মায়ার_যাতনা #পর্ব_৮ #অরুনিতা_আঁ

0
250

#মায়ার_যাতনা
#পর্ব_৮
#অরুনিতা_আঁখি

রুদ্রের চেহারার সাথে তার কথা বলার ধরন মিলছে না।। রুদ্র এত নরম স্বরে সাথে কথা বলছে? তাও মায়ার সাথে!!মায়া যেন বিস্ময়ে কিছু বলতে পারছে না!!

~কি হলো মিসেস??এখনো উল্টো বই পড়বেন!!

এতক্ষণে মায়ার খেয়াল হলো সে বই উল্টো করে রেখেছে,,লজ্জায় আর অস্বস্তিতে ইচ্ছে করছিল দৌড়ে কোথাও চলে যেতে।।”লোকটা কি ভাবছে কে জানে!” মায়া ঘাবড়ে গিয়ে তোতলানো শুরু করলো,,

~জ্বি,, না মানে, আ.. আাসলে আমি….

~ওকে,ওকে,,রিল্যাক্স! এত ঘাবড়ানোর কিছু নেই।। তো আজকে আমার ল্যা’মন জু’স কোথায়,,হুমম??

মায়ার যেন আজকে অবাক হওয়ার দিন।।রুদ্র তো কোনোদিন তার হাতের কিছু খায় না,,,মায়া যেকোনো কিছু রুদ্রের জন্য যেভাবে রেখে যায়,, সেই জিনিসটা ঠিক সেভাবেই পড়ে থাকে,,,রুদ্র ছুঁয়েও দেখেনা!!আর আজ কিনা নিজেই খেতে চাইছে??

~জ্বি? ওইতো,,ও’খানে টেবিলটার উপর রাখা আছে।। সেখানেই তো থাকে প্রতিদিন,,আপনি’ই খান না কখনো।।

~সো,,,বেগম সাহেবা!!আপনি বরং আমার জন্য আরও একগ্লাস নিয়ে আসুন!!আর হ্যাঁ,,, সাথে চিলি পাউডার নিয়ে আসবেন।।

রুদ্রের কথা মায়া কিছু বুঝতে পারছে না।।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,,”কিন্তু স্যার,,দু গ্লাস একটু বেশি হয়ে যায় না?আপনি তো মনে হয় এখনো ডিনার করেননি!!আর মরিচ গুড়ো দিয়েই বা আপনি কি করবেন?? ”

~আপনার এত কিছু ভাবতে হবে না,,ম্যাডাম!!যা বলছি তাই করুন।।যান, যান! দ্রুত গিয়ে নিয়ে আসুন।।

মায়া আর কথা বাড়ালো না,,”পরে যদি রুদ্র আবার রেগে যায়?”।।মায়া দ্রুত নিচে গিয়ে কিচেন থেকে মরিচ গুড়োর কৌটো আর আরো এক’গ্লাস শরবত বানিয়ে নিয়ে আসলো।।

~”এইই নিন,, স্যার” মায়া রুদ্রের দিকে গ্লাস আর কৌটো এগিয়ে দিয়ে বলল।।
রুদ্রের মুখে বাঁকা তীর্যক হাসি ফুটলো,,সে এগিয়ে গিয়ে মায়ার থেকে গ্লাস আর কৌটো’টা নিলো।।কিন্তু তারপর পরেই রুদ্র যা করলো তাতে মায়া হতভম্ব হয়ে গিয়েছে!!

~”এ’কি,,স্যার!!আপনি এটা কি করছেন, শরবতে মরিচ গুঁড়ো কেন মিশাচ্ছেন??”

রুদ্র মায়ার হতবাক হয়ে করা প্রশ্নের কোন উত্তর দিলো না,,উল্টো গ্লাস দু’টোতে প্রায় অর্ধেক মরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে মায়ার কাছে এসে এগিয়ে দিয়ে বলল,,

~ “Take and drink it”..

~ড্রিঙ্ক করবো মানে??এটাতো আমি আপনার জন্য এনেছিলাম!!
-আর তাছাড়া এখানে আপনি মরিচ গুঁড়া মিশিয়েছেন,, আমি এটা কিভাবে খেতে পারি??

~”হুঁশশশশ!! নো সাউন্ড।।”
আমি তোর জন্য এত কষ্ট করে স্পেশাল ড্রিঙ্ক বানালাম!! আর তুই বলছিস খাবিনা??আমি রুড হওয়ার আগেই ভালোভাবে খেয়েনে।।

মায়া যেন এবার ভেঙ্গে এলো।।রুদ্র দু’টো গ্লাসেই ইচ্ছেমতো মরিচ গুঁড়ো মিশিয়েছে!!দু’গ্লাস তো পরের কথা! আধা গ্লাস খেলেও যে কেও অসুস্থ হয়ে পড়বে।। সে অসহায় কন্ঠে রুদ্র কে বললো,,

~স্যার,,এতক্ষণ তো আপনি ঠিকই ছিলেন এখন আবার এরকম করছেন কেন??

~”কাকের বাচ্চা,,,তোর ভাবনা দেখে আমি বারবার অবাক হয়ে যাই!!তুই কি ভেবেছিলি? আমি তোকে মেনে নিয়েছি!”মায়াকে বিদ্রুপ করে কথাটি বললো রুদ্র।

মায়া এবার শক্ত হলো,, রুদ্র কে বললো,,, “যাই হয়ে যাক না কেন,,আমি এটা কিছুতেই খাব না।।”

রুদ্র এবার নিলিপ্ত ভঙ্গিতে মায়ার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,,” খাবি না?? ”

রুদ্রকে কাছে এগিয়ে আসতে দেখে মায়া ভয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে।।রুদ্র ঠিক যতটা সামনের দিকে এগোচ্ছে,মায়া ঠিক ততটা পেছাচ্ছে!!মায়া পেছাতে পেছাতে বললো,,
~”বলছি তো খাবো না”।।

~সত্যি’ই খাবি না??

~সত্যিই খাবো না।।

~ “না” শব্দটা আমার একদম পছন্দ নয়!! “না” কে আমি যেভাবেই হোক “হ্যাঁ” করয়ে ছাড়ি,,,”বাই হুক অর বাই ক্রুক”।।

পিছনে দেওয়াল,,আর পিছানোর জায়গা নেই।।রুদ্রের হাব-ভাব ভালো ঠেকছে না।।মায়া বুঝলো,, তাকে আপাতত রুম থেকে পালাতে হবে!!
মায়া সেটাই করলো,,,সে দৌড়ে দরজার কাছে গেলো,,উদ্দেশ্য যে করেই হোক রুম থেকে পালাতে হবে!!

কিন্তু মেয়েটা আর রুম থেকে বের হতে পারলো কই!! তার আগেই রুদ্র মায়ার হাত খপ করে ধরে ফেললো।
রুদ্র মায়া কে টেনে এনে বিছানায় ফেলেছে।।মায়া বিছানা থেকে উঠতে যাবে কিন্তু রুদ্র তাকে বিছানার দুই পাশে দুই হাত দিয়ে আটকে ফেলল।।মায়া রুদ্রের দুই হাতের মাঝখানে বন্দী হয়ে আছে।।

~আমাকে যেতে দিন স্যার,, আমার ভালো লাগছে না!!

রুদ্র কিছু না বলে মায়ার দিকে গ্লাস এগিয়ে দিলো,,

~বললাম তো খাবো ন…………উম……উমমম……

রুদ্র মায়ার দু’গাল চেপে ধরে ঠোঁটে শক্ত করে গ্লাস চেপে ধরে রেখেছে।মুখে যতটুকু গিয়েছে,,তা সে গিলতে’ও পারছে না ফেলতেও পারছে না।।মায়া হাত দিয়ে গ্লাস সরানোর চেষ্টা করছে,,,একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে রুদ্রের হাত থেকে গ্লাস নিচে পড়ে ভেঙ্গে যায়।।
মায়ার জ্বীভ ও গলা জ্বলছে,,জ্বালে অনবরত চোখ থেকে পানি পড়ছে।।
কিন্তু নিষ্ঠুর রুদ্রের তাতেও মন গলেনি।। দু’সেকেন্ডের মাঝে সে একইভাবে অপর গ্লাসের তরল টুকু মায়াকে পুনরায় খেতে বাধ্য করছে!!

শরবতের বেশিরভাগ টুকুই মায়ার গায়ে পড়েছে আর বাকিটুকু তাকে গিলতে হয়েছে।। মায়া মোটামুটি ভালোই জ্বাল খেতে পারে,,,কিন্তু তবুও তার অবস্থা এখন নাজেহাল।।বুক,পেট,গলা,জ্বীভ সব যেন জ্বলে যাচ্ছে।।চোখ খুলতে পারছেনা মেয়েটা,,, কানে দিয়ে মনে হচ্ছে ধোঁয়া বের হচ্ছে!!

মায়ার অবস্থা দেখে রুদ্র পৈশাচিক আনন্দ পাচ্ছে।।সে মায়ার সামনে একটা চেয়ার টেনে পায়ের উপর পা তুলে বসে মায়ার অবস্থা দেখছে।।মুখে শয়তানি হাসি!!

~প্রতিদিন আমার এত কেয়ার করিস!!তুই তো কিছু রিএওয়ার্ড ডিজার্ভ করিস,,,এটা আমার তরফ থেকে ছোট্ট একটা রিএওয়ার্ড।।

~”আমি নোংরা বলে আমার বানানো কোন খাবার খান না,,,আমার স্পর্শে আপনার বিছানা অপবিত্র হয়ে যাবে বলে,আমাকে বিছানায় ঘুমাতে দেন না!!আমার স্পর্শ করা কোন পোশাক আপনি পড়েন না!!
তাহলে কারণে-অকারণে শাস্তি দেওয়ার নাম করে আমাকে স্পর্শ করেন কেন??আমার স্পর্শে তখন আপনার নিজেকে অপবিত্র মনে হয় না?? “…..
~~~~~~~~~~
সময় প্রবহমান!!মায়ার বিবাহিত জীবনের এক মাস কেটে গেছে!!
মাঝের কয়টা দিন একটু শান্তিতে কাটলেও এরপরের দিনগুলো কাটলো দুর্বিষহ ভাবে।।মায়ার উপর রুদ্রের ক্ষোভ যেন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে।।

কথায় কথায় অপমান করা,আঘাত করা,গায়ে হাত তোলা এগুলো তার স্বামীর নিত্যদিনের রুটিন।।
মাঝে মাঝে মায়ার নিজেকে বড্ড তুচ্ছ মনে হয়,, অসহায় লাগে নিজেকে।। ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে কোথাও চলে যেতে৷।
“কিন্তু কোথায় যাবে সে??তার যাওয়ার যে কোন জায়গা নেই!!”
~~~~~~~~~~~~~~~~
রায়হান মির্জা কে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে মায়া,,, রায়হান মির্জার এবার বেশ খারাপ লাগলো, কখন থেকে কাঁদছে মেয়েটা!!
তিনি মায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,,,
~শান্ত হও মা!!বাবা আবার খুব তাড়াতাড়ি চলে আসবো তোমাদের কাছে।।
মায়া কান্নার তোঁড়ে কথা বলতে পারছে না,,অসহায় নিষ্পাপ কণ্ঠে জানতে চাইলো,,
~”না গেলে হয় না বাবা??”

~না রে মা,,না গেলে যে ব্যবসার অনেক বড় লস হয়ে যাবে।।তুমি চিন্তা করো না,,কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই বাবা চলে আসবো।।
আর এসেই তোমাদের আবার ধুমধাম করে বিয়ে দিবো।।
এখন তো কেউই জানে না,,এসে খুব বড় অনুষ্ঠান করে আমার মেয়েকে আবার ঘরে তুলে আনবো আমি।।

মায়ার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে রায়হান মির্জা তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলো,,,,তখনই পিছন থেকে রুদ্রের চওড়া গলার আওয়াজ আসে,,,

~ড্যাড লেট হয়ে যাচ্ছে,,তুমি এখনো আসছো না কেন??

~আমি আসি রে মা, নিজের খেয়াল রাখিস!! আর রুদ্র ব্যাটা কোন বেয়াদবি করলে সাথে সাথে আমাকে ফোন করে জানাবি,, কেমন??

~জ্বি আচ্ছা,,বাবা!!তুমিও সাবধানে থেকো,,নিজের খেয়াল রেখো।।

রায়হান মির্জা চলে যাচ্ছে,,মায়া তার চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো,,, আঁখি জোরায় পানি জমলো আবারও!!
~~~~~~~~~~~~~~~
রায়হান মির্জা চলে যাওয়ার পরপরই রুদ্র বাড়ির সবগুলো সার্ভেন্টকে ছুটি দিয়ে দিয়েছে।।মায়া জানে রুদ্র এটা করেছে শুধুমাত্র ওকে কষ্ট দেওয়ার জন্য।।

রুদ্র কোথায় আছে মায়া জানেনা,,আজ এক সপ্তাহ হলো রুদ্র বাড়িতে নেই।।এত বড় বাড়িতে মায়া ছাড়া আর কেউ থাকেনা।।
মায়ার এখানে থাকতে দম বন্ধ লাগে,,কেমন গাঁ ছমছম করে!!ওর সময় কাটে না!রাত হলে পুরো বাড়িটা কেমন ভৌতিক লাগে!!
আজ এক সপ্তাহ হলো ভয়ে রাতে মায়ার ঘুম আসে না।।শেষ কবে মায়া ভালো ঘুমিয়েছে,,তা তার মনে পড়ে না।।
~~~~~~
রাত ন’টা বাজে,,,মায়া নামাজ পড়ে মোনাজাতে আল্লাহর কাছে হাত তুলে কাঁদছে!

“হে রব্বানা!! হে আমার প্রতিপালক!!তুমি আমাকে পথ দেখাও।।হে সর্বশক্তিমান খোদা,,আমাকে তুমি সাহস দাও!আমার সকল ভয় তুমি দূর করে দাও!!হে আমার করুণাময় স্রষ্টা,,আমাকে তুমি ধৈর্য দাও!!…………………………”

মায়া নামাজ শেষ করে উঠে দাঁড়িয়েছে,,,এমন সময় হঠাৎ অনবরত দরজা ধাক্কানোর শব্দে সে আঁতকে উঠলো।।
দরজা ধাক্কানোর শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে!মনে হচ্ছে আর একটু পর দরজা ভেঙেই ফেলবে!!
“এত রাতে কে আসতে পারে??”
মায়া কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করলো,,,
~”কে??”
বারবার জিজ্ঞাসা করার পরও কোন উত্তর আসছে না।।ভয়ে মায়ার হাত-পা কাঁপছে,,,কি করবে ভেবে ফেলো না।।কিছুক্ষণ ভেবে আল্লাহর নাম নিয়ে মায়া দরজাটা খুলে দিলো।।

দরজা খুলে দিতেই সামনে থাকা লোকটা হুমড়ি খেয়ে মায়াকে নিয়ে মেঝেতে পড়লো …………!!

…..চলবে??

https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/
এই গল্পের নেক্সট পার্ট এর হাইলাইট নোটিফিকেশন পেতে অবশ্যই কমেন্ট অথবা follow ফলো করে রাখুন..!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here