক পলক রাগান্বিত সামিহার দিকে চেয়ে ঠোঁট কামড়ে হাসল। বিড়বিড় করে বলল,
– ধানি লঙ্কা!

সামিহার বাবা এগিয়ে এলো। মেয়ের পাশে বসে মেয়ের মাথায় হাত রাখল। বাবাকে দেখে সামিহা মাথা নত করে নেয়। একে একে পরিবারের সকলের দিকে চাইল। চোখ ভরে আসে তার। আবেগের বশীভূত হয়ে কত বড়ো ভুল করতে যাচ্ছিল সে।

– কী হয়েছে মামণি?

আদুরে কণ্ঠে মেয়েটা কেঁদে ফেলল। নাক টেনে ফ্যাচফ্যাচে গলায় বলল,
– আহ আব্বু আমি ইনজেকশন দিব না।

– দিতে হবে না।

বলেই ইশারা করল। ভদ্রলোকের ইশারা পেয়ে ইন্টার্ন করা ছেলেটা মৃদু হেসে এগিয়ে এলো। সূক্ষ্ম ব্যথায় সামিহা মাথা তুলতে চাইলেও তার বাবা তুলতে দিল না।

_

ঘড়ির কাঁটা যেন নিজ গতিতে এগিয়ে চলেছে। হলরুমে টানানো দেয়াল ঘড়িটা এবার শব্দ করে ঘুরতে লাগল। লাবণ্যর চোখ লেগে এসেছিল। তীব্র আওয়াজে উঠে বসল সে। ডাইনিং টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। সেই দুপুরে মাহাদ যাওয়ার পর যে চোখ লেগে গিয়েছিল কেবল ঘুম ভাঙল। লাবণ্য আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়ায়। অন্ধকারে কিছু দেখার জো নেই। রাত হয়ে গিয়েছে তার মানে। এতক্ষণ অবধি ঘুমিয়ে ছিল ভেবে আশ্চর্য হলো লাবণ্য। অন্ধকারে হাতড়ে মোবাইল খোঁজার চেষ্টা করল সে। সময় দেখেই মাথা ঘুরে উঠল লাবণ্যর। রাতের দশটা বাজে। লাবণ্য উঠে লাইট দিল। ঝলমল আলোতে ভরে গেল পুরো হলরুম। বাড়ির কেউ আসেনি তার মানে। লাবণ্যর খুব একটা ভাবান্তর হলো না তাতে। এক নজর তাকিয়ে দেখল দুপুরে বেড়ে রাখা খাবার সেভাবেই পড়ে রয়েছে। মাহাদ তখন খবর শুনেই বেরিয়ে গিয়েছিল। খাবার মুখেও তোলেনি। লাবণ্য ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে উপরে উঠে গেল। চোখে ঘুম নামছে না তার। কেন যেন অসহ্য লাগছে সব। লাবণ্য ছটফট করতে লাগল, চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে দু ফোঁটা উষ্ণ নোনাজল। সময় গড়ায়, তবে মাহাদের দেখা নেই। লাবণ্য সেভাবেই পড়ে রইল। ঘড়ির কাঁটা যেন নিজ গতিতে বেড়ে চলেছে। লাবণ্যর মাঝে বিন্দু পরিমাণ দুশ্চিন্তার আভাস নেই। তার স্বামী নামক পুরুষটার জন্য কোনো এক নারী আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছে। তাতেও যেন হেলদোল নেই। সে বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত। তবে তার চোখে পানি কেন?

_

– সামাদের বাবা তোমার মেয়েকে বুঝাও। এসব কিন্তু সহ্য হচ্ছে না আমার।

– কী হয়েছে?

– সেই দুপুর থেকে কিছুই মুখে তোলেনি। এখন খাবার নিয়ে আসার পরও বলছে খাবে না।

– আচ্ছা আমাকে দাও।

বাবাকে মানা করার সাধ্য যেন সামিহার নেই। চুপচাপ খেয়ে নিল বাবার হাতে।

– এবার তাহলে আমরা বের হই। সামিহা মা সাবধানে থেকো। পরেরবার এমন পাগলামি করতে যেও না কেমন। ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।

সামিহা লজ্জিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। কী বোকামি করতে গিয়েছিল তখন।

– এত রাতে আপনাদের যেতে দিচ্ছি না আপা।

সামিহার মায়ের কথায় সুরভী সহাস্যে এগিয়ে আসে। মৃদু হেসে বলল,
– লাবণ্য বাড়িতে একা আছে। এবার আমাদের না গেলেই নয়।

মায়ের কথায় মাহাদের সম্বিৎ ফিরে। লাবণ্যর কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। মেয়েটার কথা সে কীভাবে ভুলে গেল ভেবেই রাগ হচ্ছে তার।

মাহাদরা যখন বাড়ি ফিরে তখন রাতের এগারোটা। হলরুম বাদে পুরো বাড়ির বাতি নেভানো। মাহাদ রুমের লাইট দিতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন কামরা আলোয় ছেয়ে যায়। বিছানায় ঘুমন্ত রমণীকে এক নজর দেখে ফ্রেশ হতে গেল সে। খাবারের প্লেট দেখে মাহাদের মুখে সূক্ষ্ম হাসির দেখা মিলে। কে বলেছে, এই মেয়ে তাকে অদেখা করে চলে? ভাতগুলো শক্ত হয়ে আছে। মাহাদ বুঝল দুপুরে সে না খেয়ে বের হওয়ার কারণে সেই ভাতই রেখে দেওয়া হয়েছে তার জন্য। মাহাদ কয়েক লোকমা খেয়ে উঠে পড়ল। গিয়ে শুয়ে পড়ল ঘুমন্ত রমণীর গা ঘেঁষে। শোয়ার আগে সাবধানে পরখ করে নিয়েছে রমণী ঘুমে মগ্ন কী না!

_

খাবার টেবিলে আজ রমরমা ভাব। বেশ কয়েক পদের ভর্তা বানানো হয়েছে। সকাল হতেই বর্ণা আর লাবণ্য মিলে ভর্তা বানানোর কাজে লেগে পড়েছে। আজ প্রাতরাশের ভোজনে ধোঁয়া উঠা সাদা ভাত আর পাটায় বাটা কয়েক পদের ভর্তা।

– উত্তর পাড়ার হান্নান চাচার মেয়েকে নিয়ে না কি ঝামেলা হয়েছে? কালকে এ নিয়ে মারামারি হয়েছে এলাকায়।

– কে বলল?

– রাসেল কালকে ওর ছেলেদের নিয়ে মসজিদ থেকে ফেরার পথে দেখেছিল। পরে শুনল চাচার মেয়েকে নিয়েই নাকি ঐ ঘটনা ঘটেছে।

– আমিও কিছুটা শুনেনি। দারোগা বাড়ির কোন ছেলের সাথে নাকি প্রেমের সম্পর্ক আছে ঐ মেয়ের। ওর চাচাতো ভাই ঐ ছেলের সাথে একবার দেখেছিল ওকে। বাড়িতে সেই কথা জানাতেই বেশ ঝামেলা হয়। মেয়ে পরে ঐ ছেলেকে ফোন দিয়ে সব বলার পর ওকে একা পেয়ে মারধর করে।

– ও তো এবার দশম শ্রেণিতে উঠেছে বোধহয়। এই বয়সে প্রেম ভালোবাসার কী বুঝে, আবার ছেলেপেলে দিয়ে মার খাইয়েছে। এতটুকু একটা ছেলের কাছে বিদেশি অস্ত্র কীভাবে থাকে? এ নিয়ে শালিস বসানো হয়নি?

– হয়েছিল। ওরা তিন গোষ্ঠী এক হয়েছে আবার। শুনলাম কেইস করবে নাকি।

– ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেগুলো আজকাল অরাজকতা শুরু করেছে এলাকা জুড়ে। এরা এই বয়সেই সন্ত্রাসীদের মতো চলাফেরা করছে দেখছি।

বাড়ির রমণীরা নিশ্চুপ থেকে কথা শুনে চলেছে। সৌভিক আর বাবাই গতকাল ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে আলোচনা করছে। খাবার টেবিলে মাহাদের দেখা নেই। সে এখনও ঘুমে মগ্ন।

– লাবণ্য যাও, মাহাদকে ডেকে নিয়ে এসো।

মাহাদ ঘুমুঘুমু চোখে লাবণ্যকে দেখে চলেছে। আশ্চর্য, সকাল থেকে এই মেয়ে এমন করছে কেন? সকাল থেকে কথা বলেনি একবারের জন্যও। এখন আবার শব্দ করে কাজ করছে। যেন তার রাগ প্লেট বাটির উপর দেখাচ্ছে। মাহাদের আফসোস হচ্ছে বেচারা প্লেট, বাটিগুলোর জন্য। মুখ দিয়ে অস্পষ্ট স্বরে চুকচুক শব্দ করল।
_

অম্বরে ছেয়ে থাকা প্রগাঢ় নীলচে রঙ যেন প্রকৃতিতে শরৎ এর আগমনী বার্তা জানান দেয়। বর্ষা পেরিয়ে শরৎ এর আগমনে প্রকৃতি যেন ঘন কালো মেঘের পরিবর্তে নীলচে রঙের ছোঁয়া এঁকে মিলেমিশে একাকার। আকাশে শুভ্র মেঘমালা ঘনীভূত। সুবিশাল এক মাঠ। ঘন সরু সবুজ ঘাসে ভরা। বিশাল মাঠের প্রান্তর পেরিয়ে যত দূর চোখ যায় সব যেন সবুজে ঘেরা। খুঁটি গেঁথে গোরু ছেড়ে ঢালু প্রান্তে এক দল লোক আবাদে ব্যস্ত। পাখিদের কলরবে প্রকৃতি মুখরিত। এদের কিচিরমিচির শব্দ যেন জাগতিক সকল মোহ মায়া কাটিয়ে কল্পনার এক জগৎ এ বিভোর করাতে সক্ষম। সমীরণে নাম না জানা ফুলের সুবাস। সুবিস্তীর্ণ এই আকাশ যেন রহস্য ঘেরা। মনে হয় কোনো এক প্রান্তের আকাশ যেন জমিন ছুঁয়েছে। অথচ আকাশ ছুঁতে গিয়ে দেখা যায় সবটাই ধোঁয়াশা কেবল।
আভিরা বিশাল মাঠের এক কোণে হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে আনমনে খোদা তায়ালার অপরুপ সৃৃষ্টি দেখে চক্ষু শীতলে বিভোর। আভিরার গা ঘেঁষে এক মানব দেহ অবস্থানরত। নিজ রমণীর সৌন্দর্যতা যেন মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করে চলেছে সে। রমণীর সে খেয়াল নেই। সে তো আজ প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দর্শনে মজেছে।

চোখে বাঁধা কাপড় টেনে খুলতেই আভিরার মুখশ্রীতে অমাবস্যা তিথির ন্যায় আঁধার ভিড়ে। মুখ ফুলিয়ে উঠতে নিলেই দু হাতের বেষ্টনীতে অবরুদ্ধ করে নাওয়াজ। মেয়েটা আনত মুখশ্রী তুলে আড়চোখে চাইল সম্মুখে মুখে হাত চেপে হাসতে থাকা বাচ্চাগুলোর দিকে। দম ফাটা হাসিতে মেতেছে এক দল বাচ্চা ছেলেমেয়ে।

– এ আপু দেখলে তো, বলেছিলাম না আমাদের ধরতে পারবে না।

বলেই খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল। ফোকলা দাঁতের হাসিতে যেন শামিল হয় লাজে রাঙা রমণীও। তার পুরুষের মুগ্ধ দৃষ্টি নজরে আসতে মুখ লুকানোর প্রয়াস চালায়।

ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ে কানামাছি খেলছে। এক কোণায় আনমনে প্রকৃতি বিলাসে মত্ত থাকা রমণীকে নজরে আসতে খেলা স্থগিত রেখে ছুটে গেল সেই রমণীর কাছে।

– আপু তুমি আমাদের সাথে খেলবে চলো।

রমণীকে কিছু বলতে না দিয়ে তার হাত টেনে নিয়ে ঘিরে ধরল চারদিক থেকে। দক্ষ হাতে রমণীর চোখে কাপড় বাঁধতে অন্ধকার দেখল। লজ্জায় হাঁসফাঁস করতে লাগল আভিরা। টেনে খুলতে চাইল চোখে বেঁধে দেওয়া এক টুকরো কাপড়। সহসাই কারো হাতের ছোঁয়ায় জমে গেল মেয়েলি গড়ন।

– খুলবেন না। আমি আছি এইখানেই।

– মানুষ দেখবে। আমি এত বড়ো হয়ে এত মানুষের সামনে…

– আপনি আমি ছাড়া কেউ নেই এখানে। থাকলেও অগ্রাহ্য করুন সকলকে। এই বাচ্চাগুলোর উচ্ছ্বাসে শামিল হোন আঞ্জুম। বিশ্বাস করুন আপনার উচ্ছ্বাস আমি ছাড়া সকলে অদেখা করবে।

শাড়ি পরিহিত এক রমণী ছুটে চলেছে সবুজের বুকে। তার বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে যেন আজ প্রকৃতিও শামিল। কিছু কিছু মহিলা বাড়ির ভিতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখছে সেই রমণীর ছোটাছুটি। আবাদে ব্যস্ত পুরুষ লোক কাজ সেরে কবেই বাড়ির পথ ধরেছে। খোলা প্রান্তরে কেবল এক রমণীর পদাচরণ। লাজে আড়ষ্ট হয়ে থাকা রমণী যেন কদম ফেলছে বেশ ধীরস্থে। এই না কেউ এসে পড়ল এই ভয়ে আড়ষ্ট লতানো কায়া।

– আপু আমরা এইদিকে।

দু হাত মেলে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও যেন ব্যর্থকাম। এই বাচ্চাগুলো এত ধুরন্ধর। ছোটোছুটি করছে এদিক সেদিক। আভিরা কয়েক মিনিটে হাঁপিয়ে গিয়েছে। শাড়ির সাথে পা বেঁধে পড়তে নিলেই কারো বাহু আঁকড়ে ধরে। ভারসাম্য হারিয়ে সেই পুরুষকে নিয়েই পড়ল সবুজের সমারোহে।

_

– বৃষ্টি হওয়ার পর রৌদ্রজ্জ্বল স্বচ্ছ নীলাম্বর দেখতে যেমন লাগে তেমন লাগছে বলব, না কি শরৎ এর আকাশের পেঁজা তুলোর মেঘের ন্যায় লাগছে বলব?

নীল শাড়ি পরিহিতা রমণী লাজে আড়ষ্ট। ঘাসের বুকে বসে আছে আভিরা। তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে নাওয়াজ। আভিরার আঙুল নিয়ে খেলছে সে। আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে তীক্ষ্ণ বাণ ছুঁড়ে মারল রমণীর উদ্দেশ্যে। আভিরা জবাব দেয় না। নাওয়াজ এবার উঠে বসল। আভিরা হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে চুমু খেল।

আভিরার হাতে এক টুকরো সফেদ কাগজ। মেয়েটার শরীর কাঁপছে। কম্পনরত কায়া যেন নাওয়াজকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। হলদেটে সূর্য রক্তিম আভায় ছেয়ে লাল বর্ণ ধারণ করেছে। নাওয়াজ এক হাতে চিবুক ছুঁয়ে আভিরার মুখ উপরে তোলে। সারা মুখে নজর বুলিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। শুষে নিতে লাগল অর্ধাঙ্গীর ওষ্ঠের অমৃত সুধা! আভিরার ধ্যান ছুটে। হাতের কাগজটা হাত ফসকে পড়ে গেল। বাতাসের সাথে উড়ে কোথায় গেল জানা নেই নর নারী কারোরই।

– এই কাগজ, চিঠিগুলো আপনিই দিতেন তাই না?

আভিরার গলা কাঁপছে। নাওয়াজ মুখে কিছু বলে না। শুধু শব্দ করে চুমু খেল অর্ধাঙ্গীর নিম্নাষ্ঠে।

– আমি ছাড়া অন্য কেউ আমার নারীকে প্রেম নিবেদন করবে এমন দুঃসাহস কারো নেই আঞ্জুম।

আভিরার চোখ জ্বলে উঠল। প্রেমময় নজরে চাইল সম্মুখে থাকা পুরুষের পানে। তার ধারণাই সঠিক তবে। এই লোকই এতকাল যাবৎ তাকে আড়ালে চিঠি দিয়ে এসেছে।

– আপনাকে তো আমি কখনো দেখিনি। আমাদের বাড়িতেও আসা নিষেধ ছিল আপনার। তাহলে চিঠিগুলো আমি অবধি পৌঁছাতেন কীভাবে?

নাওয়াজ দুর্বোধ্য হাসে। ঠোঁটের কোণে হাসি বজায় রেখে বলল,
– বাড়িতে যাওয়া নিষেধ ছিল। আপনার এলাকায় নয়। আর আপনি অবধি চিঠি পৌঁছে দেওয়ার কথা আসলে সে কাজ আমার শ্যালক সাহেব করেছে।

– কী, তাযীম!

আভিরা উচ্চ শব্দে বলে উঠল।

– হ্যাঁ।

আভিরা চোখ বড়ো বড়ো করে চাইল। তার ভাই কিনা তার সামনে দিয়ে এসব করে বেড়িয়েছে আর সে ধরতে পারেনি। সে এত বোকা!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here