#চূর্ণচূড়ায়_চাঁদের_পাহাড়
লেখনিতে— #সৈয়দ_মারিয়াহ্_হামিদ
৯.
রাতের শেষ প্রহর। চূর্ণচূড়ায় কুয়াশা জমেছে পাতলা চাদরের মতো। আচমকা একটা মেয়ে চিৎকার শুনতে পেলো তুলি„ —“আমি মরিনি।”
ধরফরিয়ে জেগে উঠলো তুলি। বুক ধড়ফড় করছে তার। আশে-পাশে তাকালো নাহ কেউ নেই। স্বপ্ন দেখেছিল নিশ্চয়ই। তুলি উঠে বসলো। পাশে সাইর ঘুমিয়ে আছে। মধু গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে মাটিতে। ধীরে ধীরে উঠে বাইরে এলো তুলি। ভোরের আজান দূর থেকে ভেসে আসছে। সে চোখ বন্ধ করলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো„ —“আল্লাহ‚ যদি সত্যিই তুমি আমার রব হও‚ তাহলে আমাকে দুর্বল করো না।”
তার পেছন থেকে কণ্ঠ ভেসে এলো„ —“দুর্বল তুমি নও।”
তুলি ঘুরে দাঁড়ালো। সাইর পিটিপিটি চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তার চোখে ঘুম নেই। যেন অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিল তুলির দিকে।
তুলির শীতল কন্ঠে শুধালো„ —“আমাকে নজরদারি করা আপনার অভ্যাস?”
সাইর কিছুক্ষণ চুপ রইল। তারপর বললো„ —“তুমি পালাতে চাইবে আমি জানতাম। তাই নজরদারি করা আমার জন্য শ্রেয়।”
তুলি ক্ষিপ্ত হলো„ —“যদি জানেনই আমি পালাবো তাহলে আটকালেন কেন শুনি?”
তুলি এগিয়ে এলো এক কদম। রাগান্বিত কন্ঠে বলল„ —“আমি কি আপনার বন্দিনী?”
সাইরের চোখ নামালো„ —“তুমি বিপদে।”
তুলি ভ্রু-কুঁচকালো„ —“বিপদ কে?”
পরপরই প্রশ্ন ছুড়ে দিলো„ —“আপনার বাবা? এই চূড়া? নাকি আপনি? আমার জন্য তো আপনি নিজেই বড় বিপদ তাই নয় কি?”
শব্দগুলো সোজা গিয়ে আঘাত করলো সাইরের বুক পাঁজরে। সাইর নিচু স্বরে বললো„ —“আমার বাবা তোমাকে আবার আঘাত করবে।”
তুলি তাকালো সাইরের দিকে„ —“আর আপনি?”
সাইর চুপ রইলো। তুলি সবসময় তাকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু তার দূরত্ব সহ্য হচ্ছে না। তার চাঁদ চিহ্নটা বড্ড টানছে তাকে। মিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে বুক পিঞ্জরে। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে সুখের সাগরে।
জমিদার বাড়ির বিশাল উঠোনে আজ নানান আয়োজনে নানান সাজে সজ্জিত হয়েছে। ভোরের আলো ফোটার আগেই বাল্বের আলোয় আলোকিত হয়েছে পুরো বাড়ি। গত রাতের আঙিনা, উঠান, বারান্দার আলপনাগুলো এখনো শুকোয়নি পুরোপুরি। সাদা চালের গুঁড়োর নকশায় সকালের রোদ পড়তেই উঠোনটা যেন নতুন করে সেজে উঠলে। বাতাসে মিশে আছে স্নিগ্ধ ফুলের সুবাস। গাঁদা ফুলের গন্ধের চারদিকটা মো-মো করছে। মাটির ভেজা গন্ধে পরিবেশটা মুখরিত হয়েছে। জমিদার মুমিনুর ভোরেই উঠেছেন ঘুম থেকে। গত রাতের রাগ এখনো কমেনি তার। ঘুমন্ত বাড়িটা ধীরে ধীরে জেগে উঠলো। রান্নাঘরের পাশে বড় চুলায় বড় বড় হাঁড়িতে কত-শত রান্না উঠেছে আজ। গ্রামের প্রতিটি মানুষ বুড়ো হতে ছোকড়া পর্যন্ত আজকে জমিদার বাড়িতে আসবে জমিদার বাড়ির বড় ছেলে-বউকে দেখতে।
বাড়ির ভেতরে বেঞ্চে বসে আছে সহিনী। কালকের লাল বেনারসির বদলে আজ হালকা গোলাপি শাড়ি পরিধান করেছে সে। মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়েছে। খুব অস্বস্তি হচ্ছে না তার। কালকের দীর্ঘ আয়োজন‚ অচেনা মানুষ‚ আর নতুন সংসার। সব মিলিয়ে মনটা ক্লান্ত ছিল বেশ। কিন্তু আজ যেন সবকিছু একটু শান্ত লাগছে তার কাছে।
বড় চাচী এসে কপালে আলতো করে হাত রাখলেন„ —“কেমন আছো মা?”
সহিনী সালাম দিলো„ —“আস্ সালামু আলাইকুম? আমি ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?”
—“ভালো।”
সাজাদ উঠোনে দাঁড়িয়ে গ্রামের কয়েকজন বয়োজ্যেষ্ঠের সঙ্গে কথা বলছে। তার মুখে দায়িত্বের ছাপ স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। কাল পর্যন্ত সে ছিল বাড়ির বড় ছেলে। আজ সে একজন স্বামী‚ পরিবারের নতুন কর্তা। কথাবার্তায় একটু স্থিরতা এসেছে তার মাঝে। হয়তো আগে নিজেকে স্বাভাবিক ভাবে সবার কাছে উপস্থিত করতো এজন্যই। তাদের আলোচনার ফাকেই মুনশি কাকা হেসে বললেন„ —“এখন থেকে কিন্তু শুধু নিজের কথা ভাবলে চলবে না বাবা। সংসার মানে ভাগাভাগি।”
সাজাদ মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। মাথা তুলে বাড়ির ভেতরে তাকালো। সহিনী বেঞ্চে বসে আছে। কিছুটা অস্তিত্ব হলো তার। বড়লোক বাবার একমাত্র মেয়ে কিনা বিয়ের পরের দিনই এই গরিব পরিবারটায় মানিয়ে নিচ্ছে।
গ্রামের সব লোকেরা বাড়ির সামনে ভীড় জমিয়েছে। বউ দেখতে সবাই হাজির হয়েছে জমিদার বাড়ির সামনে। জমিদার বাবুর অনুমতি পেয়ে বাড়ির মেয়েরা সহিনীকে উঠোনে নিয়ে এলো। সাজাদ আর সহিনীকে পাশাপাশি বসিয়ে রাখা হলো। গ্রামের প্রবীণ নারীরা এসে দোয়া করলো„ —“আল্লাহ তোমাদের সুখে রাখুক।”
তাদের মাঝখানে কেউ বলল„ —“ঘর ভরে উঠুক হাসিতে।”
সহিনী সবার পা ছুঁয়ে সালাম করলো। বিনয়ের ভেতরে একটা দৃঢ়তা আছে মেয়েটার। সে শুধু কারও ঘরের বউ হয়ে আসেনি এখানে। তার রয়েছে অনেক দায়িত্ব‚ কর্তব্য আর অধিকার।
রান্নাঘরে তখন জমে উঠেছে ব্যস্ততা। পোলাও, কোরমা, পায়েশ আরও কত কি অতিথিদের জন্য রান্না করা হয়েছে। গ্রামের সকল লোকদের খাওয়ানোর জন্য আবারও ছোটখাটো আয়োজন করেছে জমিদার বাবু। যদিও বিয়ে শেষ, তবুও গ্রামের রীতি মানতেই হবে। নবদম্পতির দ্বিতীয় দিনেও খাওয়া-দাওয়া চলবে।
সহিনী উঠে দাড়ালো। দূরত্ব বজায় রাখলো সাজাদের থেকে। সবাই কত কত আদুরে গ্রহণ করছে সহিনীকে। সাজাদ ধীরে ধীরে সহিনীর পাশে এসে দাঁড়ালো„ —“ক্লান্ত লাগছে?”
সহিনী মাথা নাড়লো„ —“একটু ক্লান্ত তবে এখানে ভালো লাগছে।”
“ভয় লাগছে না তো?”
সহিনী একটু ভেবে বলল„ —“ভয় তখনই লাগে‚ যখন মানুষ একা থাকে। এখানে তো সবাই আছে। আর তুমিও।”
সাজাদ হাসলো সাথে সহিনীও। তাদের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল উঠোনের কোলাহলে। লোকজনদের খাবারের বন্দবস্ত করা হলো। তারা দুজন বাড়ির ভেতরে চলে গেলো।
সকাল থেকে কিছুই খায়নি তুলি। সে সাইরকে বলে দিয়েছে তার পাপের তরে জাদুর মতো কুফরির কোনো অন্ন মুখে তুলবে না সে। সকাল থেকে খুপরিতে বসে আছে মধুর সাথে। চৌকির নিচ থেকে দোয়াত-কালি নিয়ে শাড়ির আঁচল ছিঁড়ল সে। আঁচলে দোয়াত-কালি দিয়ে কিছু লিখলো৷ তারপর সেটা মধুর গলায় বেঁধে দিলো। তারপর বলল„ —“তুই গিয়ে এটা বাড়িতে রেখে আসবি। আজকে মা বাড়ি ফিরতে চেয়েছিল হয়তো এসেও পরেছে তুই গিয়ে এটা মাকে দিস।”
মধু কান নাড়িয়ে সম্মতি দিলো„ —“আচ্ছা।”
তুলি হাসলো। কেননা সকালে সাইর বলেছে যে মধু কথা বলতে পারছে। তুলি খুব খুশি হয়েছে। সকাল থেকে এখন অব্দি খুপরির কপাট লাগিয়ে মধুর সাথেই বক বক করেছে সে। মধু চলে গেলো খুপরি থেকে বেরিয়ে। তুলিও বেরিয়ে এলো পিছু পিছু। নাহ এখানে সাইর নেই। কোথাও নেই সে। মধু দৌড় দিলো চূড়া ছেড়ে। সোনালি রঙের মাকড়সার জালটা এখনো জ্বলজ্বল করছে আগুনের ন্যায়। তুলি একবার হাত লাগাতেই পেছনে ছিটকে সরে গেলো। অথচ মধু নিমিষেই সেই জালটাকে পেরিয়ে বাইরে গেলো। তুলি একা বটগাছটার পাশে দাড়িয়ে মধুকে যেতে দেখে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো।
পেছন থেকে ধীরে পায়ের শব্দ হলো„ —“তুমি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছো কেন?”
তুলি ঘুরলো না। অপর দিকে তাকিয়ে বলল„ —“কারণ আমি চাই।”
সাইর এগিয়ে এলো। রাগে তার চোখ লালচে আভা ধারণ করেছে„ —“তুমি জানো আমি কেন তোমাকে আটকে রেখেছি?”
তুলি এবার ঘুরে দাঁড়ালো„ —“আমি বন্দিনী নই। তবুও আপনি আমাকে বন্দি বানিয়েছেন। বলী দিবেন তাহলে দেরি করছেন কেন? নিন আপনার মনষ্কামনা পূর্ণ করুন?”
সাইর এক ধাপ এগিয়ে এলো„ —“আমি যতবার তোমাকে দূরে সরাতে চাই‚ ততবার তুমি আরও গভীরে ঢুকে যাও। তুমি বুঝো না তুলি‚ আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
তুলি হাসলো উচ্চ স্বরে হাসলো। যেনো সে ভুত দেখেছে। সাইর বিস্মিত হলো। তুলি কোনো কথা বলছে না শুধু হাসছে। তুলির চোখে কোনো বিস্ময় নেই‚ নেই কোনো ভয়। সে কি জানে না এভাবে হাসতে হলে সাইরের অনুমতি নিতে হবে? সে জানে না সাইর উচ্চ হাসি ঘৃণা করে? রাগে চোয়ালদ্বয় শক্ত করলো সাইর। তুলির গলা চেপে ধরে কটমটিয়ে বলল„ —“কি ভেবেছো নিজেকে? আমার আবেগ নিয়ে খেলবে তুমি? আমার ভালোবাসা গ্রহণ করবে না?”
তুলি তাচ্ছিল্য করলো„ —“ভালোবাসা?”
পরপরই একদলা থুতু মারল সাইরের মুখে। অতঃপর বলল„ —“ভালোবাসা না ছাই। দূরে সরুন আমার কাছ থেকে। ঘেন্না হয় আপনাকে দেখলে। ঘেন্না হয় আমার।”
সাইর রেগে তুলির গলা ছেড়ে তাকে কাছে টেনে নিলো। একহাতে চুলগুলো মুষ্টিবদ্ধ করলো‚ অন্য হাতে কোমড় চেপে নিজের কাছে আবদ্ধ করলো। তুলির ঘাড়ের কাছে থুঁতনি রাখলো। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল„ —“আমাকে এতো রাগাইও না। মেরে ফেলবো একদম।”
তুলি ধাক্কার মেরে দূরে সরে দিলো সাইরকে। সাইর বাম হাতে চোখ-মুখের থুতুগুলো মুছে ফেললো। তুলি কটমটিয়ে তাকাতেই সাইর আবারও তার কাছে এলো। তুলি বিরক্ত হলো খুব। সাইর তুলির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো খুপরিতে। খুপরির ভেতরে এনে চুলা আর কয়েকটা ব্যাগ দেখিয়ে দিয়ে বলল„ —“নাও। ব্যাগ বাজার আছে যা খুশি রান্না করে খাও।”
তুলি দুই হাত বুকে গুঁজলো„ —“আমার খিদে নেই।”
সাইর অকপটে বলল„ —“কিন্তু আমার খিদে আছে। রান্না করো খেতে হবে।”
তুলি অন্য দিকে মুখ ঘুরালো„ —“আপনার খিদে পেয়েছে? ব্যাপারটা হাস্যকর না?”
সাইর কিছুই বলল না। রাগান্বিত চোখে তাকিয়ে রইলো তুলির পানে। তুলি স্পষ্ট বর্ণনা দিলো„ —“আপনার খিদে পেয়েছে আপনি নিজে রান্না করে খান। আমি কারও খিদে মেটাতে পারবো না।”
সাইর কটমটিয়ে বলল„ —“আমার খিদে তোমাকে খেলেই মিটবে। তবে তুমি যে শুঁটকি তাকে পেট ভরবে না। যতদিন আমার কাছে থাকছে মানে আমি তোমাকে বলী না দিচ্ছি ততদিন খেয়ে একটু মোটা হও। তাহলে তোমাকে খেতে আমার বেশ মজা লাগবে।”
—“খেতে হয় খান। বাঁচিয়ে রেখেছেন কেন? শেষে তত মেরে খেয়েই নিবেন? এত দয়া দেখানোর কি আছে?”
সাইর ঝটপট তুলিকে পেছন থেকে জড়িয়ে নিলো বুকে। গলায় আলতো কামড় বসিয়ে দিতেই তুলি চিৎকার করল„ —“আহহহহহ। ছাড়ুন বলছি। ছেড়ে দিন।”
সাইর তুলির গলা থেকে মুখ তুললো। এক হাত উঁচিয়ে কিছু ছুঁড়ে মারতেই মায়াবী আয়নার প্রকট হলো। তুলির সম্মুখে এলো। তুলি দৃষ্টি রাখতেই আঁতকে উঠল। গলায় যেখানে সাইর কামড় দিয়েছে সেই জায়গায় তার দাঁতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। গলার অংশটা লাল হয়ে আছে। তুলি গলায় হাত বুলালো। সাইর স্মিত হেসে বলল„ —“এই টুকুতে এতটা কষ্ট পাচ্ছো? তাহলে আমার খাদ্য হবে কিভাবে তুমি? বাকিদের তো বশীভূত করে মেরে ফেলেছি তবে তোমাকে মারছো তোমার ইচ্ছেই। এই যে বারবার বলো না‚ মেরে ফেলুন এখানেই তো আছি। শয়তননের কসম এমন কষ্ট দেবো তোমাকে যে তুমি নিজেই নিজের গলায় ছুড়ি ধরবে।”
ছেড়ে দিলো তুলিকে। সামনে ধাক্কা দিতেই চুলার সামনে গেলো তুলি। চোখ পাকিয়ে ইশারা করলো সাইর। অতঃপর বলল„ —“রান্না করো আমি এখানেই আছি খিদে পেয়েছে খুব।”
তুলি রাগে কটমটিয়ে ব্যাগ থেকে বাজারগুলো বের করলো। লাল শাঁক‚ পালঙ্ক শাঁক‚ আর কিছু আলু। আর একটা ব্যাগে কিছু চাল। তুলি এদিকে সেদিকে তাকালো কিন্তু কোথাও পাতিল নেই। সে রান্না করবে তো করবে কোথায়। সামনে তাকাতেই দেখলো সাইর চৌকির বারে দুই হাতে মাথা রেখে চোখ বুঁজে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। তুলি রেগেমেগে লাল শাঁকের তা-র টা ছুঁড়ে মারলো সাইরের মুখে। সাইর ধরফরিয়ে উঠে বসলো। নিজের কাছে লাল শাঁকের তা-র দেখে চোখ গরম করে তুলির দিকে তাকালো। সে কিছু বলতে যাবে তখনই তুলি বলল„ —“এসব কি হ্যাঁ? রান্না করবো পাতিল কই? আপনাকে এগুলো খাইয়ে কি চুলার উপরে তুলে আগুন লাগিয়ে দিবো?”
সাইর হাসলো। তুলি আরও রেগে গেলো কিছু বলতে যাবে তখনই সাইর আঙুল দিয়ে চুপ করে দিলো তুলিকে। হাত শূন্যে তুলে গোল গোল ঘুরালো। সামনে পাতিলসহ একটা বস্তা বেরিয়ে এলো। সাইর আদেশ করলো„ —“এখন আর আমাকে ডাকবে না। পাতিল দিয়ে রান্না সেরে নাও আর যা যা লাগবে তা ঐ বস্তার ভেতর থেকে নিলো। আমি ঘুমালাম। সারা রাত ঘুমাতে দাও নি তুমি।”
তুলি বাতিলটা রেখে বস্তাটা এদিক-ওদিক করে ঝাড়া দিলো। কিন্তু কিছুই বের হলো না বস্তা থেকে। সে বস্তাটা ফেলে দিয়ে বলল„ —“ছাই আছে এখানে। কিছুই নেই। এটাও আপনার পেটের মতো খালি।”
সাইর কটু দৃষ্টিতে তাকালো তুলির দিকে। তুলি ভয় পেয়ে গেলো। সাইরের চোখগুলো মুহুর্তেই লাল আভা ধারণ করলো। তুলি ভয়ে খুপরি ছেড়ে বাইরে গেলো। বাইরে এসে দেখলো সূর্য প্রায় ডুবন্ত ডুবুরি হয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু মধু এখনো তার কাছে ফিরলো না। চিন্তিত মুখে আবারও খুপরিতে উঁকি দিলো তুলি। দেখলো সাইর নিজে থেকে রান্না করছে। কিন্তু আশ্চর্য এতো বাসন সে পেলো কোথায়। কান পেতে দিলো তুলি।
সাইর একটা গামলা থেকে পানি নিয়ে চাল ধুচ্ছে কিন্তু গামলার পানি যেমন টুই-টম্বর ঠিক তেমনি থাকছে। সাই এদিকে সেদিকে তাকালো। কড়াই নেই সে শাঁক ভাঁজবে কিভাবে। বস্তার মুখ চেপে ধরে বলল„ —“বস্তা একটা কড়াই এনে দাও।”
কিছুক্ষণ পরে বস্তার ভেতরে হাত রেখে একটা কড়াই বের করলো সাইর। তুলি পা টিপে টিপে খুপরির ভেতরে গেলো। চৌকিতে ধপাস করে বসলো। সাইর তার দিকে ফিরেও তাকালো না। তুলি সাইরের নজর কারাতে তার সম্মুখে এসে দাড়ালো। তবুও সাইর কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। তুলি রেগে গিয়ে সাইরের সম্মুখে বসলো। সাইর অন্যদিকে মুখ ঘুরালো। তুলি রাগ বসত সাইরের থুতনি চেপে ধরে তার দিকে ফেরালো। দাঁতে দাঁত চেপে বলল„ —“আমাকে এরিয়ে যাচ্ছেন আপনি?”
সাইর কিছু বলল না। সে তুলির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে রান্নায় ব্যস্ত হলো। তুলি এবার চুলার দিকে তাকালো। লাল শাঁক খুনতি দিয়ে কড়াইয়ে করে ভাঁজছে সাইর। তুলি খপ করে খুনতিটা কেরে নিলো সাইরের থেকে। সাইর তুলির দিকে তাকাতেই তুলি বলল„ —“মধু সেই সকালে বাইরে গেছে এখনো ফিরে নি গিয়ে নিয়ে আসুন মধুকে। আমি রান্না করছি।”
সাইর কিছুই বলল না। উঠে চলে গেলো খুপরি ছেড়ে। তুলিও সাইরের পেছন পেছন বের হলো। দূরে যেতে যেতে সাইরের আশেপাশে ধুলো উড়তে লাগলো। তুলি ধুলোর অস্বস্তিতে কিছুই দেখতে পেলো না। চোখ-মুখ হাত দিয়ে ঢেকে রাখলো। কিছুক্ষণ যেতেই সবকিছু ঠিক হলো সামনে তাকাতেই দেখলো সাইর নেই। সামনের মায়াবী জালে হাত রাখতেই আবারও ছিটকে দূরে সরে গেলো সে। খুব মন খারাপ হলো তার। এলোমেলো পায়ে খুপরিতে এসে বসলো। চুলায় লাল শাঁক তেমনই আছে ইচ্ছে করছে না কিছু করতে তার। সেই কাল সকালে কিছু খেয়েছে আর খায় নি। পেটটাও তার অবাধ্য হয়েছে খুব। শুধু খাই খাই করতে থাকে। উঠে গিয়ে চুলায় বসলো সে। রান্না তো করতে হবে। সে না খেলেও তো সাইরকে বলেছে রান্না করে রাখবে।
জঙ্গলে এসে মধুর প্রতিবিম্ব তৈরি করলো সাইর। তুলির কর্মকাণ্ড দেখে রাগ হলো খুব। মধু কোথায় কোথায় গিয়েছে সবকিছু এক পলকে দেখে নিলো সাইর। পরপরই রওনা হলো তুলিদের বাড়ির দিকে।
বেড়া ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তুলির মা ছুটে এলো। হন্তদন্ত হয়ে বলল„ —“কে তুমি আমার তুলি কোথায় তুলি? তুলি?”
তুলি বলে ডাকতে ডাকতে বাইরে গেলো মাধুরী। পেছনে পেছনে তুলির বাবা তারেক রহমান ছুটে বেরিয়ে গেলেন। দ্রুত মাধুরীকে ধরে বাড়িতে নিয়ে এলেন। বারান্দার উঠোনে বসিয়ে রেখে সাইরের দিকে আসলো। চিনতে না পেরে প্রশ্ন করল„ —“কে তুমি বাবা?”
সাইর প্রসঙ্গ পাল্টালো„ —“ওনার কি হয়েছে? ওনি এমন করছে কেন?”
তারেক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল„ —“আজ থেকে গত ২০ দিন আগে আমাদের মেয়ে মারা গিয়েছে আর আজকে তারই পোষা ছাগল একটা চিরকুট এনেছে যেখানে লিখা আছে আমাদের মেয়ে বেঁচে আছে। একথা শুনে আর স্ত্রী আরও পাগল হয়েছে।”
তারেক ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে সাইরের দিকে। সাইর অকপটে প্রশ্ন করল„ —“কিভাবে মারা গেছে?”
তারেক চোখ মুখছো। সাইর ইতস্তত হলো„ —“আসলে আপনাদের মেয়ে কিভাবে মারা গেছে আপনারা জানেন কি?”
মাধুরী ছুটে এলো সাইরের কাছে। বলল„ —“আমার মেয়ে মারা যায় নি সে বেঁচে আছে। আমার মেয়ে বেঁচে আছে। আমার মেয়ে বেঁচে আছে।”
তারেক উদগ্রীব হলো„ —“শান্ত হয় মাধূুরী। আমাদের মেয়ে বেঁচে আছে। তুমি শান্ত হও।”
সাইরের বড্ড মায়া হলো মাধুরীকে দেখে। সে মাধুরীকে বুঝিয়ে উঠোনে নিয়ে গিয়ে বসালো। ধীর কন্ঠে শুধালো„ —“আপনি বলুন আমি আপনার মেয়েকে আপনার কাছে এনে দেবো।”
মাধুরী খুব খুশি হলো। পরপরই বলল„ —“তুমি সত্যি এনে দেবে আমার মেয়েকে?”
সাইর সম্মতি দিলো„ —“হুম এনে দিবো। এখন আপনি বলুন তো আপনি ঠিক কোথা থেকে আপনার মেয়েকে হারিয়েছেন?”
মাধুরী সামনে তাকালো। তার মনে পরছে না তেমন কিছু। সব যেন চোখের সামনে ঘোলাটে হয়ে গেলো। তারেক বলল„ —“আমার স্ত্রী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। গত ২০ দিন আগেই।”
সাইর উঠে চলে গেলো বাড়ি থেকে। মধুর খোঁজে পারুলের বাড়ি গেলো। উঠোনের বারান্দায় মধুকে বেঁধে রেখে তারা। সামনে এক কর্পা তাজা লকলকা ঘাস রাখা তবুও মধু কিছুই খায় নি। সাইর ডাকলো„ —“বাড়িতে কেউ আছেন?”
পারুল নারকি হাতে বেরিয়ে এলো হেঁসেল ঘর থেকে। নারকি উঁচিয়ে বলল„ —“আমি তোমার ছাগলকে দিতে পারবো না বাপু। তুমি টাকা দেও আগে।”
সাইরের মনে পরলো পারুলের এখনো বাকি টাকা পরিশোধ করা হয় নি। কিন্তু এখন তো তার কাছে টাকা নেই। জাদু-শক্তি সবকিছু দিতে পারলেও টাকা টা আর দিতে পারবে না। সাইর তাকালো পারুলের দিকে। পারুল রেগে আছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। সাইর বলল„ —“আপনি মধুকে রাখুন আমি টাকা অনিচ্ছি।”
চলে গেলো সাইর। পারুল রেগেমেগে হেঁসেল ঘরে গেলো রান্না করতে। সাইর জঙ্গল পেরিয়ে জমিদার বাড়িতে গেলো। বাগানের পেছন দিয়ে বাঁশের সাহায্যে দোতলায় নিজের ঘরে গেলো। একজন লোক সাইরকে চোরের মতো নিজের ঘরে যেতে দেখে জমিদার বাবুকে খবর দিলো। জমিদার রেগেমেগে সাইরের ঘরের দরজায় গেলো। দরজায় জোড়ে জোড়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগলো„ —“সাইর। সাইর দরজা খোলো। আমি জানি তুমি ঘরে আছো? দরজা খোলো বলছি?”
অনেক ডাকাডাকি করলো জমিদার কিন্তু সাইর কোনো কথা বলল না। জমিদার জোড়ে ধাক্কা দিলো দরজায়। কপাট দু’টো খুলে গেলো সহসাই। জমিদার ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। এদিকে সেদিকে তাকিয়ে সাইরকে খুঁজতে লাগলো কিন্তু সাইর কোথাও নেই। জালানাও ভেতর থেকেই বন্ধ হয়ে আছে। অন্ধকার ঘরটায় ভালোভাবে তাকাতেই একটা অবয়ব চোখে পরলো জমিদার বাবুর। সে হেসে বলল„ —“পিতার বিদ্যা শিখে পিতার সাথেই চালাকি? আমি দেখবো তুমি এবার ঐ মেয়ের কাছে কিভাবে যাও?”
আলমারির থাঁক থেকে লঙ্কার গুড়া বের করে দ্রুত বাইরে গেলো জমিদার। দরজা লাগিয়ে বিরবির করে কিছু পড়তে পড়তে লঙ্কার গুড়া ছিটিয়ে দিলো দরজার বাইরে। সাইর নিজের রূপ ধারণ করেছে। তার বাবা তাকে দেখে ফেলেছে এখন যে করেই হোক তাকে এখান থেকে পালাতে হবে। ট্রাঙ্ক থেকে টাকা বের করে জালানার কাছে গেলো সাইর। জালানায় হাত দিতেই ছিটকে দূরে সরে গেলো সে। হাতে ফোস্কা পরেছে তার। জমিদার বাইরে থেকে হেসে উঠলো„ —“চোরের উপরে ডাকাতি। এবার নিজের চিন্তা কর তুমি সাইর। নিজেকে বাঁচাতে পারবে তুমি?”
সাইর চেঁচিয়ে উঠলো„ —“বাবা যেতে নেও আমাকে।”
জমিদার উচ্চ স্বরে হাসলো„ —“আমি তোমার শক্তির পরিক্ষা নিবো সাইর। মনে কর এখান থেকেই শুরু। এবার ঐ মেয়ের পালা।”
সাইর দরজায় টোকা দিতে দিতে চিৎকার করল„ —“দরজা খোলো বাবা। তুমি তুলির কিচ্ছু করবে না। আমাকে যেতে দাও এখান থেকে। তুমি তুলির কাছে যেও না।”
জমিদার সাইরের কোনো কথা শুনলো না। বেরিয়ে পরলো বাড়ি থেকে।
মাগরিবের আযান পেরিয়েছে। রান্না করে বসে আছে তুলি। সেই যে সাইর চলে গেলো এখান থেকে আর ফিরলো না। আনমনে বসে রইলো তুলি। হঠাৎই একটা ছায়া দেখতে পেলো সে। এদিক থেকে ওদিকে সরাৎ করে চলে গেলো। ভয় পেলো তুলি। ভয়ে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো। কিছুক্ষণ পরেই আবারও ছায়াটা এদিক থেকে ওদিকে গেলো। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল তুলি„ —“এটা কি আপনি?”
কোনো উত্তর এলো না। তুলি ছায়াটাকে সাইর মনে করলো। এক-পা দু-পা করে খুপরি ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো তুলি। কিন্তু কোথাও কেউ নেই। বার কয়েক ডেকেও কাউকে পেলো না তুলি। হঠাৎই মনে হলো তার পেছন দিয়ে কেউ চলে গেলো। তড়িৎ গতিতে পেছনে ফিরলো তুলি। হঠাৎই একটা কালো নেকড়ের হাত এসে তুলির গলা চেপে ধরলো। তুলি তার সর্বত্র দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু পেলো না। নিস্তেজ হয়ে পরলো তার দেহটা। চোখ বোঁজার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সে সামনে তাকিয়ে ছিল। শুধু একটা নেকড়ের হাত ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না সে।
সৈয়দ মারিয়াহ্ হামিদ 🕊️
[ ভুল-ভ্রান্তির সম্ভাবনা আছে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পর্বটি কেমন হয়েছে অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। ভালো থাকবেন‚ সুস্থ থাকবেন‚ ধন্যবাদ ]

