তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ০৫
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
বাহিরে ঝড়বৃষ্টির প্রকট কিছুটা কমলেও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।আকাশ ডেকে উঠছে।বাহির থেকে মেঘের গর্জন শোনা গেলেও ড্রয়িংরুমে রয়েছে পিনপতন নীরবতা।সবাই আশ্চর্য্য আয়রার কথায়।যখন সকলে বিয়েতে মত দিয়েছে তখনি আয়রা বলে উঠলো –
“এই বিয়ে হবে না।”
সবাই অবাক চোখে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছে ইয়াসিন। কি বলছে এই মেয়ে?মাথার তার কি ছিঁড়ে গেছে নাকি।সবার আগে ইয়াসিন অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো –
“কি বলছো তুমি? বিয়ে কেনো হবে না।”
আয়রা রাগী চোখে তাকালো। তারপরই তেতে যাওয়া কন্ঠে বললো –
“আমাকে পুতুল পেয়েছো তাই না? তুমি জানো আমার কি অবস্থা হয়েছিলো?মনে হচ্ছিলো আমি মরেই যাবো।আর তুমি এসেছো আমাকে সারপ্রাইজ দিতে।তোমার সারপ্রাইজের গুলি মারি বাবা আমি ওনাকে বিয়ে করবো না।অন্য কোথাও সম্বন্ধ দেখো।”
একনাগাড়ে কথা বলে হনহন করে নিজের রুমের দিকে ছুটলো।তার পিছু ছুটলো ঈশানিও।ইয়াসিন এখন দমে গেলো।তার রাগিণী মারাত্মক রেগে গেছে।ইয়াসিনের মা একদফা বকে ভাসিয়েছেন ছেলেকে।বাচ্চা মেয়েটাকে কত কাদিয়েছে – এসব বলে বলে।ইয়াসিন কাচুমাচু করে জাহিদ চৌধুরী ও আরহানের উদ্দেশ্যে বললেন –
“আপনাদের অনুমতি পেলে আমি একটু ওর সাথে দেখা করতে চাই।রেগে আছে ভীষন ও। আমি গিয়ে একটু বুঝিয়ে বলি প্লীজ।”
জাহিদ চৌধুরীর সহধর্মিনীর দিকে চাইলেন। মিনারা বেগম ইশারায় যাওয়ার অনুমতি দিতে বললেন।জাহিদ চৌধুরী অনুমতি দিতেই ইয়াসিন অস্থির হয়ে পড়লো। আরহান তাকে উপরে আয়রার রুমের সামনে নিয়ে গেলো।দরজায় টোকা দিতে ঈশানি দরজা খুলে দিলো। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলো আরহান। আরহানের পিছন থেকে ইয়াসিন উঁকি দিলো। আরহান ঈশানিকে রুম থেকে বের হওয়ার জন্য ইশারা করতেই ঈশানি বের হয়ে যায়।ইয়াসিন রুমে প্রবেশ করে দেখে তার রাগিণী পায়ের উপর পা তুলে আরাম করে জুস খাচ্ছে।ইয়াসিনকে দেখে থতমত খেয়ে দ্রুত দাঁড়াতে গিয়ে নিজের গায়ে জুসের আংশিক ফেলে দেয়। হিঁচকি উঠে যায় তার।ইয়াসিন ব্যস্ত হয়ে পাশের টেবিল থেকে পানি নিয়ে দেয় আয়রার হাতে। আয়রা একঢোকে পানি শেষ করে তাকায় ইয়াসিনের দিকে।ইয়াসিন ভ্রু কুচকে তার দিকেই চেয়ে ছিলো।তারপর বলে –
“আমাকে নিচে টেনশনে ফেলে ম্যাডাম এখানে জুস খাচ্ছে।বাহ্,দারুন!”
আয়রা মুখ ভেংচি দেয়।তারপর মুখ বাঁকিয়েই বলে-“কিসের টেনশন?আপনি তো চিলে ছিলেন ? বলেছিলেন আমায় বিয়ে করে নিতে তাই না? এখন সেটাই করবো, হুহ!”
তৎক্ষণাৎ ইয়াসিন হাঁটুগেড়ে বসে আয়রার সামনে। তার পা নিজের হাঁটুর উপর নিয়ে তাতে রূপার একটি সুন্দর নূপুর পড়িয়ে দিতে দিতে বলে –
“আমার আয়রাবিবি,একান্ত ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এই নাবালক শিশুর নাদান ভুল মাফ করিয়া অবশ্যই আপনি উদার ব্যক্তির পরিচয় দিবেন।”
আয়রা মিটিমিটি হাসে।কিন্তু উপরে কঠিন চেহারা প্রকাশ করে বলে –
“হয়েছে সরুন।এসবে আমি গলবো না মোটেও।অনেক কষ্ট দিয়েছেন।আমি কিচ্ছু ভুলবো না।”
ইয়াসিন উঠে দাড়ালো। আয়রার দিকে গভীর দৃষ্টি ফেলে বললো –
“ভুলতে হবে না,সোনা। এই সামান্য কষ্টের বিনিময়ে সারাজীবনের সুখ দিবো।”
তারপর আবার চোখ টিপ দিয়ে বললো –
“তবে তুমি এভাবে কথায় না গললে কিন্তু আমার কাছে দারুণ অস্ত্র আছে তোমাকে গলানোর জন্য।”
আয়রা ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকে। কে এই লোক?তার প্রেমিক পুরুষ তো এমন ছিলো না। সে তো আয়রার থেকে লজ্জাশীল এবং কঠোর ছিলো। কি হলো তার?
ইয়াসিন আর একটু এগিয়ে গেলো আয়রার দিকে।ফিসফিসিয়ে বললো –
“সেই অস্ত্র ব্যবহার করবো নাকি?”
আয়রা বোকার মতো জিজ্ঞেস করলো –
“কি অস্ত্র?”
আয়রার বলার সঙ্গে সঙ্গে একজোড়া ঠাণ্ডা শীতল ওষ্ঠ স্পর্শ করলো আয়রার ওষ্ঠ।দু – সেকেন্ডের ব্যবধানে ছেড়েও দিলো। আয়রার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে হাস্কিস্বরে বললো –
“কেনো পাগলামি করছো? তুমি কি বুঝতে পারছো না তোমাকে আমার লাগবে। তোমার থেকে নিজেকে দূরে রাখা আর সম্ভব না। তোমাকে ছাড়া আমার একমুহুর্ত চলবে না। রেগে থেকো না।তাড়াতাড়ি বধূ সাজিয়ে তোমায় নিয়ে যাবো।তুমি শুধু নিজেকে মির্জা ইয়াসিনের বউ হওয়ার জন্য তৈরি করো, আয়রাবিবি।”
আয়রা চোখ বন্ধ করে ছিলো।ইয়াসিনের প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাসের প্রকোপে তিরতির করে কাপছিলো তার ওষ্ঠ ,ছোট্ট সত্তা।ইয়াসিন আয়রার কপালে চুমু দিয়ে চলে গেলো রুম থেকে। আয়রার অনুভব করতে লাগলো প্রিয় পুরুষের স্পর্শ, মাদকতা মেশানো প্রতিটি কথা।তারপর লজ্জায় লাল নীল হয়ে বিছানায় হাতপা ছড়িয়ে শুয়ে পড়লো।
.
ঈশানি আয়রার রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই পিছন থেকে আরহান ডেকে উঠলো। ঈশানি পিছু ফিরে চাইতেই আরহান ভারী কন্ঠে বললো –
“প্রচণ্ড মাথা ধরেছে।মাকে গিয়ে একটু বলো আমার জন্য কফি পাঠাতে।”
ঈশানি চাইলো আরহানের পানে।চোখগুলো লাল হয়ে আছে,চুলগুলো কেমন উষ্কো খুস্কো হয়ে আছে,ভীষন ক্লান্ত লাগছে দেখতে।অসুস্থ্য কি না সেটা আন্দাজ করতে পারলো না।মুখে শুধু – “ঠিক আছে” বলে নিচে চলে গেলো।
.
ঈশানি নিচে এসে দেখে মেহমানরা চলে গেছে।বলেছে শুক্রবার এসে বিয়ের ডেট ফিক্সড করবে।ঈশানি ভীষন খুশী হলো।রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে পেলো ছোটোমা নেই।বাড়ির পরিচারিকা থালাবাসন ধুচ্ছে। পরিচিকাকে জিজ্ঞেস করলেন –
ছোটোমা কোথায়?
পরিচিকা মেয়েটির নাম ময়না।সে নিজের কাজে ব্যাস্ত থেকেই বললো –
“খালাম্মার নাকি কোমরের ব্যথা উডছে।তাই ঘরে গেছে বিশ্রাম নিতো।কোনো কাম আছেনি আপামনি?”
ঈশানির তাকে না বলে নিজেই কফি বসালো।ছোটমাকে এখন আর সে বিরক্ত করতে চায় না।নিজের মতো কফি বানিয়ে চললো আরহানের রুমের দিকে। আরহানের রুমের দরজা খোলাই ছিলো।তবুও সে রুমের সামনে গিয়ে মৃদুস্বরে ডাকলো –
“আসবো?”
ভিতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ঈশানি এবার উকি দিলো।দেখতে পেলো আরহান লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। দোনামনা করে সে ভিতরে ঢুকলো। বেডসাইডের পাশের টি টেবিলে কফির মগ রাখলো।চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মনে হলো এখনি কফিটা না খেলে ঠান্ডা হয়ে যাবে। সে কি ডাকবে তাকে? লোকটা কি আসলেই ঘুমিয়েছে? ঘুমিয়েছে কি সেটা নিশ্চিত হতে ঈশানি কিছুটা ঝুঁকে গেলো আরহানের দিকে। নিজের ঘাড় নামিয়ে আরহানের মুখের দিকে তাকিয়ে একটা চুটকি দিলো। আরহানের থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করলো আরহানকে। আর একটু ঝুঁকে গেলো। ঠিক সেই মুহূর্তেই চোখ খুলে ফেললো আরহান।তার একদম মুখের সমক্ষেই আর একটি মুখ দেখতে পেলো।ঈশানি ভীষণভাবে হচকচিয়ে গেলো। চট করে মাথা তুলতে নিবে তখনি আরহান ও উঠে বসার চেষ্টা করতেই মুহূর্তেই দুজনের কপাল একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ করলো।ঈশানির নিজের ব্যালেন্স ধরে রাখতে না পেরে দু ‘ কদম পিছিয়ে পড়ে যেতে নেয়। আরহান খপ করে ঈশানির হাত ধরে তাকে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হাত টেনে ধরে।ঈশানি চোখ খিঁচে নেয় পড়ে যাওয়ার ভয়ে ।পরক্ষণেই অনুভব করতে পারে তার হাতে টান লাগছে এবং ঠিক তখনি তার মাথা গিয়ে লাগে একটি শক্তপোক্ত বুকে।ঈশানি গিয়ে আঁচড়ে পরে আরহানের বুকে। আরহানের শরীরের ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণে ঈশানি চোখ বুঝে নেয়।হার্টবিট দ্রুত চলতে থাকে তার।পরক্ষণেই দ্রুত উঠে পরে।সাফাই গাওয়া কণ্ঠে বলে –
আসলে ঘুমিয়েছেন কি না দেখছিলাম।কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিলো।
“আমার মুখের উপর চড়ে দেখছিলে”? আরহান ঈশানির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে।
ঈশানি লজ্জায় মাথা নামিয়ে নেয়।বলে –
“ঠিক বুঝতে পারিনি এমনটা হবে।দুঃখিত।”
আরহান ভ্রু কুচকে তার দিকেই তাকিয়ে।ঈশানি “আপনার কফি “বলে এক দৌড়ে বেরিয়ে যায়। আরহান উঠে দাড়ায়।কফি হাতে নেয় খাওয়ার জন্য।এক চুমুক খেতেই চোখ মুখ কুচকে ফেলে। এতো মিষ্টি সে কখনোই খায় না।নিশ্চয় এই কফি তার মা বানায়নি।বিরক্ত হয়ে কফি রেখে দেয়।মাথা ব্যথাটা বেড়েছে ভীষন তার।
.
ঈশানির আজকে শেষ পরীক্ষা ছিলো।দের/দু’ মাস পরেই তার ফাইনাল পরীক্ষা। আয়রার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়েছে এ মাসের ২৫ তারিখ। হাতে সময় কম।সবাই বিয়ের বন্দোবস্ত,বাজার করা,ইনভাইটেশন পাঠানো এসবই ব্যস্ত।ঈশানির একটু বাহিরে যাওয়া প্রয়োজন।প্র্যাক্টিকাল খাতা কিনতে হবে। তার চাচ্ছু বাসায় নেই,থাকলে সেই এনে দিতো।উপায় না পেয়ে মিনরা বেগমের কাছে গিয়ে বললো –
ছোটোমা,আমার একটু বাহিরে যাওয়া লাগবে।প্র্যাক্টিকাল খাতা লাগবে।যাবো?
মিনারা বেগম বাহিরে তাকালেন।বৈশাখ মাস চলছে। কালরাতের ঝড়ের প্রভাব এখনো রয়েছে।আকাশ পরিষ্কার হয়নি এখনো।রাস্তায় হঠাৎ বৃষ্টি হলে মেয়েটা বিপাকে পড়বে।তখনি সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখা গেলো আরহানকে। মিনারা বেগম আরহানকে ডেকে বললেন –
“বাবা, ইশুকে একটু বাহিরে নিয়ে যা তো।ওর কিছু কেনার আছে।”
ঈশানি একবার বলার চেষ্টা করলো – “সে পারবে একা যেতে।” মিনারা বেগম সেটা হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে মৃদু ধমক দিলেন।ঈশানি দমে গেলো। আরহান ঈশানির দিকে তাকিয়ে বললো –
“তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে আসো।যেকোনো সময় বৃষ্টি হতে পারে।”
বলেই গটগট করে চলে গেলো।ঈশানি ও তৈরি হতে নিজের রুমে চলে গেলো।
~চলবে
{ আসসালামু আলাইকুম।আজকের পর্ব কেমন লেগেছে অবশ্যই জানাবেন।}

