তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ০৬
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
আকাশটা ধূসর মেঘে ঢাকা,চারদিক যেনো এক মায়াবী আলোর চাদরে মোড়ানো। গাছের পাতা ভিজে চকচকে হয়ে আছে,আর রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে ফোঁটা ফোঁটা ছোঁয়ার রেশ।বিশাল দ্বিতল ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো স্পোর্টস কার।গাড়িতে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে আরহান।পরনে তার কালো রঙের “রালফ লরেনের”পোলো শার্ট জড়ানো।জেল দিয়ে স্যাট করা চুলগুলো বাতাসে খানিক এলোমেলো হয়ে গেছে। ব্যস্তচিত্তে ডানহাতে শোভা পাওয়া “রোলেক্স” ব্র্যান্ডের কালো ডায়ালের উপর চোখ বুলালো ।সে বাহিরে এসে দাঁড়িয়েছে প্রায় মিনিট দশেক হতে চললো অথচ এই মেয়ের এখনো আসার নামগন্ধ নেই। বিরক্তিতে কপাল কুচকে নিলো সে।বাহিরের আবহাওয়া ভালো না।মেঘের আনাগোনা রয়েছেই। আরহানকে সর্বোচ্চ বিরক্তিতে ফেলতে গগন থেকে ফোঁটা ফোঁটা বারিধারা ঝরতে শুরু করলো। আরহানের মেজাজ সপ্তমকাশে পৌঁছালো।এই মেয়েটার কি বিন্দুমাত্র সময়জ্ঞান নেই।বিরক্তিতে ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো সে।
তখনি সামনে থেকে আসতে দেখা গেলো ঈশানিকে।নীল রঙের একটি চুড়িদার পরনে। কোমড়পর্যন্ত লতানো চুলগুলো একপাশে এনে বেনি করে রেখেছে। কপালের উপর বেবী হেয়ারগুলো উড়ছে।মুখে কোনো প্রসাধনী নেই।ঠোঁটে শুধু লিপবাম দেয়া।ঈশানি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে আরহান গাড়ির ড্রাইভিং সিটে চড়ে বসে।ঈশানি বিপাকে পড়ে যায়।সামনে বসবে না পিছনে বসবে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে সে সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রয়। আরহানের চড়ে উঠা রাগ যেনো আকাশ ছুঁলো এবার।এক ধমকে বলে উঠলো –
“স্টুপিডের মতো দাঁড়িয়ে আছো কেনো? দ্রুত গাড়িতে উঠে বসো।”
ঈশানি চোখ মুখ কুচকে তাকালো আরহানের দিকে। এই সামান্য প্রশ্ন করায় তাকে এরকম ধমক দেয়ার কারণ বুঝে উঠতে পারলো না।তবুও শান্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো –
“কোথায় বসবো?”
আরহান যেনো অবাক হলো এবার সাথে রাগটাও তরতর করে বাড়লো।এতক্ষন অপেক্ষা করিয়ে এখন বলছে কোথায় বসবে? আশ্চর্য্য,এই মেয়ের কি কমনসেন্সর অভাব নাকি? আরহান চোখ মুখ বিকৃত করে বললো –
“আমার কোলে বসো, আসো।”
ঈশানি নাক মুখ কুচকে ফেললো।বোঝার চেষ্টা করলো ঘটনা,কিন্তু তৎক্ষণাৎ কোনো সুরাহা পেলো না। তবু মুখটা গম্ভীর করে তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো আরহানের পানে।মুখে কিছু বললো না।
আরহান আবার বলে উঠলো –
“এ্যাই মেয়ে, কি সমস্যা? তুমি কি যাবে?এমনিতেই দশমিনিট অপেক্ষা করিয়ে রেখে এসেছো আর এখন অদ্ভুদ প্রশ্ন করে মাথা খারাপ করছো।চুপচাপ সামনে এসে বসো।”
ঈশানি হয়তো আরহানের রাগের কারণ বুঝতে পারলো।নিজের করা কাজে লজ্জিত ও হলো।তাই মাথা নিচু করে বললো –
আসলে চুলে ভীষন জট বেঁধে ছিলো।সেটা খুলতেই দেরি হয়ে গেছে।দুঃখিত।
ঈশানি আর এক মিনিটও সময় ব্যয় না করে সামনে গিয়ে বসে।ঈশানি গাড়িতে বসতে দেখতে পায় আরহান তার দিকে তাকিয়ে আছে।ঈশানি কারণ জানতে ভ্রু উঁচিয়ে বুঝায় “কি”? আরহান কিছু না বলে ঈশানির দিকে ঝুঁকে যায়।ঈশানি অজান্তেই কিছুটা পিছু সরে যায়। দ্বিধান্বিত চোখে তাকায় আরহানের পানে। আরহান তার দিকে তাকিয়েই পিছন থেকে সিট ব্লেট টেনে এনে লাগিয়ে দিতে থাকে।ঈশানি তাড়াহুড়ায় বলে –
“আমি পারি লাগাতে।”
“তো ,এতক্ষন না লাগিয়ে কি আমার লাগিয়ে দেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলে” – বলেই আরহান নিজের সিটে চলে আসে।গড়ি চালানোয় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
.
বাহিরে এখন বিশাল বড় বড় বারিধারা ঝড়ছে।তারা দোকান থেকে বের হয়ে গাড়ির দিকে ছুটে যেতেই মোটামুটি ভিজে গেছে দুজনেই। আরহান গাড়িতে উঠেই নিজের চুল ঝাড়তে শুরু করে। সেই পানির ঝাঁপ গিয়ে লাগে ঈশানির চোখে মুখে।ঈশানি হাঁচি দিয়ে উঠে। আরহান ঈশানির দিকে তাকায়।শরীর পুরো না ভিজলেও মেয়েটার চুল ভিজেছে যার কারণে জামার বেশ কিছু অংশ ভিজে গায়ে লেটকে আছে। আরহান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বললো –
“ওড়না গায়ে ভালোভাবে জড়িয়ে নেও।ঠাণ্ডা লেগে যাবে।”
ঈশানি ওড়না জড়িয়ে নিলো।বাহিরে ঝড়েরা তাণ্ডব করলেও গাড়ির ভিতর চললো নিশ্চল নীরবতা।কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাড়িতে এসে পৌঁছালো। ঈশানি ইতোমধ্যে গাড়িতেই ঘুমিয়ে পড়েছে। আরহান চাইলো তারদিকে।মৃদুস্বরে কয়েকবার ডাক দিতেই ঈশানি উঠে পড়লো।বাহিরে তখনো বৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে। আরহান দ্রুত তাকে বাসায় যেতে বললো।ঈশানি নামতে যেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলো –
“আর আপনি?”
“গাড়ি পার্ক করে আসছি।” আরহান বললো।
ঈশানি নেমে সোজা বাসার দিকে দৌড় দিলো ।
ঈশানির আর আরহান দুজনেই ভিজে বাসায় এসেছে। এ নিয়ে মিনারা বেগম দুজনকে বেশ বকেছে।তারপর দুজনকে আদা – তুলসী চা বানিয়ে দেয়।
.
মাঝরাতের দিকে ঈশানি নিজের শরীরে জ্বর জ্বর অনুভব করলো। মাথাটাও ভারী হয়ে আছে তার। সে মাথায় হাত দিয়ে উঠে বসলো।ভীষন পানির তৃষ্ণা পেয়েছে তার। হাত উঠিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে পানির বোতল হাতে নিয়ে দেখে বোতল ফাঁকা।এখন নিচ থেকে গিয়ে পানি আনতে হবে।বিরক্ত লাগছে তার।পানি খাওয়াও বিশেষ প্রয়োজন।তাই সে বিরক্ত হয়েই ওড়না গায়ে জড়িয়ে নেমে পরে কিচেন রুমের উদ্দেশ্যে।
চৌধুরী বাড়ি দোতলা বিশিষ্ট।নিচে দুটো রুম রয়েছে একটিতে মিনারা বেগম আর জাহিদ চৌধুরী থাকে। কোমরের ব্যথার জন্য ওনারা নিচেই থাকে।অপর রুমটি গেস্ট রুম।আর দোতলায় সিঁড়ি দিয়ে উঠে প্রথম রুমই আরহানের তারপরের রুমটি আয়রার এবং পরের রুমটি ঈশানির।
ঈশানি কিচেন থেকে পানি নিয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠে আসে। তার শরীরটা ভীষন দুর্বল লাগছে।মনে হচ্ছে জ্বর তাকে কাবু করে ফেলেছে।তবু অসুস্থ্য শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে চলতে লাগলো সে।কিন্তু শরীর বেশিক্ষণ সায় দিলো না। ঠাস করেই নিচে পড়ে গেলো।
আরহান ঘুমায় নি এখনো।নিজের কিছু পেন্ডিং কাজ ছিলো সেটায় করছিলো ল্যাপটপে। নিশুথি রাতে হুট করে বাহিরে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দে উঠে দাড়ালো।চঞ্চল পায়ে রুমের বাহিরে এসে দেখতে পেলো ঈশানি নিচে শুয়ে আছে। কপালে ভাঁজ ফেলে এগিয়ে গেলো ঈশানির দিকে,কয়েকবার মৃদুস্বরে ডাকলো।ঈশানি উঠলো না। আরহান ঈশানিকে এবার মৃদু ধাক্কা দিলো।ঈশানির শরীর স্পর্শ করতেই সে আর এক দফা অবাক হলো।মেয়েটার শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। জ্বরের প্রকোপে জ্ঞান হারিয়েছে।সে ঈশানির হাঁটুর নিচে এক হাত ও পিঠের নিচে এক হাত দিয়ে কোলে তুলে ঈশানির পেলব ,নিশ্চল দেহ —চললো ঈশানির রুমের দিকে ।
ঈশানিকে এনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে, কপালে হাত দিয়ে উত্তপ্ততা পরিমাপ করার চেষ্টা করলো।মেয়েটার শরীর আগুন গরম হয়ে আছে। সে ফের গেলো নিজের রুমে এবং দু ‘ মিনিটের মাথায় ফিরেও এলো— হাতে তার থার্মোমিটার।ঈশানির মুখে থার্মোমিটার পুড়ে দিলো।কিছুক্ষণ পর বের করে দেখলো ১০২° জ্বর।অথচ এই মেয়ে কাউকে কিছু বলেনি। আরহান একবার ভাবলো মিনারা বেগমকে ডাকবেন, কিন্তু এতো রাতে ডাক দিলে শুধু শুধু টেনশন করবে এবং শরীর খারাপ হবে ভেবে ডাকেনি।নিজেই একটা ছোট বোলের মধ্যে পানি ও একটা কাপড় নিলো।ঈশানির মাথার কাছটায় বসে তার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকলো। ঈশানির জীর্ণ শীর্ণ শরীর কাচুমাচু হয়ে আছে।মাঝে মাঝে জ্বরের প্রকোপে কেঁপে উঠছে। শেষরাতের দিকে ঈশানির জ্বর নামলে সে নিজের রুমে চলে যায়।
.
ভোরের আলো জানালার পর্দা ভেদ করে রুমে প্রবেশ করেছে। সেই সাথে শোনা যাচ্ছে পাখির কিচিরমিচির কলরব।ঈশানির ঘুম ভেঙে যায়।শরীর কেমন ম্যাজম্যাজ করছে তার।মাথাটা মনে হয় দশ মণের বস্তা হয়ে আছে।এখন শরীরে জ্বর নেই,তবুও যেনো ভীষন দুর্বল লাগলো শরীর।ঈশানি কোনো মতে উঠে বসলো। বেডসাইড টেবিলে একটি বোল ও একটি কাপড় দেখতে পেলো।ঈশানির ধরে নিলো হয় ছোটোমা না হয় আরুপুর কাজ এটা। বেশি ঘাটালো না ব্যাপারটা।আপাতত তার গোসল করা দরকার।মাথাটা পাতলা করতে হবে।সেই উদ্দেশ্যেই ওয়াশরুমের দিকে গেলো।
.
জাহিদ চৌধুরী এবং আয়রা ব্রেকফাস্টের জন্য টেবিলে বসেছে। মিনারা বেগম খাবার বাড়ছেন।তখনি একদম ফরমাল গেটআপে নিচে নেমে এলো আরহান। সে এসে আয়রার পাশের চেয়ারে বসলো।
মিনারা বেগম তার প্লেটে দুটো ব্রেড টোস্ট দিলেন। মিনারা বেগম আয়রাকে ডেকে বললো –
“ইশু আজ এখনো নামেনি কেনো দেখে আয় তো।
দ্রুত খেতে ডাক ওকে”
আয়রা উঠতে নিলে আরহান থামিয়ে দেয়। ব্রেড টোস্টে সুগার ফ্রি পিনাট বাটার লাগাতে লাগাতে বলে –
“কালরাতে জ্বরের কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল সিঁড়িতে। আমি দেখতে পেয়ে রুমে দিয়ে এসেছিলাম। তাই হয়তো নামেনি।”
মিনারা বেগম ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।বললেন –
“আমাদের কাউকে ডাক দিলি না কেনো? মেয়েটা সারারাত জ্বরে কাতরেছে নিশ্চয়।”
আরহান কিছু বলার আগেই নিচে নেমে আসে ঈশানি।ঈশানি কিছু বলার আগেই মিনারা বেগম এগিয়ে যান।ঈশানির কপালে গালে হাত দিয়ে বলে-
“এখনো তো জ্বর নেই। হ্যাঁ রে, জ্বর হয়েছে আমাকে জানাবি না।যদি বাড়াবাড়ি কিছু হয়ে যেতো তখন ।”
ঈশানি মৃদু কেশে জবাব দিলো —
“এখন ঠিক আছি তো ছোটোমা। তোমার যত্নে একদম সুস্থ হয়ে গেছি।”
মিনারা বেগম হেসে বললেন –
“আমার না আরহানের। সিঁড়িতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি। আরহান দেখতে পেয়ে তোকে তোর রুমে দিয়ে এসেছে। ভাগ্যিস ছেলেটা দেখেছিলো। যাই হোক, আয় খেতে আয় এখন।
ঈশানি অবাক হয়ে তাকায় আরহানের পানে। এই লোক রাতে তার সেবাযত্ন করেছে? তার মানে বোল কাপড় জলপট্টি এনার কাজ?কিন্তু আরহানের কোনো হেলদোল দেখা গেলো না।সে নির্বিকার খেয়ে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়।
.
চৌধুরী বাড়িতে বিয়ের ধুম লেগেছে।সামনের সপ্তাহে আয়রার বিয়ে।কেনাকাটা তেমন কিছুই হয়নি।বিয়ের বেনারশী ই এখনো কেন হয়নি।এদিকে বাড়িতে দুইজন ছেলেমানুষের একজন ও নেই যে তাদের নিয়ে শপিংয়ে যাবে।উপায় না পেয়ে মিনারা বেগম কল লাগায় নিজের ছেলেকে।বলে –
“বাবা, আয়রার বিয়ের কেনাকাটা বাকি।এখনো বিয়ের বেনারশী,লেহেঙ্গা কিছুই কেনা হয়নি।তোর কি সময় হবে?
আরহান নিজের হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বললো –
“আমার দুপুরে একটা ওটি আছে।সেটা শেষ করে বিকেলে তোমাদের নিতে আসবো।তৈরি থেকো।”
~চলবে
{আসসালামু আলাইকুম।গল্পটি আপনাদের কেমন লাগছে? ভালো লাগছে তো? ভালো লাগল একটু রিয়েক্ট,কমেন্ট করে জানাবেন।আপনাদের রেসপন্স পেলে লেখার আগ্রহ দ্বিগুণ বেড়ে যায়।}

