তোমার_আমার_প্রেম পর্ব – ০৮ লেখনীতে – রুবাব ফারহা

0
29

#তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব – ০৮
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
চৌধুরী বাড়ির ড্রয়িং রুমে গভীর মনোযোগ দিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত চার রমণী আলোচনার মূল উদ্দ্যেশ্য হলো আগামীকাল আয়রার মেহেন্দি অনুষ্ঠান এবং আগামী পরশু গায়ে হলুদ।আলোচনায় মত্ত আছে – রিমি , আয়রা,ঈশানি এবং অলিভিয়া। অলিভিয়া চৌধুরী বাড়ি আসার পর মিনারা বেগম ভীষন খুশি হন।তারপর তাকে জানায় দুদিন পরেই আয়রার বিয়ে।সে যেনো আজ কিছুতেই না যায়।অলিভিয়া যেনো আকাশের চাঁদ হাতে পেয়ে যায়।সে তো এটায় চাচ্ছিলো।যেকোনো ভাবে আরহানের সাথে থাকতে,কাছাকাছি থাকতে।একমাত্র আরহানের জন্যই তো সে দেশে এসেছে।কিন্তু সেই ছেলে বুঝলে তো,পাত্তা দিলে তো।অলিভিয়া মনোবল হারায় না।বরং দ্বিগুণ মনোবল নিয়ে নিজেকে বলে – “বুঝবে বুঝবে।না বুঝে কোথায় যাবে? আরহানের জীবনের একমাত্র মেয়ে সেই হবে। আর কাউকে সে আসতে দিবে না।কখনোই না।”— এসব ভেবেই মৃদু হাসি দেয় অলিভিয়া।তারপর মুখ ফুলিয়ে বলে মিনারা বেগমকে –
“আয়রার বিয়ে আমি তো জানিই না ,আন্টি।তোমার ছেলেটা কিচ্ছু বলেনি আমায়।”

মিনারা বেগম এক গাল হেসে বললেন –
” তুমি এসেছো এখন আর যেতে দিচ্ছি না। কাল থেকে এমনিতেই মেহমান আসতে শুরু করবে।একদম বিয়ে শেষ করে যাবে,কেমন।”

অলিভিয়া খুশি হয়ে যায়।এবং তারপর থেকেই চারজন বসেছে কাল কি করবে।গায়ে হলুদে কি হবে– এসব নিয়েই আলোচনায় ব্যাস্ত ছিলো তারা
ঈশানির এসবে বিশেষ মন না থাকলেও আয়রার মন রক্ষার্থে তাকেও সঙ্গ দিতে হচ্ছে। চারমাথা এক হয়ে ফোনে তারা নাচ দেখছিলো।রিমি আর অলিভিয়া নাচবে হলুদের অনুষ্ঠানে।সেই নাচের টিউটরিয়াল দেখছে। ঠিক সেই মুহূর্তে উপর থেকে আরহানের কন্ঠ ভেসে আসলো-
“মা,এক কাপ কফি দিয়ে যাও।”

আরহানের কন্ঠস্বর পেয়ে চট করে উঠে দাড়ায় রিমি।একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যায় রান্নাঘরে। আরহানের মনমতো কফি বানিয়ে চললো আরহানের রুমের দিকে।অলিভিয়া সবকিছুই খেয়াল করলো নিখুঁত চোঁখে। তার মন বলছে এটা শুধু কাজিনদের মধ্যে স্বাভাবিক মেলবন্ধন না।বরং রিমির মনে রয়েছে সুপ্ত অভিলাষা। সে রাগে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয়।কপালের রগ ফুলে ফুটে অলিভিয়ার।তার আরহানের দিকে নজর।এতবড় সাহস!
.
রিমি কফি নিয়ে আরহানের রুমে যায়।দেখতে পায় আরহান ল্যাপটপে মুখ গুঁজে কাজ করছে।রিমিকে তখনো খেয়াল করেনি।রিমি কফি মগ এগিয়ে দিয়ে লাজুক স্বরে বলে –
“আপনার কফি।”

আরহান ল্যাপটপেই মুখ গুঁজে বলে –
“রেখে দে টেবিলে ।”

রিমি টেবিলে রেখে দিয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে রয়। আরহান মাথা তুলে চায় রিমির পানে।ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে –
“কিছু বলবি?”

ইশ,এই লোকটা এতো সুন্দর কেনো? তার কথা বলার ধরন,প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি,চোখের চাহনি এতো প্রবলভাবে কেনো টানে রিমিকে?এইযে এখন ভ্রু উঁচিয়ে কথা বললো,কি মারাত্মক না লাগলো রিমির কাছে —এসবই ভেবে রিমি তার দুই ঠোঁট ভিজিয়ে ঢক খায়।তারপর কোনরকম “কিছু না”বলে চলে যায়।
.
চৌধুরী বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসতে শুরু করেছে।আগামীকাল হলুদ এবং তারপরের দিন বিয়ে।আজ সন্ধ্যায় ছোট করে বাড়ির মেয়েগুলো মেহেন্দি অনুষ্ঠান রেখেছে।চারদিকে মানুষের আনাগোনা,বিয়ের তোড়জোড়ে যেনো চৌধুরী বাড়ি নতুন রূপ নিয়েছে।

সকালের নাস্তার জন্য খাবার টেবিলে উপস্থিত হয় ঈশানি।দেখতে পায় মোটামুটি সকলে খেতে বসেছে।ঈশানিকে দেখেই রনি একটা বিশ্রী হাসি উপহার দেয়।ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয় ঈশানি।তারপর রান্না ঘরে চলে যায় ছোটোমাকে সাহায্য করতে।
এদিকে রনির মুখে লেপ্টে থাকে এক দুর্বিষহ হাসি।চোখে অজানা কোনো রহস্য, ক্ষোভ।
.
মেহেদী অনুষ্ঠান উপলক্ষে ছাদে ছোট করে ডেকোরেশন করেছে মেয়েরা। আয়রার ভীষন শখ ছিলো মেহেদী অনুষ্ঠানের।তাই তার কাজিনমহল ও বন্ধুরা মিলে এই ছোট্ট অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে ওকে।বাড়ির গুরুজনরা এদিকে আসেনি।

আয়রা সুন্দর একটি গাঢ় গোলাপী ইংরেজিতে যেটাকে বলে “হট পিংক”রঙের হালকা কাজের একটি লেহেঙ্গা পড়েছে।সেজেছে ও দারুন ভাবে। আর বাকি সকলে মিলিয়ে নিজেদের জন্য সবুজ রঙের চুড়িদার নির্বাচন করেছে ।ঈশানি ,রিমি,অলিভিয়া সহ বাকি সকলে মিলে মেহেদী দেয়ার উদ্দেশ্যে ছাদে এসেছে।বক্সে উচ্চশব্দে বাজছে শাহরুখ খানের বিখ্যাত গান -” মেহেন্দি লাগাকে রাখনা”।
আয়রাকে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছে মেহেদী আর্টিস্ট।সেই সাথে অন্যদের ও দিয়ে দিচ্ছে অন্য আর্টিস্ট।ঈশানি,অলিভিয়া,রিমি ও বসে পড়েছে মেহেদী দিতে।ঈশানির মেহেদী দেয়া আগেই শেষ।সে সিম্পল ডিজাইন পছন্দ করেছিল,যেটা তাড়াতাড়ি দেয়া হয় গেছে।ঈশানি হাতে মেহেদী নিয়ে বসে ছিল,তখন আয়রা ডেকে বললো –
“ইশু,আমার ফোনটা ঘরে রেখে এসেছি। একটু এনে দিবি।”

ঈশানি মাথা দুলিয়ে ছাদের গেট পেরিয়ে নিচে নামতে লাগলো। ছাদের থেকে নামতে হাতের বামে রয়েছে স্টোর রুম।সেদিকটায় সচরাচর কেউ যায় না।সন্ধ্যা পেরিয়ে এখন রাত নেমেছে শহরের বুকে। ঈশানি তিন/চার সিঁড়ি পার করে নামতেই পিছন থেকে একটি দানবীয় হাত চেপে ধরে ঈশানির মুখ।ঈশানি ছোটার জন্য ছটফট করতে থাকে।আগন্তুকের হাতে কিল,ঘুষি দিকে থাকে কিন্তু লাভ হয়না।উল্টো সেই আগুন্তুক ঈশানির মুখ চেপে ধরে নিয়ে যায় সেই পরিত্যক্ত স্টোররুমে।ঈশানি বুঝতে পারে কিছু একটা খারাপ হতে চলেছে।সে ঘাবড়ে যায়,ভয় পেয়ে যায়।মাথা কাজ করে না তার।তাকে যখন স্টোর রুমে নিয়ে আসে তখন সে ভয়ে আরো সিটিয়ে যায়।তখনি তার ঘাড়ের উপর কারো উত্তপ্ত নিশ্বাস পায় এবং শুনতে পায় ফিসফিসিয়ে বলা কথা –
“ইশুরানি,বলেছিলাম না ভয়ংকর শাস্তি দেবো।আমাকে থাপ্পড় মারার ফল আজকে পাবে তুমি।তোমার সারা শরীর ক*ল*ঙ্কি*ত করবো আমি। যেই ক*ল*ঙ্ক নিয়ে তুমি সমাজে দাঁড়াতে পারবে না।সবাই তোমাকে ছিঃ ছা দিবে সেই ক*ল*ঙ্কে ক*ল*ঙ্কি*ত করবো তোমায় আজ।”

আতঙ্কে ঈশানির সর্বাঙ্গ কাপতে থাকে।নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনবরত ধস্তাধস্তি করতে থাকে।শেষে গিয়ে এক প্রকোপ কামড় বসায় মুখের উপর থাকা রনির হাতে।রনি মৃদু আর্তনাদ করে ঈশানির মুখ ছেড়ে দিতেই ঈশানি পালানোর চেষ্টা করে।কিন্ত,আজ ভাগ্য ঈশানির সহায় নেই।দরজার কাছে যাওয়ার আগে চুলের মুঠি ধরে ফেলে রনি।ঈশানির চুলের মুঠি ধরে ঘুরিয়ে তার গালে একটি থাপ্পড় বসায়।ঈশানি গিয়ে আছড়ে পরে মেঝেতে। ঠোঁটকেটে রক্ত বেরিয়ে আসে।ডুকরে কেঁদে উঠে ঈশানি ।কিভাবে বাঁচবে সে?কিভাবে পালাবে এখান থেকে?এই মানুষরূপী জানোয়ার,রাক্ষস থেকে সে কি নিজেকে বাঁচাতে পারবে? ঈশানির এবার জোরে চিল্লাতে থাকে –
“কেউ আছো?বাঁচাও আমাকে।এই শয়তানের থেকে আমাকে রক্ষা করো।হেই,আল্লাহ আমাকে সহায়তা করুন।”

ঈশানির চিৎকারে রনি হেসে উঠে।বিকৃত সেই হাসি দিয়ে বলে –
“গানের আওয়াজ পাচ্ছো না,ডার্লিং?তোমরা না মেহেদি অনুষ্ঠানে আছো? গান বাজিয়ে এনজয় করছিলে?সেই গানের নিচেই চাপা পড়ে যাবে চিৎকার।কেউ শুনবে না,কেউ দেখবে না,কেউ আসবে না বাঁচাতে।বিয়ে বাড়ির এতো মানুষের ভিড়ে তোমাকে কে খুঁজবে। চিল্লাও আরো চিল্লাও।তুমি যত চিল্লাবে তোমাকে ততটা যন্ত্রণা দিয়ে ক*ল*ঙ্কি*ত করবো।”

ঈশানি এবার হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। হাতজোড় করে মিনতি করে বললো –
“আমাকে ছেড়ে দেন, রনিভাই প্লীজ।আমার এতবড় ক্ষতি করবেন না।আমাকে ছেড়ে দিন প্লীজ।”

রনি যেনো পৈচাশিক আনন্দ পেলো ঈশানির অনুনয়ে।মুখে শয়তানি হাসি রেখে এগিয়ে গেলো ঈশানির দিকে।ঈশানি পেছাতে লাগলো আর অনুনয় বিনোনোয় করতে থাকলো।রনি কিচ্ছু শুনলো না হাত বাড়িয়ে টেনে ফেলে দিলো ঈশানির ওড়না, ছিঁড়ে ফেললো ঈশানির ডান হাতের জামার কিছু অংশ।ঈশানি হাতের কাছে থাকা পুরানো ফুলদানি দিয়ে রনির মাথায় আঘাত করলো।রনির কপাল কেটে কিছুটা পিছিয়ে গেলো।কপাল বেয়ে রক্ত বেরোচ্ছে।ঈশানি এই ফাঁকে দৌড় দিতে গেলে রনি খপ করে ঈশানির পেটে বাহু জড়িয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসে।ঈশানির পেটে রাখা তার হাতের নখ ডেবে দেয় ঈশানির পেটে।ঈশানি ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠে। পা দিয়ে অনবরত লাত্থি দিতে থাকে রনিকে।রনি হিসহিসিয়ে বলে –
“তোর তেজ কমাবো আমি আজ। এখানে আমার কাছে বন্ধ হয়েও তোর তেজ কমেনা।তোর শরীরের প্রতিটি অঙ্গের তেজ কমাবো আজ।তোকে ছি*ন্ন বি*ন্ন করে খু*ব*লে শেষ করে দেবো।”

বলেই ঈশানির ঘাড়ে কামড় বসায়।ঈশানি ব্যথায় ঘৃণায় মুখ খিঁচিয়ে নেয়।পরক্ষণেই রনির গো*প*না*ঙ্গে এক লাথি বসায় ।রনি ব্যথায় মুচড়ে উঠে ঈশানিকে ছেড়ে দিলে ঈশানি দৌড়ে দরজা খুলতে যায় তার আগেই আবার তাকে ধরে ফেলে রনি। আরো হিংস্ররূপ নিয়ে ধরে ফেলে ঈশানির হাত।ঈশানির গাল চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠে।ঈশানি হাত ঝটকা দিয়ে বলে –
” ছেড়ে দেন বলছি। ছুবেন না আমায় একদম।আমি আপনাকে খু*ন করে ফেলবো।”

রনি ঘর কাঁপিয়ে হাসে।তারপর আবার ঈশানির হাত মুচড়ে পিঠে নিয়ে আসে।তারপর দাঁতে দাঁত চিপে বলে –
“আগে আমার হাত থেকে রক্ষা পাও ,ডার্লিং।তোমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে আমি কালিমা লেপন করবো আজ।”

ঈশানি মনেপ্রাণে আল্লাহকে ডাকছে। আজ কি তবে তাকে তার সম্ভ্রম হারাতে হবে।ঈশানি হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। হঠাৎ বাইরে থেকে কারো জুতার খসখসে আওয়াজ পাওয়া যায়।ঈশানি যেনো আশার আলো দেখতে পেলো সে কিছু বলবে তার আগেই রনি তার মুখ চেপে ধরে।ঈশানি মুখ বন্ধ অবস্থায় ” উ উ ” শব্দ করে গোঙাতে থাকে। রনি লক্ষ্য করলো বাহিরে আর গানের শব্দ নেই।সে কিছুটা ভীত হলো।তবে তাকে ভয় কাবু করতে পারলো না ,তাকে এই মুহূর্তে এক পৈচাশিক নেশায় কাবু করেছে।সে ঈশানির মুখ শক্ত করে চেপে ধরেছে। ঈশানির মুখে হাত থাকায় সে শব্দ করতে পারছে না।হঠাৎ করে বাহিরে পায়ের আওয়াজও ও থেমে গেছে। ঈশানির মনে জেগে উঠা আশার আলো ধপ করে নিভে গেলো যেনো।তবু একটা শেষ চেষ্টা করতে আশেপাশে দেখে নিলো। তার পায়ের কাছে একটি খালি পুরানো ছোট টেবিল রাখা।সে পা দিয়ে সেটা ফেলে দেয় শব্দ করার জন্য। রনি এবার আরো ক্ষিপ্তভাবে চেপে ধরলো ঈশানির মুখ।চুলের মুঠি ধরে কিছু বলবে তখনি দরজায় করাঘাতের শব্দ হলো।ঈশানি আবার রনির হাতে কামড় দিলো কিন্তু রনি হাত সরালো না।এভাবেই চেপে ধরলো।বাহির থেকে দরজা ধাক্কানো হচ্ছে।এবার দরজা ধাক্কানোর সাথে ভেসে এলো পুরুষালি আওয়াজ –
“ভিতরে কে?কে ভিতরে?দরজা খুলো বলছি এখনি।”

~চলবে

{আসসালামু আলাইকুম।ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে পাশে থাকবেন এবং রিয়েক্ট কমেন্ট করে যাবেন সকলে।}

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here