কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৭.

0
429

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৭.

ক্যাফেটেরিয়ায় একটা গোল টেবিলে জড়োসরো হয়ে বসে আছে শার্লি। ওর সামনের চেয়ারে আয়েশে বসে আছে আরো দুটো ছেলে৷ এদেরকে চেনে ও। ফার্স্টইয়ারে এসে যাদের কাছে পরিচয় দিতে দিতে মুখে ফেনা উঠে যেতো, এরা সেই সিনিয়র ভাই। শান্ত আর টিটু। ঠিক পাশের টেবিলটায় পা ঠেকিয়ে, বুকে হাত গুজে দাড়ানো তাশদীদ। শান্ত ওর কলেজের বন্ধু। আর টিটুর সাথে পরিচয় ঢাবিতে আসার পর। আগেরদিন শার্লি যে বইটা নিয়ে রেখেছে, সে বইটা নেবার ওদেরকে সাথে করে এসেছে তাশদীদ। শার্লি টেবিলে থাকা বইটার দিকে অসহায়ভাবে তাকালো। তারপর মনেমনে নিজেই নিজেকে গালি দিলো। ওর মোটা মাথায় যদি আগেরদিন ঢুকতো, এই বই অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের না, মাস্টার্স পড়ুয়াদের বই, তাহলে ও কখনো তাশদীদকে পাকড়াও করতো না। ভুল করেও তাশদীদকে বলতো না, আরো দুটো বন্ধুসমেত দেখা করে বই নিয়ে যেতে। তাশদীদ মিটমিটিয়ে হাসছে। ছেলেদের মতো বেশভুষার মেয়েটার ভীতুভীতু মুখটা দেখার মতো। শার্লি শুকনো ঢোক গিললো। হাত বাড়ালো টেবিলের ওপরের ওর ফোনটার দিকে। টিটু ছোঁ মেরে ওর ফোনটা সরিয়ে নিলো। আর শান্ত কফির মগ এগিয়ে দিয়ে বললো,

– আপু কি জুনিয়রদের সামনে স্ট্রেসড ফিল করছেন? কফি খান। ইউ’ল ফিল বেটার।

আবারো ঢোক গিললো শার্লি। এই মুহুর্তে ওর তাথৈকে খুব মনে পরছে। রুমন তাথৈ একটাও এখনো ভার্সিটিতে আসেনি। ও হলে থাকে বলে আগেআগেই চলে এসেছে ক্যাম্পাসে। ক্যাফেতে বসে ছিলো। হঠাৎ করেই শান্ত আর টিটু এসে ওর সামনে বসে যায়৷ ওদের সাথে তাদশদীদকে দেখে শার্লির বুঝতে বাকি রইলো না, ওরা জুনিয়র না, সিনিয়র হিসেবে ওর সাথে দেখা করতে এসেছে। রুমন কাধের কাপড়ের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে ক্যাফেতে ঢুকলো। সেইসাথে গুনগুনিয়ে গানও গাইছে, ‘বাতাসে গুনগুন…এসেছে ফাগুন…’ আচমকা একটা সার্ভবয়ের সাথে ধাক্কা লাগে ওর। ছেলেটার হাতে খালি প্লেট ছিলো কিছু। ‘সরি ভাই’ বলে ছেলেটা রুমনকে পাশ কাটায়। রুমন পেছন থেকেই ছেলেটাকে দেখতে দেখতে, কানের পেছনের চুলে আঙুল ঠেলে গাইলো, ‘বুঝিনি তোমার…শুধু ছোঁয়ায়, এতো যে…’

– আগুন!

উচ্চআওয়াজে কেবল আগুন শব্দটা শুনে সবাই রুমনের দিকে তাকালো। আর ওর দৃষ্টি তাশদীদের দিকে। কালো প্যান্ট, ইন করা হালকা নীল শার্ট, গুটানো বড় হাতা, টেবিলে ঠেস দিয়ে বসা তাশদীদকে নজরে পড়তেই আগুন শব্দটা জোরেই বেরিয়ে গেছে ওর মুখ দিয়ে। রুমন কারো চাওনিকে গুরুত্ব দিলো না। দেখলো, শার্লির সাথে দুজন ছেলে বসা। ওদের দেখেই খুশি হয়ে গেলো রুমন। শার্লি ইশারায় দাঁত কিড়মিড়িয়ে বুঝাচ্ছে, ‘আসিস না, আসিস না!’ কে শোনে কার কথা! রুমন এগিয়ে এসে ব্যাগটা টেবিলে রাখলো। শার্লির চেয়ার কনুই ঠেকিয়ে, দাড়িয়ে শান্ত আর টিটুর উদ্দেশ্যে বললো,

– কি? তোমরাও জুনিয়র?

– জ্বী ভাইয়া। আমি শান্ত, আর ও টিটু।

অতি মাসুম একটা হাসি দিয়ে বললো শান্ত। ওদের নাম শুনে চেয়ার থেকে কনুই ফসকে যায় রুমনের। এই নামের সিনিয়দের নিয়ে শার্লি নিয়ম করে বদনাম গায়। রোবটের মতো শার্লির দিকে তাকালো ও। শার্লি নির্বাক হয়ে বসে। টিটু উঠে দাড়িয়ে শার্ট টেনে ঠিক করলো। আর শান্ত শার্লির ফোনটা এগিয়ে দিয়ে বললো,

– কাইন্ডলি ফোনের লকটা খুলেন আপু। আপনার আইডি থেকে একটা ছোট্টখাট্টো পোস্ট দিবো।

শার্লি বিস্ফোরিত চোখে চাইলো। শান্ত একপলক তাশদীদের দিকে তাকালো। শার্লির ভীতগ্রস্ত চেহারা দেখে দুজনেই নিশব্দে হাসছে। শার্লি বললো,

– ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া। আ্ আর এমন হবেনা।

– ভুল যখন করেছেন, মাশুল দিন আপু। আর হবে কি হবেনা সেটা নিয়ে কথা হচ্ছে না এখানে।

– ভাইয়া প্লিজ, আমি…

– লক খুলুন! নইলে আমি আরো ভয়াবহ স্টেপ নেবো!

শান্তশিষ্ট ভঙ্গিতে বললো শান্ত। আর কিছু বলার সাহস হলো না শার্লির। রুমন বুঝলো, পরিস্থিতি সামাল দিতে তাথৈকে কল করা প্রয়োজন। বিরবিরিয়ে কাধে ঝোলানো কাপড়ের ব্যাগটায় হাত ঢুকাতে যাচ্ছিলো ও। কিন্তু খপ করে ওর হাত ধরে ফেলে টিটু। হাত মুড়িয়ে ওরই পিঠে ঠেকাতেই, ‘আহ!’ আওয়াজ করে ওঠে রুমন। টিটু পুরাই বোকাবনে। রুমনের মুখনিঃসৃত এই আহ আওয়াজটা মোটেও ব্যথাতুর আওয়াজ ছিলো না। তৎক্ষণাৎ রুমনের হাত ছেড়ে দিয়ে দুপা সরে দাড়ালো ও। শান্তকে বললো,

– এটা কি জিনিস?

শান্ত নিজের কপাল চেপে ধরে চেহারা আড়াল করলো। শার্লিকে ভয় দেখাতে এসে ওদের নিজেদেরই নাকমুখ ডুবছে। শার্লি লক খুলে ফোনটা আবারো শান্তর দিকে বাড়িয়ে দিলো। এতোক্ষন চুপ থাকলেও তাশদীদ সোজা হয়ে দাড়ালো এবারে। এগিয়ে গিয়ে শার্লিকে থামিয়ে বললো,

– হয়েছে। ফোন দিতে হবেনা আর।

শার্লি অবাক চোখে চাইলো। তাশদীদ চমৎকার একটা হাসি দিয়ে বললো,

– কোনো পোস্টটোস্ট দেবে না ও। জাস্ট ভয় দেখানোর চেষ্টা করছিলো। বাই দা ওয়ে, তোমাকে দেখে তো অনেক সাহসী মনে হয়। আমি সত্যিই গতদিন তোমার কথায় আর এটিচিউডে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তাহলে আজ তুমি এটুকোতেই ভয় পেয়ে গেলে কেনো?

পাশের চেয়ারে বসে কফিতে চুমুক দিলো তাশদীদ। শার্লি চেয়ে দেখে শান্ত উঠে একদম দরজার কাছে চলে গেছে। টিটুর সাথে দাড়িয়ে কফি খেতে খেতে কথা বলছে। তাশদীদ টেবিলের বইটা নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললো,

– এনিওয়েজ! আই সাজেস্ট, সাহসটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দেখানোর জন্য তুলে রাখো। জুনিয়রকে বদার করে, শুরুতেই ভয় দেখিয়ে মুষড়ে দেওয়ার কাজে না। বিশ্ববিদ্যালয় অনেকের অনেক সাধনার জায়গা। প্রতিটা স্টুডেন্ট হাজারো স্বপ্ন নিয়ে এ আঙিনায় পা রাখে। সো ওদেরকে সযত্নে স্বাগত জানাতে শেখো। র‍্যাগিংয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে না। হুম?

বলা শেষ হতে না হতেই একটা সার্ভবয় তাশদীদের পাশে এসে দাড়ায়। তার হাতে বিলের কাগজ। ছেলেটা কাগজটা তাশদীদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

– ভাইয়া আপনার বিলটা।

চব্বিশশো টাকার বিলের কাগজ দেখে তাশদীদ ভ্রু কুচকালো। কফি ছাড়া এখনো কিছুই খায়নি ওরা। কিঞ্চিত বিস্ময়ে বললো,

– কিন্তু আমিতে কেবল তিনটা কফি…

– হ্যালো সিনিয়র ভাইয়া?

আওয়াজ শুনে পাশে তাকালো তাশদীদ। একটা কোকা কোলার কাচের বোতল হাতে ওদের দিকেই এগোচ্ছে তাথৈ। পরনে হালকা গোলাপী রঙের কুর্তি আর কালচে নীলাভ ধূতি। তাশদীদ দৃষ্টি সরালো। প্রয়োজন হোক বা না হোক, তাথৈয়ের ওড়না না পরার বিষয়টা ওর মোটেও ভালো লাগে না৷ ওদিকে তাথৈয়ের শরীরে রক্তের পরিবর্তে যেনো রাগের উষ্ণ প্রবাহ। শান্ত যখন শার্লির ফোন নিচ্ছিলো, তখনই এসেছে ও। তারপর সবটা দেখে, শুনে ওর বুঝতে সময় লাগেনি কি ঘটেছে। শার্লিকে ভয় দেখাচ্ছে ওরা। প্রতিত্তোরে তাশদীদের নাম করে চারটে টেবিলের খাবার অডার করে দিয়েছে ও। এগিয়ে এসে তাশদীদের ঠিক সামনের চেয়ারটায় বসলো তাথৈ। শক্ত গলায় বললো,

– জুনিয়রের ফোনের লক খুলাতে পারেন, আর জুনিয়রকে ট্রিট দেবেন না, তা কি করে হয় বলুন? মহামান্য সিনিয়র ভাই! মিস্টার তাশদীদ ওয়াসীর!

তাশদীদ চোখ তুলে তাকালোও। বিলের কাগজটা নিয়ে পাঁচটা পাঁচশো টাকার নোট পুরে দিলো সেখানে। ঠোঁটে পুনরায় সেই চমৎকার হাসি ফুটিয়ে সার্ভবয়কে বললো,

– একশো এক্সট্রা আছে। আরেকটা কোক দিয়ে এর মাথা ঠান্ডা করাও। ম্যাডাম ইজ অন ফায়ার!

শেষ কথাগুলো বলার সময় তাথৈকে আপাদমস্তক দেখেছে তাশদীদ। সেই সাথে তাথৈয়ের সর্বাঙ্গে আগুনও ধরিয়ে দিয়েছে যেনো। তাশদীদ কাধে ব্যাগ নিয়ে, শার্লি আর রুমনকে হাসিমুখে বাই বলে চলে গেলো। তাথৈ টেবিলে রাখা হাত শক্তমুঠো করে নেয়। শক্ত হয়ে বসে তাকিয়ে রয় তাশদীদের চলে যাওয়ার দিকে। তাশদীদের অন ফায়ার কথাটার জবাব না দেওয়া অবদি ওর শান্তি নেই, স্বস্তি নেই!

ক্লাসশেষে ক্লাসের বাইরে বেরোতেই বাইরের ঝুম বৃষ্টি চোখে পরে তাশদীদের। বৃষ্টির বেগ দেখে, আপনাআপনি কপালে হাত চলে যায় ওর। কাছে ছাতা নেই। শুধু বাস অবদি যাওয়া দরকার। নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে কিছু একটা ভাবলো তাশদীদ। পরে পকেট থেকে রুমালটা বের করে, মাথায় দিলো। কপালের দিকটায় হাত রেখে, বড়বড় পায়ে পেরিয়ে আসলো বিভাগের সামনের মাঠঠা। পরে দৌড় লাগালো মুলসড়কের দিকে। সারি ধরে ভার্সিটির দ্বিতল লাল বাসগুলো বেরিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির মাঝে একাধিক বাসের ভীড়ে নির্দিষ্ট বাসটা খুজছিলো তাশদীদ। না পেয়ে ফুটপাতের যাত্রীছাউনিতে উঠতে যাবে, ঠিক সে সময়েই একটা গাড়ি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ভিজিয়ে দিয়ে যায় ওকে। তাশদীদ বাকা হয়ে নিজের বুকের দিকে তাকালো। এমনিতেও বৃষ্টির জন্য অনেকটা ভিজে আছে ও। তারওপর রাস্তার পানি রীতিমতো সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পরেছে। তীব্র বিরক্তিতে তাশদীদ কয়েকহাত দুরের ছাইরঙা ল্যাম্বরগিনি হিউরাক্যান গাড়িটার দিকে তাকালো। চেচিয়ে বললো,

– হো স্মোকি নাগাটার বংশোধর! ভার্সিটি এরিয়ায় এতো জোরে গাড়ি চালানোর নিয়ম নেই, জানেননা?

ব্রেক কষে গাড়ি থামালো তাথৈ। ইচ্ছে করেই গাড়িটা দ্রুত চালিয়েছে ও। ফ্রন্টসাইড সিটে তুল্য কানে হেডফোন গুজে মোবাইলে ব্যস্ত ছিলো। বোনকে গাড়ি থামাতে দেখে ও ফোন থেকে চোখ তুললো। ক্লাসশেষে টংয়ে দাড়িয়ে সিগারেট ধরাচ্ছিলো তুল্য। হুট করেই তাথৈ এসে ওর সিগারেট কেড়ে, ড্রেনে ছুড়ে মারে। কারন? বৃষ্টির জন্য অম্বুনীড় থেকে তুল্যর জন্য গাড়ি আসবেনা আজ। তুল্য ড্রাইভ করা পছন্দ করে না। ড্রাইভারই গাড়ি করে ওকে আনা নেওয়া করে। অন্যদিকে গাড়ি আর ড্রাইভিং তাথৈয়ের প্রাণ। তাথৈ সবখানে নিজে ড্রাইভ করে চলাচল করে। তৈয়ব আলফেজ তাই তাথৈকে বলে দিয়েছেন, আজ তুল্যকে নিয়ে বাসায় ফিরতে। যেহেতু তাথৈ ওর গাড়িতে সিগারেটের ঘ্রাণ সহ্য করতে পারবে না, তাই তুল্যর এখন সিগারেট খাওয়া চলবে না৷ উপায়ন্তর না দেখে চুপচাপ গাড়িতে উঠে বসেছে তুল্য৷ এখন গাড়ি থামিয়ে, তাথৈ শক্ত চোখে লুকিং মিররের দিকে তাকিয়ে আছে। তুল্য বললো,

– হোয়াট? গাড়ি থামালি কেনো?

– ইচ্ছে হয়েছে, থামিয়েছি।

নির্বিকারচিত্ত্বে জবাব দিলো তাথৈ। ওর দৃষ্টি তাশদীদের দিকে। গাড়িটাকে থামতে দেখে তাশদীদ আর কিছু বললো না। ফুটপাতের যাত্রীছাউনিটাতে দাড়িয়ে, রুমাল মাথা থেকে নামিয়ে পানি ঝেরে, শার্ট ঝারতে লাগলো ও। তুল্য কিছু বলতে যাবে, তাথৈ নিজের সিটবেল্ট খুলতে খুলতে লাগলো। কপাল কুচকে আসলো তুল্যর। এমনিতেও তাথৈয়ের জেদ বুঝতে ওর সময় লাগেনা। ওকে বৃষ্টির মাঝেই গাড়ি থেকে নামতে দেখে আরো গাঢ় হলো ওর ধারনা। তুল্য বৃষ্টির বেগ দেখে নিলো৷ অনেকবেশি বৃষ্টি। বললো,

– এই বৃষ্টিতে নামছিস কেনো? বাসায় চল! আমার তাড়া আছে।

– আমি আটকাইনি তোকে। চলে যা।

স্পষ্ট জবাব দিয়ে গাড়ি থেকে নামলো তাথৈ। শব্দ করে লাগিয়ে দিলো গাড়ির দরজাটা। সে আওয়াজ কানে আসে তাশদীদের। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখে, গাড়ির পাশে দাড়িয়ে ভিজছে তাথৈ। ওর ভেজা চুল এলোমেলোভাবে ছরিয়ে আছে। তাশদীদ কিছুটা অবাক হলো। গাড়িটা তাথৈয়ের হবে, ভাবতে পারেনি ও। তাথৈ পায়ের উচু হিলটা খুলে হাতে নিলো। তারপর খালি পায়ে পিচঢালা পথে এগোলো তাশদীদের দিকে। দৃষ্টি নামিয়ে নিলো তাশদীদ। ভিজতে ভিজতে একদম ওর সামনে এসে দাড়ালো তাথৈ। ছাউনির বাইরেই দাড়ালো ও। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

– আমার গাড়ি। আমি যেভাবে খুশি, সেভাবে ড্রাইভ করবো। আমাকে স্পিড শেখানোর তুমি কেউ নও!

তাশদীদ চরম বিস্ময়ে চোখ তুললো। ঠিক,-ভুল, সিনিয়র-জুনিয়র, ভদ্রতা-ব্যবহার, রাগের বশে সব ভুলে বসেছে এই মেয়ে। বুঝলো তাথৈ প্রতিশোধপরায়ন মুডে আছে। ফু দিয়ে শ্বাস ছেড়ে, নিজেকে সামলে নিলো তাশদীদ। বললো,

– তুমি ভুলে যাচ্ছো, আমি তোমার সিনিয়র।

– সেটা ক্যাম্পাসের ভেতরে। ক্যাম্পাসের বাইরে, তুমি কেউ না!

আঙুল উচিয়ে কিছু একটা দেখালো তাথৈ। ওর আঙুল বরাবর তাকিয়ে, তাশদীদ নিজের কপাল চেপে ধরলো। এদিকওদিক ঘুরে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। মুলত তাথৈ ওকে একটা সাইনবোর্ড দেখিয়েছে। সেখানে লেখা, ‘বিশ্ববিদ্যালয় এরিয়া’ যার মানে, ওরা এখন ক্যাম্পাসের বাইরে। কয়েকপা এগোলেই ক্যাম্পাস। এটুক দুরুত্বে এসেই যে মেয়ে বলে ‘তুমি ক্যাম্পাসের বাইরে। তাই এখন তুমি আমার সিনিয়র নও।’ এমন পাগল মেয়ে দুনিয়ায় আর দুটো আছে বলে ওর মনে হয়না। কথা বাড়াবে না বলে তাশদীদ লম্বা দম নিয়ে, স্থির হয়ে দাড়ালো। বললো,

– কি চাও?

তাথৈ আটকে গেলো। অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নিলো ও। বুঝে উঠতে পারলো না, ওর ঠিক কি চাই। কি মনে করে পরমুহূর্তেই চোখ তুলে তাকালো তাথৈ। চেচিয়ে বললো,

– তাথৈ আলফেজের কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হয় না। এন্ড ইউ! লিসেন! আমাকে কিছু দেবার মতো যোগ্যতাও তোমার নেই! গট ইট?

তাথৈ চলে আসছিলো। দুপা এগোতেই পেছন থেকে অকস্মাৎ ওর সামনে এসে দাড়ায় তাশদীদ। বৃষ্টিতে পুনরায় ভিজে উঠতে শুরু করে ওর হালকা নীল শার্টটা। তাথৈ চোখ তুলে চায় ওর চোখে। তাশদীদ আরেকপা এগিয়ে বললো,

– আমি তোমাকে কি দেবার যোগ্যতা রাখি, ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া আবাউট দ্যাট মিস তাথৈ আলফেজ।

– ইউ….!

তাথৈ তীব্র রাগে আঙুল উচিয়ে কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিলো। কিন্তু ওকে সুযোগ দেয়নি তাশদীদ। তার আগেই, একদম হুট করে তাথৈয়ের মুখের ওপর কিছু ছুড়ে মারলো ও। ঘাড় ঘুরিয়ে, চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো তাথৈ। পরে চোখ খুলে দেখে, ওর কাধের ওপরে ভেজা চুলে দুটো শিউলী ফুল লেগে আছে। অগ্নিচক্ষু করে তাশদীদের দিকে তাকালো ও। বরাবরের মতো আজও সে চাওনিকে পাত্তা দিলো না তাশদীদ। বরং তাথৈয়ের দিকে আরেকটু এগিয়ে, কিঞ্চিৎ ঝুকে, বললো,

– রাগ কমাও রাগান্বিতা। রাগ, মনের জন্য হানীকারক।

বলাশেষে একমুহুর্ত দেরি করে নি তাশদীদ৷ ঠিক ওইসময়েই ওর কাঙ্ক্ষিত বাস যাচ্ছিলো রাস্তা দিয়ে। লাফিয়ে ফুটপাত থেকে নেমে, চলমান বাসে উঠে পরলো ও। বৃষ্টির প্রকোপে, তাথৈয়ের রাগমিশ্রিত অশ্রু দেখা গেলো না। তুমুল বৃষ্টিতে দাড়িয়ে, দুহাত মুঠো করে ও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো দ্বিতল লালবাসের সামনের গেইটে। কিন্তু সেখানে দাড়ানো বেপরোয়া মানুষটার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই ওর চাওনিতে। একহাতে গেইটের হাতল ধরে, আরেকহাতে মাথার ভেজাচুল উল্টে দিলো তাশদীদ। কি মনে করে, তাকালো তাথৈয়ের দিকে৷ বৃষ্টির মাঝে দাড়ানো মেয়েটার রাগী, জেদী অনড় অবস্থা আটকে দেয় ওর দৃষ্টিকে। তাশদীদ শক্তমুঠো করে নেয় বাসের দরজার হাতল। বাসের পেছনের গেইটে ছেলেগুলোর গলায় তখন সমস্বরের গান,
‘একগুচ্ছ, কদম হাতে,
ভিজতে চাই, তোমার সাথে।
এক গুচ্ছ, কদম হাতে
ভিজতে চাই তোমার সাথে…’

#চলবে…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here