শুভ্রফুল — ৯ #কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

0
36

#শুভ্রফুল — ৯
#কলমে_লিজা_আক্তার_আলো

[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

ধার ধারিনা পাড়াপড়শি…
ধার ধারিনা কারো,
প্রেমের পথে আসবে বাঁধা…
আসতে পারে ঝাড়ু।
তবু যদি পরাণ বন্ধু আমার পানে চাই…

” হোয়াই আর ইউ লিসেনিং টু দিস রাবিশ অর্নব!

অর্নব মেডিকেলের বেডে শুইয়ে ফোনে উচ্চ ভলিউম দিয়ে এই গানটা শুনছিলো আর হাতের দিকে তাকিয়েছিলো একমনে । হাতে ব্যাথা পেয়েছে সে। তা
ও যে সে ব্যাথা না ঝাড়ুর বারি। সলার ঝাড়ু যা অর্নবের হাতে দু’টো ইনজেকশন এর মতো গেঁথে গিয়েছিলো। শুভ্রর কথা শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো অর্নব। ফোনটা হাতে নিয়ে গান অফ করলো দ্রুত । হা-হুতাশ করে বলে উঠলো অর্নব,

” তোর কাছে বাজে লাগলে ও আমার জীবনের সাথে মিলে গিয়েছে এই লিরিক্সটা ভাইইই! প্রেম করতে গিয়ে ঝাড়ুর বারি খেয়ে হসপিটালের বেডে শুইয়ে আছি। তুই-ই বল দু’দিন পর বিয়ে আমাদের। আর আজ সামান্য প্রেম করতে গিয়েছিলাম তাও তোদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছিলাম কিন্তু, ওদের বাড়ি কুটনি, ডায়নি মহিলাটা আছে না অরিনের ফুপি। আমায় দেখ কি করেছে। চোর ভেবে আমায় ঝাড়ুর বারি দিছে।
ভাগ্যিস মুখে হেলমেট ছিলো নয়তো মানসম্মান সব ধুলো নয় ঝাড়ুতে মিশে যেতো।

শুভ্র হতাশ হলো। সে তো না বুঝে ভুল করে কিন্তু এই ছেলেটা ইচ্ছেকৃত ভুল করে বারবার। নিষেধ করেছে অরিনের বাসায় যেতে তাও যাবে অর্নব। দু’দিন ও অপেক্ষা করতে পারে না। শুভ্র পাশে এসে বসে। বিরক্ত নিয়েই বলে,

” প্রেম ভালোবাসা কি পালিয়ে যাচ্ছে? তুই না একজন শিক্ষক। তোর এই অবস্থা ছিহ! তোর সম্মান আর রইলো না! তোর থেকে তোর স্টুডেন্টরা ও এসবই শিখবে।

” প্রেমে পইড়া দেখ তারপর তোর এই লেকচার শুনাবি
আমায়। আমি ও শুনবো মনোযোগ দিয়ে।

” বাদ দে এসব আন্টি আংকেল জানে তোর এই অবস্থার কথা ?

” না কেউ জানে না। তবে কিছুক্ষণ পর বাসায় চলে যাবো। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবো বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছিলো।

” এখন ঠিক আছিস তো তুই? নাকি এখানে থাকতে হবে আর কিছি…

” আমি এখন ঠিক আছি । সরি রে ডিস্টার্ব করলাম তোকে। তো দুজনের মান অভিমান সব মিঠেছে নাকি আরো বছর তিনেক লাগবে ?

” হতে পারে।

অর্নব শুভ্রর পাশে এসে বসলো বললো,

” হ্যা সময় লাগবেই তো। মেয়েদের স্বভাব সম্পর্কে তো তোর তেমন ধারনা নেই বলতে গেলে । তাই তোকে কিছু
কথা বলে রাখি শোন, আলো মেয়েটা অনেক ভালো। তুই এতোগুলা বছর দূরে ছিলিস। তুই জানিস ও এই বাড়িতে কিভাবে টিকে আছে আলো ? একটা মেয়ের স্বামী ছাড়া শশুর বাড়ি থাকা অনেক কঠিন জানিস? তোর মামার বাড়ির লোকজন তোর দাদুর বাড়ির লোকজন প্রতিনিয়ত ছোট্ট মেয়েটাকে কথা শুনিয়েছে।
ডেই বাই ডে মেন্টালি টর্চার করেছে। মেয়েটা অনেক কান্নাকাটি করতো প্রথমে পরে সয়ে নিয়েছে। ভাগ্যিস আন্টি আংকেল আর কাকা কাকি ভালো ছিলো নয়তো কবেই মেয়েটার জীবন শেষ হয়ে যেতো। একদিন তো আত্মহত্যা করতে বসেছিলো আলো। কাকি দেখেছিলো তারপর কি থাপ্পড়টাই না দিলো। ভাবলেই সব রাগ তোর উপরে চলে যায়। ভুল তো আংকেল করেছে মেয়েটা তো আর নিজ ইচ্ছেতে আসেনি। সেসব বাদ দিয়ে এখন থেকে সুন্দর করে সংসার করবি। আলো আমার বোনের মতো। ওকে নিয়ে আমার বিয়েতে ও আসবি কিন্তু। আংকেল আন্টি আলোর কারনে সবার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। দেখ ওরা মেয়েটাকে কতটা ভালোবাসে। কিন্তু শুধু তোর অবহেলার কারনে সবাই তাকে কথা শুনায়। কারন অন্যের বাড়িতে মেয়েরা শশুর শাশুড়ী পরিচয়ে নয় বরং স্বামীর পরিচয়ে আসে। স্বামীর অধিকারে অন্যের বাড়িতে সমান ভাবে থাকতে পারে।

আরো অনেক কথা বললো অর্নব। শুভ্র শুধু শুনে গেলো নিঃশব্দে । কতক্ষণ কথা বলার পর ডক্টর এর সাথে কথা বলে অর্নবকে ডিসচার্জ করে দেওয়া হয়।
বাড়ি নিয়ে গেলো শুভ্র।
______________

” আরে ভাবি তোমরা এই সময় ?

প্রায় দু’বছর পর আসছে আফিয়া চৌধুরীর ভাই ও ভাবি। আলোকে নিয়ে বাজে কথা বলায় রাগ করে তাদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন আফিয়া চৌধুরী। এতোদিন পর কি মনে করে এলো বুঝেল খুব
ভালো করেই। আফিয়ার ভাবনার মধ্যে আতিকা বেগম বলেন,

” শুভ্র আসছে শুনছি তাই চলে এলাম। কতদিন দেখিনি ওকে।

আফিয়া চৌধুরীর ভাই ভাবি ও তাদের ছেলে মেয়ে
আসছে। আফিয়া খুশি হলে ও ওনার চোখ যায় আলোর দিকে। মনটা খারাপ হয়ে যায় ওনার আলোর মলিন ও ভীত চেহেরা দেখে । তার ভাবি আলোকে একদম সহ্য করতে পারে না।

” শুভ্র বাসায় নেই বাইরে বেরিয়েছে তোমরা বসো
আগে। অনেক দূর থেকে এসেছো।

আলো ভয়ে দূরে রইলো। সামনে আসলে কথা শুনাবে আতিকা বেগম তারপর আফিয়া চৌধুরী ও আতিকা বেগম দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হবে। তার চেয়ে আড়ালে থাকাই ভালো। আলো তাদের এড়িয়ে কিচেনে যায়। মেহমানের জন্য জুস বানাতে। আফিয়া চৌধুরী ভাই ভাবির সাথে কথা বলছেন। ফাহিমা চৌধুরী ঘুমিয়
পড়েছেন বিকেলে এখনো ওঠেনি তাই আলো আর ডাকলো না। কেউ নেই আজ বাড়িতে। বিরক্ত হলো আলো আজই তাদের আসতে হলো এখন তো তাকে সামনে পড়তেই হবে। ভাবতে ভাবতে সে জুস বানিয়ে ফেললো চারজনের জন্য। ট্রে তে রাখতেছিলো সে।

” কেমন আছো আলো ভাবিইইই?

চমকে পিছু ফিরলো আলো। হাসলো রাফিদ। কুৎসিত হাসি। চেহেরায় কেমন সয়তান টাইপ দেখলেই আলোর ঘৃণা লাগে। লালসা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রাফিদ। মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। নিজেকে সামলে নিলো দ্রুত। ট্রেটা হাতে নিয়ে দ্রুত আসলো লিভিংরুমে। আলোকে দেখে খুশি হলেন না আতিকা বেগম। বলে উঠলেন তিনি,

” যেই মেয়ের কারনে একমাত্র ছেলেটা দূরে চলে গিয়েছিলো আজ ও মেয়েটা এখানে পড়ে আছে?
শুভ্র মেনে নিয়েছে সব? কেন যে তুমি বোঝনা আফিয়া
আপা এসব দু’টাকার মেয়েরা জানে শুধু ছেলেদের পাগল করতে। তাছাড়া এতো বড় বাড়ির বউ হওয়ার যোগ্যতা আছে নাকি! শুভ্র তো এজন্যই ছেড়েছে।
লজ্জা নেই মেয়েটার। টাকার লোভে পড়ে আছে।
শুভ্র হয়তো তোমাদের কারনে মেনে নিবে আপা কিন্তু কখনো মন থেকে এই মেয়েকে মানবে না। এদের কে
বাড়িতে জায়গা দিলে ও মনে জায়গা দেওয়া যায় না।
থাকতেই পারে বাড়ির রক্ষিতা হিসেবে। কম তো আর টাকাপয়সা খরচ করোনি এই মেয়ের পিছনে। তাই আমি বলি কি তোম…..

কঠিন স্বরে বলে উঠলো আফিয়া চৌধুরী,

” ভাবি ও আমার মেয়ে, আমার বাড়ির বউ, আমাদের দায়িত্ব। ওর নামে কোনো বাজে কথা শুনতে চাচ্ছি না আমি। আমি কিন্তু ভুলে যাবো তোমরা আমার কিছু হও।

মুখ কালো করে ফেললেন আতিকা বেগম স্বামীর দিকে তাকালেন তিনি। আসলাম সাহেব বলেন,

” ওদেরটা ওদের বুঝতে দাও আতিকা। আফিয়া ঠিক কথা বলেছে। আমরা শুভ্রকে দেখতে আসছি
দেখে চলে যাবো। কেন এসব কথা বলছো বলো তো?

রেগে সোফায় কামছে ধরলো আতিকা বেগম। কত
কিছু করেছে নিজের মেয়ের বিয়ের জন্য। কিন্তু,
আফিয়া কিছুতেই বুঝতেছে না তার অবস্থা। আফিয়ার বোন আলিয়া দুজনের মধ্যে ঝগড়া ঝামেলা সৃষ্টি করেছে আতিকা বেগম। দু’বোন আজ ও কথা বলে না। এই বাড়িতে অতিথি আসে শুধু। রাফিদের পাশে বসে আছে রাফা। মুখটা তার শুঁকনো । আলোকে সেও সহ্য করতে পারে না। বাইরের মেয়ের জন্য এতো দরদ ফুপির এটা মানতেই তার কষ্ট হয়। তাছাড়া বিয়ে টিয়ে নিয়ে কোনো কথা বলে না রাফা। সে এবার ইন্টার ফাইনাল ইয়ারের এক্সাম দিবে। বাবা মা যেটা বলে লক্ষী মেয়ের মতো সেটাই শুনে।

আলো ট্রেটা রেখে উপরে চলে যায়। নিচে তার কোনো কাজ নেই। শুভ্র কোথায় গেলো? তার কারনে আবার চলে যায়নি তো? ভাবতেই মন খারাপ হলো আলোর।
আতিকা বেগম এর কথা বিষাক্ত তীরের ন্যায় আঘাত করলে ও অভ্যস্থ হয়ে গিয়েছে সে। তাই তো চোখের কোণে পানি জমলে ও মুখ ও মন শক্ত করে এড়িয়ে চলে আসলো। দরজা লক করে দিলো ভেতর থেকে। রাফিদ ছেলেটা বেশি সুবিধার না। রুমে না থেকে বেলকনিতে চলে যায় সে। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে ধরনির বুকে। ভালো লাগছে না কিছুই তার। বেলকনিতে সুন্দর একটা দোলনা আছে আর সেই বেলকনি থেকে বাইরের সবটা দেখা যায়। শুভ্র আসলে এখান থেকে দেখা যাবে। নিজের মনের নিয়ন্ত্রণই আলো হারিয়ে ফেলছে ক্ষণে ক্ষণে, কখনো তীব্র রাগ কখনো অভিমান আবার কখনো কষ্ট লাগে। বসে রইলো সে আনমনে। চোখ দু’টো তার গেইটের দিকে।
আর ভাবলো ওরা যেভাবে আঘাত করে তা মনে নিলে মৃত্যু নিশ্চিত। তাই ঝেড়ে ফেলে দেয় ময়লার মতো।
আলো নিভে যেতে চাই না কিন্তু তারা বাধ্য করে আলো হারিয়ে যেতে।
______________

” আলোকে পেতে যতো হেল্প লাগবে আমি করবো তোকে। তোর সাথে আলোকেই মানায় আহিকে না। আংকেলের কথা শুনবি না। ওরা তো যাকে তাকে তাদের ইচ্ছে মতো চাপিয়ে দিতে পারলেই বাঁচে।

একসাথে এতোগুলা কথা বলে দম নিলো রাফিন।
মিহুল অবাক হলো রাফিনের কথায়,

” তোর এতো তাড়া কিসের শুনি?

থতমত খেলো রাফিন। জোরপূর্বক হেসে বলে উঠলো রাফিন,

” আরে না তেমন কিছু না। তুই আলোকে ভালোবাসিা আর আমি তোর বন্ধু হিসেবে পাশে থাকবো না?

” আচ্ছা আসি।

” ওকে বাই।

রাফিন ও মিহুল কফিশপ থেকে বেরিয়ে গেলো।
বাইকটা স্টার্ট দিয়ে একটা লেকপারে আসলো মিহুল। ফোনটা বের করে বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো সে, ফোন দিলো আলোর ফোনে। আলোর জন্য মিহুলের অনেকগুলো সিম কিনতে হয়েছে। মেয়েটা শুধু ব্লক করে দেই নাম্বার। মাঝেমধ্যে মিহুল আহির ফোন থেকে ফোন দিতো, মিহুলের কন্ঠসস্বর পেলে ফোন কেটে দিতো আলো। আজ খুব করে ইচ্ছে করছে কথা বলতে।
মেয়েটার কন্ঠস্বরে কি যে মায়া তার জন্যই তো মেয়েটার সামনে গম্ভীর হয়ে থাকে। তাকে যেনো ভয় পায়। ফোন দিলো সে। একবার দু’বার করে করে পঞ্চাশ বার হলো আলো ফোন তুলছে না। চিন্তিত হলো মিহুল। ফোনটা পকেটে রেখে বাইকে ওঠলো আবার উদ্দেশ্য তার বাসায় যেতে হবে।

” আহি! আহি! কোথায় তুই?

আহি রুমে ছিলো না। ছাঁদে বসে আকাশের দিকে
তাকিয়ে ভাবনায় মগ্ন ছিলো সে। মিহুলের কথা তার কান অব্দি পৌঁছালে ও মন আর মস্তিষ্ক তা ঠাহর করতে পারলো না। আহিকে খুঁজে না পেয়ে মিহুল ছাঁদে এসে দেখলো আহি রেলিঙে পিঠ ঠেকিয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে বসে আছে। তার আসার শব্দ কি পায়নি মেয়েটা? একপা একপা করে সামনের দিকে এগিয়ে এলো মিহুল আহির কাছে। আহির অশ্রুশিক্ত চোখ জ্বলজ্বল করছিলো চাঁদের আলোয়। আকাশটা আজ জ্যোৎস্নায় মুখরিত। তাই উজ্জ্বল মুখশ্রী আর চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে চকচক করছিলো।

কাঁধে হাত রাখলো মিহুল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে ডাকলো সে,

” এই আহি কি হয়েছ তোর? এখানে বসে কাঁদছিস কেন? কেউ কিছু বলেছে তোকে? বল আমায়?

আহি চমকিত হয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালো মিহুলের দিকে। দ্রুত চোখ মুছলো সে। ঠোঁটে হাসির রেখা ঝুলিয়ে বলে উঠলো আহি,

” কই কিছু না তো,

হাঁটু গেড়ে বসলো মিহুল। মাথায় হাত বুলিয়ে সে বললো,

” আমি জানি তুই এমনি এমনি কাঁদিস না। এখন ঝটপট বলতো কেউ কিছু বলেছে আমায় একবার বল।

” আমার জন্য তোমাদের সবার সমস্যা সম্মুখীন হতে হচ্ছে তাই না মিহুল ভাইয়া?

” কিসের সমস্যার কথা বলছিস তুই?

ভ্রুঁ কুঁচকে তাকালো মিহুল। আহি চোখ নিচু রেখে
বললো,

” আমি সব জানি মিহুল ভাইয়া। আমার জন্য তুমি আর আলো এক হতো পারবে না। আচ্ছা ভাইয়া আমাকে তুমি আমাদের বাড়িতে রেখে এসো। এখানে থাকলে তুমি আর আলো বিপদে পড়বা। আমি জানি বড়বাবা কতটা ভয়ংকর।

উঠে দাঁড়িয়ে গেলো মিহুল। কি বলবে বুঝে পেলো না সে। আহি আবার ও বললো,

” তুমি কোনো চিন্তা করো না আমি তোমাদের মধ্যে
কাবাব মে হাড্ডি হবো না কখনো।

কথাটা বলে চলে গেলো আহি। মিহুল আকাশ পানে চেয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেললো। কেন এই মেয়েটাকে তার সাথে জুড়ে দিচ্ছে তারা? মেয়েটা কেন কষ্ট পাচ্ছে? কার জন্য ? এর কোনো উত্তর জানা নেই মিহুলের।

সে তো আলোর কথা বলতে এসেছিলো ভুলে বসলো নাকি? পরিস্থিতি সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
_______________

ঘুমের মধ্যে নিজেকে ভাসমান মনে হচ্ছে। নড়চড় হলে আলোর ঘুম হালকা হয়ে আসে। কারোর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ মনে হচ্ছে আলোর। তাকে কি কেউ আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে? পিটপিট করে চোখ খুললো আলো,

চোখের সামনে ভেসে উঠলো শুভ্রর মুখখানা। বার কয়েক ডানা ঝাপটালো সে। ঘুমন্ত কন্ঠে বললো,

” আপনি এখানে কি করছেন? আপনি কি স্বপ্নে এসে ও আমায় বিরক্ত করছেন?

ততোক্ষণে শুভ্র বিছানায় শুইয়ে দিলো আলোকে।
শরীর তীব্র গরম হয়ে আছে আলোর। যা শুভ্র অনুভব করতে পারছে। বেড সাইড টেবিল থেকে নিজের রুমালটা নিয়ে বাটির পানিতে ভিজিয়ে কপালে ছুঁয়ে দিলো সে। আলো চোখ মুখ খিঁচিয়ে শুভ্রর সার্ট কামছে ধরলো। ঠান্ডা অনুভতি হওয়ায়। চোখদুটো ও ঠিক মতো মেলতে পারছিলো না আলো। বিরবির করে বলে উঠলো সে,

” আপনি কখন এসেছেন? খেয়েছেন কিছু? আমি যাবো খাবার আনতে?

শুভ্র পাশে তাকালো এখনো দুপুরের খাবারটা রাখা
আছে টেবিলের উপর। আলো ও যে খাইনি সেটা ও তার জানা। জ্বরে ঘা পুড়ে যাচ্ছে। তবুও তার কথা চিন্তা করছে। শুভ্র আলোর চুলের ভাঁজে আঙুল চালিয়ে বললো,

” এই অসুস্থ শরীর নিয়ে বেলকনিতে কি করছিলে?
আমি যদি না আসতাম তখন কি হতো তোমার?

কথা শুনে আনমনে হেঁসে উঠলো আলো। বিরবির করে বললো সে,

” আমার মন বলছিলো আপনি আসবেন তাই তো
অদূরে তাকিয়ে রইলাম। অপেক্ষায় তো মানুষ বাঁচে তাই না? আসবে, একদিন তো আসবেই না আসলে ও মানুষ অপেক্ষা হারায় না, অপেক্ষা বহমান সাগরের ডেউয়ের মতো। আজ হোক কাল মৃত্যু অব্দি অপেক্ষা করে। যেমন জিবিত মানুষ অপেক্ষায় থাকে একদিন মৃত্যু হবে। তেমন অপেক্ষায় আপনার জন্য ছিলো।

কথাগুলো থেমে থেমে বলছিলো আলো। বারবার
পানিতে ভিজিয়ে কপালে ভাঁজ করে রুমাল দিলো
শুভ্র। আলো স্বজ্ঞানে নেই তাই তো এতোগুলা কথা একসাথে বলছে। আর একটা কথা ও ভুল বলছে না।
নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইলো জ্বরে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য তার শুভ্রফুলের দিকে।

রাত বাজে এখন একটার কাছাকাছি। অর্নবের সাথে যাওয়ায় অর্নবের মা বাবার জোড়াজুড়িতে বাধ্য হয়ে থাকতে হয়েছে তার এতোক্ষণ। আলোর জন্য এই একদিনেই মনটা কেমন ছটফট করছিলো তার। রাস্তায় জ্যাম থাকার কারনে আরো লেইট হয়ে এসেছে। খাবার সাথে নিয়ে আসছিলো শুভ্র। শরীরের তাপটা কিছুটা কমতেই নিজের সাথে বসালো আলোকে, মাথাটা নিজের বক্ষদেশে রাখলো একহাত দিয়ে আগলে নিয়ে, অন্য হাত দিয়ে প্লেট থেকে চামচ দিয়ে খাবার এগিয়ে দিলো আলোর মুখের সামনে।

” হা করো আলো খেয়ে মেডিসিন নিতে হবে। নয়তো এই জ্বর কমবে না।

আলো মুখ ফিরিয়ে নিলো।

” আমি খাবো না আপনি খান। আপনি আজ কিছুই খাননি। আমার উপর রাগ করে না খেয়ে আছেন আমি জানি। আমার কষ্টটা কেউ অনুভব করতে না পারলে ও আমার উপর সবাই রাগ, অভিমান করতে পারে।

অর্নবদের বাসায় জোড় করে ও কেউ খাওয়াতে পারেনি শুভ্রকে। শব্দহীন হাসলো শুভ্র। আলোর কপালে চুমু খেলো অতঃপর বললো,

” আমি পরে খাবো। আগে তুমি খেয়ে নাও। কোনো কথা নই। আমি তোমার উপর রেগে নেই। তুমি আমার উপর রেগে আছো। আমি তোমার সব রাগ ভাঙাবো। যেভাবে বলো সেভাবেই থাকবো। এখন লক্ষী মেয়ের মতো খেয়ে নাও প্লিজ! নয়তো আমি আবার ও চলে যাবো।

আলোর মুখ দেখেই বুঝতে পারে শুভ্র আলোর খেতে ইচ্ছে করছে না। বিরিয়ানি এনেছিলো সে। আলোর পছন্দের খাবার। জ্বরের মুখে এই খাবার এখন কুখাদ্য মনে হচ্ছে আলোর কাছে । একচামচ মুখে দিয়ে আর খেতে চাইলো না সে। শুধু শুভ্রর কথা রাখতে খেলো।

” আর খেতে পারবো না আমি। আপনি খেয়ে নিবেন।

” আর এক চামচ খাও সারাদিন তো কিছুই খাওয়া হয়নি।

তাকালো আলো। জ্বরের কারনে চোখ মুখ অদ্ভুত লাগছিলো। শুভ্র আলোর চাহিনি দেখে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো কি?

” আপনি আমার জন্য এতো ভাবেন মি. চৌধুরী?
আমার জন্য তো আপনার সবকিছু এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। আমি ডিসিশন নিয়েছি আপনার জীবন থেকে অনেক দূর চলে যাবো। যেখানে আমার সাথে জড়িত কেউ থাকবে না কেউ না।
আমি হাঁপিয়ে গিয়েছি। আর পারছি না সবকিছু মানিয়ে নিতে। আমি তো ইচ্ছে করে আসিনি।
জানেন আমার কেউ নেই আপন বলতে। আমার মতো মানুষদের দুনিয়ায় বেঁচে থাকা একটা অভিশাপ। আমি মরে গেলে মামুনি, বাবা সবাই একটু সস্থি পেতো। কত মানুষের কত কথা হজম করতে হয়। কত মানুষের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আপনি ও আমার জন্য বিরক্ত। একটা কাজ করুন আমায় খুন করে ফেলুন। মরে যায় আমি। আমি মুক্ত! মুক্ত সবাই। মারবেন আমায়? আমার ছোট্ট মনটাকে সবাই আঘাত করে। আমি আর ঠিকে থাকতে পারছি না। আমাকে মুক্তি দিন মি. চৌধুরী আমি সত্যিই এই সমাজ, মুখোশধারী মানুষদের থেকে মুক্তি চাই। এই শহরে কেবল টাকা আর ইট-পাথরের,
সরল মনের মানুষের নয়। তাদের জন্য এই শহরটা
একটা অভিশাপ।

কথা বলতে বলতে চোখ লেগে আসলো আলোর।
চোখে পানির শ্রোত বয়ছে। কাঁদছে মেয়েটা। সবকিছুর জন্য একটা মানুষ দায়ী আর সেটা আমি।

শুভ্রর চোখে ও পানি আলোর মাথাটা নিজের বক্ষস্থলে
আঁকড়ে ধরলো সে। আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে নিলো নিজের সাথে। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছে শুভ্র।

[ পেইজে ফলো দিয়ে লাইক কমেন্ট করবেন সবাই ]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here