#চোরাবালির_পিছুটানে (০৭)
#জেরিন_আক্তার
রাজ শক্ত গলায় বলে উঠে,
“বাবা আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করছি!”
রাশেদ চৌধুরী বলেন,
“রাজ তুমি জানো কেনো রাদিফ চলে গিয়েছে এখন এখানে আবার প্রশ্ন তুলছো কেনো? রাদিফ নিজের ইচ্ছায় চলে গিয়েছে।”
“না বাবা, তুমি ভুল বলছো রাদিফ নিজ ইচ্ছায় চলে যায়নি!”
রাশেদ চৌধুরী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে উঠেন,
“তাহলে কি বলতে চাইছো! আমি বের করে দিয়েছি রাদিফকে?”
উপরে থেকে রুবেল চৌধুরী নিচে নেমে এলেন। সিঁড়ির পাশে দাড়িয়ে দুজনের কথা শুনছেন। রুমানা চৌধুরী রাজকে বলেন,
“রাজ, রাহাকে পাওয়া যাচ্ছে না, আর তু্ই রাদিফকে নিয়ে কেনো পড়ে আছিস?”
এই শুনে রাজ চোখ বন্ধ করে ফোঁস করে নিঃশাস ছেড়ে বলে উঠে,
“ছোট আম্মু, এখন আমার কাছে রাহার থেকে রাদিফের বিষয়টা জানা বেশি ইম্পরট্যান্ট।”
রাশেদ চৌধুরী রাগ নিয়ে বলেন,
“রাজ তোমার মাথা ঠিক নেই। রাহাকে না পেয়ে রাদিফের ব্যাপারে কথা বলছো। আর রাদিফ কি কারণে চলে গিয়েছে তা আমি, তুমি, সবাই জানি। এটাকে এতো জটিল করছো কেনো?”
এই শুনে রাজের মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেলো। পাশে থেকে একটা ফুলদানি নিয়ে সোফার টি-টেবিলে আঘাত করলো। সাথে সাথে কাচের টি-টেবিলটা ভেঙে গেলো। সবাই রাজের এমন রাগ দেখে চমকে উঠলো।
রাজ গর্জে উঠে বলে,
“বাবা তুমি কথা ঘুরিও না। আমি না জেনে তোমাকে বেকার বেকার প্রশ্ন করিনি। তুমিই ছিলে রাজের চলে যাওয়ার কারণ। সবার সামনে আজ তোমাকে বলতেই হবে। আমি এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তোমাকে ছাড়বো না।”
রাশেদ চৌধুরী উঠে দাঁড়ালেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে থেকে স্পষ্ট গলায় বলেন,
“রাজ তুমি ভুলে যাচ্ছো তুমি কার সামনে দাড়িয়ে কথা বলছো! আমি তোমার বাবা হই। আর তুমি তোমার বাবার সাথে খারাপ ব্যাবহার করছো!”
রাজ সাথে সাথে বলে,
“হ্যা করছি! আমি আমার প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এমন খারাপ ব্যবহার করেই যাবো।”
এই শুনে রাশেদ চৌধুরী ক্ষেপে উঠেন। রাজের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“রাজ! তুমি নিজের মধ্যে নেই। রাহার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠছো। নিজের রুমে যাও!”
“আমি যাবো না! আমার প্রশ্নের উত্তর চাই। তাহলেই আমি এই উন্মাদ থেকে রেহাই পাবো।”
রাশেদ চৌধুরী সায়মা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“তোমার ছেলেকে বোঝাও ভালো করে, ও একটা ভুলভাল প্রশ্ন নিয়ে এমন রাগারাগি করতে পারে না।”
রাজ তার বাবার মুখোমুখি হয়ে বলে,
“বাবা, আমি তোমার সাথে কোনো রাগারাগি করতে চাইছি না। তুমি আমাকে সোজা-সাপ্টা সব বলে দাও! এরপরে আমি আর একটা প্রশ্নও করবো না।”
রাশেদ চৌধুরী এবার চরম পর্যায়ে রেগে গেলেন। ছেলের দিকে তাকিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বলে উঠেন,
“রাজ, তুমি ভুলে যেও না তুমি কার সামনে দাড়িয়ে উঁচু গলায় কথা বলছো! আমার ছোট ভাইও আমার সাথে এমন করে কথা বলেনি আজ পর্যন্ত। আর তুমি ছোট হয়ে কেনো এসব কথা বলছো?”
রাজও একই ভাবে উঁচু গলায় বলে উঠে,
“তোমার ভাই তোমার ব্যাপারে কোনো কিছু জানে না বলেই তোমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলেনি। সবাই শুধু রাদিফের দোষই দেখলো। কেউ সেই দোষটা নিয়ে কোনো কথা বললো না কেনো? কারণ তুমি কাউকে বলার সুযোগই দাওনি। নিজেই বাধ্য করেছো রাদিফকে চলে যেতে। এর সাথে সাথে রাদিফ আর মিষ্টির জীবন দুই দিকে। আর এই নিয়ে রাহাকে আমি দূরে সরিয়ে দিয়েছি। কত গুলো জীবন আলাদা আলাদা হয়ে গিয়েছে তোমার ধারণা আছে। এর সব কিছুর জন্য এখন তোমাকে দায়ী মনে হচ্ছে।”
কথাটা বলার সাথে সাথে রাশেদ চৌধুরী ধমকে উঠে বলেন,
“রাজ, আর একটা কথা বললে আমি ভুলে যাবো তুমি আমার ছেলে।”
রাজ সাথে সাথে বলে,
“কি করবে মারবে আমাকে? বাড়ি থেকে বের করে দিবে? নাকি রাদিফের মতো আমাকেও বাড়ি থেকে চলে যেতে হবে।”
কথাটা বলার সাথে সাথে রাশেদ চৌধুরী তির্যক গলায় বলে উঠেন,
“প্রয়োজন হলে আমি তাই করবো। তুমি ভেবেছো টা কি? তুমি একটা মনগড়া কথা বানিয়ে বলবে আর আমি সেটায় সম্মতি দিয়ে বলবো, রাদিফের চলে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। আমি যা করিনি সেটা নিয়ে কেনো সম্মতি জানাবো। আর বলবো যে, রাদিফের চলে যাওয়ার জন্য আমিই দায়ী। না, না, আমি যা করিনি সেটা আমি কেনোই বা সম্মতি জানাবো। আর এই নিয়ে যদি তুমি আর একটা কথা বাড়িয়েছো তাহলে আমি সত্যিই ভুলে যাবো যে আমি তোমার বাবা। আমি তোমাকে ত্যাজ্য পুত্র করতেও দুবার ভাববো না।”
এই শুনে রাজ চোয়ালে শক্ত করলো। কিছু বলতে নেওয়ার আগেই সায়মা চৌধুরী রাজকে টেনে সিঁড়ির কাছে নিয়ে গেলেন। রাজ যেতে যেতে রুবেল চৌধুরীর দিকে তাকালেন। এরপরে চলে গেলো সায়মা চৌধুরীর সাথে।
রাশেদ চৌধুরী তপ্ত শ্বাস ফেলে সোফায় বসলেন। রুবেল চৌধুরী তার দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীর স্বরে বলেন,
“ভাই, তোমাকে আমি কোনোদিন কোনো প্রশ্ন করিনি রাদিফের ব্যাপারে বা সংসার নিয়ে। আজ আমার একটা প্রশ্ন রয়ে গেলো তোমার কাছে।”
রাশেদ চৌধুরী তাকে বসতে বলেন। রুবেল চৌধুরী বসে বলেন,
“ভাই, রাজ যা বলে গেলো তার মধ্যে কি সব কথাগুলোই মূল্যহীন। এর মাঝে কি কোনো সত্য লুকিয়ে আছে?”
রাশেদ চৌধুরী ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থেকে নরম গলায় বলে উঠেন,
“তু্ইও কি আমার ছেলের মতো আমায় দোষারোপ করছিস?”
রুবেল চৌধুরী বলেন,
“দোষারোপ না, আমি তোমার কাছে জানতে চাইছি। এই নিয়ে যদি কোনো সত্য কিছু থেকে থাকে তাহলে তোমার রাজকে বা আমাদের সবাইকে বলে দেওয়া উচিত। কেনো না এতে কত গুলো জীবন। আর রাজ এইটা নিয়ে তোমার কাছে আবার আসবে। যদি রাজের কথাগুলো মূল্যহীন হয় তাহলে তুমি ওকে বোঝাও।”
__________________
জাপানে সময় রাত দশটা, রাহা বাড়িতে একা, শুধু মেইড আছে। আর তার ভাই গিয়েছে সাইমনকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে। রাদিফ রাহাকে যেতে বলেছিলো। কিন্তু রাহা যায়নি।
রাহা নিজের রুমে বসে ছিলো। হঠাৎ করে তার হাত দুটো, পেটের উপরে রেখে লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে বলে উঠে,
“আমি এখন কি করবো আল্লাহ আমায় বলে দাও। যে আমার সন্তানকে মারতে চেয়েছিলো আমি তার ভয়ে আজ এখানে এসেছি। এখন সে আমাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি এখন কি করবো? আমার কি ফিরে যাওয়া উচিত?”
রাহা নিজের মতো একা একা কথা বলতে বলতে ঘুমিয়ে পড়েছে।
এদিকে রাদিফ সাইমনকে নিয়ে বাড়িতে ফিরলো। সাইমন বাড়িতে ঢুকেই কেমন একটা উদাসীন চোখে আশেপাশে নজর বুলালো। রাহাকে খুঁজছে তার দুটো চোখ। সাইমন রাদিফের দিকে তাকিয়ে বলে,
“এই ভাই রাহা কোথায়? ওকে দেখতে পাচ্ছি না যে?”
রাদিফ হালকা হেসে বলে উঠে,
“হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে! শরীরটা দুর্বল তো!”
মেইডটি ভিতরে থেকে বেরিয়ে এলো। রাদিফ তাকে দেখে বলে,
“রাহা কোথায়? ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি?”
“জি স্যার, ঘুমিয়ে পড়েছে।”
এই শুনে রাদিফ সাইমনকে বলে,
“ঘুমিয়ে পড়েছে। এখন তু্ই রুমে যা। সকালে রাহার সাথে দেখা করিস!”
“ঠিক আছে!”
রাদিফ নিজের রুমে ঢোকার আগে রাহার রুমে ঢুকলো। বিছানায় তাকাতেই দেখলো রাহা ঘুমিয়ে আছে। রাদিফ এগিয়ে এসে রাহাকে একনজর দেখে লাইট নিভিয়ে চলে গেলো।
সাইমন নিজের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে এলো। রাদিফও নিচে ছিলো। এরপরে দুজনেই খেতে বসলো। মেইড খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। খাবার খাওয়ার মাঝে সাইমনের ফোনে কল এলো। সাইমন এক হাত দিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরলো। ওপাশে থেকে অস্থির কণ্ঠে কিছু কথা ভেসে এলো,
“স্যার, রাদিফ স্যার কোথায় উনাকে ফোনে পাচ্ছি না কেনো?”
সাইমন ফোনটা মিউট করে রাদিফকে বলে,
“এই ভাই তোর ফোন কোথায়?”
“চার্জে দিয়ে এসেছি! কেনো কি হয়েছে?”
“ইলাফ কল দিচ্ছে! তোকে চাচ্ছে!”
রাদিফ চমকানো গলায় বলে উঠে,
“কিহ, ও এখন কল দিচ্ছে কেনো? দে তো ফোনটা!”
সাইমন ফোনটা রাদিফের দিকে এগিয়ে দিলো। রাদিফ ফোন কানে নিয়ে বলে,
“হ্যালো, কি হয়েছে ইলাফ?”
“স্যার আপনার বাড়িতে রায়ান তার লোকজন নিয়ে যাচ্ছে। যেকোনো সময় এট্যাক করতে পারে।”
“হোয়াট! ও এখানে আসছে কেনো?”
“স্যার, ওরা আমাদের গোডাউনে ঢুকতে চেয়েছিলো। আমরা ঢুকতে দেইনি বলে আপনার বাড়িতে গিয়েছে।”
ফোন মিউট করে রাদিফ সাইমনকে বলে,
“সাইমন শোন, রায়ান নাকি আমাদের গোডাউনে গিয়েছিলো। ওরা নাকি ঢুকতে দেয়নি। এখন লোকজন নিয়ে আমাদের বাড়িতে আসছে। কি করবো এখন?”
সাইমন বলে,
“আসতে বল! দেখি কি করে?”
রাদিফ চিন্তিত গলায় বলে উঠে,
“বাড়িতে কিন্তু রাহা আছে।”
“রাহা ঘুমিয়ে আছে। আর চিন্তা করিস না, কিচ্ছু হবে না।”
রাদিফ ফোনে বলে,
“ইলাফ তুমিও চলে আসো। আর আমরা এখানেই আছি।”
“ওকে স্যার, আমি আসছি!”
রাদিফ ফোনটা রাদিফের দিকে এগিয়ে দিলো। সাইমন আর রাদিফ খাওয়া শেষ করে মেইডকে বলে আজকে চলে যেতে। মেইডও চলে যায়, আজ আর এই বাড়িতে থাকবে না সে।
রাদিফ আর সাইমন কারো অপেক্ষায় বসে রইলো ড্রইং রুমে। মিনিট বিশেক পরে কালো পোশাকধারী একজন লোক যার নাম রায়ান সে ও তার পেছনে দুজন কালো পোশাকধারী দেহরক্ষ্মী বাড়িতে প্রবেশ করে।
রাদিফ আর সাইমন দুজনেই দাঁড়ায়। রাদিফ এক অদ্ভুত হাসি দিয়ে বলে,
“আরে, রায়ান যে, আসুন আসুন। আপনার অপেক্ষায়ই ছিলাম!”
সামনে থাকা লোকটা অর্থাৎ রায়ান অবাক হয়ে বলে,
“তাহলে আগে থেকেই জানতি আমি আসবো!”
সাইমন হাত ইশারা করে তাকে সোফায় বসতে বলে। রায়ান বসে পড়লো রাদিফ আর সাইমনের মুখোমুখি। রাদিফ গম্ভীর গলায় বলে,
“গোডাউনে গিয়েছিলি কেনো?”
রায়ান বাঁকা হেসে বলে,
“তু্ই খুব ভালো করেই জানিস আমি কিসের জন্য তোর ওই গোডাউনে গিয়েছিলাম। দেখ, আমি তোকে সোজা ভাবেই বলে দিচ্ছি, আমরা একসাথে পার্টনার হয়ে বিজনেস করি। দেখবি তোরও লাভ এমনকি আমারও লাভ।”
রাদিফ সাইমনের দিকে তাকায়। সাইমন বলে,
“দেখ, যা সম্ভব নয়, সেটা নিয়ে কেনো পড়ে আছিস? তু্ই তোর বিজনেস নিয়ে পড়ে থাক আর আমাদের, আমাদের টা নিয়ে পড়ে থাকতে দে। আমরা একসাথে কাজ করতে পারবো না। আর তোকে আমাদের সাথে নিয়েছিলাম। কিন্তু তু্ই নিজের স্বার্থে চলে গিয়েছিস এখন আবার কেনো ফিরে আসতে চাইছিস?”
রায়ান উচ্চগলায় বলে উঠে,
“দেখ, তোরা একসাথে কাজ না করতে চাইলে আমি কি করতে পারি তোদের ধারণাও নেই।”
রাদিফও জোর গলায় বলে উঠে,
“কি করবি তু্ই? তোর কলিজায় এতই সাহস জেগেছে আমাদের কিছু করার। তু্ই কিন্তু ভুলে যাচ্ছিস তু্ই কার সামনে দাড়িয়ে কথা বলছিস? তোকে এখন মেরে ফেললেও একটা পাখিও টের পাবে না।”
রায়ান মুখে হাত দিয়ে বলে উঠে,
“আমি তো ভয় পেয়ে গেলাম। এখন আমি কোথায় লুকাবো!”
এই বলে রায়ান একটা পিস্তল বের করে। আর এই দেখে রাদিফ আর সাইমনও নিজেদের পিস্তল বের করলো। এর মাঝে ইলাফ এলো। ইলাফ এসে রাদিফ আর সাইমনের পেছনে দাঁড়ালো। রায়ান ইলাফকে দেখে হেসে বলে,
“ও এখন তো দেখি চামচাটাকেও আসতে বলেছিস? নিশ্চই ভয় পেয়েছিস!”
রাদিফ উঠে দাড়িয়ে নিজের রিভলবার তাক করে রায়ানের লোকেদের উপরে। এরপরে কোনো পূর্ব সংকেত না দিয়েই রাদিফ দুজনকেই গুলি করে। আর গর্জে উঠে বলে,
“মুখের ভাষা ঠিক কর! আর একটা কথা বাড়াবি তো তোকে শেষ করে দিবো। ভাড়া করা লোক নিয়ে এসে আমাদের হুমকি দিচ্ছিস? আর যেই পথ দিয়ে এসেছিস সেই পথ দিয়েই চলে যা।”
রায়ান সহ সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো রাদিফের এই কাজে। রায়ানও ভয় পেলো কিন্তু বুঝতে দিলো না। মনে মনে ভাবলো রাদিফ আর সাইমনের সাথে সে কোনো ভাবেই পেরে উঠবে না। রায়ান উঠে দাড়িয়ে কথায় খানিকটা জোর এনে বলে,
“রাদিফ, সাইমন দেখ, আমি ভুল করে তোদের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। এমনকি তোদের ক্ষতিও করতে চেয়েছি। কিন্তু তোদের সাথে পেরে উঠিনি। এখন আবার এক হতে চাইছি। তু্ই আমাকে সাথে নিয়ে কাজ কর, আমি আর অবাধ্য হবো না!”
রাদিফ বলে,
“না কোনো কাজ করতে চাই না। আর জীবনে করতেও চাইনা।”
রায়ান এগিয়ে আসে রাদিফের দিকে। এরপরে খানিকটা নরম হয়ে বলে,
“বেশ না করলি কাজ। তাহলে আয় আগের মতো বন্ধুত্ব করি?”
রাদিফ বাঁকা হাসে। সাথে সাইমনও।
__________________
পরদিন সকালে রাহা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। সাইমন নিচেই ছিলো। রাহাকে দেখা মাত্রই মুখে হাসি ফুটে উঠে। রাহার সামনে এসে বলে,
“রাহা কেমন আছো?”
রাহা হেসে বলে,
“ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?”
সাইমনের মুখে থেকে হাসিটা উড়ে গেলো রাহার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে। হাসার চেষ্টা করে বলে,
“ভালো আছি! এখানে এসে তোমার কেমন লাগছে?”
“ভালো লাগছে। তবে বাড়ির সবার জন্য মনটা খারাপ।”
“ওহ। চিন্তা করো না। মন খারাপ একসময় ভালো হয়ে যাবে।”
রাহা গিয়ে সোফায় বসলো। সাইমন দাড়িয়ে দাড়িয়ে রাহাকে দেখে যাচ্ছে। এর মাঝে রাদিফ নিচে নামতে নামতে সাইমনকে বলে,
“এই তু্ই রেডি হোসনি এখনও।”
সাইমন রাহার দিকে তাকিয়ে ঘোরে ছিলো। রাদিফের ডাকে ভাবনার ঘোর থেকে বেরিয়ে বলে উঠে,
“কো কোথায় যাবো?”
“তু্ই ভুলে গেলি? এখন আমাদের ডিলটা নিয়ে কথা বলতে যেতে…!”
রাদিফ থেমে যায় রাহাকে দেখে। আর কিছু বলে না। কথা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে,
“অফিসে যাবি না!”
রাহা দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। কেমন একটা সন্দেহ জাগছে দুজনের উপরে। ডিল আবার অফিস কি বলছে।
রাদিফ এগিয়ে এসে হেসে বলে,
“সাইমন যা রেডি হয়ে আয়। আমি ওয়েট করছি!”
সাইমন রাহার দিকে তাকিয়ে চলে যায়। রাদিফ রাহার পাশে বসে বলে,
“কিরে কখন উঠলি? আর নাস্তা করেছিস?”
“না নাস্তা করিনি!”
রাদিফ বলে,
“শোন, আমি আর রাদিফ কেউই বাড়িতে থাকবো না। মেইড আছে। যা যা লাগবে তু্ই শুধু বলবি!”
রাহা মাথা নাড়িয়ে বলে,
“ভাইয়া কোথায় যাবে তোমরা?”
“অফিসে যাবো। এরপরে আরও কিছু কাজ আছে!”
“আসবে কখন ভাইয়া?”
“একটু রাত তো হবেই!”
“ওহ।”
“শোন, বাড়িতে থেকে কোথাও যাবি না। বাড়ির মেইন গেইট বন্ধ করে রাখবি। যে কেউই আসুক না কেনো খুলবি না। আর আমি মেইড কে সব বলে গিয়েছি।”
রাহা মাথা দুলিয়ে বলে উঠে,
“ঠিক আছে ভাইয়া!”
সাইমন নিচে নেমে আসে। রাদিফ উঠে দাঁড়িয়ে রাহাকে বলে,
“দেখে থাকিস, আমরা আসছি!”
রাদিফ সাইমনকে নিয়ে চলে যায়। রাহা একটা বিষয় ভাবছে, তার ভাই যে অফিসে কাজ করে সেখানে তো ছয় ঘন্টা অফিস টাইম। তাহলে তো বিকেলের দিকে ফিরে আসবে। আর বললো রাতে ফিরবে। এতো কি কাজ!
রাহা ভাবতে ভাবতে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলো। মেইডটি হেসে বলে উঠেন,
“বসো, কিছু নাস্তা করো!”
রাহা বসে। খেতে খেতে মেইডকে প্রশ্ন করে,
“আপনি কি এখানে অনেক দিন ধরে আছেন?”
“হ্যা, আমি এখানে দুই বছর ধরে আছি। অনেক জায়গায় কাজের জন্য ঘুরেছি কোথাও কাজ পাচ্ছিলাম না। এরপরে তোমার ভাই আমাকে এখান কাজ দেয়। তোমার ভাই খুব ভালো একজন মানুষ। আমাকে সেই সময় কাজ না দিলে এখন আমার সন্তানদের নিয়ে এতো স্বচ্ছল ভাবে চলতে পারতাম না।”
রাহা মেইডের দিকে তাকিয়ে বলে,
“আন্টি আপনার হাসব্যান্ড! উনি কি করেন?”
মেইড মহিলাটি লম্বা একটা শ্বাস ছেড়ে বলেন,
“উনি মারা গিয়েছেন।”
রাহা সাথে সাথে বলে,
“সরি আন্টি আমি না জেনে আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেললাম।”
মেইড হেসে বলে,
“তুমি তো জানতে না।”
রাহা খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। এর মাঝে মেইডকে বলে,
“আচ্ছা আন্টি রাতে কি বাড়িতে কেউ এসেছিলো?”
“আমি তো রাতে আজকে ছিলাম না। স্যার চলে যেতে বলেছিলো। কেনো কিছু হয়েছিলো?”
“ঘুমের ঘোরে কারো উচ্চ শব্দে কথা শুনেছিলাম।”
মেইডটি হেসে বলে,
“ওহ। হয়তো স্যারের কোনো বন্ধু এসেছিলো।”
রাহা নাস্তা শেষ করে উপরে চলে আসে।
___________________
রাশেদ চৌধুরী ও রুবেল চৌধুরী সকালের খাবার খাচ্ছেন একসাথে বসে। দুজনের দুই পাশে সায়মা চৌধুরী আর রুমানা চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। রাশেদ চৌধুরী খাবার মুখে দিতে দিতে সায়মা চৌধুরীকে বলেন,
“তোমার ছেলে উঠেছে?”
“না, উঠেনি মনে হয়। উঠলে তো নিচে আসতো!”
রাশেদ চৌধুরী আর কোনো প্রশ্ন করলেন না। খাবার শেষ করে সোফায় বসলেন। সাথে রুবেল চৌধুরীও। এর কিছুক্ষণ পরে রাজ নিচে নেমে এলো। চোখ-মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই ছেলে এখনও চরম পর্যায়ে রেগে আছে। রাজ খাবার টেবিলে এসে বসে তার মাকে বলে,
“মা, খেতে দাও!”
সায়মা চৌধুরী ছেলেকে খাবার বেড়ে দিলেন। রাজ গম্ভীর হয়ে খাবার খাওয়া শেষ করলো। এরপরে যেই সিঁড়ির দিকে যাবে ঠিক তখনই রাশেদ চৌধুরী রাজের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন,
“রাজ, রেডি হয়ে এসো, আমরা বেরোবো!”
রাজ দাড়িয়ে যায়। এরপরে পেছনে ফিরে কড়া গলায় বলে উঠে,
“আমি কোথাও যেতে পারবো না তোমার সাথে!”
“কেনো যাবে না?”
“আমি আমার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এক পাও এগোবো না।”
“তুমি কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি করছো?”
“আমি একটুও বাড়াবাড়ি করছি না। বরং আমি ঠিকই করছি।”
এই শুনে রাশেদ চৌধুরী তেতে উঠেন,
“কি শুরু করেছো কি তুমি? তোমায় বলছি তো রাদিফ নিজে থেকে চলে গিয়েছে। সব জেনেও কেনো অবুঝের মতো আচরণ করছো?”
রাজও এগিয়ে এসে বলে,
“আমি অবুঝের মতো আচরণ করছি না। তুমি অবুঝের মতো আচরণ করছো। তুমি যদি কোনো কিছু না করেই থাকো তাহলে রাদিফ তোমাকে চব্বিশ ঘন্টার সময় দিলো কেনো বলো? আর তুমি সেই ভয়েই রাহাকে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছো।”
রাশেদ চৌধুরীর হাতের মুঠো শক্ত করে বলেন,
“রাজ তুমি যদি আরেকটা কথা বলো তাহলে আমি তোমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য হবো!”
এই শুনে রাজ হিতাহিত আরও রেগে গিয়ে বলে,
“থাকলাম না তোমার বাড়িতে তাই আমার কি হবে? কি ভেবেছো আমার যাওয়ার জায়গা নেই। প্রয়োজন হলে এই বাড়িতে থেকে চলে যাবো। আর কি ভেবেছো বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ভয়ে আমি চুপ থাকবো। না, আমি বারবার তোমাকে একই প্রশ্ন করে যাবো।”
রাশেদ চৌধুরী নিজের রাগ সামলাতে না পেরে বলে উঠেন,
“আমার প্রশ্নের উত্তর একই থাকবে। আমি রাদিফকে বাড়ি থেকে বের করে দেইনি। আর এতে যদি তোমার বাড়ি থেকে চলে যেতে ইচ্ছে করে তাহলে চলে যাও!”
রাজ ধুপধাপ পা ফেলে উপরে চলে গেলো। নিজের রুমে এসে কিছু জামাকাপড়, দরকারি জিনিসপত্র একটা লেদারে ভরে নেয়। এরপরে নিজের গাড়ির চাবিটা নিয়ে বের হয়ে যায়। সিঁড়ি দিয়ে এভাবে নামতে দেখে সায়মা চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে বলেন,
“তু্ই এগুলো নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? বাড়ি থেকে চলে যাসনা। তোর বাবা রাগের মাথায় বলেছে কথাগুলো।”
রাজ কোনো কথা বলে না। সোজা এসে তার বাবার সামনে দাড়িয়ে কঠিন গলায় বলে উঠে,
“আজ বুঝতে পারছো না। তবে একদিন বুঝতে পারবে। সেদিন বুঝতে পারবে তুমি কি করেছো। তোমার বাড়ি-ঘর নিয়ে তুমি থাকো। আমি আর তোমার এই বাড়িতে থাকবো না।”
এই বলে রাজ হন হন করে বেরিয়ে যায়। পথ আটকিয়ে দাঁড়ায় মিষ্টি। রাজ মিষ্টির সামনে দাড়িয়ে তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলে,
“দেখে থাকিস? কোনো কিছু হলে জানাবি!”
মিষ্টি কাঁদতে কাঁদতে বলে,
“ভাইয়া তুমি এই সময়ে বাড়িতে থেকে চলে যেও না। রাহা চলে গিয়েছে আর তুমিও আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছো!”
রাজ এক হাত দিয়ে মিষ্টির চোখের পানি মুছে দিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে উঠে,
“তু্ই চিন্তা করিস না, যদি এই বাড়িতে ফিরি তাহলে রাহাকে সাথে নিয়েই ফিরবো।”
এই বলে রাজ চলে যায়।
______________________
জাপানে রাত তখন নয়টা,,
রাদিফ ড্রাইভ করছে পাশে সাইমন বসে আছে। সাইমন রাদিফকে বলে,
“ভাই, তু্ই তোর বোনকে কিছু জানাসনি?”
রাদিফ হেয়ালি করে বলে,
“কি জানাবো?”
“আমরা অফিসের বাহিরে যে কাজগুলো করি সেগুলো জানাসনি?”
রাদিফ তড়িৎ চোখে তাকায় সাইমনের দিকে। এরপরে বাঁকা হেসে বলে,
“তোর মাথায় কি কিছুই নেই। কোনো ভাই কি তার বোনকে এসব সিক্রেট বিজনেসের কথা বলবে? আমি যদি রাহাকে বলি যে আমরা অফিসের বাহিরে অন্য কাজ করি তাহলে ও চিন্তা করবে না।”
সাইমন রাদিফের দিকে ঘুরে বলে,
“তোর বোন তো এখন এখানেই থাকবে। তাহলে আগেই বলে দে।”
রাদিফ বলে,
“দেখ, ও এখানে এসেছে একটা বিপদে পড়ে। ওকে এগুলো জানাতে চাই না।”
সাইমন কপাল কুঁচকে উঠে বলে,
“কিসের বিপদে পড়ে এসেছে?”
চলবে….
প্রিয়, পাঠকমহল,, এখন থেকে এই সময়েই গল্প পোস্ট হবে। এর আগে যদি কোথাও গল্প পেয়ে যান তাহলে মনে করবেন না সেটা আমার লেখা।
ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। কেউ বাজে মন্তব্য করবেন না। আর এই পার্টটা ভালো লাগলে বেশি বেশি রেসপন্স করবেন!!!!!!
[হেশট্যাগ ব্যবহার ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]

