প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি #সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী #পর্ব_২৯

0
812

#প্রিয়_অর্ধাঙ্গীনি
#সুমাইয়া_সুলতানা_সুমী
#পর্ব_২৯
,
মানে?

মানে আবার কি আসলে ভাইয়া তুই না সবসময় জ*ঙ্গি, গুন্ডা এদের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে এখন সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করেছিস। আরে ভাই কালবাদে পরশো তোর বিয়ে এখন অন্তত এসব ভাবা বাদ দিয়ে নিজের বিয়ের কথা ভাব নয়ত দেখা যাবে বিয়ের দুইদিন পরেই তোর বউ পালিয়েছে। আর আমার কিছুই হয়নি তোকে তো বললামই আমি আমার একটা জিনিস হারিয়ে ফেলেছি তাই সেদিন ওমন ব্যাবহার করে ফেলেছিলাম। আর জিনিসটা তো প্রথমবার হিজলতলী তেই দেখেছিলাম এই জন্যই ওখানে গিয়ে ছিলাম খুঁজতে, কিন্তু পায়নি আমিই অনেক দেরি করে ফেলেছি। আমার যাওয়ার আগেই ওটা হারিয়ে গেছে তবে ওটা হারিয়ে যাওয়াই আমার আর এখন কোনো আফসোস নাই। কারণ জিনিসটা একজন সঠিক মানুষই পেয়েছে।

শেষের কথাগুলো রোদ্র শুকনো হেসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল। শাহানারা রোদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। সে যা ভেবেছিলো রোদ্র তা করেনি ভাই ভাইয়ের সাথে বিরোধীতা করেনি। আজকে তার ভিতরটা শান্ত হয়ে গেছে, নাহ সে তার সন্তানদের সঠিক শিক্ষা দিতে পেরেছে। রোদ্র কথা বলতে বলতে সমুদ্রের কাছে চলে আসলো। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল, দেখবি ভাইয়া তোর বিয়েতে আমিই সবচেয়ে বেশি আনন্দ করবো আমি অনেক খুশি হয়েছি। আরে এখনো কত কাজ বাকি জয় কোথায়? ওকেও কাজে লাগিয়ে দেবো আর মা দেখি কি কি লিস্ট বানিয়েছো।

কথাগুলো বলে রোদ্র শাহানারার দিকে যেতে গেলে পিছন থেকে সমুদ্র গম্ভীর কন্ঠে বলল। কথা ঘুরাছিস কেনো? আমার সাথে একদম মিথ্যা বলতে আসবি নাহ। সত্যি করে বল তুই হিজলতলী কেনো গিয়েছিলি? কথাটা বলে সমুদ্র একটা ঢোক গিলে আস্তে করে বলল, তুই কি শশী কে।

হ্যাঁ শশীর কাছেই তো প্রথমে জিগাস করতে চেয়েছিলাম কিন্তু পরে ভাবলাম ও চিনবে কিনা এই জন্যই তো কিছু না বলে চলে আসলাম৷ আসলে হয়েছে কি ভাইয়া আমি যেদিন প্রথম হিজলতলী তে যায় সেদিন একটা মেয়েকে দেখে ছিলাম। অঞ্চলা হরিণীর মতো ছুটে চলছিলো৷ যেনো রঙীন রঙ তুলি দিয়ে সদ্য আঁকা জীবন্ত ছবি। কথাটা বলতেই রোদ্র আনমনে সেদিনের প্রথম দেখা শশীর মুখটা ভাবতে লাগলো। অতঃপর নিজের ভাবনা থেকে ফিরে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখে সমুদ্র ভ্রু কুঁচকে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। তাই দেখে রোদ্র হেসে বলল, তারপর মেয়ে টাকে আমার পছন্দ হয়ে গেলো ভাবলাম তোর বিয়ের পরেই বিয়েটা সেরে ফেলবো। কিন্তু তুই তো বিয়ে করলি নাহ আর আমাকেও চলে যেতে হলো আমিও আর ওটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামালাম না। ভাবলাম দেশে ফিরেই একবারে বিয়েটা করে ফেলবো। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেলো যা হওয়ার সেটাই হলো মেয়েটার অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। এই হলো মোট কথা আর তুই কি না কি ভাবছিস।

তুই সত্যি বলছিস তো? আর মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়েছে বিয়ে হয়ে তো যায়নি। তুই চল আমার সাথে আমি ওই মেয়ের বাবার সাথে কথা বলবো আমার ভাই কোন দিক থেকে কম শুনি। এখনি চল আমিও দেখতে চাই মেয়ের বাবার কেমন ছেলে পছন্দ।

সমুদ্রের কথায় রোদ্র হেসে মনে মনে বলল, মেয়েটা কে জানলে তুই এই কথাগুলো কখনোই বলতে পারতি না ভাইয়া। তুই সয্য করতেও পারতি নাহ তার চেয়ে বরং তোর না জানায় থাক। কথাগুলো বলে সমুদ্র কে বলল, কি দরকার ভাইয়া আর তার চেয়েও বড় কথা মেয়েটা জানেই না যে আমি তাকে ভালোবাসি। তাহলে এখানে মেয়েটার কি দোষ, আর দেশে কি মেয়ের অভাব আছে নাকি। আচ্ছা এসব বাদ এখন সবকিছুর আয়োজন করতে হবে তো আমার ভাইয়ের বিয়ে বলে কথা।

রোদ্র কথাগুলো বলে শাহানারার দিকে চলে গেলো অতঃপর মায়ের সাথে আলোচনা করতে লাগলো কি কি করতে হবে। সমুদ্র দু হাত বুকের সাথে গুঁজে রোদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে। এতো সব কিছুর পরেও একটা কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। রোদ্র যদি মেয়েটাকেই খুঁজতে যাবে তাহলে শশীদের বাড়িতে গিয়ে ওরকম টা করার মানে কি। মেয়েটা আসলে কে?
,,,,,,,,,,,,
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে আযান ও বোধহয় হয়ে গেছে এই সময়টাতে পারভিন যদি দেখে শশী এভাবে বিছানায় শুয়ে আছে তাহলে বাড়ি মাথায় তুলবে। তবুও আজকে শশী শুয়ে আছে মা দেখলে যা খুশি বলুক গিয়ে। সকাল থেকে এটা ওটা করতে করতে শরীল আর চলছে নাহ। বিকেলের দিকেই অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে। বাড়ি ভর্তি মেহমান উঠানে ছোট ছোট বাচ্চারা চেঁচামেচি করছে দৌড়াদৌড়ি করছে। কারেন্ট চলে গেছে এই জন্য বাকিরা কেউ কেউ চেয়ার পেতে গল্প করছে আবার কেউ পিয়াজ রসুন কাটছে। কাজের বাড়িতে এই সময় কারেন্ট যাওয়াই সবাই বিরক্ত। তবে সবাই মিলে আলো আধাঁরিতে হারিকেন জ্বালিয়ে গল্প করতে করতে কাজ করছে এটাও উপভোগ করছে। কারেন্ট নেই এই জন্য গরমের মধ্যে কেউ রুমেও নেই সবাই বাইরে। নিজের রুম খালি পেয়ে শশী বিছানায় নিজের শরীলটা এলিয়ে দিয়েছে। হলুদ শাড়ির আঁচল টা বুক থেকে নামিয়ে পাশেই রেখে দিয়েছে। কারেন্ট না থাকায় ফ্যান ও চলছে নাহ আর শাড়ি পড়ায় গরম যেনো বেশি লাগছে এই জন্যই মূলত এটা করা। জ্বানালা দিয়ে হালকা ঠান্ডা বাতাস আসছে এতেই চোখে ঘুম নেমে এসেছে। কেবলি চোখটা বন্ধ করেছে ওমনি ফোনটা ভূঁ ভূঁ শব্দ করে বেজে উঠল। শশী বিরক্ত হয়ে যে কল দিয়েছে তাকে বেশ কয়েকটা গা*লি দিয়ে বসল। অতঃপর হাতড়ে ফোনটা সামনে এনে দেখলো স্কিনে সমুদ্রের নামটা জ্বল জ্বল করছে৷ যলদি উঠে বসে জিব্বাহতে কাঁমড় দিয়ে একটু আগের বকাটা ফিরিয়ে নিলো৷ ফোন রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর কন্ঠে সমুদ্র বলল।

সারাদিন কি করছিলে ফোন ধরোনি কেনো?

সমুদ্রের কথায় শশীর মনে পড়ে গেলো সকাল থেকে তার ফোনটা তার কাছে ছিলোই নাহ। ওর চাচাতো মামাতো ফুপাতো মিলে অনেক গুলা ভাইবোন এসেছে৷ প্রায় সবাই ওর থেকে বড় কেবল চাচাতো ভাইবোনদের মধ্যে থেকেই শশী বড়। সকালে যখন সমুদ্র কল দিয়েছিলো ও ফোনটা ধরতেই যাবে তখনি ওর ফুপাতো বোন লিমা এসে ফোনটা কেঁড়ে নিয়ে বলল।

বাবাহ এতো প্রেম কালকেই তো বউ নিয়ে চলে যাবে তাহলে আজকে এতো কিসের কথা শুনি। শুনেছিলাম আর্মিরা নাকি রোমান্টিক কম গম্ভীর হয় বেশি কিন্তু সমুদ্র তো দেখছি হেব্বি রোমান্টিক।

আপু ফোন দাও ওনি ভীষণ রেগে যাবে।

যাক রেগে কালকে তো বাসর রাত কালকেই না হয় আদর সোহাগ দিয়ে রাগ ভাঙ্গিয়ে দিবি।

লিমার কথা শুনে শশী লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে বলল, তুমি আমার থেকে বড় আবার সম্মানের দিক থেকেও ওনার চেয়ে বড় তাহলে এসব বলো কেনো।

এই শোন যার আগে বিয়ে হবে সেই বড় তাই আপাতত তুই বয়সে আমাদের ছোট হলেও যেহেতু আমাদের আগে তোর বিয়ে হচ্ছে এই জন্য তুই আমাদের সবার বড়। আর ফোন টা আমার কাছে থাকলো আগে সব অনুষ্ঠান শেষ হোক তারপর রাতে ফোন পাবি।

এরপর সারাদিনই ফোন আমার কাছে ছিলোই নাহ তাহলে ওনার সাথে কথা বলবো কি করে? কিন্তু এই কথাগুলো ওনাকে কে বোঝাবে। শশীর চুপ থাকা দেখে সমুদ্র ধমকে বলল, এখন চুপ করে আছো কেনো আমি কি ফোন দিয়েছি তোমার শ্বাস শোনার জন্য? শোনো যেহেতু ভুল করেছো তাই তোমার এখন শাস্তি পেতে হবে।

কিহ? সামান্য ফোন না ধরার জন্য এখন আমায় শাস্তি পেতে হবে?

হ্যাঁ হবে এখন কথা না বলে আমি যা বলছি শোনো, এখন থেকে ঠিক দুই ঘন্টা পর তোমাদের ক্লাবঘরের আগে যে বাগানটা আছে ওখানে আসবে।

এখন? এই রাতের বেলা?কিন্তু কেনো? আর মা বলেছে বিয়ের আগে বাইরে যেতে হয় না। হলুদের গন্ধে নাকি বউয়ের ঘাড়ে জ্বিন আসে। আর আপনি আমায় সোজা বাগানে যেতে বলছেন তাও এই বৃহস্পতিবার এর রাতে যদি আমার ঘাড়ে জ্বিন আসে তখন?

শশীর কথায় সমুদ্র দাঁতে দাঁত চেপে বলল আর যদি তুমি না আসো তাহলে আমি নিজ দায়িত্বে তোমাকে জ্বিনের বাড়িতে পাঠাবো। শোনো দুই ঘন্টার মধ্যে যদি তোমাকে ওখানে না পাই তাহলে সোজা তোমার বাড়িতে চলে যাবো আর তোমার আব্বাকে বলবো তুমি আমায় ফোন করে আসতে বলেছো। আমি নিষেধ করলে তুমি কান্নাকাটি করেছিলে এই জন্য আসছি৷

কথাটা বলেই সমুদ্র ফোন কেটে দিলো কান থেকে ফোন নামিয়ে শশী চিন্তায় হাতের নখ কাঁমড়াতে লাগলো। কি মুসিবত এখন এতো মানুষের মধ্যে বাগানে যাবো কীভাবে? আর লিমা আপুরা যদি একবার জানতে পারে তাহলে তো আমাকে লজ্জা দিবে। আবার না গেলেও ওনি বলেছে বাড়ি চলে আসবে, ওনি তো এক কথার মানুষ চলেও আসতে পারে। তখন তো বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে আরো লজ্জায় পড়তে হবে। এতো দেখি জলে কুমির ডাঙায় বাঘ কোনদিকে যাবো আমি?

এসব ভাবছে আর হাতের নখ কামড়াচ্ছে শশী তখনি জোনাকি ফোনের আলো নিয়ে ঘরে এসে বলল। এই আপা তুই এখানে শুয়ে শুয়ে কি করছিস নিচে চল লিমা আপারা তোকে ডাকছে।

শশী জোনাকির কথাশুনে নখ কামড়ানো বাদ দিয়ে ওর দিকে তাকালো। মাথায় একটা বুদ্ধি আসতেই জলদি করে কাপড়ের আঁচল টা বুকের উপর নিয়ে বিছানা থেকে নেমে জোনাকি কে বলল। শোননা তুই যদি আমাকে একটা কাজ করে দিস তাহলে তোকে আমার ফোনটা দেবো গেইম খেলার জন্য। আবার একশো টাকাও দেবো তুই কি নাকি কিনবি তখন আমার কাছে টাকা চাইলি। ওটা কিনিস সাথে চকলেট ও দেবো তুইতো আমার আপন বোন বল এখন তুই আমার দুঃখ না বুঝলে আর কে বুঝবে বল।

শশীর এমন পাম দেওয়া কথাশুনে জোনাকি সন্দেহের চোখে শশীর দিকে তাকালো। বিকেল বেলা ও শশীর কাছে একশো টাকা চেয়েছিলো খেলনা সাপ কেনার জন্য কালকে জয় আসলে ওকে ভয় দেখাবে তাই৷ কিন্তু শশী টাকা দেয়নি উল্টো মাকে বলে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাড়ায় দিছে আর এখন নিজেই সেধে টাকা দিতে চাইছে তাই জন্য জোনাকি অনেকটা সমুদ্রের মতো গলার স্বর গম্ভীর করে বলল।

কিন্তু কাজটা কি?
,,,,,,,,,,,,

জোনাকি ওর আব্বার বাটন ফোনটাতে আলো জ্বালিয়ে হাঁটছে আর শশীও পাশে ভয় ভয় নিয়ে হাঁটছে। এই আপা মা তো কইছিলো বিয়ের কথা হইলে আর হলুদ গায়ে লাগলে রাতে বার হতে হয় না জ্বিনে ধরে। তুইতো তাও হইলি ওহন যদি তোরে জ্বিনে ধরে তখন কি হবে?

এই তুই আমাকে সাবধান করছিস নাকি ভয় দেখাচ্ছিস কোনটা? আর সাবধানে আলোটা সামনে ফেল নয়ত হুঁচট খাবো তো। তাছাড়া আমার কি মনে করিস এই দেখ মাথায় হলুদ নিয়ে আসছি এখন আর কোনো চিন্তা নাই। তুই নিসনাই তাই জ্বিন আমারে রেখে তোরে ধরবে।

শশীর মুখে কথাটা শুনতেই জোনাকি থেমে গেলো তারপর ফোনের আলোটা সামনের দিকে ফেলতেই দেখলো লম্বা মতো সাদা সাদা কি একটা দূরে ওটা দেখতেই আলোটা শশীর মুখের দিকে ফেলে চোখ বড় বড় করে শশীর দিকে তাকালো। শশী জোনাকির তাকানো দেখে জোনাকিকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল।

আরে ওটাতো শহীদ কাকাদের আমগাছ অন্ধকারে ওমন দেখাচ্ছে তুই চল।

কিন্তু মলিতো কইছিলো শহীদ কাকার যে ছেলে পানিতে ডুবে মারা গিছিলো ওরে নাকি ওখানে কবর দিছিলো। আর রাতের বেলার নাকি ও ওদের বাড়িতে আইসা টিনের উপরে থাপ্পড় দেয়। মলি নাকি ওদের বাড়ি থেকেও শুনেছে।

জোনাকির কথাশুনে শশী ঢোক গিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, আরে ধুর ওরা তোকে ভয় দেখানোর জন্য বলছে ওসব কিছু নাহ চল আমরা যাই এখান থেকে ওই টুকু এক দৌড়ে চলে যাবো।

শশীর বিয়ের জন্য ছোট ছেলে মেয়েরা বাজি এনেছে ফাঁটানোর জন্য। হয়ত তারা ওটা ফাটাচ্ছে আগুন ধরিয়ে ছাড়তেই ফটাস করে শব্দ হয়ে উপরে উঠে গেলো৷ জোনাকি এমনিতেই ভয় পেয়ে ছিলো ওই শব্দ শুনতেই চমকে, ওরে বাবা ভূত। কথাটা বলেই দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে গেলো। শশী যেহেতু কাপড় পড়া ছিলো আবার জোনাকি আচমকা দৌড় দিবে ও ভাবিইনি তাই ভয় পেয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগল।

#চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here