#মায়ার_যাতনা
#পর্ব_৬
#অরুনিতা_আঁখি
মায়া তার লাগেজ খুলে বসে আছে,, রুদ্র এখনো বাসায় ফেরেনি।।রুদ্রের রুমে জামা-কাপড় রাখার জন্য দুইটা কাবার্ড,,এছাড়াও জুতো ও অন্যান্য জিনিসপত্র আলাদা আলাদা কাবার্ডে সাজিয়ে রাখা আছে।।মায়া ভাবে,,”বড়লোক হয়তো একেই বলে!!রুদ্রের ঘরে তার একারই যে জিনিসপত্র আছে,,রুদ্রের জায়গায় মায়া হলে হয়তো আর সারা জীবনেও শপিং করার কথা ভাবতো না।।
দু’দিন হলো মায়ার পোশাক-আশাক সব লাগেজে রাখা,,যেগুলো এখন কোথাও গুছিয়ে রাখা প্রয়োজন।।মায়া রুদ্রের কাবার্ড এর দিকে তাকালো,,”লোকটা তাকে স্ত্রী হিসেবে মানেনা,,স্ত্রী হিসেবে রুদ্রের সবকিছুর উপর তার অধিকার থাকলেও,রুদ্র মায়াকে সেই অধিকার দেয়নি।।এমনকি লোকটার কোন জিনিসে মায়ার স্পর্শ করাটাকেও সে ঘৃণা করে!!”
জোর করে কোন কিছুতে ভাগ বসানো মায়ার অপছন্দ,,নিজের কাছেই কেমন বিশ্রী অনুভূতি হয়!!লাগেজ বন্ধ করে মায়া উঠে দাঁড়ালো, ভাবলো,”যেদিন লোকটা তাকে স্বইচ্ছায় অধিকার দিবে,,সেদিনই ওই কাবার্ডে মায়ার জামা-কাপড় স্থান পাবে।।ততদিন না হয় লাগেজ অথবা অন্য কোনভাবে চালিয়ে নেবে!!
মায়া কাবার্ড খুললো,,রুদ্র এখন অফিসে যাবে,তাই সেই অনুসারে ফর্মাল স্যুট নামালো।।কাবার্ডের যতগুলো পোশাক রাখা আছে,,তার বেশিরভাগই সাদা-কালো,,অন্যান্য রঙে রুদ্রকে খুব একটা দেখা যায় না!!মায়া সেখান থেকে কালো ব্লেজার,টাই,সাদা শার্ট,কালো প্যান্ট নামিয়ে আয়রন করে সুন্দর মতো গুছিয়ে বিছানায় রাখল যাতে রুদ্র তা সহজে পেয়ে যায়।।মায়া জানে,”এই কাজ করার জন্যে তাকে কথা শুনতে হবে,,হয়তো গায়েও হাত তুলবে।।তাই সে রুদ্রের সামনে যাবে না বলে ঠিক করলো।।”
~~~~~~~~~
জ্যিম থেকে ফিরে কোনো দিকে না তাকিয়ে রুদ্র সোজা ফ্রেশ হয়ে কোমরে শুধু একটা টাওয়াল পেঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো।।মায়া দরজার আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখছিলো,রুদ্র তার ঠিক করে দেওয়া ড্রেসগুলো পরে কিনা!আচমকা রুদ্রকে এই অবস্থায় বেরিয়ে আসতে দেখে লজ্জা ও অস্বস্তিতে দরজার আড়াল থেকে সরে দাঁড়ালো,,নিজেই নিজেকে বকলো,,এভাবে কারো রুমে উঁকি দেওয়া তার ঠিক হয়নি!!
রুদ্র সাধারণত নিজের কাজ নিজেই করতে পছন্দ করে,,পারমিশন ছাড়া কেউ তার রুমে প্রবেশ করতে পারে না।।
~বিছানায় আমার ড্রেস কে রাখলো?দেখে তো মনে হচ্ছে আয়রন করা!!
এক সেকেন্ড!!রুমে তো কারো আসার পারমিশন নেই!!ঐ মেয়েটা!……… নিশ্চয়ই এটা ওই স্টুপিড মেয়েটার কাজ।।
রাগে গজগজ করতে করতে সে মায়াকে ডাকলো,,”কাকের বাচ্চা!! কাকের বাচ্চা,,,,কোথায় তুই??সামনে পেলে মে*/রেই ফেলবো তোকে!!
মায়া দরজার পাশে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো,এমন সময় রুদ্রের চিৎকার শুনে তার আত্মা কেঁপে উঠলো,,”মনে হচ্ছে তিনি এখনই রুম থেকে বেরিয়ে আসবেন,,বেরিয়ে যদি আমাকে দেখতে পান,, মনে হয় না আমাকে আস্ত রাখবেন!!”
রুম থেকে রুদ্রের ধুপ-ধাপ পা ফেলে এগিয়ে আসার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।।মায়া আর ডানে-বায়ে,সামনে- পিছনে কোথাও তাকাচ্ছে না,,তাকানোর সময়’ও নেই।।সে শুধু চোখ বন্ধ করে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে দৌড়োচ্ছে,,উদ্দেশ্য রুদ্রের চোখের সীমানার বাইরে যাওয়া!!
রুদ্র দরজা খুলে বাইরে আসতেই তার পা জোড়া থমকে গেল এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখে,,”লাল শাড়ি পড়া এক শ্যামাঙ্গিনী দৌড়োচ্ছে,,শাড়ির পাড় মেঝেতে ছেঁচড়ে যাচ্ছে!!দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ’ই মেয়েটির আলগা হওয়া খোঁপা করা চুল খুলে গেলো,,এক ঝাঁক ঝলমলে কেশরাশি কোমর ছড়িয়ে নিচে পড়লো!!মেয়েটি দৌড়াচ্ছে!তার সাথে সাথে কোমরের হালকা দোলন আর বাতাসে চুলগুলো ওড়ার যেন প্রতিযোগিতা চলছে!!
মেয়েটিকে যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ রুদ্র স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো।। মায়া রুদ্রের চোখের আড়াল হয়েছে বেশ কিছুক্ষণ হয়েছে,,কিন্তু রুদ্র এখনো শূন্যস্থানে তাকিয়ে আছে।।হঠাৎই রুদ্রের ধ্যান কাটলো,,নিজের চুল টেনে ধরলো-“ওহহ শিট!!কি করছি এটা আমি!!”
নিজের বেখেয়ালি আচরণের কথা ভেবে চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল তার,, দাঁত কিড়মিড় করে বললো,,-তার মানে ওই মেয়েটা এতক্ষন এখানেই ছিলো।আর মেয়েটা আমাকে মানে এই “রুদ্র মির্জা” কে ঘোঁল খাইয়ে গেলো??হাউ ডেয়ার সি!!
~~~~~~
ছাদে দাড়িয়ে বুকে হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছে মায়া,,সেই যে দৌড় দিয়েছে,,আর পিছু ফিরে তাকাইনি সে।।মায়ার মনে পড়ে,এমন দৌড় সে লাস্ট মাস চারেক আগে দিয়েছিল,,টিউশনি করে ফেরার পথে সন্ধ্যাবেলায় তাদের বাড়ি থেকে সামান্য দূরে,রাস্তার মোড়ে অবস্থানরত দুটো খ্যাপা কুকুরের কাছে তাঁড়া খেয়েছিল সে,, বাড়ির কাছে এসে পড়ায় সে যাত্রায় কোনরকমে বেঁচে গিয়েছিল।।যদিও সে দৌড়ের কাছে এ সময়ের দৌড় তুলনীয় নয়,, কারণ এ সময় শাড়ি পরা থাকায় খুব একটা সুবিধা হয়নি তার জন্য!!
মায়া ঠিক করেছে, রুদ্র অফিসে চলে না যাওয়া পর্যন্ত সে আর নিচে যাবে না।।
অনেকক্ষণ পর রুদ্র ঘর থেকে বের হলো,,মায়া ছাদের উপর থেকে রুদ্রকে দেখছে।।ঠিক যেমনটা ভেবেছিল মায়া তাই হয়েছে,,রুদ্র তার সিলেক্ট করে দেওয়া ড্রেস পড়েনি।। এতে মায়া খুব একটা অবাক হয়নি,,,পড়লেই বরং অবাক হতো।।
রুদ্র “মির্জা ম্যানশন”থেকে হেঁটে গ্যেটের কাছে গেল,,পেছন পেছন তার দুইজন বডিগার্ড রাও আসছে,,বাইরে কোথাও গেলে এরা সব সময়ই রুদ্রের সাথে থাকে।।
সিকিউরিটি গার্ডরা সকলে একত্রে রুদ্রকে সালাম জানিয়ে এবং মাথা নুয়ে সম্মান জানালো,,তারপর গ্যেট খুলে দিলো।।
মায়া উপর থেকে দাঁড়িয়ে সবটাই পর্যবেক্ষণ করছিলো।।রুদ্র অনেকক্ষণ হলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে,,গ্যেট থেকে এক পাও সামনের দিকে এগোচ্ছে না!!মায়া একটু বিরক্ত হলো,,”কি ব্যাপার! উনি এখনো যাচ্ছেন না কেন??”
আচমকাই রুদ্র ঘাড় ঘুরিয়ে ছাঁদ বরাবর সোজাসুজি মায়ার দিকে তাকালো।।আকস্মিক নিজের সোজাসুজি রুদ্রের দৃষ্টি অনুভব করতেই মায়া আঁতকে উঠে তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলো।
মায়া হকচকিয়ে আছে,, রুদ্রের শকুনি দৃষ্টি!! যেন চোখ দিয়েই সে মায়াকে বশ্ম করে দিবে!!
ঠিক দু’সেকেন্ড তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মায়াকে দেখে চলে গেল রুদ্র।।
~~~~~~~
রুদ্র চলে যাওয়ার পর মায়া ছাদ থেকে নিচে নেমে এসেছে,,ঘরে ফিরে যা দেখলো তাতে মায়ার মুখের তাছ্যিল্যের হাসি ফুটলো,সাথে এক ফোটা জল জমলো কি!!”রুদ্র ড্রেস গুলো পুড়িয়ে দিয়েছে!!সেগুলো এখন ছাঁই হয়ে ফ্লোরে জমে আছে।।”
মায়া ছাঁইগুলো হাতে নিলো-“নানুমা বলল,সেবা করলে নাকি মন গলবে আপনার!অথচ আপনি আমাকে সেই সুযোগটা দিচ্ছেন কই??
আপনার একটা বিশেষ ভূমিকা আছে,সেটা কি আপনি জানেন??আপনি আমাকে যেভাবে অপমান করেন,,আমার মনে হয় না আজ পর্যন্ত কেউ সেভাবে আমাকে অপমান করতে পেরেছে!!
বেশতো,,আমি সয়ে যাই নাহয়!!দেখি আপনি সর্বোচ্চ কতটুকু যন্ত্রনা দিতে পারেন আমাকে।।
…….চলবে???
(বি.দ্র: কুকুরের তাঁড়া খাওয়ার বিষয়টি আমার জীবন থেকে নেওয়া,,,, মানে ক্লাস 5 এ থাকতে একবার সেই লেভেলের তাঁড়া খেয়েছি আরকি🙃ঐ কথা মনে পড়লে আমার এখনও রুহু কাঁপে🫠)
গল্প ঘর

