#তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ০৪
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
বাহিরে আকাশ মেঘলা।আকাশে কালো মেঘেরা ভিড় জমিয়েছে।দেখেই মনে হচ্ছে যেকোনো সময় তারা দলবল নিয়ে ঝমঝমিয়ে নামবে।বাহিরের কালো মেঘের মতো ঈশানির মনেও মেঘেরা ভিড় জমিয়েছে। আয়রা কাদতে কাদতে জানিয়েছে তারই ভার্সিটির প্রফেসরের সাথে গভীর প্রণয় রয়েছে তার ।যার জন্য বধ্য উন্মাদ আয়রা।সবকিছু তাদের মধ্যে ভালই চলছিলো।হুট করে আজকে আয়রাকে দেখতে আসবে সেটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি সে।ভার্সিটি থেকে আসতেই মায়ের থেকে বিয়ের কথা শুনতেই একদফা চিল্লিয়েছে মায়ের সাথে।কোনো কাজ হয়নি তাতে।মা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে – তার বাবা কথা দিয়ে রেখেছে।সেটা এখন নড়চড় করা অসম্ভব।
আয়রা কোনো উপায় না পেয়ে যখন জ্ঞানশূন্য,অস্থির হয়ে পড়ে তখনি ফোন লাগায় তার প্রেমিক পুরুষকে।, তার একমাত্র ভরসার স্থল।কিন্তু , হায়!তার প্রেমিক পুরুষ যে তাকে উপেক্ষা করেছে। মুখের উপর কল কেটে দিয়েছে ।কল কাটার পূর্বে অত্যন্ত রুক্ষ কন্ঠে জানিয়ে দিয়েছে তাকে বিয়ে করে নিতে।তারপর পর পরই ফোন বন্ধ।প্রেমিক পুরুষের এই উপেক্ষা,রূপ পরিবর্তন মোটেও মেনে নিতে পারছে না আয়রা।কি করে পারলো সে এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিতে? এতদিন কি তবে লোকটা তার সাথে নাটক করেছে?এতো ভালোবাসা,এতো যত্ন, এতো পাগলামি এগুলো সবই কি তার নাটক? না, আয়রা আর ভাবতে পারছে না।বুকের মধ্যে যেনো কেউ সুচ দিয়ে ফুটু করে যাচ্ছে। ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে তার হৃদয়।বুক চিড়ে আর্তনাদ আসছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।এসব কথায় ঈশানিকে বলছে আর পাগলের মতো কান্না করে যাচ্ছে।ঈশানি নিজেও ভেবে পাচ্ছে না কি করে আয়রাকে শান্ত করবে।কিন্তু আয়রার জন্য তার ভীষন কষ্ট হচ্ছে। আয়রার সাথে সেও কেঁদেছে।ঈশানির মনে প্রশ্ন জাগে লোকটা কি আদো তার আরুপুকে ভালবেসেছিলো?দুজন যখন কাদতে ব্যস্ত তখনি নিচ থেকে কথা বলার শব্দ এলো। আয়রা আরো করুণস্বরে কেঁদে উঠলো ।ঈশানির দিকে অশ্রুভেজা চোখে তাকিয়ে,তার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ভেজা কন্ঠে বললো –
ইশু রে,আমি এখন কি করবো?আমার হৃদয়ের সবটুকু জায়গা জুড়ে শুধু ইয়াসিনের বসবাস।আমি কি করে অন্য লোকের সামনে যাবো নিজেকে প্রদর্শন করতে। যেই স্বার্থপর লোকের কাছে আমি নিজের সকল অনুভূতি উজাড় করে দিয়েছি সেই লোকটাও নেই আমার পাশে আজ ।আমার তো মরে যেতে ইচ্ছে করছে। কি করবো আমি ইশু।
আয়রার কন্ঠ অনেক করুণ শোনালো।আয়রার কথা শুনে ঈশানির ভিতরে কেঁদে উঠলো।সে আয়রাকে জড়িয়ে ধরে মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে বললো-
আপু,এভাবে বলো না প্লীজ।আল্লাহ নিশ্চয় উত্তম পরিকল্পনাকারী।তুমি দয়া করে আল্লাহর উপর বিশ্বাস ও ভরসা রাখো।
আরো কিছু বলার আগেই রুমে প্রবেশ করলেন মিনারা বেগম।সে রুমে ঢুকতে ঢুকতে তাড়া দিয়ে বললেন –
কিরে আরু,এখনো রেডি…..
আর কিছুই বললেন না মূলত বলতে পারলেন। আরিয়া কাদতে কাদতে নিজের নাজেহাল অবস্থা করে ফেলেছে।মেয়ের এহেন করুন দশা দেখে উনি এগিয়ে এসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন।মৃদু কন্ঠে বুঝানোর মতো করে বললেন –
এভাবে কেনো কাদছিস মা? দেখতে আসলেই কি বিয়ে হলো বল? কেঁদে কেঁদে নিজের কি হাল বানিয়েছিস দেখ তো।মনে হচ্ছে আজই তোর বিয়ে।
আরিয়া ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো এবং মাকে জড়িয়ে ধরে বললো –
মা,আমি যাবো না নিচে।আমি কি তোমাদের কাছে বেশি হয়ে গেছি?
মিনারা বেগম ফিচেল হেসে মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন –
পাগল মেয়ে।সন্তান কখনো মায়েদের কাছে বেশি হয় নাকি।কিন্তু মেয়ে হয়ে জন্মেছিস পরের বাড়ির যেতে হবে আজ বা কাল।তাছাড়া বাবার উপর কি তোর ভরসা নেই?
আরিয়া আর কিছু বলতেই পারলো না। কি বা বলবে সে? যার জন্য সে এতো কষ্ট পাচ্ছে,ভিতরটা মুচড়ে উঠছে,হৃদয় ভেঙে চূর্ণ বিচূর্ণ হচ্ছে সেই পাষাণ নির্দয় লোকটাই তো তাকে অগ্রাহ্য করলো। কোনমুখে সে কাউকে কিছু বলবে আর।
মিনারা বেগম মেয়েকে বুকে জড়িয়ে বুঝিয়ে বললেন অনেক কথা।তারপর ঈশানির উদ্দেশ্যে বললেন –
আরুকে তৈরি করে নিচে নিয়ে আয়।তারা এসেছে অনেক্ষন।
ঈশানি শুধু ঘাড় কাত করে সম্মতি জানিয়েছে।তারপর আয়রাকে তৈরি করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
.
বিস্তৃত ড্রয়িংরুম।ড্রয়িংরুমে সজ্জিত আছে একটি বড় ঘিয়া কালার সোফাসেট,তারই কোনঘেষে রাখা হয়েছে আর একটি ডাবল সিটের সোফা এবং তারই বিপরীতে সিঙ্গেল সোফা।সামনে রয়েছে টি – টেবিল। যা এখন বিভিন্ন প্রকার নাস্তা,মিষ্টি ফলমূল দিয়ে ভর্তি।
ছেলের বাড়ি থেকে ছেলে আর তার বাবা – মা এসেছে।ছেলের বাবা মা বসেছে সামনের সোফায়।তাদের পাশের সোফায় বসেছেন জাহিদ চৌধুরী।এবং তারই পাশে বসেছে আরহান। তাদের বিপরীত পাশের সোফায় বসেছে ছেলে ।
বোনকে দেখতে আসছে বলে দ্রুত আরহানকে ডেকে পাঠিয়েছে জাহিদ চৌধুরী। আরহান যখন বাসায় আসে তখন বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি।এখন বৃষ্টির ঝাঁপ একটু কমে এসেছে। বড়রা তখন কথা বলায় ব্যস্ত।এরমধ্যেই আয়রাকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলো ঈশানি। আয়রার গায়ে বেগুনি কালার জামদানি শাড়ি জড়ানো।গলায় ছোট্ট একটা হার আর কানে ছোট্ট দুল।মুখে কোনো প্রসাধনীর প্রলেপ নেই।একদম সাদামাটা ভাবেই পাত্রপক্ষের সামনে এসেছে সে।ড্রয়িংরুমে এসে সালাম দিতেই ছেলের মা উঠে আসলেন।সালামের উত্তর নিয়ে তাকে নিজের পাশেই বসিয়ে দেয়। থুতনিতে হাত রেখে মুখটা উঁচিয়ে বলে মাশা – আল্লাহ্।ঈশানি মুখ নিচু করে রেখেছে।এদিকে তার মন নেই।কিন্তু সে যদি একটু তাকাতো তাহলে দেখতে পেতো দুটো তৃষ্ণার্ত চোখ তাকে কত মায়াভরা দৃষ্টিতে দেখছে।যেনো কতবছরের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে তারা।ঈশানির মলিন মুখ দেখে ধক করে উঠলো তার হৃদয়।ঈশানি তখনো মাথা নিচু।চোখে পানি টলমল করছে।যখনতখন বের হয়ে যাবে বোধ হয়।সামনে থাকা যুবকটি এবার গলাখাকারি দিলো।তবুও আয়রার মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যার্থ হয়। চাতকপাখির মতো চেয়ে থাকে আয়রার পানে। মা হয়তো ছেলের মনোভাব বুঝতে পারলেন।তাই আয়রার পাশে থাকা ভদ্রমহিলা বলে –
আয়রা মা,বাবুকে এই জুস টা দেও তো।
আয়রা বিপাকে পড়ে।বাবুটা আবার কে এখানে।জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ভদ্রমহিলার পানে চাইতেই উনি ইশারায় ডানদিকে ইশারা করলেন। আয়রা রয়েসয়ে জুসের গ্লাস হাতে নিয়ে ডানদিকে ঘুরতেই মুহূর্তেই জুসের গ্লাস হাত থেকে পড়ে যায়।সেই সাথে ডুকরে কেঁদে উঠে আরিয়া। এইতো তার প্রণয়কুমার।কি সুন্দর ফরমাল পোশাক পরে তারই বাড়িতে বসে বসে শরবত খাচ্ছে। আয়রার কান্না দেখে জাহিদ চৌধুরী আর আরহান ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিনারা বেগম ও হকচকিয়ে যায়। ঈশানিও অবাক হয়।কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে আয়রা গিয়ে হামলে পরে তার প্রেমিকপুরুষের বুকে।কাদতে কাদতে ফুপিয়ে বলে উঠে –
তুমি এতো পাষাণ হলে কিভাবে? জানো আমার নিশ্বাস আটকে ছিলো।যেকোনো সময় ত্যাগ করে হয়তো আমি মরেই যেতাম।
ইয়াসিন আয়রাকে আর একটু আগলে নেয়।মুহূর্তেই আবার হাতের বাধন আলগা করে। আয়রার মাথায় ঘোমটা টেনে দিতে দিতে বলে –
হুস!এরকম কথা বলে না।কি অবস্থা করেছো নিজের?তোমার বিয়ে অন্য কোথাও হতে দেবো এটা তুমি ভাবলে কিভাবে?সবটাই আমার প্ল্যান ছিলো।তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম।তুমি এরকম হয়ে যাবে ভাবিনি।প্লীজ ক্ষমা করে দেও।এখন স্বাভাবিক হও সবাই দেখছে প্লীজ।
আয়রার যেনো মাত্রই বোধবুদ্ধি এলো।রুমে তার বাবা,ভাই মা সকলেই উপস্থিত। কি করে সে এরকম নির্লজ্জ হলো।ভালোবাসা হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে গ্রাস করে ফেলেছিলো।কাবু করে ফেলেছিলো ভিতরের সত্তা ।তাই তো ভালোবাসার মানুষকে চোখের সামনে দেখতে পেয়ে বোধবুদ্ধি সব যেনো পালিয়ে গিয়েছিলো।সে দূরে সরে আসলো।মাথা নিচু করে রইলো। আরহান ভ্রু কুচকে শান্তস্বরে জিজ্ঞেস করলো –
তোমরা একে অপরকে চেনো?
আয়রা কিছু বলতে পারলো।ইয়াসিন গুছিয়ে শর্টকাটে জানালো।সে আয়রাকে পছন্দ করে।বাসা থেকে বিয়ের কথা জানালে সে তার পরিবারকে আয়রার কথা জানায়।তার পরিবার হাসিমুখেই মেনে নেয় একমাত্র ছেলের পছন্দ বলে কথা।ব্যস্ত হয়ে পড়ে মেয়ের বাসায় প্রস্তাব পাঠানোর জন্য।ভাগ্যক্রমে জাহিদ চৌধুরী এবং ইয়াসিনের বাবা মির্জা খালেক একে অপরের পূর্ব পরিচিত।তাই সহজেই প্রস্তাব দিয়ে ফেলেন।আর পরিচিত বলে জাহিদ চৌধুরী ও না করতে পারেননি। এ সবকিছু এতই দ্রুত ঘটে যায় যে ইয়াসিন আয়রাকে কিছু জানানোর সুযোগ পায়নি।যখন পেয়েছে ইচ্ছে করে আয়রাকে জানায়নি।উল্টো আয়রা বিয়ের কথা বললে এড়িয়ে গেছে।কিন্তু মেয়েটা যে নিজের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা করবে সেটা ইয়াসিন কল্পনা ও করেনি।প্রিয়তমার প্রতি তার ভালোবাসা আরো বেড়ে গেছে। এই মিষ্টি ফুলটাকে তার চাই ‘ ই চাই।
সবশুনে জাহিদ চৌধুরী বিয়েতে মত দিলেন।ছেলের পরিবার ভালো তার উপর ছেলেমেয়ে দুজন দুজনকে পছন্দ করে মাঝে সে ভিলেন সেজে কি করবে। আরহান ইয়াসিনকে আগে থেকেই টুকটাক চেনে। আরহানের জুনিয়র ছিলো ইয়াসিন।সে জানে ছেলেটি ভালো এবং সুযোগ্য ।তারচেয়েও বড় কথা তার বোন এই ছেলেকে ভালোবাসে।নিশ্চয় তার বোন সুখে থাকবে এখানে।তাই তারও কোনো আপত্তি ছিলো না।কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে বেকে বসলো আয়রা নিজে।
চলবে~
{ আসসালামু আলাইকুম।আজকের পর্ব কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন।এত্ত বড় বড় পর্ব দেই তবু রেসপন্স করেন না আপনারা।প্লীজ রেসপন্স করবেন।আপনাদের ছোট্ট মন্তব্যে লেখার আগ্রহ তিনগুণ হয়ে যায়}

