কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা ৮.

0
432

#কার্নিশ_ছোঁয়া_অলকমেঘ
লেখনীতে: মিথিলা মাশরেকা

৮.

প্রায় পাঁচমিনিট যাবত তুল্য অনবরত হর্ণ দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাথৈ ওভাবেই বৃষ্টির মাঝে দাড়িয়ে। একচুল নড়ছে না ও। অন্যকোনো উপায় না দেখে ড্রাইভিং সিটে বসে, গাড়ি স্টার্ট দিলো তুল্য। উল্টোদিক চালিয়ে, তাথৈয়ের পাশে এনে দাড় করালো গাড়িটা। আরো দুইবার হর্ণ দিয়েও তাথৈয়ের হেলদোল পেলো না ও। তুল্য গাড়ির জানালার কাচ নামালো। গা ছাড়াভাবে বললো,

– ছেলেটা যেভাবে তোর সেল্ফ-অবসেশনকে পিষে দিয়ে গেলো; তোর ড্যাডের আলিশান বাড়ির, আলিশান ওয়াশরুমের শাওয়ার তোকে ঠান্ডা করতে পারবে বলে আমার তো মনে হচ্ছে না। তারচেয়ে বরং তুই এই বৃষ্টিতে এভাবেই মাঝরাস্তায় দাড়িয়ে থাক। ওপরওয়ালার রহমতের পানিতে যদি তোর মাথা ঠান্ডা হয়।

তাথৈয়ের কর্ণগোচর হয় কেবল প্রথম লাইনটা। ‘তাশদীদ ওর আত্নবোধকে পিষে দিয়ে গেছে।’ মস্তিষ্ক শিরশিরিয়ে ওঠে ওর। ক্ষিপ্ত বাঘিণীর মতো জানালা দিয়েই তুল্যর টিশার্টের কলার চেপে ধরলো তাথৈ। ওর এ হেন কাজে, তুল্য পুরোপুরিভাবে হচকিয়ে যায়। বড়বড় চোখে তাকায় কলার মুঠো করে রাখা তাথৈয়ের হাতের দিকে। তাথৈ বললো,

– ড্রাইভিং সিটে বসার সাহস কি করে হলো তোর?

– কলার ছাড় তাথৈ!

– না ছাড়বো না! হাউ ডেয়ার ইউ টু টাচ মাই কার এন্ড হাউ ডেয়ার ইউ টু ড্রাইভ ইট ড্যাম ইট! হাউ ডেয়ার ইউ!

চেচিয়ে উঠলো তাথৈ। বৃষ্টির জন্য ওর চোখের জল দেখা না গেলোও, তুল্য ওর গলা শুনেই বুঝলো, রাগ সহ্য করতে না পেরে তাথৈ কাদছে। অথচ তুল্য এটাও জানে, এতোবেশি রাগের মতো কিছু ঘটেই নি এখানে। তাথৈ নিজেই ছেলেটার গায়ে বৃষ্টির পানি ছিটিয়েছে। ছেলেটা যদি চাইতো, অনেক বাজেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারতো। কিন্তু সে তা করেনি। উল্টো মুঠোভর্তি ফুল ছুড়ে গেছে তাথৈয়ের চেহারায়। আর এ সবটুকোতে তাথৈয়ের রাগের একমাত্র কারন, ছেলেটা ওর আত্মকেন্দ্রিকতায় ঢুকে পরেছে। ‘আমিই সঠিক’ এর বাইরে ভাবতে না জানা তাথৈ আলফেজকে প্রতিত্তোর করেছে। তুল্য ঝারা মেরে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিলো তাথৈয়ের হাত থেকে। তারপর সরে গিয়ে পাশের সিটে বসে, জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টিক্ষেপ করলো। তাথৈ ভেজা শরীরে গাড়িতে চরে বসে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে ফেরে অম্বুনীড়ে। গাড়ির বাইরে পা রেখেই মুখে সিগারেট গোজে তুল্য। লাইটার দিয়ে আগুন ধরিয়ে মুখভর্তি ধোয়া ছাড়লে। তৈয়ব আলফেজ কোমড়ের পেছনে দুহাত গুজে দরজায়ই দাড়িয়ে ছিলেন। তুল্য বাসায় ঢোকার আগে একবার চোখ উল্টিয়ে তাকালো বাবার দিকে। মুখ থেকে সিগারেট নামিয়ে তাচ্ছিল্যে বললো,

– অম্বুনীড়ে আবার বজ্রপাত হবে।

তুল্য ভেতরে চলে যায়। ওর হাসিটা দেখে তৈয়ব আলফেজের বুঝতে সময় লাগলো না, তাথৈ আজ আবারো ক্ষেপেছে। চোখ বন্ধ করে নিলেন উনি। তাথৈ গাড়ি থেকে নেমে, নাক ডলতে ডলতে বাসায় ঢুকলো। দু দন্ডের মধ্যে ভাঙার আওয়াজ আসে ভেতর থেকে। তৈয়ব আলফেজ ভেতরে এগোলেন। তাথৈ সিড়ি বেয়ে নিজের ঘরে এগোচ্ছে। যাওয়ার আগে ড্রয়িংরুমের বড় ফুলদানিটা ভেঙে গুড়িয়ে গিয়ে গেছে ও। ক্ষুদ্রশ্বাস ফেলে নিজের ঘরে চলে গেলেন তৈয়ব আলফেজ।
ঝড়-ঝঞ্ঝার রাত পেরিয়ে ভোর হয়। ভোর গরায় বেলা এগারোটায়। তুল্য ভার্সিটি যাবে বলে বেরোয় রুম থেকে। ব্যাগ কাধে নিয়ে সিড়ি দিয়ে নামছিলো ও। ড্রয়িংরুমে তাকিয়ে দেখে আগেরদিন তাথৈ যে বড় ফুলদানিটা ভেঙেছে, সেখানেই নতুন আরেকটা ফুলদানী এনে রাখা হয়েছে। ডাইনিংয়ে তাকিয়ে দেখে সেখানে বসে জুসের গ্লাস নিয়ে তৈয়ব আলফেজ ফাইল দেখছেন। তুল্য নিচে নেমে বললো,

– তোমার মেয়ে বেরিয়েছে?

– না।

নিজের কাজে ব্যস্ত থেকে বললেন তৈয়ব আলফেজ। তুল্য ঘৃণাসূচক চাওনিতে তাকালো বাবার দিকে। অম্বুনীড়ের একটা সুতো নষ্ট হলেও তৎক্ষনাৎ সেটা ঠিক করে নেয় এই লোকটা। অথচ তার নিজের ছেলেমেয়েদুটোই যে নিঃশেষ হতে চলেছে, তাতে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। রাগ নিয়ে সামনের চেয়ারটায় লাথি মারলো তুল্য। আবারো ওপরে গিয়ে তাথৈয়ের ঘরের সামনে দাড়ালো। বন্ধ দরজার এপার থেকে ডাক লাগালো,

– তাথৈ? ভার্সিটি যাবিনা? মিড আছে আজ।

জবাব এলো না। তুল্য আবারো ডাকলো,

– তাথৈ? ক্যাম্পাসে যাবিনা?

এবারো জবাব এলো না। তুল্যর কপালে ভাজ পরে। ‘তাথৈ?’ বলে দরজায় হাত রাখতেই টের পায়, দরজা খোলা। কিছুটা অবাক হয়ে দরজা ঠেলে ভেতরে চোখ বুলায় ও। কিন্তু ভেতরের অবস্থা দেখেই মাথা ঘুরে ওঠে ওর। তাথৈ বিছানায় হাত রেখে মাথা ঠেকিয়ে, চোখ বন্ধ করে মেঝেতে বসে আছে। আগেরদিন ও যে জামা পরে ভিজেছিলো, সেই জামাই ওর পরনে। তুল্য ‘ড্যাম’ বলে কাধের ব্যাগ মেঝেতে ছুড়ে মারে। ছুটে এসে হাটুতে বসে যায়। তাথৈয়ের গায়ে হাত দিতেই টের পায়, ওর শরীরে অসহনীয় উত্তাপ। জ্বরে গা পুড়ে যাওয়া অবস্থা। তুল্য দিশেহারা হয়ে যায়। চিৎকার করে ওঠে,

– মিস্টার আলফেজ!

নিচতলায় বসা অবস্থায় কেপে ওঠেন তৈয়ব আলফেজ। হন্তদন্ত হয়ে পা বাড়ান তাথৈয়ের ঘরের দিকে। অকস্মাৎ উষ্ণতার আবেশ পেতেই কাপতে শুরু করে দেয় তাথৈ। উচ্চস্বর শুনে বিরবির করে কিছু বলতে থাকে। তুল্য কি করবে ভেবে পায় না। নিজের ফোন হাতে নেয়। কিন্তু এ্যাম্বুলেন্সের নম্বর নেই ওর কাছে। রাগে চোখ ফেটে জল গরায় তুল্যের। নিজেকে ওর তীব্র অসহায় লাগছে। তাথৈ চোখ বন্ধ রেখে জ্বরের ঘোরে বলে চলেছে,

– যেও না মম। মম প্লিজ যেও না। তুল্য প্লিজ মমকে আটকা। ড্যাড মমকে থামাও। যেতে দিও না। মম! মম!

তুল্য থেমে যায়। সদ্য ভুমিষ্ট হওয়া শিশু যদি কথা বলতে জানতো, তাহলে হয়তো আজ ওরা মা ছাড়া হতো না। এভাবেই হয়তো আর্তনাত করে করে ওই মহিলাকে আটকে দিতো তাথৈ। তাথৈ আবারো বলে,

– তুল্য প্লিজ যাসনা। প্লিজ যাসনা তুল্য। আমি একা হয়ে যাবো। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাস না! প্লিজ!

তুল্যর চোখ বেয়ে জল গরাতে লাগলো। বিরামহীন। তাথৈ বড়বড় দম নেয়। ওর বন্ধ চোখের কোনা বেয়ে জল গরাচ্ছে। শরীর জ্বলছে। তবুও অতিকষ্টে চোখ মেললো ও। জলভরা আবছা চোখে ভাইকে দেখে, লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললো,

– মম টাকার লোভে দ্বিতীয়বিয়ে করলো, আমাকে অতিরিক্ত ভেবে ফেলে চলে গেলো। ড্যাড নিজের স্বার্থে আমাকে বাচিয়ে রাখলো। তুইও নিজের স্বার্থ খুজতেই বিদেশ গেলি। অন্তু আমাকে কোনোদিনও ছাড়বেনা লোভ দেখিয়েছিলো। বেটার অপশন পেয়ে চলে গেলো ওউ। তোরা সবাই স্বার্থপর। সবাই। সবাই….

বলতে বলতেই জ্ঞান হারায় তাথৈ। তুল্য স্তব্ধ। তৈয়ব আলফেজ ততোক্ষণে দরজায় এসে দাড়িয়েছেন। দেখলেন রুমে তাথৈ তুল্যর কোলে অজ্ঞান অবস্থায় পরে আছে। ভেতরে না এসে পান্জাবীর পকেট থেকে ফোন বের করলেন উনি। হসপিটালে কল লাগালেন এ্যাম্বুলেন্সের জন্য।

বিকেল চারটা। তিনতলা বাড়িটার দোতালায় ড্রয়িংরুমে বসে আছে তাশদীদ। ওর সামনের টি টেবিলে চারপ্রকারের মিষ্টান্ন-পিঠা, ছয়প্রকারের ফলসহ হরেক রকমের ব্যন্জন সাজানো। বাড়ির মালিক সৈয়দ সাহেব ওর পাশের সোফায়ই বসে। তিনদিন ক্লাসের পর, আজকের দিনটা অফডে ছিলো তাশদীদের। ওয়াসীর সাহেব তাই আজই ওকে সৈয়দ সাহেবের বাসায় পাঠিয়েছেন। রিংকিকে পড়ানোর উদ্দেশ্যে। খুব বেশি হলেও মিনিট পাঁচেক হলো বাসায় ঢুকেছে তাশদীদ। এরমাঝেই মিসেস সৈয়দ ট্রে ভর্তি করে এসব সাজিয়ে দিয়ে গেছেন ওর সামনে। সৈয়দ সাহেব নিজেও ব্যস্ত হয়ে পরেছেন। খাবারের মধ্য থেকে এটাওটা তাশদীদকে এগিয়ে দিচ্ছেন আর নেওয়ার জন্য জোরাজুরি করছেন। সৌজন্য দেখাতে তাশদীদ জোরালো হাসি দিয়ে বারন করছে বা কোনো কোমোটা একটুএকটু করে সবই মুখে তুলছে। সৈয়দ সাহেব জার্মানিতে বসবাসরত ছিলেন। ওখানকার কথা বলতে বলতেই পাস্তার হাফপ্লেটটা তাশদীদের দিকে এগিয়ে দিলেন উনি। তাশদীদ আর খাবে না বলে এবারে বারন করতে উদ্যত ছিলো। সৈয়দ সাহেব আগের কথা থামিয়ে বললেন,

– ওহ তাশদীদ? এই পাস্তাকে কিন্তু মানা করো না। এটা স্পেশাল। খেয়ে দেখোতো কেমন হয়েছে?

তাশদীদের আর বারন করা হয়ে উঠলো না৷ ও নিজেও জানে, নির্দিষ্ট কারনে ভদ্রলোক ওকে অনেকবেশি ভালোবাসে। আর তাশদীদ চায় সে কারন খন্ডন করতে। শুধুমাত্র উনি মুখে কিছু বলেননি বলে বলা হয়ে ওঠেনি ওর। পাস্তার প্লেট হাতে নিলো তাশদীদ। হেসে বললো,

– আন্টি বানিয়েছে, নিসন্দেহে ভালোই হয়েছে। তবে এসবের কিন্তু কোনো দরকার ছিলো না। তোমরা এরকম ব্যস্ত কেনো হচ্ছো বলোতো?

– ব্যস্ত হয়নি। কারন এসব আম্মু একা বানায়নি তাশদীদ।

তাশদীদ চোখ তুলে চাইলো। রিংকির বড় বোন রোজি ওর সামনে এসে দাড়িয়েছে। রোজি কলেজে তাশদীদের ক্লাসমেট ছিলো। বিয়ে হয়েছে কলেজে থাকতেই। স্বামী সরকারী চারকিজীবি। আপাতত সন্তানসম্ভবা। সৈয়দ সাহেব বিদেশ থাকতেই ভালো পাত্র পেয়ে রোজির বিয়ে দিয়ে দেন। গর্ভাবস্থার শেষ সময়টার জন্য বাবার বাড়িতে এসেছে রোজি। আর ঠিক এসময়টাতেই দেশে ফিরেছেন সৈয়দ সাহেব। তাশদীদ হাতের পাস্তার হাফপ্লেট সামনের টিটেবিলে রাখলো। হাসিমুখে বললো,

– আরেহ! রোজি! কেমন আছো?

রোজি একপলক বাবার দিকে তাকালো। তারপর পেটে হাত বুলিয়ে, মলিন হেসে বললো,

– যেমন দেখছো, আছি তেমনই।

তাশদীদ দ্রুততার সাথে ওকে বসতে ইশারা করলো। বাবার পাশে গিয়ে বসলো রোজি। তাশদীদ বললো,

– অনেকদিন পর দেখলাম তোমাকে। বদলে গেছো অনেক।

– তোমাকেও অনেকদিন পর দেখলাম। তবে তুমি একটুও বদলাওনি।

একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বললো রোজি। তাশদীদের হাসিটা কমে আসলো। রোজির মলিন হাসিটায় কেমন একটা আক্ষেপ। তাশদীদ সেটাকে মনের ভুল ধরে নিয়ে জোরপূর্বক হাসলো। বললো,

– আমার কথা ছাড়ো। তুমি কবে এসেছো সাভার? দুলাভাই কেমন আছে?

– আছে ভালোই।

উত্তর দিয়েই রোজি দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। এমন অভিমানী জবাব শুনে আবারো কিছুটা থেমে যায় তাশদীদ। সৈয়দ সাহেব এতোক্ষণ চুপ থাকলেও এবার মুখ খুললেন। গমগমে গলায় বললেন,

– আরে তাশদীদ, পাস্তা খাচ্ছো না যে? এটা কিন্তু রিংকি বানিয়েছে। খেয়ে দেখোনা কেমন হয়েছে?

তাশদীদ আবারো পাস্তা হাতে নিলো। বাবার দিকে তীব্র অভিমানী দৃষ্টিক্ষেপ করলো রোজি। ও ছোটবেলা থেকেই অনেক চাপা স্বভাবের মেয়ে। এতোবেশি চাপা স্বভাবের যে, ওর নিজের বাবা-মাও কোনোদিন ধারনা করে উঠতে পারেনি, একসাথে স্কুল কলেজ পেরোনো তাশদীদ ওর কিশোরী মনের প্রথম প্রেম। টাকা আর চাকরী দেখে কলেজে থাকতেই রোজির বিয়ে ঠিক করে ফেলেছিলেন সৈয়দ সাহেব। রোজির জন্য এটা কতোবড় ধাক্কা ছিলো, তা কেবল ওই জানে। আর সেসময় তাশদীদও কলেজপড়ুয়া। বাবার কাছে নিজের অনুভূতি বলার সাহস হয়ে ওঠেনি রোজির। ও ভাগ্য মেনে নিয়েছিলো। কিন্তু বরাবরের মতোই, ভাগ্য ওর সহায় ছিলোনা। বড়লোক ঘর কেবল ওকে মাথা গোজার ঠাই দিয়েছে, সংসার দেয়নি। টাকাওয়ালা বর কেবল ওকে বিলাসবহুল জীবন দিয়েছে, ভালোবাসা দেয়নি। অথচ ও চেয়েছিলো প্রীতিকার্নিশের মতো একটা সুখের নীড়, তাশদীদের মতো একটা উচ্ছ্বল, হাসিখুশি মানব। হয়নি কোনোটাই।

কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এমনই যে, সেই তাশদীদকেই ওরই ছোট বোনের জন্য ঠিক করতে ওর বাবা-মা উঠেপরে লেগেছে। অবশ্য পরবেই বা না কেনো? রিংকি তো আর রোজি নয়। রিংকি কিছু চেয়েছে আর পায়নি, এমন ঘটনা খুবই বিরল। ও জানে, ওর বাবা-মা সবসময় ওর সব জেদ পুরনে উদ্যত। ক্লাস টেনের মডেল টেস্ট পরীক্ষার আগে ও বাসায় জানায়, তাশদীদকে ওর পছন্দ। শুধু জানায় বললে ভুল হবে। রীতিমতো ধমকি দিয়েছিলো রিংকি। তাশদীদকে না পেলে ও নাকি সুইসাইড করবে। সৈয়দ সাহেব দেশের বাইরে ছিলেন। মেয়ের কথা মেনে নেওয়া ছাড়া অন্য কোনো উপায় ছিলো না তার। এমনিতেও তাশদীদকে বেশ পছন্দ করেন তিনি। তাই দ্বিমত করেননি। তবে তারও শর্ত ছিলো। তাশদীদের চাকরি না হওয়া অবদি ওয়াসীর সাহেবকে বিয়ে নিয়ে কিছুই বলবেন না। ততোদিন তাশদীদের সাথে সম্পর্ক গাঢ় করার উদ্দেশ্যেই মুলত রিংকিকে পড়াতে বলেছেন তিনি। রিংকির মতো জেদী হতে পারলে, হয়তো আজ রোজির জীবনটাও অন্যরকম হতো। এমনটা ভাবতেই টুপ করে চোখ বেয়ে একফোটা জল গরায় রোজির। সবার অগোচরে তৎক্ষণাৎ ও চোখের জল মুছে ফেললো। কান্না মানায় না ওকে। তাশদীদ ওর প্রেমিক ছিলো না। যাকে একতরফা ভালোবেসেছে, বিয়ের পর তার আক্ষেপে ফেলা চোখের জলের নাম কলঙ্ক। রোজি চোখ তুলে তাকালো তাশদীদের দিকে। হাসিমুখে সৈয়দ সাহেবের সাথে কথা বলছে সে। পাশ থেকে আওয়াজ এলো,

– ওমা তাশদীদ? পাস্তা খাওনি তুমি?

মিসেস সৈয়দের গলা শুনে সামনে তাকালো তাশদীদ। ভদ্রমহিলার হাসিমুখ দেখে ওর হাসি প্রসারিত হচ্ছিলো। কিন্তু পাশে দাড়ানো রিংকির হাসিটা দেখে হাসি কমে আসলো তাশদীদের। পরনে ভারি কারুকাজকরা থ্রি পিস আর ঘাড় বাকিয়ে তাকিয়ে থাকা রিংকির চেহারায় এক অদ্ভুত হাসি। চোখাচোখি হতেই তাশদীদ চোখ সরিয়ে নিলো। আবারো মিসেস সৈয়দের কি তাকিয়ে, হেসে বললো,

– খেয়েছি আন্টি। ভালো ছিলো।

– কেমন আছেন তাশদীদ ভাই?

তাশদীদ আবারো তাকালো রিংকির দিকে। স্বাভাবিকভাবে বললো,

– আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো রিংকি?

– জ্বি। আপনাকে দেখে বেশ ভালো আছি।

রিংকির কথায় বিরক্ত হলেও প্রকাশ করলো না তাশদীদ। রিংকি আগ্রহের সাথে বললো,

– পাস্তাটা কিন্তু আমি বানিয়েছি তাশদীদ ভাই। পছন্দ হয়েছে আপনার?

– পছন্দ কেনো হবেনা? আমার ছোট্ট বোনটা রান্না করেছে বলে কথা! ওয়াও ছিলো।

মিসেস সৈয়দ অপ্রস্তুত হয়ে যান। রিংকিকে তাশদীদের এমন আহ্লাদী ‘ছোট্ট বোন’ সম্বোধনের জন্য সৈয়দ সাহেব নিজেও তৈরী ছিলেন না। গলা খাকারি দিলেন উনি। রোজি বোনের দিকে তাকালো। তাশদীদের কাছে বোন কথাটা শুনেও রিংকির কোনোরুপ হেলদোল নেই। রোজি বেশ বুঝলো, বোনের চেয়ে ওয়াও শব্দটা বেশি শুনেছে রিংকি। মনেমনে ভাবতেও শুরু করেছে, আরো কতোভাবে তাশদীদের মুখ থেকে ‘ওয়াও’ শব্দটা বের করানো যায়। মিসেস সৈয়দ কিছু বলতে চাইছিলেন। রিংকি মাকে বললো,

– আমি রুমে যাচ্ছি। ওনাকে ভেতরে পাঠাও?

মাথা ঝাকালেন মিসেস সৈয়দ। রিংকি হেলেদুলে ভেতরে চলে গেলো। সৈয়দ সাহেব আর তার মিসেস মিলে তাশদীদের সাথে কথা বললেন আরো কিছুক্ষন। তাদের কথার মাঝে তাশদীদ ডানহাতের দু আঙুলে কপাল ডললো দুবার। জীবনে অনেকরকমের ঝামেলা মিটিয়েছে ও। তবে প্রথমবারের মতো এমন উদ্ভট বিষয় ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। রিংকির ব্যবহার সুবিধার না। ব্যাপারটা সহজে মিটবে বলে ওর মনে হচ্ছে না।

#চলবে…

[ নোট: আমি মুলত অবসরযাপন আর আত্মতুষ্টির জন্য লেখালেখি করি। গল্প পেইজে ছাড়া অন্যকোথাও পোস্ট করছি না মানে এটাই, পুরোনো পাঠক-পাঠিকাদের উদ্দেশ্যেই গল্প দিচ্ছি। এখন যারা পড়ছেন, আপনারা যদি গঠনমুলক মন্তব্য না করেন, তাহলে আমার গল্প পোস্ট করার সার্থকতা কোথায় বলতে পারেন? এসব আত্মতুষ্টি, অবসরযাপন তো আমি নোটপ্যাডেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারতাম। পোস্ট করার প্রয়োজন ছিলো না তো!
যারা পড়ছেন, আজকে একটু মতামত জানাবেন প্লিজ। গল্প পোস্ট করার উদ্দেশ্য চাই আমার। আসসালামু আলাইকুম ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here