প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন #পর্বসংখ্যা_৮২

0
4

#প্রভঞ্জনে_প্রেমগুঞ্জন
#পর্বসংখ্যা_৮২
#ফাতেমা_আক্তার_মাইশা

রাতের মধ্যভাগ। হাঁটুতে মুখ গুঁজে বসে আছে শাড়ি পরিহিতা রমণী। গায়ের ভারী লেহেঙ্গা পাল্টে দেওয়া হয়েছে বহু আগেই। বাইরের হট্টগোলের শব্দ কানে আসছে স্পষ্টভাবেই। তবুও তার নড়চড় নেই। এই যে ছেলেটা এলো মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল না অবধি। ঠাঁয় বসে রইল।

– এভাবে বসে থাকতে অসুবিধা হচ্ছে নিশ্চয়। ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ো।

কথা মাত্র জ্যোতি পা গুটিয়ে শুয়ে পড়ে। বর্ণ হতভম্ব হয়ে তাকায়। এই মেয়ে দেখি বলা মাত্রই শুয়ে পড়েছে। কথা নেই, বার্তা নেই। তাকে একপ্রকার অগ্রাহ্য করে। বর্ণ কিয়ৎক্ষণ নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থেকে ফ্রেশ হতে গেল। তার ফ্রেশ হওয়া হয়নি এখন অবধি। গায়ের পাঞ্জাবি ঘামে ভিজে চিটচিটে হয়ে আছে। ফোঁটা ফোঁটা পানির কণা ভিজিয়ে দেয় দেহ। উত্তপ্ত মস্তিষ্কধারী বর্ণ পিঠ হেলিয়ে দেয় ঠান্ডা পানিতে। তার চওড়া বুক, পিঠ, প্রশস্ত কাঁধ ছুঁয়ে দেয় ঝিরিঝিরি পানির কণা। অনাকাঙ্ক্ষিত এক সম্পর্কে আচমকা জড়িয়ে বর্ণ বিমূঢ়। একজনের বিয়ে খেতে গিয়ে নিজেরই বিয়ে হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা যেন পুরোই অকাল্পনিক, অবান্তর ঠেকছে তার নিকট।

ঘুমন্ত জ্যোতির এক পাশ দৃশ্যমান আরশিতে। ঘন কেশে ঢাকা মেয়েলি বদন। মাথার নিচের বালিশ আরেকটু হলে গড়িয়ে পড়বে মেঝেতে। ভেজা চুল থেকে পানি পড়ছে টপটপিয়ে। বর্ণ এগিয়ে গিয়ে কিছুটা ঝুঁকে দাঁড়ায়। হাতে থাকা তোয়ালে দিয়ে খুব সাবধানে মুছে দিল চুল। এক হাতে ঠিক করে দেয় বালিশ। মেয়েটার ঘুম ভেঙে না যায়, তাকে এতটা কাছে দেখে আবার না উল্টা পাল্টা কিছু ভাবে। এই আশঙ্কায় ছিল।

রাতের প্রায় মধ্যভাগ। মাঝরাতে কারো ফুঁপানোর শব্দে ঘুম হালকা হয়ে এলো বর্ণের। ছেলেটা সেভাবেই পড়ে রইল। চোখ তুলে তাকাল না। কাঁদতে দিল মেয়েটাকে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘায়িত হলো রমণীর কান্না। সময়ে কান্নার শব্দ কেমন করুণ শোনায়। যেন কেউ প্রাণ ভিক্ষেয় অনুনয় করে চলেছে খোদার দরবারে।

_

কাছে, দূরের পরিচিত আত্মীয় পরিজন সকলেই সকাল হতেই উপস্থিত। আশেপাশের মানুষ ভিড় করেছে রাত থেকেই। যাকে দেখার অপেক্ষায় সকলে, তার দেখা নেই। অনেকেরই যেন মনঃক্ষুণ্ণ এতে! কেউ আবার অপেক্ষা করতে করতে বড্ড বিরক্ত।

রুম জুড়ে তাজা ফুলের সুবাস। দক্ষিণের জানালা মেলে দেওয়াতেই এমন সুঘ্রাণ ভেসে আসছে। জ্যোতি জানালায় মাথা ঠেকিয়ে উদাস চোখে আকাশ দেখছে। আকাশ কেমন মেঘলা, যেন তার মতোই বিষণ্ণ! একটু হলেই ঝরঝরিয়ে দুঃখের অশ্রু নামবে।

– ওখানে কী করছিস তুই?

জ্যোতি তার হরিণী চোখ মেলে চায়। মুখে তার ক্ষীণ হাসি। গতকাল রাতের সেই ঘটনার রেশ মাত্র নেই। তাকে দিব্যি স্বাভাবিক দেখাচ্ছে। জিদান অবাক হয় না বোনের স্বাভাবিকতায়। জ্যোতি নিজেকে সামলে নিতে পারে দ্রুত। দুঃখ আড়াল করতে জানে সহাস্যে।

– ফুল দেখছিলাম। ভাবি লাগিয়েছে?

– হু।

– ভাবি তো এখন এখানে থাকে না। নিশ্চয় আগের মতো যত্ন নেওয়া হয় না। ভাবছি বিকেলে পানি দিব গাছে। পানির অভাবে গাছগুলো কেমন নেতিয়ে পড়ছে। যত্নের অভাবে ফুলেরাও সৌন্দর্য হারায়, তাই না ভাইয়া?

– হু। তোর মতোই।

জ্যোতি শুনল না। এতটা ধীরে বললে শোনা যায় ঠিকঠাক? জিদানের কাছে জানতে চাইল,
– কিছু বললে?

– না। আয়, এখানে বোস।

জ্যোতি কিছুটা দূরত্ব রেখেই বসে। উদাস চোখে দেখতে লাগে পুরো কামরা। আজ থেকে এ ঘর তার। এই বাড়ি, এই বাড়ির মানুষেরা তার নিজের মানুষ। এটাই তার শেষ ঠিকানা।

– শাড়িতে সুন্দর লাগছে তোকে।

ভাইয়ের কথায় ভাবনাচ্যুত হয় জ্যোতির। চেয়েও চাইল না জিদানের পানে। বেখেয়ালে বলল,
– উনি দিয়েছেন।

– কে আব্দুল্লাহ?

জ্যোতি আমতা আমতা করে,
– না মানে, হ্যাঁ। তুমি আগে থেকেই জানতে সব‌?

– হ্যাঁ

– কীভাবে জানলে? কারো জানার কথা নয়।

– তোকে আর আব্দুল্লাহকে একদিন রিকশায় দেখেছিলাম আমি। তাছাড়া যখনই বাড়িতে যেত ওর নজর ঐ উপরের তলার বদ্ধ কামরার দিকেই থাকত সবসময়। আর বন্ধু হয়ে যদি বন্ধুর মনের খবর রাখতে না জানি তাহলে কেমন বন্ধু হলাম।

– আমাকে উনি ফিরিয়ে কেন দিলেন ভাইয়া?

– তোর ভালোর জন্য।

– আমি ওনার সাথে ভালো থাকতে চেয়েছিলাম।

– সবার সাথে আমাদের ভালো থাকা লেখা থাকে না। আমরা যা চাই তা পাওয়া হয় না কখনো। এটাই দুনিয়ার নিয়ম, উপরওয়ালার নিয়ম। খোদার নিয়মের কাছে আমরা মানুষেরা বরাবরই অসহায়। যার জন্য প্রতারকের খাতায় নাম লেখা থাকে হাজারও আব্দুল্লাহর। একদিন দেখবি তোর ভালো থাকা এখানেই লেখা ছিল।

– এত সব আব্বুর জন্য হয়েছে। আব্বু ওনার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে সবকিছু করেছেন। ভেবেছেন অর্থের লোভ দেখালেই ভালোবাসা বিক্রি করে দিবেন উনি। কিন্তু আব্বু জানে না সবাই ওনার মতো অর্থ লোভী না। সবাই অর্থের কাছে বিক্রি হয় না।

তখন ভর দুপুর। আব্দুল্লাহ কেবল দু লোকমা ভাত মুখে দিয়েছিল। তখনই টিনশেড বাসার সামনে বিশাল গাড়ি থামে। আশেপাশের মানুষ হইহই কলরব লাগিয়ে দেয় এমন বিশাল গাড়ি দেখে। উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগে এই বস্তি এলাকায় এরা কী এমন কাজে এসেছে। গাড়ির ভিতরে থাকা বিশালদেহী লোকগুলো যখন আব্দুল্লাহদের বাড়িতে প্রবেশ করছিল তখন যেন বিস্ময়ে হতবাক সকলে।

গরিবের ঘরে মিস্টার সারওয়ারের পদধূলিতে আব্দুল্লাহও বড্ড অবাক হয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়া যে আসেনি তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তবে বুঝে উঠতে পারেনি ওনার এই অনাহুত আগমন তার প্রাণ নেওয়ার জন্যে।

– আপনি হঠাৎ আমার বাড়িতে?

মিস্টার সারওয়ার পুরো রুমে নজর বুলিয়ে নেন। তার চোখে স্পষ্ট তাচ্ছিল্যের হাসি। আব্দুল্লাহ বুঝতে পারলেও প্রতিক্রিয়া দেখায় না তেমন। বরং খাবার ছেড়ে উঠে চেয়ার টেনে দেয় ভদ্রলোককে বসার জন্য। উনি বসতেই চেয়ারটা কেমন মটমট শব্দ করে উঠল। একটু খেয়াল করেই দেখতে পেলেন চেয়ারের একটা পায়া অর্ধ ভাঙা, প্যারেক খুলে রয়েছে। ভদ্রলোক সেখানেই বসে রইলেন। অপেক্ষমান আব্দুল্লাহর খাবার শেষ হওয়ার।

– আরে খাবার শেষ করো।

– খাওয়া শেষ আমার। আপনি বলুন।

মিস্টার সারওয়ার দুইটা বান্ডেল রাখে টেবিলে। আব্দুল্লাহকে ইশারায় দেখিয়ে বলল,
– এইটাতে কাজ হয়ে যাবে আশা করি।

– কত আছে?

– দশ লাখ।

– এত কম? দশ লাখে হবে না স্যার। আব্বার চিকিৎসা করালেই এ টাকা শেষ হয়ে যাবে। বোনদের বিয়েতে মোটা টাকা যৌতুক দিতে হবে। এমাউন্ট বাড়ান। নয়তো তাকে ছাড়ছি না। আমার চাকরিটাও খেয়েছেন আপনি।

মিস্টার সারওয়ার চোখ রাঙিয়ে তাকান। এসব ছোটোলোকদের স্বভাব তো এমনই হবে। সুযোগ পেলে এরা মাথায় উঠতে চায়। সারা জীবনে এত টাকা চোখে দেখেছে কিনা সন্দেহ। এখন টাকা দেখে নিজেকে সামলাতে পারছে না। নেহাত তার সম্মান জড়িয়ে। নয়তো এমন অশিক্ষিত, জাতে ছোটো কারো বাড়িতে পা রাখা তো দূর এদের থেকে শত হাত দূরত্ব বজায় রাখতেন।

– আমার কথায় ভালোই ভালোই সরে এলে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না। আর এখন যে টাকা দিচ্ছি আরও দশ বছর আরামসে বসে খেতে পারবে। সাত হাজার টাকার বেতনের চাকরির জন্য হাপিত্যেশ না করে টাকাটা ধরো।

আব্দুল্লাহ মোটা মোটা চারটে বান্ডেল হাতে নিয়ে অদ্ভুতভাবে হাসে। ফ্ল্যাশের তীর্যক আলো তার চোখ এড়ায়নি। তার আড়ালে তার ছবি তোলার কারণ, সেই ছবি কোথায় যাবে বুঝতে মোটেও অসুবিধা হচ্ছে না তার।

মোটা মোটা টাকার বান্ডেল হাতে ছবি তোলা অবধিই সীমাবদ্ধ ছিল। লাখ বিশেক টাকা ফেরত গিয়েছিল নিজ মালিকানায়। কিন্তু সে কথা সকলের অজানা।

– তুই জানিস কীভাবে?

– যেভাবে তুমি জানো।

জিদান নিঃশব্দে বসে রইল। ছবিটা দেখার পরেই সব বিশ্বাস ভেঙে যায় তার। খোঁজ নিয়েও কোনোকিছু জানতে পারেনি তৎক্ষণাৎ।‌ আক্রোশে ফুঁসে ওঠে। ঐ মুহূর্তে ইচ্ছে করছিল আব্দুল্লাহকে খুন করতে। পরক্ষণেই তার ভুল ভাঙে। আজ সকালেই জানতে পেরেছে সব। তার বাবার ম্যানেজারই তথ্য দাতা। ভদ্রলোক এমন অন্যায় দেখে নিশ্চুপ থাকতে পারেনি। সকলের অগোচরে সবটা জানায় জিদানকে। অর্থ প্রাচুর্যে অন্ধ হয়ে মিস্টার সারওয়ারের করা জঘন্য কাজের কথা জানতে পেরেও রাগ, ক্ষোভ কিছুই হয়নি জিদানের। অমন একটা নিকৃষ্ট ব্যক্তির জন্য তার ঘৃণ্য অনুভূতিও আসে না।

জিদান উঠে চলে যেতে নিলেই জ্যোতি মাথা নুইয়ে হাসে। কিছুটা কটাক্ষ করেই বলল,
– এড়িয়ে যাচ্ছ? সত্য থেকে?

– কিছু সত্যের মুখোমুখি হতে নেই, এড়িয়ে যাওয়ায় শ্রেয়। যেমন আব্দুল্লাহ পালিয়ে বেড়াচ্ছে বাস্তবতা থেকে।

জ্যোতি মাথা নামিয়ে হাসে। তার চোখ থেকে জল গড়ায়। ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু বিন্দু গাল বেয়ে পড়ে। সরু রেখা দৃশ্যমান হয় পেলব গালে। জিদান বের হওয়ার আগে আদেশ ছুঁড়ে,
– অন্যের সামনে নিজের দুর্বলতা দেখানোর শিক্ষা তোকে দেইনি আমি। চোখ মুছ, বুশরা আসছে। ওর সাথে নিচে যাবি। নিচে সকলে বর্ণের বউকে দেখার জন্য বসে আছে।

সকলের অপেক্ষার অবসান ঘটে কাঙ্ক্ষিত মানুষের পদার্পণে। কারো কারো চেহারায় অমাবস্যা নেমে এসেছে এমন অপরূপা সুন্দরী বধূয়া দেখে। কেউ আবার হিংসাত্মক চোখে দেখছে নব দম্পতিকে। এমন একটা মধ্যবিত্ত পরিবারে ধনীর দুলালি বউ হয়ে এসেছে দেখে নাক মুখ কুঁচকাচ্ছে। বলাবলি করছে, এই মেয়ে দুই দিনও সংসার করে খেতে পারবে না। না জানি কোন কারণে চাচাতো ভাইয়ের জন্য ঠিক করা মেয়েকে নিজে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। মেয়ে গিয়েছে এক বড়োলোক পরিবারে, এখন ছেলেও সেই পরিবারের মেয়েকেই বউ করে নিয়ে এসেছে।

_

প্রাণ গায়ে শাড়ি জড়িয়েছ? কেমন লাগছে দেখতে তোমাকে? নিশ্চয় আমার কল্পরাজ্যের অপ্সরা! তোমাকে শাড়িতে দেখার সাধ আমার বহু আগের। তুমি তো পরতে জানো না। তাই আর ঘটা করে নিজের ইচ্ছের কথা জানানো হয়নি তোমাকে। ইচ্ছে ছিল একেবারে বধূ বেশে যখন ঘরে তুলব তখন না হয় শাড়িতে দেখব তোমায়। কে জানত আমার সকল ইচ্ছের মতো তোমাকে লাল শাড়িতে দেখার ইচ্ছেও অপূর্ণ রয়ে যাবে। এমন হবে জানলে আমি এমন আকাঙ্ক্ষাই করতাম না।

এই শাড়িটার দাম কত হবে বলো তো? এমন কম দামি শাড়ি হয়তো তোমার বাড়ির চাকরেরাও পরে না। কম দামি বলাতে একেবারে সস্তা ভেবো না। তবে বিয়ের বেনারসি হিসেবে অনেকটাই নিম্নমানের। দামে কম হলেও এই শাড়ি আমার বড্ড শখের। শখের নারীর জন্য কেনা শখের শাড়ির সাথে দামের তুলনা করা অনুচিত।

তোমাকে বলা হয়নি আমার প্রথম ইনকামের টাকায় কেনা এ শাড়ি। আম্মার জন্যও নিয়েছি। আম্মা একটা নতুন শাড়ি গায়ে দেয় না আজ বহুদিন। শাড়ি হাতে নিয়ে আম্মার ফেলা ঐ সুখের অশ্রু আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি। মনে হচ্ছে জীবনে সব পাওয়া হয়ে গেছে কেবল তোমাকে ছাড়া। তুমি আমার এক জীবনে অপ্রাপ্তি হয়ে রয়ে গেলে!

এমন লাল টকটকে রঙ তো তোমার বড্ড অপছন্দ? আজ এই অপছন্দের রঙেই না হয় সাজালে নিজেকে। দেখবে যেই তাকাবে মুগ্ধতার নজরে দেখবে। কেবল একজোড়া চোখ বাদে সবার দৃষ্টিই আকৃষ্ট করবে তোমার জ্বালাময়ী রূপ!

চোখে গাঢ় করে কাজল দাও, মাঝ বরাবর সিঁথি তুলবে? মন্দ লাগবে না। তুমি সিঁথি তুলেই দেখো। হাত ভর্তি রঙ বেরঙের চুড়ি পরো মুঠো কয়েক। কান খালি রেখো না যেন। দেখো শাড়ির সাথে ম্যাচিং সব অর্নামেন্টস আছে। পছন্দ না হলে রেখো দাও, পরতে হবে না।

জ্যোতি একে একে সব অর্নামেন্টস দিয়ে সাজায় নিজেকে। অদূরে একটা প্যাকেট পড়ে রয়েছে। জ্যোতি হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নেয়। আলতা, আলতা নিয়ে তো কিছু লেখা নেই। তবে কী লিখতে ভুলে গেল। ভুলে গেল নাকি ইচ্ছে করেই লেখেনি, কে জানে? এ নিয়ে লেখা না হলেও দু পা আলতায় রাঙায় জ্যোতি। নাকে নথ পরে খুব যত্নে। নিজেকে আধো অর্ধ সাজিয়ে আরশির সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। আরশিতে প্রতিয়মান নারীর রূপে সে নিজেই বিমুগ্ধ! ঘুরেফিরে দেখতে লাগল। যেন ফুটন্ত লাল পদ্ম। খিলখিল হাসিতে মেতে উঠে রমণী। শাড়ির আঁচল টেনে ঘ্রাণ নেয়। কোনো এক পুরুষের নিজস্ব ঘ্রাণ শাড়ি জুড়ে।

রক্তাভ হাতের গাঢ় ছাপ পড়ে সফেদ কাগজে। জ্যোতি ভাঁজকৃত সফেদ কাগজ মেলে আলতো হাতে। গোটা গোটা কালো কালির মাঝে রক্তিম কৃষ্ণচূড়া বরণ।

এই বেলি ফুলের মালাটা কোথায় বাঁধবে বলো তো? আধ খোঁপা করে খোঁপায় গুঁজতে পারো চাইলে, নয়তো বা হাতে। আমায় তো প্রায় বলতে তোমার জন্য একটা মালা নিয়ে আসতে। কিন্তু আমি নিয়ে আসিনি কখনো। তোমার সকল চাওয়াতেই বড্ড অবহেলা ছিল আমার। ঠিকঠাক মূল্যায়ন করিনি বলেই বোধহয় আজ তুমি বহু দূরে। তুমি ঐ বিশাল আকাশের ন্যায়, আমার ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

গৌরাঙ্গ মুখের বরণ, কাজল কালো চোখ, দৃষ্টিতে মোহিত, স্নিগ্ধ হাসিই যেন বশীকরণ!

লাস্যময়ী? তোমার কৃষ্ণ চোখের সুগভীর দৃষ্টিতে আমি মরণাপন্ন!

সব সহ্য করা গেলেও ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করা যায় না। দুই দিন যখন পেটে দানাপানি পড়েনি তখন খুব করে বুঝে ছিলাম তোমাকে ভালো রাখতে পারব না আমি। তোমার মুখে তিন বেলা দু মুঠো ভাত তুলে দেওয়াটাও দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়াবে আমার জন্য। সেই থেকে আমি অসহায়ের মতো সব দেখে গেলাম। তোমাকে অন্যের হতেও দেখলাম অসহায়ের ন্যায়!

তুমি তো এখন অন্য কারো। তোমায় নিয়ে কিছু লেখা আমার সাধে? কখনোই তো কিছু প্রকাশ করিনি তোমার সামনে, আমার অনুভূতি, অনুরক্তি! শেষবারের মতোই অনুভূতি লিখলাম।

তোমার একদিন সুখের সংসার হবে প্রাণ। আমার অস্তিত্ব যত দ্রুত মুছতে পারবে ততই মঙ্গল, তোমার আমার সবার জন্য।

_

গায়ে তীব্র জ্বর। পুরুষালি শক্তপোক্ত সুঠাম দেহ কেমন জ্বরে কাঁপছে। গায়ে কেবল পাতলা কাঁথা। এতে শীত মানে? তার মাঝে ফুল স্পিডে ফ্যান ছাড়া। নিজেকে আঘাত করার কোনো মাধ্যমই ছাড়তে অনিচ্ছুক! যেন নিজের প্রাণ নাশে নিজেই মরিয়া সে!

আলো ভাইয়ের শিয়রে বসে। কপালে হাত রাখতেই বুঝল জ্বর কমার বদলে বাড়ছে মাত্রারিক্ত। কাল সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজেছে। সকালবেলা বন্ধুরা মিলে অচেতন আব্দুল্লাহকে বাড়িতে রেখে যায়। সেই থেকে এভাবেই পড়ে আছে। পুরুষ মানুষকে সামান্য জ্বরেই কী এমন কাবু করে? এই নির্জীবতা, রুগ্ন অবস্থা কী কেবলই জ্বরের কারণে? আলোর চোখে জল জমে ভাইয়ের এমন শোচনীয় দশা দেখে। টাকা ছাড়া এ দুনিয়ায় সত্যিকারের ভালোবাসাও এমন মূল্যহীন জানা ছিল না তার।

– তাকে ছাড়া যখন বেঁচে থাকায় দায় তাহলে অন্যের হতে দিলি কেন?

– যার জন্মই অন্য কারো জন্য, তাকে আমি আটকে রাখি কীভাবে? ভাগ্যের সাথে লড়াই করার সাধ্য যে আমার নেই।

– তাই বলে মেয়েটাকে এভাবে ফিরিয়ে দিবি। তোকে ভুল বুঝল অযথাই। ভালোবাসার মানুষের ঘৃণ্য দৃষ্টি সহ্য করতে পারবি?

জ্বরে পরাস্ত আব্দুল্লাহ শুষ্ক ঠোঁটে মলিন হাসে।

– সে আমার ভুল বুঝেনি আপা, ঘৃণা তো দূরের ব্যাপার!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here