শর্বরে_জোনাকি ❤️,পর্ব: ০৩

0
112

#শর্বরে_জোনাকি ❤️,পর্ব: ০৩
#ইফা_আমহৃদ

বুবুর মৃত্যুর ঠিক সাতদিন পর পাত্রপক্ষ দেখতে এলো। নাকোচ করলেও সম্মতি দিতে হল। বাবার ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে কর্মক্ষমতা লোপ পেয়েছে। নড়াচড়া করতে পারেন না। ব্রেন স্ট্রোক হলে বেঁচে থাকলেও সে মৃত ব্যক্তির ন্যায় স্থির দেহ। দ্বিগুণ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সারাদিনের কাজকর্মের পর বাবার যত্ন নেওয়া আরও দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও উপায় নেই।

সন্ধ্যায় দেখতে এলো। আমি ঘোমটা দিয়ে সামনে গেলাম। পাত্র-কে দেখা হলনা। যতটুকু সম্ভব বুঝলাম, তৌহিদ ভাইয়ের ছোট ভাই‌। আমাকে দেখেই শান্ত হয়নি, সাথে কাজি নিয়ে হাজির। পাত্র না দেখে বিয়ে, বেশ আশ্চর্যন্বিত হলাম। বুবুর পুরোনো একটা শাড়ি জড়িয়ে বিয়েতে বসলাম। ‘পুরোনো শাড়িতে নববধু’- কথাটা বেশ বেমানান। তবে এটাই সত্যি! কাজি সাহেব বিয়ে পড়ানোর সময় পাত্রের নাম বললেন, “স্নিগ্ধ।”
শুধু নামটাই মনে আছে। স্নিগ্ধ মুঠোফোনে কবুল বললেন। এই প্রথমবার কেউ কারো কণ্ঠ না শুনে, চোখের দেখা‌ না দেখে বিয়ে হল। তবে তার কণ্ঠস্বর ভারী মধুর। আমি তার কণ্ঠের মায়ায় জড়িয়ে গেলাম। বুবু-কে বলা তোর দেবরের বউ হবো, সেটা মিলে গেল।

বড়দের পা স্পর্শ করে ভবিষ্যতের জন্য দোয়া নিলাম। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। যারা তাদের কাঁটা তুলতে আমায় বিয়ে দিলেন, তারা কি মন থেকে আশির্বাদ করতে পারে?
বিয়েতে রাজি ছিলাম না, তাই প্রচুর নির্যাতন করেছে। পিঠে পোড়ার দাগ আছে। বাবার ওষুধ কিনতে খরচ বহন করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়, এটাই ছিল আমার প্রধান ব্যর্থতা। বাবার অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বিয়েতে রাজি করতে বাধ্য করলেন তাঁরা।

স্বামী ছাড়া ভাইয়ের সাথে রওনা হলাম শ্বশুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে জীবনের বাকি মানেটুকু পুরোপুরি নিঃশেষ হয়ে গেল।

জ্বর শরীর নিয়ে অবলোকন করতেই স্বপ্ন জগৎ হতে বাস্তবে ফিরল পিউ। গাল গড়িয়ে অশ্রুধারা পড়ছে তার। পুরোনো দিনের স্মৃতিগুলো তন্দ্রার মাঝের ছাড় দেন না তাকে। ভয়ংকর দিনগুলো সে কীভাবে ভুলবে।

পরীক্ষায় ফেল করা রেজাল্ট পেয়ে অসুস্থ বোধ করছিল সে। সামান্য একটু কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়া তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঠোঁটে ফুটল অপ্রত্যাশিত হাসি, তার বন্ধুমহল তার সামনে বসে আছি। মেঘলা পিউর কপালে হাত এপিঠ ওপিঠ করে ছুঁয়ে দিল। না জ্বর নেই, শুধু হালকা শরীর গরম। মেঘলা পিউয়ের জামা বের করল। বিছানায় রেখে কড়া গলায় বলল, “তাড়াতাড়ি যা, পাল্টে আয়। আজকে ঘুরতে যাবো।”

পিউ অসহায় কণ্ঠে বলে, “শরীরটা ভালো নেই, না গেলে হয়না?”

তূর্ণ তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “তোর মন ভালো করতেই যাচ্ছি আর তুই এইসব বলছিস। আশ্চর্য।”

পিউ-কে হন্তদন্ত হয়ে খুঁজছে তার চাচা চাচি। তাকে পেলেই আবার সেই নরকে আটকে রাখবে। তাই সে বের হতে চায়না। সে নিজেকে পুরোপুরি আড়াল করতে চায়। শরীরটা ততটা ক্লান্ত না থাকলেও তার অজুহাত দিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে বলে,
“দেখ, হসপিটালের কাজের চাপে আমার অবস্থা বেহাল। তার উপরে ভালোভাবে পড়তে হবে। আমি কোনো রিস্ক নিতে চাই না।”

“চুপ কর তুই, এখন আমাদের সাথে যাবি মানে যাবি। অর্থাৎ তুই যাবি।” মুন রাগান্বিত কণ্ঠে বলে।

পিউ শহরে থাকে এখন। দু’বছর অধিক সময় হয়েছে গ্ৰাম থেকে শহরে পাড়ি জমিয়েছে। ঢের পরিশ্রম করে রাতের আঁধারে পালিয়ে এসেছে সে। তার অসুস্থ বাবা গ্ৰামেই বসবাস করছেন। বাবার চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য প্রতিমাসে টাকা পাঠাতে হয় তাকে। একটা বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ করে খরচ মেটাতে হয়। কাজের পাশাপাশি একটা কলেজে ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে তার কলেজে শিক্ষকদের কোয়ার্টারে থাকে। তার দারিদ্রতার জন্য তাকে ছোট একটা ঘর দেওয়া হয়েছে। এই শহরে আসার পর পিউ আর কাউকে না পেলেও দু’জোড়া বন্ধু পেয়েছে। ‘মেঘলা,তূর্ণ, মুন, মিহুল’ – এই চারজন। এতেই সন্তুষ্ট সে।
স্বচ্ছতার আড়ালে ভেতরের যন্ত্রণাগুলো লুকিয়ে নিল পিউ। ব্যাকুলহৃদয় নিয়ে ঝাপসা গলায় বলে,
“কোথায় যাবি?”

উৎফুল্লিত হয়ে বলে, “কোথায় আবার, বাস্কেটবল খেলা দেখতে।”

ক্ষেপে গেল পিউ। তার নিশ্চল দেহটা থরথর করে কম্পনের জানান দিচ্ছে। নেত্রযুগল ভয়ংকর আঁকার ধারণ করেছে। বিমর্ষ কণ্ঠে বলে, “তাহলে আরও আগে যাবো না। আমি আমার জীবনে স্নিগ্ধ নামটাকে প্রচণ্ড ঘৃনা করি।”

মেঘলা বিচলিত কণ্ঠে বলে, “এভাবে বলিস্ না। তোর জীবনের এতবড় ক্ষতির জন্য স্নিগ্ধ নামের একজন দায়ী, তাই বলে সব স্নিগ্ধ এক নয়।”

মেঘলা-কে থামিয়ে পিউ ক্ষান্ত গলায় বলে, “আমি কোনো স্নিগ্ধ-কে দোষ দেই না, সব দোষ আমার নিজের। আমার ভাগ্যের। যেমনটা ছিল, তেমনটাই হয়েছে।”

মুন অসহায় কণ্ঠে বলে, “তুই ভুল বুঝছিস। আমরা জানি, তোর সাথে যেটা হয়েছে সেটা ঠিক নয়।
অনুশীলনের সময় স্নিগ্ধ পায়ে ব্যথা পেয়েছে। ও আজ খেলতে পারবে না। ডাক্তার নিষেধ করেছে। দূরে থাকবে। আমরা দূর থেকেই তাকে দেখব, প্লীজ চল..

পিউ প্রত্যুত্তরে কিছু বলে না। আলতো মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দেয়। সে চায় না, তার জন্য আরেকজনের কোনো রুপ খা’রাপ লাগুক। স্পৃহা না থাকার সত্বেও সে স্পৃহা প্রকাশ করল। একসময়ের প্রিয় খেলা এই বাস্কেটবল। মনের ভেতরে জমিয়ে রাখা সব অনুভূতি এখন ফিকে। সেদিন যদি বাস্কেটবল খেলা দেখতে না গিয়ে বোনের আশেপাশে থাকত, তাহলে আজ তার জীবনটা ভিন্ন রকমের হতো। এই বাস্কেটবল, অভিশাপ তার জীবনের।

আজ তেমন একটা ভিড় নেই। সিটগুলো ফাঁকাই ছিল প্রায়। অন্যতম সেরা খেলোয়াড় স্নিগ্ধ নেই যে। গতকাল অনুশীলনের সময় পায় মচকে গেছে স্নিগ্ধর। তাই কয়েকদিন খেলা থেকে পুরোপুরি বিরত থাকবে। খেলা তো সরাসরি টিভি চ্যানেলে দেখাই যায়, অনেকে খেলোয়াড়দের দেখতে আসে।

কোর্ট থেকে বাস্কেটবল মাথায় পড়তেই ভরকে গেল পিউ। মেঘলা কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে বসে ছিল সে। মাথায় হাত রেখে নিশ্চিত দৃষ্টিতে চারিদিকে অবলোকন করল। নেত্রযুগল ঝাপসা হয়ে আসছে তার। নিজের সাথে প্রাণপণ প্রয়াস করেও লাভ হলনা। অবশেষে জ্ঞান হারালো সে। ঢলে পড়ল পাশের সিটে বসা ছেলেটির কাঁধে। শরীরের তার জ্বর জ্বর ভাব। অনিহা থাকার সত্বেও বন্ধুদের আবদার উপেক্ষা করতে পারেনি বলেই তার বেহাল দশা। কোর্টের কিনারায় বসেছিল তারা। জ্ঞান হারানো নতুন কিছু নয়, এই নিয়ে সাতান্ন বার জ্ঞান হারিয়েছে। হুটহাট ভয়, চিন্তা, আতঙ্ক কিংবা সামান্য আঘাত পেলেই জ্ঞান হারায় পিউ।
ছেলেটি বেশ বিরক্তবোধ করলো। মাক্স, ক্যাপ দিয়ে ঢাকা মুখ নিয়ে উষ্ণতায় তার অবস্থা নাজেহাল। তবুও কোনোরকম সামলে নিয়ে আলতো গলায় ডাকল, “মিস্, এই যে মিস্। হ্যালো! কী হয়েছে?”

প্রত্যুত্তর এলো না। দর্শকেরা খেলা রেখে পিউ আর ছেলেটিকে দেখছে। বল পিউয়ের আশেপাশে থাকার ফলে সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ তাদের দিকে। ছেলেটা যেন একটু বেশি অস্বস্তিতে পড়লো বলে মনে হল। কপালের উপরে হাত রেখে নিজেকে আড়াল করতে ব্যস্ত হয়ে গেল। মিডিয়া থেকে দূরে থাকতে চাইছে।
মিহুল তীক্ষ্ণ গলায় বলে, “এজন্য ওকে আনতে চাইনি। এমনিতেই মেয়েটার শরীর ভালো নেই তার উপরে বল।”

মুন দ্বিগুণ তেজ নিয়ে বলে, “তুই রাজি হোস নি? আমরা কি জেনে শুনে ওকে ধরে এনেছি? আশ্চর্য! কাল থেকে মেয়েটার শরীর বা মন ভালো নেই, তাই এনেছি।”

ছেলেটা ওদের দিকে কোনোরুপ তাকালো না। পিউ-কে ছেড়েও যেতে পারছে না। উপায়হীন হয়ে কোলে তুলে নিল পিউ-কে। অতি সাবধানের সাথে দ্রুত পা চালিয়ে বেরিয়ে গেল সেখান থেকে। ওদের খেয়াল হতেই দ্রুত পিছু নিল।

বাইরে এলে দাঁড়াল। হাতের ইশারা করল ছেলেটি। তৎক্ষণাৎ একটা গাড়ি এসে তার সামনে দাঁড়াল। ড্রাইভার দ্রুত গাড়ি থেকে নামল। ছেলেটা-কে দরজা খুলে দিল। ছেলেটির পা গাড়ির ভেতরে রাখতে গিয়েও থেমে গেল সেকেন্ড খানেকের জন্য। পেছন থেকে পিউয়ের বন্ধুরা থামতে বলছে। ছেলেটি ঝুঁকে পিউ-কে গাড়িতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
হাঁপাতে হাঁপাতে মেঘলা বলে, “আপনি পিউ-কে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন?”
‘পিউ’ নামটা শুনে বেশ চমকালো ছেলেটি। তাঁর মুখের ভঙ্গিমা সাধারণ নেই। কপালে সরু ভাঁজ পড়েছে। অব্যক্ত স্বরে উচ্চারণ করে, “পিউ।”
মুখোশের আড়ালে ছেলেটির মুখে হাসির দেখা ফুটে উঠে। কণ্ঠস্বর শ্রবণ হলনা কারো। উত্তরের প্রতিক্ষায় চেয়ে আছে ছেলেটির পানে। কিয়ৎক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ছেলেটি সাধারণভাবে জবাব দেয়, “সামনে একটা হাসপাতাল আছে। আমরা সেখানে যাচ্ছি। আপনারাও চলুন।”

ছেলেটি প্রত্যুত্তরের আশায় না থেকে গাড়ির সামনের সিটে বসল। ড্রাইভারও উঠল। গাড়ি স্টার্ট দিল। বাকিরা একজন অন্যজনের মুখের দিকে চেয়ে আছে। দৃষ্টিশক্তি তারা কথা আদান-প্রদান করল। পিউয়ের জ্ঞান ফেরানোর জন্য হাসপাতালে যাওয়া জরুরি। উপায়হীন হয়ে দ্রুত গাড়িতে গিয়ে বসল।

গাড়ির চাকা চলমান হল। বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করে এসেছে তাঁরা। ছেলেটি তার মুখের মাক্স খুলে ফেলে। শার্ট দিয়ে হাওয়া করার চেষ্টা করল। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিল। পেছন থেকে আয়নাতে ছেলেটিকে দেখে চমকে গেল মেঘলা। আনন্দে আত্মহারা হওয়ার ফলে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে সে।

[চলবে.. ইন শা আল্লাহ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here