তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ০৭
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
সায়াহ্ন বেলায় সূর্যটা লাল হয়ে আকাশ ছুঁয়েছে।পাখিরা সব ফিরে যাচ্ছে তাদের নীড়ে। কর্মব্যস্ত মানুষ ফিরে যাচ্ছে তাদের ঠিকানায়।ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তার জ্যামে বসে এসবই অবলোকন করছিলো ঈশানি।,আয়রা , মিনারা বেগম , রিমি এবং ঈশানিকে নিয়ে বেরিয়েছে আরহান। আয়রার বিয়ের জন্য এক সপ্তাহ আগে চলে এসেছে রিমি।আপাতত উদ্দেশ্য তাদের শপিংমলে যাওয়া।কিন্তু ঢাকার বিশ্রী জ্যামে তারা আটকে আছে আধ ঘণ্টা হবে। ড্রাইভিং সিটে বসে আছে আরহান।শরীর তার ঘেমে নেয়ে যা – তা অবস্থা।বিরক্তভাবে আরেকবার চাইলো সিগন্যালের দিকে।সবুজ বাতি জ্বলে উঠতেই গাড়ি টান দিলো সে।বিশাল বড় শপিংমলের সামনে থেমেছে গাড়িটি।একে একে সকলে নামলো। আরহান পার্কিং লটে গাড়িটি পার্ক করতে গিয়ে দেখা হয় ইয়াসিনের সাথে।ইয়াসিনের সাথে হ্যান্ডসেক করে আরহান জিজ্ঞেস করলো –
“তুমি এখানে?”
ইয়াসিন আয়রার থেকে শুনেছে তারা শপিংয়ে এসেছে।বিয়ে ঠিক হয়েছে থেকে তাদের দেখা হয়েছে মাত্র দুবার।তাই প্রিয়তমাকে দেখার লোভ সামলাতে না পেরে চলে এসেছে।কিন্তু এই কথা তো আর হবুও সমন্ধিকে বলা যায় না।সে অকপটে মিথ্যে বলে দিলো –
আসলে ভাই ,এদিকে একটা কাজ ছিলো আর কি।
আরহান তাকে একবার দেখে নিলো।তারপর আবার বললো –
“কাজ শেষে হলে আমার সাথে না হয় আসো।আয়রা মা ওরা এসেছে বিয়ের কেনাকাটা করতে।”
ইয়াসিন যেনো এই কথার অপেক্ষাতেই ছিলো। চট করে বলে ফেললো –
হ্যাঁ,কাজ তো শেষ।যাওয়া যায় তবে।
আরহান মাথা দুলিয়ে সামনে এগোলো।পিছু নিলো ইয়াসিন। সামনে গিয়ে মিনারা বেগমকে সালাম দিলেন।তারপর সকলের অগচরে আয়রার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারলেন। আয়রা লজ্জায় মাথা নুইয়ে নিলো। বদ লোকটা ঠিক চলে এসেছে।
.
প্রথমেই বেনারশী কিনতে বসলো তারা। আয়রা একটার পর একটা বেনারসি উল্টে পাল্টে দেখছে আর ইয়াসিনকে চোখের ইশারায় জিজ্ঞেস করছে এটা নিবে কি না? প্রতিবারই ইয়াসিন না করছে।ইয়াসিন এবার নিজেই দেখতে লাগলো।খুঁজে খুঁজে একটা মেজেন্টা কালারের বেনারসি এনে আয়রার শরীরে ধরলো।মুখ থেকে আপনা আপনি বেরিয়ে এলো –
“মাশা আল্লাহ”
আয়রা লজ্জা পেলো।ঈশানি আর রিমি ঠোঁট টিপে হাসছে। আরহান বাইরে অপেক্ষা করছে এসব শপিং তার ভালো লাগে না। মিনারা বেগম অন্যান্য শাড়ি দেখায় ব্যস্ত। রিমি ঠোঁট টিপে হেসে আয়রাকে খোঁচা দিয়ে বললো –
“এই আরুপু,তোমার বর তো এখনি পাগল হয়ে যাচ্ছে।বিয়ে পর্যন্ত মনে তো হয় না আর অপেক্ষা করতে পারবে।”
আয়রা কিছু না বললেও ইয়াসিন তার মুখের হাসি আরেকটু চওড়া করে বললো –
“তা অবশ্য ভুল বলোনি শ্যালিকা।আমার হাতে থাকলে তোমার বোনকে এখনি কিডন্যাপ করে নিতে যেতাম আমার কাছে। আর কতকাল একা বিছানায় ঘুমাবো বলো।”
শেষের কথাটা দুঃখী দুঃখী মুখে বললো সে।রিমি এবার উচ্চস্বরে হেসে দিলো। আয়রা ইয়াসিনের বাহুতে মৃদু আঘাত করে মায়ের কাছে চলে গেলো।ইয়াসিন গাল এলিয়ে হাসলো।মেয়েটাকে লজ্জা দিতে তার দারুন লাগে।
সকলের কেনাকাটা শেষ করতে করতে অনেকটা রাত হয়ে গেছে।ইয়াসিন চলে গেছে। মিনারা বেগম তাদের সাথে ডাকলেও আসেনি।দুদিন পর বিয়ে এখনি হবু শ্বশুরবাড়ি যাওয়া ঠিক না। আরহান তাদের নিয়ে চলে এলো বাড়িতে।
.
অপরাহ্নের সময়। কয়েকদিন বৃষ্টির পর সূর্য আজ দারুন তেজ নিয়ে এসেছে। ভ্যাপসা গরমে নাজেহাল অবস্থা জনমানবের।সাদা রঙে রাঙানো দরজার মাঝখানে ছোট একটি ফ্রস্টেড কাচের জানালা ।দরজার ডান পাশে মোটা অক্ষরে লেখা –
“ডা. আরহান মীর চৌধুরী
হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ”
দরজার পাশে ছোট একটি বেল সুইচ,তার নিচে লেখা – “দয়া করে বেল টিপে ভিতরে প্রবেশ করুন”
আরহান রাউন্ড শেষ করে নিজের কেবিনের নব ঘুরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করে। নিজের গায়ের সাদা অ্যাপোর্ন খুলে চেয়ারের হাতলে রাখে।এসির পাওয়ার আরেকটু বাড়িয়ে দিয়ে নিজের চেয়ারে বসে।টেবিলের উপর থেকে পানির গ্লাস নিয়ে ঢকঢক করে খেয়ে চেয়ারে শরীর এলিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর বেলের শব্দ কানে ভাসে। আরহান সোজা হয়ে বসে বলে –
“কাম ইন ”
আরহানের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভিতরে এসে বলে –
স্যার,একজন পেশেন্ট এসেছে।পাঠিয়ে দেবো?
আরহান মাথা নাড়িয়ে “হ্যাঁ”বোঝাতেই মেয়েটি চলে যায়।
দরজা ঠেলে ভিতরে আসার শব্দ পেতে আরহান চোখ তুলে তাকিয়ে বলতে নেয় –
“বসু….”
ঈশানিকে দেখে থেমে যায়। ঈশানির পাশে একজন বয়স্ক লোক।লোকটির বাহু ধরে সে আগাচ্ছে।আরহান বসতে ইশারা করে জিজ্ঞেস করলো –
“তুমি এখানে? আর উনি?”
বৃদ্ধ লোকটিকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসে।ওড়নার কোনো দিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলে-
“চাচার রিক্সা করে কলেজ শেষে বাসায় যাচ্ছিলাম। মাঝরাস্তায় চাচা বুকে হাত দিয়ে চিৎকার করে রাস্তায় শুয়ে পড়ে।আমি আশে পাশের লোকের সাহায্যে তাকে নিয়ে আমি নিকটস্থ ফার্মেসিতে নিয়ে যাই।সেখানে জানায় আগে ওনার ইসিজি করতে হবে।তাই নিয়ে এসেছি।”
ঈশানির বলা শেষ হলে বৃদ্ধ লোকটি কাচুমাচু করতে করতে বলেন –
মা রে কতবার না করলাম যে, যাওন লাগতো না হাসপাতালে।হেই কোনো কথায় শুনলো না। কন ডাক্টার সাব আমি ঠিক আছি না?
ঈশানি ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো।ঈশানির দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে আরহান বললো –
“সেটা তো ইসিজি করলেই বোঝা যাবে চাচা।আপাতত আপনি আমার সাথে আসুন।”
তারপর ঈশানির দিকে তাকিয়ে বলে –
“তুমি এখানেই অপেক্ষা করো।”
আরহান বৃদ্ধ লোকটিকে নিয়ে চলে যায় ।
.
সকল টেস্ট করানো শেষে লোকটিকে ওষুধ কিনে দিয়ে রিপোর্ট নিতে পরশু আসতে বলেছে আরহান।বৃদ্ধ লোকটি চলে গেলে সে নিজের কেবিনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।যেতে যেতে ডানহাতে ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নেয় দুপুর—৩.৪০।কেবিনে প্রবেশ করে দেখতে পায় ঈশানি চেয়ারে পা তুলে বসে টেবিলের উপর হাত রেখে তাতে মাথা দিয়ে ঘুমিয়ে আছে।জানালা থেকে আসা রোদের আলো মুখে পড়ায় মুখ কুঁচকে নিচ্ছে। আরহান এগিয়ে গিয়ে জানালায় পর্দা টেনে দেয়।এসির পাওয়ার কমিয়ে সে ঈশানির দিকে তাকায়।বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টে ঘুমাচ্ছে এখন। আরহান তার ডান হাতের দু – আঙ্গুল দিয়ে কপাল ঘষা দেয়।চোখ অফ করে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে গিয়ে বসে নিজের চেয়ারে।পেশেন্টের কেস স্ট্যাডিতে মনোযোগ দিলেন।
.
ফোনের বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ঈশানির। নিভু নিভু চোখে তাকাতেই সামনে দৃশ্যমান হয় আরহানের গম্ভীর মুখশ্রী। সে নিজের কাজে ব্যাস্ত। সে ধপ করে উঠে বসে। ফোলাফোলা চোখগুলো কচলে আবার তাকায় আরহানের পানে। দু ‘ সেকেন্ড সময় নেয় সবটা মনে পড়তে।আরহান শান্ত দৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়েই।ঈশানি সদ্য ঘুম থেকে উঠা ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় জিজ্ঞেস করে –
আমাকে ডাক দিয়ে দেননি কেনো?সন্ধ্যা হয়ে গেছে দেখেছেন।
আরহান উত্তর দেয় না।নিজ কাজে ব্যাস্ত হয়ে টেবিলের উপর থেকে সুইচ বেলে চাপ দেয়। তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ভিতরে আসে। আরহান তাকে এককাপ কফি দিতে বলে।ঈশানি বিরক্ত নিয়ে তাকায় আরহানের দিকে।লোকটা কি তাকে অবজ্ঞা করলো? পরপরই মুখ বেঁকিয়ে ভাবলো — করলে করুক।তাতে তার বয়েই গেলো।সে এখন চলে যাবে।এমনিতেই সন্ধ্যা নেমে গেছে।ঈশানি উঠে দাড়ায়।কাধে ব্যাগ জড়িয়ে আরহানকে কিছু বলার আগে আরহান ডান দিকে আঙুল তাক করে নিজেই বলে উঠে –
“ওদিকে ওয়াশরুম আছে।ফ্রেশ হয়ে আসো। আমার আরো ৩০ মিনিট সময় লাগবে।”
ঈশানি অবুঝের মতো বলে –
“কিসের জন্য?”
আরহান ফাইলের দিকে তাকিয়েই বলে –
“হাতের কাজ শেষ হতে। তারপর বেরোবো।”
ঈশানি কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বললো –
“আমি পারবো যেতে।”
“সন্ধ্যা নেমে গেছে।এখন একা বাসায় গেলে মা বকাবকি করবে। অপেক্ষা করো।” – আরহান বলে
ঈশানি মুখ বাকায়।সে কি বাচ্চা যে যেতে পারবে না? আর এমনভাবে অর্ডার করছে যেনো রাজা – মহারাজা।বিড়বিড় করতে করতে সে ওয়াশরুমে চলে যায়। ৫ মিনিট পর বেরিয়ে এসে দেখতে পায় কফি টেবিলে। আরহান ইশারায় নিতে বলল সেটা ।ঈশানি বিনা শব্দে নিয়ে নেয়।
আরহানের কাজ শেষ করতে করতে মাগরিবের আজান দিয়ে দেয়।ঈশানিকে গাড়ির চাবি দিয়ে বলে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে।ঈশানি চাবি নিয়ে গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
দুরু থেকে দেখতে পায় আরহান আসছে।শরীরে তার সাদা শার্ট– ইন করা।পরনে কালো প্যান্ট।চুলগুলো হাল্কা এলোমেলো।পেশীবহুল বাহু দুটি ফুলে আছে হাল্কা। আরহান ঈশানির কাছে আসতেই ,কোত্থেকে একটি মেয়ে এসে হুট করে জড়িয়ে ধরে আরহানকে। ঈশানি অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।অবাক হয় আরহান ও।তারপর নিজের থেকে মেয়েটিকে ছাড়িয়ে নিয়ে ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলে উঠে –
“কি হচ্ছে কি অলিভিয়া। এটা তোর লন্ডন না যে এভাবে হুট করে গায়ে পড়বি।দূরে দাড়া।”
অলিভিয়া আরহানের ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলা গায়ে মাখলো না।উল্টো অভিমানী শুরে বললো –
“আমায় না বলে চলে এসেছিস।আবার এখন ধমক ও দিচ্ছিস।”
আরহান ঈশানির দিকে একবার তাকাল তারপর আবার অলিভিয়ার দিকে তাকিয়ে বললো –
“সময় হয়ে উঠেনি।তুই কবে এসেছিস।”
অলিভিয়া গদগদ ভাব নিয়ে জানালো –
“কাল রাতে এসেছি। আর আজকে তোকে সারপ্রাইজ দিতে চলে আসলাম।”
আরহান বললো –
“আচ্ছা।”
অলিভিয়া আবার জিজ্ঞেস করলো –
“তোর তো ডিউটি আওয়ার শেষ।চল কোথাও একটা বসি।”
আরহান ঈশানিকে একবার দেখে নিলো। তারপর বললো –
“আমার সাথে মানুষ আছে।”
অলিভিয়া এবার পিছনে তাকালো।ঈশানি একটু হাসার চেষ্টা করলো।অলিভিয়া ঘাড় ঘুরিয়ে প্রশ্নাত্মক দৃষ্টি দিতে আরহান এগিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিলো।অলিভিয়া হেসে ঈশানির সাথে কি হ্যান্ডসেক করলো।অলিভিয়া ফের আরহানকে জিজ্ঞেস করলো –
“কোথায় যাচ্ছিস?”
“বাসায়।” আরহানের ছোট্ট জবাব।
অলিভিয়া হেসে বলে –
” আমিও যাই তবে ,অনেকদিন আন্টির সাথে দেখা হয় না।”
আরহান মৃদু হেসে গাড়িতে উঠতে বলে তাকে। অলিভিয়া গিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশে বসে।ঈশানি আরহানের দিকে একবার তাকিয়ে পিছনে গিয়ে বসে পড়ে। আরহান গাড়ি চালাচ্ছে আর অলিভিয়া বকবক করে যাচ্ছে।
~চলবে
{ একটা বিষয় ক্লিয়ার করতে চাই। পর্ব – ০৪ এ আমি ভুলে উল্লেখ করেছিলাম যে ইয়াসিন আরহানের সিনিয়র।সেটা আসলো উল্টো হবে।মানে আরহান ইয়াসিনের সিনিয়র।আমি পর্ব – ০৪ এ এডিট করে দিয়েছি।আবার এখানেও লিখে দিলাম যাতে আপনারা কেউ কনফিউজড না হন।আজকের পার্ট কেমন লাগলো জানাবেন।}

