#তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব -০২
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
পড়ন্ত বিকেলে সূর্যের দীপ্তিময় লাল আভা যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে সেই সময়টা বেশ উপভোগ করে ঈশানি।প্রতিদিন এই সময়টা সে নিজের জন্য বরাদ্দ রাখে।রোজ বিকেলে ছাদে নিরিবিলি পরিবেশে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা ঈশানির অন্যতম পছন্দের কাজ।যেখানে আকাশটা হয় তার ডাকবাক্স আর সে নির্নিমেষ তাকিয়ে অভিযোগ,অভিমান,কষ্ট,ইচ্ছে,আকাঙ্ক্ষা মেলে ধরে আকাশের খোলা ডাকবাক্সে।তখন সে নিজেকে আকাশের একচ্ছত্র মালিক মনে করে।যেখানে শুধুমাত্র তার আর তার ভাবনার আনাগোনা।তবে আজকে তার প্রতিদিনের সুন্দরতম কাজে ব্যাঘাত ঘটাতে ছাদে প্রবেশ করে আরহান।
ঈশানি যখন গভীর মনোযোগ দিয়ে আকাশ দেখায় ব্যস্ত তখন আরহান ফোনে কথা বলতে বলতে ছাদে উঠে আসে।মানুষের কথার শব্দে ঈশানির মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে।সে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছু ফিরে দেখতে পায় আরহান এসেছে। আরহান ও ছাদে কাউকে দেখতে পেয়ে থেমে যায়।তারপর দুজনের চোখাচোখি হয়ে যায়।ঈশানি চোখ ঘুরিয়ে নেয় এবং ভাবতে থাকে চলে যাবে নাকি থাকবে।যখনি সে ভাবলো চলে যাবে তখনি অনুভব করলো কেউ তার পাশে বসেছে।ঈশানি একপল তাকিয়ে আবার আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো।কয়েক মিনিটের নীরবতা ভেঙে আরহান বলে উঠলো –
এখানে কি করছো?
ঈশানি একটু সময় নিলো।তারপর আকাশের দিকে তাকিয়েই বললো –
আকাশ দেখছি।
আরহানের বোধ হয় উত্তরটা পছন্দ হয়নি। নাকমুখ কুচকে বললেন –
আকাশ দেখার কি আছে?
ঈশানি উত্তর করলো –
আকাশের অসীম ঠিকানায় নিজেকে মেলে ধরে যায়। স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয়া যায়।
আরহান তাকালে ঈশানির দিকে।তারপর আবার জিজ্ঞেস করলো –
কোন ক্লাসে পড়?
ঈশানি ছোট্ট করে বললো –
ইন্টার দ্বিতীয় বর্ষ।
আরহান বেশ অবাক হলো।এইটুকুন মেয়ে অথচ আচার আচরণে মনে হবে প্রাপ্ত বয়স্ক একটা মেয়ে। এই বয়সের মেয়েরা সাধারণত চঞ্চল,প্রাণবন্ত, ছুকছুক প্রকৃতির হয়ে থাকে।অথচ এই মেয়ে যেনো পানির মতোই ঠান্ডা,নীরব,প্রাণহীন।
মাগরিবের আজানের শব্দ কানে ভাসতেই আরহান ঈশানির উদ্দেশ্যে বললো –
নিচে গিয়ে মাকে বলবে আমার রুমে এক কাপ কফি দিতে।
ঈশানি ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়ে চলে গেলো। আরহান কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে নিচে নেমে গেলো।
.
রাতে খাবার টেবিলে সবাই খেতে বসেছে। খাবার বেড়ে দিচ্ছেন মিনারা বেগম। মিনারা বেগমের জোরাজোরিতে ঈশানি ও খেতে বসেছে।কিন্তু সে খাচ্ছে কম, খাবার নাড়ছে বেশি।সেটা দেখে মিনারা বেগম ধমকে উঠলেন –
কিরে ইশু, না খেয়ে এভাবে বসে আছিস কেন?
ইশু ঢোক গিললো।সে কিছু বলতে চায় কিন্তু কথা যেনো তার গলায় আটকে আছে। টেস্ট পরীক্ষার রুটিন দিয়ে দিয়েছে।রেজিস্ট্রেশন ফি দিতে হবে। চাচ্ছু হয়তো ভুলে গেছে নাহলে নিজে থেকেই দিয়ে দিতো।এদিকে কালকে লাস্ট ডেট জমা দেয়ার।কিন্তু এটা বলতেই ঈশানির যত অসস্তি হচ্ছে। তার মতে তাকে পড়াশুনা করাচ্ছে এই তো ঢের সেখানে সে আবার কোন মুখে নিজের প্রয়োজনের কথা বলবে ।কিন্তু না বললেই নয়।রেজিস্ট্রেশন ফি না দিলে সে টেস্ট দিতে পারবে না।তবুও বলতেই হবে ভেবে একটা গলা খাকারি দিলো।তারপর চাচ্ছুকে বললেন –
চাচ্ছু,আমার টেস্ট পরীক্ষার রুটিন দিয়েছে।
জাহিদ চৌধুরী খেতে খেতেই বললেন –
বেশ তো।ভালোভাবে পড়াশুনা করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেও, মা।
ঈশানি অস্বস্তিতে আরো গাট হয়ে পড়লেন।মিনমিনিয়ে বললো –
আসলে চাচ্চু রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেয়ার কাল লাস্ট ডেট।
জাহিদ চৌধুরী খাওয়া থামিয়ে বললেন –
সরি ইশুমা। আরহান আসার খুশিতে ভুলেই গিয়েছিলাম।তুই চিন্তা করিস না।আমি কালকে গিয়ে দিয়ে আসবো।
ইশু আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিলেন। আরহান এতক্ষন ইশুর আচরণ লক্ষ্য করছিলো।এবং এই মুহূর্তে তারমনে হচ্ছে এই মেয়েটা সত্যি অদ্ভুদ। নাহলে এই কথা বলতে এতো অস্বস্থি লাগার কি আছে।
.
সকাল সকাল খেয়ে ইশু খেয়ে কলেজে চলে গেছে। আয়রা চলে গেছে ভার্সিটি।এবং জাহিদ চৌধুরী ব্যবসায় চলে গেছেন।বাসায় আছে শুধু মিনারা বেগম এবং আরহান। আরহান যেহুতু কালকেই লন্ডন থেকে এসেছে তাই কয়েকদিন তার ছুটি রয়েছে। আরহান এসে মায়ের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে গেছে।সে তার মাকে ভীষন ভালবাসে। আর মিনারা বেগম ও ছেলে অন্ত প্রাণ।
.
কলেজের প্রথম ঘণ্টার ক্লাস শেষ।ঈশানি আর তার একমাত্র বেস্টফ্রেন্ড মিথিলা গল্প করছে।গল্প বলতে মিথিলা বলে যাচ্ছে আর ঈশানি শুনে যাচ্ছে।মাঝে মাঝে হু হা উত্তর দিচ্ছে।মিথিলা জানে ঈশানির আচার আচরণে সম্পর্কে।যেখানে মিথিলা সারাক্ষণ কথাই বলতে থাকে সেখানে ঈশানির মুখ থেকে হুটহাট কথা বের হয়।যেনো কথা বললেই ট্যাক্স দিতে হবে। তাই হয়তো এদের দুজনের এতো মিলে।
মিথিলা একটু ঈশানির দিকে চেপে বসলো।এবং কন্ঠস্বর নিচু করে বললো –
এই তোর চাচাতো ভাই দেখতে কেমন রে?বিদেশ থেকে এসেছে বিদেশীদের মতোই দেখতে হয়েছে নাকি?বল না।
ঈশানির চোখে ভেসে উঠলো আরহানের প্রতিচ্ছবি।লম্বায় কত হবে লোকটা ৫.১১ অথবা ৬ ফুট বোধ হয়।গায়ের রং ফর্সা,কপালের সামনে কিছু চুল আসে,কালচে খয়েরী চোখ,সুঠাম দেহ সব মিলিয়ে তাকে সুদর্শন পূরুষ বলা যায়।কিন্তু ঈশানি এতকিছুর বর্ণনা দিলো না।ছোট্ট করে বললো –
দেখতে কেমন হবে সুন্দর।বাঙালি মানুষ বাঙালি দেখতেই তো হবে।
মিথিলা আরো কিছু বলতো তবে তার আগেই ক্লাসে স্যার প্রবেশ করায় তাদের গল্পের এখানেই ব্যাঘাত ঘটে।
.
চৌধুরী বাড়ির গেটে আসতেই ঈশানি দেখলো আয়রা যেনো কাকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে। আয়রা তখনো ঈশানিকে দেখেনি।সে বিদায় জানিয়ে পিছু ফিরতেই ঈশানিকে দেখতে পেয়ে চমকে গেলো।সাফাই গাওয়া কণ্ঠে বললো –
আমার বান্ধবী এসেছিল এদিকে একটা কাজে তাই ওকে বায় দিলাম।
ঈশানি ভ্রু কুচকে একবার তাকালো।তারপর স্বাভাবিকভাবে বললো –
ওহ আচ্ছা। চলো ভিতরে যাই।
আয়রা যেনো হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।হাসতে হাসতে বললো –
হ্যাঁ হ্যাঁ চল ভিতরে যাই।
বাড়িতে প্রবেশ করতেই ড্রয়িং রুমে অনেক মানুষ দেখতে পেলো তারা। আয়রা একদৌড়ে চলে গেলো তার মামার পাশে। আরহান এসেছে শুনে আরহান – আয়রার মামা মামী এসেছে দেখা করতে।সাথে এসেছে তাদের দুই ছেলে মেয়ে। মেয়েটার নাম রিমি।ঈশানির সাথে একই ক্লাসে পড়ে আর ছেলেটার নাম রনি।সে এবার অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। আয়রা খুশি হলেও খুশি হতে পারেনি ঈশানি।
ঈশানিকে দেখেই রনি একটা গা জ্বালানো হাসি দিলো।যেটা দেখে ঈশানি আরো অসস্তিতে পড়লো।তারপর ড্রয়িংরুমে উপস্থিত সকলকে সালাম দিয়ে সে দ্রুত প্রস্থান করলো নিজের রুমের উদ্দেশ্যে।
চলবে ~
{কেমন লেগেছে আপনাদের অবশ্যই জানাবেন}

