মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [পর্ব-০২] #মেহুলিনা_প্রাপ্তি

0
2

#মনটা_তারই_সুরে_অনুরাগিনী [পর্ব-০২]
#মেহুলিনা_প্রাপ্তি

ভোরের আলো এখন ঠিকমতো ফোটেনি। চারপাশটা এক ধরনের ধূসর নীরবতায় ছেয়ে আছে।যেন সবকিছু এক বিধ্বস্ততার অপেক্ষায় অপেক্ষামান।
স্থান : রাজশাহীর গোমদাগাড়ী উপজেলার পাকড়ি ইউনিয়ন এলাকায় পদ্মা নদীর পাড় ঘেঁষে দাড়িয়ে থাকা একটি চরাঞ্চল,যার নাম ‘চর পাকড়ি’। এটি মূলত নদীর ধারের চর বা নিম্নভূমি এলাকা, যেখানে মৌসুমি চর তৈরি হয়েছে,এখানে অদূরে কিছু গ্রাম-ঘেঁষা বসতি চোখে পড়ছে। রাজশাহী শহর থেকে এখানের দূরত্ব আনুমানিক প্রায় ৪০–৫০ কিলোমিটার হবে।

কিছুক্ষণ আগেই পদ্মা নদীর পাড় ঘেঁষে চড় পাকড়ির চরাঞ্চলের দিকে একটি মালবাহী ট্রলার এসে থেমেছে।ট্রলারে করে সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বস্তার বস্তা ভারত থেকে অবৈধ‍্য মালামাল বাংলাদেশের সীমানায় ঢুকেছে ।
ট্রলালে করে আনা বস্তার গুলোর ভিতরে আছে,অবৈধ‍্য মাদক দ্রব‍্য ও নেশাজাতীয় দ্রব‍্য এবং হাজার ভরী চোরাই স্বর্ণ।

পনেরো-বিশ জন লোক তাড়াতাড়ি ট্রলার থেকে মাল নামিয়ে ট্রাকে তুলছে।হঠাৎ কাছে কোথাও শব্দ হতেই রবি নামের লোকটা থেমে গেল।রবি চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা একটু শক্ত করে চেপে ধরল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গুন্ডা গোছের একটা লোক নাম ‘তালেব আলী’।সে নিচু গলায় বলল,
“সতর্ক থাক,সামনে হারামী’র দলেরা থাকতে পারে।”

তালেবের কথায় রবি ভয়ে ঢুক গিলে চারপাশে সতর্ক দৃষ্টিতে আবার চোখ বুলিয়ে নিল।তারপর রবি আবার মাথা নাড়িয়ে কাঁধে ঝোলানো ব‍্যাগ গুলোকে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো একটা ট্রাকের দিকে । রবিকে অনুসরণ করে একই ভাবে আরও পনেরো-বিশ জন লোক ট্রলার থেকে বস্তাগুলো কাঁধে করে নামিয়ে, ট্রাকে তুলছে। সবার হাতেই একটা করে বন্দুক আছে।তাদের পিছনে ‘পদ্মা নদীর পাড় ঘেঁষে মালবাহী ট্রলারটা এখনো দাড়িয়ে আছে।

__

নিজের বিয়ে পড়ানো শেষ হতেই, মেজর ‘আহিয়ান অভ্র’ জরুরি ফোন কল পেয়ে বাসা থেকে রাজশাহী সেনানিবাসে চলে গিয়েছিল।তারপর তার স্প‍্যাশাল ফোর্স নিয়ে সে চড় পাকড়ি চরাঞ্চলে পৌঁছেছে।

মেজর ‘আহিয়ান অভ্র’ তার দল ‘ প্লাটুন A’ কে নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। কারও মুখে তেমন কথা নেই, শুধু চোখে তীক্ষ্ণ মনোযোগ। মাঝেমধ্যে তারা থেমে চারপাশ দেখছে, আবার মেজর ‘আহিয়ান অভ্রের’ দেওয়া সংকেত পেয়ে এগোচ্ছে। হঠাৎ করে দূরের দিকে দ্রুত কিছু আওয়াজ শোনা গেল। মেজর ‘আহিয়ান অভ্র’ সবাইকে দ্রুত নিচু হয়ে অবস্থান নিতে ইশারা করলো। বাতাসে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে আছে।কিছুক্ষণ পর আহিয়ানের দেওয়া নির্দেশ এলো আবার—
” অগ্রসর হতে হবে সবাইকে। ”

পদ্মার চর পাকড়ির বাতাসে এখন এক অদ্ভুত ভারী চাপ অনুভূতি ছড়িয়ে আছে। দূরে সূর্যটা ধীরে ধীরে উদয় হতে শুরু করেছে কেবল, কিন্তু তার আলো যেন আজ স্বাভাবিক উষ্ণতা ছড়াতে পারছে না।
মেজর ‘আহিয়ান অভ্র’ হাতের ইশারায় তার দলকে দুই ভাগে ভাগ করলো। একদলকে ডান দিকের ঝোপঝাড়ের আড়ালে এগোতে নির্দেশ দিল।অন্যদলকে বাঁ দিক ঘেঁষে সামনের দিকে এগোতে বলল।প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে ফেলছে তারা।
ক‍্যাপ্টেন ‘জাহিদ জায়ান’ আশে পাশে নজর বুলিয়ে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল,
“স্যার, সামনে ট্রাকটা দেখা যাচ্ছে।”

মেজর আহিয়ান অভ্র চোখ সংকুচিত করে দূরের দিকে তাকালো। তার চোখ এদের দিকে আগেই পরেছিল।আহিয়ান সতর্ক দৃষ্টিতে নদীর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাক, আর তার আশপাশে ব্যস্ত গুন্ডাগোছের লোকদের দেখে নিল।আহিয়ান তার দল ‘ প্লাটুন A ‘ এর মাত্র সাত জন সদস‍্যকে নিয়ে এসেছে এই অপারেশনে।তাই একটু সতর্ক হয়ে আহিয়ান সব দেখে নিল।

তালেব আলীর নেতৃত্বে থাকা গুন্ডা দলটি শেষ বস্তাগুলো ট্রাকে তুলতে ব্যস্ত। তারা তাড়াহুড়ো করছে।তালেব নিচু গলায় বলল,
“দ্রুত কর, বেশি সময় নেই। কেউ টের পেলে সব শেষ।”
রবি ঘাম মুছতে মুছতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার হাত কাঁপছে একটু বেশিই। সে ভয়ে বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে।

:

হঠাৎই, একটা পাখির ডাকের মতো সংকেত ভেসে এলো বাতাসে। মেজর আহিয়ান অভ্র সঙ্গে সঙ্গে হাত নামিয়ে দিলেন।হাতে ইশারা করলেন সবাইকে নিজেদের বিশেষ সাইনে।
পরের মুহূর্তেই চারদিক থেকে নীরবতা ভেঙে দ্রুত অগ্রসর হতে শুরু করল আহিয়ানের নেতৃত্বে থাকা প্লাটুন A দলটি। তাদের চলাচলের গতিতে ঝোপঝাড় নড়ে উঠতে লাগলো।পদ্মার চর তাদের পদধ্বনিতে যেন হঠাৎ জেগে উঠতে শুরু করলো।

তালেব প্রথমে কিছু বুঝে উঠার আগেই আহিয়ানের দল তাকে ঘিরে ফেলল । চারপাশে তাকিয়ে চোখ বুলাতেই তালেবের চোখে আতঙ্ক ফুটে উঠল।সে আতঙ্কিত গলায় চেঁচিয়ে বলল-
” বা*ন্দির ছেলেরা এসে পড়েছে রে ! ”
কিন্তু ততোক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে তাদের। ট্রাকের আশপাশের জায়গা ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা হয়েছে। তালেবের দলের কিছু লোক দৌড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু পথ আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।রবি ভয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। স্বভাব সুলভ সে একটু বেশিই ভীতু।তার চোখে ভয় আর অসহায়ত্ব একসাথে জমে আছে।

মেজর আহিয়ান অভ্র সামনে এগিয়ে এসে শান্ত অথচ কঠিন কণ্ঠে বললেন,
“ সবাই হাত ওপরে তুল। কোনো ভুল হলে পরিস্থিতি খারাপ হবে বলে দিলাম।সব কটাকে এখানেই গু*লি করে শুইয়ে দিয়ে যাব। ”
আহিয়ানের রাশভারী ধমকানিতে চারপাশে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এলো যেন।পদ্মার চর এখন আর আগের মতো নেই। সেই ভোরের নীরবতাটুকু এখন বদলে গিয়ে ভিন্ন রূপ নিয়েছে।আকাশটা এতোক্ষণে পুরোপুরি আলোকিত হয়ে উঠছে।নতুন দিনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতে যাচ্ছে এক নতুন অধ্যায় এর।

আহিয়ানের দলের বাকি সদস্যরা এদের ধরে বেঁধে নিজেদের গাড়িতে নিয়ে তুলল।আহিয়ান এবার ক‍্যাপ্টেন জায়ানকে বলল,
” ট্রাক সেনানিবাসে নেওয়ার ব‍্যবস্থা কর। স‍্যার ডেকেছেন আমাকে। উনার সাথে দেখা করতে যেতে হবে ।আমি চলে যাচ্ছি। ”

ক‍্যাপ্টেন জায়ান মেজর আহিয়াকে সম্মান প্রর্শন করে বিদায় জানোলো।আহিয়ান একটা জিপ গাড়িতে সবার আগে আগে রওনা হলো রাজশাহী সেনানিবাসে যাওয়ার জন‍্য।

____________

মাশরিফা সকালে উঠে আহিয়ানের ঘরে রোদেলাকে ডাকতে গিয়েছিল।কিন্তু দরজায় শব্দ করার আগেই তিনি দেখলন দরজা খোলা।মাশরিফা রোদেলাকে ডাক দিতেই রোদেলা নিজের গায়ে থাকা বিয়ের শাড়িটা কোনো রকম খুলে যাওয়া থেকে আটকিয়ে দরজা মেলে দিল।রোদেলা অভ‍্যাসবশত মাশরিফাকে দেখা মাত্র সালাম দিল,
” আসসালামু আলাইকুম ম‍্যাম। ”

মাশরিফা প্রথমেই সালাম নিয়ে রোদাকে পাশ কাটিয়ে রুমে ঢুকে পরলো।রোদেলা কাচুমুচু করে নিজের শাড়িটা সামলে তার নতুন শ্বশুড়ির পিছু পিছু আসতে লাগলো।মাশরিফা পুরো রুমটায় চোখ বুলিয়ে থেমে যেতেই,রোদেলা অসচেতনতায় শ্বাশুড়ির পিঠের সাথে ধাক্কা খেল।রোদেলার কপাল মাশরিফার পিঠে গিয়ে লেগেছে।

মাশরিফা উচ্চতায় ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি হবে।মহিলার গায়ের রং ধবধবে ফর্সা।দেখতে একদম আধুনিক গোছের মহিলা।চেহারায় তার সব সময় আত্মবিশ্বাসের ফুটে থাকে।গম্ভীরমুখী স্বভাবের হলেও তিনি শিক্ষার্থীদের বেশ স্নেহ করে।রোদেলার মনে হয় আহিয়ান তার মায়ের হুবহু ফটোকপি।এই লম্বা চওড়া মহিলার কাছে ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উচ্চতার রোদেলা একটা চুনোপুটিই বটে।
রোদেলা কপাল চেপে একটু দূরে সরে গিয়ে আস্তে করে বলল,
” সরি ম‍্যাম। আসলে….”

মাশরিফা আবারও রোদেলার ম‍্যাম সম্মোধনে বেশ বিরক্ত হলো।সে রোদেলাকে আর কথা বলতে না দিয়ে, হাতের ইশারাই থামিয়ে দিল।রোদেলার অর্ধেক খুলে যাওয়া শাড়ির দিকে তাকিয়ে তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন,
” ম‍্যাম ডাক শোনার জন‍্য নিশ্চয়,ঘটা করে তোমাকে আমার ছেলের বউ করিনি? এই বারই শেষ,এর পরে যেন ম‍্যাম ডাক না শুনি।হয় মম নয়তো মা ডাকতে পারো। ”

রোদেলা তার শাশুড়ির কথায় তড়িৎগতিতে মাথা তুলে তাকালো।মাশরিফার মায়া মাখা অথচ গম্ভীর মুখখানায় তাকিয়ে রোদেলা সমানে মাথা নাড়লো কেবল।মানে সে বুঝেছে।
মাশরিফা এবার রোদেলাকে উদ্দেশ‍্য করে বলল,
” আহিয়ান কাল এই ঘরে ফিরেনি ? ”

রোদালা আহিয়ানের নাম শুনে আবার মাথা তুলে তাকালো তার শাশুড়ির দিকে।রোদালের চোখে ভেসে উঠলো গতকালের ঘটনা। আহিয়ানের চোখের কঠিন হুমিকি মিশ্রিত চাহনি গুলো।বিয়ে করবে না বলে কি কি করেছিল সব একে একে ভেসে উঠলো রোদেলার চোখে।রোদেলা জড়তায় নিজের খোলা শাড়িটার একটা অংশ শক্ত করে মুঠো করে ধরলো।গতকাল আহিয়ানের সাথে বিয়ের রোদেলার বিয়ের পর তাদের আর সামনাসামনি দেখা হয়নি।রোদেলা এবার মাথা নিচু করেই দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
” উনি আসেনি মা ”

রোদেলার কথায়, মাশরিফার গম্ভীর মুখশ্রীটা সাথে সাথে চিন্তিত হয়ে পরলো। অথচ ‘ মা ‘ সম্মোধনটা শুনে কোথাও যেন তিনি খুব শান্তি পেল।মাশরিফা রোদেলাকে বলল,
” যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। আমি তোমার কাপড় লতিফাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। ”

রোদেলা মাশরিফার কথায় সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়তেই মাশরিফা বেরিয়ে গেল।তারপর তিনি লতিফাকে দিয়ে চার সেট নতুন থ্রিপিস আর একটা জলপায় রঙা শাড়ি পাঠালো উপরে।রোদেলা সবুজ রঙা একটা থ্রিপিস নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো গোসল করতে।

__

রোদেলাকে মাশরিফা গতকাল আহিয়ান বাসা থেকে চলে যাবার পর আহিয়ানের রুমে দিয়ে এসেছিল।ছেলে যে বাড়ি ছেড়ে সেনানিবাসে চলে গিয়েছে এটা সে সকালে জেনেছে।সে ভেবেছিল আহিয়ান হয়তো বাইরে গিয়েছে।

মাশরিফা অযথা বাড়ি মাথায় তুলবে দেখে মি. জাবির আহমেদ তাকে গতকাল কিছুই জানায় নি । মাশরিফা গতকাল ছেলের কথা জিজ্ঞেস করলে জাবির বলেছিল,
” তোমার ছেলে বাইরে গিয়েছে।চলে আসবে রাতেই চিন্তা করো না। ”
স্বামীর কথা মাশরিফা তখন বিশ্বাস করে নিয়েছিল।ভেবেছিল,হয়তো ছেলেটা তার উপর রাগ করে কোথাও গিয়েছে। আবার রাতে ফিরে আসবে।কিন্তু সকালে সত‍্যি কথাটা শোনার পর তার খুব খারাপ লাগছে ।তার ছেলে এভাবে হুট করেই তাকে না জানিয়ে ক‍্যাম্পে চলে যাবে, বিষয়টা সে ভাবতে পারেনি।এখন তার মনে হচ্ছে সে তার ছেলের সাথে এই বিয়েটা নিয়ে একটু বেশিই বাড়াবারি করে ফেলেছিল।ছেলেটাকে আর কয়টা দিন সময় দিলেই বোধহয় ভালো হতো।

____

রোদেলা লিভিং রুমে সবার সামনে মাথা নিচু করে চুপচাপ বসে আছে।তার সামনেই বসে আছে আহিয়ানের বড় দুই বোন আর আহিয়ানের নানি আফিয়া খানম।তাদের থেকে একটু দূরে বসে আছে আহিয়ানের দুই দুলাভাই।

আহিয়ানের বড় বোন অন্বেষা আহিয়ানের চেয়ে তিন বছরের বড়। তার এক মেয়ে এক ছেলে।ছেলের নাম আজনান চৌধুরী অন্ত। ছেলেটা ক্লাস ফাইভে পড়ে।মেয়েটার নাম অনন‍্যা চৌধুরী। মেয়েটার বয়স ছয় বছর।মেয়েটা ক্লাস ওয়ানে পড়ে।
অবন্তি আহিয়ানের চেয়ে এক বছরের বড়।অবন্তির এক ছেলে।বয়স তিন বছর।ছেলের নাম জাফীন আরশাদ
জয় ।

বাচ্চা তিনটাও তাদের নতুন মামীকে চোখ বড় বড় করে দেখছে।অন্বেষা আর অবন্তি মায়ের সাথে রাগ দেখাবে বলে আসলেও তাদের সেই সাহসে কুলায়নি।প্রথমত তাদের তিন ভাই-বোনের কেউই কখনও তাদের মায়ের মুখের উপর কথা বলেনি।তার উপর রোদেলাকে দেখে তাদের রাগ এমনিতেই গলে পানি হয়ে গিয়েছে।রোদেলার সুন্দর স্নিগ্ধ মুখশ্রীতে বিরাজমান মায়া তাদের অন্তরকে জুড়িয়ে দিয়েছে।মাশরিফা মেয়েটার পরিস্থিতির কথা সবাইকে বুঝিয়ে বলেছে।মাশরিফার মা আফিয়া খানম বেশ বুদ্ধিমতি মহিলা।তিনিও পরিস্থিতি বুঝে নাতনিদের সব বুঝিয়ে বলেছে । আফিয়ার নাত বউকে বেশ পছন্দ হয়েছে।আহিয়ানের বড় দুলাভাই আয়মান চৌধুরীও নিজের স্ত্রীকে বুঝিয়েছে।অবন্তির স্বামী
‘জুনাইদ আরশাদে’র তো ছোট শালার বউকে বেশ পছন্দ হয়েছে।সে বারবার তার বউকে বলে যাচ্ছে,
” তোমার ভাইয়ের ভাগ‍্য ভালো বুড়ো বয়সে এমন কচি সুন্দরী বউ পেয়েছে। আর তোমরা রেগে আছো? তোমার ভাইয়ের সাত কপালের ভাগ‍্য যে এমন বউ পেয়েছে। ”

আহিয়ানের বড় দুলাভাইও সম্মোতি জানিয়ে বলল,
” ভুল বলনি জুনাইদ। ”

____________

মেজর জেনারেল. রাফতান রশিদে’র অফিস কার্যালয়ের কক্ষে প্রবেশের সময় আহিয়ানের সাথে
মেজর ‘শায়ান শিবলী’র দেখা হয়।শিবলী ‘মেজর.আহিয়ান অভ্রকে’ দেখেই পাশ কাটিয়ে তীর্যক বিদ্রুপ মাখা হাসি ছুঁড়ে বেড়িয়ে যায়।আহিয়ান তা দেখেও না দেখার মতো মেজর জেনারেলের কক্ষে হাজির হয়।আহিয়ান প্রথমেই সম্মান প্রদর্শন কেরে সোজা হয়ে দাড়িয়ে থাকলো।আহিয়ানের মুখোভঙ্গি গম্ভীর,তার মুখ দেখে কিছু আন্দাজ করার উপায় নেই।আহিয়ান এবার রাশভারী আওয়াজে মুখ খুললো,
” আমাকে ডেকে পাঠিয়ে ছিলেন স‍্যার। কোনো জরুরি বিষয় কি? ”

মেজর জেনালেল. রাফতান রশিদ আহিয়ানের কথায় এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে মুখ খুললেন,
” আমি ভাবতে পারিনি তোমার মন মানসিকতা এতোটা নিচু।তুমি একটা কিশোরী মেয়েকে বিয়ে করে নিলে।বাল‍্যবিবাহ আইনত দন্ডনীয় অপরাধ। তুমি কি তা জানতে না?তবে কেন একজন আর্মির মেজর হয়েও এত বড় একটা অন‍্যায় করে বসলে?আমি তো আমার মেয়ে রামিশাকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চেয়ে ছিলাম আর তুমি তা প্রত‍্যাখ‍্যান করে একটা ছোট মেয়েকে বিয়ে করে নিলে।কি যোগ‍্যতা আছে ওর? রামিশা ওর চেয়ে তোমার জন‍্য হাজার গুণ উপযুক্ত ছিল। ”

আহিয়ান তার স‍্যার মেজর জেনালের কথায় মাথা নিচু করে নিল,
” সরি স‍্যার।ইট’স অল মাই ফল্ট।বাট আমাকে বাধ‍্য হয়েই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।আশা করি আপনি বিষয়টা বুঝতে পারবেন। তাছাড়া ল‍েফট‍েন‍্যান্ট রামিশা রশিদে’র সাথে আমার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ‍্যমে তাকে ছোট করা আমার উদ্দেশ‍্য ছিল না।আমি মূলত এসব বিয়ে নামক ঝামেলায় কখনো জড়াতেই চাইনি।তবে পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে,বিয়ে করতে বাধ‍্য হয়েছি।আশা করি কাজেরক্ষেত্রতে আমার পারসোনাল লাইফ টেনে আমার কর্তব‍্য আর নিষ্ঠাকে আঙুল তুলবেন না। ”

রাফতান রশিদ বরারই আহিয়ানকে বিশেষ স্নেহ করতেন তার কর্তব্যপরায়াণ আর নিষ্ঠা দেখে।আহিয়ানের মতো এরকম তীক্ষ্ণ কৌশলের অধীকারী আর্মি মেজররায় তো দেশের সার্বভৌমত্বেরর জন‍্য সবচেয়ে বড় আশির্বাদ।রাফতান চেয়েছিল আহিয়ানকে নিজের মেয়ের সাথে বিয়ে দিয়ে জামাতা বানাতে।তবে আহিয়ান বিয়ে নামক বিষয়টার উপর বিতৃষ্ণা থেকে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল।এখন আহিয়ানের বিয়ের খবর শুনে তিনি,এই কারণেই আরও বেশি এই চটেছে।

মেজর শায়ান শিবলী ,মেজর আহিয়ান অভ্রকে সব সময় নিজের প্রতিদ্বন্দি ভেবে এসেছে।তবে আহিয়ান সর্বদায় প্রমাণ করে এসেছে আহিয়ান তার চাইতে কয়েক ধাপ এগিয়ে।তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর কৌশলের কাছে শায়ান শিবলী যেন ছোট বাচ্চা।এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার রেশ এখন থেকে শুরু হয়নি,কলেজ সময় থেকে শুরু হয়েছিল।ভাবতেও অবাক লাগে এই দুজনের একসময় গলায় গলায় বন্ধুত্ব ছিল।তাছাড়া তাদের মধ‍্যে রক্তের সম্পর্ক বিদ‍্যমান। শায়ান শিবলী’র বাবা আহিয়ানের বাবার আপন বড় ভাই। এক সময়কার গলায় গলায় থাকা বন্ধুত্বটা বর্তমানে বিষে ভরা শত্রুতায় রূপ নিয়েছে।সেই সত্রুতার রেশ থেকেই শিবলী, মেজর জেনারেলের কানে আহিয়ানের বিয়ের খবরটি তুলে দিয়ে গিয়েছে।আর কেউ না জানুক কিভাবে যেন শিবলী আহিয়ানের সব খবর সবার আগে আগে জেনে যায়। আর তা দিয়ে আহিয়ানের অনিষ্ট করতে সবসময় তৎপর হয়ে থাকে।

মেজর জেনারেল এবার রাশভারী স্বরে রাগের পারদে ডুবে এক কঠিন বাণী আওড়ালেন,
” বাল‍্যবিবাহ করার অপরাধে তোমাকে চাকরি থেকে ছয় মাসের জন‍্য সাসপেন্ড করা হচ্ছে। ”

মেজর আহিয়ান অভ্র উক্ত কথাটি শোনার জন‍্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।তার আশা ছিল আর যায় হোক স‍্যার তার সাথে এমনটা করবেন না।অতিরিক্ত রাগে আহিয়ানের চোখ লাল বর্ণ ধারন করেছে।হাতের শিরা উপশিরা ফুলে ফেঁপে উঠে ডাবল আকার ধারন করেছে।আহিয়ান নিজের রাগ কন্ট্রল করতে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল তারপর কোনো দিকে না তাকিয়ে ধপধপ পায়ে বেরিয়ে গেল মেজর জেনারেল এর অফিস কার্যালয় থেকে।পিছনে রেখে গেল এক অবিশ্বাস্য চোখের দৃষ্টিকে।সেই সাথে রেখে গিয়েছে তৃপ্ত এক সত্তাকে।যে আহিয়ানের সাসপেন্ড হওয়ার খবর শুনে সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে।

আহিয়ান বাইরে বেরিয়ে নিজের জিপ গাড়িতে উঠে বসলো।পিছনে তার দলের সবাই কত ডাকাডাকি করলো তাও সে কানেও তুলল না। আহিয়ান তাড়াতাড়ি জিপ চালিয়ে রাজশাহী সেনানিবাস ত‍্যাগ করতে লাগলো।
আর সেই সাথে তার রাগের পারদ তরতর করে বাড়তে থাকলো বিয়ে করে রেখে আসা মেয়েটির উপর।

_________

আহিয়ান তার নিজের বাসায় ফিরবে না ফিরবে না বলেও রাত দুইটায় বাসায় ফিরলো ।তখন পুরো বাড়ির সবাই ঘুমে বিভোর।তার কাছে বাড়ির এক্সট্রা চাবি আছে।প্রায়শই এইভাবে রাত বিরাতে আহিয়ানের বাড়িতে ফিরা হয়ে থাকে।তাই সে নিজের সাথে,আগে থেকেই এক্সট্রা চাবি রাখে।আহিয়ান বাসায় ফিরে কাউকে না জাগিয়ে, সোজা উপরে উঠে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।আহিয়ান নিজের রুমের দরজার নব ঘুরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। আহিয়ান রুমে প্রবেশ করে অন্ধকারের মাঝে টেবিল ল‍্যাম্প থেকে আসা অল্প আলোতে দেখতে পায় কেউ তার বিছানাটা দখল করে কাচুমুচু হয়ে শুয়ে আছে। আহিয়ান দৃশ‍্যটি দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে নিল।তারপর অন্ধকার হাতরে সুইচ টিপে লাইট অন করতেই এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ‍্য তার চোখে পরলো।

রোদেলা জলপায় রঙা শাড়ি পরে ঘুমিয়ে আছে।মেয়েটার মুখশ্রীর উপর খুলে রাখা অবাধ‍্য চুলগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।শাড়ির আঁচল বুকের কাছ থেকে সরে আছে অনেকখানি।রোদেলার মসৃণ ফর্সা পেটের একটু অংশও বেরিয়ে আছে, যেটি আহিয়ানের চোখ এড়ালো না।মেয়েটা কেমন যেন গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে।আহিয়ানের আর সহ‍্য হলো না।বিয়ে হতে না হতেই,এই মেয়ে তার জীবনের সব কেড়ে নিতে লেগেছে যেন।আহিয়ান রাগে চোয়াল চেপে হাত মুষ্টি বদ্ধ করে মেয়েটার কাছে গিয়ে দাড়ালো।তারপর কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়ায় রোদেলার একহাত ধরে টান দিয়ে রোদেলাকে কাঁচা ঘুম থেকে বিছানায় বসিয়ে দিল।আকস্মিক আক্রমণে আর কাঁচা ঘুম হঠাৎ ভেঙে যাওয়াই রোদেলা ছটফট করে চিৎকার দিয়ে বলল,
” কে ? কে? ”
রোদেলার চোখে পানি চিকচিক করছে।দেখেই মনে হচ্ছে মেয়েটা এক্ষুনি কেঁদে দিবে।আহিয়ানের এসব আর সহ‍্য হলো না।সে রোদেলাকে এবার এক ঝটকায় বিছানা থেকে টান দিয়ে ফ্লোরে দাড় করিয়ে দিল।রোদেলা নিজেকে ধাতস্থ করে, জোরে শ্বাস টেনে নিল। তারপর রোদেলা আহিয়ানকে দেখে আরও ছিটকে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।রোদেলার চোখে চিকচিক করা পানিটা এখন শুভ্র কপোল বেয়ে গড়িয়ে পরছে।রোদেলা তার চিকন আঙুলে চোখের পানি মুছে আহিয়ানের দিকে তাকাতেই,আহিয়ানের রাগী লাল চোখ গুলো দেখে ভয়ে জমে গিয়ে মাথা নামিয়ে নিল।আহিয়ান বিষয়টা আড় চোখে দেখে নিয়ে রাশভারী আওয়াজে মুখ খুললো,
” এই মেয়ে, তুমি আমার রুমে কি করছিলে? আর আমার বেডে ঘুমিয়েছিলে কেন? ”

রোদেলা আহিয়ানকে ভীষণ ভয় পাচ্ছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।তাই আহিয়ানের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে লজ্জা,ভয় আর জড়তায় ফ্লোরে পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে ঘোঁষছে।রোদেলাকে নিজের প্রশ্নের উত্তর দিতে না দেখে আহিয়ান এবার আরও রেগে গেল।আহিয়ান দ্রুত পায়ে হেটে এসে খপ করে রোদেলার একটা হাত শক্ত করে ধরে নিল।তারপর গমগমে স্বরে বলল,
” বউ এর অধিকার খাটিয়ে আমার রুমে আসা হয়েছে বুঝি? এখন তোমার এইটুকু শরীরে, আমি যদি স্বামীর অধিকার খাটিয়ে দেখিয়ে দিই। তখন কি করবে মেয়ে ? ”

রোদেলা আহিয়ানের কথাগুলো আর নিতে পারছিল না।নিজেকে এতোটা অসম্মানিতে হতে হবে কখনও ভাবেনি সে।রোদেলার বুকে যেন ঝড় উঠেছে।রোদেলা সাহস করে আহিয়ানের হাতের মুঠোই রাখা নিজের হাতটা মুচড়িয়ে উঠতেই আহিয়ান কড়া চোখে চোখ রাঙিয়ে এক ঝারা মেরে রোদেলার হাতটা ছেড়ে দিল।তারপর রোদেলার কাছ থেকে কিছুটা দূরত্বে সরে গিয়ে বলল,
” যাও।এক্ষুনি বেড়িয়ে যাও এই রুম থেকে। আর কখনো আসবে না এখানে । ”

চলবে…..

( সবাই মতামত জানাবেন কেমন হয়েছে।সবাই রেসপন্স করবেন।🥰❤ )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here