#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
১০.
তুলির নিস্তেজ দেহটা মাটিতে পরার আগেই ধরে নিলো সাইর। মধু দৌড়ে এসে এদিকে সেদিকে খুঁজতে লাগলো হাতটাকে কিন্তু পেলো না। কোথাও কেউই ছিল না। এমনকি ঐ নেকড়ের হাতটাও না। সাইর তুলিকে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিলো মাটিতে। গলার আশেপাশে ধারালো নখের জখম দিয়ে অনবরত রক্ত পরছে। এভাবে রক্ত পরতে থাকলে খুব ক্ষতি হতে পারে তুলি। সাইর উঠে খুপরিতে গেলো। সেখান থেকে একটা শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে নিয়ে এসে আলতো করে তুলির গলার জখমে বেঁধে দিলো। তুলিকে নিয়ে গিয়ে খুপরিতে শুইয়ে দিলো। মধুও সাইরের পিছুপিছু গেলো। খুপরিতে নিয়ে চৌকিতে শুইয়ে দিলো তুলিকে। কাঠ-কাঠ গলায় শাসিয়ে গেলো মধুকে„ —“ওকে একা রেখে কোত্থাও যাবি না। ঘর থেকেই বের হবি না তুই। আমি আসছি।”
মধু দুই কান নেড়ে বলল„ —“ঠিক আছে।”
সাইর খুপরি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। নিজের শক্তি দ্বারা হাতে পানির পাত্র নিয়ে এলো তার সম্মুখে। বিরবির করতে করতে পানিগুলো খুপরির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিলো। খুপরির দরজার কাছে এসে পা দিয়ে মাটিতে আঘাত করলো। মাটির খানিক জায়গাটা গর্ত হলো। সাইর সেখানে পানির পাত্রটা পুতে দিলো। তারপর আবার বিরবির করতে করতে মাটির গর্তটা ভরাট করে দিলো। চোখের পলকে খুপরিটা উধাও হয়ে গেলো। সাইর দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে তাকালো। জোরে জোরে চিৎকার করল„ —“অর্কা? কোথায় তুমি? সামনে এসো? আমার সাথে দেখা করো?”
কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সাইর আবারও ডাকতে লাগলো„ —“কোথায় তুমি? সামনে এসো বলছি? নয়তো?”
—“নয়তো কি করবে তুমি?”
সাইর পেছনে তাকালো। তার বাবা এসেছে চূড়ায়। স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো সে। তখন পেছন থেকে কেউ বলল„ —“এতো নিশ্চিত হইও না সাইর। আমি দেখেছি তুলি কোথায় আছে?”
সাইর পেছনে ফিরলো। বিস্মিত হয়ে বলল„ —“অর্কা তুমি?”
উচ্চ স্বরে হাসির শব্দ ভেসে এলো ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে। কুন্ডলীটা উড়তে উড়তে জমিদার বাবুর কাছে যেতে লাগলো। সাইরও তার বাবার দিকে তাকালো। সাইর বাঁধা দিতে বলল„ —“অর্কা তুমি আমার সাথে বেইমানি করতে পারো না? তোমার কথা ছিল আমাকে অমরত্ব দেওয়া আর তুমি?”
ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে রাগান্বিত স্বর ভেসে এলো„ —“আর তুমি? কি আমি হ্যাঁ কি? তোমাকে বলেছিলাম আজকে মেয়েটাকে বলী দিতে। তুমি কি করলে? মেয়েটিকে আবারও বাচিয়ে নিলে। তোমাকে মায়া দেখানোর অভিনয় করতে বলেছিলাম আর তুমি কি-না ঐ মেয়েটাকে ভালোবাসলে? আমি বলেছিলাম মেয়েটি যখন জেগে থাকবে তখন তার জন্ম চিহ্ন খুঁজে বের করো আর তুমি? তুমি কি-না ঘুমন্ত মেয়েটির দূর্বলতার সুযোগ নিলে? মেয়েটিকে বলী দিলে তুমি হতে ১০০টা নারী-সুধা পান করা পুরুষ। যা এই ধরায় একটা লোকও নেই। তাহলে তোমার শরীরকে আমি ব্যবহার করতে পারতাম। আমি অমর। আমার মৃত্যু নেই। আমি শুধু দেহ বদলাতে পারবো কিন্তু আত্মা আমার থেকেই যাবে বহুদিন‚ বহুকাল। তুমি যখন আমার কথা মতো চললে না তখন এর পরিণাম ভয়ংকর হবে। তোমাকে বুঝিয়ে দিবো অর্কা কি কি করতে পারে? তৈরি হও সাইর।”
জমিদার বাবু দুই হাত ওসাড় করে বক্ষ এগিয়ে দিলো। ধোঁয়ার কুন্ডলীটা ধীরে ধীরে তার শরীরে প্রবেশ করতে লাগলো। সাইর বিরবির করে দুই ফোটা পানির ছিটিয়ে দিলো তাদের শরীরে। দু’জন দুই দিকে ছিটকে পরলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সাইর দুইজনকে দুইটি খাঁচায় বন্দি করলো। মায়াবী খাঁচায় চারপাশে মাকড়সার জালের মতো আবরণ দিয়ে দুজনকে পৃথক করলো সে। ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে আওয়াজ এলো„ —“সাইর একটা মেয়ের জন্য পাগলামি করো না? তুমি আমার কথা শোনো‚ যদি নিজেকে বাঁচাতে চাও তাহলে মেয়েটিকে বলী দাও।”
সাইর উচ্চ স্বরে হাসলো„ —“কি বললে তুমি? তুলিকে বলী দিবো? তুমি ঐ চাঁদ চিহ্নের রহস্য জানো? এই ধরায় ঐ একটা মেয়ের শরীরেই চাঁদ চিহ্ন রয়েছে। যা তোমাকে বিনাস করবে? তুমি সেই ভয় আমাকে দেখিয়েছিলে যাতে আমি নিজের মৃত্যুর ভয়ে তোমার কথা মতো তুলিকে বলী দিই। আর তুমি আমার শরীর বেছে নিয়ে নিজের আত্মা বদলিয়ে দিবে। আমাকে শাণিত করতে আসমানে আর তুমি হতে এই ধরার অমর মানব।”
জমিদার রেগেমেগে বলল„ —“সাইর। অমর হওয়ার সকল বুদ্ধি আমি তোমাকে দিয়েছি। তোমার উচিত তোমার শক্তির বিনিময়ে আমাকে এখান থেকে মুক্তি দেওয়ার।”
সাইর আঙুল উঁচিয়ে বলল„ —“চুপ। একদম চুপ। আপনি নিজেও একটা শয়তান। ৪০বছর বয়সে ঐ শয়তান অর্কা’র দেখা পেয়েছেন আপনি। তখন আপনার সংসার‚ সন্তান সবকিছু ছিল। অর্কা’র থেকে পর্যাপ্ত শক্তি নিজের করে বাকি শক্তিতে মানুষ করেছেন আমাকে। মানুষ নয় জানোয়ার বানিয়েছেন আমাকে। আমার ১৪বছর বয়স হতেই আপনি আমাকে নারী সংগমে বাস করিয়েছেন। আপনার মতো পিতা আমি দু’টো দেখিনি এই ধরাতে।”
জমিদার রেগে গেলো„ —“তোমার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা উচিত সাইর। তোমাকে এতকিছু যা দিয়েছি‚ যা বানিয়ে সবকিছু তোমার জন্যই।”
—“চুপ করুন আপনি? আপনি যখন ছোট চাচির সাথে নষ্টামি করেছিলেন তখন পরিবারের সকলেই আপনাকে বেঁধে রেখেছিল এই চূড়ার বটগাছটায়। আপনার বড় ছেলে সাজাদও আপনাকে ঘেন্না করে। আপনার ঐ ঘটনার পর থেকেই সে শহরে থাকতে শুরু করে মামার সাথে। আর আমি ছোট ছিলাম বলে আপনি আপনার মর্জি মতো ব্যবহার করেছেন আমাকে। খামারে কাম করার নামে নিয়ে গিয়ে মায়ের বয়সী নারীদের সাথে আমার রেখে যেতেন। আমার বলতেও ঘেন্না হচ্ছে। কি নিচু আপনার মানসিকতা। এ মন-মানসিকতা আর মানবিকতা নিয়ে আপনি জমিদার হয়েছে দশ গায়ের লোকের। লোকেরা এসব জানলে আপনাকে জিন্দা দাফন করবে।”
জমিদার রাগের চোটে তার সর্বস্ব নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললো। মুহুর্তে মধ্যে বিচলিত হয়ে নিজের শক্তি ব্যবহার করতে লাগলো। দুই হাতে বুক চাপরে গর্জন করে উঠলো। কপালের মাঝখান থেকে হলুদ রঙের রশ্মি তীরের মতো ছুটতে লাগলো সাইরের দিকে। তীরটা সোজা সাইরের পেটের দিকে যাচ্ছে। সাইরের পেট ছোয়ার আগেই তীরটাকে ধরে ফেললো সাইর। নিজের শক্তির মাধ্যমে তীরটাকে নিজের শরীরে প্রবেশ করালো সর্তপনে। তীর নয় সাইরের শরীরে প্রবেশ করলো তীর ছাড়ানো তার পিতার কালো শক্তি। হলুদ আলোক রশ্মি তির-তির করে প্রবেশ করলো সাইরের দেহে। ফতুয়া খুলে উন্মুক্ত হলো দেহ। তার দেহ থেকে চাঁদের আলো বিকশিত হলো চারপাশ। চারদিকে আলোর ঝলকানিতে চিকচিক করছে। জমিদার নিস্তেজ হয়ে পরে গেলো খাঁচার ভেতরেই। অর্কা বারবার বিচলিত কন্ঠ জড়ালো„ —“এসব করো না সাইর। তোমার শক্তি নষ্ট হবে।”
দুই হাত শূন্য ভাসিয়ে উচ্চ স্বরে হাসলো„ —“আমার কিছুই হবে না অর্কা। এখন থেকে যা হবে সব তোমার। তৈরি থেকো তুমি।”
ধোঁয়ার কুন্ডলী থেকে হাসির শব্দ ভেসে এলো„ —“আমার কিছুই হবে না সাইর। তুমি আর ঐ মেয়েটা আমার হাতেই বিনাস হবে। মেয়েটি তো মৃত প্রায়। এখন ভালোই ভালোই যদি তুমি আমার কথা শোনো তাহলে আমি তোমাকে অমরত্ব লাভ করাতে পারবো।”
অর্কা’র মুখে তুলির কথা শুনতেই নিস্তেজ দেহটার কথা মনে পরলো সাইরের। তাকে তো এক্ষুনি দাবাই আনতে হবে। এখানে সময় নষ্ট করলে চলবে না। এদের পরেও সামলে নিতে পারবে সে। রাগান্বিত চোখে দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করতেই ডাবনার দুই পাশ থেকে ঈগলের দু’টো পাখনা ডানা ঝাপটাতে লাগলো। উড়তে যাবার সময়ই অর্কা আদেশ করলো„ —“দাড়াও।”
অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাড়িয়ে পড়লো সাইর। ভ্রু উঁচিয়ে বলল„ —“কি হয়েছে বলো?”
অর্কা’র হাসির শব্দ শোনা গেলো„ —“মেয়েটিকে বাঁচাতে দাবাই নিতে যাচ্ছো নাকি পাঁচন নিতে?”
সাইর স্মিত হাসলো„ —“কেন ভয় পাচ্ছো?”
সাইরের কথা শুনে অর্কা বলল„ —“যেখানে যাচ্ছো যেটা তো মরণাপন্ন স্থান। আর দাবাই নিয়ে ফিরতে ফিরতে মেয়েটি পরপারে। যদি রক্ত পরা বন্ধ না হয়ে মারা যায় তখন? কি করবে তুমি?”
রাগে চোয়ালদ্বয় শক্ত করলো সাইর। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে কিছু ধুলো ছুড়ে মারলো ধোঁয়ার কুন্ডলীর উপরে। নিমিষেই ঝড়ের সৃষ্টি হলো ঐ স্থানে। কিছুক্ষণ পরে ঝড় থামতেই একটা ঈগল উড়ে গেলো সেখান থেকে। আর কিছুই ছিলো না সেখানে। জমিদার বাবুও খাঁচাও উধাও আর অর্কা’র খাঁচাও উধাও। শুরু ঈগল রূপে উড়ে গেলো সাইর।
[ বি:দ্র: আপনারা যারা আমার গল্প পরেন তাদের কাছে বলবো যে আপনারা আপনারা আমার মানে লেখিকার পেইজে ফোলো দিয়ে রাখুন। তাহলে গল্প বিষয়ক বিভিন্ন আপডেট পাবেন।
আপনারা যারা লেখিকার পেইজ ব্যতীত অন্য কোনো পেইজ থেকে গল্প পরেন তারা দয়া করে আলসেমি বাদ দিয়ে কষ্ট করে লেখিকার পেইজটা খুঁজে ফোলো দিয়ে রাখুন ]
উড়তে উড়তে গ্রামের পর গ্রাম পারি দিলো ঈগল পূরে সাইর। প্রায় ঘন্টা খানেক উড়ার পরে একটা বড় গাছে গিয়ে বসলো। ভেসচ গাছের পাতা লাগবে তুলিকে সুস্থ করতে। একটা নেকড়ের বিষাক্ত আঘাত থেকে ভেসচ গাছের পাতাই সবচেয়ে বড় দাবাই। ভেসচ গাছের পাতা‚ বাবলা গাছের ছাল আর ধানশিষা গাছের শেঁকড় সবকিছু একত্রিত করে একটা দাবাই বানিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেই ঘন্টা খানেক মধ্যেই ভালো হয়।
গাছটা থেকে মাটিতে নামলো সাইর। পরপরই মনুষ্য রূপ ধারণ করলো। চাঁদ শরীর ঢাকার জন্য একটা শাল জড়িয়ে নিলো গায়ে। এদিক-সেদিক খুঁজতে খুঁজতে ঝোপের পাশেই কিছু একটা পায়ে ঠেকলো তার। সেদিকে তাকাতেই ঝোপ নড়েচড়ে উঠলো। ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো বিশাল একটা শকুন। সাইর হকচকিয়ে গেলো। উল্টো পায়ে এক-পা দুই-পা করে পেছনে হাঁটতে লাগলো। শকুনটা দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সাইরের দিকে। শকুনের পালকে পা দিয়েছে সাইর। ক্রোধান্যিত হয়ে ডানা ঝাপটালো শকুনটা। দুই পাখনা মেলে ধরতেই নিচে ভেসচ গাছ দেখতে পেলো সাইর। উদ্দেশ্য এত কাছে দেখে চোখ দুটি লোভে চকচক করতে লাগলো তার। দ্রুত এগিয়ে গেলো ভেসচ গাছের দিকে। ওমনি শকুনটা পাখনা দিকে ঝাপটা দিলো সাইরকে। হঠাৎ আক্রমণে ছিটকে দূরে গিয়ে গাছের সাথে বারি খেয়ে পরে গেলো সাইর। পায়ে খুব লেগেছে তার। কাঁধের হাড়-গোড় মনে হলো ভেঙে গেলো মুহুর্তেই। উঠতে গিয়ে ধপ করে পরে গেলো মাটিতে। ব্যথায় শরীর ভরে উঠলো তার। নিশ্চয়ই ভেসচ গাছের রক্ষক এই শকুন। তাকে যে করেই হোক শকুনটাকে হারিয়ে ভেসচ গাছের পাতা নিয়ে যেতে হবে। একবার ভাবলো নিজের শক্তি দিয়ে বশিভূত করবে শকুনকে। তারপর ভাবলো এটা করা ঠিক হবে না আগে বুঝিয়ে বলি। তারপর যদি না দেয় তখন নিজের শক্তি ব্যবহার করবো। সাইর ব্যথা জড়ানো শরীর নিয়ে এগিয়ে গেলো শকুনের দিকে। শকুনটা তেড়ে আসতেই সে বলল„ —“হে ভেসচ গাছের রক্ষক আমার কথা শুনুন?”
শকুনটা থেমে গেলো। লম্বা সূচালো দুই ঠোঁট দিয়ে গগণ ফাটানো চিৎকার করল„ —“কূকূকূয়য়য়য়য়য়।”
সাইর শকুন ডাক শুনে দুই হাতে কান চেপে ধরলো। শকুন ঠোঁট নেড়ে বলল„ —“বলো কি বলতে চাও?”
সাইর প্রস্তুত হয়ে বলল„ —“আপনাকে না জেনেই প্রথমে কষ্ট দিয়েছি আমাকে মাফ করবেন। আমি ঐ ভেসচ গাছের পাতা নিতে এসেছি।”
শকুনটা মাথা দোলালো„ —“ঐ গাছের পাতা নিয়ে তুমি কি করবে?”
সাইর হাত জোড় করল„ —“আমি একটা মেয়েকে ভালোবাসি। আমার শত্রুতা তাকে আঘাত করেছে। তাকে বাঁচানোর জন্য আমার আপনার সাহায্য প্রয়োজন। আপনি যদি ঐ গাছের পাতা আমাকে দিতেন?”
শকুনটা নিচে বসলো„ —“তুমি শয়তানের অধিপতি। তোমাকে কিভাবে বিশ্বাস করবো? তুমি হয়তো মিথ্যে ভালোবাসার কথা বলছো?”
সাইর মাথা নত করলো„ —“আপনি আমার ভালোবাসার পরিক্ষা নিতে পারেন। এতে আমিও সন্দেহ মুক্ত থাকবো। আমি পরিক্ষা দিতে প্রস্তুত।”
সাইর চোখ-মুখ শক্ত করে সোজা দাঁড়ালো। শকুন বলল„ —“তোমাকে তিনটি পরিক্ষা দিতে হবে।”
—“আপনি বলুন আমি প্রস্তুত।”
শকুন সরু লম্বা ঠোঁট ফাঁক করে বলল„ —“তোমাকে একটা ধাঁধার উত্তর বলে আমার ঠোঁট দিয়ে পেটে প্রবেশ করতে হবে। আমার পেট থেকে আমার একটা শরিরের বিশেষ অংশ বের করতে হবে। সেটা অপরিবর্তিত যা বাইরের জগতের সাথে সাদৃশ্য। আবার আমার ধাঁধার উত্তর দিয়ে তোমাকে বাইরে আসতে হবে। এটাই হলো তোমার ভালোবাসার পরিক্ষা। তবে সময় দ্বিপ্রহর পর্যন্ত। এর এক চুল পরিমাণ সময়ও তুমি পাবে না। আর হ্যাঁ যদি এর মধ্যে আসতে না পারো তাহলে তোমাকে আজীবন আমার পেটেই থাকতে হবে।”
সাইর বড়সড় এক নিশ্বাস নিলো„ —“আমি প্রস্তুত।”
শকুন তার প্রথম ধাঁধা বলল„ —“একূল জোয়ার ঐ কূলে তোর কিনার জোয়ার ভাঁটা। দুপুর শেষে সূর্য ডুবিলে অন্যত্র লাগিলো হাঁটা। নাই বাড়ি‚ নাই ঘর সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হইয়াছি তুবি। আঁধারের আগেই জনসমাগমে খারায়া ফেলাই মূল-তুবি। বলো তো উত্তর কি?”
সাইর দ্বিধায় জর্জরিত হলো। সে বাইরের জগতের সাথে বেশি পরিচিত নয় যার কারণে এতকিছু সে জানে না। গালে হাত রেখে ভাবতে শুরু করলো উত্তর কি হতে পারে। কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলো„ —“যা-যা-ব-র।”
শকুন দৃঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো„ —“আমাকে বুঝিয়ে বলো?”
সাইর থতমত খেলো। সে যেভাবে বলেছে এটা তো আর শকুন সে বুঝিয়ে ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। সে বরাবরই আনাড়ি। আমতা আমতা করে বলল„ —“একূল হলো নদীর কূল আর ঐ কূল হলো নদীর অন্য প্রান্তের কূল। কিনার মানে ঘাট। আর এখানে ভাঁটা শব্দটি ব্যবহার হয়েছে ভীড় অথবা লোকজনদের বোঝানোর জন্য। তাহলে এই নদীর প্রান্তে হতে ঐ নদীর ঘাটে লোকজনের ভীড়। দুপুর শেষে সূর্য ডুবিলে মানে সন্ধ্যা হওয়ার আগ মুহুর্তে অন্যত্র মানে অন্য জায়গায় বা অন্য নদীর কুলে হাঁটতে শুরু করে। যা যা-যা-ব-রের দলেরা এটা করে। তাদের বাড়িও নেই ঘরও নেই বলতে গেলে তারা নিঃস্ব। আঁধারের আগেই জনসমাগমে খালাইয়া ফেলায় মূল-তুবি। এখানে আঁধার বলে রাতের আগেই বুঝিয়েছে আর জনসমাগমে মানে লোকজনের সামনে খারাইয়া ফেলাই দিয়ে লাঠি-সোঁটার কথা বলা হয়েছে যা খারা করে পুঁতে রাখা হয় আর এখানে মূল-তুবি হলো মূল বিছানা কিন্তু এখানে তাবু বা খুপরি বুঝা হয়েছে। যা-যা-বরেরা নদীর এপ্রান্তে ওপ্রান্তে বসিয়ে বাস করে।”
—“আমার ভেতরে প্রবেশ করো।”
শকুন তার ঠোঁট মাটির সাথে লাগিয়ে দিয়ে লম্বা ঠোঁটটা ফারাক করলো। একটা সাদা জ্যোতি এসে সাইরের শরীরে সাথে লাগতেই সে ছোট হয়ে শকুনের ঠোঁট দিয়ে তার পেটে প্রবেশ করলো। শকুনের গল্ডদেশে একটাই সূচালো হাড় ছিল যে কাউকে লাগলেই মুহুর্তেই হৃদপিন্ড ভেদ করবে। শুঁকনো ঢোক গিলল সাইর। সামনে তাকাতেই একটা সাপ চোঁখে পরলো। বিশাল লম্বা সাপ। সবুজ রঙের শীরকাটা শরীর। চোখ দুটো নীল রঙের। দুই পাছে দুইটা বিষাক্ত দাঁত দেখা যাচ্ছে। ধপ করে মাটিতে পরে গেলো সাইর। ব্যথাগুলো আবার চেতে উঠলো নিমিষেই। সাইর আশে-পাশে তাকালো। সে তো শকুনের পেটের ভেতরে ঢুকেছিল তবে এত গাছ-পালা‚ সাপ-চিল‚ ময়ূর কোথা থেকে এলো। আশে-পাশে বন-জঙ্গলের মতো সব পশুপাখি বাস করছে শকুনের পেটে। চোখ বন্ধ করে কিছু বিরবির করলো সাইর কিছুক্ষণ পরে চোখ খুলে বিচলিত হলো সে। ভয়ার্ত কন্ঠে বলল„ —“আমার শক্তি কাজ করছে না কেন?”
—“তোমার ভালোবাসা শয়তানের শক্তি নয়। তোমার ভালোবাসাকে বাঁচাতে হলে মনের শক্তি দিয়ে জয়ী হতে হবে।”
সাইর পেছনে তাকালো। একটা গাছ কথা বলছে তার সাথে। সে আবারও চোখ বন্ধ করে নিজের শক্তিতে আহ্বান জানালো কিন্তু শক্তিরা এলো না। সে মহা বিপদে পরে গেলো। কিভাবে এখন এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে সে। চারপাশ তাকালো। সাপটা অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। গাছ-পালার ডাল-পালা গুলো অসম্ভব রকমের নড়ছে। চিলগুলো মাথার উপরে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ডাকছে। ময়ূর নিজের পেখম তুলে এদিক-সেদিক দেখছে। কি করবে এখন সে এখানে শকুনের শরীরের কোনো অংশ দেখা যাচ্ছে না তাহলে সে কি নিয়ে ফিরবে। হাতে সময়ও খুব কম। ধপ করে মাটিতে বসে পরলো সাইর৷ তুলির মায়াবী মুখটা বড্ড মনে পরছে তার„ —“আমি তো সত্যি তুলির সাথে জড়িয়ে গেছি আষ্টেপৃষ্টে। যেখান থেকে চাইলেও বেরিয়ে আসতে পারবো না। তুলিকে আগে বাঁচাতে হবে নয়তো আমিও আমার ভালোবাসা পাবো না। কিন্তু তার আগে তো আমাকে এখান থেকে বের হতে হবে। কিন্তু বের হবো কিভাবে?”
তখনই একটা গাছ কথা বলল„—“তোমার কাছে সময় খুব কম। যা করবে ভেবে চিন্তে করিও।”
সাইর জঙ্গলের এদিকে সেদিকে খুঁজতে লাগলো এমন কি অংশ হতে পারে যা বাইরের জগতের সাথে সাদৃশ্য। চারপাশ খুঁজেও কোনো কিছুই পেলো না সাইর। ওদূরে একটা নদীর দেখা পেলো সে। বড্ড পিপাসা পেয়েছে তার। একটু পানিতে গলা ভিজলে মন্দ নয়। সে ধীর পায়ে হেঁটে গেলো নদীর দিকে। স্বচ্ছ নীল পানি নদীর কিনারা দিয়ে বয়ে চলছে। দুই হাতের চৌলে পানিতে নিতেই যেন ভ্রুম দেখলো সাইর। সে স্পষ্ট নদীর পানি নাড়ছে কিন্তু পানি তার হাতে লাগছে না। বিস্ময়ে চারপাশ তাকালো সাইর। পাশে আমের গাছটা দেখে দ্রুত এগিয়ে গেলো গাছের নিকট। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই বৃক্ষ ভেদ করে অন্য প্রান্তে হাত বেরিয়ে এলো। সাইর দুই হাতের সাহায্যে চোখে ঘুষলো। কোথাও ভুল দেখছে না তো? এভাবে কয়েকটা গাছ ছুঁয়ে দেখলো সে। আসলেই গাছগুলো মায়াবী। এরা জীবন্ত নয়। সাইর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জঙ্গলটা দেখলো। সাপটার কাছে গিয়ে থেমে গেলো সে। সাপের ফনা দেখে থেমে গেলো সে। হাত বারিয়ে ছুঁয়ে দিলো সাপের লেজ। ঠিক তাই এটাও মায়াবী। হঠাৎই কিছু একটা হাতে ঠেকলো সাইরের একটা শেঁকড়। শেঁকড়টা হাতে নিতেই একটা সিঁড়ি তৈরি হলো সাপের মাথা পর্যন্ত। সাইর সিঁড়ি বেয়ে উঠে পরলো সাপের মাথা পর্যন্ত। শেষ প্রান্তে সাপের মাথায় হাত দিতেই একটা মতি জ্বলজ্বল করলো সাইর মতিটা হাতে নিতেই শকুনের পেট স্বাভাবিক হলো। চারপাশে নাড়ী-ভুড়ি দেখা গেলো। সাইর খুশি হয়ে মতিটাকে চুমু খেলো। হাসতে হাসতে উচ্চ স্বরে বলল„ —“আমি পেরেছি। আমি পেরেছি।”
একটা কন্ঠ ভেসে এলো„ —“তোমার কাছে আর বেশি সময় নেই। এবার আমার ধাঁধার উত্তর দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসো।”
সাইর খুশি মনে জিজ্ঞেস করল„ —“বলুন আপনারা পরবর্তী ধাঁধা।”
—“কলঙ্কের কুলসিত রমনী‚ উঠিয়ে আঁধারে। কলঙ্ক নিয়া ঘুরে সবারই মাঝে। কখনো অর্ধ‚ কখনো বা পূর্ণ‚ কখনো আবার গোলকধাঁধার গোলাকার। প্রতিমাসে ৮দশা বদলিয়েছে বহুবার।”
সাইর চুপ রইলো। কি হতে পারে এর উত্তর। উত্তেজনা বসতো মাথা কাজ করছে না তার। তাহলে কি সে আর তুলির কাছে পৌঁছাতে পারবে না? মন খারাপেরা হানা দিলো হৃদয়ে। চুপ করে বসে রইলো সে।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। আজকের পর্বটা কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। আর হ্যাঁ এই পর্বে লেখিকার মেইন পেইজে 2k ফোলোয়ার্স 1k রিয়েক্ট আর 1k কমেন্ট না হলে পরের পর্ব দিবো না। এটাই আমার ফাইনাল কথা। গল্প তো 21k লোকজন পরেন তাহলে রিয়েক্ট‚ কমেন্ট করেন না কেন? আমার লিখতে বুঝি কষ্ট হয় না? আর আপনারা যারা আমার সাথে আছেন তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

