তোমার_আমার_প্রেম #সারপ্রাইজ_পর্ব লেখনীতে:রুবাব ফারহা

0
38

#তোমার_আমার_প্রেম
#সারপ্রাইজ_পর্ব
লেখনীতে:রুবাব ফারহা
.
দিনটা শুক্রবার।একটি রৌদ্রোজ্জ্বল সুন্দর দিন।দিনটিকে আরো বেশি সুন্দর,স্নিগ্ধ,কাল্পনিক লাগছে আয়রার কাছে।লাগবে নাই বা কেনো? আজ তার প্রণয়ের পূর্ণতার দিন।তার অনুরাগ,কামনা,হৃদয়ানুভুভূতি ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের দিন।তার কল্পলোকের কল্প পুরুষকে সে নিজের করে পাবে। তার হৃদয়ে একটি শীতল স্রোত বয়ে যায়।এই পথটা মোটেও সহজ ছিলো না।নিজের ভার্সিটির লেকচারারকে পটানো কি চাট্টিখানি কথা।মুচকি মুচকি হেসে এসবই ভাবছিলো আয়রা তখনি মিনারা বেগম প্রবেশ করলেন হাতে তার খাবারের প্লেট। প্লেটে সাজানো অল্পকিছু খিচুড়ি আর দু/ তিন পিস গরুর মাংস।তিনি এসে মেয়ের পাশে বসলেন।খিচুড়ির সাথে গরুর মাংসের ঝোল মাখাতে মাখাতে বললেন –
“নে, হা কর।কবে আবার তোকে নিজের হাতে খাওয়ানোর সুযোগ হয় কে জানে। তুই তো আমার হাতে ছাড়া খেতেই চাস না। ও বাড়িতে গিয়ে একদম অনিয়ম করবি না।নিজের যত্ন নিবি।শশুড়,শ্বাশুড়ি,বরের কথা শুনবি। ”

আয়রার চোখে পানি চলে এলো। মিনারা বেগম নিজেও কেঁদে দিলেন এপর্যায়ে।তবু মেয়েকে মিছেমিছি রাগ দেখিয়ে বললো –
“খাবার প্লেটে বসে কাদতে নেই বলেছি না আগে।কাদছিস কেনো,পাগল মেয়ে।”

আয়রা এবার মাকে জড়িয়ে ধরলোকাদতে লাগলো।কাদতে কাদতে বললো –
“মা,আমি বিয়ে করবো না।তুমি ওদের না করে দেও।তোমাকে ছাড়া ,বাবাকে ছাড়া,ভাইয়াকে ছাড়া,ঈশানিকে ছাড়া কি করে থাকবো আমি? একটুও পারবো না , মা।আমি করবো না বিয়ে।”

মিনারা বেগম হাসলেন মেয়ের পাগলামিতে।কপালে চুমু খেয়ে বললেন –
“শোনো, পাগল মেয়ের কথা। প্রতিটি মেয়েকেই অন্যের ঘরে যেতে হবে।নিজ ঘর,পরিবার ছেড়ে অন্য ঘর পরিবারকে আপন করে নিতে হয়।এটায় নিয়ম।সেখানে তোর জন্য অনেক সুখ অপেক্ষা করে আছে, মা।ইয়াসিন তোকে ভীষন ভালবাসে। ও তোকে ভালো রাখবে আমার বিশ্বাস।তখন আর আমাদের মনেই পড়বে না।”

আয়রা একটু লজ্জা পেলো।পরক্ষণেই কল্প পুরুষের কথা মনে করে হৃদয়ে শান্তি অনুভব করলো।আবার পরিবারের কথা মনে করে মনে বিষাদ ছেয়ে যায়।এক অন্যরকম অনুভূতির সাথে পরিচয় হলো আয়রার।যেখানে আছে পূর্ণতার সুখ, ও ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি,বিষাদ।
.
জুম্মার পরপর বরপক্ষ রওনা দিয়েছে কিন্তু ঢাকা শহরের অসহ্য জ্যামে উত্তরা থেকে ধানমন্ডি আসতে সময় নিয়েছে সাড়ে তিন ঘণ্টা।চৌধুরী বাড়িয়ে সামনে বরের গাড়ি থামতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো “বর এসেছে, বর এসেছে”। আয়রা খামচে ধরলো ঈশানির হাত।তার বুক দুরুদুরু করছে।শরীর কাপছে।কেমন যেনো একটা অসস্তিকর অনুভূতি হচ্ছে। ঈশানি চাইলো আয়রার দিকে।মেয়েটার মুখে একটা লাজুক তৃপ্তির হাসি অথচ চোখ জুড়ে যেনো কত ভয়,বিব্রতবোধ,লজ্জামাখা।ঈশানি ভাবলো ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করার অনুভূতি বোধ হয় এরকমই।ঈশানি উদাস চোখে চাইলো জানালা ভেদ করে সেই আকাশপানে।সাদা মেঘগুলো কালো বর্ণে রূপান্তর হয়েছে।থেকে থেকে বাতাস ছাড়ছে।হয়তো রাত বৃষ্টি হবে।

কিছুক্ষণ পর কাজীসহ রুমে প্রবেশ করে জাহিদ চেধুরি, মিনারা বেগম আরো কিছুজন। মিনারা বেগম এসে বসেন মেয়ের পাশে।মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে হাত নেয় নিজের হাতের মুঠোয়। আয়রার প্রচণ্ড কান্না পায়।এরপর কাজী আয়রার সাক্ষর নিতে কাবিননামা এগিয়ে দেয়। আয়রা কাপে হাতে কলম নেয়।কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কাপা কাপা হাতে সাইন করে।এরপর ধর্মীয় নিয়ম অনুসারে কাজী কবুল বলতে বলে । আয়রা এবার ডুকরে কেঁদে উঠে। মিনারা বেগম মেয়েকে জড়িয়ে নেয়।জাহিদ চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করে।কিছুটা শান্ত হলে আয়রা ক্ষীণকন্ঠে বলে “কবুল”।সকলে একত্রে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে।
কাজী এবার যায় ছেলের কাছে।ইয়াসিনকে সাইন করতে দিলে সে সঙ্গে সঙ্গে সাইন করে দেয়।এবং তখনি কবুল ও বলে ফেলে।একদফা হাসির রোল পড়ে যায় চারদিকে।ইয়াসিন মোটেও বিব্রত হলো না।বরং বিয়ের এতো নিয়ম কানুনে বিরক্ত হলো।এখনো সে তার প্রাণনাশিনীকে দেখেনি।তার অস্থির লাগছে।এতসব নিয়মে তার ধৈর্য্য আর কুলচ্ছে না যেনো।

আয়রা – ইয়াসিনের বিয়ে পড়ানো হলে কাজী আবার যায় ঈশানির কাছে। আরহান – ঈশানির রেজিস্ট্রি বিয়ে সেদিন রাতেই হয়েছিলো।যদিও ঈশানির ১৮ বছর না হওয়া নিয়ে কাজী দোনামোনা করছিলো।কিন্তু কিছু টাকা দেয়ায় সে সেটাও করে দেয়। আজ শুধু ধর্মীয় মতে কবুল পড়ানো হবে।জাহিদ চৌধুরী গিয়ে দাড়ালো ঈশানির পাশে।মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কিছু বলতে নিলে মিনারা বেগম আসে।এসে ঈশানির পাশে বসে।মেয়েটাকে আগলে নেয়।ঈশানিকে ছোটমাকে দেখে ফুপিয়ে কেঁদে উঠে।জাহিদ চৌধুরী খুশি হয়।সে জানতো তার মিনা কখনোই মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারতো না।স্ত্রীর প্রতি তার ভালোবাসা সম্মান আরো বেড়ে যায়। মিনারা বেগম ঈশানির চোখের পানি মুছিয়ে দিলেন।তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন –
” আমি এখানে এখন তোর ছোটমা হয়ে এসেছি।নিজের মেয়ের বিয়েতে মেয়েকে আগলে নিতে তবে আরহানের মা হিসেবে আমি এখনো তোকে নিজের ছেলের বউ বলে মানিনি।কখনো মানতে পারবো কি না জানি না।তবে ছোটমাকে তুই সবসময় পাশে পাবি।”

ঈশানি জড়িয়ে ধরলো মিনারা বেগমকে।তারপর কাদতে কাদতে বললো –
“তুমি আমার ছোটমা হয়েই থাকো ,ছোটমা।তুমি যখন এভাবে আমায় জড়িয়ে ধরো আমি তোমার মাঝে আমার মাকে খুঁজে পাই।অন্যকিছু লাগবে না আমার।তুমি আমাকে আগের মত ভালোবেসো শুধু।”

জাহিদ চৌধুরী মিনারা বেগমের কাধে হাত রাখলেন।তারপর বললেন –
“কাজী বসে আছে তো।”

মিনারা বেগম নিজেও চোখ মুছলেন।ঈশানিকে কবুল বলার জন্য বললে ঈশানি কিছুটা সময় নিয়ে কবুল বলে।সকলে একসঙ্গে আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে।আরহানের কাছে যায় এবার। আরহানও বেশি সময় নেয় না। কবুল বলে সম্পন্ন করে নিজের বিয়ে। আবদ্ধ হয় বিবাহ নামক পবিত্র বন্ধনে।জড়িয়ে যায় সারাজীবনের জন্য।
.
ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করা যতটা আনন্দের,সুখের ,তৃপ্তির অথচ বিদায় জিনিষটা তততাই বেদনায়ক,হৃদয়বিদারক। জাহিদ চৌধুরী ইয়াসিনের হাত ধরে ভারী কন্ঠে বলে
“আমার কলিজার টুকরো তোমাকে দিচ্ছি বাবা।আমার রাজকন্যা।আগলে রেখো। যত্নে রেখো।তোমার কাছ আমার কোনো চাওয়া নেই আমার মেয়ের সুখ ছাড়া।”

ইয়াসিন শ্বশুরের হাত নিজের মুঠোয় নিলো এবার।আস্থা দিতে বললো –
“আপনি চিন্তা করবেন না।আপনার রাজকন্যা আমার রাজ্যে রানী হয়ে থাকবে।অভিযোগ করার সুযোগ পাবেন না, ইন শা আল্লাহ।”

আয়রা কেঁদে যাচ্ছে।একবার মাকে জড়িয়ে ধরে কাদঁছে,ঈশানিকে জড়িয়ে ধরে কাদঁছে।ঈশানি নিজেও বউ সাজে আয়রাকে জড়িয়ে ধরে কাদঁছে। তার খুব কষ্ট হচ্ছে।জাহিদ চৌধুরীকে দেখে বুকে হামলে পড়ে আয়রা।বাবার পাঞ্জাবি ধরে কাদতে কাদতে বাচ্চাদের মতো বলে সে যাবে না।জাহিদ চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বরের কাছে নিয়ে যেতে লাগে। আয়রার দূরে দাঁড়ানো আরহানকে দেখতে পেয়ে বাবার হাত ছাড়িয়ে ছুট্টে যায় ভাইয়ের কাছে।ভাইকে জড়িয়ে ধরে কাদতে থাকে। আরহানের চোখেও পানি।আটকে রাখতে পারছিলো না বলে দূরে ছিলো।তার ছোট্ট পাগলি বোনটা কত বড় হয়ে গেছে। আজ তার বিয়ে।চলে যাচ্ছে অন্যের ঘরে। আয়রা ভাইকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে যাচ্ছে। আরহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। হাত উচু করে পাঞ্জাবির হাতার অংশ দিয়ে চোখ মুছে।তারপর আয়রাকে সোজা নিয়ে যায় বরের সামনে। আয়রার হাত ইয়াসিনের হাতে দিয়ে বলে –
“এবাড়ির সবচেয়ে দামি সম্পদ তোমায় দিচ্ছি।অবহেলা করো না কখনো। ওর ছেলেমানুষী ,পাগলামি মানিয়ে নিও।আমার বোন আমার কাছে ছোট্ট পুতুলের মতো।আমার পুতুলের গায়ে যেনো একটা আচর না লাগে।দুঃখের বাতাস ও যেনো না লাগে।”

ইয়াসিন হেসে ফেললো। আশ্বস্ত করে বললো –
“এরকম কখনোই হবে না ভাই।আপনার বোনের প্রাণে আমার প্রাণ বাধা। ওকে কষ্ট দেয়া মানে নিজেকে কষ্ট দেয়া।কেউ কি নিজেকে কষ্ট দেয় বলেন?

আরহান ইয়াসিনের পিঠে চাপড় মারলো।বরপক্ষ আয়রাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। আয়রা চললো নিজের চিরচেনা পরিচিত সেই ঘর,সেই ঘরের মানুষ,সেই ঘরের ঘ্রাণ,মায়ের হাতের রান্না,বাবার আল্লাদ,ভাইয়ের শাসন ও ঈশানির ভালোবাসা রেখে নিজের প্রণয় পুরুষের হাত ধরে নতুন জগৎ সাজাতে।
.
ইয়াসিনদের বাড়িতে পৌঁছে সকল নিয়ম নীতি ও রীতি নীতি মানতে মানতে বেশ রাত হয়েছে।ঘড়ির কাটা এখন –১১ টায়। আয়রাকে সবে ইয়াসিনের ঘরে রেখে গেছে কিছু মেয়ে।সম্পর্কে কয়েকজন তার জা হয় কয়েকজন ননদ বোধ হয়।কানে কানে বলে গেছে অনেক অসভ্য কথা। আয়রা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে।তারা হেসে চলে যায়। রুম নিস্তব্দ হলে সে চোখ তুলে যায়।আজ প্রথমবার সে ইয়াসিনের রুমে এসেছে।রুমটা ছিমছাম সুন্দর।রুমের সাথে লাগোয়া বেলকনি বেশি পছন্দ হয়েছে। নিরবচোখে পর্যবেক্ষণ করছিলো তার আর ইয়াসিনের কক্ষ। হ্যাঁ তাদের নিজস্ব কক্ষ।নিজস্ব মানুষটার সাথে এঘরেই স্বপ্ন বুনবে সে।তখনি দরজা ঠেলে প্রবেশ করে ইয়াসিন। আয়রা দ্রুত ঘোমটা নামিয়ে দেয়।ইয়াসিন এসে ঠাঁয় দাড়িয়ে রয়।কোনো কথা বলে না ,এগিয়েও আসে না।পাঁচ মিনিট ধরে রুমে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আয়রা কৌতূহলী ঘোমটা তোলে।সঙ্গে সঙ্গে শরীরে শীতল স্রোত বয়ে যায়। একজোড়া তৃষ্ণার্ত চোখ ঈগল পাখির ন্যায় চেয়ে।যেনো কতবছরের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে। আয়রা চুটকি দিলে তার চেতনা আসে।এগিয়ে যায় আয়রার দিকে। আয়রার পাশে বসে বলে –
“আজ আমার রুম প্রকৃত পূর্ণতা পেলো।আমার হৃদয় শীতলকারী আমার কক্ষে আমার বিছানায় বসে আছে আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই।আমার সকল চাওয়া তোমাকে পাওয়ার সাথে সাথেই পূর্ণতা পেয়েছে।”

আয়রা তৃপ্তির হাসি আসলো।মনকুঠিরে যেনো একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেলো।শীতলতা অনুভব করলো।মুখে কিছু বলতে পারলো না।শুধু চেয়ে রইলো সেই কালো মনিজোড়ার মায়ায়।এখানেই সকল রহস্য।এই চোখের রহস্য ভেদ করতে অক্ষম সে। ইয়াসিন আয়রার হাত ধরে বললো –
“পোশাক পাল্টে ওযু করে আসো, জান।দুজনে আল্লাহর অনুগত্য পালন করে এই রাতের আমাদের নতুন জীবনের শুরু করবো।”

আয়রা মাথা ঝাকিয়ে নেমে যায়।সুটকেস থেকে একটি সুতি শাড়ি নিয়ে ওয়াশরুমে যায়।
.
ফুলে সজ্জিত বিছানায় বসে আছে ঈশানি।মাথায় তার একহাত ঘোমটা।দুজন মহিলা তাকে এই ঘরে দিয়ে গেছে প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়।যাওয়ার আগে অদ্ভুদসব কথা বলে ভয় ঢুকিয়ে গেছে ঈশানির মনে।দুরু দুরু বুকে সে অপেক্ষা করছে আরহানের।মহিলা দুজন বলেছে স্বামী আসার আগে এখান থেকে যেনো না উঠে। সেও বাধ্য মেয়ের মতো কথা শুনছে।বসে বসে অপেক্ষা করতে করতে ফিরে গেলো সে গতকাল সন্ধ্যায়।যখন পায়ে ব্যথা পেয়ে আরহান তাকে নিজের রুমে নিয়ে আসে।ঈশানির পায়ে ব্যান্ডেজ করার সময় ঈশানি জিজ্ঞেস করছিলো আরহানকে –
“কেনো জড়ালেন আমার ক*ল*ঙ্কি*ত জীবনের সাথে আপনাকে?”

আরহানের হাত থেমে যায় একমুহুর্ত।পরপরই আবার নিজের কাজে ব্যাস্ত হয়ে বলে –
“নিজেকে ক*ল*ঙ্কি*ত করতে।”

ঈশানি এবার বাকা হাসলো।তারপর ত্যাছড়াভাবে জবাব দিলো –
“দয়া করে বিয়ে করেছেন আমায়, তাই না? আমি সাড়াজীবন দয়ার পাত্র হয়েই থেকে গেলাম।ছোটো থেকে চাচ্চুর আর এখন আপনার। হাহ,আমার জীবন!”
শেষ কথাটা নিজেকে উপহাস করে বলে।

আরহান ক্ষতে ব্যান্ডেজ করে তাকায় ঈশানির দিকে।ঈশানির চোখে চোখ রেখে বলে –
“এই চৌধুরী বাড়িতে যতটা অধিকার আমার আয়রার আছে ঠিক ততটা অধিকার’ই তোমারও আছে। আর বাবা – মা তোমাকে কতটা ভালবাসে সেটা নিয়ে কি তোমার সন্দেহ আছে?”

ঈশানি মাথা ডানে বামে নাড়িয়ে না বোঝায়। আরহান আবার বলে –
“তাহলে নিজেকে তাদের কাছে দয়ার পাত্রী বানিয়ে তুমি তাদের ভালোবাসা ছোট করছো।আর রইলো আমার কথা।আমার কাছে তুমি আমার দায়িত্ব।অন্যান্য আর পাঁচটা স্বাভাবিক সম্পর্কের মতো আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক না আমি জানি।আমি তোমাকে নিয়ে স্ত্রীর মতো কিছু অনুভব করি না ঠিকই তবে এতটুকু বলতে পারি এই আরহান মীর চৌধুরী কখনো দায়িত্বের অবহেলা করে না।আমাদের সম্পর্কের এখন শুধুমাত্র সময় প্রয়োজন।আসা করি তুমি সেটা দিবে।আর তুমি নিজেও এখনো বাচ্চা।বিয়ে হয়েছে বলে সংসার নিয়ে থাকবে সেটা না।নিজের মতো পড়াশুনা ,নিজের ইচ্ছে মতো সব করতে পারো সমস্যা নেই।তবে হ্যাঁ নিজেকে সবার আগে নিজের সম্মান করতে হয়।বারবার ক*ল*ঙ্কি*ত ক*ল*ঙ্কি*ত বলে তুমি নিজেকে অসম্মান করছো।নারীদের শক্ত হতে হয়,কংক্রিটের মতো শক্ত। যাতে যেকোনো ঝড় হাওয়া উড়িয়ে নিয়ে যেতে না পারে।নিজেকে প্রস্তুত করো।নিজের কঠিন রূপে প্রস্তুত করো, মেয়ে। আর এসব বাজে কথা যেনো তোমার মুখে না শুনি।”—বলেই ঈশানিকে কোলে তুলে নেয়।

খট করে দরজা খোলার শব্দ ঈশানি ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসে। শাড়ির একাংশ খামচে ধরে।নিঃশ্বাসের গতি বাড়তে থাকে। ওই মহিলাদের কথা মনে পড়ে ভয়েরা দানা বাঁধতে শুরু করে।
আরহান নিজের শেরওয়ানি খুলে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।গোসল করে একটি টি – শার্ট, টাওজার মাথা মুছতে মুছতে বের হয়।ঈশানি তখনো ওভাবেই মূর্তির মতো বসে থাকতে দেখে ভাঁজ পড়ে।হাল্কা কেশে ঈশানির মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলে বৃথা হয়।ঈশানি যেনো নিশ্বাস ও নিচ্ছে না এমনভাবে বসে আছে। আরহান ঈশানির উদ্দেশে বলে –
“এভাবে বসে আছো কেনো? গরমে এসব পরে ঘোমটা দিয়ে আছো অসহ্য লাগছে না? চেঞ্জ করে নেও।”
বলে রুমে রাখা সোফায় বসে পড়ে।ঈশানি নড়ে চড়ে উঠে।তারপর ঘোমটা উঠিয়ে নিচে নামে।এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে তার কোনো পোশাক নেই এখানে।মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। আরহান বসে এতক্ষন ওকেই পর্যবেক্ষণ করছিলো।শাড়ি পরে বৌ সাজে মেয়েটাকে চমৎকার সুন্দর লাগছে।ফর্সা গায়ে লাল বেনারশী যেনো গোলাপ ফুলের মতোই ফুটে আছে।মুখে ভারী মেকআপের আস্তরণ।যদিও মেকাপ ছাড়াই মেয়েটাকে বেশি ভালো লাগে।একটা আলাদা মায়া কাজ করে।শাড়ি পড়ায় এখন আর বাচ্চা লাগছে না।বরং একজন রূপবতী যুবতী মেয়ে লাগছিলো।
আরহান এসবই ভাবছিলো হঠাৎ খেয়াল হলো ঈশানি দরজার খুলছে। আরহান পিছন থেকে জিজ্ঞেস করলো –
“কোথায় যাচ্ছো?”

ঈশানি পিছনে ফিরলো। নতমস্তিষ্কে শাড়ির আচল পেচাতে পেচাতে বললো –
“আমার রুমে।আমার পোশাক আনতে। এ রুমে আমার পোশাক নেই।”

আরহান উঠে দাঁড়ালো।ঈশানিকে বললো –
” তুমি এখানেই বসো।আমি আনছি।দেখা যাবে আবার শাড়ি নিয়ে পরে গেছো।”

ঈশানি লজ্জা ও বিব্রতবোধ করলো। আরহান কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আমার পিছু ফিরে জিজ্ঞেস করলো –
“তোমার পোশাক কোথায় পাবো?”

ঈশানি প্রত্যুত্তর করলো –
“ক্লোজেটের ডানপাশে।”
৫ মিনিট পর আরহান এলো। হাতে ঈশানির পোশাক।ঈশানিকে দিলে সে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।পাক্কা ৩০ মিনিট পর মেকাপ তুলে গোসল করে বের হয়।এবার বেশ হাল্কা লাগছে তার।এতক্ষন দমবন্ধ লাগছিলো।ঈশানি বেরিয়ে দেখে বিছানা থেকে সব ফুল নামিয়ে ,বিছানা ঝেড়ে আরহান শুয়ে পড়েছে।ঈশানি কি করবে ,কোথায় শুবে ভাবতে থাকে দাঁড়িয়ে। আরহান চোখের উপর একহাত ও পেটের উপর একহাত দিয়ে টান হয়ে শুয়ে ছিলো।ঈশানি দাঁড়িয়েছে ঠিক তার পায়ের কাছে। কারো উপস্থিতি উপলদ্ধি করে আরহান চোখ মেলে চায়।সদ্য গোসল করে বেরিয়ে আসা ঈশানিকে তার কাছে স্নিগ্ধ ফুটে ওঠা পদ্ম মনে হচ্ছে।সে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।তারপর ঈশানির উদ্দেশে বললো –
” সারারাত কি দাঁড়িয়েই থাকবে ওখানে? থাকলে থাকতে পারো।তবে লাইট নিভিয়ে দিয়ে পরে দাড়াও।চোখে আলো লাগছে।”

ঈশানি ইতস্তত করলো।কথা যেনো মুখ দিয়ে বের হচ্ছে না।তার ছোট্ট তনু যেনো ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে।অজানা ভয়ে তটস্থ কিশোরী হৃদয়।তবুও ক্ষীণ কন্ঠে বললো –
“না মানে,আমি সোফায় ঘুমাবো বালিশটা একটু দিবেন?”

আরহান এবার সোজা হয়ে বসে পড়লো। তারপর ঈশানিকে বললো –
“এটা কোনো বাংলা সিরিয়াল না যে তুমি সোফায় ঘুমাবে,আমি বিছানায়।এটা বাস্তব জীবন।তোমার ভবিতব্য ।আমি তোমার স্বামী।তিন কবুল বলে স্বামীর অধিকার দিয়েছো তুমি।এখন আমি সেই অধিকার চাইলে তুমি দিতে বাধ্য।তখন কোনো সিনেমার কাহিনী কাজ করবে না। তাই বলছি সম্পর্কটাকে স্বাভাবিক নেও।মানিয়ে নিতে না পারো যেভাবে চলছে সেভাবেই চলুক।কিছু যোগ – বিয়োগের প্রয়োজন নেই।সম্পর্ক নিজেই তার নিজস্ব রং চিনে রূপ পরিবর্তন করবে।এখন সোজা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।”

ঈশানি ফ্যাসফাস করলো।বিব্রতবোধ করলো।কিন্তু তার ভিতরের ভয়টা চলে গেলো।সেটার পরিবর্তে এসে বাসা বাঁধলো একটা অজানা মুগ্ধতা,শান্তি ।সে কিছু বললো না আর।চুপ করে বিছানার অন্য সাইডে শুয়ে পড়লো। আরহান লাইট নিভিয়ে নিজেও শুয়ে পড়লো।
ঈশানির ঘুম ধরছে না।ভিতরটা হাসফাঁস লাগছে।এপাশ ওপাশ করে যাচ্ছে।মূলত তার অন্ধকারে ভয় লাগে।এরকম ঘুটঘুটে অন্ধকারে মনে হয় কেউ তাকে দেখছে।ভয়েই ঘুম আসে না।তার উপর একটা ছেলের সাথে একই রুমে একই বিছানায় শুয়ে আছে আরো অস্বস্থি জেঁকে ধরেছে।যদিও ছেলেটি তার স্বামী কিন্তু সম্পর্কটা তো অস্বাভাবিক।সে সোজা হয়ে শোয়।তখনি হঠাৎ আরহান তার মুখের উপর উঠে আসে।ঈশানিকে ভয় পেয়ে যায়।মাথায় আসে সেই মহিলাদের বলা কথা।ভয় পেয়ে হুট করে বলে ফেলে –
“কাছে আসবেন না ,প্লীজ।আমি এখনো তৈরি নই.”

আরহান হাত বাড়িয়ে ঈশানির পাশের টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে দেয়।তারপর সেভাবেই ঈশানির উপর ঝুঁকে যায় ।মূলত ঈশানির বলা কথা শুনে অবাক হয়ে যায়।তারপর সরে সরে আসতে আসতে ব্যঙ্গাত্মক স্বরে বলে –
“তুমি মোটেও বাচ্চা না।আমার মাথায় যেটা আসেনি সেটা তোমার মাথায় ঘুরছে।ইউ আর ভেরি এডভ্যান্স।”

ঈশানির যারপরনাই করুণ করুন অবস্থা হয়।লজ্জায় চোখ খিঁচে নিয়েছে।ইশ কি একটা কান্ড ঘটে গেলো। লোকটা নিশ্চয় তাকে নির্লজ্জ ভাবছে।ঈশানির সমস্ত শরীরে ছেয়ে গেলো অস্বস্থির আস্তরনে।।লজ্জায় গালদুটো মেদুর হয়ে উঠলো।ঈশানির এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে “হে ধরণী, ফাঁক হও,আমি ঢুকে যাই।”কোনরকম পাশ ফিরে চোখ খিঁচে শুয়ে থাকলো সে ।
.
নিস্তব্দ মধ্য রাত।চারপাশে জনমানবের কোনো চিহ্ন নেই।মাঝে মাঝে দুর থেকে ভেসে আসছে কিছু নেড়ি কুকুরের ডাক। যা নিস্তব্দ পরিবেশে একপ্রকার ছেদ টানে।আকাশে সুন্দর থলের মতো চাদ উঠেছে। চাদের মৃদু আলোয় আলোকিত লাগছে চারপাশে।সেই চাদের স্নিগ্ধ আলোয় একজোড়া কপোত কপোতী বসে চন্দ্রবিলাসে মত্ত।যেনো চাদের আলোর সৌন্দর্য তাদের গ্রাস করছে।মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় চেয়ে থেকে আয়রা বললো –
” আজকের চাঁদটা ভীষন সুন্দর তাই না?”

আয়রার পাশে বসে আছে ইয়াসিন। আয়রার মেদহীন কোমরে হাত দিয়ে আয়রাকে নিজের সন্নিকটে আনলো আরেকটু।তারপর আয়রার দিকে চেয়ে আবিষ্ট কন্ঠে বললো -” ভীষন”

আয়রার লজ্জা পেলো।গালদুটো লালচে বর্ণ ধারণ করলো। আয়রাকে লজ্জার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে ইয়াসিন এবার তার ঘাড়ে মুখ গুজলো।ভেজা ওষ্ঠযুগল নাড়িয়ে ছোটো ছোটো চুমুতে ভরিয়ে দিলো। আয়রা জমে গেছে যেনো।শক্ত করে ধরেছে তার শাড়ির আঁচল।নিঃশ্বাসের গতি বেগতিক হচ্ছে তার।কাঙ্ক্ষিত পুরুষের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে মিইয়ে যাচ্ছে।ইয়াসিন এবার চুমুর জায়গায় হাল্কা করে কামড় বসালো। আয়রার “আহ্” বলে কেঁপে উঠলো।ইয়াসিন ছাড়লো না।বরং উঠে দাঁড়িয়ে কোলে তুলে নিলো আয়রার ছোট্ট শরীর। আয়রার কপালে নিজের কপাল লাগিয়ে চললো রুমে।দুজনের নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।সাথে ভারী হয়ে আছে রুমের বাতাসও।নিঃশ্বাসের শব্দ ও যেনো ভয়ংকর প্রতিধ্বনি দিচ্ছে।ইয়াসিন আয়রাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজে ঝুঁকে যায় তার দিকে।ঘরের ড্রিম লাইটের সবুজ আলোতে আয়রার মুখ যেনো আরো মায়াবী,আবেদনময়ী লাগছে।নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে ইয়াসিন। আয়রা সেই দৃষ্টি নিতে পারে না।শরীর জুড়ে বয়ে যায় অজানা শিহরণ।চোখ খিঁচে বন্ধ করে পড়ে ইয়াসিনের বক্ষদেশের নিচে।ইয়াসিন আলতো করে চুমু দেয় আয়রার কপালে। আয়রা নিজের কপালে স্পর্শ পেয়ে চোখ খুলে তাকায়।অমনি ঝড়ের বেগে একজোড়া ওষ্ঠ আঁকড়ে ধরে তার ওষ্ঠ ।সেদিনের মতো শুধু ছুঁয়ে ক্ষান্ত হয় না।বরং উন্মাদ হয় মধুসধা পানে। গাঢ় থেকে গাঢ় হয় সেই স্পর্শ।সময়ের সাথে তাণ্ডব বাড়তে থাকে।দুটো আলাদা মানুষ,আলাদা দেহ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।প্রণয়পুরুষ ছাড় দেয় না একরত্তি।দীর্ঘদিনের লালিত ভালোবাসা উজাড় করে দিয়ে আয়রাকে করে তোলে পাগল প্রায়।রাতের দ্বিপ্রহরে রচিত হয় তাদের ভালোবাসার নতুন কাব্য। কিছু ভয়, কিছু ব্যথা , কিছু যন্ত্রণা ও সুখ মিলিয়ে পরিচিত হয় নতুন জগতের সাথে।

~চলবে

{আপনাদের জন্য বিশাল বড় সারপ্রাইজ পর্ব। রাত জেগে আপনাদের জন্য লিখেছি জাগে সকালেই পোস্ট করতে পারি।তাই আপনাদের ও বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করতে হবে। আর যারা পেজে ফলো না দিয়ে চুপিচুপি পড়েন তারাও ফলো দিয়ে যাবেন।ভালোবাসা সকলকে।আজকের পর্ব কেমন লেগেছে অবশ্যই মতামত জানাবেন।}

#বি: দ্র: এই পর্বে বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করলে রাতে আর একটা পর্ব দেবো😷

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here