আমরন_চেয়েছি_তোমায় – ০৮
লেখায়_সুরাইয়া_নওশিন
০৮
আরহি সানি আর সারার দিকে তাকালো। সারা খুব আনন্দের সহিত দাঁড়িয়ে দূর আকাশ দেখছে। সারার মুখে তৃপ্তি ময় হাঁসি, মুগ্ধ দৃষ্টি দেখে বুঝা যাচ্ছে প্রাকৃতিক দৃশ্য কি সুন্দর ভাবে উপভোগ করছে। তারও ভীষণ ইচ্ছে দেখতে। কিন্তু এই নৌকাতে দাঁড়াতে ভীষণ ভয় লাগছে তার। সাফি আবারও দাঁড়িয়ে পরলো। আরহি একবার সাফির দিকে তাকালো। সাফি আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। এই প্রথম বার নৌকায় উঠেছে আরহি। ভয় ঘাপটি মেরে বসে থাকা, কেমন বিরক্ত লাগছে আরহির। আর যদি নৌকায় উঠার সৌভাগ্য না হয়। এসব ভাবতে ভাবতে আরহি সাহস করে সাফির দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,,
” স্যার”
সাফি আরহির দিকে তাকালো,
” হুম বলো”
” আমিও দাঁড়াবো।”
সাফি নিশব্দে হাঁসলো,,
” ভয় পাবে না তো”
আরহি কথার ফেরে বলে ফেলে,,
” আপনি আছেন তো ”
আরহি বাক্যটি বলে থেমে যায়। সে নিজেও জানে না এমন বাক্যটি হুট করে কেন বললো সে। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাফি। সেজন্য বিশ্বাস করতে পারছে না আরহি তাকে ভরসা করছে, বিশ্বাস করছে তার উপর আস্থা রাখছে। মনে বইলো প্রশান্তির বাতাস, অন্ধকার ভেদ করে এক চিলতে আলো। আজকের দিনটি সত্যি স্মরনীয়। সাফি আরহির দিকে হাত বাড়ালো। আরহি এক বার সাফির দিকে তাকালো আর একবার হাতের দিকে। এরপর আরহি হাত বাড়িয়ে সাফির হাতটা ধরতেই সাফি শক্ত করে চেঁপে ধরে। সাফি হাতের দিকে দৃষ্টি রেখে মনে মনে আওড়ালো,,
” তোমার এতোটুকু ভরসা আমার জয়, আমার আশার আলো, আমার স্বপ্নের প্রান ফিরে পাওয়া।”
আরহি ভয় পেলেও মনে মনে ভীষণ সাহস জুগিয়ে দাঁড়ায়। আরহি তাকিয়ে আছে দূর আকাশের দিকে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে আসছে। হয়তো বৃষ্টি নামবে। এই মুহুর্তে আকাশের সৌন্দর্য বর্ননা করা যাচ্ছে। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি যেন নিখুঁত দৃষ্টি ফেরানো দায়। বৃষ্টি হওয়ার আগ মুহুর্তে শীতল বাতাস আরহিকে মুহুর্তে সব কিছু ভুলিয়ে নিয়ে গেলো প্রকৃতির শান্তির অপরুপ এক রাজ্যে।
হুট করে নৌকা দোল খেতেই আরহি সাফির দিকে ঝুঁকে ভয়ে হাত রাখে সাফির কাঁধে। ভয়ে মৃদু স্বরে চিৎকার করে উঠে,,
” আল্লাহ পরে গেলাম। ”
সাফি নিশব্দে হাঁসে আরহির এমন কান্ডে। মানুষ এতো ভীতু কিভাবে হয় আর দিনশেষে এমন ভীতু মেয়ের পাল্লায় পরেছে সে। তার তো ঘোরাফেরা ভীষণ শখ এমন মেয়ে নিয়ে ঘোরাফেরা করতে গেলে ভীষণ কষ্ট করতে হবে তাকে। আরহি স্থির হতেই খেয়াল হয় নিজের হাতের দিকে। বার বার একই ভুল, এবার যদি ঝাড়ি মেরে বসে। এতো সুন্দর মুহুর্তে এমন ঝাড়ি সব কিছু পানি হয়ে যাবে আশেপাশে ভরা পানির মতো। আরহি ভয়ে শুকনো ঢোক গিলে সাফির দিকে পিট পিট করে তাকিয়ে ভীতু কন্ঠে বলে,,
” সরি ”
সাফি আরহির দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়। এ রকম ভয় পাওয়ার কি আছে। সে তো সম্পূর্ণ রুপে তাকে তার কাছে আসার অধিকার দিয়েছে। তাকে যদি অধিকার না দিতো এই সাফি মেহতাব খান কখনও তার হাত স্পর্শ করে, এতো নিকটে এসে দাঁড়ায়। এই মেয়ে শুধু পারে ভয় পেতে আর পালিয়ে বেড়াতে। আরহি হাত সরিয়ে নিতে নিলে সাফি অপর হাত দিয়ে সে হাত ধরে আটকে দেয়। আরহি অবাক দৃষ্টি তাকিয়ে আছে। দুজনের দৃষ্টি দুজনের দিকে। সাফি এবার আরহির উপর বিরক্ত হয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” বার বার সরি বলতে হবে না। আমি জানি তুমি ভয় পাও পাচ্ছো। আর আমি তোমাকে যেহেতু ঘুরাতে এনেছি তার মানে তোমার দেখাশোনা, ভালোমন্দ দায়িত্ব আমার। চুপচাপ এভাবে দাঁড়িয়ে থেকে যেভাবে ইনজয় করছিলে করো। ”
আরহির আনন্দ নেওয়া মুহুর্তে গায়েব হয়ে গেলো। যেভাবে সূর্য আস্তে আস্তে ঢাকা পরে যাচ্ছে কালো মেঘে। এই মানুষটার এতো নিকটে দাঁড়িয়ে কিভাবে আনন্দ করবে সে। আর মানুষটাও আজব তার জানা মতো সাফির তো এতোক্ষণে তার সুন্দর গালে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেওয়ার কথা অথচ কিছুই বলছে না। তিনি তো কখনও কোনো মেয়েকে তার নিকটে আসতে দেয় না।
এবার ভীষণ অসস্থি লাগছে তার।
মাঝি সাফি আর সানিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” স্যার বৃষ্টি আইবো মনে হয়। ”
সাফি মাঝির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” হোক ভালোই হয়। আজ দিনটা সত্যি স্পেশাল, তাই সব কিছু যেন স্পেশাল হচ্ছে। নৌকা ঘুরা সাথে বৃষ্টিতে ভেজা সত্যি অসাধারণ মুহুর্ত। ”
সানি সাফির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” ঠিক বলেছো সাফি ভাই। কিন্তু এদের দুজনকে কি করবো। ”
মাঝি বিশাল বড় কালো পলিথিন বের করে বলে,,
” সমস্যা নাই স্যার এই নেন কাগজ। ”
সারা সানির দিকে তাকিয়ে বলে,,,
” আমিও ভিজবো বৃষ্টিতে। ”
” না ভেজা শরীর নিয়ে ঘুরাফেরা করা যাবে না। বাসায় যেতে অনেক সময় লেগে যাবে। তখন ঠান্ডা লেগে যাবে। ”
” কিচ্ছু হবে না, ভিজবো আমি।”
সানি শাসনের কন্ঠে বলে,,
” না, মানে না।”
সাফি সানির দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিশব্দে হেঁসে বলে,,
” অসুখ হলে একজন পেশেন্ট বাড়লো তোর ইনকাম ও বাড়লো। ”
সানি সাফির দিকে ভ্রু কুচকে তাকায়, জানে সাফি মজা নিচ্ছে। সানি বিরক্ত হয়ে বলে,,
” শুধু শুধু অসুখ বাধিয়ে কষ্ট করার কোনো প্রয়োজন নেই। ”
মাঝি নৌকা বাইতে বাইতে দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” আপনারা কি জামাই বউ নাকি। ”
সানি এবার সুযোগ পেলো। হাত ছাড়া করবে কেন এ সুযোগ তাই চটজলদি জবাব দেয়,,
” আমরা মামাতো ভাই বোন। আর ওরা দুজন স্বামী স্ত্রী। ”
সাফি বড়সড় বিষম খেলো একটা। শুকনো কাঁশি দিলো সাফি। মনে মনে ভীষণ চটেছে সানির উপর। একবার হাতের নাগালে পেলে দেখে নিবে তাকে। সারা হা হয়ে তাকিয়ে আছে সানির দিকে। এমন মজা তাও তার ভাইয়ের সাথে। অবশ্য সানি আর সাফি দু’জন এর সম্পর্কে ভালো ধারণা তার। একে অপরের সঙ্গে অনেক গভীর বন্ধুত্ব আর ভাইয়ের সম্পর্ক। দুজন সব সময় একে অপরের পাশে থাকতে দেখেছে। কিন্তু দুজন একে অপরের সাথে এমন ধরনের মজা করে তার ধারণা ছিলো না। সানি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? স্যার ছাত্রী ঘুরতে এসেছে ভালো লাগবে শুনতে। কার মাইন্ড কেমন বুঝা যায়। এরা গ্রামের মানুষ শহরের নয়। আর বললেই তো স্বামী স্ত্রী হয় না। ”
সারা বোকার মতো বিশ্বাস করে নিলো। সারা আর আরহি স্বামী স্ত্রী হলে সত্যি ভালো হতো। তার বান্ধবী আজীবন রয়ে গেলো। মনে মনে এসব ভাবলো সারা।
এদিকে আরহি বিশাল বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে সাফির দিকে। সাফি পরিস্থিতি সামাল দিতে বলে
এভাবে কেন তাকিয়ে আছো? কোনো মেয়ের এভাবে তাকিয়ে থাকা ভালো লাগে না আমার। ”
আরহি সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে নেয়। রাগে ভয়ে লজ্জায় তার কান্না পাচ্ছে ভীষণ। আর কখনও এদের সাথে ঘুরতে আসবে না। আরহি সাফির থেকে হাত সরিয়ে দূরে সরে যেতে চাইলে সাফি আর শক্ত করে হাত ধরে নেয়। এরপর আরহির দিকে এগিয়ে গিয়ে আরহির কানে ফিসফিস করে বলে,,
” এতো কেন ভাবছো বলো তো? তোমাদের মেয়েদের একটু বেশি ভাবার স্বভাব। এখন তোমাকে যদি ছাত্রী বলে সম্মোধন করি সবাই কি ভাববে বলো তো। আর যদি বোনের বান্ধবী বলেও সম্মোধন করি তাও কি ভাববে বলো তো। সবার দৃষ্টি ভঙ্গি কেমন থাকবে ভাবতে পারছো, তাও আবার গ্রামের মানুষ। এর থেকে স্বামী স্ত্রী বললে কেউ কিছু ভাববেই না। কারও দৃষ্টি ভঙ্গি, চিন্তা ভাবনা অন্য রকম থাকবে না।
এই জন্য সানি এ কথা বলেছে। এখানে কেউ কি তোমাকে আর আমাকে চিনে। আর বললেই কি আমি তোমার স্বামী আর তুমি আমার বউ হয়ে গেলে। ”
সাফির শেষ এর কথায় আরহির ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে। কেমন এক অসস্থি পরিস্থিতিতে পরতে হলো তাকে। তাকানোর সাহস টুকু নেই তার। আরহি ইতস্তত হয়ে আশেপাশে তাকাতে লাগলো। বুক যেন অসম্ভব ভাবে কাঁপছে তার।মাঝি আবারও বলে উঠে,,
” বেশ মানাইছে আপনাগোর। ”
সানি ঠোঁট চেপে হাঁসছে সাফিকে বেকায়দা ফেলে। সব সময় তার সাথে মজা নেই। আজ সে একটু বঝুক। বড় ভাই বলে সব সময় তো আর ছেড়ে দেওয়া যায় না।
আরহি বিরক্ত হলো মাঝির উপর। মাঝিটা একটু বেশি কথা বলে। সাফি সানির দিকে চোখ পাকিয়ে তাকায় আর সানির মুখে দুষ্টুমির হাঁসি। সাফি জোর পূর্বক হাঁসার চেষ্টা করে বলে,,
” ধন্যবাদ। ”
এরই মধ্যে বৃষ্টি ফোঁটা পরতে শুরু। সানি আর সাফি বসিয়ে দিলো সারা আর আরহিকে। সারার অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বসতে হলো। কালো কাগজে খুব ভালো ভাবে ঢেকে দিলো। তবুও ভালো লাগছে দুজনের। নৌকা চলছে আপন গতিতে আর বৃষ্টির ফোঁটা পরছে ভরা বিলের পানিতে। সারা আরহির দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির ছলে বলে,,
” কেমন লাগছে ভাবি।”
আরহি সারার দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকায়। সারা এবার মুখ গোমড়া করে বলে,,
” এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? যে ভাই আমার কখনও কোনো মেয়ের সাথে অপ্রয়োজনীয় কথা বলে না সে ভাই কি সুন্দর করে তোকে প্রটেক্ট করলো, এতো সুন্দর জায়গায় নিয়ে এলো তবুও ভাব দেখাচ্ছিস। খুব তো সুন্দর তখন আমার ভাইয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলি। ”
” তোর ভাইয়ের হাত ধরা আর তোর ভাইয়ের বউ হওয়ার কোনো শখ নেই আমার। বিপদে পরে হাত ধরেছি। ”
সারা মুচকি হেঁসে বলে,,
” এরপর ইচ্ছে করে ধরবি। ”
আরহি রাগী কন্ঠে বলে,,
” সারা শা*কচুন্নি ”
সাফি সানির পাশে দাঁড়িয়ে সজোরে সানির পেটে চিমটি কাটে সাফি। ব্যাথায় কুকিয়ে উঠলো সানি। সাফি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,
” বেশি ফাজিল হয়ে গিয়েছিস তুই। ”
” তোমারই শিষ্য আমি ”
” একদম উল্টো পালটা কথা বলবি না। মেয়েটার অনেক খারাপ লেগেছে এভাবে বলে কেউ। ”
” কিছু খারাপ লাগা ভালো। মনে লাড্ডু ফোটার লক্ষন। এক তরফা লাড্ডু ফুটলে চলে নাকি। ”
সাফি দাঁতে দাঁত চেপে বলে,,
” সানি বেশি হয়ে যাচ্ছে। তোর মতো ফাজিল ছেলের সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে দিবো না। ”
” যাও পুরো দেশ খুঁজে এসো সানি মেহরাজ শিকদার এর মতো আর একটা খুঁজে পাবে কি না। সানি মেহরাজ শিকদার এর মতো তোমার বোনকে কেউ ভালোবাসবে কি না হু। রাস্তা একটু ক্লিয়ার করে দিলাম ভাব দেখাচ্ছে। আমি জানি তুমি মনে মনে ঠিক খুশি হয়েছো। একটু তো মুখ ফুটে বলো। অন্তত আমাকে বলো আর কত দিন এভাবে চেপে রাখবে কথা বলো আমায়। ”
” চুপ ”
বৃষ্টি কিছু সময় হয়ে অনেকটা থেমে গেলো। তবে দুজনের গাঁ ভিজে শরীরে লেপ্টে আছে কাপড় গুলো। চুল গুলো কপালে পরে আছে। এতটা এলোমেলো আগে কখনও দেখেনি সারা আর আরহি এদেরকে।সাফি মাঝিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” মাঝি চাচা এখানে পারে একটু নৌকা থামান। একটু এদিকে হাঁটাহাঁটি করি। বৃষ্টি তো থেমে গিয়েছে। ”
” আইচ্ছা স্যার ”
মাঝি হাঁসি মুখে পারে এসে নৌকা বাঁধলো। সানি আর সাফি দুজনে নেমে গেলো নৌকা থেকে, সারা আর আরহি তাদের দেখে নেমে পরে নৌকা থেকে। বৃষ্টি হওয়ার কারনে পানি জমে আছে, ঘাস গুলো ভেজা। সাফি আর সানি হাটঁতে শুরু করে। তাদের পেছনে পেছনে সারা আর আরহি। সাফি আর সানি কথোপকথন এর মাঝখানে আরহি আর সারার জন্য দাঁড়িয়ে গেলো। বিলের পাশ দিয়ে হাঁটছে তারা, এদিকে পানির ভয় অন্য দিকে বৃষ্টির জন্য পিচ্ছিল থাকায় দুজনে হাঁটতে বেশ হিমশিম খাচ্ছে। শহরের মেয়ে এরা এসবে একদম অভ্যস্ত নয়। সানি এদের হাটার ধরন দেখে সাফিকে ফিসফিসিয়ে বলে,,
” শিক্ষক হয়েছো ছাত্রীর উপর দায়িত্ব পালন করো। দেখো না তোমার ছাত্রীরা হাটতে ভুলে গিয়েছে।”
সাফি সানির দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকায়। সানি আবারও বলে,,
” ঠিক আছে এতো রাগ দেখাতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি তুমি একা দুজন ছাত্রীকে সামাল দিতে পারবে না তাই তো। ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব পালন করছি তোমার একজন ছাত্রীর হাটতে না হয় আমি সাহায্য করলাম। আর একজনকে তুমি দেখে নাও। ”
সাফি কিছু বলতে যাবে তখনই আরহি আর সারা তাদের কাছাকাছি চলে আসে। তাই সাফি আর কিছু বলতে পেলো না। রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সানির দিকে। সানি মিটিমিটি হাঁসছে শুধু। সাফি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” কোনো সমস্যা হচ্ছে। ”
সারা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে উঠে,,
” হ্যাঁ সমস্যা হচ্ছে। পিচ্ছিল রাস্তা আর এক দিকে পানি যদি পরে যাই। ভয় করছে আমাদের। তুমি সাথে করে নিয়ে চলো নয়তো নৌকা নিয়ে চলো। এই ভাবে হাটতে পারবো না আমরা। ”
সানি ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। সাফি মনের রাগ মনের মাঝে রেখে উপায় না পেয়ে সানিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” সারাকে হেল্প কর।”
সানি অনুরুপ ভাব নিয়ে বললো,,
” ওকে ”
সাফি দাঁতে দাঁত পিষে রাগ সংযত করবে। সেও এর কড়া জবাব দিবে। সানি সারার হাত ধরে এগিয়ে গেলো। সারা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। যে মানুষটা তাকে কখনও স্পর্শ করে নি বরাবরি দুরত্ব বজায় রেখে চলেছে অথচ হুটহাট আজ তার হাত ধরছে, তার নিকটে দাঁড়াচ্ছে।তার চাহনি, তার আচরণ, তার কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার চেনা সানি আর আজকের দেখা সানি সম্পুর্ণ ভিন্ন। অনেক তফাৎ এ দুজনের মাঝে।
এদিকে সাফি আরহির নিস্তব্ধ ভাবে হেঁটে চলেছে। সাফি আরহির হাত ধরে আছে। আজ কেন সবকিছু এলোমেলো লাগছে আরহি। কত বছর হয়ে গিয়েছে খান বাড়িতে আরহি আসা যাওয়া। সাফি এমন ব্যবহার কখনও দেখে নি, কখনও ঠিক ভাবে তাকাতেও দেখে নি। প্রয়োজন অনুসারে দু একটা কথা হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় কথা কখনও হয় নি এই দীর্ঘ বছরে। সব সময় গম্ভীর ব্যবহার দেখেছে।অথচ আজকের আচরণ কতটা ব্যাতিক্রম।
সারার অমনোযোগী থাকায় কাদায় মেখে যায় তার পা। সারা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,,
” ছি৷ কি বাজে অবস্থা। ”
সানি সারার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলো,,
” কি হয়েছে আবার। ”
সারা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে উঠে,,
” এই যে পা, কাদায় মেখে বাজে অবস্থা ”
সানি সারার পায়ের দিকে তাকায়।
” দেখে শুনে হাটতে হয় না। মনোযোগ কোথায় থাকে তোর। ”
সারা কপাল কুচকে তাকায় সানির দিকে। মনোযোগ যে তার জন্য বিঘ্ন ঘটে সেটা তাকে কিভাবে বলবে৷সানি এবার বিরক্ত ভরা কন্ঠে বলে,,
” কি হলো খোল। ”
সারা কিছুটা চমকে উঠে দ্রুত জুতো জোড়া খুলে। সারাকে আরও অবাক করে দিয়ে সানি বসে পরে। এরপর পানি নিয়ে পা পরিষ্কার করে দিতে গেলে সারা পা সরিয়ে নেয়। এভাবে পা স্পর্শ করতে দেওয়া যায়, বিষয়টি ভীষণ বেয়াদবি দেখায় তার কাছে। সানি খুবই বিরক্ত নিয়ে দৃষ্টি রাখে সারার দিকে। এরপর একটু উচ্চ কন্ঠে বলে,,
” কি হলো তোর। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। ”
সারা কিছুটা ভয় পেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। এই মানুষটার আচরণ বুঝে উঠতে পারে না সারা। এই সুন্দর ব্যবহার, আবার এই গম্ভীর একটা ব্যবহার।
অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এই মানুষটার।
সানি খুবই যত্ন সহকারে ধুয়ে দেয় সারার পা। এরপর জুতো জোড়া পরিষ্কার করে সারার পায়ের সামনে রাখে। নিজের হাতটাও ধুয়ে নিলো। সারা অবাক হয়ে তাকিয়ে সানির কান্ড দেখছে। সানি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” নে এই বার জুতো জোড়া পরে নে। আর দেখে শুনে হাট। ”
সাফি আর আরহি তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো। আরহি অবাক হয়ে দেখছিলো এই দৃশ্য। একটা মেয়ে একটা ছেলের কাছে এতোটুকু যত্ন আশা করে। যে সব সময় তাকে আগলে রাখবে, যত্ন করবে, ছোট খাটো বিষয়ও গুরুত্বের চোখে দেখবে। আরহি মাঝে মাঝে খেয়াল করছে সারার প্রতি সানির যত্ন গুলো। এই মানুষটাকি সারাকে ভালোবাসে, যদি তাই হতো তাহলে সারার গাঁয়ে হাত তুলে ছিলো কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর নিয়ে দ্বিধায় থাকলেও ছোট সারা কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলো এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে কোন দ্বিধা নেই তার। মেয়েরা যত্নের পাগল, আর যত্নের জন্য সারার ছোট বয়সে এমন কান্ড বাধিয়ে ফেলেছিলো। তবে এটা ভেবে ভয় হচ্ছে একই কান্ড সারা আবার না করে বসে। যেভাবে মানুষটি সারার যত্ন নেয়, সারার মনে একই চাওয়া আবারও বাসা বাঁধতে কতক্ষন।
সাফি আড় চোখে তাকালো আরহির দিকে। কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো আরহির চোখের ভাষা। সাফি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবারও দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলো। সানি সারা এগিয়ে এলো তাদের দিকে। সানি সাফিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” চলো ভাই। ব্রিজের উপর যাই, ওখানে ন্যাচারাল ভিউ অনেক সুন্দর দেখা যায়। ”
” হুম চল। ”
চারজনেই দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজের উপর। রাস্তার দুই পাশে গাছ। সরু এক রাস্তা। আকাশটা এখনও অনেকটা মেঘলা। সানি আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে,,
” সাফি ভাই রংধনু দেখো। ”
সানির কথায় সবাই দৃষ্টি রাখে আকাশের দিকে। সারা আর আরহি তো ভীষণ খুশি রংধনু দেখে। কত বছর পর দেখলো এমন দৃশ্য। সাফি কিছু ছবি তুলে নিলো। এরপর চারজন মিলে কিছু ছবি তুললো। সারা সাফি কে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” সাফি ভাই এখানে আগেও এসেছিলে। ”
” হুম। না আসলে চিনলাম কিভাবে। সানি যখন দেশে ছিলো তখন ওর আর আমার বন্ধুরা মিলে এসেছি। এখানে একটা মাঠ আছে ফুটবল খেলেছি আমরা। এরপর এই বিলে গোসল করে সোজা বাসায়। ”
সারা অবাক হয়ে বলে,,
” ভেজা গাঁয়ে গিয়েছো বাবা কিছু বলে নি। ”
” ড্রেস পালটে গিয়েছি। কিন্তু বাসায় লেট করে ফেরাতে ঝাড়ি খেয়েছি। সাফি বড় হয়ে তোমার এমন স্বভাব হলে ছোটোরা কি শিখবে। আর তুমি তাদের কি শিক্ষা দিবে। সানিকেও দেখি পাগলামো শিখাচ্ছো। ”
সাফি আর সানি দুজনেই শব্দ করে হেঁসে দিলো। সাফি আবারও হাঁসতে হাঁসতে বলে,,
” এরপর আমাদের ডা. সানি মিনমিনে গলায় বলতো সাফি ভাইয়ের কোনো দোষ নেই। আমি আর আমার বন্ধুরা জেদ করেছিলাম। সাফি ভাই অনেক বাধা দিয়েছিলো আমি শুনি নি। তাই বাধ্য হয়ে নিয়ে গিয়েছে। ”
এরপর সানি মুখে হাঁসি নিয়ে বলে,,
” তারপর রায়হান খান উচ্চ কন্ঠে বলে এতো কেন জেদ তোমার। শিকদার বাড়ির রক্ত বইলে জেদ তো থাকবেই। এসব জেদ খান বাড়িতে চলবে না। নিজেকে শুধরাও। ”
সাফি স্থির দৃষ্টিতে তাকায় সানির দিকে। সানির মুখে হাঁসি থাকলেও তার মন যে বিষন্নতায় ঢেকে গিয়েছে এটা জানতে তার বাকি নেই। সানির চোখের ভাষা বুঝার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে সাফির। আর এই অলৌকিক ক্ষমতার সৃষ্টির কারণ সানিকে ভীষণ স্নেহ করা। তার জীবনে স্নেহের প্রথম তালিকায় সানি। সাফি সানিকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলে,,
” আমার দোষ নিজের কাঁধে নেওয়ায় ধন্যবাদ। ”
সানি হাঁসে,,
” তুমিও তো কম নাও নি। সারা তোর হাঁটুর নিচে কাটা দাগ রয়েছে। এই দাগের কারন আমি। ”
সারা বেশ অবাক হলো আসলেই তার হাঁটুর নিচে কাটা দাগ রয়েছে। কিন্তু এই দাগ সানি কিভাবে দেখলো। পরক্ষণেই সানির সেদিনের কথা মনে পরলো। লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পরলো মেয়েটা। পরক্ষনেই নিজেকে শান্তনা দিলো তুই ছোট ছিলি আর এসব স্বাভাবিক।
সানি আবারও বলে,,
” আরহিদের বাসার সামনে ছোট একটা মাঠ ছিলো আগে সেখানে ক্রিকেট খেলতাম আমরা। একদিন আমি আর ভাই আর এলাকার কিছু ছেলে মিলে সেখানে ক্রিকেট খেলছিলাম। তুই কখনও পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিলি আমি জানি না। বল ধরতে গিয়ে আমার সাথে ধাক্কা লাগে তোর। আর তুই পরে যাস ইটের উপর। কি রক্ত ঝরছিলো তোর পা দিয়ে আর তুই কি কান্না। সাফি ভাই আর আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। তোর পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়ে খাবার কিনে দিয়ে কান্না থামিয়ে ছিলাম আমরা। আর সেই আমার দোষ ভাই কাঁধে নিয়ে কত কথা শুনেছিলো ওই দিন। ”
” তোর দোষ কোথায় ওটা জাস্ট এক্সিডেন্ট। তুই কি জানিস নাকি সারা এসেছে। ইনফেক্ট আমিও জানি না। আমরা সবাই খেলায় মগ্ন ছিলাম। এই এক্সিডেন্ট আমার ধারাও হতে পারতো। আর এই জন্য তুই,,। ”
সাফি আর কিছু বলতে যাবে এর আগেই থামিয়ে দিলো সানি কথা। সাফি আবারও জ্ঞ্যান দিতে শুরু করবে। সানির ক্রিকেট খেলা অনেক শখ ছিলো। অনেক ভালো ক্রিকেট ও খেলতো। কিন্তু ওই দিন সারা আঘাত পাওয়ার পর ক্রিকেট ব্যাট হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি নি সানি। সাফি অনেক বলেছে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু সানি সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই দিন আর ক্রিকেট খেলবে না সে। সারা কান্না আর ওর শরীর থেকে ঝরে যাওয়া রক্ত তার চোখে ভাসে। কতটা কষ্ট পেয়েছিলো মেয়েটা কয় দিন। ঠিক ভাবে হাঁটতেই পারে নি।
সানি প্রসঙ্গ পালটে বলে,,,
” চল নৌকা ফিরে যাই। একটু ঘুরে রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাসায় চলে যাই। নয়তো রাত বেশি হয়ে যাবে। ”
আরহি তাদের দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলে,,
” আপনারা এভাবে ভিজা গাঁয়ে থাকবেন ঠান্ডা লেগে যাবে না। ”
সাফি আড় চোখে আরহির দিকে তাকায়। যাক মেয়েটার খেয়াল আছে তাহলে। সানি আরহির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” এখন কিছু করার নেই। ”
সারা কপাল কুচকে বলে,,
” অন্য দের সবার বেলায় জ্ঞ্যানের ভান্ডার আর নিজেদের বেলায়। ”
সানি সারার কথায় মনে মনে নিশব্দে হাঁসে। সাফি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” আমরা তোর মতো নই একটু কিছু হলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলে নিয়ে রাখি। আর আমাদের সাথে ঘুরতে এসে তোর ঠান্ডা জ্বর বাঁধলে রায়হান খান আমাদের জীবনের জ্বর ঠান্ডা বাঁধিয়ে দিবে। ”
সাফি আর সানি উচ্চ শব্দে হেঁসে উঠে। দুজনের হাঁসির ঝংকার যতবার শুনছে তত অবাক হচ্ছে। মানুষগুলোর হাঁসি কতটা ভয়ানক সুন্দর। অথচ গোমড়া মুখে থাকে সব সময়।
তারা আবারও নৌকায় ফিরে এলো। এবার আরহি আর সারা কম ভয় পেলো। মাঝি হাঁসি মুখে বলে,,
” ঘোরাঘুরি শেষ স্যার ”
সাফি মাঝির দিকে তাকিয়ে বলে,,
” হুম চাচা শেষ। ”
মাঝি সাফি আর সানিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” আপনাগর কন্ঠে গান মেলা ভালা লাগছে। চইলাই আইছি পারে আর একটা গান কন শুনি একটু। ”
আরহি আর সারার মাঝির এই আবদার ভীষণ ভালো লেগেছে। এই সুযোগে তাড়াও শুনতে পারবে। তাদের কাছেও অসম্ভব ভালো লেগেছে তাদের দুজনের সুর। যদিও তখন বিস্মিত হয়ে ছিলো এবার মনোযোগ দিয়ে শুনবে। আরহি বুদ্ধি করে তার পার্স থেকে ফোন বের করে রেকর্ড চালু করে নিলো। সাফি আর সানি একে অপরের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেঁসে গলা ছেড়ে আবারও গাইলো দু লাইন,,
” কাছের মানুষ দুরে থুইয়া,
মরি আমি ধড়-ফড়াইয়া,রে
দারুণ জ্বালা দিবানিশি
অন্তরে অন্তরে
আমার এত সাধের মনোয়া পাখি হায়রে
কি জানি কি করে
ওরে সাম্পানের নাইয়া,
আমায় দেরে দে ভিড়াইয়া
বন্ধি হইয়া মনোয়া পাখি,হায়রে
কান্দে রইয়া রইয়া।
ওরে নীল দরিয়া
আমায় দেরে দে ছাড়িয়া ”
সাফি গান ছেড়ে বলে উঠে,,
” কত বছর পর আমরা দুজন এক সাথে গান গাইলাম বল সানি। ”
সারা আর আরহি দুজনে অবাক। আজ অবাকের উপর অবাক হচ্ছে তারা। সারা নিজের ঘোর কাটিয়ে বলে,,
” ভাইয়া তোমরা এতো ভালো গান পারো জানা ছিলো না তো। ”
সাফি সারার দিকে তাকিয়ে বলে,,
” সব কথা জানাতে হয় না। ”
সারা কপাল কুচকে বলে,,
” কি হবে জানলে। কত সুন্দর গান বলো তোমরা। আচ্ছা ভাইয়া তোমরা দেশাত্মবোধক গান ছেড়ে এসব গান কবে থেকে শিখলে। রহস্য কি বলো তো। একজন হয়তো বিদেশে কাছের মানুষ রেখে এসে বাংলাদেশে শোক পালন কারছে। তুমি কোথায় রেখে এসেছো বলো বলো, সামথিং সামথিং ভাইয়া ”
মজা ছলে সারা সাফিকে উদ্দেশ্য করে বলে। কিন্তু সানিকে উদ্দেশ্য করে বলে কথাটা খোঁচা মেরে বলে সারা। আরহি মিটিমিটি হাঁসছে। সানি কপাল কুচকে বিরক্ত হয়ে তাকায় সাফির দিকে। সাফি সারার মাথায় গাট্টা মেরে বলে,,
” ঘোড়ারডিম ঘোড়ারডিম। এতো বেশি কেন বুঝিস তুই।এই জন্যই কাউকে কিছু বলতে নেই। সব সময় মানুষ দূর্বল জায়গা আঘাত করতে বেশি ভালোবাসে।”
সারা সাফির দিকে তাকিয়ে মুখ বাঁকায়। এরপর পারে চলে এসে রেস্টুরেন্টে এসে হাল্কা কিছু খাওয়া দাওয়া করে নেয়। ৬-৩০ দিকে বেরিয়ে পরে বাড়ির উদ্দেশ্যে। আবারও দুজনের আচরণ আগের মতো গম্ভীর। সারা আর আরহির দুজনের ইচ্ছে করছে দুটোকে মকস বিলে ফেলে আসতে। সেখানের হাওয়া বাতাসটাই তাদের জন্য প্রযোজ্য। ভেজা গাঁয়ে এবার অসস্থি লাগছে সাফি আর সানির। সাফির একটু বেশি ঠান্ডা লাগছে গাড়ির বাতাসে। গলায় ঝুলিয়ে রাখা আরহির হিজাব নিজের পাশে রেখে দিলো। ভেজা কাপড় অসস্তি লাগছে ভীষন। শার্টের বোতাম দুটো বোতাম খুলে ফেলে সাফি। আরহি আড় চোখে সাফির কর্মকাণ্ড গুলো দেখছে। সাফির মুখে বিরক্তির ছাপ। ফর্সা গাল লাল হয়ে গিয়েছে, ঠোঁট জোড়া কালচে রং ধারন করেছে। সিটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইলো সাফি।
রাত ৮ টার আগে পৌঁছে গেলো সাভারে তারা। আরহির বাসার গলির সামনে গাড়ি থামালো সানি। সাফি চোখ মেলে তাকায়। আরহি গাড়ি থেকে নামতেই সাফি বলে উঠে,,
” দাঁড়াও আমি এগিয়ে দেই। ”
আরহি মিনমিনে গলায় বলে,,
” সমস্যা নেই যেতে পারবো। ”
সাফি আরহির দিকে কপাল কুচকে তাকাতেই চুপ হয়ে যায় আরহি। এরপর সাফি গাড়ি থেকে বের হতেই আরহিও বেড়িয়ে পরে। খুবই অল্প রাস্তা। কিন্তু এতটুকু রাস্তা অন্ধকার। খুব বেশি গলির ভেতর সরু রাস্তা হওয়ায় লাইট নেই এখানে।
সাফি ফোনের টর্চ জ্বালায়।এক মিনিটের ব্যবধানে আরহি দের বাসার প্রবেশ গেটে পৌঁছে যায় তারা। কিভেবে আরহিদের বাসা প্রবেশ গেট অতিক্রম করে বাড়ির ভেতরে পৌঁছে দিলো তাকে। আরজু আহমেদ বসে ছিলো চেয়ার পেতে। সাফি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। পায়ের শব্দ শুনে ঘুরে তাকায় আরজু আহমেদ। সাফিকে দেখে হাঁসি মুখে বলে উঠে,,
” আরে সাফি বাবা। ভেতরে আসো। ”
সাফি হাস্যজ্বল মুখে জবাব দেয়,,
” না চাচা অন্য কোনো দিন আসবো। আরহিকে পৌঁছে দিলাম। অনেক দিন পর ঘুরতে বেরিয়েছি একটু সময় লাগলো আর অনেক ক্লান্ত। ”
” মাঝে মাঝে ঘোরাফেরা ভালো। বয়স হলে আর পারবে না। ”
” তা ঠিক বলেছেন। আপনার শরীর কেমন? আর চাচীর কি অবস্থা। ”
” শরীর এই বয়সে যেমন থাকে৷ তবুও আলহামদুলিল্লাহ। তোমার চাচীর পা ব্যাথা ছিলো কয় দিন। এখন একটু আরাম হইছে। কয়দিন আরহি সংসার সামলালো। ”
আরহি সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। সাফি আড় চোখে আরহির দিকে তাকায়। আরজু আহমেদ আবারও বললেন,,
” ভেতরে আসো বাবা।”
” নানা চাচা আসি। সানি সারা অপেক্ষা করছে। ”
” সানি বাবারে নিয়ে একদিন আইসো। ”
” ইনশাআল্লাহ চাচা আসবো। ”
সাফি আড় চোখে আরহির দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেলো সেখান থেকে। আরহির না চাইতেও চোখ গেলো সাফির যাওয়ার দিকে। মুহুর্তে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো সাফি। সানি ড্রাইভিং সিটে হেলান দিয়ে চুপচাপ বসে ছিলো। সাফিকে আসতে দেখে আবারও ড্রাইভ করতে শুরু করে। দু_তিন মিনিটের ব্যবধানে পৌঁছে গেলো খান বাড়িতে।
সকলের আড়াল হয়ে দ্রুত গতিতে নিজের ঘরে চলে যায় সানি আর সাফি। কারও চোখে পরলে আর ভেজা গাঁয়ে দেখলে অনেক কথা হজম করতে হতো তাদের। সাফির হাতের মুঠোয় আরহির ভেজা হিজাব বাঁধা। সেটা সুন্দর করে ধুঁয়ে মেলে দিলো বেলকনিতে। নিজেও গোসল করে নিলো। এখন মাথাটা ভীষণ ধরে আসছে তার। বুঝতেই পারছে ঠান্ডা জ্বর বাঁধার লক্ষন।
কাজা নামাজ পরে নিলো সাফি। জায়নামাজ তুলতেই সারা কড়া লিকারের আদা দিয়ে লাল চা বানিয়ে নিয়ে এসে হাজির। সারা সাফির দিকে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলে,,
” নাও চা খেয়েনাও। কত সময় ভেজা কাপড়ে ছিলে ঠান্ডা বেঁধে যদি যায়। আর আমি জানি ভেজা চুলে বেশি সময় থাকলে ঠান্ডা বেঁধে যায় তোমার। নিশ্চয়ই মাথা ধরেছে এখন তোমার। ”
সাফি সারার দিকে ভ্রু জোড়া বাঁকিয়ে বলে,,
” বাপ রে বইনা আমার অনেক বুদ্ধিমতী হয়ে গিয়েছে দেখা যায়। ভালো খেয়াল রাখতে শিখে গিয়েছে। ”
” আমি বুদ্ধিমতী আগে থেকেই কিন্তু তুমি বুঝতে পারো নি। এটা তোমার দোষ হু। ”
” অপরাধ হয়ে গিয়েছে আমার। ক্ষমাপ্রার্থী আমি বইনা। ”
সারা হাল্কা শব্দ করে হাঁসে। সাফি সারার হাতে আর এক কাপ চা দেখে বলে,,
” সানির জন্য এটা। ”
” হুম ”
” ওহ আচ্ছা। দিয়ে আয় ঠান্ডা হয়ে যাবে। ”
” হুম যাচ্ছি আমি। খেয়ে নিও তুমি। ”
সানি মাত্র কাজা নামাজ পরে বিছানায় গাঁ এলিয়ে শুয়ে পরেছে। ঠান্ডা লক্ষন ইতি মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। বার বার হাঁচি আসছে। সারা বাইরে থেকে সানির হাঁচির আওয়াজ শুনে বিরক্ত হয়ে বিরবির করে বলে,,
” বাঁধিয়েছে ঠান্ডা। নিজে শখ করে ঠান্ডা বাঁধাতে পারে অন্য কারও বেলায় জ্ঞ্যানের ভান্ডার। ভন্ড ডাক্তার। ”
সারা মুখ বাঁকিয়ে সানির ঘরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কড়া নারে,,
” আসবো। ”
দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি হলো এই ঘরে প্রবেশ করে নি সে। কিছুটা সংকচ কাজ করছিলো সারার মনে। তবে সেদিকে তেমন পাত্তা দিলো না। সানি অনেকটা অবাক হলো সারার আগমনে। এতোবছর পর তার দরজায় আগমন অবাক হওয়া স্বাভাবিক। সানি উঠে বসতে বসতে বলে,,
” হুম ”
কন্ঠ কিছুটা ভারি হয়ে এসেছে ঠান্ডায়। সারা ঘরে প্রবেশ করে, কপালে ভাজ পরেছে বিরক্তির। বিরক্তির কারণ শখ করে ঠান্ডা বাঁধাতে কেন হবে। সারা সানির সামনে চায়ের কাপ বাড়িয়ে দিয়ে বলে,,
” এই নিন চা। ভালো লাগবে। ”
সানি একটু বেশি খুশি হলো, এই মুহুর্তে এই চা ভীষণ প্রয়োজন ছিলো। তবে তার বেশি খুশি হওয়ার কারন সারার মাথায় একটু বুদ্ধিশুদ্ধি বাসা বাঁধছে এই জন্য। যত্ন করতে শিখছে, দায়িত্ব বুঝতে শিখছে, খেয়াল রাখতে শিখছে বিষয়টি ভালো লাগলো সানির। মেয়েটা যা জেদি, আর উড়নচণ্ডী স্বভাবের।
সানি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলে,,
” ধন্যবাদ। ”
সারা মুখ ফুলিয়ে বলে,,
” আমি বুঝি না নিজের বেলায় মানুষের জ্ঞ্যানের ভান্ডার কোথায় যায়। ”
সানি নিশব্দে হাঁসে, কথাটা যে তাকে খোঁচা মেরে বলেছে বুঝতে বাকি নেই তার। সানি চায়ের কাপ টেবিলে রেখে আবারও হাঁচি দিলো। নাক টানতে টানতে ভারি কন্ঠে বলে,,
” উপকার ও করবি আবার খোঁচাও মারবি। তুই মানুষটা তো বেশ ভয়ংকর। ”
বাক্যটি শেষ করে সানি আবারও হাঁচি দেয়। মানুষটার শোচনীয় অবস্থা দেখে এবার খারাপ লাগে সারার। একের পর এক হাঁচি দিয়ে যাচ্ছে। সারা চিন্তিত হয়ে বলে,,
” অনেক ঠান্ডা লেগে গিয়েছে আপনার। ”
সারার চিন্তিত মুখ দেখে সানি বলে উঠে,,
” চিন্তার কিছু নেই, ঠিক হয়ে যাবে। তেমন কোন সমস্যা না। তুই যা গিয়ে রেস্ট নে। আর কাজা নামাজ পরে নিস। ”
সারার যাওয়ার ইচ্ছে না থাকলেও হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায়। মানুষটার জন্য মায়া হচ্ছে এখন। চোখ, নাক কেমন লাল হয়ে আছে।
রাত ৯ টায় খেতে বসেছে খান বাড়ির সকল সদস্য। রায়হান খান সাফিকে উদ্দেশ্য করে বলে,,
” অফিসের কাজ রেখে বাইরে এতো রাত অবব্ধি ঘোরাফেরার মানে কি? ”
সাফি খেতে জবাব দেয়,,
” আজ তেমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিলো না। যতটুকু আছে কাল সামলে নিবো আমি। ”
সানি ঠান্ডার জন্য ঠিক ভাবে খেতেও পারছে না।
রায়হান খান গম্ভীর কন্ঠে বলে,,
” সামলে নিবে বুঝলাম। এতো রাত পর্যন্ত দুটো মেয়ে নিয়ে এতো দূর ঘুরাফেরা করতে যাওয়া ঠিক। যদি ভালো মন্দ হয়ে যেতো। ”
” বাবা ওখান থেকে আমরা ৬-৩০ টার আগেই বেরিয়ে পরি আর ৮ টার আগেই এসে পরেছি বাসায়। ”
” তোমার এমন হেয়ালি পনা কথা একদম মানায় না সাফি। ওই রাস্তা সন্ধ্যায় মোটেও সেফ নয়। তুমি বাড়ির বড় ছেলে এসব তোমার মাথায় রাখা উচিত। ঘুরতে যেতে ইচ্ছে করছে শহরের ভেতরে ঘুরাফেরা জায়গা অভাব ছিলো। ”
সাফি কিছু বলতে যাবে তার আগেই সানি সাফির হাত মুঠো করে ধরে থামিয়ে দেয়। সাফি, সানি আর আর পাশে আয়াদ পাশাপাশি বসেছিলো। সানি রায়হান খান এর দিকে তাকিয়ে বলে,,
” মামা আমি যেতে চেয়েছিলাম। দেশের বাইরে ছিলাম গ্রামের পরিবেশটা হুট করে দেখতে ইচ্ছে করছিলো তাই গিয়েছিলাম ঘুরতে। ”
রায়হান খান রাগী কন্ঠে বলে,,
” ইচ্ছে হলেই সব করতে নেই। এতোটুকু জ্ঞ্যান বুদ্ধি হওয়া উচিত তোমার। এমনিতেই তোমাদের শিকদার বাড়ির রাজনীতি, শত্রুদের অভাব রয়েছে তোমার। ভালো মন্দ যদি কিছু হয়ে যেতো, তুমিও মরতে সাথে আমার ছেলে মেয়েও এটার শিকার হতো। ”
সাফির রাগে চোখ জোড়া লাল হয়ে আসছে। সানি সাফির হাত মুঠো করে শক্ত করে ধরে আছে। সানি শান্ত স্বরে জবাব দেয়,,
” সরি মামা। আমি মারা গেলেও এ বাড়ির সন্তানদের কোনো বিপদের ছায়া টুকু পরবে না। ভয় পাবেন না। ”
রবিউল খান বিষয়টি সামাল দিতে বলে উঠে,,
” আরে বাদ দাও ভাই। এতোদিন পর এসেছে ভাইবোন ঘুরতে যেতে চাওয়া স্বাভাবিক। এই বয়সে ঘুরাফেরা করতে চাওয়া দোষের কিছু নয়। ”
রায়হান খান আর কিছু বললেন না। বাড়ির মহিলা সদস্যদের আসতে দেখে চুপ হয়ে গেলেন। একবার দৃষ্টি রাখলেন সানির দিকে। সানি স্বাভাবিক ভাবে খাচ্ছে। আর ঠান্ডা লেগে যাওয়ার কারনে একটু একটু পর নাক টানছে। রায়হান খান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আবারও খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন।
সারার ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেলো। সারাদিনের আনন্দ মুহুর্তে ভুলে গেলো সে। সারা মাথা নিচু করে আড় চোখে দেখছে সানিকে। সানি কি সুন্দর স্বাভাবিক ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সারা তাকালো সাফির দিকে। সাফি মাথা নিচু করে খাবার গুলো নাড়ছে। সাফির মুখ দেখতে পারছে না বিদায় কিছু আন্দাজ করতে পারছে না সে। আয়াদ হুট করে খাবার রেখে দাঁড়িয়ে গেলো। শাহানা বেগম আয়াদকে দাঁড়াতে দেখে বলে উঠে,,
” একি বাবা খাওয়া রেখে দাঁড়ালি কেন? খাওয়া শেষ তোর। ”
আয়াদ মাথা নিচু করে জবাব দেয়,,
” হ্যাঁ বড় মা শেষ। আয়রা কোথায়। ”
” মেয়েটার ঘুমে নাজেহাল অবস্থা তাই নূরজাহান ওকে রুমে খাইয়ে দিচ্ছে। ”
” ওহ আচ্ছা। ”
আয়াদ উঠে গেলে শায়লা বেগম রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে বলে উঠে,,
” এতো বড় মানুষ এতো কম খেলে হয়। চুপচাপ সম্পূর্ণ খাওয়া শেষ কর। খাবার পাতে রাখতে নেই। ”
” প্লিজ মামুনি ক্ষিদে নেই আমার। আমি শুয়ে পরলাম ঘরে গিয়ে। ”
আয়াদ উঠে চলে যায়। সানি আর সাফির বুঝতে বাকি নেই আয়াদ কেন চলে গিয়েছে। সাফি উঠতে পারছে না সানির জন্য। শক্ত করে হাত ধরে রেখেছে তার। কিন্তু সাফির বিন্দু মাত্র খাওয়ার ইচ্ছে নেই। ক্ষিদে মিটে গিয়েছে তার।
চলবে__
https://www.facebook.com/share/1AYhCCqwqL/
https://www.facebook.com/share/g/1AufQdkZf8/
Follow গল্প ঘর ✓
আপনাদের কমেন্টের লাইক দেওয়ার মানে হল এই গল্পের পরবর্তী পর্বটি আসছে ,
তাই প্লিজ আপনাদের মন্তব্য জানান…
Comment…

