#মায়ার_যাতনা
#পর্ব_২০
#অরুনিতা_আঁখি
…….
“উফফ..!” ব্যথায় মায়া শব্দ করে উঠলো। মায়া নিচে বসে থেকেই কপাল আর নাক ঢলছে,,” উফ নাকটা চ্যাপ্টা হয়ে গেল মনে হচ্ছে।”
মায়া কপাল থেকে হাত সরিয়ে এতক্ষন বুজে রাখা চোখ মেলে সামনে তাকালো,, আর তাকাতেই ভীষণ সকড্ হলো,,” একি..! সামনে তো কিছুই নেই! তাহলে আমি ধাক্কা খেলাম কিসের সাথে! ”
মায়া যেন হ্যাং হয়ে আছে,,মাথায় আসছে না কিছু। ” অবশ্যই সে শক্ত কিছুর সাথেই ধাক্কা খেয়েছে,, আর এর প্রমাণ তার কপাল আর ব্যথায় ফুলে উঠা নাক।”
তাছাড়া এমনি এমনি তো আর কেউ পড়ে যায় না…!?”
মায়া নিচে কতক্ষণ থম মেরে বসে থাকলো,, তারপর কোমরে হাত চেপে আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ালো,
” আহহ..! আমার কোমরটা মনে হয় ভেঙেই গেল..।
গায়ের উপর সাইকেল পরা সত্ত্বেও তার ব্যথা মনে হয় কম হয়ে গিয়েছিল…আর এখন তাই তার পাওনা পুরো ব্যথাটুকু কোনভাবে শোধ হয়ে গিয়েছে।
_
মায়া ঘরে এসে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিয়েছে।
ভেবেছিল একটু শুয়ে রেস্ট নেবে,, কিন্তু মনে পড়লো,, “তার যে ঘুম ..! তার ওপর এখন ক্লান্ত লাগছে,,,ঘুমোলে মনে হয় না আর উঠতে পারবে। তখন তার রাতের পড়াও হবে না,,”তাই সে এখন ঘুমানোর চিন্তা-ভাবনা সরিয়ে দিল একপাশে।
“তবে ক্লান্তি ভাবটা দূর করার জন্য হলেও এক কাপ কড়া করে আদা চা চাই-ই চাই ”।
কিচেনে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে আনলো। সঙ্গে দুটো বিস্কুট খেয়ে নিলো তাড়াতাড়ি। তারপর ঘুম কাটানোর জন্য ঘরের ভেতরে কয়েক চক্কর হাঁটাহাঁটি করে টেবিলের দিকে এগোল পড়ার জন্য।
কিন্তু টেবিলের দিকে তাকাতেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
টেবিলের উপর রাখা দুটি সুন্দর গিফট বক্স— রঙিন র্যাপিং পেপার, ফুল আর ফিতায় এমন আকর্ষণীয় ভাবে সাজানো যে, গিফট খোলার আগেই কেবল বক্স দেখেই যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে।
হতবাক হয়ে বক্স দুটো হাতে তুলে নিলো মায়া।
“এগুলো এখানে কে রাখলো? দেখে তো মনে হচ্ছে কারো জন্য পার্সেল করা…”
কৌতূহলবশত আরও ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখতেই বক্সের এক কোণায় চোখে পড়লো ছোট করে লেখা একটি নাম— ‘মায়া’।
মায়া স্তব্ধ হলো „
“মানে… এই পার্সেল দুটো আমার জন্যই?”
তাকে আবার কে উপহার দিবে? তাও আবার উপহার সোজা তার ঘরের ভিতরে? এমন তো কেউ নেই!
এক মিনিট তার শ্বশুর বাবা না তো..?
রেজাল্ট পাওয়ার পর মায়ার প্রথম ফোন গিয়েছিল নানুমার কাছে। আনন্দের খবরটা ভাগ করে নিতে চেয়েছিল যাঁর সঙ্গে, তিনি তো সবসময়ই মায়ার প্রথম আশ্রয়। তারপর জানালো রায়হান মির্জাকে। খবর শুনে তিনি ভীষণ উৎফুল্ল হয়েছিলেন, সেটা মায়া ফোনের ওপার থেকেও টের পেয়েছিল।
মুহূর্তের জন্য মায়ার মনে হলো—হয়তো খুশি হয়েই রায়হান মির্জা তাকে উপহার পাঠিয়েছেন। কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধা ভর করল মনে।
দেশের বাইরে থাকা অবস্থায় তাঁর পক্ষে উপহার পাঠানো অসম্ভব নয় বটে, তবে এ-ম্যানশনের নিয়মকানুন তো কঠিন! বাইরের কেউ তো সোজা ভেতরে প্রবেশ করতেই পারে না। তা হলে উপহারগুলো এখানে এলো কীভাবে? আর কে-বা জানল মায়া রায়হান মির্জার ঘরেই থাকছে…!
এই রহস্য তাকে ভীষণ কৌতূহলী করে তুলল। কে পাঠিয়েছে এ উপহার? খোলা উচিত নাকি নয়—এই দ্বিধা তাকে খানিকক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ালো। অবশেষে সমস্ত সংশয় সরিয়ে রেখে মায়া সিদ্ধান্ত নিলো—খুলেই দেখবে।
দুটো পার্সেল—একটা বড়, একটা ছোট। ছোটটা আগে হাতে তুলে নিলো।
খুলতেই তার চোখ থমকালো —
“iPhone…!”
মায়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার হাতে থাকা বস্তুর দিকে। মারিয়ার কাছে শুনেছিল এই ফোন নাকি ভীষণ দামি,, মারিয়া তো মাঝে মাঝে মজা করে এটাও বলতো,,
“শোন দোস্ত,, তোর কিডনি বিক্রি করে হলেও আমি একটা iphone কিনবো…”
মায়ার হাত হালকা কাঁপছে,, সে রেখে দিল ফোনটা। ফোনের সাথে ইয়ার বার্ড, চার্জার আরো কি কি জানি সাথে দিয়েছে,, মায়া সেদিকে তাকালো’ও না ধরলো’ও না… তবে সেখানে থাকা আরো একটা জিনিস মায়ার দৃষ্টি কাড়লো,,, একটা নীল চিরকুট!
মায়া হাতে তুলে নিলো,,
❝
হেইই লিট্যেল বার্ড„
“দিস ইজ অ্যা লিট্যেল্ কংগ্রাচুলেশন গিফট্ ফর্ ইউ..।”
~ R·K
❞
“লিট্যেল্ বার্ড..! ,, এই নামে তো ওই বাজে লোকটা তাকে ডাকে..! “…তার মানে ঐ লোকটা তাকে গিফটগুলো দিয়েছে…!? ”…মায়া কিছু ভাবতে পারল না আর।
সে তড়িঘড়ি করে দ্বিতীয় পার্সেল্ টা খোলা শুরু করলো…..আর খুলেই দেখতে পেল– “শাড়ি..? ”
চোখ ধাঁধানো জমকালো এক কালো শাড়ি,,তার সাথে মিলিয়ে ডায়মন্ডের নোজ রিং,গলার হার ও একজোট কানের দুল…!? দেখলেই মনে হয় কোনো চুজি ফার্সন ভীষণ বাছাই করে বেস্ট টা কিনে এনেছে….. কিন্তু এত সুন্দর শাড়ি আর অর্ণামেন্টস্ মায়ার মন বিন্দুমাত্র কাঁড়তে পারেনি…!
এইসব ছাড়িয়ে তার নজরবন্দি হল আর’ও একটা নীল চিরকুট,,,মায়া তা হাতে তুলে নিয়ে পড়তে লাগলো–
❝
ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট আমার ফেভরেট কালার..।
Do you know, bird?,,তুমি দেখতে পুরোটাই ছোটখাটো একটা অ্যাঞ্জেলের মতো….।
আমি অলরেডি তোমাকে সাদা রঙে দেখে নিয়েছি,,, সাদা রঙে তোমাকে একদম হোয়াইট এঞ্জেলের মতো লাগে দেখতে….
Don’t worry,, ধীরে ধীরে তোমাকে সব রঙেই সব রূপেই দেখতে পাবো..।
তবে এখন আমি আপাতত তোমাকে ব্ল্যাক শাড়িতে ব্ল্যাক এন্জেল রূপে দেখতে চাইছি….
“সো… মিসেস রুদ্র! ”,,,চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো শাড়ি পড়ে ছাদের ওপর চলে আসবে… এবং তা যেন রাত নয়টার মধ্যেই হয়।
“আমি অপেক্ষায় থাকবো ”
R·K~
❞
মায়ার হাত থেকে চিঠিটা পড়ে গেল,,, সবকিছু ছেড়েছুড়ে মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় থপ করে বসে পড়লো সে।
“ এইগুলো কি হচ্ছে তার সাথে..! ”
রুদ্র এমন কিছু করতে পারে তা মায়া কখনো চিন্তাও করতে পারেনি। লোকটা তার ছায়াও দেখতে পারতো না,, আর সেখানে কিনা তাকে কংগ্রাচুলেট করার জন্য এসব….!
“ এসব করার মানে কি! নতুন কি উদ্দেশ্যে লোকটা তাকে এমন দামি দামি উপহার দিচ্ছে…. আর এমন অদ্ভুত আচরণ’ই বা কেন করছে!? ”
মায়া কিছু ভাবতে পারছে না,, বা চাইছে না ভাবতে!
সে কিছুক্ষণ জোরে জোরে শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো।
লোকটা তার জীবনে একদমই গুরুত্ব রাখেনা,,
তাই তাকে নিয়ে সে বিন্দুমাত্র চিন্তা-ভাবনা করে অযথা সময় নষ্ট করতে চাইছে না।
মায়া খানিক তাচ্ছিল্য হাসলো,,
“মানুষ আমাকে কী ভাবে আসলে..? এসব দামি দামি উপহার দিলেই আমি গলে যাবো..!
আর তারপর তার নোংরা উদ্দেশ্যে সামিল হবো?
উহু…তাতো হবেনা!
‘আমি মায়া’… আমার জীবনে খুব কম ঘৃণিত মানুষ আছে,,, তবে যাদের একবার ঘৃণা করা শুরু করি….তাদের দিকে আর ফিরেও তাকাই না আমি! ”
মায়া তাকালো টেবিলে রাখা শাড়ি গয়না আর মোবাইলের দিকে…
“ ইচ্ছা করছে উপহারগুলোর উপর থু*তু ছিটিয়ে দিতে… কিন্তু তা আমি করবো না।
কি ভেবেছে? দামি দামি উপহার দিয়ে আমাকে কিনে নেবে?কিন্তু আমার তো এগুলোর দিকে তাকাতে’ও রুচিতে বাঁধছে….. ”
-মুখ ফিরিয়ে নিল মায়া……।
~~~~~~~~~~
নির্জন প্রহর,,, রুদ্র সেই কখন থেকে ছাদের রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে পকেটে এক হাত গুজে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে,, সেই সাথে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে….।
আকাশ আজ ভরপুর তারা ও চাঁদের আলোতে উজ্জ্বল হয়ে আছে,,, ভীষণ পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে আকাশটাকে..!
তবে এই ঝলমলে তারকাপূর্ণ আকাশ,, রুদ্রের এখনকার অবস্থার সাথে সম্পূর্ণ বিপরীত আর বেমানান’ও বটে..!
এখন তার সিগারেটকে’ও অসহ্য মনে হচ্ছে।হাত দিয়ে সিগারেটের আগুন নিভিয়ে নিচে ফেলে পা দিয়ে ফিষলো।
তারপর পিছনে ঘুরে পুরো ছাদটাকে এক নজরে পরোখ করে নিলো..।রুদ্র নিজের হাতে নিপুনভাবে ফুল আর ক্যান্ডেল দিয়ে সম্পূর্ণ ছাদ টাকে সাজিয়েছিল একদম নিজের মতো করে…!
চাঁদের আলোয় ক্যান্ডেল লাইটে সজ্জিত ছাদের পরিবেশটা ভীষণ মনোরম হলেও… রুদ্রের কাছে এখন এই পরিবেশটা ধীরে ধীরে বিষাক্ত লাগা শুরু করেছে….।
ন’টা সেই কখন ফেরিয়ে গেছে,, এখন প্রায় দেড়টা বাজতে চললো।
রুদ্র জানে, ‘সে আসবে না ..! ’,,কিন্তু তবুও কিছু একটার আশায় রুদ্র দরজার দিকে তাকিয়ে আছে…।
….
সম্পূর্ণ রাতটা রুদ্র নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো,,একাকী নির্জন রাতটা তার মনের কোনো একটা দহনের সাক্ষী হয়ে থাকলো।
চারপাশ থেকে ফজরের সুমধুর আজানের ধ্বনি কানে আসছে,,,রাতের আধার কাটিয়ে ভোরের আলো ফোটা শুরু করেছে।…
…চলবে?
( মনে থাকলে আর জীবনেও আগবাড়িয়ে পাকনামি করে কোন কথা দিতে যাবো না। 🤦♀️
আপনাদের কথা দিয়েছিলাম,, আর তারপরের দিনই বাড়ি ভর্তি মেহমান এসে হাজির… তাদের আপ্যায়ন আর কাজ করতে করতে আমার অবস্থা এখন,,
“ ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। ”🙂)

