আমার উপমা তুমি__(অন্তিম পর্ব।)🕊️
আফরোজা আঁখি
_______________________
সময় আর স্রোত অপেক্ষা করে না কারোর জন্য। দিন পরিবর্তন হয়, সাথে পরিবর্তন হয় প্রতিটা মানুষের জীবনের গল্প। মাঝখানে পেরিয়ে গেছে চারটা বছর, পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছুই, তবে পরিবর্তনগুলো খারাপ নয় সবটাই ছিল ভালো। এতো পরিবর্তনের মধ্যে যে জিনিসটা অপরিবর্তনীয় রয়ে গেছে তা হলো উপমার প্রতি ইয়াশের ভালোবাসা। এতোগুলো দিন পেরিয়েছে, কিন্তু ওদের দুজনের ভালোবাসা এখনো ঠিক প্রথম দিনের মতোই আছে। ঝগড়া ঝামেলা আগে যাই একটু হতো, ইরা আসার পর তাও হয় না। মেয়েকে নিয়ে ছুটাছুটি করতে করতেই কেটে যায় ওদের দিন ঝগড়া করার সময় কোথায়? ইয়াশ কাশফিয়ার সংসার ভরে উঠেছে আনন্দে আর সুখে। কৌশিক ইনায়ার ঘর আলো করে এসেছে একটা ছোট্ট রাজপুত্র, নাম ওর ইরহান। ইনায়া আর কৌশিক একানকার সব ছেড়েছুড়ে দেশে চলে গেছে প্রায় দুই বছর আগে। দেশের যাওয়ার জন্য আর কাছের মানুষ গুলোকে দেখার জন্য সবসময় মনটা আকুপাকু করে কাশফিয়ার। কিন্তু ইয়াশের কাজের জন্য এখন আর বায়না করে না যাবে বলে। আস্তে আস্তে মানিয়ে নিয়েছে সবটা। কাশফিয়াকে দেখলে মাঝেমধ্যে অবাক হয় ইয়াশ,চঞ্চল মেয়েটা কেমন শান্ত হয়ে গেছে এখন। মাঝেমধ্যে কাশফিয়ার কাজে ইয়াশের রাগ হলে বকাঝকা করে, কিন্তু আগের মতো আর তর্কাতর্কি করে না কাশফিয়া। সে তো জানে ইয়াশের রাগ ক্ষণস্থায়ী, রাগ কমে গেলে তাকে বুকে টেনে নেবে আবার।
আজকে ইরার জন্মদিন। বাড়িতে সকাল থেকেই গেস্টদের আসা-যাওয়া চলছে। ইরার জন্মের পর ইয়াশ বাড়িতে বাড়তি লোক রেখেছে মেয়ের দেখাশোনার জন্য। আজকে সবটা সামলে নিচ্ছেন উনারাই। কাশফিয়া নিজের রুমেই ছিল, সব গোছগাছ করে সাজতে বসেছে সে। কাশফিয়া আজকে পার্পেল কালারের একটা সুন্দর জর্জেট শাড়ি পড়েছে। গলায়, হাতে, কানে ডায়মন্ডের পাতলা জুয়েলারি সেট। এগুলো ইয়াশেরই দেওয়া। আগের বার এনিভারসারিতে কাশফিয়াকে শাড়ি আর জুয়েলারিগুলো গিফট করেছিল ইয়াশ। আগে সুযোগ বা সময় কোনোটাই হয়ে উঠেনি এগুলো পরার, আজকে গেস্ট আসবে, তাই কিছু না ভেবেই পরে নিল।
কাশফিয়ার মাথার লম্বা চুলগুলো খুব বিরক্ত করছে ওকে, ছোট্ট একটা ক্লিপ দিয়ে আটকে নিয়েছে চুলগুলো। মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে থাকা খেলনাগুলো চোখে পড়ল, একটা একটা করে তুলে রাখল সব। হঠাৎই মনে হলো কেউ দাঁড়িয়ে আছে পিছনে কাশফিয়ার মাথার ক্লিপটা খুলে দিয়েছে সে। মানুষটা যে ইয়াশ ছাড়া আর কেউ নয়, বুঝতে বাকি নেই কাশফিয়ার। ইয়াশের এমন কাজে বিরক্ত হলো সে, উঠে দাঁড়িয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল ইয়াশের দিকে, কিছু বলবে তখনই ইয়াশ কাছে টেনে নিল ওকে। কাশফিয়ার হাত দুটো আপনা আপনি চলে গেলো ইয়াশের বুকে কাছটায়। ইয়াশ ওর এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুজে দিয়ে বলল,
“বাহ! ইরার মাম্মাকে অনেক সুন্দর লাগছে আজ। চোখ ঝলসে যাচ্ছে আমার। কিন্তু…”
“কিন্তু কি?”
“এই সাজে তুমি রুম থেকে বেরুবে না।”
“কেন?”
“আমার উপমার সৌন্দর্য কেবল আমিই দেখব, অন্য কেউ না দেখুক।”
ইয়াশের কথায় পালটা প্রশ্ন না করে বলল কাশফিয়া,
“ঠিক আছে, বেরুবো না।”
ইয়াশ কাশফিয়াকে নিয়ে গেল আয়নার সামনে, লম্বা চুলগুলো দিয়ে খোঁপা করে দিল। খোঁপায় গুজে দিল বাগান থেকে তুলে আনা টাটকা লাল গোলাপ। কাশফিয়া হাত দিয়ে দেখে নিল, বলল ইয়াশকে,
“কি করলেন?”
ইয়াশ শক্ত করে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল কাশফিয়াকে, ঘাড়ে থুতনি রেখে বলল,
“আমার ফুলকে ফুল দিলাম। তোমার পছন্দের বেলিফুল পেলাম না। গোলাপ পছন্দ?”
“সব ফুলই আমার পছন্দ।”
“তুমি নিয়েই তো একটা ফুল উপমা। আমার ব্যাক্তিগত ফুল!”
ইয়াশের কথায় মুচকি হাসল কাশফিয়া।এই মানুষটার প্রশংসা না পেলে সাজগোছ করাই তো বৃথা! তবে ইয়াশকেও কম সুন্দর লাগছে না। সাদা রঙের শার্ট পরেছে ইয়াশ কালো স্যুট-প্যান্ট,মাথার সুন্দর চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করা, হাতে দামী একটি স্মার্ট ওয়াচ। সব মিলিয়ে ভালোই লাগছে ইয়াশকে। কাশফিয়া ইয়াশের গলা আঁকড়ে ধরল, বলল ওকে,
“ইরার পাপ্পাকেও কম সুন্দর লাগছে না। সুন্দরী মেয়েগুলোর থেকে দূরত্ব বজায় রাখবেন।আমাকে তো চিনেনই, এদিক সেদিক কিছু হলে মাথার সবগুলো চুল ছিঁড়ে টাকলা বানাব।”
বউয়ের কড়া হুমকিতে মনে মনে হাসল ইয়াশ। উপর-নিচ মাথা নাড়াল কেবল। ইয়াশ কাশফিয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলো একটু একটু করে, কি হবে বুঝতে পেরে চোখ দুটো বন্ধ করে নিয়েছে কাশফিয়া। সব দূরত্ব ঘুচিয়ে ইয়াশ যখনই চুমু দেবে কাশফিয়ার ঠোঁটে, তখনই কানে ভেসে আসল মেয়ের কণ্ঠস্বর,
“পাপ্পা, মাম্মা, আমি ততলেট যাব।”
ইরার কথা কানে আসতেই দ্রুত কাশফিয়াকে ছেড়ে দিল ইয়াশ। ইরা গটগট করে হেঁটে আসল ইয়াশের কাছে, দুই হাত কোমরে চেপে বলল রেগে-মেগে,
“ইরা লাগ করেছে।”
“কেন?”
“পাপ্পা খালি মাম্মাকেই পাপ্পি দেয় কেন?”
ইয়াশ কোলে নিল মেয়েকে, দুই গালে বেশ কয়েকটা চুমু দিয়ে বলল,
“এই তো, ইরাকেও দিলাম।”
বাবা-মেয়ের কাণ্ড দেখে মুখ ভেংচি কেটে বিড়বিড় করে বলল কাশফিয়া,
“হিংসুটে মেয়ে! তোর বাপ আমাকে আদর না দিলে তুই পৃথিবীতে আসতি কীভাবে? আমার আদরে ভাগ বসাতে চায়,ভাবা যায় কি সাহস মেয়ের!”
কাশফিয়া কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ওভাবেই। ইরাকে বারবার কোলে নিতে চাইলেও আসল না সে। ওদিকে গেস্টরা এসে বসে আছে অপেক্ষা করছে ইয়াশ কখন ইরাকে নিয়ে যাবে। ইয়াশ ভাবল এবার যাওয়া উচিত কাশফিয়াকে রুমে বসতে বলে পা বাড়িয়েছিল যাবে বলে,তখনই কাশফিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল ইরা,
“মাম্মা, ইরা ততলেট যাবে?”
মেয়ের আদো-আদো কথায় হেসে উঠলো কাশফিয়া। ইরার ভারী রাগ হলো মায়ের হাসি দেখে। মেয়ের রাগ দেখেই ইয়াশ চোখ রাঙিয়ে তাকাল কাশফিয়ার দিকে,বহু কষ্টে হাসি থামাল কাশফিয়া। ইরাকে কোলে করে নিয়ে গেল টয়লেটে।
________________
খন্দকারের মঞ্জিলের সামনে এসে থেমেছে একটা কালো রঙের কার। দারোয়ান এসে দ্রুত খুলে দিল গেইট। বাড়ির ভিতরে ঢুকে থামল গাড়িটা, এক এক করে নামল ইয়াশ আর কাশফিয়া, ইয়াশের কোলে ছোট্ট ইরা আর কাশফিয়ার কোলে মমী। ইরা বায়না করলো ইয়াশের কোল থেকে নামবে বলে। ইয়াশ মিষ্টি করে হেসে নামিয়ে দিল মেয়েকে। কাশফিয়াও নামালো মমীকে। মমী দৌড়ে ভিতরে যেতেই ইরাও গেল তার পিছু পিছু।মেয়েকে বারবার ডেকেও থামাতে পারল না কাশফিয়া।
সুফিয়া বেগম বাড়ির উঠোনে এসেছেন রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় নিতে। হঠাৎই মনে হলো উনার শাড়ির আঁচল ধরে টানছে কেউ। চোখের কালো ফ্রেমের চশমাটা ঠেলে সামনে তাকালেন তিনি, দেখতে পেলেন বছর চারেকের এক বাচ্চা মেয়েকে। ফর্সা শরীরে লাল গাউনে ঠিক যেন পরীর মতো লাগছে তাকে। মেয়েটার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা বিড়াল, এই বিড়ালকে তিনি দেখেছেন আগেও। আর মেয়েটা যে পুরোপুরি উনার ছেলের মতো চোখ, নাক, গায়ের রঙ একেবারে ইয়াশের মতো! চিনতে ভুল করেননি সুফিয়া বেগম, এ হলো ছোট্ট ইরা,উনারই রক্ত। আর খন্দকার মঞ্জিলের রত্ন। হাতে থাকা কাপড়গুলো পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা গৃহকর্মীর হাতে ধরিয়ে দিলেন সুফিয়া বেগম, হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে বললেন বাচ্চা মেয়েটাকে,
“নাম কি তোমার?”
সাথে সাথে উত্তর এল ইরার থেকে,
“আমাল তো অনেক গুলো নাম, কোনতা বলবো?”
“যে নামটা বেশি পছন্দ!”
ইরা বেশ কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিল,
“পাপ্পার প্রিন্সেস আর মাম্মার লিদি।”
ইরার এমন অস্পষ্ট কথা আর কেউ বুঝবে কিনা সন্দেহ, তবে সুফিয়া বেগম বুঝলেন ঠিকই দ্বিতীয় নামটা যে সে ‘হৃদি’ বলেছে, এটাও বুঝে নিলেন। ইরার ছোট্ট হাতটা টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসলেন, আবারও জিজ্ঞেস করলেন ওকে,
“তুমি আমাকে চিনো?”
“না তো।”
“আমি তোমার পাপ্পার আম্মু। বুঝলে?”
বুঝদারের মতো উপর-নিচ মাথা নাড়াল ইরা। কী বুঝল কে জানে! কিছুক্ষণ পর সুফিয়া বেগমের মতোই মাটিতে বসল ইরা, মমীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“শুনো পাপ্পার আম্মু।”
“বলো সোনা!”
“আমার মমীকে খাবাল দাও, ওর খিদে পেয়েছে।”
সুফিয়া বেগম হাসলেন, কোলে তুলে নিলেন ইরাকে। কাশফিয়ার কল পেয়ে সিমি, আফিয়া আর উজ্জ্বল সহ বাড়ির সকলেই বেরিয়ে এসেছে উঠোনে। সুফিয়া বেগমের ইশারায় বিড়ালটাকে ভিতরে নিয়ে গেল সিমি, ইরাকে রাগ করলে ওকে বুঝালেন মমীকে খাবার দেওয়ার জন্যই ভিতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কাশফিয়া আর ইয়াশ মাত্রই এসে দাঁড়ালো সবার সামনে। ওদেরকে দেখেই ছুটে গেল আফিয়া আর উজ্জ্বল। ব্যাগপত্র সব নিয়ে গেল বাড়ির ভিতরে।
খন্দকার মঞ্জিলে আজ খুশির আমেজ,আসার আগে ইয়াশ কাউকেই জানায়নি তাই আনোয়ার সাহেব, উজ্জ্বল আর বাকিরা বকাঝকা দিচ্ছেন ওকে। সুফিয়া বেগম আর আফিয়া রান্নার কাজে ব্যাস্ত। আজ ইয়াশের পছন্দের সব খাবার বানাচ্ছেন মা মেয়ে মিলে। আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীরা এসেছেন ইয়াশদেরকে দেখতে। ইরা এতো সময়ে চিনে গেছে সবাইকে। ইয়াশ এক এক করে মেয়ের সাথে পরিচয় করালো সবার। কাশফিয়া-ইয়াশকে রেখে ইরাকে নিয়েই ব্যস্ত বাড়ির মানুষরা। বিশেষ করে ইয়াশের আব্বু আনোয়ার সাহেব আর সিমিম ইরাও মিশে গেছে সবার সাথে, তবে কারো টুকটাক ভুল হলেই কান্না করে ভাসাচ্ছে সে।
___________________
বিকেলে কৌশিক আর ইনায়া এসেছে ইয়াশদের দেখতে, ইনায়ার কোলে ছোট্ট ইরহান! কাশফিয়া ছুটে গেল ওদেরকে দেখে, ইরহানকে কোলে নিয়ে আদর করল সে। ইয়াশও একই কাজ করল। এটা দেখে আবার রাগ হলো ইরার, সুযোগ পেতেই খামচে দিল ইরহানের গাল। মেয়ের দুষ্টুমি দেখে বিরক্ত হলো ইয়াশ, ছোট্ট করে একটা ধমক দিয়েছিল ওকে। ইরা কান্না করে চলে গেল ইয়াশের কাছ থেকে। তারপর আর কি! কত কিছু করে ইয়াশ রাগ ভাঙালো মেয়ের।
_____________________
রাত প্রায় ১২ টার কাছাকাছি হবে
বাড়িতে আত্মীয়রা এসেছেন আজ, ইনায়া আর কৌশিকও থেকে গেছে। কাশফিয়ার পাশটায় শুয়ে আছে ইরা। ইয়াশ বসে আছে সোফায়, বিড়বিড় করে বলছে মা-মেয়ের দিকে তাকিয়ে,
“মেয়েটা দেখতে পুরো আমার মতো হলেও মায়ের মতো ঘাড়ত্যাড়া হয়েছে।”
ইয়াশের কথা ইরা বা কাশফিয়া কারোরই কানে যায়নি। নিশ্চিতে ঘুমোচ্ছে ওরা। ইয়াশ ল্যাপটপ হাতে নিয়ে বসে আছে সোফায়,মনোযোগ দিয়ে কিছু করছে। কিছুক্ষণ না যেতেই মা মেয়ে দুজনে উঠে গেলো ইয়াশের কাছে। দুইপাশে দুইজন বসে হঠাৎই চিৎকার দিয়ে উঠলো। ভয়ে ইয়াশের হাত থেকে পড়ে গেলো ল্যাপটপটা। রেগে তাকালো কাশফিয়ার দিকে,ইয়াশের রাগান্বিত চেহারা দেখে হাসি থামিয়ে চুপ করে গেলো কাশফিয়া কিন্তু ইরা তো ওর এক কাঠি উপরে। ইয়াশের কোলে উঠে মাথার চুলগুলো সব শক্ত করে ধরে রেখেছে। ইয়াশ ধমকের স্বরে বলল মেয়েকে,
“ইরা হচ্ছে কি?”
বাবার বড়সড় ধমকে চুপচাপ মায়ের কাছে চলে গেলো ইরা। ইয়াশ বিরক্ত হয়ে বলল কাশফিয়াকে,
“এসব কি উপমা? আমার মেয়েকে বাঁদর বানাচ্ছ তুমি?”
“হুহ্, মেয়ে তো বাঁদরই। আপনার মতো বাঁদড়।”
“অথচ এই বাঁদড়ের আদর না পেলে তোমার শ্বাস নিতে কষ্ট হয়।”
কাশফিয়া মুখ ভেংচি কেটে ইরাকে কোলে নিয়ে চলে গেলো বিছানায়। ইয়াশ হাসল ওর মুখের ভঙ্গিমা দেখে৷ রান্নাঘরের জিনিসপত্র সব গুছিয়ে নিজের রুমে যাচ্ছিলেন সুফিয়া বেগম। ইয়াশের রুমের দরজা খোলা তাই চোখ পড়ল উনার। ইয়াশের রুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা দেখলেন তিনি।ছেলে বউমার সুখের সংসার দেখে ভালোই লাগছে উনার। ইয়াশের চোখ পড়ল মায়ের দিকে। রুম থেকে বেরিয়ে সুফিয়া বেগমের সামনে দাঁড়াতেই বললেন উনি,
“আসলে তবে! আবার ফিরে যাবে নিশ্চয়ই? চলেই যখন যাবে তাহলে আসো কেন?”
ইয়াশ কিচ্ছুক্ষণ চুপ থেকে বলল সুফিয়া বেগমকে,
“এবার আর ফিরে যাচ্ছিনা আম্মু।”
ইয়াশের কথা শুনে খুশি হলেন সুফিয়া বেগম। এ যে আশা করেননি তিনি। ছেলে বউমা আর নাত্নিকে এবার থেকে কাছে পাবেন ভাবতেই খুশিতে চোখের কোণে পানি জমা হলো উনার। ছেলের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে চলে গেলেন নিজের রুমে।
________________
সকাল পেরিয়ে বিকেল হয়েছে। বাড়ির মেহমানরা অনেকেই চলে গেছেন আবার কেউ কেউ থেকে গেছেন। ইয়াশ বাড়িতে নেই, হয়তো রোহির কবরের কাছে গেছে। কাশফিয়া মনে মনে এটাই ভেবে নিয়েছে, তাই আর কল দিয়ে বিরক্ত করল না ইয়াশকে। রুমে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল ওর আসার। বেলকনিতে রাখা ফুলের টবগুলো এলোমেলো হয়ে আছে দেখে কাশফিয়া হেঁটে গেল বেলকনিতে। ওর পিছু পিছু গেল ইরাও। কিছুক্ষণ বাইরের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভেবে ডাকল কাশফিয়াকে,
“মাম্মা।”
কাশফিয়া ফুলের টবগুলো ঠিক করতে করতে উত্তর দিল মেয়ের কথার,
“হুম, বলো।”
ভাঙা ভাঙা কন্ঠে বলল ইরা,
“ওখানে নাকি ঘুমপরী শুয়ে আছে?”
দ্রুত ইরার দিকে তাকাল কাশফিয়া। ওর হাতের ইশারা অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকাল সে। নজরে এল রোহির কবরটা। ওর রুমের বেলকনি থেকে রোহির কবরস্থান পুরোপুরি না হলেও খানিকটা দেখা যায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইরাকে বলল কাশফিয়া,
“কে বলেছে?”
সহজ সরল স্বীকারোক্তি ইরার,
“পাপ্পা বলেছে।”
কাশফিয়া মুচকি হেসে ইরার মাথার চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, ওখানে ঘুমপরী শুয়ে আছে।”
“ঘুমপরী আমাল কী হয় মাম্মা?”
“তোমার আন্টি হয়।”
“নাম কী তার?”
“রোহি।”
কিছুক্ষণ ভেবে বের করল ইরা, রোহি নামটা ওর অন্য নামের মতোই যে নামে কাশফিয়া ডাকে সবসময়। ছোট্ট মাথায় প্রশ্ন এল ইরার ঘুমপরী কি ওকে ভালোবাসে? জিজ্ঞেস করল কাশফিয়াকে,
“পরী কি ইরাকে ভালোবাসে মাম্মা?”
“সে তো নেই মামুনি, থাকলে অনেক ভালোবাসতো তোমাকে।”
“তাহলে পরী কাকে ভালোবাসে?”
কথা নেই কাশফিয়ার মুখে, চুপ করেই রইল সে। ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল রোহির কবরটার দিকে। পরে আবার ইরার ছোট্ট মুখটার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,
“পরী হৃদির পাপ্পাকে ভালোবাসে।”
“ইরার থেকেও বেশি?”
“সবার থেকে বেশি।”
মায়ের কথায় রাগ হলো ইরার। গটগট করে হেঁটে চলে গেল নিজের রুমে।
ইয়াশ মাত্রই রুমে ঢুকল। মেয়ের এমন রাগের কারণ বুঝল না সে। হৃদিকে বুলিয়ে ভালিয়ে নিজের কাছে নিয়ে এল। কোলে তুলে ওর দুই গালে চুমু দিয়ে বলল,
“কি হয়েছে আমার প্রিন্সেসের? কে বকেছে?”
“মাম্মা বকেছে।”
“কি বলে বকেছে?”
“ঘুমপরী পাপ্পাকে ভালোবাসে।”
ইয়াশ চোখ মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো মুহূর্তেই। এই নামে তো ইয়াশ রোহিকেই ডাকে ইরা কিছু জিজ্ঞেস করায় তখন ওকে বলেছিল কথাটা।ওর ছোট্ট মেয়েটা এখনও ওসব মাথায় নিয়ে বসে আছে! আর ওর উপমাটাই বা কেমন, এসব বলছে মেয়েকে!ইয়াশ মুখে হাসি টেনে বলল ইরাকে,
“উঁহু, আমার প্রিন্সেসের মতো আমাকে আর কেউ ভালোবাসে না।”
চোখ মুখে খুশির ঝিলিক ইরার। অন্ধকার মুখটা ছেয়ে গেল হাসিতে। বাবার গলা জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ইয়াশও হাসল মেয়ের কাণ্ডে।
কাশফিয়া এখনও দাঁড়িয়ে আছে বেলকনিতে। বাবা-মেয়ের খুনসুটি দেখে হাসছে সে। ওদের থেকে চোখ সরিয়ে তাকাল রোহির কবরটার দিকে। মনে মনে বলল,
“তোমার না হওয়া প্রিয় মানুষকে আমি ভালো রেখেছি রোহি আপু। তোমাকেও আমরা মনে রেখেছি। তোমার কথাই সত্যি হোক, আমাদের ভালোবাসা বেঁচে থাকুক যুগ যুগ।”
“উপমা আসবে একটু?”
ইয়াশের ডাকে ওর দিকে তাকাল কাশফিয়া। ছোট্ট করে বলল,
“আসছি।”
কাশফিয়া এসে দাঁড়িয়েছে ইয়াশের মুখোমুখি। ইয়াশের কাঁধে মাথা ফেলে ঘুমিয়ে আছে ইরা। ইয়াশ কাশফিয়াকে বিছানায় ফেলে রাখা শাড়ি, চুড়িগুলো দেখিয়ে বলল ওগুলো পরে রেডি হতে। সে আসছে এক্ষুনি! কাশফিয়া কেবল মাথা নেড়ে সায় জানাল ইয়াশের কথায়, মুখে কিছুই বলল না সে।
____________________
ইয়াশের আনা নীল রঙের শাড়ি, চুড়ি আর বেলিফুলের গাজরা পরে তৈরি হয়েছে কাশফিয়া। বিকেল পেরিয়ে রাত হতে চলল কিন্তু ইয়াশের আসার নাম নেই। ইরা তার বাবার সাথে আছে তাই চিন্তা করল না ওকে নিয়ে। কাশফিয়ার থেকে ইয়াশকে ইরা একটু বেশিই ভালোবাসে মেয়ে তার বাবার কাছে থাকলেই নিশ্চিত থাকে কাশফিয়া। বিছানায় বসে থাকতে থাকতে বিরক্ত কাশফিয়া, উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল মাত্রই, ইয়াশ এসে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল তখনই। কাশফিয়া ওভাবে দাঁড়িয়ে থেকেই বলল ইয়াশকে,
“মেয়ে কোথায়?”
“আম্মুর কাছে।”
“রেখে আসলেন যে! কান্না করবে তো।”
“কারণ আছে তাই।”
“কি চাই আপনার? মতলব ভালো ঠেকছে না।”
“বাবু চাই।”
কাশফিয়া ঘুরে তাকাল ইয়াশের দিকে। দু’হাত দিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
“একজনকে নিয়েই পারি না, আরেকজন? কে সামলাবে শুনি?”
“তুমি আমাকে সামলাবে, আর আমি বাচ্চাদের!”
“বাহ! আমার কথাই আমাকে বলা হচ্ছে?”
ইয়াশ তাকিয়ে রইল কাশফিয়ার সুন্দর মুখটার দিকে। মাথার গাজরাটা খুলে দিল সে। এলোমেলো হলো কাশফিয়ার মাথার চুল। শাড়ির কুচিতে হাত রাখতেই কেঁপে উঠল কাশফিয়া। বাধা দিয়ে বলল ইয়াশকে,
“এলো মেলো করার মতলব যখন, সাজতে বললেন কেন?”
“আমি নিজ হাতে এলো-মেলো করব তাই। আদর চাই না?”
কাশফিয়া লজ্জা পেল। ইয়াশের বুকে লুকিয়ে আস্তে করে বলল,
“চাই তো।”
কাশফিয়ার সম্মতি পেয়ে দেরি করল না ইয়াশ। কোলে তুলে নিল ওকে, নিয়ে গেল বিছানার কাছটায়। গায়ের শার্টটা খুলে মেঝেতে ফেলতেই শুকনো ঢোক গিলল কাশফিয়া। ইয়াশ ওর দিকে ঝুঁকল।কাশফিয়া ইয়াশের বুকে হাত দিয়ে বলল,
“পাগলামি করবেন না একদম।”
“একশো বার করব।”
“সরুন তাহলে।”
“উঁহু, আজ তোমাকে আদর দিব।”
পালাতে চেয়েও পারল না কাশফিয়া হার মানল ইয়াশের জেদের কাছে৷ পুরো শরীরজুড়ে ইয়াশের ঠোঁটের উষ্ণ স্পর্শ পরছে বার বার, কেঁপে উঠছে কাশফিয়া। লজ্জাবতী পাতার ন্যায় নেতিয়ে পড়েছে বিছানায়। ইয়াশ নিজের সবটুকু ভালোবাসা উজার করে দিতে ব্যাস্ত তার উপমাকে।
__________________
ঘড়ির কাটা জানান দিচ্ছে রাত প্রায় ১২ টার কাছাকাছি। ইয়াশ শুয়ে আছে কাশফিয়ার ছোট্ট বুকে মাথা রেখে। দু’হাতের শক্ত আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরেছে ওকে। এমন ভাবে ধরে রেখেছে নড়াচড়ার অবকাশটুকুও নেই। মনে হচ্ছে ছাড়লেই পালাবে সে!কাশফিয়া হাত বুলালো ইয়াশের মাথার ঘন চুলের ভাঁজে,মুচকি হেসে বলল,
“প্রফেসর সাহেব, আপনি আমার ভালো থাকার ঔষধ। আপনার কাছে আমি কি বলুন?”
ইয়াশ মুখ তুলে তাকাল, ঘুম ভেঙে গেছে ওর অনেক আগেই। কাশফিয়ার সুন্দর মুখটা দেখে মন ভালো হয়ে গেলো মুহূর্তেই।ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি নিয়ে ঠোঁট ছুঁয়ালো কাশফিয়ার কপালে। ওর চোখ মুখে এসে পড়া এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিয়ে বলল,
“তুমি আমার জীবনে আসা বসন্তের ফুল, আমার শূন্য হৃদয়ের রঙের বন্যা। আমার অন্ধকার জীবনে আলোর দীপশিখা তুমি। আমার উপমা তুমি।”
কাশফিয়ার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল মুহূর্তেই। শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ইয়াশকে।চোখ দুটো বন্ধ করে বলল সে,
“ভালোবাসি প্রফেসার সাহেব। এই ছন্নছাড়া অগোছালো উপমা আপনাকে অনেক ভালোবাসে।”
“আমিও তোমাকে ভালোবাসি উপমা। ভীষণ রকমের ভালোবাসি।”
#সমাপ্ত।
সারপ্রাইজ পর্ব।
https://www.facebook.com/61564128154756/posts/122166631832470938/?app=fbl
(২৫০০ শব্দ আমি এতো বড় পর্ব কখনোই দিইনা।আজকের পর্বটা এলো মেলো হয়ে গেছে জানি, মানিয়ে নিবেন পরে আবার এডিট করে দিব।এতদিন তো চুপচাপ পড়ে গেলেন, লাস্ট পর্বে অন্তত মন্তব্য করুন!)
১৫ পর্বে শেষ করব ভেবে লিখেছিলাম ঠিকই, তবে রেসপন্স বাড়ায় আমিও গল্পের পর্ব বাড়িয়ে ২৫ এ এনেছি। আমার ব্রেক চাই, তাই তাড়াহুড়ো করেই শেষ করলাম গল্পটা। সবাই ভালো থাকবেন আর দোয়ায় রাখবেন। ❤️
১.
পড়ুন রোমান্টিক ই-বুক “প্রাণ প্রণয়িনী”
https://link.boitoi.com.bd/4T8X
২.
পড়ুন রোমান্টিক ই-বই “রাগে অনুরাগে সিক্ত কাব্য”
https://link.boitoi.com.bd/GQcM
গল্প রিলেটেড সব আপডেট পেতে গ্রুপে জয়েন হোন।
https://facebook.com/groups/569604222322147★ Afroza Akhi’s Readers Realm ★

