#তোমার_আমার_প্রেম
পর্ব -০৯
লেখনীতে – রুবাব ফারহা
.
আকাশে সুন্দর ঝলমলে চাঁদ উঠেছে।চারদিকে মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। হয়তোবা ঝড়ের পূর্বাভাস।ছাদে উপস্থিত কয়েকজন যুবতী মেয়ে তাদের নিজকর্মে ব্যস্ত।কেউ হাসছে,কেউ নাচছে,কেউ গাইছে। আয়রার মেহেদী দেয়া প্রায় শেষের দিকে। সেই কখন ঈশানিকে পাঠিয়েছে ফোনটা আনতে মেয়েটার এখনো আসার খবর নেই।এদিকে তার বরমহাশয় পইপই করে বলে দিয়েছেন মেহেদী দেয়া হলে যেনো সর্বপ্রথম তাকে ছবি তুলে দেয়া হয়।সে পাশে ফিরে রিমিকে একবার দেখে নিলো।মেয়েটার এখনো দেয়া হয়নি মেহেদী।তবুও রিমিকে বললো –
“এই রিমি ঈশুকে কখন পাঠিয়েছি ফোনটা আনতে।এখনো আসার খবর নেই।তুই গিয়ে একটু দেখে আসবি, প্লীজ।”
রিমি “আচ্ছা”বলে মেহেদী আর্টিস্টকে থামিয়ে উঠে দাড়ালো।নাচতে নাচতে এগিয়ে গেলো নিচে নামতে।প্রথমেই গেলো আয়রার রুমে গিয়ে দেখে বিছানার উপর ফোন রাখা ঈশানি কোথাও নেই।রিমি ভ্রু কুচকে এগিয়ে গিয়ে ফোনটা নিলো। তারপর ভাবতে লাগলো মেয়েটা গেলো কই। আয়রার রুম থেকে বেরিয়ে সোজা রান্নাঘরের দিকে গেলেন মিনারা বেগমের কাছে। মিনারা বেগমকে জিজ্ঞেস করলেন –
“ফুফি, ঈশু কোথায় গো? দেখেছো?”
মিনারা বেগম হাতের কাজে ব্যাস্ত হয়েই বললো –
“তোরা তো সব একসাথে ছাদে গেলি মেহেদী দিতে।সেখানেই তো ঈশু।”
“আরুপু ওকে ফোন আনতে আরো ৩০ মিনিট আগে নিচে পাঠিয়েছে,ওর কোনো দেখা না পেয়ে আমি নিচে এসে ফোন নিলাম কিন্তু ওকে আর পাচ্ছি না।” – রিমি বললো
মিনারা বেগম তেমন গুরুত্ব দিলেন না ।বরং বললেন –
” আছে হয়তো এদিকেই কোথাও।খুঁজে দেখ।আমার হাতে অনেক কাজ রে।”
তখনি আরহান আসলো মিনারা বেগমের কাছে।এসে জিজ্ঞেস করলো –
“মা, মইটা কোথায়? বাহিরে ডেকোরেটরের লোকদের লাগবে।”
মিনারা বেগম চাইলেন ছেলের দিকে।তারপর বললেন –
“স্টোররুমে আছে হয়তো।একটু গিয়ে খুঁজে দেখ না,বাবা।”
আরহান সেদিকটায় পা বাড়ালো।রিমি দৌড়ে পিছু নিলো আরহানের। আরহান সামনে আর সে পিছু হাটছে।কয়েক সিঁড়ি উঠার পর আরহান পিছু ফিরে চাইলে ,রিমি দ্রুত একটু হাসার চেষ্টা করে বলে উঠলো –
“আমি ছাদে যাচ্ছিলাম ।”
আরহান সরে দাঁড়ায় ওকে আগে যেতে বললে,রিমি পা দাপিয়ে চলে যায়। এই লোকটা সবসময় তাকে অবহেলা করে।একটু একসাথে গেলে কি এমন হতো।বলেই মুখ বাকায়। রিমি ছাদে গিয়ে পেঁচার মতো মুখ করে ফোনটা এগিয়ে দেয় আয়রাকে। আয়রা ফোনটা নিয়ে জিজ্ঞেস করে –
“কি হয়েছে?আর ঈশু কোথায়?”
রিমি নিজেকে স্বাভাবিক করে তারপর বলে –
“ঈশুকে তো কোথাও পেলাম না।ফুফি ও দেখেনি।”
আয়রার এবার একটু চিন্তা হতে লাগলো। কোথায় গেলো মেয়েটা।সে ফোন দিলো ঈশানির ফোনে।ফোনটা তার পাশেই বেজে উঠলো।কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। আয়রা উঠে দাড়ালো।ঈশানি কখনো এমন করে না।কোথাও গেলে অন্তত বলে যায়। আর এতো রাতে যাবেই বা কোথায়। বাড়িভর্তি মানুষ।সে নিজের হাত উচু করে নিয়ে কোনোরকম পা বাড়ায়।
.
আরহান স্টোররুমে সামনে যায়। দরজার বাহির থেকে খোলার চেষ্টা করছে সে ,তবু সে দরজা খুলতে পারছে না। আরহান ভাবলো হয়তো দরজা লক করা।আবার পা ঘুরিয়ে নিচের দিকে যেতে লাগলো চাবি আনার জন্য। আরহান কয়েক কদম হেঁটে সামনে আসতেই দেখা হয় আয়রার সঙ্গে। আয়রা নিচে নামছিল। আরহানকে দেখে সে জিজ্ঞেস করে –
“ভাইয়া,তুমি ঈশুকে দেখেছো?ওকে কোথাও পাচ্ছি না।ফোনটাও ছাদে রেখে গেছে।”
আরহান স্বাভাবিকভাবেই জানালো –
” না,দেখিনি আমি।দেখ আশেপাশেই আছে হয়তো। তুই স্টোররুমের চাবি কোথায় জানিস।”
আয়রা বলে –
“স্টোররুম তো খোলায় থাকে সবসময়। চাবি লাগবে কেনো।”
আরহান কিছু বলবে তখনি স্টোররুমে থেকে একটা শব্দ এলো,গানের আওয়জে তেমন শোনা না গেলেও ওরা রুমের কাছে থাকায় শুনতে পেলো।। আয়রা খানিক কেঁপে উঠল হঠাৎ শব্দে। বললো –
“এই শব্দ কোথা থেকে আসলো ভাইয়া?”
আরহান স্টোররুমে দিকে তাকিয়ে বললো –
“স্টোররুমে থেকে মনে হলো।কিন্তু সেটা তো বন্ধ।আমি এতক্ষন খোলার চেষ্টা করলাম কিন্তু খুললো না।”
আয়রা ভীত হয়ে প্রশ্ন করলো –
“ভিতরে কি কেউ আছে ভাইয়া?”
তখনি রিমি এলো।এসে জিজ্ঞেস করলো –
“কি করছো তোমরা এখানে।”
আরহান কপালে ভাঁজ ফেলে কিছু একটা ভাবলো। তার কিছুটা গোলমাল লাগছে ব্যাপারটা,এগিয়ে গেলো রুমের দিকে।তারপর আয়রার উদ্দেশ্যে বললো –
“গান বন্ধ করতে বল গিয়ে।”
আয়রা ছুটে গেলো।রিমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছে -” কি হয়েছে ?”
আরহান এগিয়ে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো –
“ভিতরে কে? কে ভিতরে?দরজা খুলো বলছি।”
ভিতর থেকে ঈশানি “উম উম” শব্দ করে যাচ্ছে।রিমি বললো ভাইয়া ভিতরে কেউ আছে।দেখো কেমন একটা শব্দ। আরহান কিছুটা অস্বাভাবিক হলো। জোরে দরজা ধাক্কিয়ে ভাঙার চেষ্টা চালালো।
এদিকে রনি একহাতে ঈশানির মুখে চাপ দিয়ে অন্যহাতে ধরে ঈশানির চুলের মুঠি ধরে। লাল চোখে তাকিয়ে চোখ রাঙায়। রনি ঘাবড়ে যায় আরহানের কন্ঠ শুনে।শরীর বেয়ে নেমে যায় একটা শীতল ভয়। কি করবে ভাবতে থাকে।এভাবে হুট করে ধরা খেয়ে যাবে ভাবেনি সে।ভয়ে আরো তীব্র করে তার হাতের থাবা। চারপাশে তাকিয়ে দেখতে থাকে পালানোর রাস্তা আছে নাকি।কিন্তু তখনি দরজা ভেঙে প্রবেশ করে আরহান। রনি ভয়ার্ত নেত্রে তাকায় আরহানের পানে। আরহান ঈশানির দিকে তাকায়।করুন চোখে আরহানকে দেখছে। আরহান একমিনিট সময় নেয় ঘটনা বুঝতে।রনি ঈশানিকে ফেলে পালাতে ধরলে আরহান নাক বরাবর এক ঘুষি বসায়।মুখ থুবড়ে পড়ে রনি।ঈশানি দৌড়ে চলে যায় আরহানের কাছে।হামলে পরে আরহানের উপর।ডুকরে কেঁদে উঠে আরহানকে ধরে। আরহান একহাতে জড়িয়ে নেয় ঈশানিকে,রক্তচক্ষু নিয়ে তাকায় রনির দিকে।রনির ভয়ার্ত দৃষ্টি। আরহানের পিছনে আয়রা ও অলিভিয়া এগিয়ে আসে। আয়রা এগিয়ে এসে ঈশানিকে ধরে। আয়রাকে পেয়ে ঈশানি জড়িয়ে ধরে,কাদতে থাকে।।অলিভিয়া মেঝে থেকে ঈশানির ওড়না নিয়ে গায়ে জড়িয়ে ধরে।রিমি আশ্চর্য্য হয়ে তাকিয়ে ভাইয়ের দিকে।তার ভাই এতো জঘন্য কাজ করলো কি করে।চোখে তার পানি। আরহানের চোখ লালচে বর্ণ ধারণ করেছে।কপালের রগ ফুলে ফেঁপে মনে হয় ফেটে যাবে।সে হিংস্র বাঘের ন্যায় এগিয়ে গেলো রনির দিকে। রনি দুই হাতে ভর দিয়ে পেছাতে পেছাতে বললো –
“ভাই,তুমি যেমন ভাবছো তেমন …….
আর বলতে পারে না কিছু। আরহান তার বুক বরাবর এক লাথি বসায়।তারপর রনির কলার ধরে তুলে গালে ঘুষি দিতে থাকে – যেনো গালটা থেতলে যায়। আশেপাশের মানুষ উপরে উঠে এসেছে।সাথে এসেছে — মিনারা বেগম,জাহিদ চৌধুরী ,রিমির বাবা রবিন শিকদার এবং মা আমেনা শিকদার। রবিন শিকদারসহ কয়েকজন মিলে আরহানকে আটকানোর চেষ্টা করে কিন্তু আরহানের শরীরে যেনো আজকে অশুরের শক্তি এসেছে।সে পাশ থেকে তুলে নেয় একটি ভাঙ্গা কাঠের অংশ,সেটা দিয়ে আঘাত করতে গেলেই আমেনা শিকদার চিল্লিয়ে কেঁদে উঠে –
“মারিস না, বাবা।আমার ছেলে মরে যাবে।মারিস না ওটা দিয়ে।”
আরহানের হাত থেমে যায়। ফোসফোস করতে থাকে। জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠান্ডা করার বৃথা চেষ্টা করে। সবাই কানাঘুষা করছে। মিনারা বেগম ছেলের মারামারির দৃশ্যে ভীত হয়ে ছিলো ।এতক্ষণে ঈশানিকে খেয়াল করলেন।”ইয়া আল্লাহ্”বলে এগিয়ে গিয়ে গিয়ে ঈশানিকে জড়িয়ে ধরে।জাহিদ চৌধুরী একবার ঈশানির দিকে তাকিয়ে আবার আরহানের দিকে তাকায়। আরহান হুংকার দিয়ে বলে –
“এখানে কি সিনেমা হচ্ছে? সবাই কি দেখছেন? যে যার কাজে যান।”
সবাই একপ্রকার হুড়মুড় করে চলে গেলো। থেকে গেলো ঘরের মানুষেরাই।জাহিদ খান এগিয়ে গেলো ঈশানির দিকে , তার মাথায় হাত রেখে স্নেহেভরা অথচ ঠাণ্ডা তেজি কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন –
“ঈশুমা মা আমার,তোমার এই অবস্থার জন্য কে দায়ী বলো? একটু কেঁপে উঠলো তার কন্ঠস্বর।তারপর আবার বললো – “তুমি শুধু বলো আমি তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেবো।”
ঈশানি চাচ্চুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো।কান্নার দমকে কিছু বলতে পারলো না। আরহান চিল্লিয়ে বলে উঠলো –
“এই জা*নো*য়া*রে*র বাচ্চা করেছে।”
আরহান তেড়ে যায় আবার রনির দিকে।হিংস্র থাবায় মুচড়ে ধরে রনির হাত তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বলে –
“তোর সাহস কম না।চৌধুরী বাড়িতে দাঁড়িয়ে চৌধুরী বাড়ির মেয়ের ক্ষতি করতে চাস? যেই হাত দিয়ে তুই ওকে ছুঁয়েছিস সেই হাত আমি ভে*ঙে গুঁড়িয়ে দিবো। যাতে কখনো ঈশানি তো দুর অন্য কোনো মেয়ের দিকে তাকাতেও তোর কলিজা কাপে। ”
রনি ব্যথায় ককিয়ে উঠে। আমেনা শিকদার এবার নিজের ননদের কাছে যায়।রবিন শিকদার তার একমাত্র ভাই।তাকে ভীষন ভালবাসে ও স্নেহ করেও মিনারা বেগম।নিশ্চয় ভাইয়ের বউয়ের কথা বুঝবে, কথা শুনবে।একমাত্র ভাইপো বলে কথা আবার একমাত্র ছোট ভাইয়ের ছেলে । সে দৌড়ে যায় ননদের কাছে। মিনারা বেগমের হাত ধরে কেঁদে বলে –
“আপা,তোমার ছেলেকে থামতে বলো।আমার ছেলেটাকে মেরে ফেললো।আমার ছেলের কিছু হলে আমি আর তোমার ভাইও মরে যাবো আপা।”
মিনারা বেগম তাকালেন ভাইয়ের বউয়ের দিকে।তারপর গর্জে উঠে বললেন –
“তুমি ও কি তোমার ছেলের মতো জা*নো*য়া*র হয়েছো,আমেনা?
জাহিদ চৌধুরী এবার মুখ খুললেন।হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন –
“তোমাদের ছেলে একটা মেয়ের শ্রীলতাহানীর চেষ্টা করেছে আর তুমি সেই ছেলেকে বাঁচাতে বলছো।ঈশানির জায়গায় নিজের মেয়ে হলে পারতে?বিবেক কোথায় তোমার? তোমার ছেলেকে আমি নিজে পুলিশ।”
তারপর আরহানের উদ্দেশ্যে বললেন –
” আরহান, তুমি ওকে ছেড়ে দেও।পুলিশে ফোন দেও। এই নরকের কিটের শাস্তি হবে আদালতে।”
আমেনা শিকদার কেঁদে উঠলেন।তারপর জাহিদ চৌধুরীকে কিছুটা অনুরোধের এবং ব্রেনওয়াশ করতে বললেন –
“ভাই,আমার ছেলেকে পুলিশে দিলে কি ঈশানির মানসম্মান ফেরত আসবে? আসবে না।সমাজের চোখে ও ক*ল*ঙ্কি*ত, নষ্টা।কেউ কিন্তু তলিয়ে দেখবে না যে আসল কাহিনী।আমার ছেলেকে আপনি পুলিশে দিলে ও ঠিক কয়েকদিন পর ছাড়া পেয়ে ঘুরে বেড়াবে।কিন্তু ঈশানি সেটা পারবে না । ও সমাজে মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় নেই। আমার কিন্তু আগে থেকেই ঈশানিকে ভীষন পছন্দ ছিলো।আমার ছেলেটা ভুল করে ফেলেছে।বয়স কম তো ,বুঝতে পারেনি ভাই। আপনি ওকে ক্ষমা করে দিন।ওর ক্ষমার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ও ঈশানিকে বিয়ে করে বউয়ের সম্মান দিবে,ক*ল*ঙ্কি*ত হওয়া থেকে রক্ষা করবে বিনিময়ে আপনারা আমার ছেলেটাকে ছেড়ে দিবেন।এমনিতেও ঈশানিকে আর ভালো ঘরে বিয়ে দিতে পারবেন না আপনারা।আমার ছেলে সবদিকেই ভালো।বংশপরিচয় ভাল, চরিত্র ভালো সবই ভালো শুধু আজ একটা ভুল করে ফেলেছে।বাহিরে সবাই ছিঃ ছাহ করছে ঈশানিকে।এরচেয়ে এদের দুজনের বিয়ে দিয়ে দেই।তাহলে ঈশানির ও সম্মান বাঁচবে।”
~চলবে
{কি মনে হয় আপনাদের?জাহিদ চৌধুরী কি রাজি হয়ে যাবে রনির সাথে ঈশানির বিয়েতে?বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করবেন প্লীজ🥹}

