#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
২০.
মন খারাপ নিয়ে নিচে নেমে এলো মুন্নি। সামনে তাকাতেই দেখলো তুলি আর ঐ ছেলেটা পাশা-পাশি চেয়ারে বসে খোশগল্প করছে। মুন্নির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। যাকে কাজের লোক ভেবে এক বালতি ময়লা কাপড় ধুতে পাঠালো, সে কিনা তার আপন ভাবির সাথে এতো অন্তরঙ্গভাবে কথা বলছে! লৌকিকতার খাতিরে হলেও তো রাইসুলের এখন জমিদারের কাছে নালিশ করার কথা। কিন্তু তার চোখেমুখে রাগের বদলে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করছে।
মুন্নিকে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুলি এক গাল হেসে ডাকলো„ —“আরে মুন্নি আপু। দাঁড়িয়ে আছো কেন? এদিকে এসো। দেখো, রাইসুল ভাইয়া তোর জন্যই অপেক্ষা করছে। উনি বলছিলেন তোমাকে নাকি আগেই চিনে ফেলেছেন!”
মুন্নির পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেলো মুহুর্তেই। রাইসুল মুচকি হেসে মুন্নির দিকে তাকালো। তার গায়ের সেই ধুলোমাখা শার্ট নেই। সে এখন ধবধবে সাদা একটা পাঞ্জাবি পরিধান করেছে।
রাইসুল শান্ত গলায় বলল„ —“চিনবো না মানে? আপনার বোন তো মাশাআল্লাহ বেশ কর্মঠ। এসেই আমাকে বাড়ির নিয়ম-কানুন বুঝিয়ে দিয়েছেন।”
মুন্নি ঢোক গিললো। রাইসুলের কথার খোঁচাটা সে খুব বুঝতে পারল। তুলি কিছু না বুঝে বলল„ —“কর্মঠ হবে না কেন? আমার ননদিনী বলে কথা! তা রাইসুল ভাই, আপনি নাকি আমাদের গ্রামের নদীটা দেখতে চেয়েছিলেন? মুন্নি আপুকে সাথে নিয়ে যান না? ওনি সব চেনে।”
মুন্নি বিড়বিড় করে বলল„ —“আমি কোথাও যাবো না। আমার অনেক পড়া বাকি।”
জমিদার গিন্নী দূর থেকে মেয়ের কাণ্ড দেখে এগিয়ে এলেন। মুন্নির পাশে এসে দাড়িয়ে বললেন„—“বেয়াদবি করিস না। ছেলে যেমন সুন্দর, তেমনি তার স্বভাব। যা, গ্রাম ও নদী দুটোই ঘুরিয়ে নিয়ে আয়।”
মায়ের আদেশে মুন্নি অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাইসুলের সাথে বাড়ির বাইরে বের হলো। দুপুরের কড়া রোদ এখন কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছে। গ্রামের মেঠো পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে রাইসুল হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। মুন্নির দিকে ফিরে বলল„ —“তা মুন্নি সাহেবা। কাপড়গুলো কিন্তু আমি আসলেই ধুয়ে দিয়েছি। কলপাড়ে মেলে দিয়ে এসেছি, দেখে নেবেন।”
মুন্নি লজ্জায় রাঙা হয়ে চেঁচিয়ে উঠল„ —“আপনি কি মানুষ নাকি রোবট? কেউ আপনাকে ওভাবে কাপড় ধুতে বললেই আপনি ধুয়ে দেয়?”
রাইসুল শব্দ করে হেসে উঠল„ —“আসলে আমি দেখতে চেয়েছিলাম, যে মেয়েটা এতো তেজ নিয়ে কথা বলে, তার মনটা কেমন। আপনার তেজ আছে মুন্নি, কিন্তু অহংকার নেই। এটাই আমার ভালো লেগেছে।”
মুন্নি স্তব্ধ হয়ে গেল। এই প্রথম কোনো পুরুষ তার তেজের প্রশংসা করলো। সাধারণত সবাই তাকে ‘বেয়াড়া’ বলে গালি দেয়। মুন্নির তেজি স্বভাবের আড়ালে যে একরাশ জড়তা লুকিয়ে ছিল, তা রাইসুলের এক চিমটি হাশিতে যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
রাইসুল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে মুন্নির ঠিক সামনে দাঁড়ালো। মেঠো পথের দুপাশে তখন কাশফুলের দোলা, আর মাথার ওপর পড়ন্ত বিকেলের সোনাঝরা রোদ। রাইসুল পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা রুমাল বের করে মুন্নির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল„ —“নিন, কপালে ঘাম জমেছে। অতটা রাগলে শরীর খারাপ করবে।”
মুন্নি একবার রুমালটার দিকে তাকালো। তারপর রাইসুলের চোখের দিকে। সেখানে কোনো উপহাস নেই, আছে এক অদ্ভুত মায়া। মুন্নি রুমালটা না নিয়ে নিজের ওড়নার আঁচল দিয়ে কপাল মুছতে মুছতে একটু দূরে সরে দাঁড়ালো। কাঁপা গলায় বলল„ —“আপনি কি সবসময় এভাবে মানুষকে অপ্রস্তুত করেন?”
রাইসুল মুচকি হাসলো„ —“অপ্রস্তুত আমি করিনি, আপনি করেছেন। আচ্ছা ধরুন, আমি যদি সত্যি কাজের লোক হতাম, তবে কি আমার সাথে কথা বলতেন না?”
মুন্নি মাথা নিচু করল। দুই অপরিচিত মানুষের মাঝে যখন প্রথম পরিচয়ের দেয়ালটা ভেঙে পড়ে, তখন সেখানে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হয়, যা কেবল নতুন কোনো অনুভূতির স্পন্দন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব।
নদীর ঘাটে আসতেই বাতাসের ঝাপটা তাদের ছুঁয়ে গেল। রাইসুল একটা বড় পাথরের ওপর বসে পড়ে বলল„ —“শহরের যান্ত্রিকতায় আমরা শুধু ছুটতে জানি। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে, সময়টা স্থির হয়ে আছে। আপনার কি মনে হয় না, জীবনটা এই নদীর মতোই হওয়া উচিত? শান্ত কিন্তু প্রবহমান।”
মুন্নি এবার সাহস করে রাইসুলের পাশে বসলো। ঘাসের ওপর হাত রেখে মৃদুস্বরে বলল„ —“আমি কখনো এভাবে ভাবিনি। আমার কাছে গ্রাম মানেই চার দেয়ালের শাসন আর বাবার আদেশ। কিন্তু আজ আপনার সাথে কথা বলে মনে হচ্ছে, চারপাশের গাছপালাগুলোও কথা বলতে পারে।”
রাইসুল মুন্নির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো। মুন্নির চোখের তারায় তখন অস্তগামী সূর্যের প্রতিচ্ছবি। রাইসুল বলল„ —“নতুন কাউকে চেনা মানে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করা। আপনি যে তেজ দেখান, সেটা আসলে আপনার আত্মরক্ষার দেয়াল। আমি কি সেই দেয়ালটা একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি?”
মুন্নি চমকে উঠলো। এক লহমায় রাইসুলের চোখের গভীরতা তাকে গ্রাস করে নিল। অপরিচিত এক পুরুষের এমন সরাসরি প্রস্তাব তাকে যতটুকু ভীত করল, তার চেয়ে বেশি ব্যাকুল করে তুলল। একটা মানুষের সাথে মাত্র কয়েক ঘণ্টার পরিচয়, অথচ মনে হচ্ছে জন্ম-জন্মান্তরের চেনা। সম্পর্কের এই যে সূক্ষ্ম উদ্বেগ যাকে না বলা যায় প্রেম, না বলা যায় মোহ তা মুন্নিকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো।
মুন্নি উঠে দাঁড়িয়ে শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে বলল„ —“সূর্য ডুবে যাচ্ছে। এবার বাড়ি ফিরতে হবে।”
রাইসুল হাসলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে মুন্নির পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করল। মেঠো পথের অন্ধকারে তাদের ছায়া দুটো যখন একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।
এদিকে জমিদার বাড়িতে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। সাইর তার ঘরে একা বসে কিছু একটা ভাবছিল। পূর্ণিমার আর মাত্র তিন দিন বাকি। অর্কার সেই অশুভ শক্তি এখন আরও প্রবল হচ্ছে। সাইর বুঝতে পারছে, জমিদারের রক্তে অর্কা নতুন করে প্রাণ পাওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরে ঢুকলো তুলি।
তুলির হাতে এক গ্লাস দুধ। সে সাইরের পাশে বসে ধীর গলায় বলল„ —“আপনি কি খুব বেশি চিন্তিত?”
সাইর তুলির দিকে তাকিয়ে তার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিল“ —“চিন্তা তো হবেই তুলি। অর্কা যে মায়াজাল বুনছে, তাতে আমাদের সবাইকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করছে সে। বিশেষ করে বাবাকে সে যেভাবে কব্জা করেছে, তাতে বাবার মুক্তি মনে হয় একমাত্র মৃত্যুতেই।”
তুলি সাইরের কাঁধে মাথা রাখল„ —“আমি আপনার সাথে আছি। আপনি বলেছিলেন না, আমিই পারবো অর্কাকে শেষ করতে? আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়বো।”
সাইর তুলির কপালে আলতো করে চুমু খেল। কিন্তু পরক্ষণেই তার শরীর শক্ত হয়ে গেল। বাতাসের গন্ধে এক পচা লাশের গন্ধ ভেসে আসছে। সাইর দ্রুত জানালা দিয়ে বাইরে তাকালো। বনের দিক থেকে কালো ধোঁয়া পাকিয়ে উপরে উঠছে। দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে বাইরে গেল সাইর।
সরাই খানার জমাট বাঁধা অন্ধকারে জমিদারের লোভাতুর চোখের মণি দুটো বিড়ালের মতো জ্বলজ্বল করতে লাগলো। অর্কার অবয়বহীন ছায়াটা দুলতে দুলতে জমিদারের আরও কাছে এগিয়ে এলো। এক হিমশীতল বাতাস সরাই খানার প্রদীপগুলোকে নিভিয়ে দিলো নিমেষেই।
অর্কা গম্ভীর গলায় আজ্ঞা দিল„ —“শোন জমিদার, সাইরের শরীরে তোর রক্ত থাকলেও তার ধমনীতে এখন পবিত্র প্রেমের আগুন জ্বলছে। ঐ আগুন নেভাতে হলে বিষের প্রয়োজন। সাইরকে বলপ্রয়োগে বন্দি করা সম্ভব নয়, তাকে বন্দি করতে হবে মায়ার জালে।”
জমিদার মামুনুর উৎসুক হয়ে ঝুঁকে বসলেন„ —“কি করতে হবে আমায়? আমায় খোলসা করে বল অর্কা।”
অর্কা এক বীভৎস হাসিতে ফেটে পড়লো„ —“শোন, কাল সন্ধ্যায় তুই সাইরকে বলবি তার মায়ের সেই পুরনো ভিটেয় এক তান্ত্রিক এসেছে, যে কি না তোর ওপর করা অভিশাপ মুক্ত করতে পারবে। সাইর তার মায়ের স্মৃতি বিজড়িত সেই ভিটের মায়া ত্যাগ করতে পারবে না। সে সেখানে পৌঁছানো মাত্রই তুই ‘রক্ত-বন্ধন’ মন্ত্র পাঠ করবি। তোর নিজের হাতের কয়েক ফোঁটা রক্ত দিয়ে মাটিতে বৃত্ত আঁকবি। সেই বৃত্তের ভেতর পা রাখা মাত্রই সাইরের সব শক্তি অর্গলবদ্ধ হয়ে যাবে। সে এক পা-ও নড়তে পারবে না, যেন অদৃশ্য শিকলে সে বন্দি হয়ে থাকবে।”
জমিদার মাথা নাড়াল„ —“আর তুলি? তাকে কীভাবে আনবো?”
অর্কা তার অদৃশ্য হাতটা জমিদারের কাঁধে রাখলো। জমিদারের শরীর যেন বরফ হয়ে গেল„ —“তুলি তখন ঘরে একা থাকবে। তুই সাইরের এক জোড়া রক্তাক্ত খড়ম বা রুমাল পাঠিয়ে দিবি তুলির কাছে। বলবি, সাইর গুরুতর আহত হয়ে বাগানের শেষ প্রান্তে পড়ে আছে। তুলি যখন ব্যাকুল হয়ে সেই অন্ধকারের দিকে ছুটবে, তখনই আমার ছায়া তাকে গ্রাস করে নেবে। সাইর বন্দি থাকবে তার মায়ের ভিটেয়, আর তুলি থাকবে আমার বেদীতে। পূর্ণিমার চাঁদ যখন মধ্যগগনে উঠবে, তখন সাইরের চোখের সামনেই তুলির বুক চিরে তার তপ্ত রক্ত আমি এই মাটিতে ঢালবো।”
জমিদার মামুনুর একটু থমকালেন„ —“কিন্তু অর্কা, সাইর যদি কোনোভাবে সেই বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে?”
—“ভয় নেই জমিদার! তোর রক্তই হবে তার কারাগার। নিজের বাবার রক্ত ডিঙিয়ে সে বেরোতে পারবে না। আর একবার যদি তুলির রক্ত এই মাটিতে মেশে, তবে তোর জীর্ণ শরীর হবে লোহার মতো শক্ত, আর আমার আত্মা হবে অবিনশ্বর। আমরা দুজনেই হব এই চূর্ণচূড়ার অঘোষিত সম্রাট।”
জমিদারের মনে তখন পুত্রের জন্য একবিন্দু মায়া অবশিষ্ট রইলো না। ক্ষমতার মোহ তাকে অন্ধ করে ফেলল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগলো„ —“অমরত্ব। আমার কত দিনের সাধ আমি অমর হবো। সাইর, তুই আমায় ক্ষমা করিস বাবা, কিন্তু এই পৃথিবীর অধিপতি হওয়ার সুযোগ আমি হাতছাড়া করতে পারবো না।”
জমিদারের কথা শেষ হতেই অর্কা হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। সরাই খানার সেই পচা লাশের গন্ধটাও যেন ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে গেলো।
সন্ধ্যা নেমেছে চূর্ণচূড়ায়। গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া শীতল হাওয়া আজ একটু বেশিই হিমশীতল। জমিদার বাড়ির বিশাল উঠোন জুড়ে আঁধার ঘনিয়ে এলেও বারান্দার হ্যারিকেন আর সারি সারি মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে আছে। বাগানের শিউলি ফুলের কড়া ঘ্রাণ আর ধুনোর ধোঁয়া মিশে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ গড়ে তুলেছে চারিদিকে। তুলি ধীর পায়ে অন্দরে প্রবেশ করল। তার মনে এক অজানা ভয়ের শঙ্কা দানা বাঁধছে।
রাতের খাবারের সময় হতেই খাবারের টেবিলে রূপোর থালা-বাসনের ঝনঝনানি শোনা গেল। আজ খাবারের আয়োজন রাজকীয়। জমিদার মামুনুর রহমান আজ অন্যদিনের চেয়েও বেশি প্রফুল্ল আর আনন্দিত। তার চোখে-মুখে এক ধরণের পৈশাচিক আনন্দ কাজ করছে, যা বাইরের কেউ আঁচ করতে পারছে না।
খাবারের টেবিলে রাইসুল বসেছে সাজাদের পাশে। তার পরনে এখনও সেই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি। তার ঠিক উল্টো দিকে মাথা নিচু করে বসে আছে মুন্নি। রাইসুল মাঝে মাঝেই আড়চোখে মুন্নির দিকে তাকাচ্ছে। আর মুন্নি লজ্জায় নিজের শাড়ির আঁচল আঙুলে পেঁচাচ্ছে।
সহিনী আর তুলি তাদের সকলের মাঝে খাবার পরিবেশন করছে। সাইর চুপচাপ বসে আছে তার জায়গায়, তার দৃষ্টি আজ স্থির। অজানা ভয়ের মোকাবেলা করতে নিজের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে সে। সাইর বারবার তার বাবার চোখের দিকে তাকাচ্ছে। যদি একবার জমিদার তার চোখের দিকে তাকায় তাহলেই সে তাকে বশিভূত করবে। তারপর সবকিছু জানতে পারবে।
জমিদার গলার স্বর কিছুটা পরিষ্কার করে নিলেন। এক টুকরো খাসির মাংস মুখে দিয়ে তৃপ্তির হাসি হেসে রাইসুলের বাবার দিকে তাকিয়ে বললেন„ —“বেয়াই মশাই, গ্রামটা কেমন দেখছেন? আমাদের গ্রামের এই শান্ত পরিবেশ কি আপনাদের শহরের মানুষদের ভালো লাগছে?”
রাইসুলের বাবা বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন„ —“অপূর্ব! বিশেষ করে আপনাদের আতিথেয়তা আমাদের মুগ্ধ করেছে জমিদার মশাই।”
জমিদার এবার রাইসুলের দিকে তাকালেন। মুচকি হেসে বললেন„ —“রাইসুল বাবাজি, তোমাকে দেখে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। মুন্নির মতো জেদি মেয়ের জন্য তোমার মতো শান্ত আর ধৈর্যশীল ছেলেই প্রয়োজন। তাই আমি ভাবলাম, শুভ কাজে আর দেরি করে লাভ কী?”
মুন্নি আর রাইসুল দুজনেই একসাথে মাথা তুলল। রাইসুলের চোখে বিস্ময় আর মুন্নির চোখে একরাশ ভয়। জমিদার মামুনুর দরাজ গলায় ঘোষণা করলেন„ —“আগামী তিন দিন পর পূর্ণিমা। ঐ পবিত্র পূর্ণিমার রাতেই আমি মুন্নি আর রাইসুলের বিয়ের দিন ধার্য করলাম। ঐদিন চূর্ণচূড়ার আকাশে যখন গোল চাঁদ উঠবে, তখনই ওদের চার হাত এক হবে।”
মুন্নি বিড়বিড় করে কিছু বলতে চেয়েও পারল না। চূড়ার নাম শুনে তুলি চমকে গেল। সাইর খাবার ছেড়ে তাকালো জমিদারের দিকে। রাইসুলের বাবা কিছুটা উৎসাহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল„ —“আপনাদের এত বড় জমিদার বাড়ি থাকতে পাহাড়ে কেন বিয়ের আয়োজন করছেন?”
পেছন থেকে জমিদার গিন্নী বলল„ —“আমাদের একটা রীতিনীতি আছে বেয়াই। পরিবারের কোনো মেয়ের সেখানেই বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। এটা আমাদের বংশগত নিয়ম।”
রাইসুলের বাবা সম্মতি দিলো„ —“ঠিক আছে তাই হবে।”
সাজাদ আর সহিনী খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল। তাদের সহিত পরিবারের সকলে করতালি বাজিয়ে তাদের শুভেচ্ছা জানালো।
জমিদার আবার বললেন„ —“আর হ্যাঁ, বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত রাইসুল আর তার পরিবারের সবাই এই জমিদার বাড়িতেই আমাদের মেহমান হয়ে থাকবেন। আমি চাই না এই শুভ লগ্নে আমার বেয়াইরা দূরে থাকুক। কী বলেন বেয়াই মশাই?”
রাইসুলের বাবা সানন্দে রাজি হলেন। পুরো টেবিলে খুশির জোয়ার বয়ে গেলে। খাবারের বাটি নিয়ে জমিদারের পাশে যেতেই তুলির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে লক্ষ্য করল জমিদারের হাতের নখগুলো কেমন যেন কালচে হয়ে আছে।
সাইর ধীর গলায় বলল„ —“বাবা, পূর্ণিমার রাতে তো গ্রামে অনেক অলৌকিক কাণ্ড ঘটে বলে শুনেছি। ঐ রাতে বিয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে?”
জমিদার মামুনুর কঠোর চোখে সাইরের দিকে তাকালেন। হাসির আড়ালে রাগ লুকিয়ে বললেন„ —“তোর ভয় কিসের রে সাইর? আমি থাকতে তোদের ওপর কোনো অশুভ ছায়া পড়তে দেব না। তুই বরং তোর বউকে নিয়ে ঘরের ভেতরে থাকিস, বাইরের চিন্তা তোকে করতে হবে না।”
খাবার শেষে সবাই যার যার ঘরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। রাইসুল যাওয়ার সময় একবার মুন্নির কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল„ —“এখন তো আর পালানোর পথ নেই মুন্নি সাহেবা। পূর্ণিমার চাঁদ সাক্ষী রেখে আপনাকে চিরতরে নিজের করে নেব।”
মুন্নি উত্তর না দিয়ে এক দৌড়ে নিজের ঘরে চলে গেল। যেন রাইসুলের থেকে বাঁচতে পারলেই তার শান্তি মিলবে। নিজের বারবার লুকিয়ে রাখলেই যেন তার প্রকৃত সুখ।
নিজ ঘরে জানালার কাছে দাড়িয়ে আছে সাইর। ঘরে মৃদু কূপের আলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল„ —“পূর্ণিমার রাত! অর্কাও তো ঐ রাতেই তার শক্তির খেলা দেখাবে।”
দরজা খুলে ভেতরে এলো তুলি। খট করে দরজা লাগাতেই কূপের আলো নিভু নিভু হলো। তুলি এসে সাইরের পাশে দাড়িয়ে বলল„ —“এত তাড়াতাড়ি চলে এলেন যে? এতটুকু খাবার খেয়ে কেন চলে এলেন? নিচে কি আমার জন্য একটু অপেক্ষা করা যেত না?”
সাইর চুপচাপ রইল। তার কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে তুলি চিন্তিত হলো। সাইরের হাতের ফাঁকে জানালার কার্নিশে সাইরের বক্ষ ঘেষে তার সম্মুখে দাড়ালো। সাইরের চিন্তিত মুখ দেখে তুলি সব রাগ ভুলে গেলো। সাইরের গালে হাত রেখে বলল„ —“কি হয়েছে আপনার? এত চিন্তিত কেন আপনি?”
অন্ধকার বাগানের দিকে তাকিয়ে সাইর বিড়বিড় করে বলল„ —“মায়াজাল বোনা হয়ে গেছে তুলি। শিকারী তৈরি, এখন শুধু শিকার হওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু অর্কা জানে না, সাইর মরতে জানে, হারতে জানে না।”
তুলি কিছুই বুঝল না। বলল„ —“এসব কিছু বুঝি না আমি। তবে শুনুন আজকে আমি একটা জিনিস দেখেছি।”
—“কি জিনিস?”
তুলি মাথা তুলে সাইরের চোখের দিকে তাকালো„ —“আপনার বাবার হাতের নখগুলো কালো হয়েছিল। ঘাড়ের পাশের ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো মাফলার ভেদ করে বাইরে দেখা যাচ্ছে। আর যাই হোক ছোট্ট চুল মাফলার ভেদ করে বাইরে আসবে না।”
সাইর কিছু একটা বুঝে বাইরের দিকে অগ্রসর হলো। তুলি ঠিক তখনই সাইরের হাত চেপে ধরল। অভিমান মেশানো গলায় বলল„ —“আপনি কি হ্যাঁ?”
সাইর ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“কি?”
তুলি সাইরের হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল„ —“একে তো বউ বানিয়ে নিজের কাছে রেখেছেন। তারপর না কখন স্বামীর অধিকার নিয়ে কাছে এসেছেন। আর আমি যখন আপনার এত কাছে ছিলাম তখন আমাকে রেখে কাজ করতে যাচ্ছেন?”
সাইর কিছুক্ষণ আগের কথা মনে করল। সে যখন জানালায় দুই হাত দুই পাশে রেখে জানালার কপাটে ভর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল তুলি তখন ঘরে আসে। তাকে চিন্তিত দেখে নিচু হয়ে হাতের ফাঁকে সাইরের সম্মুখে আসে। সাইর তার দিকে তাকাইনি বলে তার একদম সম্মুখে দাড়িয়ে সাইরের বুকে দুই হাত রেখেছিল তুলি।
সাইর অপরাধী স্বরে বলল„ —“মাফ করো বউ। তুমি নিজের ইচ্ছায় আমার কাছে না আসলে আমি কখনো নিজ ইচ্ছায় তোমার প্রতি অধিকার দেখাতে যাবো না।”
তুলি মিনমিনিয়ে বলল„ —“এখন তো চাইছি। আসবেন?”
সাইর একটু একটু করে তুলির দিকে পা বাড়ালো। ওমনি তুলি পেছাতে লাগলো। সাইর মিখ ফুলিয়ে বলল„ —“যদি কাছেই ডাকো তাহলে পিছিয়ে যাচ্ছো কেন? আমাকে বুঝি শুধু কল্পনাকে কাছে চাও?”
তুলি মাথা নোয়াল। সাইর আর কিছু না বলে পেছন ঘরের বাইরে হাঁটতে লাগলো। তুলি দ্রুত পায়ে গিয়ে সাইরের সম্মুখে দাড়ালো। কিছু না বলেই হুট করে সাইরের বুকে জড়িয়ে পরলো।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ ওরা দুজন প্রেম করুক আর আপনারা আমার গল্পের রেন্সপন্স করুন। কারণ আমার থেকেও বড় অলস আপনারা।
ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পরবর্তী পর্বটি খুব দেরি করে দিবো ইন-শা-আল্লাহ। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাঁশ ]

