আমার উপমা তুমি (০৮)
আফরোজা আঁখি
আজ পনেরো দিনের মতো হলো ঈশান হাসপাতালে আছে। নিয়ম করে প্রতিদিনই ছেলের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন সুফিয়া বেগম। হাসপাতালে এসেই যখন দেখতেন হাত পায়ে ব্যান্ডেজ করা ঈশান ব্যথায় কাতরাচ্ছে, মনটা খারাপ হয়ে যেত উনার। আজকে ঈশানকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। মাথা আর হাতে ব্যথা পেয়েছে অনেকটা, এখনও হাত নাড়াতে পারে না সে। ধরে ধরেই সুফিয়া বেগম বাড়ির ভিতরে নিয়ে এসেছেন ছেলেকে। সিঁড়ি বেয়ে দুতলায় উঠবে, তখনই ঈশানের ধাক্কা লাগে কারো সাথে। মুখ তুলে চাইলে দেখল ওর সামনে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশকে। শুকনো ঢোক গিলল ঈশান, দাঁড়িয়ে পড়ল গিয়ে মায়ের পিছনে। ইয়াশ এদিকে রেগেছে প্রচণ্ড, রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে ঈশানের দিকে। সুফিয়া বেগম ধমকের স্বরে বললেন ছেলেকে,
“হচ্ছে টা কি ইয়াশ! ঈশান তোমার ভাই হয়।”
“আমার চাহনিতে তোমার ছেলে জ্বলসে যাবে না আম্মু।”
শার্টের হাতে গোটাতে গোটাতে নিচে নামছে ইয়াশ। তখনই কথাটা বলেছে সুফিয়া বেগমকে। দূরত্ব খুব বেশি নয় তবুও ছেলের সম্পুর্ণ কথাটা বুঝতে পারেননি সুফিয়া বেগম।প্রশ্ন করলেন তাকে।
“কিছু বললে ইয়াশ?”
প্রতিউত্তর করল না ইয়াশ, গটগট করে হেঁটে চলে গেলো বাড়ির বাইরে। মাথায় কতো শত ভাবনা ইয়াশের,তাকে আবারও ফিরে যেতে হবে লন্ডনে, এখানে ভালো লাগছে না, কোনো কাজেই মন বসছে না। কৌশিক কেমন আছে নিজ চোখে না দেখলে যে শান্তি পাচ্ছে না মনে। যতদিন না কৌশিক ঠিক হচ্ছে, চলে যায় কীভাবে! উপমা যে তার দায়িত্ব। শুধু কি দায়িত্ব! মেয়েটার প্রতি ইয়াশের এক আকাশ পরিমাণ মুগ্ধতা। ওকে না দেখলে, কথা না বললে যে মন শান্ত হয় না ইয়াশের। এই অসুখ সারাবে কী করে?
বেশ কিছুক্ষণ পর সিমি কোথা থেকে দৌড়ে এসেছে কাশফিয়ার কাছে। হাপাতে হাপাতে ফোনটা কাশফিয়ার সামনে ধরে বলছে,
“মামাই তোমাকে খুঁজছে নতুন মামী।”
ফোনটা হাতে নিল কাশফিয়া। সেন্টার টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে দিয়ে পানি খেতে বলল সিমিকে। ফোনটা কানে ধরল সে, কিন্তু কথা না বলে নীরব রইলো। ইয়াশ বুঝল না এই নীরবতার কারণ, যে মেয়ে সারাক্ষণ কথা বলে তার সামনে, সে এখন চুপ কেন? নীরবতা ভেঙে প্রথম কথাটা বলল ইয়াশই।
“উপমা।”
“বলুন।”
“সোফার পাশের সেন্টার টেবিলের উপরে একটা শপিং ব্যাগ রেখে এসেছি, তুমি তো সেটা পেয়েছ?”
ইয়াশের কথা অনুসরণ করে কাশফিয়া তাকাল ওদিকে। চোখে পড়ল একটা শপিং ব্যাগ। বলল ইয়াশকে,
“হ্যাঁ, পেয়েছি।”
“ওগুলো পরে রেডি হয়ে নিচে আসো, আমি অপেক্ষা করছি।”
“ভাইয়ার কাছে নিয়ে যাবেন?”
কথা বলল না ইয়াশ। এই মেয়ে এত ভাই পাগল কেন? তার জন্য পাগল হলে কি খুব খারাপ হতো! ইয়াশের যে ইচ্ছে করে মেয়েটার হৃদয়ে থাকতে, মন মস্তিষ্কে বিচরণ করতে! ইয়াশ ধমক দিল উপমাকে, বলল গম্ভীর কণ্ঠে,
“ভাই পাগল না হয়ে স্বামী পাগল ও তো হতে পারো উপমা।”
“এ্যাহ! আপনি বলছেন এই কথা! তিত করলা এত মিষ্টি হলো কী করে?”
উপমার কথাটা হয়তো পছন্দ হলোনা ইয়াশের ধমকের স্বরে বলল উপমাকে,
“তাড়াতাড়ি আসবে, নাকি চলে যাব?”
“আরে বাবা, আসছি, অপেক্ষা করুন।”
ফোনকলটা কেটে দিল কাশফিয়া। সিমিও চলে গেলো রুম থেকে বেরিয়ে।
শপিং ব্যাগটা খুলতেই একটা সুন্দর নীল শাড়ি নজরে আসল কাশফিয়ার। তার সাথে সুন্দর জুয়েলারি সেট, সাথে বেলিফুলের গাজরাও ছিল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল কাশফিয়ার। এই কিছুদিনে ইয়াশের সাথে সম্পর্কটা ওর বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো হয়ে গেছে। তাই কিছু বলতে দ্বিধাবোধ করে না তেমন। তবে মাঝেমধ্যে ইয়াশের বড়সড় ধমকে ভয় পেয়ে চুপ করে যায় সে।
কাশফিয়া এখন শাড়ি পড়তে পারে। চেষ্টা করতে করতে কীভাবে যেন শিখে গেছে। আজকে সে নিজেই শাড়ি পড়েছে, মুখে হালকা মেকআপ লাগিয়েছে, ঠোঁটে গাঢ় গোলাপি রঙের লিপস্টিক। এইটুকু সাজেই অপূর্ব লাগছে ওকে। সবই ঠিক আছে, কিন্তু বেলিফুলের গাজরাটা সে চুলে গাঁথবে কী করে? ফুলটা হাতে নিয়েই বেরিয়ে গেলো কাশফিয়া। নিচে আসতেই সামনে পড়ল আফিয়া আর ইয়াশের আম্মু সুফিয়া বেগমের। চোখ রাঙিয়ে কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে আছেন মা-মেয়ে দুজনেই। আফিয়া কটমট কণ্ঠে বলছে কাশফিয়াকে,
“সেজেগুজে কোথায় যাওয়া হচ্ছে? প্রেমিকের সাথে দেখা করতে বুঝি!”
ভ্রু কুঁচকালেন সুফিয়া বেগম, রেগে বললেন মেয়েকে,
“আহ, কি হচ্ছে আফিয়া! ও তোমার ভাইয়ের বউ। এসব কথা মুখ থেকে বের করার সাহস পাও কোথায়?”
ভয়ে আর অপমানবোধে আফিয়া মাথা নিচু করে ফেলল, বলল মিনমিনে কণ্ঠে,
“এই বয়সের মেয়েদের তো প্রেম ভালোবাসার প্রতি ঝোঁক থাকে বেশি, আম্মু। আমি ওভাবে বলতে চাইনি।”
দরজার সাথে হেলান দিয়ে বুকে দুই হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে ছিলো ইয়াশ। বোনের এমন কথায় রাগ বাড়ল তরতর করে। বলে উঠল তখন,
“ওর বয়সটা তুই, রোহি আর বাড়ির প্রত্যেক মেয়েই পার করে এসেছিস, আপু! তোরা এসব করেছিস বুঝি?”
ভাইয়ের শান্ত কণ্ঠের ধমকে ভয় পেয়ে গেল আফিয়া। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল ইয়াশকে,
“কথায় কথায় এ বাড়ির মেয়েদের সাথে তোর বউকে মিলাবি না ইয়াশ।”
“হুম, মিলাব না। কারণ আমার উপমা আলাদা। কিন্তু ওকে অপমান করলে হাজবেন্ড হিসেবে আমার চুপ থাকাটা মানায় না, আপু। ঈশানের অবস্থা দেখেছ তো?”
“তুই কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস?”
“না, সাবধান করছি।”
কাশফিয়া একবার তাকাচ্ছে ইয়াশের দিকে, তো আরেকবার তাকাচ্ছে ওর শাশুড়ি আর উনার মেয়ের দিকে। বাইরে যাওয়া নিয়ে এত কাহিনি হয়ে যাবে জানলে কাশফিয়া রেডিই হতো না। সুফিয়া বেগম অতিষ্ঠ ছেলে মেয়ের তর্কাতর্কিতে। আফিয়া তো এবার বলেই দিয়েছে কান্না করতে করতে,
“দেখলে আম্মু, তোমার ছেলে কীভাবে এই মেয়ের জন্য আমাকে অপমান করে যাচ্ছে!”
“দোষ তোমার কম নয় আফিয়া। বারবার কেন নিজের নোংরা কথাগুলো দিয়ে আঘাত করো মেয়েটাকে? ও এ বাড়ির বউ, মনে রেখো তুমি।”
ইয়াশ কথা বাড়াল না আর, মায়ের কথা শুনল কিনা সন্দেহ। কাশফিয়ার হাত ধরে নিয়ে চলে গেলো বাড়ি থেকে। পথ আটকালো আফিয়া, ভাবল ভাই ওর রাগ করে বাড়ি ছেড়েই চলে যাচ্ছে হয়তো। হাতে পায়ে ধরে এক প্রকার কান্নাকাটিই শুরু করল সে। ইয়াশের ভাবমূর্তির পরিবর্তন হলো না তেমন, তবে কাশফিয়ার মায়া হলো আফিয়ার জন্য। মিষ্টি হেসে চোখের ইশারায় শান্ত হতে বলল ওকে। চলে গেলো ইয়াশের সাথে বেরিয়ে। ওদের যাওয়ার পানে তাকিয়ে আছে আফিয়া, অবাক হচ্ছে মেয়েটাকে দেখে। এ মেয়ে এত ভালো কেন? সবসময় কত অপমান করে, আর তার উত্তরে মন বুলানো একটা হাসি দেয় কেবল!
———
পড়ন্ত বিকেলে সুন্দর রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে এক জোড়া দম্পতি। সময়টা সুন্দর, চারিদিকে বাতাস বইছে। এমন সুন্দর আবহাওয়ায় ঘুরতে বেরোলে মন ভালো হয়ে যাবে যে কারোর। কাশফিয়ারও হয়েছে, কতোবার ভেবেছে, এরকম কেউ একজন আসবে তার জীবনে, ভালোবেসে আগলে রাখবে তাকে প্রতি মুহূর্তে। মাঝেমধ্যেই দুজনে মিলে প্রকৃতি দেখতে বেরোবে। হাঁটার পথে ফুচকার দোকান দেখলেই কাশফিয়া বায়না করবে তার কাছে। মানুষটাও সায় জানাবে ওর সব পাগলামিতে।
অবশেষে কি আসল সেই দিন! ইয়াশই কি তবে কাশফিয়ার কল্পনার রাজ্যের রাজকুমার! ইয়াশের ডাকে ভাবনার জগৎ থেকে বেরোলো কাশফিয়া।
“ফুল টা হাতে ঝুলিয়ে রাখার জন্য! এই সুন্দর বেলিফুল তোমার খোপাতেই মানায় উপমা।”
মুচকি হেসে ফুলের গাজরাটা ইয়াশের দিকে বাড়িয়ে দিল কাশফিয়া। বলল ওঠা গেঁথে দিতে তার চুলে। দেরি করল না ইয়াশ, কাশফিয়ার থেকে ফুলের গাজরাটা এনে ওর পিছনে গিয়ে সুন্দর মতো ক্লিপ দিয়ে আটকে দিল ওঠা। কাশফিয়া ঘুরে তাকাল ইয়াশের মুখপানে। ধ্যান ধরে তাকিয়ে রইলো ইয়াশের দিকে,আগের মতো আবারও বলে উঠল ইয়াশ।
“এই মেয়ে, কি ভাবছ এতো?”
কিছুক্ষণ ইয়াশের দিকে তাকিয়ে বলল কাশফিয়া,
“ভাবছি তিত করলা রূপী ইয়াশ রায়হানের মধ্যে এতো মিষ্টতা আসল কীভাবে?”
ভ্রু কুঁচকাল ইয়াশ। কাশফিয়ার মনে হলো ভুল করেছে সে। জিভ কেটে বলল,
“ভুল হয়েছে জনাব।”
কাশফিয়ার কথা বলার ধরন দেখে হাসল ইয়াশ। ওর হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল কিছু দূরে থাকা দোকানটায়।
খোলামেলা ছোট্ট দোকানটায় কতো রকমের চুড়ি, নূপুর আর ফুলের গাজরা। কাশফিয়া বুঝল, ইয়াশ এসব কিনে দেবে তাকে। তবুও বলল ইয়াশকে,
“আমাকে কিনে দিবেন বলে নিয়ে আসলেন বুঝি!”
“উঁহু, তুমি পছন্দ করে দিবে, আমি অন্য কারোর জন্য নিব।”
হাসিমুখটা চুপসে গেল কাশফিয়ার। ইয়াশ কি এই চুড়ি নূপুর রোহির জন্যই কিনতে চাইছে! ভিতরে ভিতরে রাগ হলো কাশফিয়ার, তবুও বুঝতে দিল না ইয়াশকে।
দু’মুঠো কাচের চুড়ি নিয়েছে কাশফিয়া, ওগুলো আবার একটা মুখ ভেংচি কেটে ইয়াশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ইয়াশকে অন্য কারো জন্য গিফট কিনতে দেখতে রাগ লাগছে কাশফিয়ার, তাই সে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে চলে গেছে কিছু দূরে দাঁড় করিয়ে রাখা ইয়াশের গাড়িটার কাছে।ইয়াশ মুখ টিপে হাসছে কাশফিয়ার রাগ দেখে।
গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাশফিয়া। ইয়াশ এসে দাঁড়িয়েছে ওর পাশে। গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে ঘুরে তাকাল কাশফিয়া। ইয়াশ ওর হাত টেনে নিয়ে আসল নিজের কাছে।
যত্ন করে চুড়িগুলো পড়িয়ে দিল কাশফিয়ার হাতে। চোখ মুখে বিস্ময় নিয়ে ঘুরে তাকাল কাশফিয়া, বলল ইয়াশকে,
“এগুলো আমার?”
“আমার বুঝি আরও কয়েকটা বউ আছে!”
ইয়াশের উত্তর শুনে কেবল হাসল কাশফিয়া, বুঝল, তাকে রাগাতেই ইয়াশ বলেছিল এভাবে।
গাড়ি চলছে, তার আপন গতিতে বাড়ির রাস্তা ধরেই যাচ্ছে কাশফিয়া আর ইয়াশ।ড্রাইভিং সিটে বসে আছে ইয়াশ, কাশফিয়া তার পাশের সিটটাতেই।ঘুরতে ঘুরতে প্রায় সন্ধ্যা এখন। আজকে কাশফিয়ার মনটা অনেক ভালো। কতোদিন পর এভাবে ঘুরলো জানা নেই তার। লাস্ট যখন কৌশিক এসেছিল কিছুদিনের জন্য দেশে, তখনই ভাইয়ের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছিল কাশফিয়া।
আচ্ছা, ইয়াশ কীভাবে জানে ওর পছন্দ অপছন্দ সম্পর্কে?
ইয়াশ যেমন ছেলে, এরকম জায়গায় ঘুরাঘুরি করা, ফুচকা খাওয়া বা ওই ছোট্ট দোকানটা থেকে গিফট কিনে কাশফিয়াকে দেওয়া এসব ওর সাথে যায় না বোধহয়। তবে কি ইয়াশ কাশফিয়ার জন্যই করল এতো কিছু! আনমনেই হাসল কাশফিয়া ভাবল মনে মনে, সে যে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসে ইয়াশকে, এটা কি ইয়াশ জানে? জানে না হয়তো। আচ্ছা, ইয়াশও তাকে পছন্দ করে যেভাবে কাশফিয়া পছন্দ করে ইয়াশকে?
বলে দেখবে একবার! মনটাকে শান্ত করতেই কাশফিয়া বলল ইয়াশকে,
“ভালোবাসেন আমাকে?”
ইয়াশের ভাবভঙ্গির পরিবর্তন হলো না তেমন। মুখটা আগের তুলনায় গম্ভীর হয়েছে আরও। ইয়াশ কি তবে রাগ করল কাশফিয়ার প্রশ্নে! ভালোবাসে না তাকে? ২য় বার একই কথা জিজ্ঞেস করল কাশফিয়া,
“কি হলো, বলছেন না যে? ভালোবাসেন না আমাকে?”
“ভালোবাসার বয়স হয়েছে তোমার?”
“বিয়ে করার বয়স হয়েছে আমার?”
কথার উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকাল ইয়াশ,রেগে বলল উপমাকে,
“মানে!”
“বিয়ে করে এখন জিজ্ঞেস করছেন, ভালোবাসার বয়স হয়েছে কিনা! ভালোবাসার বয়স না হলে তো বিয়ের বয়সও হয়নি আমার। অথচ আপনি আমাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে বিয়ে করে বসে আছেন।”
“কিসের সাথে কি মিলাচ্ছ উপমা? তুমি বিপদে পড়েছিলে বলেই আমি বাঁচিয়েছি। বিয়ে না করলে আমার বাড়িতে কোন পরিচয়ে নিয়ে যেতাম তোমাকে?”
মন খারাপ হয়ে এল কাশফিয়ার ইয়াশ তবে ভালোবাসেনা তাকে। তাহলে কেন এতো খেয়াল রাখে তার?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল আবারও ইয়াশ —– “আফটার অল, ইউ’আর মাই রেসপনসিবিলিটি।”
বিষ্মিত নেত্রে ইয়াশের মুখপানে তাকাল কাশফিয়া প্রশ্ন করল ওকে,
“কিসের রেসপনসিবিলিটি? কে দিয়েছে আমার রেসপনসিবিলিটি আপনাকে!”
একের পর এক প্রশ্ন করায় রাগ হলো ইয়াশের। বড়সড় ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিল কাশফিয়াকে। চোখজোড়া ছলছল করছে কাশফিয়ার। হৃদয়ে জন্ম নেওয়া ভালোবাসা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে মুহূর্তেই। মাথায় থাকা ফুলের গাজরা খুলে ফেলেছে গাড়ির জানালা দিয়ে। হাতের চুড়ি গুলোও অন্য হাতের চাপে ভেঙে গেছে ওর। ইয়াশ কি জানে, অষ্টাদশীর মন জুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে তার জন্য। তাকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে উপমার মন।
———
অসুস্থতা কমেছে কৌশিকের, এখন হাঁটাচলা করতেও সমস্যা হয় না খুব একটা। আল্লাহর অশেষ রহমতেই সুস্থ হয়ে উঠেছে সে। টানা ৪ মাস পর বাইরে বেরিয়েছে কৌশিক। একটা হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে ফ্ল্যাটের পুরো গার্ডেন ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে ইনায়া। হসপিটাল থেকে বাসায় নিয়ে এসেছে এক সপ্তাহ হলো। বাড়িতে ইনায়ার আম্মু আব্বু ছাড়া আর কেউ-ই থাকেন না। কৌশিক ছেলেটাকে উনারা খুবই পছন্দ করেন। হসপিটালে থাকাকালীন কতদিন কৌশিকের খাবার বানিয়ে নিয়ে গেছেন ইনায়ার আম্মু! সেজন্যই সাহস করে ইনায়া নিজের বাসায় নিয়ে আসল কৌশিককে। এখানে থাকলে সে দেখাশোনা করতে পারবে ছেলেটার।
বাইরের সুন্দর আবাহাওয়ায় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে ইনায়া। কৌশিক চেয়ারে বসে মাথা ঘুরিয়ে তাকিয়েছে ওর দিকে। এই মেয়েটাকে দেখলে ভীষণ অবাক হয় কৌশিক। কোথায় নিজের পড়াশোনা, ক্যারিয়ার আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে তা না করে মেয়েটা সারাদিন পড়ে থাকে ওর পিছেই। ইনায়া মেয়েটা যে তাকে পছন্দ করে, বিষয়টা কৌশিকের অজানা নয়। কিন্তু নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে কখনোই সাহস দেখায়নি ইনায়াকে ভালোবাসার কথা বলতে। তবে আজকে যে ইচ্ছে করছে, মেয়েটার সব ঋণ শোধ করে দিতে। এতো ভালোবাসার প্রতিদানে তাকেও ভালোবাসা ফিরিয়ে দিতে। কৌশিককে নিজের দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল ইনায়া,
“কি দেখছেন এভাবে?”
“তোমাকে দেখছি, ইনায়া।”
“দেখার মতো কি আছে আমার মধ্যে?”
মুচকি হেসে বলল কৌশিক,
“তুমি প্রচুর বই পড়ো, তাই না?”
“হুম, তা তো পড়ি। বইয়েই আমার শান্তি, আরেক শান্তি আপনাতে।”
কথাটা বলেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটল ইনায়া। লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে ওর কি বলে ফেলল এক্ষুণি! কৌশিক মুখ টিপে হাসল, ইনায়া তাকিয়ে রইলো ওর মুখপানে। কৌশিক এবার বলল ইনায়াকে,
“দেবদাস উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটা উক্তি আছে, পড়েছ নিশ্চয়ই? তবে বেঁচে থাকতে তোমাকে কোনোদিন ভুলব না, তোমাকে দেখার তৃষ্ণা আমার কখনো মিটবে না।”
ইনায়া নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে কৌশিকের মুখপানে। ওর এমন কাব্যিক কথায় কি বুঝাল? ইনায়া যেভাবে কৌশিককে ভালোবাসে, কৌশিকও কি তাকে ভালোবাসে ওভাবেই? ইনায়ার এমন চাহনি দেখে বড়কাল না কৌশিক। মেয়েটা এমন করবে সে জানত। মুচকি হেসে বলল কৌশিক,
“তোমার দিকে তাকালে আমার চোখে শান্তি লাগে, ইনায়া। এই চোখ দুটো কারণে অকারণে তোমাকেই খুঁজে বেড়ায় সারাক্ষণ।”
ইনায়া দ্রুত গিয়ে কৌশিকের সামনে বসল, ওর হাত দুটো ধরে উৎফুল্ল হয়ে বলল,
“ভালোবাসেন আমাকে?”
“তা তো একটু বাসিই।”
খুশিতে কান্না করে দেবে এমন অবস্থা ইনায়ার। এই কথাটা শুনবে বলেই তো সে অপেক্ষা করে ছিল এতদিন। অবশেষে তবে সত্যি হলো ইনায়ার স্বপ্ন কৌশিক প্রেম নিবেদন করল তাকে!
————
ঘুমন্ত কাশফিয়ার পায়ের কাছে এসে বসেছে ইয়াশ, হাতে থাকা নূপুর জোড়া একবার নেড়েচেড়ে দেখে যত্ন করে পড়িয়ে দিল ওর পায়ে। কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল মনে মনে।
“রাগ করেছ অভিমানী? অপেক্ষা করো একটু, সময় আসলে আমি তোমার সব রাগ ভাঙিয়ে দিব। বুঝিয়ে দিব এই ইয়াশের মনে উপমা ব্যাতীত অন্য কেউ নেই,ছিলো না আর আসবেওনা।”
কাশফিয়া কি শুনল ইয়াশের কথা! হয়তো না। কাশফিয়া নড়েচড়ে উঠতেই ওর ঘুম ভেঙে যাবে তাই ইয়াশ চলে গেলো রুম থেকে।
#চলবে…..

