শুভ্রফুল—২ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
45

#শুভ্রফুল—২
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

চোরের মতো চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো আলো। মিহুল ছেলেটা তার আসা যাওয়ার পেছনেই পড়ে থাকে। তাই তড়িঘড়ি করে পা ফেলে কোনোরকমে রিকশা নিয়ে বাসার উদ্দেশ্য রওনা দিলো আলো। হাত পা কাঁপছে তার। বিশ্বাস হচ্ছে না মানুষটা তার চোখের সামনে ছিলো পুরো চল্লিশ মিনিট। তবে নিজের বাড়ি না এসে কোথায় ঠাই নিলো লোকটা? ভাড়া বাসা নাকি,
মনটা বিষাদে চেয়ে গেলো আলোর মুহুর্তের মধ্যে। যার বাড়ি, যার পরিবার, শুধু তার জন্য সে-ই দূরে সরে গেলো। কাছে এসে ও দূরে আছে। কি করা উচিত আলোর এখন? ছেড়ে চলে আসতে হবে চৌধুরী বাড়ি। মুছে আসতে হবে দীর্ঘ তিন বছরের মায়া। ফেলে আসতে হবে না থাকা একজন প্রিয় মানুষের ঘরময় জিনিসের স্মৃতি! উহুম এ মানার নয়। দম বন্ধ হয় আসছে ভাবতে গেলে। কেন তার প্রতি এতো বিতৃষ্ণা। আচ্ছা তার কি কোনো প্রিয়জন আছে? মামুনি বাবা তো জানে না। এমনকি চৌধুরী বাড়ির কেউই তো জানে না। তাহলে কেন এতো হেলাফেলা তার প্রতি। যার জন্য
মা বাবাাকে ও ত্যাগ করা যায়। এতো অযোগ্য তুই আলো? তুই কিভাবে মা-বাবার কাছ থেকে তাদের সন্তানকে আলাদা করতে চাইছিস? মা বাবা ছাড়া জীবনটা কতটা কষ্ট তুই তো তা হারে হারে অনুভব করেছিস। তাহলে কেন তুই অন্যের কষ্টটা বুঝতেছিস না কেন আলো? তুই সবাইকে এক করে দিয়ে দূরে চলে আয়। জীবনে কারোর অবহেলা পাওয়ার থেকে একা থাকা ভিষণ ভালো। আর যেখানে মনে থাকা মানুষটায় অবহেলা অবজ্ঞা করছে।

আলো নিজের প্রশ্নে নিজেই জড়িয়ে যাচ্ছে বার বার। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে। লোকটার না বলা কথা আর তার এহেন কাজে স্পষ্ট বুঝতে পারছে আলো। আলোর এই বাড়ি ছাড়লেই তবে শুভ্র বাড়ি আসবে। নয়তো কখন দেশে আসলো লোকটা কেউ জানলো না কেন? নিশ্চয়ই তার থাকার কারনে আসেনি।

” মামা চলে আসছি তো।

রিকশাওয়ালা মামার কথায় ধ্যান ভাংলো আলোর। সে ব্যাগ থেকে টাকা বের করে ভাড়া মিটিয়ে গেইটের ভেতর ডুকতেই সামনে একজনকে দেখে ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো।

” আলো শুভ্র দেশে আসছে। কথাটা খালামনি ও আংকেল জানতে পেরে কান্না করছেন। কেন জানো ?
কারন সে বাড়ি আসেনি বরং ফ্ল্যাট নিয়েছে। আলাদা থাকবে এতো বড় বাড়ি থাকতে ও শুধু তোমার জন্য বাড়ি ছেড়ে সবাইকে ছেড়ে আলাদা থাকছে। এতো গুলো বছর থেকে ও এখন ও একা থাকবে নিজ দেশে এসে। কেন পরিবারটাকে ধ্বংস করছো তুমি? চলে যাওনা আমাদের জীবন থেকে।

বিরক্ত হলো আলো। এই মেয়েটা তাকে প্রতিনিয়ত
অপমান করে বাড়ি থেকে বের হওয়ার কথা বলে।
এমনিতেই মন মেজাজ ভালো না।

” এটা আমার শশুর বাড়ি। আর তুমি এই বাড়ির মেহমান অতিথি। ওনি যেহেতু আসছে যা করার
মামুনি আর বাবা করবেন। তোমাকে কেউ দায়িত্ব দেয়নি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলার। মেহমান মেহমানের মতো থাকো।

আলোর কথায় অতিথি রেগে গেলো। চোখ মুখ কাঠিন্যে করে বলে উঠলো,

” আর একটা কথা ও বলবি না আলো। অনেক সহ্য করেছি তোকে আমি। তোর কারনে খালামনি আমায় আগের মতো ভালোবাসে না। আমার এই বাড়ির বউ হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলো না। আমি যে কবে থেকে শুভ্র ভাইকে ভালোবাসি সেটা কেউ বুঝলো না।

” ভদ্র ভাবে কথা বলো অতিথি। আমাকে বোকা ভেবো না। মামুনি জানতো এই বিষয়টা। তিনি চান না আত্মীয়তায় নতুন করে আত্মীয় হোক। আর মামুনির কথা বাদই দিলাম যার জন্য তুমি এই বাড়িতে আসতে চাইছো সে তো তোমাকে চাই না বরং একমাত্র আদরের বোন ছাড়া কিছুই ভাবে না। এইখানে আমাকে
টানছো কেন?

” স্টপ আলো। এসব কথা আমি শুনতে চাইনি। বরং শুভ্র ভাইয়া যে তোমাকে ডিভোর্স পেপারে সিগনেচার করে পাঠিয়েছে সেটাতে সাইন করে বিদায় হও বাড়ি থেকে। নির্লজ্জ মেয়ে কোথাকার যেখানে হাসবেন্ডই দেখতে পারে না। তার জন্য বাড়ি ছাড়া সেখানে বেহায়ার মতো পড়ে আছে। লজ্জা করে না। মা আর বাবার কাছ থেকে সন্তান কে আলাদা করতে? বুঝি বুঝি সবই টাকার…

টা’সসসস!

ক্রোধান্নিত হয়ে চিৎকার করে উঠলো অতিথি।

” আলোওওওও!

” চিৎকার করো না অতিথি। আমি ভালোবাসার লোভী। মা বাবার জন্য পড়ে আছি এখানে। তার সাথে টাকার নাম ভুলে ও আনবা না। নরম বলে যা নয় তা বলবা তা তো আলো মেনে নেবে না। এই থাপ্পড়ের কথাটা মনে রেখো।

আলো ভেতরে চলে গেলো।

আলোর যাওয়ার পানে গালে হাত দিয়ে ক্ষোব্দ নয়নে তাকিয়ে ফুঁসছে অতিথি। রাগে নিজেকেই নিজে আচাড় মারার ইচ্ছে করছে তার। সকলের আদরের মনি আর তার একমাত্র শুত্রু। তার সব কেঁড়ে নিয়েছে এই মেয়েটা। ছাড়বে না সে আলোকে।

__________

” আলো কোথায় আহি ?

আহি আনমনে বসেছিলো গালে হাত দিয়ে। একা একা ভালো লাগে নাকি। হঠাৎ মিহুলের কন্ঠস্বর শুনে তাকালো সে। বললো,

” চলে গেছে ভাইয়া।

মিহুল হতাশ হলো। কিছুক্ষণ ভেবে বললো,

” ঠিক আছে আমি আসছি।

” আচ্ছা ভাইয়া।

মিহুল চলে যেতেই আহি গালে হাত দিয়ে মিছে মন খারাপ করে বেসুরো গলায় বলতে লাগলো,

” জীবন মানেই পড়াশোনা…..
বেঁচে থাকতে এই পড়া শেষ হবে না।

শেষ হবে তো বিয়ে সাদী করলে। কিন্তু আমাকে তো তারা বিয়ে দিবে না। একটা বয়ফ্রন্ড ও নাই যে বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করবো। সে ছোটখাটো একটা জব করবে আর আমি তার জন্য মন থেকে ভালোবেসে আমার ফেবারিট ডিম ভাজি করবো। সে আমার প্রশংসা করে বলবে,

” বউওওও লাভ ইউ! কে বলছে তুমি রান্না পারো না। এই যে তোমার প্রতিদিনের রান্নার রেসিপি ডিম ভাজি, ডিম ভুনা, ডিমের অমলেট, সিদ্ধ ডিম, এতো এতো মজা কি বলবো। তোমাকে তো এওয়ার্ড দেওয়া উচিত।

আর আমি লজ্জায় তার বুকে মুখ লুকাবো। ইশশ কি সুন্দর ফিলিংস!

” আপাতত বইয়ে মুখ লুকান ম্যাম তারপর জামাইয়ের বুকে।

চমকে উঠলো আহি। তার বিরবির করা কথা কে শুনে ফেললো? তাকাতেই লজ্জায় সত্যিই ভয়ে মুখ লুকালো আহি ।

সামনে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে রাফিন। তার হাসি পাচ্ছে ভিষণ কিন্তু এখানে হাসা যাবে না। তাই সে হাসি চেপে খানিকটা গম্ভীর স্বরে বললো,

” হয়েছে আর লজ্জা পেতে হবে না। আফসোস করিস না। বয়ফ্রেন্ড না জুটলে ও জামাই ঠিকই একটা জুটবে
তোর ফাঁটা কপালে। তার আগে পড়াশোনা কর। মিহুল
আসছিলো এখানে? কোথাও পাচ্ছি না যে।

মিহুল ও রাফিন ফ্রেন্ড হয়। মিহুল আহির চাচাতো
ভাই। সব সময় এই আজাইরা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা
শুধু রাফিন ভাইয়ার সামনেই ঘটতে হয়? সব সময় লজ্জায় পড়তে হয়। তাকানোই যায় না সবসময় মাথা নিচু করে যেতে হয়। পুরনো এমন লজ্জাকর ঘটনা মনে পড়ে যায়। ওই ভাবেই মুখ লুকিয়ে জবাব দিলো আহি,

” এসেছিলো তারপর চলে ও গিয়েছে। এবার আপনি আসুন তো। আর আসলে নক করতে পারেননা। কেন আড়াল থেকে সব শুনতে হয়?

” আগে থেকেই ট্রাই করে নেওয়া ভালো তাই না মিস আহি!

চোখের সামনে থেকে বই সরালো হালকা। ততোক্ষণে রাফিন চলে গিয়েছে ক্লাস থেকে। স্যার আসেনি ক্লাস প্রায় ফাঁকা। সকলেই বাইরে। আহি ফের আগের ন্যায় বসে রইলো। তার এই দুরন্তপনা মনে এসব প্যাঁচানো কঠিন কথা ডুকে না। আর না মস্তিষ্ক বুঝতে পারে।
___________

” আলো!

শিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে নিলে ডাক পড়লো আসিফ চৌধুরীর। থেমে গিয়ে লিভিংরুমের দিকে তাকালো সে। আসিফ চৌধুরী ও আফিয়া চৌধুরী বসে আছে মুখ ভার করে। আলোর মন এমনিতেই বিষাদে চেয়ে আছে। তারউপর প্রিয় দু’টো মুখ মন খারাপ করে আছে। সে নিচে আসলো দাঁড়ালো দুজনের সামনে। কিন্তু তাদের কিছু বলতে না দিয়ে আলো বলতে শুরু করলো,

” আমি জানি বাবা মামুনি তোমরা আমার সাথে কি
কথা বলতে চাচ্ছো। তোমরা চিন্তা করো না আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমাদের ছেলেকে ডিভোর্স দিয়ে।তোমাদের জীবন থেকে দূরে চলে যাবো। অহেতুক তোমাদের জীবনে কালো ছায়ার মতো আমি ও থাকতে চাচ্ছি না।

কথাগুলো বলে দম নিলো আলো। আবার ও বললো,

” আমাকে তোমরা মাফ করে দিও। আমার জন্য তোমরা আজ তোমাদের একমাত্র সন্তানকে দেখতে পারছো না।

কাউকে কিছু বলার সুযোগ দিলো না আলো। বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো উপরে। আসিফ চৌধুরী তো অন্য কারনে ডেকেছিলো। আর তাদের যে শুভ্রর জন্য মন খারাপ সেটা ও জানলো কিভাবে? শুভ্র আসছে সেটা কি আলো জানে? তার মধ্যে আফিয়া চৌধুরী বলেন,

” আমি তো এমন চাইনি শুভ্রর বাবা। আমি তো আমার ছেলে আর ছেলের বউকে নিয়ে একসাথে থাকতে চেয়েছি। আমি কাউকে ছাড়তে পারবো না আলো এই বাড়িতেই থাকবে আর শুভ্র ও। তুমি শুভ্রর সাথে কথা বলো এই বাড়িতে আসতে বলো। যা কথা সব সামনাসামনি হবে। ও আসলে কি চাই সব নিজ মুখে বলুক।

” তুমি শান্ত হও তো। কিছুই হবে না শুভ্রকে আমি বাড়ি ফিরিয়ে আনবোই। দেখি ওর কত রাগ আর আমার কত জেদ।
_______________

” বাড়ি না গিয়ে ফ্ল্যাট নিয়েছিস বুঝলাম না কিছুই,
ভাবি আছে আংকেল আন্টি থাকতে তোর আলাদা
থাকার মানে কি শুভ্র?

শুভ্র গম্ভীর! তার অফিস কক্ষে বসে আছে। আর তারই সামনে বসে কথাগুলো বলেছে তার বেস্টফ্রেন্ড অর্নব।

” তুই কি এসব বলতে আসছিস?

অর্নব আগের মতোই বলতে লাগলো,

” অবশ্যই! বাড়িতে বউ থাকতে, বউ রেখে দূরে থাকিস কিভাবে ভাই!

” অর্নব আমাকে রাগাবি না। সামনে থেকে যা এখন।

অর্নব এবার একটু সিরিয়াস হলো। বললো,

” আমি মজা করছি না শুভ্র। আংকেল আন্টি কতটা কষ্ট পাচ্ছেন তা তুই আন্দাজ ও করতে পারবি না। আর তোর ফুলের মতো ব…..

” গেট আউট অব মাই রুম রাইট নাউ, অর্নব।

রাগলো না অর্নব। সে উল্টো বললো,

” রিলাক্স শুভ্র! শান্ত হো আগে তারপর আমি কিছু কথা বলি তোকে একদম রাগ দেখাবি না। আমি মানছি তুই
বিয়েটা মানিস না গ্রামের মেয়ে যেমনই হোক! আচ্ছা এখন একটা সত্যি কথা বলতো তোর কি কাউকে পছন্দ মানে কাউকে ভালোবাসিস তুই?

শুভ্র রাগান্বিত মুখশ্রী মুহুর্তের মধ্যে এক অন্যরকম ভাবনায় ডুবে গেলো। সেই ক্লাসে আনমনে তার দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটার মুখটা ভেসে উঠলো। কাজল টানা চোখ দুটোতে কি মায়া। এমন ভাবে তাকিয়ে ছিলো কেন মেয়োটা? পুরো ক্লাস শুভ্র লক্ষ করছে মেয়েটার চাহনি কেবল তার দিকেই সীমাবদ্ধ ছিলো।

” কিছু জিজ্ঞেস করেছিলাম।

” আমাকে একা থাকতে দে অর্নব। এই মুহুর্তে আমি কোথাও যাচ্ছি না।

” ঠিক আছে তাহলে আংকেল আন্টিকে বলবো শুভ্রর সময় লাগবে।

অর্নব চলে গেলো। সবসময় ফাইজলামি করবে ছেলেটা। তার কাছে সবকিছুই ফানি লাগে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে শুভ্র। মেয়েটা থাকে কেন ডিভোর্স দিচ্ছে না? টাকা অফার করতে হবে। কিন্তু তার মা বাবা কি মানবে? সেখানেই তো যতো সমস্যা তাদের। সন্তানের থেকে একটা গ্রামের অশিক্ষিত মেয়েকে নিয়ে পড়ে আছে তাড়া।

______________

” আমার মতো এতিমকে একটা পুরো পরিবার ভালোবেসে আগলে রাখলো এতো গুলো বছর! আজ শুধু আপনার মনে ঠাই না পাওয়ার কারনে, আমি আবার ও এতিম হয়ে যাবো চৌধুরী সাহেব। আমি তো এতোটা ও অন্যায় করিনি আপনি আমায় যতোটা শাস্তি দিচ্ছেন।

~ মিসেস আলো চৌধুরী

চলবে,,,,,

#শুভ্রফুল —১ লিংক দেওয়া হলো,

https://www.facebook.com/61587344584754/posts/122102718369244819/?app=fbl

[ ভালো লাগলে পেইজে ফলো দিয়ে রাখবেন। সাথে লাইক কমেন্ট করে উৎসাহিত করবেন। ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here