আমার উপমা তুমি (০৬)
আফরোজা আঁখি
বিছানায় জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকা কাশফিয়ার কাছে এসে বসেছে ইয়াশ। ওকে দেখা মাত্রই মুখ তুলে তাকাল কাশফিয়া, প্রচণ্ড ভয়ে জাপ্টে ধরেছে ইয়াশকে। ইয়াশের বুকে নিজের মাথা রেখে কেঁদে উঠেছে সে। ক্রন্দনরত অবস্থাতেই বলছে ইয়াশকে।
“ওই লোকটা আমাকে বাজে ভাবে ছুঁতে চেয়েছিল।”
ইয়াশ চোখ বন্ধ করে বড় বড় শ্বাস ছাড়ল। দ্বিতীয় বার ঘটনাটা মনে পড়তেই দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল মাথায়। নিজেকে কোনো রকমে শান্ত করল ইয়াশ। ওকে জড়িয়ে বসে থাকা মেয়েটার মাথায় পরম যত্নে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“ভয় নেই উপমা, আমি আছি তো।”
“আপনি তখন কোথায় ছিলেন? যদি খারাপ কিছু হয়ে যেত…”
বলেই ডুকরে কেঁদে উঠেছে কাশফিয়া। ইয়াশ ওর দুই হাতের আঁজলায় কাশফিয়ার ছোট্ট মুখটি নিয়ে চাওয়ালো নিজের দিকে। চোখের পানি মুছে দিয়ে বলল।
“এভাবে বলতে নেই উপমা। খারাপ কিছু হওয়ার সুযোগ দেব না আমি। ও যে হাত দিয়ে তোমাকে ছুঁতে চেয়েছিল, ওই হাতটাই আমি ভেঙে দিয়েছি।”
কাশফিয়া শান্ত হলো, কিন্তু মনের মধ্যে ভয় ঝেঁকে বসেছে ওর কোনোভাবেই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না। ইয়াশ হয়তো বুঝলো বিষয়টা। ওর কোলে মাথা রেখে ঘুমোতে বলল কাশফিয়াকে। মেয়েটা হয়তো অপেক্ষা করছিল এটারই। ইয়াশ বলা মাত্রই নিজের মাথা রাখলো ওর কোলে, চোখ বন্ধ করে নিল সে। ইয়াশ হাসল আনমনে, আদর করে হাত বুলিয়ে দিল মেয়েটার মাথায়।
———
পানির জগ হাতে নিয়ে ইয়াশের রুমের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল রোহি। ইয়াশের রুমের পরেই ঈশানের রুম, তারপর রোহির। দরজা খোলা ছিল বিধায় না চাইতেও চোখ পড়ল ইয়াশের দিকে। আগে তো অকারণেও আসত এই রুমটাতে। বিছানায় বসে থাকা ইয়াশকে দেখছে রোহি, তারপর আবার ওর কোলে ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকা কাশফিয়াকেও দেখছে। কিছুক্ষণ আগের রাগী ইয়াশ কোথায় গেল? ছেলেরা বুঝি এমনই হয় পুরো দুনিয়ার কাছে রাগী, আর ভালোবাসার মানুষের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষটি! আফসোসের স্বরে বলল রোহি।
“তুমি আমাকে ভালোবাসলেও তো পারতে, ইয়াশ।”
ইয়াশের মনে হলো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেউ। তাকিয়ে বলল সে,
“কে ওখানে?”
দ্রুত সরে গেল রোহি, ইয়াশও আর তেমন মাথা ঘামাল না বিষয়টা নিয়ে।
————
হসপিটালের বেডে শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে ঈশান। হাতটাতে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে, সাথে মাথায়। সেলাই লেগেছে বেশ কয়েকটা। পুরো মুখ আর হাত ফুলে আছে। সুফিয়া বেগমের কান্না চলে আসার উপক্রম ছেলের এই অবস্থা দেখে। পেটে না ধরলেও সে ছোটবেলা থেকে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে ওকে। নিজের ছেলেমেয়েদের থেকেও বেশি ভালোবাসা আর যত্নে বড় করে তুলেছেন। তাই বুঝি ইয়াশের এতটা ক্রোভ মায়ের প্রতি আর ভাইয়ের প্রতি! কী এমন ভুল করেছে ঈশান, যে এভাবে মারতে হলো ওকে? ডাক্তার আসলেন কেবিনে। সুফিয়া বেগমের পাশে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল আর আফিয়া, সহ আনোয়ার সাহেব। ডাক্তারকে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন সুফিয়া বেগম,
“আমার ছেলে ভালো হয়ে যাবে তো, ডাক্তারবাবু?”
“এক মাসের আগে বিছানা থেকে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না। ওনাকে বেড রেস্টেই থাকতে হবে কিছুদিন।
কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন সুফিয়া বেগম। স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলেন ছেলের মুখপানে। এ কি কথা শুনলেন তিনি,এতো মারই মেরেছে ইয়াশ ঈশানকে! উদ্দেশ্য কি ওর জানে মেরে ফেলাই ছিল? রাগ হলো সুফিয়া বেগমের। এক্ষুনি ইয়াশের সাথে কথা না বললে শান্ত হতে পারছেন না তিনি। শাশুড়ির মতিগতি ভালো ঠেকছে না উজ্জ্বলের কাছে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল উনাকে।
“কি হয়েছে, চাচি? শরীর খারাপ লাগছে?”
“ইয়াশের সাথে আমাকে এক্ষুনি কথা বলতে হবে, উজ্জ্বল। বাড়ি চলো। আফিয়া আর তোমার চাচা এখানে থাকবেন।”
“ঈশানেই বিষয়টা নিয়েই কি কথা বলতে চাইছেন?”
“তাছাড়া আর কী? আমাকেও তো জানতে হবে আমার এক ছেলে আরেক ছেলেকে মারতে মারতে আধমরা বানিয়েছে কোন ভুলের শাস্তি দিতে!”
“ইয়াশ কারণ ছাড়া কিছুই করে না, চাচি। ঈশান কেমন, এটাও আপনার জানা। সাংঘাতিক কোনো ভুল না করলে ইয়াশ কখনোই ওর গায়ে তুলত না।”
“আদরের শালার দোষ ঢাকছ তুমি, উজ্জ্বল?”
“ইয়াশ জেনে-বুঝে ভুল করার মানুষ নয়। আমি হলফ করে বলতে পারি, ঈশান খারাপ কিছু করেছে বলেই ইয়াশ এতটা রেগেছে। নইলে যে ছেলে একশো কথার উত্তরে একটাই কথা বলে জবাব দেয়, সে কেন কারণ ছাড়া কাউকে এভাবে মারবে!”
কথা বাড়ালেন না সুফিয়া বেগম। গাড়ি বের করতে বলে চলে গেলেন বাড়ির উদ্দেশে। আনোয়ার সাহেব আর উনার মেয়ে আফিয়া পড়ে রইল হসপিটালেই, ঈশানের কাছে।
————
ড্রয়িংরুমে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন সুফিয়া বেগম আর ইয়াশ। টানা ৩০ মিনিট ধরে উনি বলে যাচ্ছেন একই কথা কি ভুল করেছে ঈশান? কেনই বা এভাবে মেরেছে ওকে! উত্তরে একটাই কথা বলল ইয়াশ।
“তোমার ছেলে আমার কলিজায় হাত দিতে চেয়েছে, আম্মু। আমি ওকে মেরে ফেলিনি, এই অনেক। শুকরিয়া আদায় করো তুমি। দ্বিতীয় বার একই কাজ করলে আমি নিজ হাতে ওর কলিজাটা তুলে আনব। সাবধান করে দিও তোমার ছেলেকে।”
বিস্মিত নেত্রে ইয়াশের মুখপানে তাকিয়ে আছেন সুফিয়া বেগম। উচ্চারণ করলেন কেবল একটা বাক্য।
“ইয়াশ!”
প্রতিউত্তর করল না ইয়াশ। চলে গেল বাড়ি থেকে বেরিয়ে। যাওয়ার আগে সার্ভেন্টকে বলে গেছে, ঠিক টাইমে ওর রুমে গিয়ে উপমাকে খাবার দিয়ে আসতে।
————
লন্ডনের একটা বড় হসপিটালের কেবিনের বেডে শুয়ে আছে এক ২৮-২৯ বছর বয়সী যুবক। হাতে স্যালাইন, মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। শ্বাস নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে ছেলেটার। পুরো শরীর জুড়ে ব্যান্ডেজ ওর, কথা বলা তো দূরের কথা, নড়াচড়াটুকুও করতে পারছে না সে। টানা ৩ মাস ধরে ছেলেটা পড়ে আছে এভাবেই। অবস্থার কোনো উন্নতি হচ্ছে না ওর। ডাক্তাররাও এবার আশা ছেড়ে দেবে এমন অবস্থা। হসপিটালে নতুন ডক্টর এসেছে। নাম ওর #ইনায়া_রাহমান। পড়াশোনা করেছে এ দেশেই। অবশেষে ডাক্তারি করার সৌভাগ্য হয়েছে তার। হসপিটালে জয়েনিংয়ের আজ এক মাস হতে চলল মেয়েটার। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই ওর প্রধান কাজ ১০৩ নাম্বার কেবিনের রোগীকে দেখে যাওয়া। লোকটাকে এই এক মাস ধরেই দেখে যাচ্ছে ইনায়া। কেমন অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। ছেলেটার গোলগাল, ফর্সা মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। চোখের চাহনি দিয়ে কত কথা বলতে চায় সে, কিন্তু আফসোস কথা বলার শক্তিটুকুও নেই তার মাঝে। পেশেন্ট দেখা শেষ হলে কেবিন থেকে বেরিয়ে যেতে চায় ইনায়া। লোকটার চুলে কিছুক্ষণ হাত বুলিয়ে গল্প করে ওনার সাথে বিদায় জানিয়ে উঠতে নেবে তখনই মনে হলো, কেউ ওর গায়ে থাকা ওড়নাটা ধরে রেখেছে। বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল ইনায়ার। সে যা ভাবছে, সেটাই কি সত্যি? তিন মাস ধরে বেডে পড়ে থাকা পেশেন্ট কি তবে একটু একটু করে রেসপন্স করছে? অবাক হয়ে লোকটার মুখপানে তাকাল ইনায়া। কাঁপা কাঁপা হাতে মুখের মাস্কটা খুলে, অস্পষ্ট কণ্ঠে উচ্চারণ করল লোকটা।
“ইয়াশ কোথায়? আমার বোনকে পেয়েছে তো?”
ইনায়া বুঝল কৌশিকের কথা। কাছে গিয়ে দ্রুত অক্সিজেন মাস্কটা লাগিয়ে দিয়ে বলল।
“ইয়াশ বাংলাদেশ গেছে। আপনিও যাবেন, সুস্থ হয়ে উঠুন। আমি নিজে আপনাকে নিয়ে যাব।”
কষ্ট করে কিছুটা হাসল কৌশিক, চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে ক্রমাগত। তবুও আগের মতো করে বলল সে।
“আমার আর বাংলাদেশ যাওয়া হবে না।”
ইনায়ার হাতটা কাঁপছে। হঠাৎ করেই বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠেছে ওর। কৌশিকের কান্নায় ইনায়ারও কেমন কান্না পাচ্ছে। কান্না আটকে রাখতে ব্যর্থ হলো সে। পাশের চেয়ারটাতে বসেই মুখে দুই হাত চেপে ডুকরে কেঁদে উঠল ইনায়া। কৌশিক বুঝল না ইনায়ার কান্নার কারণ। সে না হয় কাঁদছে নিজের অনিশ্চিত ভাগ্যের জন্য। ইনায়া কাঁদছে কেন?
————
বিছানায় শুয়ে থাকা কাশফিয়ার গায়ে হাত দিয়ে দেখল ইয়াশ মেয়েটার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। কাঁপছে প্রচণ্ড। হুট করেই কেন হলো এমন? এদিকে আসার সময় কাশফিয়ার পছন্দের চকোলেট আইসক্রিম আর বেলিফুলের বানানো গাজরা নিয়ে এসেছিল ইয়াশ, ওকে আর দেওয়া হয়নি জিনিসগুলো। ফুলটা রেখে আইসক্রিমটা ফেলে দিয়েছে জানালা দিয়ে।বাড়িতে আপাতত কেউ-ই নেই। উজ্জ্বল খানিকক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে কোথাও। ঈশানের অবস্থা ভালো না, তাই সবাই গিয়েছেন হসপিটালে। ইয়াশকে যেতে বলা হলেও যায়নি সে। চোখের সামনে ঈশানকে দেখলে মেরেই ফেলবে হয়তো। ইয়াশ একটা নরম সুতি কাপড় ভিজিয়ে কপালে দিয়েছে কাশফিয়ার। মেয়েটা বিড়বিড় করে বলছে কী যেন! কাছে গেলে শুনল ইয়াশ বারবার বলে যাচ্ছে কাশফিয়া,
“তুমি কবে ফিরে আসবে ভাইয়া? আমার সাথে এমন লুকোচুরি খেললে আমিও কিন্তু রাগ করে চলে যাব আম্মু আব্বুর কাছে।”
কথাগুলো স্পষ্টই শুনতে পেল ইয়াশ। কৌশিকের কথাটা মাথায় আসতেই কল দিল ইনায়াকে। উপমার অসুস্থতার বিষয়টাও বলল। ইনায়া হয়তো শিখিয়ে দিল কিছু। ইয়াশ কলটা কেটে, কাবার্ড থেকে কয়েকটা ব্ল্যাঙ্কেট বের করে এনে জড়িয়ে দিয়েছে কাশফিয়ার গায়ে। তবুও শরীরের কম্পন কমছে না মেয়েটার।
ইয়াশ উঠে যেতে নিলেই ওর হাত ধরে নেয় কাশফিয়া। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে।
“যাবেন না, ওই লোকটা যদি আবার আসে! আমার খুব ভয় লাগছে।”
ইয়াশ দ্রুত কাছে গেল ওর, মাথায় হাত বুলিয়েব কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলল,
“যাচ্ছি না। তুমি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ো।”
ইয়াশের বাহু আঁকড়ে ধরেই চোখ জোড়া বন্ধ করে নিল কাশফিয়া। পাড়ি জমাল ঘুমের দেশে। কাশফিয়ার ঘুমন্ত মুখশ্রীর দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে ইয়াশ। মুচকি হেসে ওর গালে হাত ছুঁইয়ে বলছে।
“এই মেয়ে এত সুন্দর কেন? সৃষ্টিকর্তা যেন সব সৌন্দর্য ওর মধ্যেই দিয়েছেন।”
এমনি এমনি কি ইয়াশ তার নাম দিয়েছে উপমা! এই মেয়ে যে ইয়াশের মধুময় কবিতার প্রাণ! ওর অপার অনুভবের সন্ধান।
#চলবে…..
গল্প তো প্রতিদিন দিই রেসপন্স কমে যাচ্ছে কেন? এরকম হলে এই গল্প বেশিদূর এগুবে না ১০-১৫ পর্বেই শেষ করে দিব।😵💫🙂
★
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM
গল্প সম্পর্কে নিজেদের মতামত জানাতে জয়েন হন আমার গ্রুপে।
আমার গ্রুপ—https://facebook.com/groups/569604222322147

