#শুভ্রফুল — ২৫
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো
[ কপি নিষিদ্ধ ]
আলোর চোখে ঝাপসা হয়ে এসেছে। শুভ্রর শার্টে
লিপস্টিক পড়া কারোর ঠোঁটের চাপ স্পষ্ট। সে শুধু তাকিয়ে ফুঁসছে। মেনে নিতে পারছে না শুভ্র এমন করতে পারে। শুভ্র আলোর বাহু চেপে ধরে বোঝাতে চেষ্টা করলো। বললো,
” আলো স্টপ! এটা জাস্ট এক্সিডেন্ট’লি লেগে গিয়েছে। আ..
” ছাড়ুন আমায়। আমাকে বোঝাতে আসবেন না।
যা বোঝার বুঝে গিয়েছি আমি।
আলো শুভ্রর হাত ছাড়িয়ে নেই নিজের থেকে। শুভ্র
অবাকের ন্যায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। এই আলোর বিশ্বাস শুভ্রর প্রতি? শুভ্র বলে উঠলো,
” এই তোমার বিশ্বাস আমার প্রতি?
আলো রেগে বিছানায় বসে পড়লো। মাথা কাজ করছে না তার। যে মানুষটাকে সে ভালোবাসে সেই মানুষটাই তার অগোচরে অন্য নারীর সাথে ছিহ! আলোর চোখ আজ যেনো বাঁধ ভাঙলো। কান্নার তোপে কথা বলতে পারছে না ঠিক করে। তবুও বললে,
” আআমি আপনাকে যতোটা বিশ্বাস করতাম তার এক পার্সেন্ট আমি নিজেকে ও করিনি। আর আপনি অন্য নারীর ছোঁয়া নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? কেন কেন আমার সাথে প্রতারনা করলেন? কেন আমায় আশা দেখলেন? আমি কেন মরে গেলাম না। কেন বেঁচে থেকে আপনার এরুপ দেখলাম! আপনি এতো নোংরা মন মানসিকতার মা…
” আলো!
থাপ্পড় মারলো শুভ্র। মেয়েটা না বুঝে অযথাই পাগলামি করে যাচ্ছে। আলো গালে হাত রেখেও কেঁদেই যাচ্ছে। হাঁটু মুড়ে বসলো আলোর সামনে গালে হাত রেখে আদুরে স্বরে বললে,
” আলো আমি তুমি ব্যথিত কাউকে ভালোবাসার কথা ভাবতে ও পারি না। আমার জীবনে তুমি ছাড়া কেউ নেই আর আসবে ও না৷ আর এটা বোধহয় আমার ফ্রেন্ড হিয়ার সাথে আকস্মিক ধাক্কা লাগায় লেগে গিয়েছে। ও আমার বোনের মতো। আমাদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই।
তবুও আলো কিছু বলে না কেঁদে যাচ্ছে। শুভ্র জোড় করে নিজের কাছে টেনে নিলো৷ আঁকড়ে নিলো নিজের সাথে। এতে কান্নার গতি বোধ-হয় আরো বেড়ে গেলো আলোর। এবার শুভ্রর বুকে মাথা রেখে নাক টেনে কেঁদে যাচ্ছে।
শুভ্র ফের বলে উঠলো,
” আলো স্টপ ইট! এভাবে অযথা কেঁদো না আমার
ভালো লাগছে না।
” আপনার সমস্যা কোথায় আমি কাঁদবো সারা দিন সারা রাত কাঁদবো। আপনি আমার সাথে কথা বলবেন না। যান আপনি ওই মেয়ের সাথে৷ কেন আসছেন আমার কাছে?
” সরি বউ। আমি দেখলে কখনো ওই শার্ট পড়ায় থাকতাম না।
আলোর মনে সন্দেহ জাগলো। বিশ্বাস করেও করতে পারলো না। মনের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে উঠলো। এই মনে হলো শুভ্র আর তার নেই। অন্য কারোর হয়ে যাচ্ছে। কি মনে পড়তেই শুভ্রর বাহু বন্ধন থেকে নিজেকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিলো আলো।
” আমাকে ছাড়ুন। আপনি ক্লান্ত রেস্ট নিন। আমি কফি
নিয়ে আসছি।
আলো জোড় করেই শুভ্রকে কথা বলতে না দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে নিচে চলে আসলো। শুভ্র বুড়ো আঙুলের সাহায্যে কপালে স্লাইড করতে লাগলো।
মাথাটা ধরেছে বেশ। আলোর এই অবিশ্বাসে শুভ্র ও আশাহত হলো। মেয়েটা তাকে বিনা কারনে ভুল বুঝলো। এজন্যই বলে মেয়েরা একটু বেশিই বোঝে। এই বলে শুভ্র বিছানায় বসলো। আলোর অপেক্ষায় রইলো।
কবে আসবে সে।
” কি রে আলো তুই এখানে আসলি যে? জামাই আসেনি এখনো?
আলো জবাব দিলো না চুপচাপ এসে দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো। বিছানায় শুইয়ে পড়লো।
আলিয়া জাহান অবাক হলো আলোর কর্মকান্ডে।
তিনি আবারও একই ভাবে জিজ্ঞেস করলেন,
” আলো এখানে আসছিস কেন? আর আমার ঘরে
শুইয়েছিস কেন? জামাই আসেনি এখনো?
আলো বিরক্ত হলো কিছুটা। ভ্রুঁ জোড়া কুঁচকে তাকালো আলিয়া জাহান এর দিকে বললো,
” চাঁচি কে আসলো না আসলো তা দেখার আমার ইচ্ছে নেই। আমার ভালো লাগছে না আমি একটু ঘুমোবো প্লিজ আমায় একটু ঘুমোতে দাও তো।
আলিয়া জাহান চিন্তিত হলেন বেশ। আলোর মাথায় হাত বুলালেন। বললেন,
” তোর শরীর ঠিক আছে তো? এমন করছিস কেন আলো? নিজের ঘর রেখে আমার ঘরে আসছিস তাই একটু অবাক হলাম। আর এই ভর সন্ধ্যা বেলাই কেউ ঘুমোই? একটু পর খেয়ে তারপর ঘুমোবি। আর এতোক্ষণে তো জামাই চলে আসার কথা৷
” প্লিজ চাঁচি তুমি আর একটা কথা ও বলো না৷ আমায় একটু ঘুমোতে দাও। ভালো লাগছে না কিছু।
আলিয়া জাহান আর কিছুই বললেন না। আলতো করে হাত বুলাতে লাগলেন আলোর চুলের ভাঁজে। এতে খানিকক্ষণ পর-ই ঘুমিয়ে পড়লো আলো।
অন্যদিকে শুভ্র অপেক্ষা করে না পেয়ে নিচে আসলো। কেউ নেই বাসায়? মায়ের রুমের দিকে গেলো সে। আফিয়া চৌধুরী নামাজ শেষ করে উঠলেন কেবলই। শুভ্রকে দেখেই বলেন,
” কিছু বলবি?
” মম আলো এসেছে?
” না তো কেন কি হয়েছে?
” নাহ! কিছু হয়নি। হয়তো নিচে আমি দেখে আসছি।
” তোকে খুব চিন্তিত লাগছে যে।
” আমি ঠিক আছি মম।
চলে গেলো শুভ্র। আফিয়া চৌধুরী দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে বলেন,
” সব ঠিক থাকলেই হয়।
” আলো কোথায় আপনার দেখেছেন কেউ ?
স্টাফদের জিজ্ঞেস করতেই না বোধক মাথা নাড়ালো দু’জন স্টাফ বাকি দু’জন হ্যা বলতেই শুভ্র উদ্ধিগ্ন হয়ে শুধালো ,
” কোথায় ও?
” ভাবি তো ওনার চাচির রুমে গিয়েছে।
আর কিছুই বলতে হলো না শুভ্র ছুটলো গেস্ট রুমের দিকে। এই মেয়েটা শুধু শুধু রাগ করছে। দরজায় নক করলো সে। দু’একবার এর মাথায় আলিয়া জাহান দরজা খুলতেই সালাম দিলো শুভ্র,
” আসসালামু আলাইকুম চাঁচি আলো কোথায়?
বলেই ভেতরে আসলো শুভ্র।
আলিয়া জাহান সালামের উত্তর দিলো। বললো,
” ওয়ালাইকুম আসসালাম জামাই বাবা আলো তো ঘুমিয়ে পড়েছে। কি হয়েছে বলোতো? কথা ও বলছে না আমার সাথে মেয়েটা।
শুভ্র আলোর ঘুমন্ত মুখের দিকে খানিক্ষন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। চাঁচির উদ্দেশ্যে বললো,
” মেয়েটা বড্ড অবুঝ চাচি। আমি ওকে নিয়ে গেলাম।
” ঘুম ভেঙে যাবে বাবা।
” সমস্যা নেই।
যেই না আলোকে কোলে নিতে নিবে ওমনি আলো
হকচকিয়ে ওঠে তাকালো শুভ্রর দিকে। চোখে ঘুম ঘুম ভাব। সেইভাবেই বলে উঠলো,
” আপনি এখানে ? চাঁচি কোথায়? চাচি তুমি ওনাকে আসতে দিলে কেন?
” আলো ফালতু কথা বন্ধ করো। রুমে চলো আমার সাথে।
” আমি আজ থেকে চাচির সাথেই থাকবো। আমি যাবো না আপনার সাথে। প্লিজ আপনি এখন আসুন। আমাকে ঘুমোতে দিন।
” আলো কি শুরু করেছিস জামাইয়ের সাথে। তার সাথে তোর ঘরে যা।
” আলো পাগলামি করো না। ঘুমোবা তো রুমে আসো এখানে চাচিকে ডিস্টার্ব করছো কেন?
” আমি নয় পাগলামি আপনি করছেন। আপনি আমি থাকার পর ও.. প্লিজ আমায় একটু শান্তি দিন। আর কিছুই বলতে চাচ্ছি না।
আলোকে আর ছাড় দিলো না শুভ্র। জোড় করেই তার সাথে করে নিয়ে গেলো পাঁজা কোলে করে তাদের রুমে।
” কোনো ধরনের সিনক্রিয়েট করো না আলো। এটা
জাস্ট একটা এক্সিডেন্ট ছিলো আর কিছুই নয়।
ছোট্ট একটা ইস্যুকে এতো বড় করে দেখার মানে কি?
আলো জোরজবরদস্তির মধ্যেই উত্তর দিলো।
” পরকীয়া। আপনি আমি ছাড়া অন্য নারীর সাথে
রিলেশনে আছেন।
” থাপড়াইয়া সবগুলো দাঁত ফেলে দিবো আলো।
মেজাজটা খারাপ করো না।
আলো ছুটতে না পেড়ে কামড় বসালো শুভ্রর কাঁধের মধ্যে। শুভ্রর লাগছে কিন্তু, শব্দ করছে না সে।
পুরোটা রাগ সেই কামড়ে মধ্যে ছেড়ে দিলো। শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে নিলো। কটমট করে বললো,
” শান্তি পেয়েছো এবার আর একটা শব্দ ও উচ্চারন করবে না৷ চুপচাপ আমার সাথে যাবে। আর আমি যা বলবো তাই শুনবে।
” আমি কেন শুনবো আপনার কথা?
” তো কার কথা শুনবে তুমি?
আলো ও ত্যারামি করে বললো,
” আমি? আমি ও কারোর সাথে সম্পর্কে জড়াবো তারপর তার কথা শুনবো।
” মাইর দিবো?
” দিন আমি থানায় গিয়ে নারী নির্যাতনের মামলা করবো।
” ফাজিল মেয়ে বসো এখানে।
” আমি ফাজিল নয়। আপনি অন্যায় করেছেন আপনার শাস্তি হওয়া উচিত। নয়তো আপনি আমাকে হারাবেন।
” আলো সাধারণ একটা বিষয়কে এভাবে অসাধারণ বানানোর কোনো ওয়ে তো আমি দেখছি না?
আলো বললো,
” আমি দেখছি তো। আপনার শার্টের ওই ঠোঁটের লিপস্টিকের চাপটা। কে সে কোন বান্দুবি আপনার? আমি কথা বলবো তার সাথে। কেন আমার জামাইয়ের দিকে নজর দিবে সে?
” আলো একটু বেশিই বাড়াবাড়ি হচ্ছে না?
আলো হঠাৎই শুভ্রর সামনে এসে দাঁড়ালো। শুভ্র তাকালো আলোর মুখপানে। অদ্ভুত দৃষ্টিতে আলো তাকিয়ে আছে। বলে,
” আমি যদি হারিয়ে যায় আপনার কষ্ট হবে?
” আবোলতাবোল বকছো কেন?
” আমি নয় আমার মনে হচ্ছে কেন জানি আপনি আমার জীবন থেকে হারিয়ে যাবেন৷
” উলটাপালটা টেনশন করছো কেন?
” আপনার অদ্ভুত আচরনের জন্য। আজ শার্টে কাল গলায়, পরশু সাথে করে নিয়ে আ…
কথা বলতে পারলো না আলো। আলোর কাঁপা কাঁপা ওষ্ঠ জোড়া দখল করে নিলো শুভ্র। আলো ছটফট করতে লাগলো শুভ্রের থেকে ছাড়া পাওয়ার। শার্ট কামছে ধরছে কিন্তু, শুভ্র ছাড়লো না কামড় বসালো ঠোঁটে। আর একটু কাছে এগিয়ে আসলো। দু’টো হাত
পেছিয়ে নিলো লতানো কোমর খানা। দূরত্ব গুছিয়ে মিশিয়ে নিলো নিজের সাথে। ছেড়ে দিলো শুভ্র। দম নিয়ে বললো,
” শুভ্রের জীবনে কেবল একজনই রয়েছে সী ইজ মাই ওয়াইফ এন্ড মাই লাভ শুভ্রফুল! তুমি ব্যথিত আমি নিজেকে ভাবতে ও পারি না আর তুমি আমায় নিয়ে কতদূর চলে গিয়েছো। এই তোমার ভালোবাসা?
” আমাকে ছেড়ে দিন। আমি জানতে চাই না কিছু।
” যেখানে বিশ্বাস নেই সেখনে ভরসা ও নেই আলো।
আলো তাকালো শুভ্রর দিকে, অসহায় হয়ে বলে,
” জন্ম নিয়েছি যেহেতু মরতে হবেই এটা যেভাবে বিশ্বাস করি, ঠিক আপনি আমার পাশে আমার ছায়া হয়ে থাকবেন সেটা ও বিশ্বাস করি। কিন্তু, পরিস্থিতি আর সময় মানুষকে পাল্টে দেয়। কথা, বিশ্বাস কিছুই থাকে না। আমার ভয় হয় আপনাকে হারানোর।
শুভ্র আলোর কপালে চুমু খেলো। নিজের কাছে ঠেনে নিলো পরম যত্নে। অতঃপর বললো,
” এই আমার প্রতি তোমার এতো বিশ্বাস! এই বিশ্বাস আমি আমার কাছে আমানত হিসেবে রাখলাম আজীবন। কখনো হেরফের হবে না আলো ।
” কখনোই ছেড়ে যাবেন না। আপনি ছাড়া আমার কেউ নেই।
” ভালোবাসি শুভ্রফুল। ভিষণ ভালোবাসি।
” ভালোবাসি চৌধুরী সাহেব।
চলবে,,,,,,,

